জিহাদি – রূপক সাহা
দেব সাহিত্য কুটীর প্রাইভেট লিমিটেড
JIHADEE(A novel writen by Rupak Saha)
প্রথম প্রকাশ: বইমেলা, জানুয়ারি ২০২০, মাঘ ১৪২৬প্রচ্ছদ: রঞ্জন দত্ত
.
উৎসর্গ
ছোটো জামাই অভিষেক চৌধুরীকে
.
ভূমিকা
রহস্যভেদ করার জন্য কোনো বাঙালি গোয়েন্দা কি কখনো আমেরিকায় গেছেন? গতবছর আমেরিকায় বেড়াতে গিয়ে এই প্রশ্নটাই আমার মনে জেগেছিল। নিউইয়র্কে ম্যানহাটনের রাস্তায় হাঁটার সময়, হলিউডের বিভারলি হিলস বা লাসভেগাসের অনতিদূরে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখতে গিয়েও বারবার এ কথা মনে হত। অপরাধ জগতের গল্প জমানোর আদর্শ জায়গা। আমার কালকেতু নন্দী কি ওখানে গিয়ে রহস্যভেদে সফল হতে পারত? গতবছর আমেরিকায় থাকার সময় প্রচুর ওয়েব সিরিজ দেখেছি। মনে হত, অপরাধ জগতেও কর্পোরেট ছোঁয়া লেগে গেছে। সাইবার ক্রাইমের এমন টানটান গল্প যে, টিভি-র সামনে থেকে তখন উঠতে ইচ্ছে করত না। আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর সময় কিন্তু কখনোই মনে হত না, লোকচক্ষুর আড়ালে প্রতি মুহূর্তে দেশটাতে কী ভয়ানক ধরনের অপরাধ ঘটে যাচ্ছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এক ম্যানহাটন ছাড়া আর কোথাও কিন্তু উর্দিপরা পুলিশ দেখতে পাইনি। আকাশপথে হেলিকপ্টার উড়তে দেখেছি। নজরদারি রাখার ব্যাপারে কপ্টার পুলিশ নাকি এতটাই দক্ষ যে, সাধারণ লোকদের আতঙ্কিত না করেও, চুপিসারে তারা কর্তব্যটা করে যায়।
স্পোর্টস ক্লাব বা পাব-এ লোকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, অনেকেই বিশ্বাস করেন, আমেরিকায় কোনো অপরাধ করে নাকি কেউ পার পায় না। স্টেট পুলিশ আছে, এফবিআই আছে। নানা ধরনের সিকিউরিটি এজেন্সিও কম নেই। তবুও, অস্বস্তির চোরাস্রোত অনেকের মনে। এক হল, কলম্বিয়ান ড্রাগ মাফিয়াদের নিয়ে ভয়। দুই, অনুপ্রবেশকারী মেক্সিকানদের অত্যাচার। ডালাসের একটি স্কুলে গিয়ে একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়েছিল, ‘এটা একটা ড্রাগ ফ্রি, গান ফ্রি স্কুল।’ অর্থাৎ কি না বাবা-মাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা, এই স্কুলের কোনো ছাত্র মাদক নেয় না। অস্ত্র নিয়ে স্কুলে আসে না। অতি সম্প্রতি আইএসআইএস জিহাদিদের নিয়েও মারাত্মক বিব্রত আমেরিকা। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য অভয় দিচ্ছে, সিরিয়া থেকে জিহাদিদের উৎখাত করা হচ্ছে, সারা বিশ্ব থেকে ওদের নির্মূল করে দেওয়া হবে। তবুও, প্রায়ই টিভি খবরে দেখতাম, আমেরিকার কোথাও না কোথাও জিহাদি ধরা পড়েছে।
আমার এই উপন্যাসটি আমেরিকার পটভূমিকায় বাংলাভাষী দুই জিহাদিকে নিয়ে লেখা। একজন বাংলাদেশি ইমন, অন্যজন অসমের চিরাগ। দুজনেই ইসলামিক স্টেটস-এর (আইএস) টোপে পড়ে সিরিয়ায় চলে গেছিল। ট্রেনিং দিয়ে তাদের আমেরিকায় পাঠানো হয়, ইউনিসেফ-এর এক বয়স্কা কর্ত্রী লিলি গডউইনকে খুন করার জন্য। নায়গারা জলপ্রপাতের কাছে ঠিক ওইসময়ে হাজির ছিল কালকেতু। সে লিলি গডউইনকে বাঁচায় এবং জিহাদিদের কোপে পড়ে। কালকেতুকে অবশ্য আমেরিকায় নিয়ে যান বাংলাদেশের এক কোটিপতি ব্যবসায়ী পলাশ রায়চৌধুরী। তাঁর ছয় বছর বয়সি দিদি শিউলি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত অবস্থায় ঢাকার কাছাকাছি এক গ্রাম থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর তাঁকে খুঁজে বের করা, মানে খড়ের গাদায় সূঁচ সন্ধান করা। তবুও, এই দায়িত্বটা কাঁধে নেয় কালকেতু। জিহাদিদের নজর এড়িয়ে সে কীভাবে শিউলি দিদির খোঁজ পেল, জিহাদি ইমনকে আবার সুস্থজীবনে ফিরিয়ে আনল, সেই ঘটনাবলি নিয়েই এই উপন্যাস।
সাংবাদিকতার সূত্রে বিদেশে গিয়ে অনেক সময় মনে হত, এমন একটা গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করলে কেমন হয়, যে রহস্যভেদের প্রয়োজনে টোকিও থেকে টেক্সাস, আলাস্কা থেকে অস্ট্রেলিয়া চষে বেড়াবে! এমন আন্তর্জাতিক মানের গোয়েন্দা বাঙালিদের মধ্যে নেই বললেই চলে। সেই তাগিদেই এই জিহাদি উপন্যাস। সত্যি কথা বলতে কি, আমেরিকার পটভূমিতে কোনোদিন কোনো উপন্যাস লিখব, স্বপ্নেও তা ভাবিনি। সেই সুযোগটা হাতের কাছে এসে গেল টেক্সাসের ডালাস শহরে গিয়ে। কৈশোরে বেশ কিছু হলিউডি ফিল্ম দেখেছি ওখানকার র্যাঞ্চ জীবন নিয়ে। মেট্রো সিনেমা হলে বসে সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠত তখন কাউবয়দের গান-ফাইট দেখে। গত পঞ্চাশ বছরে ডালাস এখন অনেকটাই কসমোপলিটান। এবং আমেরিকার অন্যতম সেরা বাণিজ্যিক নগরী। ফরচুন ৫০০ কোম্পানির মধ্যে ১০টার সদর দফতর এখন ওখানে। প্রচুর ভারতীয় এবং বাংলাদেশি ডালাসে বসবাস করেন। হনুমান মন্দির, সাঁইবাবার মন্দিরও চোখে পড়ে। ওখানে না গেলে জানতেই পারতাম না, নভেম্বর মাসে দাড়ি-গোঁফ-চুল না কেটে, সেই টাকা আমেরিকানরা ক্যানসার রোগীদের সাহায্যে দান করেন।
আমেরিকা সত্যিই একটা বিশ্বজনীন দেশ। সারা বিশ্বে কোথায় কী ঘটছে, তা ওখানে জানা যায়। প্লেনোতে বার্নস অ্যান্ড নোবেল-এর একটা বুক স্টোরে গিয়ে একবার মাথা ঘুরে গেছিল। আইএস জিহাদিদের নিয়ে অসংখ্য বই বিক্রি হচ্ছে সেখানে। কেনার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু একজন পরামর্শ দিলেন, জিহাদিদের সম্পর্কে বই কিনলে আপনার পিছনে এফবিআই যে চরবৃত্তি করবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। তাই লোভ সংবরণ করেছিলাম। মিডিয়া মারফত পাওয়া আইএস অনুগামীদের নিয়ে অনেক অজানা তথ্য আমার এই উপন্যাসে আছে। মনে হয়, পাঠকদের ভালো লাগবে। কালকেতু সিরিজের এটি দ্বিতীয় খণ্ড। প্রকাশ করার জন্য দেব সাহিত্য কুটীরের সম্পাদক রূপা মজুমদারকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
—রূপক সাহা






Leave a Reply