প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

৫. নরক দর্শন

৫. নরক দর্শন

মুম্বই, ২০২৩

লোকটাকে ব্যাগটা ছুড়তে দেখেই চৌহান বুঝে গিয়েছিলেন, কী ঘটতে চলেছে। তাঁর পুলিশি ট্রেনিং কাজ করতে শুরু করল।

লোকটা দৌড় শুরু করার আগেই তার দিকে এগোতে শুরু করেছিলেন চৌহান। এ বার দ্রুত তাড়া করলেন লোকটাকে। সিঁড়ির অর্ধেক নামার আগেই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লোকটার পিছনে পৌঁছে গেলেন চৌহান। তার পরে ওই অবস্থায় একটা ধাক্কা। ভারসাম্য রাখতে না পেরে লোকটা গড়িয়ে পড়ল সিঁড়ি দিয়ে। তিনতলা আর দোতলার মাঝে যে-ল্যান্ডিং, সেখানে গিয়ে থামল শরীরটা। লোকটা যখন মুখ তুলে তাকাল, চৌহানের পিস্তলের নলটা তাক করা রয়েছে তার দিকে।

পড়ে থাকা চেহারাটার দিকে তাকিয়ে চৌহান বলে উঠলেন, “এ তো মনে হচ্ছে এই ফ্ল্যাটের মালিক। মিস শিণ্ডে, আপনার সন্দেহ সত্যি। এই ফ্ল্যাটে একটা কিছু চলছে।”

ভূপতিত শরীরটার দিকে তত ক্ষণে এগিয়ে গিয়েছে কনস্টেবল এবং লেডি অফিসারটি। শ্রুতি আর পাঞ্চালীর বিস্ফারিত চোখের দিকে তাকিয়ে চৌহান জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা একে চেনেন নাকি?”

পাঞ্চালী চিনতে পারেননি। কিন্তু শ্রুতি শিণ্ডে ঠিক চিনে নিলেন। বার কয়েক যে-এই লোকটাকে দেখেছেন তিনি।

কোনও মতে বলতে পারলেন— “জয়ন্ত দেশমুখ! লতা দেশমুখের হাজব্যান্ড।”

পরের আধ ঘণ্টায় যে-সব দৃশ্য দেখা গেল, তা নড়িয়ে দিয়ে গেল পাঞ্চালীকেও। তিনি অনেক কেস সামলেছেন। প্রচুর বাচ্চাকে ট্র্যাফিকিংয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। যৌনপল্লী থেকে মেয়েদের উদ্ধার করেছেন। কিন্তু এই রকম দৃশ্য আগে দেখেননি!

জয়ন্ত দেশমুখের হাতে হাতকড়া লাগানোর পরে মিনিট পাঁচেক ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দিতে হয়েছিল পুলিশকে। তার পরে ওই বয়স্ক মহিলা দরজা খুলে দেন।

শ্রুতি আর পাঞ্চালী প্রথমেই এগিয়ে যান বন্ধ দরজাটার দিকে। ওই রাঁধুনি মেয়েটার কথা অনুযায়ী, ড্রয়িংরুম লাগানো দু’টো বেডরুম রয়েছে। একটার দরজা খোলা। খাটটা দেখা যাচ্ছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে, ওই ঘরে কেউ নেই। অন্য ঘরের দরজাটা বন্ধ।

প্রায় একইসঙ্গে শ্রুতি আর পাঞ্চালী গিয়ে ধাক্কা মারলেন দরজায়। তালা লাগানো ছিল না। খুলে গেল দরজা। আর স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন দুই মহিলা।

খাটের উপরে একটা মূর্তি বসে। মানুষ কি না, চট করে বোঝা মুশকিল। একটু ভাল করে দেখলে বোঝা যাবে, সম্পূর্ণ নগ্ন একটা বাচ্চা হাঁটু মুড়ে বসে আছে বিছানার উপরে।

লম্বাচুলে জট বেঁধে গিয়েছে। সেই চুল নেমে এসেছে মুখের উপরে। মুখটা ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। মাথায় একটা ফেট্টি বাঁধা। আর তার উপরে মাছি ভনভন করছে। একটা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ঘরময়। পাশের ধূপদানিতে চন্দন ধূপ জ্বলছে। কিন্তু সেই ধুপের গন্ধও চাপা দিতে পারছে না এই পুতিগন্ধকে। মেয়েটার পা শিকলে বাঁধা। যে-শিকল আবার লাগানো লম্বা একটা চেনের সঙ্গে। চেনটা বাঁধা খাটের পায়ায়।

শ্রুতি দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন দরজার কাছেই। তিনি আর এগোতে পারছিলেন না। পাঞ্চালী এগিয়ে গেলেন মেয়েটার কাছে। শুধু মাথাতেই নয়। শরীরের বিভিন্ন জায়গাতেও ক্ষতচিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার কাঁধের কাছে এসে চোখ আটকে গেল পাঞ্চালীর। দেখে মনে হচ্ছে, ওই জায়গা থেকে কেউ ছাল ছাড়িয়ে নিয়েছে। কাঁপতে লাগলেন পাঞ্চালী। তার পরে নিজেকে সামলে ডাকলেন শ্রুতিকে, “আপনি এক বার এখানে এসে দেখুন, এই বাচ্চাটা আপনাদের হারিয়ে যাওয়া সেই বাচ্চা কি না?”

হুঁশ ফিরে পেয়ে ধীরে ধীরে খাটের কাছে এগিয়ে এলেন শ্রুতি শিণ্ডে। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, হোমে যে-ফুটফুটে, ফর্সা বাচ্চাটাকে দেখেছিলেন, সে এই বাচ্চাটা কি না। কিন্তু তাঁকে চিনতে হল না। বাচ্চাটা এ বার মুখ তুলে তাকাল শ্রুতির দিকে। তার পরে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরল শ্রুতির বড়সড় শরীরটা। শ্রুতি কী করবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। তবে দু’জনেই বুঝে গেলেন, তাঁরা যে-মেয়েটার খোঁজ করছিলেন, এই বাচ্চাটাই সেই মেয়ে।

শ্রুতির মস্তিষ্কে তখন বিস্ফোরণ ঘটে চলেছে। প্রচণ্ড একটা রাগ তাঁর শরীরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। এই বাচ্চাটাকে তাঁর ভীষণ মনে ধরেছিল, পছন্দ হয়েছিল। কোনও নরাধম যে-এ রকম করবে, তিনি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। জয়ন্ত দেশমুখকে এর জন্য শাস্তি পেতেই হবে।

পাঞ্চালীর মাথায় তখন আর একটা ভাবনা জন্ম নিচ্ছে। মেয়েটার গায়ে ওই ক্ষতটা দেখার পরেই তাঁর মনে সন্দেহটা দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে।

চৌহান তত ক্ষণে যা করার করে ফেলেছেন। মা এবং ছেলেকে হাতকড়া পরিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে দু’টো চেয়ারে। নীচে পাহারায় থাকা কনস্টেবলটিকে তিনি উপরে ডেকে এনেছেন। ফোন করে দিয়েছেন হেডকোয়ার্টার্সে। বাড়তি পুলিশ ফোর্স এবং অ্যাম্বুল্যান্স এখনই চলে আসবে। চৌহান বুঝতে পারছিলেন, এই কেস অনেক দূর গড়াবে। মিডিয়ায় তুমুল হইচই হবে। লোকটার পরিচয় তিনি তত ক্ষণে পেয়ে গিয়েছেন শ্রুতির কাছ থেকে। শহরের অন্যতম নামী সার্জন। এই কেসটা সল্ভ করার জন্য একটা পদকও জুটে যেতে পারে। মনে মনে বেশ তৃপ্তিলাভ করলেন এসএইচও।

মেয়েটার পায়ের শিকলে লাগানো তালার চাবিটা পাওয়া গেল ভদ্রমহিলার কাছেই। তিনি আর বিশেষ ঝামেলা না-করে চাবিটা তুলে দেন মহিলা পুলিশকর্মীটির হাতে। তার পর থেকে মা আর ছেলে চুপ করেই বসে ছিলেন চেয়ারে। চৌহান এক বার ওদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। লোকটার মুখে কোনও বিকার নেই। এক্কেবারে পাকা বদমাশ। অনেক বার এই রকম করেছে বলেই মনে হচ্ছে চৌহানের।

শ্ৰুতি তত ক্ষণে ওই লেডি অফিসারের সাহায্যে যতটা পারেন বাচ্চাটিকে পরিষ্কার করে একটা জামা পরিয়ে দিয়েছেন। তিনি এখনও স্বাভাবিক হতে পারছেন না। বাচ্চাটিও জড়িয়ে বসে রয়েছে তাঁকে।

মিনিট দশেকের মধ্যেই অ্যাম্বুল্যান্স এবং পুলিশের ভ্যান চলে এল বাড়ির সামনে। বাচ্চাটিকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে একটা হাল্কা ডোজের ঘুমের ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। তার পরে তুলে দেওয়া হল অ্যাম্বুল্যান্সে। এর পরে শুরু হল ফ্ল্যাটের তল্লাশি।

দু’টো বেডরুমে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। সব স্বাভাবিক জিনিসপত্র। আর পাঁচটা বাড়িতে যে-রকম থাকে। দু’টো বাথরুম। একটা ওই বেডরুমটার সঙ্গে লাগোয়া। অন্যটা বাইরে, একটু বড়। কিন্তু সেখানেও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না। তার পরে বাথরুমের পাশে দেখা মিলল স্টোররুমটার। যেটা সম্ভবত রাধার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। স্টোররুমের দরজার গায়ে একটা তালা বুঝুলছে।

জয়ন্ত দেশমুখকে তল্লাশি করতে বেরিয়ে পড়ল দু’টো চাবি। একটা দেখে মনে হচ্ছে এই ফ্ল্যাটের। দ্বিতীয় চাবিটা নিয়ে স্টোররুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলেন পাঞ্চালীরা। বাইরের ঘরের আলো অল্প এসে পড়েছিল। সেই আলোয় সুইচ বোর্ডের হদিশ পেয়ে লাইটটা জ্বালিয়ে দিলেন চৌহান। তার পরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন।

স্টোররুমে টাঙানো দু’টো তারে পাতলা কাপড়ের মতো কী সব ঝুলছে। সাইজে খুব বেশি বড় নয়। দু’ইঞ্চি মতো হবে। অন্তত গোটা পনেরো এই রকম বস্তু ঝুলে আছে দু’দিকের তারে। অবাক গলায় চৌহান প্রশ্ন করলেন, “এ সব কী বুলিছে?”

পাঞ্চালী বুঝে গিয়েছিলেন ওগুলো কী। জবাবটা অবশ্য শ্রুতিই দিলেন। অস্ফুটে প্রথমে বলে উঠলেন, “ওহ মাই গড়!” তার পরে চৌহানের দিকে ফিরে বললেন, “চামড়ার টুকরো।”

“মানে?” ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন না পুলিশ অফিসার।

শ্রুতি পরিষ্কার করে দিলেন, “ওগুলো চামড়া। দেখে মনে হচ্ছে, মানুষের। পরীক্ষা করলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে এইটুকু বলা যায়, এক জনের নয়, বেশ কয়েক জনের শরীর থেকে ওই চামড়া কেটে নেওয়া হয়েছে।”

“ডক্টর ডেভিল!” প্রায় নিজের মনেই বলে উঠলেন পাঞ্চালী।

দু’জনেই ঘুরে তাকালেন তাঁর দিকে। তার পরে শ্রুতি বললেন, “হ্যাঁ, ডেভিল তো নিশ্চয়ই। শয়তান না-হলে এই সব কাজ করতে পারে!”

পাঞ্চালী জবাব দিলেন, “শুধু সে জন্য নয়। ডক্টর ডেভিলের নাম আমি আগে শুনেছি। মনে হচ্ছে, একই লোক।”

দু’জনেই অবাক হয়ে তাকালেন পাঞ্চালীর দিকে। তার পরে পুলিশ অফিসার বললেন, “আপনি একটু খোলসা করে বলবেন ব্যাপারটা?”

“নিশ্চয়ই।” পাঞ্চালী বলতে থাকলেন, “শ্রুতি ম্যাডামের নিশ্চয়ই মনে আছে, আমি স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের কথা বলেছিলাম। এই স্কিন ট্র্যাফিকিংয়ের ব্যাপারটা নিয়ে আমি যখন খোঁজখবর নেওয়া শুরু করি, তখন প্রথম ওই নামটা শুনি। খুব উপরতলার কেউ। এই কাজের সঙ্গে যারা জড়িয়ে, তারা সবাই এই নামটাকে খুব ভয় পায়। খুব কম লোকই এই ডক্টর ডেভিলকে দেখেছে।” একটু থেমে পাঞ্চালী যোগ করলেন, “আমার মনে হয়েছিল, এই ডক্টর ডেভিল সত্যিকারের এক জন ডক্টর। যে-মানুষের শরীর থেকে চামড়া কেটে নেওয়ার কাজটা করছে।

সামান্য নীরবতা। শ্রুতির মনে পড়ে যাচ্ছিল কথাগুলো। তিনি পাঞ্চালীকে বলেছিলেন, প্ল্যাস্টিক সার্জন ছাড়াও যে-কোনও ভাল চিকিৎসক শিখে নিলে কসমেটিক সার্জারিও করে দিতে পারবে। কিন্তু এ তো…। শ্রুতি এ বার পাঞ্চালীর দিকে ফিরে বললেন, “আপনার বোধ হয় জানা নেই জয়ন্ত কীসের চিকিৎসক?” পাঞ্চালী মাথা নাড়লেন। আস্তে আস্তে শ্রুতি বললেন, “জয়ন্ত এক জন নামকরা প্ল্যাস্টিক সার্জন।”

স্তম্ভিত হয়ে গেলেন পাঞ্চালী। তার পরে কোনও মতে বলতে পারলেন, “আমার সন্দেহটা তা হলে ঠিক। প্ল্যাস্টিক সার্জনই জড়িয়ে আছে এই গ্যাংটার সঙ্গে।”

এর পরেই চমকে উঠলেন পাঞ্চালী। দ্রুত বলে উঠলেন, “আর সেটা যদি হয়, তা হলে ওর কবলে আরও একটা মেয়ে সম্ভবত আছে। কলকাতা থেকে তুলে আনা হয়েছে কিছু দিন আগে।”

বলেই নিজের মোবাইলটা বার করলেন পাঞ্চালী। তার পরে গ্যালারিতে গিয়ে বার করে আনলেন অজন্তার ছবিটা। দু’পাশ থেকে ঝুঁকে পড়লেন চৌহান এবং শ্রুতি।

“এই মেয়েটাই মিসিং?” জানতে চাইলেন শ্রুতি। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন পাঞ্চালী।

ছবিটা ভাল করে দেখে নিয়ে চৌহান বলে উঠলেন, “এই কেসটা নিয়ে তো কলকাতায় বেশ হইচই হচ্ছে। আমাদের কাছেও খবরটা এসেছে। আপনার মনে হচ্ছে, এই মেয়েটাকে লুকিয়ে রেখেছে এই জয়ন্ত?”

পাঞ্চালী জবাব দিলেন, “খুব সম্ভবত তাই। আর সেটা হলে বুঝতে হবে, জয়ন্ত একা নয়। ও হয়তো কিছুটা বিকারগ্রস্ত। কিন্তু একটা গ্যাংয়ের হয়ে কাজ করছে। কোনও একটা স্কিন ট্র্যাফিকিং গ্যাং।”

আবার নীরবতা। এ বার সেটা ভাঙল শ্রুতির স্বগতোক্তিতে। “মানসিক বিকারগ্রস্ত না হলে এই কাজ কেউ করতে পারে!”

পাঞ্চালীর কী মনে হল। দ্রুত চলে এলেন ড্রয়িংরুমে। তখনও জয়ন্ত এবং তাঁর মাকে ওই ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। যদি কিছু প্রশ্ন থাকে। দ্রুত জয়ন্তর কাছে এসে মোবাইলটা তাঁর মুখের সামনে তুলে ধরলেন পাঞ্চালী। তার পরে চিৎকার করে বললেন, “এই মেয়েটাকে কোথায় রেখেছেন? কোথায় আটকে আছে অজন্তা?”

এক বার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকালেন জয়ন্ত দেশমুখ। সামান্য একটু ভাবান্তর দেখা গেল ডক্টরের মুখে। জয়ন্ত দেশমুখ অল্প হাসলেন!

.

পুলিশের গাড়ি যখন পাঞ্চালীকে বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে গেল, তখন প্রায় রাত বারোটা। বাড়ি থেকে বেরনোর সময় সুদূর কল্পনাতেও পাঞ্চালী ভাবতে পারেননি, জল এতদূর গড়াবে। বাড়ি ফিরে একটু ধাতস্থ হয়েই তিনি ফোনটা করলেন রুদ্রাণীকে।

দশ মিনিটের মধ্যে জয়ন্ত দেশমুখের কাহিনিটা বলে দিলেন তাঁর বন্ধুর বোনকে, “আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল, কোনও ভাল প্ল্যাস্টিক সার্জন এই গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে। তাই হল।”

সব শুনে উল্টো দিক থেকে রুদ্রাণী জিজ্ঞেস করল, “তোমার মনে হচ্ছে এই জয়ন্তই ডক্টর ডেভিল?”

“আমার সন্দেহ কিন্তু সে-রকমই। তবে একেবারে নিশ্চিত নই। কিন্তু এই ব্লু-টা ছেড়ে দেওয়া যায় না। অজন্তাকে খুঁজে বার করার এটাই শেষ রাস্তা হতে পারে।”

রুদ্রাণী বুঝল, পাঞ্চালীদি ঠিকই বলছে। এই ব্রেককে হেলাফেলা করা যায় না। “ঠিক আছে। আমি উপরমহলের সঙ্গে কথা বলছি। দু’দিনের মধ্যেই মুম্বই চলে আসছি। তার পরে দেখা যাক, কী হয়।”

পাঞ্চালী কিছু একটা ভাবছিলেন। রুদ্রাণীর কথা শেষ হওয়া মাত্রই বললেন, “দেরি করিস না একদম। এই জয়ন্ত যদি সত্যিই ডক্টর ডেভিল হয়, তা হলে কিন্তু অজন্তার হাতে একেবারেই সময় নেই। ওর গ্যাংয়ের লোকেরা হয় মেয়েটাকে মেরে দেবে বা দ্রুত বিদেশে পাচার করে দেবে। তুই তাড়াতাড়ি চলে আয়।”

ফোনটা নামিয়ে রেখে রুদ্রাণী বুঝলেন, পাঞ্চালীদি ঠিকই বলেছে। অজন্তার হাতে একদম সময় নেই। এই জয়ন্তের মুখটা দ্রুত খোলাতে হবে। যে- করেই হোক।

পরের দিন মুম্বইয়ের কাগজগুলো একটা খবরেই ভরে গেল। বেশ রাতের দিকে খবরটা পেয়েছিল পুলিশ রিপোর্টাররা। কিন্তু এতটাই চাঞ্চল্যকর ঘটনা যে, পাতা ছাড়ার সময়ও পিছিয়ে দেওয়া হয় খবরটাকে ধরানোর জন্য।

পুলিশের থেকেই কেউ এক জন ফাঁস করে দিয়েছিল ডক্টর ডেভিলের ব্যাপারটা। এ রকম একটা সাড়া জাগানো নামকে ছেড়ে দিতে চায়নি মিডিয়া। নামকরা ইংরেজি দৈনিকের পাতায় বড় করে শিরোনাম হল-

‘ডক্টর ডেভিল— ম্যান ফ্রম হেল!’

ডক্টর ডেভিল- নরক থেকে আসা লোক।

তবে তখনও রিপোর্টে ডক্টর ডেভিলের আসল পরিচয় কিছু দেওয়া হয়নি। পুলিশের তরফেও কিছু বলা হয়নি।

.

পরের দিন কিউবান সিগার মুখে কাগজের শিরোনামটার উপরে চোখ বোলাচ্ছিল বস। তার মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে। অল্প সময় ভেবে নিজের ব্যক্তিগত মোবাইলটা হাতে নিল লোকটা। তাকে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামতে হবে। দেখা যাক, ব্যাপারটা কত দূর কী গড়িয়েছে।

.

খবরটা ছড়িয়ে পড়লেও এই নোংরা ডর্মিটরিতে কাগজ আসে না। কাগজ পড়ার কোনও আগ্রহ কখনও ছিল না। এখন তো আরও নেই। বাড়ি  থেকে আসার পথে মোবাইলটাও সঙ্গে আনেনি সমীর। সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে চাইছিল বাড়ির লোক আর পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে। কলে ডক্টর ডেভিলের গ্রেফতার হওয়ার খবরটা জানতেও পারল না সমীর।

.

দু’দিন বাদে রুদ্রাণীকে নিয়ে কলকাতার প্লেনটা যখন মুম্বইয়ের মাটি ছুঁল, পাঞ্চালী নিজের অফিসে কাজে ডুবে।

দুই নারীর মধ্যে কয়েক শো কিলোমিটারের দূরত্ব থাকলেও, তাদের মাথায় একটাই চিন্তা খেলা করছিল।

অজন্তার হাতে আর সময় নেই। যে-করে হোক জয়ন্ত দেশমুখের মুখ খোলাতেই হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *