১৩. মারীচ
মুম্বই
৩০ বছর আগে…
.
“এই বালু, শোন।”
কে ডেকেছে, বুঝতে পেরেই ছেলেটার মুখ শুকিয়ে গেল। তার বয়স এখন ১৫ হয়ে গিয়েছে। সে ভালই বুঝতে পারে, কার মতলব কী রকম।
বালু বন্ধুদের মুখে শুনেছে, এই বয়সের মেয়েদের অনেক ঝামেলার মুখে পড়তে হয়। ছেলেরা উল্টোপাল্টা কথা বলে। মায়েরা মেয়েদের একা ছাড়ে না। কখন কী সর্বনাশ হয়ে যায়, কে বলতে পারে। তা ছাড়া বাসে-ট্রেনে মেয়েদের শরীর ছোঁয়ার জন্য তো অনেক ইতর লোক আছেই।
কিন্তু ছেলে হয়েও তাকে যে-এই রকম কোনও সমস্যার মুখে পড়তে হবে, ভাবেনি বালু।
সে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। আন্ধেরির কাছে দু’টো ঘুপচি মতো ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে তার বাবা-মা। সে পড়াশোনায় যথেষ্ট ভাল। তার বাবা- মায়ের অনেক আশা তাকে ঘিরে। তাঁরা স্বপ্ন দেখেন, এক দিন ছেলে বড় হয়ে নামী ডাক্তার হবে। তাঁদের দুঃখকষ্ট ঘোচাবে। বালুও সেই চেষ্টা করে যায়।
স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ার পরে সে একাই বাড়ি ফেরে। তার যে-খুব বেশি বন্ধুবান্ধব আছে, তা নয়। যে-দু’-এক জন আছে, তারাও অন্য দিকে থাকে। তাই বাসে করে আন্ধেরির ইস্ট হনুমান নগর বাসস্টপে নেমে কিছুটা পথ সে একাই হেঁটে আসে। এই রাস্তাটা প্রায় ফাঁকাই থাকে। রাস্তার ধারে কয়েকটা নতুন ফ্ল্যাট বাড়ি গজিয়ে উঠছে। কয়েকটা বাড়ির কাজ চলছে। কিন্তু বিকেলের দিকে শুনশান থাকে জায়গাটা।
বালু বলে তাকে বিশেষ কেউ ডাকে না। ওটা ডাক নাম। সে একটু গোলগাল চেহারার ছেলে বলে বাবা-মা আদর করে ডাকে বালু বলে। স্কুলে তার অন্য নাম আছে। যে-লোকটা তাকে ডাক দিল, সে এই এলাকারই। ফলে বালু নামটার সঙ্গে পরিচিত।
ছেলেটা ভাবল, ডাকটা না শোনার ভান করে দ্রুত চলে যাবে। সেই চেষ্টাতেও ছিল। কিন্তু তত ক্ষণে তার সামনে চলে এসেছে দ্বিতীয় আর একটা লোক। সে বালুর হাত ধরে মিষ্টি করে হেসে বলল, “আরে কোথায় যাচ্ছিস, আয় না একটু গল্প করব।”
বালুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লোকটা এ বার টেনে নিয়ে গেল রাস্তার পাশের বাড়িটায়। এই বাড়িটায় কাজ চলছে। এখন ফাঁকাই আছে। ফ্ল্যাট বাড়ির বেসমেন্টে দাঁড়িয়ে আছে প্রথম লোকটা। সে এ বার পানের ছোপ ধরা দাঁত বার করে হেসে বলল, “কী রে বালু, তোকে ডাকলাম, শুনতে পেলি না?”
বলে এগিয়ে এসে বালুর গালটা ধরে জোরে টিপে দিল। ছেলেটার শরীর যেন ঘিনঘিন করে উঠল লোকটার স্পর্শে। সে মাথা ঝাঁকিয়ে লোকটার হাত ছাড়াতে চেষ্টা করল। লোকটা আর একটু সময় টিপে রাখল বালুর গাল। তার পরে ছেড়ে দিয়ে আবার ওই কুৎসিত হাসি হেসে বলল, “বালু সোনা আমাদের পছন্দ করছে না দেখছি। কী রে বালু, কী রকম চলছে পড়াশোনা? তুই নাকি ডাক্তার হবি!”
বালু কিছু বলল না। মুখ নামিয়ে রইল। “ডাক্তার হলে তো তোকে লোকের ল্যাংটা চেহারা দেখতে হবে! পারবি তো? অভ্যাস করে নিস আগে থেকেই।” দু’টো লোকই ভেঙে পড়ল অট্টহাসিতে। প্রথম লোকটা আরও মিনিটখানেক তাকিয়ে রইল বালুর দিকে। তার পরে কী ভেবে বালুর কাঁধে হাত রেখে বলল, “ঠিক আছে, বাড়ি যা।” বালু পিছন ফেরে এক পা বাড়াতেই লোকটা বালুর পশ্চাদ্দেশে একটা থাপ্পড় মেরে চেঁচিয়ে উঠল, “যা দৌড়ো, না-হলে বাঘে খেয়ে নেবে।” বালু এ বার সত্যি ছুটতে শুরু করল। পিছন থেকে তখনও লোক দু’টোর নোংরা হাসি ভেসে আসছে।
লজ্জায় বাবা-মাকে লোক দু’টোর কথা বলতে পারেনি বালু। এই লোক দু’টো এখানেই থাকে। এক জন অটো চালায়, অন্য জন কী করে, বালু জানে না। কিন্তু এদের দেখলেই বালু এখন ভয়ে জমে যায়।
মাসখানেক এ রকমই চলল। শীত পড়ে গিয়েছে। দেশের পশ্চিমপ্রান্তে হলেও সূর্যটা আগের চেয়ে তাড়াতাড়ি ডোবে। অন্ধকারও তাড়াতাড়ি নামে। সে দিনের পরে লোক দু’টো আর বালুকে ডিস্টার্ব করেনি। ছেলেটা মনে মনে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছিল। হয়তো সে যা ভাবছে, তা ঠিক নয়। হয়তো লোক দু’টো স্রেফ মজাই করছিল তার সঙ্গে। যাই হোক। ওই সব ভুলে তাকে এখন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হবে। তাকে অনেক দূর যেতে হবে। জীবনে কিছু একটা করতেই হবে।
বালু অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিল। বুঝতেও পারেনি, রাস্তার পাশের ফাঁকা বাড়িটা থেকে একটা ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এসেছে। বুঝতে যখন পারল, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। লোকটার শক্তিশালী হাত তার মুখ চেপে ধরেছে। অন্য হাতটা তাকে মাটি থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেল ফাঁকা বাড়িটার মধ্যে। যেখানে অপেক্ষা করে ছিল অন্য লোকটা।
পরের আধ ঘণ্টায় যে-নরকযন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল বালুকে, তা খুব কম বাচ্চাই সহ্য করতে পারে। কিন্তু বালু সে দিন সহ্য করেছিল। লোকগুলো তার জামা-প্যান্ট ছিড়ে দেয়নি। তারা জানত, তা হলে বালুকে অনেক প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। সমস্যা হতে পারে। আর এই শিকারকে তারা এত সহজে ছেড়ে দিতে রাজি নয়। এই রকম মাল খুব কমই হাতে পাওয়া যায়। ছেলেটা এ বার তাদের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।
সব হয়ে যাওয়ার পরে বালুকে আবার পোশাক পরতে ইঙ্গিত করল লোক দু’টো। তার পরে বালুর পকেটে দু’টো একশো টাকার নোট গুঁজে দিয়ে দাঁতে পানের ছোপওয়ালা লোকটা বলল, “চুপচাপ বাড়ি চলে যা। কাউকে কিছু বলবি না। টাকাটা নিয়ে ফূর্তি কর। মুখ যদি খুলেছিস, তা হলে গলা কেটে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে দেব।”
বালু সে দিন চুপচাপ চলে এসেছিল। সে প্রতিবাদ করতে পারেনি, সে কাপুরুষ ছিল। কিন্তু যন্ত্রণার শেষ হয়নি। আরও বেশ কয়েক বার লোকগুলোর চরম লালসার শিকার হয়েছিল সে। বিকৃত মানসিকতার চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল তার শরীরে। বেশ কয়েক বার বালুর নিতম্ব, ঊরু থেকে ব্লেড দিয়ে চামড়া কেটে নিয়েছিল দাঁতে পানের ছোপওয়ালা লোকটা। আর বিকৃত উল্লাসে সেগুলো বালুকে দেখিয়েছিল।
ক্ষতচিহ্নগুলো শরীরের যেখানে হয়েছিল, সেগুলো বালু লুকোতে পেরেছিল। তাই বাবা-মা কিছু জানতে পারেননি। বালুও কাউকে কিছু জানায়নি। ভয়ে, লজ্জায়। তবে ছেলেটা বুঝতে পেরেছিল, এই দুঃস্বপ্নের হাত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তাকে জীবনে বড় কিছু হতে হবে। স্বপ্নপূরণ করতে হবে।
আরও পাঁচটা বছর কেটে গিয়েছে। বালু এখন ডাক্তারি পড়ছে। যথেষ্ট মেধাবী ছাত্র সে। ডাক্তারি পড়তেও তার বেজায় উৎসাহ। এই উৎসাহ আরও বাড়তে থাকে, যখন সে মানবদেহের নানা জায়গায় ছুরি চালানোর সুযোগ পায়। হোক না সেগুলো মৃতদেহ। ওই মৃতদেহগুলোর মধ্যেই সে-দিনের ওই লোকটাকে খুঁজে পায় বালু। মৃতদেহগুলোর মুখ বদলে যায় তার চোখের সামনে। দেখতে পায় পানের ছোপধরা দাঁতগুলোকে। ছুরি ধরা মুঠোটা শক্ত হয়ে যায় বালুর।
শুধু তো মানুষ নয়। মানবদেহের উপরে ছুরি চালানো তো এখন শুরু হয়েছে। বালু তার প্রতিহিংসা নেওয়া শুরু করেছে অনেক দিন আগে থেকে। তবে মানুষকে তখন শিকার বানাতে পারত না সে। ছুরিগুলো চালাত ইতর প্রাণীদের উপরে। ব্যাঙ, বিড়াল এমনকী শেষে কুকুরের বাচ্চারাও রেহাই পায়নি। কখনও মুখ বেঁধে, জ্যান্ত অবস্থাতেও এই ছোট ছোট প্রাণীর ছাল ছাড়িয়ে নিত বালু। চোখের দৃষ্টি বদলে যেত তার। নরকের আগুন জ্বলত সেই চোখে।
তার পরে আরও অনেক বছর কেটে গিয়েছে। বালু এখন নামকরা চিকিৎসক। সার্জন। লোকে বলে, এই ডক্টরের হাতে জাদু আছে। ওই রকম নিপুণ ভাবে ছুরি চালাতে কেউ পারে না।
জীবন বয়ে যাচ্ছে। তার বাবা মারা গিয়েছেন। বালু বিয়ে করেছে। দ্বৈত জীবনে সে খুব ভাল অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে নিজের অন্য একটা সত্ত্বাকে। শয়তানের সত্ত্বা।
বালু এখন আর ছোট ছোট প্রাণী মারে না। তাকে অন্য নেশায় পেয়েছে। আরও একটা সুবিধে হয়ে গিয়েছে তার। সে শুধু নামকরা সার্জনই নয়, দানধ্যান করার ব্যাপারেও সুখ্যাতি আছে। অনেক চ্যারিটিবল সংস্থায় টাকা দেয় সে। যুক্ত আছে বেশ কিছু এনজিও-র সঙ্গে। এই রকম কয়েকটা এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরে বালুকে অন্য নেশায় পেয়েছে। আর নেশার রসদ জোগানোর বস্তু ও সে পেয়ে গিয়েছে!
ছোটবেলায় তাকে ভয়ঙ্কর এক সময়ের মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে। যে- বয়সে সে নরকযন্ত্রণার শিকার হয়েছে, সে বয়সের ছেলে-মেয়েরা এখন খেলে বেড়ায়, ফূর্তি করে। কেন এমন হবে? ওরা কেন আনন্দ করবে? বালুর চোয়াল শক্ত হয়ে আসে ওদের দেখলে!
.
৩০ বছর পার হয়ে গিয়েছে। সময়টা ২০২৩।
.
অজন্তা অন্তর্ধান রহস্যের এখনও কোনও ক্লু পাওয়া যায়নি। না পেয়েছে পুলিশ, না পেয়েছেন পাঞ্চালী।
দীর্ঘদিন হিউম্যান ট্র্যাফিকিং নিয়ে কাজ করার সুবাদে পাঞ্চালী অনেক বড় বড় জায়গা থেকে আমন্ত্রণ পান বক্তব্য রাখার জন্য। বেশ কিছু নামকরা, আন্তর্জাতিক সংস্থার তরফে আমন্ত্রণ আসে তার কাছে।
এই রকমই একটা সংস্থার আমন্ত্রণে সে দিন তিনি গিয়েছিলেন এক সেমিনারে। যেখানে উপস্থিত ছিলেন আরও চার কৃতী ব্যক্তিত্ব। এই চার জনের মধ্যে অবশ্য একটা মিল ছিল। চার জনই চিকিৎসক।
এই সেমিনারটা একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে করা হচ্ছে। চিকিৎসকরা বোঝাবেন, হিউম্যান ট্র্যাফিকিংয়ের সঙ্গে কিছু কিছু চিকিৎসকও কীভাবে জড়িয়ে যান। কীভাবে তাদের সাহায্যে পাচার হওয়া ছেলেমেয়েদের শরীর থেকে নানা অর্গ্যান কেটে নেওয়া হয়। এই সেমিনারে মূলত তাঁদেরই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যারা ফিল্ডে নেমে পাচারকারীদের রুখতে কাজ করে। পাঞ্চালী ছাড়াও এই সেমিনারে এসেছেন বেশ কয়েক জন অ্যান্টি হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ক্রুসেডার। যাঁরা রীতিমতো যুদ্ধ চালাচ্ছেন সমাজের এই ব্যাধিকে দূর করতে। যা হয়তো কোনও দিনই সম্ভব হবে না।
এই চার চিকিৎসকের মধ্যে তিন জন সার্জন। এক জন মেডিসিনের ডক্টর।
পাঞ্চালী শুনছিলেন তাঁদের বক্তব্য। শুনতে শুনতে মনে হল, এই চিকিৎসকদের সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার। যদি কোনও ক্লু পাওয়া যায়। বিশেষ করে এই স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের ব্যাপারে।
ঘণ্টা দেড়েকের সেমিনার শেষে একে একে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন চার ডক্টর। প্রশান্ত পাটিল, অপূর্ব দেশপাণ্ডে, শ্রুতি শিণ্ডে এবং লতা দেশমুখ।
সেমিনারের অতিথিদের জন্য লাঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানেই চার চিকিৎসকের দিকে এগিয়ে গেলেন পাঞ্চালী। এ কথা-সে কথার পরে প্রসঙ্গটা তুলেই ফেললেন। “আচ্ছা, এখন তো একটা নতুন ধরনের ট্র্যাফিকিংয়ের কথা শোনা যাচ্ছে। স্কিন ট্র্যাফিকিং। আপনারা এই ব্যাপারে কিছু শুনেছেন বা কোনও কেসের সন্ধান পেয়েছেন?”
চার ডাক্তারই একটু চুপ করে গেলেন। তার পরে লতা দেশমুখ বলে উঠলেন, “দেখুন, ভারতে তো স্কিন ব্যাঙ্ক আছে। সেখানেই মরণোত্তর চামড়াদানের ব্যাপারটাও আছে। যে-রকম ভাবে শরীরের বাকি অঙ্গদান করা হয়, সে ভাবে। ব্রেন ডেড হওয়ার পরে স্কিন ডোনেট করা হয়।”
পাঞ্চালী বলে উঠলেন, “সে জন্যই তো ট্র্যাফিকিংয়ের ব্যাপারটা উঠছে। শোনা যাচ্ছে, এখন মানুষের চামড়া ছাড়িয়ে বিদেশে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। সে ব্যাপারে আপনারা কিছু শুনেছেন কি না, সেটাই জানতে চাইছিলাম।”
চার ডাক্তার পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিলেন এক বার। তার পরে প্রশান্ত পাটিল বললেন, “এই ব্যাপারটা মনে হয় কোনও প্ল্যাস্টিক সার্জন আপনাকে ভাল বলতে পারবে। এই ধরনের কোনও কেস ওদের কাছেই প্ৰথমে আসবে।” সায় দিলেন অপূর্ব দেশপাণ্ডেও। চার জনের মধ্যে যিনি মেডিসিনের ডক্টর।
পাঞ্চালী বুঝতে পারছিলেন, এঁদের কাছ থেকে তিনি বিশেষ কিছু জানতে পারবেন না। সত্যিই তো, প্ল্যাস্টিক সার্জনেরই এই ব্যাপারে বেশি জ্ঞান থাকা উচিত। শুধু তাই নয়। পাঞ্চালী আরও একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হচ্ছিলেন ক্রমশ। কোনও ভাল প্ল্যাস্টিক সার্জন সম্ভবত এই গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে। না-হলে চামড়া ছাড়িয়ে সেটা সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা সাধারণ মানুষের কর্ম নয়। ডক্টর ডেভিল সম্ভবত কোনও সত্যিকারের চিকিৎসকেরই কোড নেম। পাঞ্চালী ধন্যবাদ জানিয়ে সরে এলেন সেখান থেকে।
লাঞ্চ শেষ হয়ে গিয়েছে। অনুষ্ঠানও শেষ। অতিথিরা এ বার বিদায় নেবেন। অনুষ্ঠানের সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে পাঞ্চালীও বেরনোর তোরজোর করছিলেন। তখনই তাঁর কাঁধে একটা টোকা পড়ল। ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলেন পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রুতি শিণ্ডে। হাসিমুখে ভদ্রমহিলা বললেন, “আপনার কথা আমি তখন শুনছিলাম। যদিও কিছু বলিনি। আমি কয়েকটা এনজিও-র সঙ্গে যুক্ত। অনেক কথাই কানে আসে। আপনি এক বার আমার সঙ্গে দেখা করুন। খোলাখুলি কথা বলা যাবে।”
“অবশ্যই। কবে, কোথায় বলুন। চলে আসব,” পাঞ্চালী আগ্রহ বোধ করলেন।
“আমার কার্ডটা রাখুন। এখানে একটা চেম্বারে আমি বসি। কাল আমার ও টি নেই। আপনি দুপুর দু’টো নাগাদ চলে আসতে পারেন।
পাঞ্চালী রাজি হয়ে গেলেন। আর দু’-একটা মামুলি কথা বলে নিজের অফিসের দিকে রওনা দিলেন তিনি। চার ডাক্তারই তাঁর চলে যাওয়াটা দেখতে লাগলেন। খুব ভাল করে।
.
ঠিক সময়ই ডক্টর শ্রুতি শিণ্ডের চেম্বারে হাজির হয়ে গেলেন পাঞ্চালী। মিনিট দশেক পরেই তাঁকে ভিতরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন রিসেপশনিস্ট। পাঞ্চালী ঢুকে দেখলেন, ভিতরটা ফাঁকা। সামনে একটা বড় টেবিল। টেবিলের ও প্রান্তে একটা সুদৃশ্য চেয়ার রাখা। আর এ পাশেও দু’টো চেয়ার। সেই চেয়ারের একটায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলেন পাঞ্চালী। দু’মিনিটের মধ্যে পাশের অ্যান্টি চেম্বারের দরজা খুলে হাসিমুখে ঢুকলেন শ্রুতি।
“বলুন এ বার, ঠিক কী জানতে চাইছেন আপনি?” চেয়ার টেনে বসে দু’টো কফির অর্ডার দিয়ে বললেন তিনি।
পাঞ্চালী আবার তাঁর প্রশ্নগুলো খুলে বললেন। একটু ভাবলেন শ্রুতি। তার পরে বললেন, “স্কিন ট্র্যাফিকিং কত দূর কী ছড়িয়েছে, সেটা আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে এটা ঠিক, যে-কিছু কথা কানে এসেছে। বিভিন্ন এনজিওয় যাওয়া আসা আছে বলে শব্দটা আমার পরিচিত।”
পাঞ্চালী বলে উঠলেন, “আপনি কি কোনও কেসের কথা শুনেছেন? বা কোনও ইঙ্গিত পেয়েছেন?”
শ্রুতি মাথা নাড়লেন, “না, সরাসরি কিছু শুনিনি। যা শুনেছি কানাঘুষো। নেপাল থেকে নাকি মেয়েদের পাচার করে নিয়ে আসা হয়। তার পরে তাদের চামড়া কেটে নেওয়া হয়। কখনও অর্থের বিনিময়ে, কখনও জোর করে। কিন্তু এর বেশি কিছু জানি না।”
পাঞ্চালী চুপ করে গেলেন। কী বলবেন, ভাবছিলেন। তার পরে শ্রুতি বললেন, “স্কিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট কীভাবে হয়, তার একটা ধারণা চিকিৎসক হিসেবে আপনাকে দিতে পারব। হয়তো পুরোটা শুনলে আপনার কাজের সুবিধে হবে।”
শ্রুতি বোঝাতে শুরু করলেন ব্যাপারটা।
এক জনের শরীর থেকে চামড়া তুলে অন্যের শরীরে লাগানোকে বলা হয় স্কিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট। স্কিন গ্রাফ্টিংয়ের মাধম্যে এই ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট হয়। চিকিৎসাশাস্ত্রে মূলত তিন ধরনের স্কিন গ্রাফ্টিংয়ের কথা বলা হয়েছে।
অটোগ্রাফ্ট: রুগির নিজের শরীরের একটা অংশ থেকে চামড়া কেটে নিয়ে অন্য অংশে লাগানো হয়। যেটা চিকিৎসা শাস্ত্রে সব চেয়ে বেশি দেখা যায়।
আইসোগ্র্যাফ্ট: যখন যমজ সন্তান, যাদের বলা হয় আইডেন্টিকাল টুইন, একে অন্যকে চামড়া দান করে। এক জনের শরীর থেকে চামড়া নিয়ে অন্য জনের শরীরে লাগানো হয়।
অ্যালোগ্র্যাফ্ট: এ ক্ষেত্রে অন্য কোনও ব্যক্তির শরীর থেকে চামড়া নিয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তির শরীরে লাগানো হয়। এ সব ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে শরীর এই সব চামড়া গ্রহণ করতে পারে না। কারণ শরীরের ইমিউন সিস্টেম এই চামড়াকে ‘শত্রু’ মনে করে আক্রমণ করে।
শ্রুতি বলে যেতে লাগলেন, “স্কিন গ্রাফ্টিং প্রধানত দু’রকমের হয়। একটা ফুল থিকনেস স্কিন গ্রাফ্টিং। অন্যটা স্প্লিট থিকনেস গ্রাফ্টিং। স্প্লিট থিকনেসের ক্ষেত্রে চামড়ার উপরের অংশ আর মাঝের অংশের খানিকটা তুলে নেওয়া হয়। যাকে বলা হয় এপিডারমিস এবং ডারমিস। এতে অনেক সুবিধে আছে। প্রধানত সমস্যাটা হয় ফুল থিকনেস স্কিন গ্রাফ্টিংয়ের ক্ষেত্রে।”
একটু থামলেন শ্রুতি। পাঞ্চালী মন দিয়ে শুনছিলেন তাঁর কথা। তবে এগুলো মেডিক্যাল জার্গন। এই সব তথ্য তার কাজে লাগবে কি না, বুঝতে পারছিলেন না। শ্রুতি আবার শুরু করলেন।
“দু’ধরনের গ্রাফ্টিংয়ের ক্ষেত্রে দু’রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে। স্প্লিট থিকনেসের ক্ষেত্রে যার শরীরে নতুন চামড়া বসানো হচ্ছে, তার সঙ্গে সব সময় রং বা টেক্সচারে মেলে না। এই সব ক্ষেত্রে দেখা যায়, দু’টো চামড়ার দু’রকম রং এসে যাচ্ছে। যে-চামড়াটা বসানো হয়, সেটা কখনও ফিকে হয়ে যায়, কখনও গাঢ়।”
“আর দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে?” প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন পাঞ্চালী।
“দ্বিতীয়টা হল ফুল থিকনেস গ্রাফ্টিং। এ ক্ষেত্রে চামড়ার দু’টো ভাগ— এপিডারমিস এবং ডারমিস, পুরোটাই এক জনের শরীর থেকে তুলে নেওয়া হয়। এই ধরনের গ্রাফ্টিং হলে অনেক ক্ষেত্রেই তফাতটা বোঝা যায় না। সাধারণত, মুখের ক্ষেত্রে ফুল থিকনেস গ্রাফ্টিং ব্যবহার করা হয়। মুখ তো লোকে দেখতে পায়। চামড়ার রং দু’রকম হয়ে গেলে তো মুখ বিকৃত হয়ে যাবে। তাই এই ধরনের কসমেটিক বা রিকনস্ট্রাক্টিভ সার্জারির ক্ষেত্রে ফুল থিকনেস স্কিন গ্ৰাফ্টিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।” একটু দম নিয়ে শ্রুতি কথা শেষ করলেন, “শরীরের যে-সব জায়গায় রক্তবহনকারী শিরা-উপশিরা আছে, সেখানেই এই ফুল গ্রাফ্টিং করা হয়।”
“সমস্যাটা কী হয় এই ক্ষেত্রে?”
কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে শ্রুতি জবাব দিলেন, “বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ম্যাচ করে না বলে শরীর এই নতুন চামড়া গ্রহণ করতে পারে না। অর্গ্যান রিজেকশন সিম্পটম দেখা দিতে থাকে। যে-মুহূর্তে নতুন চামড়ায় রক্তপ্রবাহ শুরু হয়ে যায়, তখনই সমস্যাটা দেখা দেয়।”
এতটা শোনার পরেও পাঞ্চালী ঠিক বুঝতে পারছিলেন না এই সব তথ্য তাঁকে কতটা সাহায্য করবে। তবু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কয়েকটা কথা জানার ইচ্ছে ছিল তাঁর।
“এক জনের শরীর থেকে চামড়া তুলে নিলে তার সুস্থ হতে কতটা সময় লাগে?”
পাঞ্চালী যে-প্রশ্নটা করলেন, স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ক্লাস টেন ফেল করা লোকও তার উত্তর জানে। অল্প ঘনত্বের চামড়া (স্প্লিট থিকনেস স্কিন গ্রাফ্ট) নিলে দু’ থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে চামড়াটা গজিয়ে যায়। এই সব ক্ষেত্রে সাধারণত ০.৩ মিলিমিটার চামড়া কেটে নেওয়া হয়।
যদি বেশি ঘনত্বের (ফুল স্কিন গ্রাফ্টিং) চামড়া কাটা হয়, তা হলে সময়টা আরও বেশি লাগে। এ ক্ষেত্রে যার শরীর থেকে পুরো চামড়াটা নেওয়া হচ্ছে, তাকে অনেক দিনই চিকিৎসার মধ্যে থাকতে হয়।
একই জবাব পাঞ্চালীকে দিলেন শ্রুতি। তার পরে বললেন, “যে-কারণে স্প্লিট থিকনেস গ্রাফ্টিংটাই বেশি ব্যবহার করা হয়। তাও মূলত নিজের শরীর থেকে চামড়া নিয়েই। সে ক্ষেত্রে রিজেকশনের আশঙ্কা নেই। শরীরে সমস্যা দেখা দেবে না। না-হলে দেখা যায়, কিছু দিন পরে বাইরে থেকে বসানো চামড়াটা কালো হয়ে যাচ্ছে। আরও মনে রাখবেন, এখন স্কিনের বদলি অনেক সিন্থেটিক প্রোডাক্টও বাজারে চলে এসেছে।” একটু থামলেন শ্রুতি। তার পরে নিজের মনেই বললেন, “স্কিন ট্র্যাফিকিং কতটা লাভজনক, এই ব্যাপারে কিন্তু প্রশ্ন থাকবে। তাই…।” কথা শেষ করলেন না তিনি।
দু’জনেই একটু সময় চুপ করে থাকলেন। পাঞ্চালীর মনে হল, শ্রুতি ঠিক মেনে নিতে পারছেন না স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের তত্ত্বটা। তবু আরও কিছু জানার ছিল তাঁর। কফির কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে পাঞ্চালী প্রশ্ন করলেন, “এই সব র্যাকেটের সঙ্গে চিকিৎসকদের যোগাযোগটাও থাকতে হবে তা হলে?”
শ্রুতি মাথা নাড়লেন, “সেটা খুবই স্বাভাবিক। বিশেষ করে যদি ব্যাপারটা অর্গ্যান ট্র্যাফিংকিংয়ের দিকে চলে যায়।”
“তা হলে স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের ক্ষেত্রে প্ল্যাস্টিক সার্জনদের দরকার পড়বে গ্যাংগুলোর?”
একটু সময় চুপ করে রইলেন শ্রুতি। তার পরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চেম্বারের বাঁ দিকে একটা বড় কাচের জানলা। সেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শ্রুতি যেন নিজের মনেই বলে চললেন, “ব্যাপারটা অত সোজা নয়। এই ফিল্ডে দু’ধরনের সার্জন আছে। এক দল, প্ল্যাস্টিক সার্জন। অন্য দল, কসমেটিক সার্জন। এমবিবিএস পাশ করার পরেই আপনি এই লাইনে আসতে পারেন। কেউ যদি প্ল্যাস্টিক সার্জারিতে বিশেষজ্ঞ হতে চায়, সে এই কোর্সটা পুরো করে ডিগ্রি পাবে। কিন্তু…।” শ্রুতি থেমে গেলেন।
তার পরে আবার টেবিলের সামনে এসে পাঞ্চালীর চোখে চোখ রেখে বললেন, “কসমেটিক সার্জারি রপ্ত করা কিন্তু অতটা কঠিন নয়। সে ক্ষেত্রে যে- কোনও ফিল্ডের ডাক্তাররা চুপচাপ এই শিক্ষাটা আয়ত্ব করতে পারে। মানে সহজ করে বললে এক জন সার্জন বা এক জন মেডিসিনের ডাক্তারও কসমেটিক সার্জারিতে দক্ষ হতে পারে ঠিকমতো অভ্যাস করলে। ডিগ্রি না থাকলেও চলবে। একটু দম নিয়ে শ্রুতি তাঁর কথা শেষ করলেন, “তাই শুধু প্ল্যাস্টিক সার্জনদের দিকে আঙুল তুললেই চলবে না। আমি বা অন্য কোনও এমবিবিএস ডিগ্রি পাওয়া চিকিৎসকও চুপচাপ এই কাজটা করে দিতে পারব।”
পাঞ্চালী নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন শ্রুতি শিণ্ডের দিকে।
.
সেই রাতে স্ত্রীর পাশে শুয়ে বালু ছটফট করতে লাগল। কিছুতেই ঘুম আসছে না। পাশে স্ত্রী অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সারা দিনের পরিশ্রমের পরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বালুও পরিশ্রান্ত। তাঁকেও একটা বিশেষ কেস হ্যান্ডল করে আসতে হয়েছে। কিন্তু তাও ঘুম আসছে না।
বালু আবার ছটফট করতে লাগল। তার রক্ত আবার চঞ্চল হয়ে উঠেছে। আবার প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে তার মধ্যে। প্রতিশোধটা নিতেই হবে। বালু ঠিক করে ফেলল, পরের দিন আবার ওই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে যেতে হবে।
যাওয়াটা তার খুবই প্রয়োজন।
