প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১০. দ্য ডার্ক ওয়ার্ল্ড

১০. দ্য ডার্ক ওয়ার্ল্ড

ধারাভি। মুম্বই, ২০২৩

মেয়েটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখের একটা দিক থেকে উজ্জ্বল সোনালি ত্বক ঝিলিক মারছে! আর অন্য পাশটা?

সমীর ভয়ে-আতঙ্কে কুলকুল করে ঘামতে লাগল। মেয়েটার মুখের আর একটা দিকে এক টুকরোও চামড়া নেই। চামড়াহীন মুখের একটা অংশ। শিরা- উপশিরার রক্তাক্ত নকশা কেউ যেন নিখুঁত হাতে এঁকে দিয়েছে সেই অংশটায়। মেয়েটার একটা চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে। ঠোঁট দু’টো অল্প ফাঁক হল। কী যেন বলার চেষ্টা করছে মেয়েটা। কী বলতে চাইছে? কী বলার চেষ্টা করছে?

সমীর শুনতে পাচ্ছে না, বুঝতে পারছে না। সে মাথাটা আরও কাছে নিয়ে এল মেয়েটার। তার পরে তীব্র ঝঙ্কারের মতো শব্দগুচ্ছ এসে আঘাত করল তার ইন্দ্রিয়ে— কেন? কেন? কী অপরাধ করেছি আমি? কেন এই ভাবে বাঁচিয়ে রেখেছ? কেন মেরে ফেলছ না আমায়?

সমীরের মুখ থেকে গোঁ গোঁ করে একটা আওয়াজ ছিটকে বেরিয়ে এল। নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করল সে। আর তখনই খাটিয়া থেকে ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। ঘুমটাও ভেঙে গেল সমীরের।

ছোট্ট এই ঘুঁপচি ঘরটায় এক জনের থাকাই মুশকিল, একাধিক ব্যক্তি থাকলে তো চূড়ান্ত সমস্যা। কিন্তু কিছু করার নেই। মুম্বইয়ে থাকতে গেলে এ ছাড়া উপায় নেই। এই রকম একটা ঘরে অন্তত দু’জনকে ভাগ করে থাকতেই হবে। না হলে ভাড়া দেওয়ার সাধ্য হবে না। ধারাভির বস্তি হলেও নয়।

ওই সময় অবশ্য সমীর একাই বিছানায় শুয়ে ছিল। কিন্তু ঘুম যখন ভাঙল, সে আর বিছানায় নেই। মাটিতে পড়ে আছে, কুলকুল করে ঘামছে।

কোনও মতে উঠে বসল সে। এখন রাত নয়। দিন। এই বস্তির ঘুপচি ঘরেও কিছুটা আলো আসছে। সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। তার পরে ঘরের পাশে রাখা কলসিটা থেকে গ্লাসে জল ভর্তি করে একটা চুমুক মারল। একটু ধাতস্ত হয়ে বিছানায় গিয়ে বসল সমীর। তার মনে তখন বঝড় বইছে।

যে-কাজটা সে করে, তা মন থেকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ছেলেটা। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ থেকে প্রায় সহায়সম্বলহীন অবস্থায় মুম্বইয়ে পা রাখার পরে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছিল এই অন্ধকার জগতে। আর তখন থেকেই সে জানত, এখানে পা রাখা যতটা সহজ, বেরিয়ে আসা প্রায় ততটাই অসম্ভব।

প্রায় এক বছর ধরে ওই বিশেষ ক্লিনিকটার সঙ্গে যুক্ত সমীর। অনেক নারকীয় কাজের সাক্ষী থেকেছে সে। দেখেছে, অন্তঃসত্ত্বা মেয়েদের কীভাবে ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়। তার পরে গর্ভপাত করানোর সময় কীভাবে কিডনি বার করে নেওয়া হয়। বেচারা মেয়েগুলো কিছু বুঝতেই পারে না। বোঝার মতো ক্ষমতাও তখন থাকে না। তার পরে ওই অবস্থায় সেই মেয়েদের কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওই ধরনের মেয়েকে আর দ্বিতীয় বার দেখে না সমীর।

কিন্তু গত চার মাস ধরে এই একটা মেয়েকে সে ক্রমাগত দেখে আসছে। মেয়েটাকে মাসে অন্তত দুই থেকে তিন বার এই ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়। তার পরে তার গায়ের, মুখের চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। বিশেষ করে মুখের। মুখের একটা দিকের চামড়া ঠিক হতে দু’ থেকে তিন সপ্তাহ লাগে। নির্ভর করে কতটা চামড়া কাটা হয়েছে, তার উপরে। ঘনত্ব আর মাত্রায় বেশি কাটা হলে স্বাভাবিক ভাবে একটু বেশি সময় লাগে জায়গাটায় নতুন চামড়া গজাতে। ওই সময় মুখের অন্য দিকের চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয়।

মুখের আকৃতি আর গড়ন দেখে সমীর আন্দাজ করতে পারে, উত্তর-পূর্ব ভারত বা নেপালের মেয়ে হবে। যখন মেয়েটিকে স্ট্রেচারে করে ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়, তখন তার জ্ঞান থাকে। ওই অবস্থায় বার কয়েক মেয়েটির চোখে চোখ পড়ে গিয়েছে সমীরের। ওই চোখ দু’টোর আকুল আর্তি দেখে সে নিজের অজানতেই কেঁপে উঠেছিল।

এক দিন একটা ঘটনা ঘটে গেল। অজ্ঞান করার জন্য যখন ইঞ্জেকশন দিতে যাবে, মেয়েটা তার হাত চেপে ধরেছিল। ওই মুহূর্তে ঘরে কেউ ছিল না। মেয়েটি বাধা দিতে যায়নি, কিছু একটা বলার চেষ্টা করেছিল ইঙ্গিতে। সমীরের ইঞ্জেকশন ধরা হাতটা অবশ হয়ে এসেছিল মেয়েটার স্পর্শে। তার চোখ দু’টোও ভিজে এসেছিল। মেয়েটা অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল সমীরের মুখের দিকে। কী যেন বলতে চেয়েছিল, কিন্তু সুযোগ পায়নি। তার আগেই ঘরে চলে আসে তার সঙ্গী রতন। সমীর আর দেরি না-করে ইঞ্জেকশনের ছুঁচটা ফুটিয়ে দেয় মেয়েটির হাতে। রতন কিছু দেখেছিল কি না, কে জানে।

সেই এক বারের পরে মেয়েটিকে আর একা পায়নি সমীর। তাই কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি, মেয়েটির কথাও শুনতে পায়নি। কিন্তু তার পর থেকে মাঝেমধ্যেই ওই ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করছে। যন্ত্রণা দিচ্ছে। রক্তাক্ত করছে। মেয়েটি যে-কথা সে দিন বলতে পারেনি, সেই না-বলা কথাই তাকে তাড়া করে স্বপ্নে- কেন বাঁচিয়ে রেখেছ আমাকে?

সমীর টেবিলে রাখা হাতঘড়িটা তুলে নিল। সকাল সাড়ে সাতটা বাজে। তার আরও কিছুটা সময় ঘুমোনোর ইচ্ছে ছিল। কিন্তু ঘুম উড়ে গিয়েছে। তার সব কাজই রাতে পড়ে। আগের দিনেও ক্লিনিকে ওই কাজটা সেরে ফিরতে ভোর হয়ে গিয়েছিল।

ডক্টর ক্লিনিক ছাড়ার আগেই সেন্টারে ফোনটা করে দিয়েছিল সমীর। অ্যাম্বুল্যান্স ঠিক সময়ে চলেও এসেছিল। সমীর আর তার সঙ্গীর কাজ ছিল, মেয়েটাকে ঠিকমতো অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে দেওয়া। আর তা হলেই তাদের দায়িত্ব শেষ। মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়া হবে গোপন ডেরায়। যেখানে আরও বেশ কয়েক জন মেয়ে আটকে রয়েছে। তাদের থেকেও প্রয়োজনে চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। তবে এই মেয়েটির কথা আলাদা। ত্বকের গুণগত মানের জন্য এই মেয়েটির কদরই অন্য রকম।

সেই দায়িত্ব শেষ করে ধারাভির এই অঞ্চলে নিজের ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল। কোনও মতে ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় ফেলে দিয়েছিল সমীর। তার সঙ্গী কয়েকটা দিনের জন্য বাইরে গিয়েছে। তাই সে এখন একাই থাকে। বিছানায় শুয়ে সমীর চেষ্টা করেছিল ঘুমের দেশে তলিয়ে যেতে। কিন্তু ভয়ঙ্কর ওই স্বপ্ন আবার ফিরে এসে তাকে জাগিয়ে দিল।

সমীর অবশ্য মনে মনে ভাবছিল, একেও কি জেগে থাকা বলে! সে তো যান্ত্রিক মানুষের মতো কোনও অনুভূতি ছাড়া ঘৃণ্য এক কাজ করে চলেছে। তার বিবেক তো ঘুমিয়ে পড়েছে কবে!

ওই সময় বেজে উঠল সমীরের মোবাইলটা।

মিনিটখানেক কথা বলার পরে সমীর যখন মোবাইলটা নামিয়ে রাখল, তার শরীর রীতিমতো কাঁপছে। কী শুনল সে! ফোনটা করেছিল তার ক্লিনিকের সঙ্গী রতন। সে-ও রীতিমতো উত্তেজিত। বার বার করে বলছিল, “আমাদের কিন্তু কোনও দোষ নেই। ওদের জন্য যা হওয়ার হয়েছে। আমরা তো নিজেদের কাজটা ঠিকঠাকই করেছিলাম।”

সমীরের তখন আর রতনের কথা কানে দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। তার মনের মধ্য দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

মেয়েটাকে নিয়ে যে-অ্যাম্বুল্যান্স যাচ্ছিল, সেটা দুর্ঘটনায় পড়ে। যে-চারটে ছেলে গাড়িতে ছিল, তারা সবাই পালিয়েছে। মেয়েটাকে পুলিশ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছে।

সমীর মনে মনে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে লাগল, মেয়েটা যেন ঠিক থাকে। তার পরে একটা কথা মনে হতেই শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যেতে লাগল। এরা কিন্তু শিকারকে সহজে ছেড়ে দেয় না। ঠিক খুঁজে নিয়ে আসে। অতীতে সেই রকম খুঁজে আনার কাজে তাকেও ব্যবহার করা হয়েছিল। পালিয়ে যাওয়া শিকার কোথায় রয়েছে, সেটা জানিয়ে দেওয়া হত। সেই জায়গায় তাকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হত। তার কাজটা ছিল শিকারকে আবার তুলে নিয়ে আসা। লোকে বলে তার মুখটা নাকি ভোলেভালা, যে-কেউ সহজে বিশ্বাস করে নেয়। ফলে ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে আসার কাজটা সহজ হয়ে যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই সব শিকারের সঙ্গে তার আগে পরিচয় থাকত না। এ বারের ব্যাপারটা অন্য। এ বারেও কি তাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে? কিন্তু… সমীর ভাবতে লাগল।

এই মেয়েটার যে-একটা আলাদা মূল্য আছে এদের কাছে, সেটা খুব ভাল করেই বুঝে গিয়েছিল সমীর। না-হলে বার বার কেন এই মেয়েটাকেই ক্লিনিকে নিয়ে আসা হবে, কেনই বা এরই মুখ আর শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হবে। অতীতে আরও কয়েক জন মেয়েকে আনা হয়েছিল ক্লিনিকে। একই পদ্ধতিতে ছাড়িয়ে নেওয়া হয় চামড়া। কিন্তু গত কয়েক মাসে বার বার এই মেয়েটিকেই দেখা গিয়েছে।

হঠাৎ আরও একটা কথা মনে পড়ে গেল সমীরের। দাঁড়িয়ে থাকার আর ক্ষমতা রইল না তার। ধূপ করে বসে পড়ল বিছানায়। এই মেয়েটি কি কোনও ভাবে ডক্টর ডেভিলের মুখ দেখে ফেলেছে? ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না সমীর। ক্লিনিকে যখন ডক্টর ঢুকত, মেয়েটা অচৈতন্য হয়ে থাকত। তবে অন্য কোথাও দেখে থাকলেও থাকতে পারে। মুখ দেখুক না-দেখুক, সমীর নিশ্চিত হয়ে গেল একটা ব্যাপারে। এই মেয়েটাকে কিন্তু সহজে ছেড়ে দেওয়া হবে না। যদি দুর্ঘটনা থেকে বেঁচেও যায়, এদের হাত থেকে বাঁচবে না।

সমীরের ঘুম ছুটে গিয়েছে। সে আর দেরি না-করে উঠে পড়ল। ঈশ্বর তার প্রার্থনা শুনেছে। তার সামনে একটা নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। যে-দরজার ও-পারে একটা আলোর পথ দেখা যাচ্ছে। সমীরকে ঠিক করতে হবে, সে ওই পথে হাঁটবে, না অন্ধকারের রাস্তা ধরেই এগিয়ে যাবে বাকি জীবনটা?

মনে মনে নিজের কর্তব্য ঠিক করে ফেলেছে সে। তার পরে জামাটা গায়ে গলিয়ে বস্তির ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামল সমীর নামে একটি বছর বাইশের যুবক। সেই রাস্তার শেষে কী আছে, ছেলেটা জানে না!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *