(চল্লিশ)
আলবুকার্ক পুলিশ কয়েকটা প্রশ্ন তুলেছে। ঝরণার ধার থেকে র্যাঞ্চে ঢোকার যে লোহার দরজাটা সন্ধের পর বন্ধ থাকে, সেটা খোলা ছিল কেন? পলাশভাই যে পিস্তল দিয়ে একটা নেকড়ে মেরেছেন, সেটা কার? এমনিতে নর্থ আমেরিকায় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন কড়া। নেকড়ে মেরে ফেলার জন্য পলাশভাইয়ের জেলও হয়ে যেতে পারে। অবশ্য আত্মরক্ষার জন্য মারতে বাধ্য হয়েছেন, এটা ওঁকে প্রমাণ করতে হবে। সেদিন রাতে পুলিশ এসে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করছিল, তখন পলাশভাইয়ের জন্য কালকেতুর দুঃশ্চিন্তা হচ্ছিল। তবে তার থেকেও বেশি ভয় হচ্ছিল রোজিনা ম্যাডামকে নিয়ে। ওঁর চোট আঘাত অনেক বেশি। ওঁর পরনে লেদার জ্যাকেট ছিল। তা সত্ত্বেও, নেকড়েটা ওঁর ডানহাতের কবজি এমন জোরে কামড়ে ধরেছিল যে, হাঁড় ভেঙে যায়। পলাশভাই গুলি না চালালে, হয়তো কবজিটাই শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।
নেকড়ের কামড়ে কেউ মারা গেছে, এমন ঘটনা খুব বিরল নর্থ আমেরিকায়। র্যাবিজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা হলে, সেরে ওঠা সম্ভব। রায়ান পরদিন সকালেই বড় বড় ডাক্তার এনে হাজির করেন র্যাঞ্চে। তিন দিন হয়ে গেছে, রোজিনা ম্যাডাম আর পলাশভাইয়ের চিকিৎসা চলছে র্যাঞ্চেরই হাসপাতালে। পলাশভাই শরীরের খুব বেশি ক্ষতের চিহ্ন নেই। কিন্তু রোজিনা ম্যাডামের অবস্থা ভাল নয়। ডাক্তাররা বলেছেন, ছয়দিন নজরে রাখতে হবে। দরকার হলে ডানহাত কবজি থেকে কেটে বাদ দিতে হতে পারে। শুনে হেমলতা কেঁদে ফেলেছিলেন রায়ানের কাছে। ‘আমার ফুলের মতো মাইয়াডার অঙ্গহানি অইতে দিম না। আফনে ইংলন্ড থেইক্যা সার্জেন লইয়্যা আসেন।’
নিউ ইয়ার্সের সব আনন্দ উবে গেছে র্যাঞ্চ থেকে। রিচার্ড গাটম্যান নেকড়ের আক্রমণ নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখেছেন নিউ ইয়র্ক টাইমসে। সেটা প্রথম পৃষ্ঠায় বক্স করে বেরিয়েছিল। তার পর থেকে র্যাঞ্চে হাজির টিভি চ্যানেলের প্রচুর রিপোর্টার। রোজিনা ম্যাডামকে নিয়ে দু’বেলা খবর হচ্ছে। পশুপ্রেমীরা প্রশ্ন তুলেছেন, নেকড়ের সংখ্যা ক্রমশই কমে যাচ্ছে। গুলি করে মারাটা কি উচিত হয়েছে? পুলিশ, পশুপ্রেমী আর মিডিয়ার উৎপাতে মুখ শুকনো করে হাসপাতালেই পড়ে আছেন রায়ান আর হেমলতা। সারাক্ষণ ওঁদের পাশে লারেইনা। দেশে এ রকম কোনও মিসহ্যাপ হলে রায়ানের মতো বড়লোকেরা পুলিশকে ম্যানেজ করে নিতেন। কিন্তু এটা আমেরিকা। প্রশাসনের তলার লেবেলে দুর্নীতি নেই বললেই চলে। পুলিশ দফায় দফায় তদন্ত করতে এসে কড়া কড়া প্রশ্ন করছে। এ দেশে অপার বাকস্বাধীনতা, মিডিয়াও যা-তা মন্তব্য করে যাচ্ছে। অসীম ধৈর্য রায়ানের।
দ্বিতীয় দিন রোজিনা ম্যাডামকে দেখতে গেছিল কালকেতু। মুখ অসম্ভব ফুলে রয়েছে। ব্যাণ্ডেজ সত্ত্বেও তা বোঝা যাচ্ছে। ম্যাডাম আচ্ছন্নের মতো পড়ে আছেন। তাঁর মুখ দিয়ে অনবরত লালা গড়াচ্ছে। ফলে ওঁর খুব কাছে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। র্যাবিজ না কি সংক্রামক রোগ। ম্যাডামের মুখের লালা থেকে অন্য কারও হতে পারে। ম্যাডামের তুলনায় পলাশভাই অনেকটা সুস্থ। উনি অন্তত কথা বলতে পারছেন। কথায় কথায় পলাশভাই একবার বললেনও, নেকড়েটা একবার লাফিয়ে উঠে তাঁর কাঁধের কাছটায় কামড় বসিয়েছিল। কিন্তু সেই সময় উনি নেকড়ের অণ্ডকোষ লক্ষ করে কনুই চালান। ব্যথা পেয়ে তখনই নেকড়েটা কামড় ছেড়ে দেয়।
পলাশভাইকে এখনও পরিষ্কার জানানো হয়নি, রোজিনা ম্যাডামে ইনজুরি কতটা। ডাক্তাররাই বলতে মানা করে দিয়েছেন। তবুও, পলাশভাই একবার আক্ষেপ করলেন, ‘প্লেনে আসার সময় ম্যাডাম একবার কইসিল, ডান চোখ লাফাইতাসে। লক্ষণ ভালা না। কথাডা আমি হালকাভাবে নিসিলাম। বারো ঘইণ্টার পর কথাডা এমনভাবে মিইল্যা যাইব, কে জাইনত? হ্যায় ক্যামন আসে, আমারে ক’ন কাইলকেতুভাই। আফনেরা আমারে কিছু চাইপ্যা যাইতাসেন না তো?’
র্যাঞ্চের হাসপাতালের গ্রাউণ্ড ফ্লোরেএকটা ক্যাফেটোরিয়া আছে। সেখানে বসে কালকেতু পলাশভাইয়ের কথাই ভাবছিল। রোজিনা ম্যাডাম র্যাবিজে আক্রান্ত হয়েছেন শুনলে উনি মারাত্মক শব্দ পাবেন। এমন সময় উপর থেকে নেমে লারেইনা বলল, ‘চলুন, গেস্ট হাউসে যাই। লাঞ্চ টাইম হয়ে গেছে। হেমলতা আন্টি আপনাকে নিয়ে যেতে বললেন।’
কালকেতু বলল, ‘ওঁরা লাঞ্চে যাবেন না?’
‘যা মনের অবস্থা, লাঞ্চ করার ইচ্ছে কারও নেই। আপনি চলুন।’
ক্যাফেটোরিয়ার বাইরে কয়েকটা গল্ফকার্ট দাঁড়িয়ে। একটা ভেনু থেকে অন্য ভেনুতে যাওয়ার জন্য। তার একটাতে উঠে লারেইনা স্টিয়ারিং হাতে বলল, ‘ভাবলাম, র্যাঞ্চে আপনাকে কত কী দেখাব। কিন্তু এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যে, সেই ইচ্ছেটাই উবে গেল।’
ওর পাশে বসে কালকেতু বলল, ‘ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, যেন দু’জনই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন।’
‘আমি নিজে খানিকটা ইনভেস্টিগেট করেছি, জানেন মি. ন্যান্ডি। যার উপর আমার সন্দেহ, সে র্যাঞ্চ থেকে পালিয়েছে।’
লারেইনার ইঙ্গিত কালকেতুর বোধগম্য হল না। ও বলল, ‘তার মানে তুমি বলছ, এটা অ্যাক্সিডেন্ট নয়? কেউ প্ল্যান করে ঘটিয়েছে!’
‘আমার তো তাই মনে হচ্ছে। পুলিশ সঠিক প্রশ্নটাই তুলেছে, ঝরণার কাছে লোহার দরজাটা খোলা ছিল কেন? দরজা খোলা বা বন্ধের ব্যবস্থা আছে সিকিউরিটি কন্ট্রোল রুম থেকে। এবং সেটা রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, সেদিন সন্ধ্যায় জোন সিক্সের দরজা বন্ধ করার দায়িত্বে ছিল ম্যাক বলে একজন সিকিউরিটি স্টাফের। রোজিনা ম্যাডাম যে জোন সিক্সে যাচ্ছেন, সেটা একমাত্র ম্যাকই জানত।’
কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে কালকেতু বলল, ‘দরজা খোলা রেখে ওর লাভ?’
‘কারণটা একমাত্র আমি জানি। মাস ছয়েক আগে ম্যাডামের সঙ্গে আমি কয়েকদিনের জন্য র্যাঞ্চে এসেছিলাম। সেইসময় একজন গেস্টের সঙ্গে ম্যাক দুর্ব্যবহার করেছিল। ম্যাডাম সকলের সামনে ওকে চড় মারেন। কয়েক দিনের জন্য ওকে সাসপেন্ডও করেছিলেন। তার পর থেকে ম্যাডামের উপর ম্যাকের রাগ। দু’একজনের কাছে ও বলেওছিল, মালিকের মেয়ে বলে রোজিনা ম্যাডামকে ও ছেড়ে দেবে না। আমার মনে হচ্ছে, ও সেই অপমানের বদলা নিল। আজ সকালেই ম্যাক চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। বলে গেছে, আরকানসাসে একটা র্যাঞ্চে ভাল মাইনের চাকরি পেয়েছে। ওর উপর সন্দেহ হওয়ার কথাটা আমি এখনও কাউকে বলিনি। আপনার কি মনে হয়, পুলিশকে আপনার জানানো উচিত?’
‘অবশ্যই।’ কালকেতু বলল, ‘কিন্তু তুমি কী করে প্রমাণ করবে লারেইনা? কন্ট্রোল রুমে বসে অন্য কেউও তো এই দুষ্কর্মটা করতে পাবে। তুমিই তো বলছ, রিমোট কন্ট্রোলে দরজা খোলা বা বন্ধ করা যায়।’
‘এটা আপনি ঠিক বলেছেন। আসলে আমি ভাবছিলাম, আমি যখন পুলিশে চাকরি করব, তখন যদি এই ধরনের একটা কেস আসে, তা হলে কীভাবে আমি সলভ করব? একটা বিষয়েও আমার খটকা লাগছে, জানেন। নেকড়েদের বিহেভিরিয়াল প্যাটার্ন নিয়ে আমি আমাদের ইউনিভার্সিটির জুলজির প্রোফেসরদের সঙ্গেও কথা বললাম। ওঁরা বললেন, তিন-চারটে নেকড়ে একযোগে কাউকে অ্যাটাক করেছে, এমন ঘটনা ওঁরা কখনও শোনেননি। নেকড়ে শিকার করে খায় ঠিক। কিন্তু শিকার করতে ওরা একা বেরোয়। ঝরণার জল খেতেও একসঙ্গে আসবে, এমনটাও হওয়ার নয়। সবথেকে বড় কথা হল, নেকড়েরা মানুষ শিকার করে না। হয়তো কোনও কারণে ভয় পেয়ে ওরা অ্যাটাক করেছিল। গুলির আওয়াজ শুনে পরে পালায়। আচ্ছা, আমি শুনেছি, আপনি ডিটেকটিভ। এই কেসটা এলে, আপনি কোত্থেকে শুরু করতেন মি. ন্যান্ডি?’
আচমকা প্রশ্নটা শুনে কালকেতু কী উত্তর দেবে, ভেবে পেল না। সত্যিই, এই কেসটা হাতে এলে ও কী করত? প্রথমেই ঘটনার সময়কার ক্লিপিংস ও খুঁটিয়ে দেখত। একটা না একটা ক্লু ওখান থেকে পাওয়া যেতই। দ্বিতীয়ত, পলাশভাইয়ের কাছে ও জানতে চাইত, প্রোভোগেশনটা কোনদিকে থেকে হয়েছে? ওঁরা কি এমন কিছু করেছিলেন, যাতে নেকড়েরা বিরক্ত বোধ করে? কালকেতু শুনেছে, চাঁদনি রাতে বিশেষ করে পূর্ণিমাতে, কোনও কোনও জন্তু হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ করে। নেকড়েদেরও মধ্যেও নাকি এই প্রবণতাটা আছে। নেকড়েদের নিয়ে হলিউডে প্রচুর হরর ছবি তৈরি হয়েছে। বছর খানেক আগে এইরকম একটা ছবিতে কালকেতু দেখেছিল, চাঁদনি রাতে একটা মেয়ে তাঁর পুরুষ শিকারকে নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে হঠাৎ নেকড়েতে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। তার পর তাকে খুন করছে। হলিউডের ছবিতে গল্পের গরু গাছেও ওঠে। বাস্তবে এ সব অবশ্য হয় না।
উত্তর না দিয়ে কালকেতু পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘ফিয়াসেঁকে একটা রোম্যান্টিক স্পট দেখাতে নিয়ে গিয়ে রোজিনা ম্যাডাম অস্ত্র সঙ্গে নিয়েছিলেন কেন, তোমার কি জানা আছে? উনি কি র্যাঞ্চে এলে সঙ্গে কখনও গান ক্যারি করতেন?’
‘শ্যুটিংয়ে ম্যাডামের ভীষণ ইন্টারেস্ট ছিল। দু’হাতে গান ইউজ করতে পারতেন। র্যাঞ্চে কোনও কম্পিটিশন হলে বরাবর উনি পিস্তল ইভেন্টে জিততেন। কিন্তু মি. পলাশকে যে কারণে উনি ঝঁরণার ধারে নিয়ে যান বলে শুনেছি, তাতে সঙ্গে তখন পিস্তল রাখবেন কেন, ভেবে উত্তর পাচ্ছি না।’
‘কী কারণে ওঁরা ঝরণার ধারে গেছিলেন লারেইনা?’
‘হেমলতা আন্টির মুখে শুনলাম, ম্যাডাম ঝরণাকে সাক্ষী রেখে মি. পলাশকে একটা সুখবর দিতে চাইছিলেন। উনি মা হতে যাচ্ছেন। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল, মিসহ্যাপের পর ম্যাডামের মিসক্যারেজ হয়ে গেছে।’
কথা বলতে বলতে গেস্ট হাউস এসে গেল। লারেইনা গল্ফকার্ট থেকে লাফিয়ে নেমে বলল, ‘আপনি ডাইনিং হলে চলে যান মি. ন্যান্ডি। আমি আমার মাকে ডেকে নিয়ে আসছি।’
ডাইনিং হলে আজ খুব বেশি গেস্ট নেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে কালকেতু দেখল, কোণের দিকে একটা টেবলে বসে রিচার্ড গাটম্যান। ব্যুফে এরিয়া থেকে ওঁর জন্য প্লেটে খাবার নিয়ে যাচ্ছে একটা মেয়ে। সেদিন রিচার্ডকে একা পেয়েও শিউলিদিদির ব্যাপারে খুব বেশি তথ্য বের করতে পারেনি কালকেতু। পলাশভাই মাঝখান থেকে বসে পড়ে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। আজ একবার চেষ্টা করে দেখলে হয়। যে কাজের জন্য পলাশভাই ওকে আমেরিকায় নিয়ে এসেছেন, কালকেতুর এখন মনে হচ্ছে, তার কিছুই এগোয়নি। মাঝে ঢাকা থেকে ইত্তেফাকের রিপোর্টার চঞ্চল একবার ফোন করেছিল। খুব উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, ‘আফনের কাম সহজ হইয়্যা যাইব। আর একডা উইক আমারে দ্যান। শিউলি আপারে নিয়া সব ইনফর্মেশন হাতে আইস্যা যাইব।’
সপ্তাহ খানেক আগে চঞ্চল না কি প্রধানমন্ত্রী বিলকিস বেগমের সফরসঙ্গী হয়েছিল জাপানে। সেখানে একদিন বিলকিস বেগম যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে আড্ডা মারছিলেন, তখন চঞ্চল শিউলি আপার প্রসঙ্গটা তুলেছিল। প্রধানমন্ত্রীকে না কি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে শিউলি আপার স্থান পাওয়া উচিত। আমেরিকায় শিউলি আপার ওই ছবি প্রকাশিত না হলে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পাকিস্তানের মাথার উপর থেকে হাত তুলে নিতেন না। ঢাকায় পাকিস্তানও ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করত না। ফিরে এসে বিলকিস বেগম না কি সিক্রেট সার্ভিসের চিফকে নির্দেশ দিয়েছেন, যে কোরেই হোক, বেঁচে থাকলে শিউলি আপাকে খুঁজে বের করতেই হবে। কালকেতু জানে না, কতটা গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ সরকার শিউলিদিদিকে খুঁজবে।
খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে রিচার্ডের টেবলের কাছে গিয়ে কালকেতু বলল, ‘বসতে পারি?’
রিচার্ড বললেন, ‘অত সংকোচ করবেন না। বসুন। সেদিন আপনি আমার কাছ থেকে কিছু জানতে চাইছিলেন। টপিক ঘুরে যাওয়ায় জানতে পারেননি। আজ স্বচ্ছন্দে জিজ্ঞেস করতে পারেন।’
রায়ানকে সেদিন যা বলেছিল, কালকেতু রিচার্ডকেও তাই বলল, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আমি রিসার্চ করছি। যে বাচ্চা মেয়েটার ছবি তুলে আপনি সেনসেশন ফেলে দিয়েছিলেন, তার সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।’
‘ওর ব্যাপারে রায়ান বলতে পারবেন। আরও ভাল জানেন, ওর স্ত্রী হেমলতা। ওয়ার ভিক্টিম মেয়েটা গোথেনবার্গে চলে যাওয়ার পর থেকে আমার সঙ্গে আর তেমন যোগাযোগ ছিল না। সম্ভবত, তখন দু’একবার মেয়েটাকে নিয়ে আমি লিখেও ছিলাম। মাঝে মাঝে রায়ান বলত বটে, মেয়েটাকে ভাঙিয়ে এলসা গিনেসবেরি রোজগার করে খাচ্ছেন। কিন্তু আমি আর নিজেকে এই কাদা ছোঁড়াছুড়ির মধ্যে জড়াইনি।’
‘আপনি বললেন, মেয়েটির সম্পর্কে মিসেস হেমলতা ভাল বলতে পারবেন। কেন বললেন, এ কথাটা?’
‘যখন ঢাকার হাসপাতালে ওয়ার ভিক্টিম মেয়েটির চিকিৎসা চলছে, তখন ওখানেই জুনিয়র নার্স ছিলেন হেমলতা। ওঁর তখন কুড়ি বছর বয়স। মিসেস গিনেসবেরির কথাবার্তায় মুগ্ধ। হেমলতার কাছে তখন ভদ্রমহিলা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গল। রেড ক্রশে চাকরির আশ্বাস দিয়ে মিসেস গিনেসবেরি হেমলতাকেও গোথেনবার্গে নিয়ে যান। আসল উদ্দেশ্য ছিল, ওঁকে দিয়ে ওয়ার ভিক্টিম মেয়েটার গভর্নেসের কাজ করানো। সেটা যখন হেমলতা বুঝতে পারেন, তখন দেশে ফিরে যেতে চান। রায়ানের মুখে আমি শুনেছি, পাঁচটা বছর হেমলতার পাশপোর্ট আটকে রেখেছিলেন মিসেস গিনেসবেরি, যাতে উনি দেশে ফিরতে না পারেন।’
‘রায়ানের সঙ্গে মিসেস হেমলতার পরিচয় কি ঢাকাতেই?’
‘হ্যাঁ। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর টানা দু’ বছর রায়ান নিউ ইয়র্ক টাইমসের ঢাকা করেসপন্ডেন্ট ছিলেন। ওয়ার ভিক্টিম মেয়েটিকে নিয়ে খবর করার জন্য তো বটেই, ওঁর প্রথম স্ত্রী লিজা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকার জন্যও রোজ রায়ান হাসপাতালে যেতেন। হেমলতার সঙ্গে ওঁর আলাপ ওই হাসপাতালেই। বয়সে প্রায় পনেরো বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সেটা বুঝতে পেরে লিজা রাগে আমেরিকায় ফিরে আসে। পরে ডিভোর্স নেয়। তখন কী হয়েছিল, জানি না। হঠাৎ একদিন শুনি, মিসেস গিনেসবেরির সঙ্গে হেমলতা সুইডেনে চলে গেছেন। সেইসময় রায়ান মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলেন।’
‘ফের ওঁদের মধ্যে যোগাযোগ হল কী করে?’
‘এখানে একটা শপিং মলে হেমলতার সঙ্গে আকস্মিক ওঁর দেখা হয়ে যায়। ওয়ার ভিক্টিম বাচ্চাটাকে নিয়ে হেমলতা সেদিন খেলনা কিনতে বেরিয়েছিলেন। হেমলতা বলেন, খুব কষ্টের মধ্যে আছেন। মিসেস গিনেসবেরি জোর করে ওকে নিউইয়র্কে পাঠিয়েছেন। ডা. গডউইন বলে এক ডার্মাটোলজিস্টের বাড়িতে উনি বাচ্চা মেয়েটার দেখভাল করছেন। ওঁর মুখে মিসেস গিনেসবেরির কার্যকলাপ শুনে রায়ান মারাত্মক চটে যান। মিসেস গিনেসবেরিকে হুমকি দিয়েই উনি হেমলতার পাশপোর্ট উদ্ধার করেন। তার পর রায়ান এমন একটা কড়া আর্টিকেল লিখেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত সুইডিশ সরকার নড়ে চড়ে বসে। আলটিমেটলি মিসেস গিনেসবেরির জেল হয়।’
এ সব কালকেতু রায়ানের মুখেও খানিকটা শুনেছিল। রিচার্ডের কথাগুলো শুনে ও মনে মনে তথ্যগুলো গোছাতে লাগল। ঢাকায় শিউলিদিদিকে হেমলতা প্রায় এক বছর দেখেছেন। তার পরের পাঁচ বছর গোথেনবার্গ ও নিউ ইয়র্কে। অর্থাৎ শিউলিদিদির বয়স যখন এগারো-বারো বছর, তখনও তিনি গভর্নেস। তাই যদি হয়, হেমলতাকে শিউলিদিদির মনে রাখা উচিত। দেখা হলে হয়তো শিউলিদিদি ওঁকে চিনলেও চিনতে পারেন। ধরেই নেওয়া যায়, ওই সময়টায় বাংলা ছাড়া শিউলিদিদি আর কোনও ভাষা জানতেন না। দু’জনের মধ্যে নিশ্চিতভাবে, ভাষা একটা বন্ধন তৈরি করেছিল। শিউলিদিদি সম্পর্কে আরও অনেক কিছু হেমলতার কাছে জানা যেতে পারে। কিন্তু ভদ্রমহিলা এখন যে মানসিক অবস্থার মধ্যে রয়েছেন, তাতে প্রসঙ্গটা ওঁর কাছে না তোলাই বাঞ্ছনীয়।
কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘মিসেস হেমলতাকে আপনি কতদিন ধরে চেনেন?’
রিচার্ড বললেন, ‘উনি নিউ ইয়র্কে আসার পর থেকে। উইক এন্ড-এ প্রায়ই তখন আমরা স্পোর্টস বার-এ যেতাম। তার পর রোজিনা হল। মেয়েটা ঈশ্বরের আর্শীবাদ হয়ে এসেছিল রায়ানের জীবনে। কেননা, ও জন্মানোর পরই দাদুর এই র্যাঞ্চের মালিকানা পান রায়ান। সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে উনি আলবুকার্কে চলে আসেন। এখানেই ঘটা করে হেমলতার সঙ্গে ওর বিয়েটা হয়েছিল।’
‘আপনার কি মনে হয়, হেমলতা যদি ওয়ার ভিক্টিম মেয়েটিকে এখন কোথাও দেখতে পান, তা হলে কি উনি চিনতে পারবেন? মাঝে কিন্তু প্রায় সাতচল্লিশটা বছর পেরোতে চলল।’
একটু চিন্তা করে রিচার্ড বললেন, ‘হয়তো ফেসিয়াল চেঞ্জ অনেকটাই হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আছে, যা দেখে চিনে ফেলা উচিত। এখনকার যুগে ফেসিয়াল চেঞ্জটাও বড় কথা নয়। আপনি যে কোনও ভাল কম্পিউটার গ্রাফিক্স আর্টিস্টের কাছে চলে যান। ওয়ার ভিক্টিম মেয়েটার চেহারা এখন কেমন হতে পারে, কম্পিউটারে ফেলে আপনাকে তা দেখিয়ে দিতে পারেন। এই র্যাঞ্চেই কাল এমন একজনের সঙ্গে আমার আলাপ হল, যিনি খুব নামকরা গ্রাফিক্স আর্টিস্ট। তাঁর নাম জন রিড। উনি ইন্টারপোলের হয়ে কাজ করেন। অনেক দাগী ক্রিমিনালকে উনি ধরতে সাহায্য করেছেন।’
কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘মিস লিলি গডউইন বলে কাউকে আপনি চেনেন?’
রিচার্ড বললেন, ‘অবশ্যই চিনি। ইউনিসেফের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডার। ওঁকে কে না চেনেন? ওয়ার ভিক্টিম বাচ্চাদের জন্য নিঃস্বার্থভাবে উনি অনেক কিছু করছেন। ওদের একটা অনুষ্ঠানে আমাকে একবার ইনভাইটও করেছিলেন। জানেন কি, এ বার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ওঁর নামটা বিবেচনা করা হচ্ছে? আমি জানি, কেননা, আমার ওপিনিয়ন নেওয়ার জন্য পুরস্কার কমিটি থেকে একজন আমার কাছে এসেছিলেন। মিস লিলি যদি নোবেল প্রাইজ পান, তা হলে আমি খুব খুশি হব। উনি ডিজার্ভ করেন।’
খাওয়া শেষ করে ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছছেন রিচার্ড। আর বিরক্ত করা উচিত না। বয়স্ক মানুষ, লাঞ্চের পর হয়তো বিশ্রাম নেওয়া ওঁর অভ্যেস। কালকেতু মনে মনে খুশি, যাক, তবুও কিছু খবর তো জানা গেল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে রিচার্ড বললেন, ‘নাউ ইউ হ্যাভ টু এক্সকিউজ মি জেন্টেলম্যান। আর তোমার সঙ্গে দেখা নাও হতে পারে। আমি আর খানিকক্ষণ পরেই ডালাসে ফিরে যাচ্ছি।’
কালকেতুও উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল, ‘আপনার মতো একজন জার্নালিস্টের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছি, নিজেকে ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে।’
কাঁধে হাত রেখে রিচার্ড বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলে আমারও ভাল লাগল। যোগাযোগ রেখো।’
ডাইনিং হল থেকে রিচার্ড বেরিয়ে যাচ্ছেন, এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। পর্দায় বাম কিমের মুখ। শুভেচ্ছা জানিয়ে উনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কোথায় মি. ন্যান্ডি? এখনও কি আলবুকার্কে?’
‘আপনি জানলেন কী করে?’
‘টিভিতে আপনার বন্ধুদের দুর্ঘটনার কথা শুনেছি। ভেরি স্যাড। ওঁরা ভাল আছেন তো?’
কালকেতু বলল, ‘এখনও বিপদ কাটেনি। আপনারা সবাই কেমন?’
মি. কিম বললেন, ‘আমরাও ভাল নেই। আপনার সঙ্গে মিস লিলি গডউইন কথা বলতে চান। আপনারা র্যাঞ্চ থেকে ফিরলে প্লিজ, একবার কি দেখা করতে পারবেন মিস গডউইনের সঙ্গে?’
শুনে কালকেতু একটু অবাক হল। মিস লিলি নিজে ফোন করে কথা বলতে চাইছেন! কী বলতে চান উনি? ‘আমরাও ভাল নেই।’ তা হলে কি আবার টেররিস্ট অ্যাটাক? না কি পলাশভাইয়ের চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার নিয়ে কোনও খারাপ খবর আছে? বাম কিমকে ও বলল, ‘আমরা কবে ফিরব, তা কিন্তু নির্ভর করবে, পলাশ এবং রোজিনা ম্যাডাম কেমন থাকবেন, তার উপর। নিউ ইয়র্কে ফিরেই আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।’
‘থ্যাঙ্কস’, বলে বাম কিম লাইনটা কেটে দিলেন।
