জিহাদি – ১৯

(উনিশ)

চিরাগ সেদিন বলেছিল বটে, ডিনারের পর আউট হাউসের বেসমেন্টে চোরাকুঠুরিতে নিয়ে যাবে। কিন্তু ওকে নিয়ে যাওয়ার কোনও আগ্রহই দেখায়নি। ইদানীং ওর কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না ইমন। কোত্থেকে সব বাজে বাজে খবর পাচ্ছে, কে জানে? পলাশছ্যারের সঙ্গে না কি জিহাদিদের যোগাযোগ আছে! কোন দুঃখে মানুষটা জিহাদিদের সংস্পর্শে আসতে যাবেন। উনি কি জানেন না, এর পরিণাম কী হতে পারে? কোটি কোটি টাকার ব্যাবসা জলে দেওয়ার ঝুঁকি কি কোনও সুস্থ মানুষ নিতে পারেন? রোজিনা ম্যাডামই বা সেটা অ্যালাউ করবেন কেন? পলাশছ্যারকে দেখে তো মনে হয়, উনি রোজিনা ম্যাডামের পরামর্শ ছাড়া এক পাও নড়েন না।

চিরাগের মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ করছে ইমন। ওর কথাবার্তাগুলো ইদানীং সহ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। রোজিনা ম্যাডাম সম্পর্কে ও কটু মন্তব্য করে। প্রায়ই বলে, সুযোগ পেলে ম্যাডামকে একদিন বিছানায় চিত করে শোয়াবেই। ক্যালিফেটে থাকার সময় নারীদেহের প্রতি ওর টান দেখেছে ইমন। সিরিয়ান, ইরাকিরা যে সব কুর্দ মেয়েকে বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করত, পরে তাদের ভোগ করার জন্য তক্কে তক্কে থাকত চিরাগ। রাক্কায় একবার একটা সিরিয়ান মেয়েকে তুলে এনে ও মারাত্মক বিপদের মধ্যে পড়েছিল। মেয়েটির নামও ইমনের মনে আছে… ওলা। একটা পরিত্যক্ত স্কুলবাড়িতে মেয়েটাকে আটকে রেখে কয়েকটা দিন ধর্ষণ করেছিল চিরাগ। সেই অঞ্চলটা আমেরিকানরা দখল করে নেওয়ার পর, মেয়েটাকে উদ্ধার করে সিরিয়ান সরকারের জওয়ানরা। তখন শ্যুট অ্যাট সাইট জারি হয়েছিল চিরাগের বিরুদ্ধে।

কালকেতুছ্যারকে নিউ ইয়র্ক টাইমস অফিসে নামিয়ে দিয়ে ইমন গাড়িটা নিয়ে চলে এসেছে কলম্বাস সার্কেলের কাছে সেন্ট্রাল পার্কে। নিউ ইয়র্কের অন্যতম ব্যস্ত জায়গা। মেট্রো ট্রেনে করে এসে কেজো লোকেরা অফিস পাড়ায় চলে যায়। আর ট্যুরিস্টরা ঢুকে পড়ে সেন্ট্রাল পার্কে। দেখে ইমন অবাক হল, একটা রিকশা স্ট্যান্ড রয়েছে পার্কে। তাতে গোটা দশ-বারো সাইকেল রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকার মতো আমেরিকাতেও সাইকেল রিকশা ও আশা করেনি। তফাৎটা হল, ঢাকার রিকশায় দু’জন বসতে পারে, সেন্ট্রাল পার্কে চারজন। রিকশাওয়ালারা বেশিরভাগই কালো। বিরাট পার্কটা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য যা ভাড়া চাইছে, ঢাকার লোকেরা তা শুনলে আঁতকে উঠবে।

হাতে ঘণ্টা তিন সময় আছে। গাছের নিচে ছায়ায় একটা বেঞ্চ দেখে ইমন বসে পড়ল। কত দেশের মানুষ পার্কে ঘুরতে এসেছে। ঘনঘন সেলফি তুলছে। ইয়ং ছেলে-মেয়েরা অন্যের হাতে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিয়ে নিজেরা লিপলক করে চুমু খেতে খেতে ছবি তুলছে। কেউ সেদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ কুসুমের কথা মনে পড়ল ইমনের। আমোদপুরে একদিন ওর কাছে অঙ্ক শিখতে এসেছিল কুসুম। সেইসময় আম্মা-আববুরা কেউ বাড়িতে ছিল না। সেদিন মাথায় কী ভূত চেপেছিল কে জানে? কুসুমকে জড়িয়ে ধরে ও চুমু খেয়েছিল। তখনকার মতো কুসুম নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছিল। কিন্তু বেশ কিছুদিন আর ওর ধারে কাছে আসেনি। অপরাধবোধে প্রায় পাগল পাগল অবস্থা হয়েছিল ইমনের। সেই কুসুম যদি আজ রাস্তা-ঘাটে খুল্লমখুল্লা চুমু খাওয়ার দৃশ্য দেখত, তা হলে ওর কী প্রতিক্রিয়া হত? কথাটা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইমন।

পার্কে ট্যুরিস্টদের কাছ থেকে কত লোক কতভাবে রোজগার করছে। কেউ জিমন্যাস্টিক্স দেখাচ্ছে। তাকে ঘিরে বেশ ভাল ভিড়। রাস্তার দু’পাশে ছোট ছোট স্টল নিয়ে বসেছে কিছু লোক। নানা ধরনের মেমেন্টো বিক্রি করছে। শিল্পীরা ক্যানভাস আর ক্রেয়ন পেনসিল নিয়ে ছবি আঁকার জন্য বসে আছে। পথচলতি ট্যুরিস্ট বসে পড়ছে তাদের টুলে। সে দিকে তাকিয়ে ইমনের চেনা চেনা একটা মেয়েকে চোখে পড়ল। একটু ভাবতেই ওর মনে পড়ল, আরে, এই মেক্সিকান মেয়েটাই তো পলাশছ্যারের বাড়িতে রোজ রুম ক্লিনিংয়ের জন্য আসে! তখন ওর গায়ে সাদা অ্যাপ্রন থাকে। কিন্তু এখন মেয়েটা টপ আর জিনস পরে আছে। কাঁধে একটা ব্যাগ। মেয়েটার নাম ও জানে না। কিন্তু দেখা হলেই খুব মিষ্টি হাসি মুখে ধরে রাখে। মেয়েটার সঙ্গে একজন বান্ধবীও আছে। সে ছবি আঁকাতে চায়। কিন্তু মেক্সিকান মেয়েটা রাজি হচ্ছে না। কী মনে হল, ইমন বেঞ্চ থেকে উঠে মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

চোখাচোখি হতে মেয়েটা মিষ্টি হেসে বলল, ‘ইউ! হিয়ার?’

মেয়েটা তা হলে ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারে। বুঝতে পেরে ইমন ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে তুমি চিনতে পেরেছ?’

‘কেন চিনব না? তুমি তো রোজিনা ম্যাডামদের সিকিউরিটি স্টাফ।’

‘সরি, তোমার নামটা আমি কিন্তু জানি না।’

‘আমার নাম লারেইনা। আমাকে তুমি লানা বলেও ডাকতে পারো।’

‘লারেইনা কথাটার মানে কী?’

‘স্প্যানিশে লারেইনা কথাটার মানে হল, কুইন।’

‘তোমার বাবা-মা সঠিক নামটাই রেখেছেন। তোমাকে রানির মতোই দেখতে।’

শুনে খিলখিল করে হেসে উঠে লারেইনা বলল, ‘গ্রাসিয়াস’। ধন্যবাদ। ওর বান্ধবী ইতিমধ্যে বসে পড়েছে ছবি আঁকাতে। নিশ্চয়ই পনেরো-কুড়ি মিনিট সময় নেবে। ইমন বলল, ‘চলো, ছায়ায় গিয়ে বসি। তোমার সঙ্গে গল্প করা যাক।’

লারেইনা কিন্তু না করল না। কয়েক পা হেঁটে ওরা দু’জন বেঞ্চে এসে বসল। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে এক ঢোঁক খেয়ে লারেইনা সেটা এগিয়ে দিল ওর দিকে। তার পর বলল, ‘তুমি কি এখানে বেড়াতে এসেছ?’

ইমন বলল, ‘না। রোজিনা ম্যাডামের বাড়িতে মি. ন্যান্ডি বলে যে গেস্ট আছেন, তাঁকে আমি নিউ ইয়র্কে নিয়ে এসেছি। ঘন্টা দুয়েক পর তাঁকে নিয়ে ফের আমাকে নিউ জার্সিতে ফিরতে হবে। ইচ্ছে করলে তুমিও আমাদের সঙ্গে ফিরতে পারো।’

‘সম্ভব হবে না। নিউ মেক্সিকো থেকে আমার এক বান্ধবী এসেছে। ওই যে… সে এখন আর্টিস্টের কাছে বসে ছবি আঁকাচ্ছে। ওর জন্যই আমার সেন্ট্রাল পার্কে আসা। আমিও আগে কখনও এই পার্কে আসিনি। এ বার এসে খুব ভাল লাগল। পার্কের ভিতরটা কি তুমি ঘুরে দেখার সময় পেয়েছ? এখানে অনেকগুলো সুন্দর স্পট আছে।’

‘না, এখনও ভিতরে ঢুকিনি। আমি খুব অল্পদিন হল ইস্টকোস্টে এসেছি।’

‘তুমি কি বাংলাদেশি? তোমাকে আমি বাংলায় কথা বলতে শুনেছি।’

শুনে চমকে উঠল ইমন। জিজ্ঞেস করল, ‘বাংলা ভাষা নিয়ে তোমার আইডিয়া হল কী করে?’

‘রোজিনা ম্যাডামের মায়ের কাছ থেকে। হেমলতা আন্টি বাংলাদেশি, থাকেন নিউ মেক্সিকোতে।’

‘তুমিও কি নিউ মেক্সিকোর মেয়ে?’

‘হ্যাঁ। ওই স্টেটে আলবুকার্ক বলে একটা শহর আছে। আমি সেখানকার মেয়ে। সেখান থেকে রোজিনা ম্যাডাম আমাকে নিউ জার্সিতে নিয়ে এসেছেন। আমি নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে পড়ি। রোজিনা ম্যাডাম আমার পড়ার সব খরচা দেন। হায়ার এডুকেশনের জন্য এখানে প্রচুর খরচ।’

‘তুমি কী নিয়ে পড়ছ লারেইনা?’

‘ক্রিমিনাল সাইকোলজি। আমার স্বপ্ন এফবিআই অফিসার হওয়া। আগামী বছরই পরীক্ষায় বসব।’

‘পুলিশ অফিসার হওয়ার ইচ্ছে হল কেন তোমার?’

‘নিউ মেক্সিকোতে ড্রাগ ডিলারদের গুলিতে আমার বাবা মারা গিয়েছিলেন। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। অপরাধীরা কোনও শাস্তি পায়নি। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি পুলিশ অফিসার হব।’

‘রোজিনা ম্যাডামকে তুমি কতদিন ধরে চেনো?’

‘একেবারে বাচ্চা বয়স থেকে। ম্যাডামের ড্যাডির একটা বিশাল র‌্যাঞ্চ আছে আলবুকার্কে। আমার বাবা ওখানেই চাকরি করতেন সিকিউরিটি চিফ হিসেবে। রোজিনা ম্যাডাম অস্টিন ইউনিভার্সিটিতে বিজনেস ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশুনো করেছেন। র‌্যাঞ্চে যখন ছুটি কাটাতে যেতেন, তখন থেকেই উনি আমাকে চেনেন। বলতে পারেন, উনি আমার মেন্টর। আমি ম্যাডামের কাছে হর্স রাইডিং শিখেছি, আর্মস চালানোও। আপনি বোধহয় জানেন না, রোজিনা ম্যাডাম দেখতে নরম সরম হলেও, ভিতর ভিতর ভয়ানক টাফ। দু’হাতে পিস্তল চালাতে পারেন। তা ছাড়া, উনি ক্যারাটের ব্ল্যাকবেল্ট। র‌্যাঞ্চে যেসব ড্রাগ ডিলার ঝামেলা করত, তাদের উনি শায়েস্তা করতেন।’

শুনে ইমন খানিকটা অবাকই হল। ম্যাডামকে দেখে বোঝা যায় না, ওঁর এতসব গুণ আছে। চিরাগকে সাবধান করে দিতে হবে। ও যদি ম্যাডামের উপর বলপ্রয়োগ করতে যায়, তা হলে মুশকিলে পড়বে। চট করে ইমনের আরেকটা কথাও মনে এল। এই নিষ্পাপ মেয়েটা আবার চিরাগের কুনজরে পড়েনি তো? অনেকদিন যৌনসংসর্গ করেনি, এখন চিরাগ খ্যাপা কুত্তার মতো হয়ে আছে। সপ্তাহে দু’দিন করে লারেইনা মেয়েটা ওদের আউট হাউসে যায়। রুম ক্লিনিং করার জন্য অনেকটা সময় ওদের ঘরে থাকে। সেইসময় মেয়েটাকে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তো চিরাগ মুখ পোড়াবে। কথাটা মনে হওয়ার পর ইমন ঠিক করে নিল, এর পর থেকে লারেইনা যখন ওদের ঘরে যাবে, তখন চিরাগের উপর ও নজর রাখবে।

ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডামের মতো তুমিও কি মার্শাল আর্টস শিখেছ লারেইনা?’

‘হ্যাঁ। আমার সেলফ ডিফেন্সের সার্টিফিকেট নেওয়া আছে। থাই বক্সিং শিখেছি ট্রেনারের কাছে। ক্যারাটে ট্রেনিং নিচ্ছি। আমি যখন এফবিআইতে চাকরি করব, তখন এ সব আমার কাজে লাগবে।’

‘এত সময় পাও কখন?’

‘সময় করে নিতে হয়। আমার কথা ছাড়ো ইমন, এ বার তোমার কথা বলো।’

লারেইনা এমন আন্তরিকভাবে জানতে চাইল যে, ইমন ভুলে গেল ও নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে। ওর মনে হল, কুসম ওর পাশে বসে আছে। বাজিতপুরের বাদাবনে ওরা বেড়াতে গেছে। সফটওয়ার নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার দার্ঘদিন পর ও দেশের বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। কুসুম ওকে একই প্রশ্ন করছে, ‘অহন তোমার কথা কও ইমন।’

কানাঘুষোয় ইমন তখন শুনতে পাচ্ছে, রাজাকার হওয়ার অপরাধে ওর দাদামশয়কে পুলিশ যে কোনওদিন তুলে নিয়ে যেতে পারে। ওর মন তখন ভীষণ খারাপ। সেই পরিস্থিতিতে কুসুমকে কী উত্তর দেবে, ও ভেবে পাচ্ছিল না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে কুসুম বলেছিল, ‘অহন চাকরি করবা, না এম টেক করার কথা ভাববা। আমার আববু অবশ্য কইতাসিল, এথিক্যাল হ্যাকিং লইয়া তোমার এত ইন্টারেস্ট। হেইসাবজেক্টডা লইয়াই তোমার আরও আগোইয়া যাওয়া উচিত। তাইলে না কি ফিউচারে তোমার চাকরির অভাব অইব না। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে তোমার মারাত্মক ডিমান্ড অইব।’

কুসুমের কথাগুলো কেটে কেটে যাচ্ছে। বর্তমানে ফিরে এসে ইমন দেখল, উত্তরের আশায় লারেইনা সাগ্রহে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের সম্পর্কে সত্যি কথাটা বলার সাহস ওর নেই। ও একইসঙ্গে সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার, হ্যাকিং এক্সপার্ট, তালা ভাঙার জাদুকর, সর্বশেষে জিহাদি। কোন পরিচয়টা ও দেবে? আনমনা অবস্থায় ও সত্যি কথাটাই বলে ফেলল, ‘আমি ফার্স্ট ক্লাস সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। কপাল খারাপ, এখানে এসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করছি।’

উত্তরটা হাতড়ানোর সময়ই হঠাৎ ইমনের মনে হল, কাছের একটা বেঞ্চ থেকে ওদেরই বয়সি একটা ছেলে ওকে লক্ষ করে যাচ্ছে। গায়ের রং সিরিয়ানদের মতো। মুখ দাড়ি-গোঁফে ঢাকা। বেঞ্চে কিছু লিফটলেট রাখা আছে। পথচলতি মানুষকে ছেলেটা সেই লিফটলেট বিলি করছে। ভাল করে তাকাতেই ইমনের মনে হল, নাকের গোড়ায় তিল আছে। ছেলেটাকে ও কোথাও দেখেছে। কসোভোর ক্যাম্পে? না কি এখানে কোথাও? একটু ভাবতেই ওর মনে পড়ল, এই রকমই দেখতে একটা ছেলেটাকে ও পাবলিক স্টোরেজে দেখেছে। দু’তিনবার কামাল আর খামিসের কাছে এসেছিল। আজই গাড়িতে আসার সময়, কাইলকেতুছ্যারের বন্ধু ইন্টারপোলের অফিসার বলছিলেন, জিহাদিরা ওর আর চিরাগের পিছনে একজনকে লাগিয়েছে। তার নাম মামুন আল ফারখ। এ সেই মামুন না কি?

ছেলেটা মামুন হোক বা না হোক, ইমন ঠিক করে নিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে পার্ক থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। এত ভিড়ের মাঝে ছেলেটা নিশ্চয়ই ওকে আক্রমণ করার ঝুঁকি নেবে না। লারেইনাকে ঢাল করে পার্ক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় ও ভাবতে লাগল। ওকে বাঁচিয়ে দিল লারেইনার বন্ধু। ছবি আঁকা হয়ে গেছে। ছবি হাতে মেয়েটা কাছে এসে খুশিতে উচ্ছ্বল হয়ে লারেইনাকে বলল, ‘কী সুন্দর এঁকেছে, দেখো।’

ছবিটা দেখে লারেইনা হাসিমুখে বলল, ‘এটা তুই লিভিং রুমে বাঁধিয়ে রাখিস।’ তার পরই ইমনকে বলল, ‘এ আমার বান্ধবী আদেলিনা। মানেটা কী জানো, দয়ালু।’

আদেলিনা মেয়েটা চঞ্চল প্রকৃতির। বেঞ্চে বসে ওদের সঙ্গে আড্ডা মারার কোনও ইচ্ছেই দেখাল না। উল্টে একবার হাতঘড়ি দেখে নিয়ে তাগাদা দিল, ‘এই চল, আমাকে এখুনি কলম্বাস সার্কেলে যেতে হবে। ওখানে জনি অপেক্ষা করবে। বেলা তিনটের মধ্যে আমাদের ফ্যাশন অ্যাভিনিউতে পৌঁছতে হবে।’

শুনে লারেইনা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘তোমার কথা শুনে আমার খারাপই লাগছে ইমন। তুমি যদি ফ্রি থাকো, তা হলে বিকেল পাঁচটার সময় টাইমস স্কোয়্যারে আসতে পারো। আমার এই বন্ধুটা ফ্যাশন ডিজাইনার হতে চায়। সেই কারণেই ওর কোথাও অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। আমাদের এখুনি যেতে হবে।’

ইমন বলল, ‘আজ সময় হবে না। তবে এখন চলো, তোমাদের সঙ্গে আমিও কলম্বাস সার্কেল অবধি যাই।’

বেঞ্চ থেকে উঠে পা বাড়ানোর সময় ইমন আড়চোখে একবার দেখে নিল, লিফলেট বিলি করা ছেলেটাকে। না, ওদের পিছু নেওয়ার কোনও আগ্রহ ছেলেটার মধ্যে নেই। অন্যদিকে তাকিয়ে ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। নিশ্চিন্ত হয়ে লারেইনা আর আদেলিনার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল ইমন। মিনিট পাঁচেক হেঁটে বড় রাস্তার কাছে পৌঁছে ওর মনে হল, যেন ঢাকার মীরপুরে দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তায় লোকজনের ভিড়, যানজট। তফাৎ শুধু সাইকেল রিকশার ভেঁপুর শব্দদূষণ নেই। রাস্তার উল্টোদিকে এক পার্কোম্যাটে ও গাড়িটা রেখে এসেছে। মীরপুরের মতো গাড়ির ফাঁক দিয়ে গলে রাস্তার ও পারে যাওয়া যায় না। আমেরিকানরা তাড়াহুড়োও করে না। রাস্তা পেরোতেই ইমনের দশ মিনিট লেগে গেল। কলম্বাস সার্কেল থেকে লারেইনারা পাতাল রেল ধরার জন্য নিচে নেমে যাওয়ার পর ইমন ফের একবার পিছন ফিরে তাকাল। কিন্তু গোঁফ দাঁড়িওয়ালা ছেলেটাকে কোথাও দেখতে পেল না।

পার্কোম্যাট থেকে গাড়ি নিয়ে বেরনোর ঠিক পরই বড় রাস্তায় একজনকে দেখে ইমন তাজ্জব হয়ে গেল। ট্র্যাফিক সিগন্যালে ও দাঁড়িয়ে রয়েছে। কুসুমের মতো দেখতে একটা মেয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে। পরনে হলুদ রঙের টপ আর নীল জিনসের প্যান্ট। কুসুম না কি!! না, না, তা কী করে হবে? একটু আগে পার্কে বসে ও কুসুমের কথা শুনতে পাচ্ছিল। এখন চোখের সামনে ওকে দেখছে। এও কি সম্ভব? কুসুম কী করে নিউ ইয়র্কে আসবে? ইমন ভেবেই পেল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *