প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পৰ্ব
তৃতীয় পৰ্ব
চতুর্থ পৰ্ব
1 of 2

২. বাঁচাতেই হবে

২. বাঁচাতেই হবে

লস অ্যাঞ্জেলেস-প্যারিস

প্যারিস দুর্ঘটনার দু’ঘণ্টা পরে।

প্যারিসে সকাল সাড়ে আটটা। লস অ্যাঞ্জেলেসে রাত সাড়ে এগারোটা। ফোনটা প্রথমে যায় মিসেস গ্রোপিয়াসের মোবাইলে। তিনি তখন বেডরুমের বিছানায় গা এলিয়ে একটা ফ্যাশন ম্যাগাজিনে চোখ বোলাচ্ছিলেন। গ্রোপিয়াস তাঁর স্টাডিরুমে।

মোবাইলটা নামিয়ে রাখার পরে যে-কেউ মিসেস গ্রোপিয়াসকে দেখলে ভয় পেয়ে যেত। তাঁর মুখ সাদা হয়ে গিয়েছে, হাত থরথর করে কাঁপছে। চোখে অন্ধকার দেখছেন। কোনও মতে কাঁপতে কাঁপতে গ্রোপিয়াসের স্টাডিরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

দরজার সামনে থেকে গোঙানির আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠলেন গ্রোপিয়াস। স্ত্রীর ওই অবস্থা দেখে তিনি প্রথমে হতভম্ব হয়ে যান। তার পরে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে স্ত্রীর দু’কাঁধ চেপে ধরে প্রায় চিৎকার করে ওঠেন, “কী হয়েছে তোমার? ও-রকম করছ কেন?”

প্রায় ফিট হয়ে যাওয়া স্ত্রীর মুখ থেকে কথাটা শুনে প্রথমে যেন বুঝতেই পারলেন না গ্রোপিয়াস।

“ক্যাটের কী হয়েছে? কী আবোল-তাবোল বকছ? কে বলল তোমাকে?”

তীব্র হাহাকারের মধ্যে কোনও মতে কথাটা বলতে পারলেন মিসেস গ্রোপিয়াস। পারিস থেকে ফোন এসেছিল। যে-অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকত ক্যাটেরা, সেই বিল্ডিংয়ে বিস্ফোরণ হয়েছে। ক্যাট গুরুতর জখম।

গ্রোপিয়াস প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তাঁর কথা। কী ভুল বকছে তাঁর স্ত্রী! সে ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস। তাঁর মেয়ের কী করে এই রকম দুর্ঘটনা ঘটতে পারে! ক্যাট ওই অ্যাপার্টমেন্টে কেন ঘর ভাড়া নিয়েছিল!

মিনিট দুয়েকের মধ্যেই অবশ্য নিজেকে সামলে নিলেন গ্রোপিয়াস। তাঁর স্টিলের নার্ভ ওভারটাইম কাজ করতে শুরু করল। পর পর কয়েকটা ফোন করতে লাগলেন তিনি। আধ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর বিশাল ভিলাটা প্রায় ওয়ারঅফিসে বদলে গেল। তাঁর পার্সোন্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে শুরু করে ডক্টরদের টিম, সবাই হাজির হয়ে গেল ওই বাড়িতে।

তত ক্ষণে পুরো খবরটা পেয়ে গিয়েছেন গ্রোপিয়াস। ক্যাট ও তার তিন বহু প্যারিসে ওই অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকছিল। একটু অন্য রকম অভিজ্ঞতা লাভের জন্য। একটু বোহেমিয়ান হবে, এই আর কী! সেই অ্যাপার্টমেন্টেই বিস্ফোরণ হয়। জানা গিয়েছে, ক্যাট গুরুতর ভাবে জখম। তার এক বন্ধু মারা গিয়েছে, বাকি দুজনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। যে-নিখোঁজ তালিকায় আরও বেশ কয়েক জন রয়েছে।

ক্যাট এবং বাকিদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্যারিসের সব চেয়ে বড় হসপিটাল – আসিস্তাস পিবলিক ওপিতো দে পারি-তে। সংক্ষেপে এপি-এইচপি।

পি এ-র দিকে ফিরে ঠান্ডা গলায় গ্রোপিয়াস জিজ্ঞেস করলেন, “এ বার আমরা কী করব?”

“স্যার, চার্টার্ড ফ্লাইট তৈরি আছে। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমরা প্যারিস উড়ে যেতে পারব।” ঘণ্টা দশেকের ফ্লাইট জার্নি। মানে তাঁরা যখন প্যারিসে নামবেন, তখন অনেক রাত হয়ে যাবে। মনে মনে হিসেব করে নিলেন গ্রোপিয়াস। তার পরে তাঁর টিমের প্রধান চিকিৎসকের দিকে ফিরে বললেন, “এর মধ্যে আপনি খোঁজ নিয়ে নিন, ক্যাটের চোটটা কী ধরনের। যাতে আমরা যে-কোনও অবস্থার জন্য তৈরি থাকতে পারি।”

ডক্টর ম্যাথুস এগিয়ে এলেন, “আপনি ভাববেন না স্যার। আমার সঙ্গে ইতিমধ্যেই ওখানকার হেডের কথা হয়েছে।”

“কতটা গুরুতর ক্যাটের চোট?”

ডক্টর ম্যাথুস ঠোঁটটা এক বার চেটে নিলেন। তার পরে বললেন, “আপাতত যা শুনলাম, বিস্ফোরণে সরাসরি জখম হয়নি ক্যাট। বাড়ির একটা অংশ ভেঙে পড়েছিল। সেখানে আগুন লেগে যায়। সেই আগুনে জখম হয়েছে ক্যাট।” একটু চুপ করে থেকে বসের মুখের ভাবটা দেখে দ্রুত যোগ করলেন, “চিকিৎসা পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে। আমরা ক্যাটের মেডিক্যাল ডিটেলস পাঠিয়ে দিয়েছি।”

পি এ-র দিকে ফিরে শেষ নির্দেশটা দিলেন গ্রোপিয়াস, “আমরা এখনই এয়ারপোর্টের দিকে বেরিয়ে পড়ব। তুমি প্যারিসে কথা বলে রাখো। ওখানে নেমেই আমরা সোজা হসপিটালে যাব। তত ক্ষণে যেন ক্যাটের যাবতীয় রিপোর্ট ওরা রেডি করে রাখে। পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেব, ক্যাটকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স করে কোথাও সরিয়ে নেওয়া যায় কি না।”

পি এ মাথা নাড়ল। সে ইতিমধ্যেই কথা বলে নিয়েছে একটি এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স কোম্পানির সঙ্গে। তারা তৈরি আছে। অল্প সময়ের নোটিসেও তারা ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিট-সহ জেট তৈরি রাখবে শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্টে। পেশেন্টকে হেলিকপ্টারে করে হসপিটাল থেকে সোজা উড়িয়ে আনা হবেটারমাকে।

আরও একটা কথা কোম্পানির লোকেদের বলে রেখেছিল পি এ। যেন সাড়ে ছ’হাজার মাইলের বেশি ওড়ার প্রস্তুতি থাকে। গ্রোপিয়াসের সহকারী ধরেই নিয়েছিল, প্রয়োজন হলে প্যারিস থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে উড়িয়ে নিয়ে আসা হতে পারে ক্যাটকে। তা ছাড়া আর কোথায় বা নিয়ে যাওয়া হবে?

গ্রোপিয়াসের চার্টার্ড প্লেন যখন লস অ্যাঞ্জেলেসের মাটি থেকে আকাশে উঠল, মার্কিন সময় রাত দেড়টা। প্যারিসে সকাল সাড়ে দশটা। এপি-এইচপি-তে তখন একের পর এক উদ্ধার করা আহতদের নিয়ে আসা হচ্ছে। উদ্বিগ্ন মুখে ছোটাছুটি করছেন চিকিৎসকরা।

সিভিয়ার বার্ন কেয়ার ইউনিটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দু’জন চিকিৎসক। এক জন অন্য জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝছ?”

দ্বিতীয় জন গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “গুরুতর থার্ড ডিগ্রি বার্ন ইনজুরি। অবস্থা একদম ভাল নয়।”

অন্য চিকিৎসক মাথা নাড়িয়ে বললেন, “সেই। অর্থ থাকলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়?”

গ্রোপিয়াসের গাল্ফস্ট্রিম এক্সিকিউটিভ জেট তখন মার্কিন আকাশ সীমার ওপর দিয়ে উড়ে আসছে ইউরোপের দিকে।

.

প্যারিস দুর্ঘটনার ১৬ ঘণ্টা পরে।

একটা ঘরে পাঁচ জন লোকের সঙ্গে আলাদা করে বসে ছিলেন গ্রোপিয়াস। এপি-এইচপি হাসপাতালে পৌঁছেছেন আধ ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে। ছ’ জনের মধ্যে দু’জন প্যারিসের চিকিৎসক, তিন জন তাঁর টিমের।

গ্রোপিয়াস সরাসরি বলে দিলেন কথাটা, “ক্যাটের কী অবস্থা, আমাকে জানান। কিছু গোপন করবেন না। তার পরে দেখা যাক, কী করা যায়।”

পক্ককেশ ফরাসি ভদ্রলোক কথা শুরু করলেন, “ক্যাটের থার্ড ডিগ্রি বার্ন ইনজুরি হয়েছে। মুখে এবং শরীরের অনেকটা জায়গা পুড়ে গিয়েছে।”

থার্ড ডিগ্রি বার্ন ইনজুরি। এই ধরনের কেসে আগুনে চামড়ার এপিডারমিস (উপরের আস্তরণ), ডারমিস (মাঝের আস্তরণ) এবং চামড়ার নীচে থাকা ফ্যাটের আস্তরণ পুড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে নার্ভেরও ক্ষতি হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাথমিক ভাবে যন্ত্রণা টের পান না সে ভাবে।

ডাক্তার বলে চললেন, “এর ফলে শরীরের অনেক জায়গায় ওর চামড়া ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের এখন প্রথম লক্ষ্য হবে নিশ্চিত করা যেন কোনও ভাবেই ক্যাটরিনার শরীরে সেপসিস না হয়ে যায়। তার পরে বাকি সব নিয়ে ভাবা যাবে।”

গ্রোপিয়াস এগিয়ে এসে ডাক্তারের দু’টো কাঁধ চেপে ধরলেন। ষাটোর্ধ্ব গ্রোপিয়াসের হাতের চাপে ডাক্তারের মনে হল, কাঁধের হাড় না ভেঙে যায়। চিবিয়ে চিবিয়ে গ্রোপিয়াস বললেন, “আমাকে ঠিক করে বলুন, ক্যাটের অবস্থা কী রকম? ওর কি মৃত্যুর আশঙ্কা আছে?”

ডাক্তার বলে উঠলেন, “দেখুন, মিস্টার গ্রোপিয়াস। আমরা সব রকম ভাবে চেষ্টা করছি ক্যাটকে সুস্থ করে তোলার। তবে ওর জখমটা বেশ গুরুতর। আমাদের একটু সময় দিন, প্লিজ।” ডাক্তারকে ছেড়ে সরে এলেন গ্রোপিয়াস। তাঁর মুখটা অন্ধকার হয়ে আছে। শোকে-রাগে-যন্ত্রণায় ক্রমশ ভয়ঙ্কর চেহারা নিচ্ছে সেই মুখ।

গ্রোপিয়াস না জানলেও চিকিৎসকরা জানতেন, এই ধরনের আগুনে পোড়ার ঘটনায় মৃত্যু কীভাবে হয়! সবথেকে বেশি মৃত্যু হয় সেপসিসে। সংক্রমণ শুরু হলে ওষুধও কাজ করতে চায় না। বিকল হতে থাকে শরীরের বিভিন্ন অর্গ্যান। দ্বিতীয় কারণ, শ্বাসযন্ত্রের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাকি দু’টো কারণ মস্তিষ্কে আঘাত এবং প্রচণ্ড শক।

ডাক্তারদের প্রধান চিন্তা ছিল এই সেপসিস আটকানো। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরেই ক্যাটরিনা হাইপোভোলেমিক শকে চলে গিয়েছে। মারাত্মক রকমের রক্তক্ষরণ বা শরীর থেকে জলীয় পদার্থ বেরিয়ে গেলে হৃত্যন্ত্র শরীরে যথেষ্ট রক্ত সঞ্চালন করতে পারে না। পেশেন্ট তখন হাইপোভোলেমিক শকে চলে যায়। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অর্গ্যান কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ডাক্তারদের তখন প্রধান কাজ ছিল, ক্যাটকে সেই শক থেকে বার করে আনা।

পরের দু’টো দিন গ্রোপিয়াসের কাটল এক ভয়ঙ্কর আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। যে-আতঙ্কের স্পর্শ এর আগে তিনি কোনও দিনই পাননি। এমনকি, রাইফেলের নলের সামনে দাঁড়িয়ে, মৃত্যুকে সামনে থেকে দেখেও গ্রোপিয়াসের এই শীতল অনুভূতি হয়নি। এখন যেমন হচ্ছে। নিজের মেয়েকে হারানোর ভয়ঙ্কর এক আশঙ্কা গ্রোপিয়াসকে ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে।

ভয়ঙ্কর দু’টো দিন

তার পরে নিজেকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনতে লাগলেন গ্রোপিয়াস। ডাক্তারদের কাছ থেকে তিনি যা শুনেছেন, তাতে একটু হলেও আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। ক্যাট লড়াই করছে। গ্রোপিয়াস নিজেকে বোঝালেন, এই লড়াইয়ে ক্যাটের পাশে থাকতেই হবে। ক্যাটকে আবার আগের মতো অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতেই হবে। গ্রোপিয়াসের চোয়াল কঠিন হয়ে গেল।

তাঁর মাথায় ডাক্তারের আর একটা কথা ঘুরছিল— ক্যাটের চামড়ার ক্ষতি হয়ে গিয়েছে অনেক জায়গায়।

তৃতীয় দিন আবার প্যারিস হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে দেখা করলেন গ্রোপিয়াস। এ বার ডাক্তার নিজেই প্রসঙ্গটা তুললেন, “ক্যাটের শরীরের কিছু অংশে স্কিন ট্র্যান্সপ্লান্ট করার কথা ভাবতে হবে। আমরা দেখেছি, ১০ শতাংশ মতো জায়গায় সেকেন্ড ডিগ্রি বার্ন আছে। ওখানে স্কিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করার কথা ভাবছি।”

গ্রোপিয়াস ঠান্ডা স্বরে প্রশ্ন করলেন, “তাতে কি শরীরের সব ক্ষত ঢাকা যাবে?”

অভিজ্ঞ ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, গ্রোপিয়াস কীসের দিকে ইঙ্গিত করছেন। কিন্তু কিছু করার নেই। তাঁকে সত্যি কথাটা বলতেই হবে। তাতে যা হওয়ার হোক।

“দেখুন, সব জায়গায় তো স্কিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট করা সম্ভব নয়। এই সব ক্ষেত্রে সাধারণত বাবা-মা, নিকট আত্মীয়রা স্কিন ডোনেট করে থাকে। তবে অর্গ্যান রিজেকশনের একটা আশঙ্কা থেকেই যায়।” একটু চুপ করে থেকে ডাক্তার বললেন, “আপনারা কেউ স্কিন ডোনেট করতে রাজি থাকলে আমরা এগোতে পারব। ঊরুর ভিতরের দিকের অংশ থেকে অল্প ঘনত্বের চামড়া তুলে নেওয়া হবে। যাকে বলে স্প্লিট স্কিন গ্ৰাফ্টিং।”

গ্রোপিয়াস এত ক্ষণ বসে ছিলেন। তার পরে উঠে বসলেন। “ক্ষত কেন থেকে যাবে? প্ল্যাস্টিক সার্জারি আছে কী করতে?”

ডাক্তার বোঝানোর একটা চেষ্টা করলেন, “এ ক্ষেত্রে সমস্যাটা হল, যে- হেতু

শরীরের বেশির ভাগ অংশে থার্ড ডিগ্রি বার্ন ইনজুরি আছে, তাই ফুল স্কিন গ্রাফ্টিং লাগবে ক্ষতগুলো ঢাকতে। তাও পুরো ক্ষত ঢাকা সম্ভব হবে না। কত আর চামড়া পাওয়া যাবে?”

গ্রোপিয়াস ধীরে ধীরে ডাক্তারের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার পরে বললেন, “চামড়ার ব্যাপারটা আপনি আমার উপরে ছেড়ে দিন। অন্য কী সমস্যা হতে পারে?”

ফরাসি ডাক্তার একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন গ্রোপিয়াসের দিকে। তার পরে কী বুঝে বললেন, “অন্য কারও চামড়া প্রতিস্থাপন করাটা কিন্তু সোজা নয়। চামড়া শরীরের সব চেয়ে বড় অর্গ্যান। আর অর্গ্যান প্রতিস্থাপন হলে সেটা কিন্তু শরীর গ্রহণ নাও করতে পারে। এইচ এল এ ম্যাচিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ সব ক্ষেত্রে।”

গ্রোপিয়াস অতসত বুঝলেন না। তিনি বললেন, “আপনি কি ক্যাটের ব্লাডগ্রুপ দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন?”

“ক্যাটের ব্লাডগ্রুপ খুবই দুর্লভ মানছি। এবি নেগেটিভ,” বললেন ডাক্তার। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গ্রোপিয়ান বললেন, “এবি নেগেটিভ ডোনার নিয়ে আপনি ভাববেন না। জোগাড় হয়ে যাবে।”

ডাক্তার বলতে চেষ্টা করলেন, “ব্লাড ম্যাচিং দিয়ে কিছু হবে না। এইচ এল ম…।” গ্রোপিয়াস তাঁকে কথা শেষ করতে দিলেন না। এগিয়ে এসে কাঁধটা চাপড়ে দিয়ে বললেন, “অনেক ধন্যবাদ। আপনারা এখন যেতে পারেন। আমি আমার টিমের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।”

দুই ডাক্তারই বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

প্রোপিয়াস তাকালেন ঘরে থাকা লোকগুলোর দিকে। সামনে দাঁড়ানো তিন ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবি নেগেটিভের ডোনার আমি নিয়ে আসব। ক্যাটের চামড়া প্রতিস্থাপন হবে। ব্লাড ম্যাচিং হলে নিশ্চয়ই অনেকটা সমস্যা কেটে যাবে।”

ম্যাথুস এক বার ভাবলেন, এইচ এল এ ব্যাপাটা বোঝাবেন। তার পরে আর সে রাস্তায় গেলেন না। তাঁর বসের মাথা এখন ঠিক নেই। গ্রোপিয়াস আর একটা প্রশ্ন করলেন, “ফুল স্কিন গ্রাফ্টিংয়ের পরে সমস্যা দেখা দিলে কী করা যেতে পারে?”

ম্যাথুস আমতা আমতা করে জবাব দিলেন, “হাই ডোজের ইমিউনোসাপ্রেসান্ট ড্রাগ দিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।”

প্রোপিয়াস মাথা নাড়লেন। “ঠিক আছে।” ম্যাথুস একটু ইতস্তত করে বললেন, “স্যার, আর একটা ব্যাপার। স্কিন ট্র্যান্সপ্লান্ট এখানে এই ভাবে করা সম্ভব হবে কি না, সন্দেহ। মানে আইনের প্রশ্নটাও থাকবে।”

প্রোপিয়াস স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন তাঁর দিকে। ম্যাথুস দ্রুত চোখটা নামিয়ে নিলেন।

গ্রোপিয়াস তিন চিকিৎসকের দিকে পিছন ঘুরে বললেন, “আপনারা বাইরে যান। আমার একটু কাজ আছে।”

তিন জনই দ্রুত বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

গ্রোপিয়াস এ বার ব্যক্তিগত মোবাইলটা বার করলেন। তার পরে ডায়াল করলেন ভারতের একটা নম্বর। ও প্রান্ত থেকে সাড়া পেতেই কাঠখোট্টা স্বরে বলে উঠলেন, “আমি আপনাদের ফ্র্যাঞ্চাইজিতে ইনভেস্ট করব। যত চান তত। আমার সাপোর্ট পুরো পাবেন আপনারা। কিন্তু তার বদলে আমার একটা চাহিদা এখনই পুরো করতে হবে।”

নানা খারাপ খবরের মধ্যে গ্রোপিয়াসের ফোনটা বসের মনটা একটু ভাল করে দিল। “বলুন, আপনি কী চান?”

“আপনাদের ওই মেয়েটাকে চাই আমি। ইমিডিয়েটলি। আর সুপার এক্সক্লুসিভ, সুপার প্রিমিয়াম একটা ক্লিনিক লাগবে, যেখানে স্কিন ট্র্যান্সপ্ল্যান্ট সম্ভব হবে।”

বস একটু চমকে উঠল। তার পরে বলল, “আপনি পুরো ব্যাপারটা আমাকে বলতে পারেন। পুরোটা জানলে আমি আপনাকে সব রকম ভাবে সাহায্য করতে পারব।”

গ্রোপিয়াস ঝড়ের গতিতে ক্যাটের ব্যাপারটা বলে গেলেন। কথা শেষ হওয়ার পরে উল্টো দিক থেকে বস বলে উঠল, “আপনি একটুও চিন্তা করবেন না। আপনার সমস্যা এখন আমার সমস্যা। আমি সব খবর জোগাড় করে আপনাকে আধ ঘণ্টার মধ্যে ফোন করছি।”

আধ ঘণ্টাও লাগল না। তার আগেই গ্রোপিয়াসের ফোনটা বেজে উঠল।

“বলুন।”

“মেয়েটার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আপনাকে আমি একটা ক্লিনিকের নাম পাঠাচ্ছি। দুবাইয়ের একটা সুপার এক্সক্লুসিভ ক্লিনিক। ওখানে ক্যাটের চিকিৎসা হয়ে যাবে। প্যারিসে যা হচ্ছে, তার থেকে অনেক ভাল ব্যবস্থা আছে ওই ক্লিনিকে।”

গ্রোপিয়াস শুনে যাচ্ছিলেন। উল্টো দিক থেকে বস বলে চলল, “আপনি যে-রকম চাইছেন, সে-রকমই হয়ে যাবে। আমার লোক আছে ওখানে। বিশ্বের সেরা চিকিৎসা আর ট্র্যান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা আছে। আপনি ক্যাটকে ওখানে আনার ব্যবস্থা করুন। আমরা মেয়েটাকে ওখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি।”

ফোনটা ছেড়ে পি এ-র দিকে ঘুরলেন গ্রোপিয়াস। “এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করো। ক্যাটকে এখান থেকে দুবাইয়ে নিয়ে যেতে হবে। আশা করি সমস্যা হবে না।”

“একদমই না স্যার,” দ্রুত মাথা নাড়ল পি এ, “সব বলা আছে। কবে যেতে চাইছেন?”

“৪৮ ঘণ্টার মধ্যে।”

“ওকে স্যার। আমি ওদের আবার জানিয়ে দিচ্ছি, সব ব্যবস্থা করে ফেলার জন্য।” বসের অনুমতি নিয়ে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল পি এ।

খাঁচায় বদ্ধ বাঘের মতো ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে লাগলেন গ্রোপিয়াস। তার পরেই তাঁর একটা কথা মনে হল। মেয়েটাকে শুধু ওই ভারতীয়গুলোর হাতে ছাড়লে হবে না। একটা ফুলপ্রুফ অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে হবে। কোনও গণ্ডগোল হলে সেটা সামলানোর জন্য ব্যাকআপ প্ল্যান। আবার ব্যক্তিগত মোবাইলটা বার করলেন গোপিয়াস।

উল্টো দিকে পরিচিত গলাটা শুনতেই বলে উঠলেন, “সময় এসে গিয়েছে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তোমাকে ভারতে যেতে হবে। বিজনেস ভিসায়। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। টার্গেটকে নিয়ে আসতে হবে। ইন্ডিয়ান কন্ট্যাক্টের নাম তোমাকে পাঠিয়ে দেব।” একটু থেমে দম নিলেন গ্রোপিয়াস, “একটা ব্যাপার মাথায় রেখো। মেয়েটাকে আমার চাই। তুমি নিয়ে আসবে ওকে, সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায়।”

ধীরে ধীরে মোবাইলটা নামিয়ে রাখল পেন্টার। তার কপালটা আবার দপদপ করছে।

গ্রোপিয়াসের তৃতীয় ফোনটা গেল আবার বসের কাছে।

“আমার এক জন লোক যাবে ভারতে। পরশু। ওখানকার অপারেশনটা ও দেখবে। মেয়েটাকে সঙ্গে নিয়ে আসবে ও। কোথায় যাবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করবে, সেটা আমাকে জানিয়ে দিন।”

ফোনটা রেখে অপেক্ষা করতে লাগলেন গ্রোপিয়াস। মিনিট দশেকের মধ্যেই মেসেজটা পেয়ে গেলেন।

ডেস্টিনেশন মুম্বই। সঙ্গে এক জনের কনট্যাক্ট নাম্বার। পেন্টারকে সেই মেসেজটা পাঠানোর পরেও শান্ত হতে পারছিলেন না গ্রোপিয়াস।

বাঘের মতোই পায়চারি করে যাচ্ছিলেন মার্কিন-জার্মান ধনকুবের। তাঁর চোখে আবার ফিরে এসেছে সেই আগুন। প্রোডিউসার গ্রোপিয়াস থেকে তিনি বদলে গিয়েছেন আর্মস ডিলার গ্রোপিয়াসে। নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য যে-লোক যা খুশি তাই করতে পারে।

ঘরের মধ্যে থাকা বড় আয়নাটার সামনে এসে দাঁড়ালেন ফার্দিনান্দ গ্রোপিয়াস। তার পরে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে গর্জন করে উঠলেন-

“তুই কিছু ভাবিস না ক্যাট। তোকে আমি সুস্থ করে তুলবই। দরকার হলে ওই ভারতীয় মেয়েটার শরীর থেকে চামড়া পুরো ছাড়িয়ে নেব।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *