প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

১৬. পিট বুল

১৬. পিট বুল

মুম্বই-নেতানিয়া, ২০২৩

লোকটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বোলাচ্ছিল বেডরুমটায়। সে বড় খুঁতখুঁতে। সব কিছু নিঁখুত ভাবে না-হলে মনটা শান্তই হবে না। অবশ্য সে যে- পেশায় আছে, এই খুঁতখুঁতানিটা না থাকলে বেঁচে থাকাই কঠিন হত।

লোকটা আবার ভাল করে দেখে নিল দু’টো ঘর। সব কিছু ঠিক জায়গাতেই আছে। কোথাও ধস্তাধস্তির কোনও চিহ্ন নেই। শুধু ড্রয়িংরুমের স্টাডি টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারটা একটু সরে গিয়েছে। ওই কেউ বসা অবস্থা থেকে দুম করে উঠে দাঁড়ালে যে-ভাবে সরে যায়, সে-রকম আর কী।

বেডরুমে একটা জিনিসের স্থান পরিবর্তন হয়েছে। একটা বেশ সুন্দর বেতের মোড়া প্রথমে রাখা ছিল ঘরের কোণে। সেই মোড়াটা এখন গড়াগড়ি খাচ্ছে খাটের উপরে। আর মোড়াটার ঠিক উপরে দোল খাচ্ছে দু’টো পা!

ইজরায়েলের রাজধানী তেল আভিভের উত্তর দিকের নেতানিয়া শহরটা টুরিস্টদের কাছে বেশ প্রিয়। সংস্কৃতি, মিউজিয়াম, নানা ধরনের আর্ট গ্যালারির ছড়াছড়ি এই শহরে। মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণের স্টার্টিং পয়েন্ট বলে ধরা হয় এই নেতানিয়াকে।

এই শহরে আরও একটা জিনিস আছে। যার কথা টুরিস্ট গাইডরা বলে না। বা ভ্রমণার্থীদের ‘মাস্ট সি’ স্পটগুলোর মধ্যে সে জায়গা পড়ে না। এটা একটা বিশেষ বিল্ডিং। সংক্ষেপে যার নাম ‘আই এস এ।’ আর পুরো নাম- ইজরায়েলি সিকিয়োরিটি এজেন্সি।

সারা বিশ্বে মোসাদ নামটা যতটা না চৰ্চিত, প্রায় ততটাই আড়ালে থাকে এই আই এস এ। কিন্তু ইজরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থা মজবুত করে তোলার পিছনে এই অ্যাকাডেমির অবদান মোসাদের থেকে কম নয়।

এই অ্যাকাডেমিতেই প্রশিক্ষণ পায় ইজরায়েলের স্পেশাল ফোর্সের সৈন্যরা। আর তাদের সেই ট্রেনিং দেওয়ার জন্য অ্যাকাডেমির তালিকায় রয়েছে কিছু বেতনভুক্ শিক্ষক। যারা এক সময় ইজরায়েলি ডিফেন্সের স্পেশাল ফোর্স, ইজরায়েলি নেভির স্পেশাল ফোর্স এবং ইজরায়েলি পুলিশের স্পেশাল ফোর্সে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই স্পেশাল ফোর্সের অফিসারদের হাতে তৈরি হয় নবপ্রজন্মের ইজরায়েলি সৈন্যরা।

তবে এই অ্যাকাডেমির আর একটা বিশেষত্ব আছে। এই অ্যাকাডেমিতে প্রাইভেট স্টুডেন্টদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যে-জন্য কিছু বিশেষ বিশেষ কোর্সও আছে আই এস এ-তে। ট্যাকটিক্যাল শুটিং, প্রাইভেট মিলিটারি কনট্র্যাক্টর কোর্স।

আর রয়েছে ক্রাভ মাহগা স্পেশাল প্রোগ্রাম।

হিব্রিউ ভাষায় ক্রাভ মাহগার অর্থ হল কন্ট্যাক্ট কম্ব্যাট। অর্থাৎ, যেখানে হাতাহাতি লড়াই হবে। প্রতিপক্ষের হাতে অস্ত্র থাকলেও। শিক্ষার্থীদের এই ক্রাভ মাহগা কোর্সে শেখানো হয় লম্বা নল আর ছোট নলের অস্ত্র নিয়ে লড়াই, ছুরি নিয়ে লড়াই, প্রতিপক্ষকে নিরস্ত করার টেকনিক এবং যন্ত্রণা সহ্য করার পদ্ধতি।

দশ বছর আগে অ্যাডাম যখন ওই অ্যাকাডেমি থেকে ট্রেনিং নিয়ে বেরিয়েছিল, তখন সে ইজরায়েলি স্পেশাল ফোর্সের কোনও সদস্য নয়। সে নিজেকে নিলামে তুলে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে সব চেয়ে বেশি দর পাবে, সেখানেই নিজের কর্মদক্ষতা প্রমাণ করার জন্য তৈরি ছিল অ্যাডাম। সোজা কথায়, মার্সিনারি সোলজার। এর মধ্যে তার তূণে আরও অস্ত্র যোগ হয়ে যায়।

বছর পাঁচেক আগে এক প্রাক্তন মিলিটারি অফিসার বন্ধু মারফত অ্যাডামের সন্ধান পায় বস। দেশে-বিদেশে তার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোয় বিদেশি কর্মীর অভাব নেই। সেই রকমই একটা কোম্পানির কর্মী তালিকায় যোগ হয়ে গেল অ্যাডামের নাম। বাকি কর্মীদের সঙ্গে তার একটাই পার্থক্য ছিল। সে অফিস ঘরে নয়, সময় কাটাতে থাকল বসের সঙ্গে। পৃথিবীর যে-প্রান্তেই বস থাকুক না কেন, অ্যাডামকে তার সঙ্গে ছায়ার মতো দেখা যেতে লাগল। বেশির ভাগ সময় অবশ্য ভারতেই কাটাত অ্যাডাম। বসের বিলাসবহুল বাংলোয় তার জন্য একটা আলাদা ঘর বরাদ্দ ছিল। তার ইজরায়েলি পাসপোর্টে কোনও বদল হয়নি। সেই পাসপোর্টেই ভিসার মেয়াদটা নির্বিঘ্নে দিনের পর দিন বাড়তে থাকল। কে আর প্রশ্ন করবে! অ্যাডামের নিজেরও কোনও সমস্যা ছিল না। সে যা পারিশ্রমিক পাচ্ছিল, তাতে আর কোনও রাস্তা খোঁজার প্রয়োজন পড়ে না।

যত সময় যেতে লাগল, অ্যাডামকে ঘিরে তৈরি হতে থাকল নানা কাহিনি। বস যদি যম হয়, তা হলে অ্যাডাম হল সাক্ষাৎ যমদূত। বস অবশ্য অ্যাডামকে যমদূত নয়, পিট বুল হিসেবে ভাবতেই পছন্দ করে। সেই পিট বুল, যে- লড়াইয়ের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। বস যার দিকে আঙুল তুলে দেখাবে, তাকেই ছিন্নভিন্ন করতে ছুটে যাবে এই বিশ্বস্ত ফাইটার কুকুর।

সে দিন রাতে অ্যাডামকে ডেকে একটা বিশেষ নাম আর ঠিকানার দিকে আঙুলটা দেখিয়েছিল বস। তিন দিন বাদে সেই বাড়ির চার তলার ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে চার দিকটা খতিয়ে খতিয়ে দেখছিল অ্যাডাম।

এত দ্রুত কাজ সে করে না। টার্গেটকে আরও জরিপ করে নেয়। লোকেশন খতিয়ে দেখে। কিন্তু এ বারের কেসটা এমার্জেন্সি ছিল। বস ভয় পাচ্ছিল, এই তিন দিনটাও না বেশি হয়ে যায়। এই তিন দিন অবশ্য অন্য ভাবে নজর রাখা হয়েছিল ছেলেটার উপরে। যদি বোঝা যেত, সে কিছু ফাঁস করে দেওয়ার তাল করছে, তা হলে সঙ্গে সঙ্গেই মেরে দেওয়া হত। কোনও উপায় থাকত না। যা ঝামেলা হওয়ার হত।

কিন্তু এই তিন দিনে ছেলেটা মুখ খোলার কোনও চেষ্টা করেনি। তার মোবাইল ট্যাপ করা হয়ে গিয়েছিল। সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে কাজটা করতে সমস্যা হয়নি। বিল্ডিংয়ের বাইরেও নজরদারি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই তিন দিন ছেলেটা বাড়ির বাইরে যায়নি। কেউ আসেওনি দেখা করতে। শুধু যে-রান্না করে যায়, সে ছাড়া। হয়তো ভয় পেয়ে গিয়েছিল ছেলেটা। হয়তো কখনওই মুখ খোলার সাহস পেত না।

কিন্তু সেই ঝুঁকি নেওয়া যায় না। নামগুলো ফাঁস হয়ে গেলে বিশ্ব জুড়ে যা হইচই শুরু হবে, তার তুলনায় একটা প্রাণ কোনও ব্যাপারই নয়। তা ছাড়া দেশের ভাবমূর্তির কথাও তো ভাবতে হবে বসকে! পিট বুলকে তাই লেলিয়ে দেওয়াই ঠিক করেছিল বস।

অপারেশনে নামার আগে বসের টিমের আর এক জনের সাহায্য নিতে হয় অ্যাডামকে। যে-স্থানীয় লোক। কতগুলো তথ্য দরকার ছিল অ্যাডামের। ছেলেটার ফ্ল্যাটের ম্যাপ। কোন ঘরে ফ্যান আছে। দরজার লকটা কী রকম। বাড়তি চেন লাগানো আছে কি না দরজায়। দ্বিতীয় দিনেই রান্নার লোক মারফত পাওয়া খবর চলে আসে অ্যাডামের কাছে। দরজা থেকে ড্রয়িংরুম যাওয়ার একটা করিডর আছে। বেডরুমে ফ্যান আছে। অনেক হোটেলের ঘরের মতোই দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিলেই লক হয়ে যায়। আর ডোর চেন নেই।

অ্যাডাম এ বার ধীরে ধীরে এগিয়ে এল ঘরের মাঝখানে। সে নিখুঁত ব্যবস্থা পছন্দ করে। এখানে আসার আগে যা জানার, সব জেনে নিয়েছে। এই বিল্ডিংয়ের পার্কিং লটের সামনে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। যে-ক্যামেরাটা অ্যাপার্টমেন্টে আসার রাস্তাটা দেখায়। ছেলেটার ফ্ল্যাটে কোনও ক্যামেরা নেই। করিডরেও নেই। বাইরের সিসিটিভি ক্যামেরাটাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য অকেজো করে দিতে সমস্যা হয়নি। সন্ধ্যা সাতটা থেকে সেই ক্যামেরা আর কিছু দেখাচ্ছে না। বিল্ডিংয়ের বাসিন্দারা সিসিটিভি-র দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে ব্যাপারটা জানিয়েছে। তারা বলেছে, রাত হয়ে গিয়েছে, টেকনিশিয়ান নেই। তবে চেষ্টা করা হচ্ছে টেকনিশিয়ান জোগাড় করার।

অ্যাডাম জানে, সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হবে না। আজ রাতে কেউ সিসিটিভি ঠিক করতে আসবে না।

সিসিটিভি অ্যাডামের সমস্যা ছিল না কখনওই। তার সমস্যা অন্যত্র। ছেলেটার শরীরে কোনও আঘাত না-করে কাজটা শেষ করতে হবে তাকে। না- হলে সুইসাইড প্রমাণ করা কঠিন। ব্যাপারটা বলা যতটা সোজা, কাজে কিন্তু ততটা নয়। টেকনিক্যাল ডিটেল নিখুঁত হতে হবে। যাতে পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে ধরা না পড়ে, খুন না আত্মহত্যা।

ছেলেটার ফ্ল্যাটের নকশাটা গাঁথা হয়ে গিয়েছিল অ্যাডামের মাথায়। মূল দরজার পরেই একটা ছোট করিডর। সেই করিডর দিয়ে ১২ ফিট মতো এগোলে ড্রয়িংরুম। আর লাগোয়া একটা বেডরুম।

দরজায় যে-লকটা লাগানো ছিল, সেটা একটা মাস্টার কি-র সাহায্যে বাইরে থেকে খোলা অ্যাডামের কাছে কোনও সমস্যা ছিল না। একটা হাল্কা ক্লিক শব্দ করে খুলে গেল দরজাটা। ধীরে ধীরে করিডরে পা রাখল ইজরায়েলি মার্সিনারি।

ছেলেটা বেডরুমের বিছানায় বসে তখন ফোনের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কাকে কিছু একটা বলছিল। ফাঁকা ঘরেও সে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। অ্যাডাম অপেক্ষা করতে লাগল ফোন কলটা শেষ হওয়ার। মিনিট দুয়েক পরে ফোনটা নামিয়ে রেখে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল তরুণ অভিনেতা।

তার পরে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। এই ধরনের দৃশ্য সে সিনেমায় অনেক দেখেছে। এ বার বাস্তবে দেখল। একটা সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল তার দিকে তাক করে আছে। পিস্তলটার চেয়েও তার বেশি ভয় করতে লাগল অস্ত্রটার মানিককে দেখে। নির্মম দু’টো চোখ যেন তাকে বিঁধে ফেলছে।

ছেলেটা বুঝতে পারছিল না, কী করবে। তার হাঁটু দু’টো কাঁপছে।

সামনের লোকটা এ বার ইশারায় ছেলেটাকে বোঝাল, চুপ করে খাটে বসতে। ছেলেটা পুতুলের মতো বসে পড়ল।

লোকটা খুব ঠান্ডা গলায় ইংরেজিতে বলল, “কখন কোথায় কী বলা দরকার, সেটা জানা উচিত সবার।” ছেলেটা এক মুহূর্তে বুঝো গেল, কেন লোকটা এসেছে। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমি কাউকে কিছু বলব না। তখন নেশার ঘোরে অনেক কিছু বলে ফেলেছি। প্লিজ, আমাকে এ বারের মতো ছেড়ে দিন।”

লোকটা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে। তার পরে বলল, “শাস্তি তো তোমাকে একটা পেতেই হবে। যাতে বুঝবে, মুখ বন্ধ রাখা কতটা জরুরি। আজ যে-শিক্ষাটা তোমাকে দেব, তা আজীবন মনে রাখবে।”

লোকটার কথা শুনতে শুনতে ছেলেটা একটু হলেও যেন আশার আলো দেখতে পেল। আজীবন মনে রাখবে! তার মানে প্রাণে মারবে না হয়তো।

বেডরুমটা ভাল করে দেখছিল অ্যাডাম। এই ঘরে ঢোকার আগে তার মাথায় বেশ কয়েকটা প্ল্যান তৈরি করা ছিল। ঘরের সিলিংটা বেশ নিচু। সাধারণত ফ্ল্যাট বাড়িতে যেটা দেখা যায়। খবরটা ঠিকই আছে। সিলিংয়ে ঝুলছে ক্যানটা। খাটের ঠিক উপরে। অ্যাডাম এ বার ঘরের বাকি অংশটা জরিপ করে নিল। কোণের দিকে একটা মোড়া রাখা। অ্যাডামের মস্তিষ্ক দ্রুত অঙ্কটা করে ফেলল।

পিস্তলের নলটা ছেলেটার মাথা বরাবর উঁচিয়ে শান্ত গলায় পরের নির্দেশটা দিল।

“ওই মোড়াটা তুলে খাটে নিয়ে এসো।”

ছেলেটা হয়তো বুঝতে পারছিল, ব্যাপারটা কোন দিকে গড়াচ্ছে। সে হাতজোড় করে বলে উঠল, “আমাকে ছেড়ে দিন, প্লিজ। এই ভুল আর হবে না।”

 লোকটা এ বার এক পা এগিয়ে এসে বলল, “আমি একটা গুলি খরচ করে তোমাকে উপরে পাঠিয়ে দিতে পারি। কোনও শব্দ হবে না, কেউ জানবে না। গুলিটা করে আমি আবার বেরিয়ে যাব। ব্যস, খেল খতম। আমি তোমাকে একটা সুযোগ দিচ্ছি। মৃত্যুভয় কাকে বলে, সেটা বুঝলে এই ভুলটা আর করবে না। দ্বিতীয় বার যদি পাল্টা কোনও কথা বলো, তা হলে আর সুযোগ দেব না।”

ছেলেটা মোড়াটা এনে বিছানার উপরে রাখল।

“ঠিক ফ্যানটার নীচে রাখো।”

ছেলেটা নির্দেশ পালন করল। পকেট থেকে একটা সরু নাইলনের দড়ি বার করে ছেলেটার দিকে ছুড়ে দিল অ্যাডাম। তার পরে বলল, “মোড়ায় উঠে দড়িটা ফ্যানের সঙ্গে ভাল করে বাঁধো।” কাঁপতে কাঁপতে নির্দেশ পালন করল ছেলেটা।

অ্যাডাম জানে, এর পরের কাজগুলো একেবারে নিখুঁত ভাবে করতে হবে। সিনেমায় যত সহজে একটা খুনকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানো হয়, বাস্তবে সেটা সাজানো খুবই কঠিন।

বেশ কিছু জিনিস ঠিকঠাক হতে হবে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে অনেক কিছু ধরা পড়ে যায়।

দড়ির গিঁটটা কী রকম। দড়ির চাপটা ঘাড়ের কোন জায়গায় পড়েছে। লিগাচার মার্ক কতটা গভীর। গলার সামনের দিকে বেশি গভীর দাগ পড়েছে, না পিছনের দিকে। ঘাড়টা কোন দিকে হেলে আছে। ঠোঁটের থুতু কোন দিক দিয়ে বেরিয়েছে। শরীরের অন্য জলীয় পদার্থের (মূত্র, বীর্য) গতিমুখ কোন দিকে। জিভ, চোখ কতটা ঠিকরে বেরিয়ে আছে, রং কী রকম। ঘাড়ের কোন হাড়টা ভেঙেছে। এই রকম অনেক কিছু।

এই অপারেশনের জন্য নাইলনের দড়িই ব্যবহার করবে বলে ঠিক করে রেখেছিল অ্যাডাম। সমীক্ষা বলছে, ভারতে যত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ লোকই আত্মহত্যা করে নাইলন দড়ির সাহায্যে। আরও একটা কেস সেই পরিসংখ্যানে এ বার যোগ হতে চলেছে।

ফ্যানের সঙ্গে দড়িটা বাঁধা হয়ে গিয়েছে। অ্যাডাম পরবর্তী নির্দেশ দিল, “দড়িটা ভাল করে টানো। যদি খুলে আসে, গুলিটা চালাতে আমি বাধ্য হব।” ছেলেটা যন্ত্রের মতো দড়িটা ভাল করে টানল। অ্যাডাম বুঝে গেল, সত্যিই গিঁটটা শক্তপোক্ত হয়েছে।

এ বার উল্টো প্রান্তে গিঁট বাঁধার পালা। ছেলেটাকে একটা কোণের দিকে সরে যেতে ইশারা করে অ্যাডাম উঠে এল খাটের উপরে। তার পরে বলল, “দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়াও। একটু নড়াচড়া করলে আর দ্বিতীয় সুযোগ দেব না।”

ছেলেটার বোধ-বুদ্ধি যেন ক্রমে লোপ পাচ্ছে। যন্ত্রের মতো সে দেওয়ালের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। অ্যাডাম বিছানায় বসে পড়ল।

তার পরে পিস্তলটা পাশে রেখে খুব দ্রুততার সঙ্গে নাইলন দড়ির উল্টো প্রান্তে একটা ফাঁস তৈরি করে ফেলল। এ ক্ষেত্রেও একটা পরিসংখ্যান আছে। সেটা বলছে, আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ‘ফিক্সড নট’ গিট ব্যবহার করা হয় ৬৩ শতাংশ ক্ষেত্রে। এ ছাড়া আছে স্লিপ নট। পুলিশ রিপোর্ট বলে, আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ২১.৩ শতাংশ মানুষ এই স্লিপ নট ব্যবহার করে। এই গিঁটের একটা প্রান্ত ধরে টানলে ফাঁসটা দ্রুত খুলে যায়। এই গিঁটটা বাঁধা সহজ। কিন্তু অ্যাডাম সেই ঝুঁকিটা নিতে পারল না। ছেলেটার হাত বাঁধা যাবে না। শেষ মুহূর্তে ছটফট করতে করতে যদি স্লিপ নটের একটা প্রান্ত ধরে টান মারে, তা হলে সেটা খুলে যেতে পারে। তাই বিশ্বস্ত ফিক্সড নট বা হ্যাংম্যান’স নুজই ভাল। এই গিঁট হাজার টানাটানিতেও খুলবে না।

ছোট্ট লাফে খাট থেকে নীচে নেমে এল অ্যাডাম। তার পরে ছেলেটার উদ্দেশে বলল, “এ বার ঘুরে দাঁড়িয়ে মোড়াটায় উঠে পড়ো।” ছেলেটার চোখ থেকে তখন দরদর করে জল ঝরছে। যন্ত্রের মতো কয়েক পা এসে সে মোড়াটার উপরে উঠে দাঁড়াল।

অ্যাডাম তার বিশেষজ্ঞের চোখ দিয়ে খাট থেকে ছেলেটার উচ্চতাটা এক বার মেপে নিল। সব ঠিক আছে।

আবার খাটে উঠে এল অ্যাডাম। দাঁড়াল ছেলেটার মুখোমুখি। পিস্তলের নলটা ছেলেটার কপাল বরাবর তাক করা। ছেলেটা এক বার ভাবছিল, ঝাঁপিয়ে পড়বে কি না। কিন্তু সামনে দাঁড়ানো লোকটার চেহারা আর হাবভাব দেখে বুঝে গেল, সে ওই চেষ্টা করলেই পিস্তলের ট্রিগারে চাপ পড়বে।

অ্যাডাম একটু ঝুঁকে এসে ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “এ বার দড়িটা গলার পরে নাও। তা হলে বুঝবে মৃত্যুভয় কাকে বলে। এই ভয়টা তোমার পাওয়া দরকার। তা হলে আর কখনও ওই ভুল করবে না।”

ছেলেটা দড়িটা গলায় পরে নিল। তার মনে তখনও একটা ক্ষীণ আশা ভেসে বেড়াচ্ছে। যদি লোকটা সত্যি বলে, যদি তাকে এ বার ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। কাঁপতে কাঁপতেই নাইলন দড়ির ফাঁসটা গলায় পরে নিল ছেলেটা।

অ্যাডাম এক বার তাকিয়ে নিল দড়িটার দিকে। ঠিকই আছে। প্রায় টানটান হয়ে আছে। তার এক্সপার্ট নজর ঠিক হিসেবটাই করেছিল।

অ্যাডাম এ বার পিস্তলের নলটা ছেলেটার কপালে ঠেকিয়ে বলল, “মৃত্যুভর কাকে বলে এ বার বুঝতে পারছ তো?”

ছেলেটা ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোনও মতে মাথা নাড়ল। একটু সময় চুপ করে থেকে মুখ খুলল অ্যাডাম, “এ বারের মতো তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি। আর কোনও দিন যেন এই রকম ভুল না হয়।”

ছেলেটার শরীর ছেড়ে দিল। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার অবিশ্বাস্য এক অনুভূতি গ্রাস করে নিল তাকে। শরীরের প্রতিটা স্নায়ু শিথিল হয়ে গেল। লম্বা একটা শ্বাস নিল ছেলেটা।

আর তখনই মোড়াটায় হাল্কা একটা লাথি মারল অ্যাডাম।

ছেলেটা ঝুলে পড়ল শূন্যে। এক মুহূর্ত সে বুঝতে পারেনি, কী হল। তার পরে দু’টো পা ছুড়ে খাটটা ছোঁয়ার চেষ্টা করল। হাত দু’টো দিয়ে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে। অ্যাডাম জানত, মৃত্যুপথযাত্রী একটা লোক সামনে কোনও মানুষকে দেখলে তাকে আঁকড়ে ধরারই চেষ্টা করবে। জানত বলেই অ্যাডাম খাটে দাঁড়িয়েছিল। শুধু ছেলেটার নাগালের সামান্য বাইরে।

ছেলেটা দু’হাত বাড়িয়ে অ্যাডামকে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারল না। তার পরে গলায় লাগানো দড়িটা ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু তত ক্ষণে বেশ কয়েক সেকেন্ড দেরি হয়ে গিয়েছে। ছেলেটার শরীর থেকে শক্তি চলে যাচ্ছিল। মৃত্যুর আতঙ্ক তার চেতনাকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিচ্ছিল।

সে তাও এক বার মরিয়া চেষ্টা করল দড়ির গিঁটটা খুলতে। কিন্তু তার হাত অবশ হয়ে আসছে, শরীরের উপরে ক্রমে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। ঘাড়ের কাছে প্রচণ্ড যন্ত্রণা। শ্বাসও নিতে পারছে না। ছেলেটার ঘোলাটে হয়ে আসা চোখ দু’টোর দিকে তাকিয়ে অ্যাডাম বুঝে গেল, তার কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

অ্যাডাম ধীরে সুস্থে নেমে এল খাট থেকে। ধীরে ধীরে নিথর হয়ে গেল শূন্যে ঝুলতে থাকা শরীরটা। দড়ির ফাঁসটা একটু ডান দিকে সরে গিয়েছে। ঘাড়টা লটকে আছে বাঁ দিকে। একেবারে নিখুঁত সুইসাইড কেস

পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে দেখা যাবে, দড়ির ফাঁসটা সব চেয়ে বেশি চেপে বসে ছিল গলার কাছটায়। থুতনির নীচে। যেটা এই ভাবে ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। পিছন থেকে কেউ দড়ির প্যাঁচ গলায় লাগিয়ে টান দিলে চাপটা পড়বে ঘাড়ের কাছেও। আর সেই মার্কটা হবে সম্পূর্ণ অন্য রকম

অ্যাডাম এগিয়ে এসে এক বার ছেলেটার মুখটা ভাল করে দেখে নিল। জিভটা দাঁতের ফাঁকা দিয়ে কিছুটা বেরিয়ে আছে। ঠোঁটের বাঁ দিক দিয়ে লালা বেরিয়ে এসেছে। পোস্ট মর্টেমের রিপোর্টে পাওয়া যাবে একটা নিগাচার মার্ক। যা থুতনির তিন ইঞ্চি মতো নীচে দেখা যাচ্ছে।

পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট আরও বলবে, ঘাড়ের পিছনে একটা অবলিক লিগাচার মার্কও দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, দড়ির চিহ্নটা থুতনির নিচ থেকে ঘাড়ের উপরের অংশে উঠে গিয়েছে। ফাঁসিতে ঝুললে যে-ভাবে দাগটা পড়ে, ঠিক সে ভাবে। শরীরের জলীয় পদার্থের গতিও নিম্নমুখী। একটা শরীর শূন্যে ঝুলে থাকলে যা হয়। গলার কাছে ‘হাইঅয়েড বোন’ সম্ভবত ভেঙে গিয়েছে।

অ্যাডামের চোখটা এ বার নীচের দিকে নেমে এল। প্যান্টটা ভিজে গিয়েছে ছেলেটার। এই রকম দৃশ্য অনেক দেখেছে অ্যাডাম। সে জানে, মূত্র এবং বীর্য বেরিয়ে এসেছে শরীর থেকে।

ধীরে সুস্থে এ বার ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াল অ্যাডাম। ছেলেটার ল্যাপটপ অন হয়ে আছে। লগইন করা অবস্থায়। ভালই হল। বাড়তি একটা পরত যোগ করা যাবে পুরো ঘটনায়। গ্লাভস পরা হাতে গুগল সার্চে কয়েকটা শব্দ টাইপ করল অ্যাডান।

টাইপস অব পেনলেস ডেথ।

তার পরে আবার দু’টো ঘরে চোখ বুলিয়ে নিল। তার পায়ে রবারের জুতো। হাতে গ্লাভস। কোথাও কোনও ছাপ পড়েনি। মোড়াটা ঠিক জায়গায় পড়ে আছে। নিষ্প্রাণ শরীরটা ঝুলছে। একেবারে নিখুঁত সুইসাইড।

অ্যাডাম ধীরে সুস্থে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার পরে কান পাতল। বাইরে কারও শব্দ শোনা যাচ্ছে না। সামান্যতম শব্দ হলেও তার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কান সেটা ঠিক শুনে নিত। ধীরে সুস্থে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অ্যাডাম। দরজাটা টেনে দিয়ে।

ক্লিক করে ভিতর থেকে লক হয়ে গেল দরজা।

আর ঘরের ভিতরে ঝুলতে থাকল এক তরুণ অভিনেতার নিষ্প্রাণ দেহ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *