(উনচল্লিশ)
ভোর রাতে ভয়ানক একটা স্বপ্ন দেখেছে ইমন। কোথায় যেন একদল নেকড়ে ওকে তাড়া করেছে। প্রাণপন দৌড়তে দৌড়তে ও পাহাড়ের চূড়ায় উঠে, পিছন ফিরে দেখে নেকড়ের দল উধাও। দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। আগুনের লম্বা লম্বা শিখাগুলো যেন ফুঁসছে। দূরদূরান্তে কোথাও লোকালয়ের চিহ্ন নেই। গাছ-গাছালি নেই। আকাশটাও আগুন রংয়ের। দেখে ওর ভয় লেগে গেল। ছোটবেলায় দাদির মুখে ও শুনেছিল, যারা গুণাহ করে, তাদের ঠাঁই হয় দোজখে। সেখানে হাজার হাজার বছর ধরে আগুন জ্বলছে। এটা সেই দোজখ না কি? এখানে ওকে নিয়ে এল কে?
আতঙ্কিত হয়ে ইমন ফের পিছন দিকে তাকাতেই দেখতে পেল, আগুনের মধ্যে থেকে নেকড়েগুলো বিকটদর্শন মানুষের রূপ ধরে উঠে আসছে। কাছে এসে মুখে তারা গররর শব্দ করতে লাগল। তার পর ওর হাত ধরে টেনে, ছুড়ে ফেলে দিল আগুনের মধ্যে। আগুনের মধ্যে দিয়ে ইমন নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। দাদি বলেছিল, দোজখ এমন একটা গর্তের মধ্যে, উপর থেকে কোনও পাথর ফেললে, সেখানে পৌঁছতে সত্তর বছর সময় লেগে যায়। আগুনে পুড়ে খাক হতে হতে ইমন বুঝতে পারল, ওর ধারণাই ঠিক। আল্লা তালাহর বিধানে ও পাপী সাব্যস্ত হয়েছে। আগামী উনসত্তর হাজার বছর ওকে এই অগ্নিকুণ্ডের মধ্যেই কাটাতে হবে। দাদি বলত, দোজখের সাতটা দ্বার। জহিম, লাজাহ, সাকর, খুতামোহ এবং তার পর খাবিয়া। এই পঞ্চম দ্বারে ফরেস্তা এসে ওকে আগুন খেতে বলবেন। তার পর সাইর, যেখানে ওকে পেরোতে হবে তিনশোটা আগুনের পর্দা। ওর শরীর তখন কাঠকয়লার রূপ নেবে। একেবারে শেষের দ্বার হল জাহান্নুম। শাস্তির শেষ গন্তব্য।
অত ঠান্ডায় কম্ফর্টারের তলায় শুয়ে ইমন দরদর করে ঘামছে। ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসার পর অনেকক্ষণ ঠকঠক করে কেঁপেছে। জীবদ্দশায় দোজখ দর্শন ভাল লক্ষণ না। নিশ্চয়ই কোনও একটা মারাত্মক কিছু ঘটতে যাচ্ছে ওর জীবনে। চিরাগ থাকলে ও ব্যাখ্যা করতে পারত। কিন্তু ও এখন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে পুলিশ কাস্টোডিতে। অন্ধকার ঘরে বিছানায় বসে চোখ খুলতেই ভরসা পেল না ইমন। পাছে দোজখের ওই বিকটদর্শন লোকগুলোকে আবার দেখতে হয়। খানিকক্ষণপরেই ওয়ার্বলার পাখির ডাক শুনে ও স্বস্তি পেল। চড়ুইয়ের মতো দেখতে পাখিগুলো ভোরবেলায় এ গাছ থেকে ও গাছ উড়ে বেড়ায়। তার মানে ভোর হয়ে গেছে। আর ও নিউ জার্সিতে পলাশছ্যারের বাড়িতেই আছে।
বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলে ইমন দেখতে পেল, আগুন নয়। লন জুড়ে হালকা সাদা কুয়াশা। মেন বিল্ডিংটা যেন মসলিন দিয়ে কেউ ঢেকে রেখেছে। কিন্তু ছবির মতো বাসাটা মৃত্যুপুরীর মতো মনে হচ্ছে। যেন কোনও দুঃসংবাদের অপেক্ষায়। হঠাৎ কেন যে ওর এ কথাটা মনে হল, ইমন বুঝতে পারল না। পলাশছ্যাররা ছুটি কাটিয়ে কবে ফিরে আসবেন, ও জানে না। যেন সহি সলামাত ফিরে আসেন। ওর আসল পরিচয় জানার পরও পলাশছ্যার ছুঁড়ে ফেলে দেননি। উল্টে, ওকে বাঁচানোর জন্য ডালাসে চলে যেতে বলেছেন। অন্য কেউ হলে কিন্তু, পুলিশের হাতে তুলে দিতেন। মানুষটার মনে এত দয়া! ইমন ভেবে রাখল, এর পর যেখানেই পলাশছ্যারের সঙ্গে ওর দেখা হোক না কেন, ছ্যারের দু’পা ও চেপে ধরবে। অনুরোধ করবে, ‘ছ্যার, আমারে দ্যাশে নিয়া চলেন। হারাডা জীবন আফনের গোলাম হইয়া থাকুম।’
কম্ফর্টার জড়িয়ে ইমন বারান্দায় বেরিয়ে এল। পরশু রাতে ঠিক এইখানটাতেই চিরাগের উপর জমা রাগ ও উগড়ে দিয়েছিল। তার পর ওর অচেতন দেহটাকে সিদানে তুলে চলে গেছিল মেট্রো পার্ক স্টেশনের কাছে। ইচ্ছে করলে ওকে মেরে ফেলতে পারত। কিন্তু পাপের ভাগী হতে চায়নি। আল্লা তালাহ-র দুনিয়ায় ও শাস্তি দেওয়ার কে? চিরাগ একজন রেপিস্ট, মার্ডারার… ওকে জাহান্নুমে পৌঁছে দেওয়ার বিচার আল্লাহ ঠিকই করবেন। ইমন যে গর্হিত কাজটা শুধু করেছিল, সেটা হল, ঘৃণা উগড়ে দেওয়ার জন্য চিরাগের শরীরে থুতু ছিটিয়েছিল। তার পর স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠে, উপর থেকে লক্ষ রাখছিল, পুলিশ কখন বডিটা তুলে নিয়ে যাবে। আকাশে আলো ফুটতে না ফুটতেই পুলিশের অ্যাম্বুল্যান্স এসে চিরাগের বডিটা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ইমন বাসায় ফিরে আসে। তার পর বারান্দা থেকে রক্তের দাগ মুছেছিল।
বারান্দার সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে ইমন আরও একবার নিশ্চিন্ত হতে চাইল, রক্তের কোনও চিহ্ন পড়ে আছে কি না। আপাতদৃষ্টিতে নেই। কিন্তু ইমন জানে, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা কোনও একটা কেমিক্যাল স্প্রে করে থাকেন। তাতেই বুঝে যান, রক্তপাত হয়েছিল কি না? কাল বিকেলবেলায় পুলিশ যখন চিরাগের খোঁজে এ বাড়িতে আসে, তখন ইমন আউট হাউসে কম্পিউটার নিয়ে ব্যস্ত। পলাশছ্যারের এক্সপোর্ট কোম্পানির নেটওয়ার্ক মেরামত করার জন্য। পুলিশ দেখে ওর উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। কিন্তু কালকেতুছ্যারের বন্ধু সুদীশছ্যারকে দেখে ও ঘাবড়ায়নি। মানুষটা আউট হাউস সার্চ করে কিছুই পাননি। চিরাগ সম্পর্কে দু’চারটে কথা জিজ্ঞাসা করেই উনি চলে গেলেন। ইমন ওঁকে সেই গল্পই করেছে, যা পলাশছ্যারকে বলেছিল। ওদের আলাপ পাবলিক স্টোরেজে। চাকরি গিয়েছে একই দিনে।
বারান্দায় বসে লনে খরগোশ আর কাঠবেড়ালির খেলা দেখতে দেখতে ইমন শুনতে পেল, ওর সেল ফোনটা বাজছে। এত সকালে কে ওকে ফোন করতে পারে? পুলিশের নয় তো? উঠে গিয়ে দেখল, ভিডিয়ো কল। সেল ফোনের পর্দায় আম্মিকে দেখে ইমন চমকে উঠল। আম্মির সঙ্গে ও শেষবার কথা বলেছিল, দাদামশায়ের তখন ট্রায়াল চলছে। তাও প্রায় এক বছর হতে চলল। তখন আম্মির উদ্বিগ্ন মুখটা দেখে ওর মন খারাপ হয়ে গেছিল। আম্মির চোখের কোণে কালি, শুষ্ক মুখ। পরনে ছিল সাধারণ ছাপা শাড়ি। যা গরিব ফ্যামিলির বউ-ঝিরা পরে। কিন্তু আজ আম্মির পরনে সাদা কারুকাজ করা জামদানি শাড়ি। ফলে আগেকার আভিজাত্য ফিরে এসেছে। আম্মিকে খুব সুন্দর লাগছে দেখতে।
কিন্তু আম্মি ওর এই ফোন নাম্বারটা পেলেন কী করে? সেল ফোনটা ওকে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন পলাশছ্যার। ওঁর মাথায় হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত খেয়াল চাপে। একদিন নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার পথে ছ্যার জানতে চেয়েছিলেন, ‘দ্যাশে ফেমিলির কারও সাথে যোগাযোগ আছে? না হি খোঁজই নাও না।’ ইমন বলেছিল, ‘আমার ফোন নাই ছ্যার।’ পরের দিনই সেল ফোনটা গিফট করে পলাশছ্যার বলেছিলেন, ‘এই নাও। রুজ আববা-আম্মির সাথে কথা কইবা। হ্যাগো কুনও বিকল্প নাই। এত দূরে আসো, দ্যাখবা, মনে শান্তি পাইবা।’ না করতে পারেনি ইমন। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমোদপুরে ফোন করার ইচ্ছে হয়নি ওর।
ও প্রান্ত থেকে আম্মি জিজ্ঞেস করল, ‘ক্যামন আছস বাবা?’
শুনেই চোখে পানি এসে গেল ইমনের। গলার ভিতর একদলা বাষ্প আটকে গেল। কোনও রকমে ও প্রশ্ন করল, ‘আপনে আমার ফোন নাম্বার পাইলেন কুথায় আম্মি?’
‘কুসুমের আববু আইসে আমাগো বাসায়। হ্যায় তর নাম্বারটা ধইর্যা দিয়া কইল, আফনে ইমনরে চইল্যা আইসতে ক’ন আপা। ফতিমার নিকাহ-র আগে হ্যায় য্যান দ্যাশে ফেরে।’
ছোটবোন ফতিমার নিকাহ! শুনে ইমন ভুলেই গেল প্রশ্নটা করতে, কুসুমের আববু আমার ফোন নাম্বার পাইল কী কইর্যা? তার বদলে বলল, ‘কোথায় ঠিক হইল হ্যার বিয়া?’
আম্মি বলল, ‘তর দাদামশায় ঠিক কইর্যা গেসিলেন। নারাণগঞ্জের পোলা… আফতাব। হ্যায় আবার কুসুমের ক্লাসমেট। কুসুমগো বাসায় আফতাব না হি ফতিমারে একবার দ্যাখসিল। তহনই পসন্দ কইর্যা ফ্যালে। হ্যাগো ফেমিলির সবাই আমাগো বাসায় আইসিল। তহনই কথাবার্তা হব হইয়্যা যায়। তর আববুর শরীল ভালা না। কবে চইল্যা যাইব দিন গুনতাসে। তুই দ্যাশে আয় বাবা।’
ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘ট্যাহা পয়সা জোগাড় কইরলেন কী কইর্যা?’
‘যা আমাগো কাসে আসে, হইয়া যাইব। আফতাবের আববু এমন ভালামানুষ, আমাগো বাসায় আইস্যাই কইল, চৌধুরী মঞ্জিল থেইক্যা মাইয়া লইয়্যা যাম, হ্যায় আমাগো ভাইগ্যের কথা। মতিউর সাহেব আমাগো জইন্য অনেক করসেন। হ্যার ফাঁসি দিয়া গর্ভমেন্ট অন্যায় করসে। আফনে রাজি হইয়া যান। ফতিমারে আমরাই সাজাইয়া গুজাইয়া লইয়্যা যাম।’
শুনে ইমন একটু শান্তি পেল। তা হলে দেশে এমন মানুষও আছেন, যাঁরা রাজাকার ফ্যামিলি বলে ওদের ঘেন্না করেন না। ও জিজ্ঞেস করল, ‘আফতাব কী করে আম্মি?’
‘এমবিএ কইর্যা, অহন একডা এক্সপোর্ট কোম্পানিতে চাগরি করে। কুসুমের আববু কইল, প্রায়ই না হি ফরেনে যায়। পোলাডারে আমারও পসন্দ হইসে বাবা। আফতাব কইত্যাসিল তরে না হি চেনে। কুসুমের সাথে তরে না হি অনেকবার দ্যাখসে। ও তরে খুব রেসপেক্ট করে। তুই আইলে নিকাহর দিন ঠিক করুম বাবা। কুসুমও কইসে, সেই সময় দ্যাশে ফিরব।’
শুনে ইমন একটু অবাকই হল। কুসুম দেশে ফিরবে মানে? ও কি দেশের বাইরে? প্রশ্নটা করবে না করবে না, ভেবেও ও করে ফেলল, ‘কুসুম অহন কোথায় আম্মি?’
‘হ্যায় তো নিউ ইয়র্কে। যুগযুগান্ত বইল্যা খবরের কাগজের রিপোর্টার হইসে। তুই যেহানে থাকস, নিউ ইয়র্ক থেইক্যা কত দূরে রে?’
‘অনেক দূর আম্মি।’ লস অ্যাঞ্জিলেসের দূরত্ব আন্দাজ করে ইমন বলল, ‘প্লেনেই প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মতো লাগে। কিন্তু কুসুম চাগরিডা পাইল কী কইর্যা?’
‘হেইডা জানি না বাবা। মাইয়্যাডা এত ভালা, প্রায়ই ফোন কইর্যা আমার খোঁজখবর নেয়। তর কথাও জিজ্ঞাস করে। তর যে কী অইল, হ্যার মতো একডা মাইয়্যারে দাগা দিয়া চইল্যা গেলি। তুই ফিইর্যা আয় বাবা। তগো চাইর হাত এক কইর্যা নিশ্চিন্তে মাটির নিচে যাই।’
আম্মির কথা শুনে নিউ ইয়র্কের ট্রাফিক সিগন্যালে দেখা সেই মেয়েটাকে ইমনের মনে পড়ল। ওকে দেখে কুসুমের মতো মনে হয়েছিল। তা হলে ও-ই কুসুম! আম্মি চার হাত এক করার কথা বলছেন। সম্ভব? ওর নামের সঙ্গে জহ্লাদ চিহ্নটা জুড়ে গেছে যে! এফবিআই ধরলে কতদিন নিউ ইয়র্কের জেলে ওকে পচতে হবে, কে জানে? মাঝে পাঁচ-পাঁচটা বছর কেটে গেছে। তা সত্ত্বেও, কুসুম ওর খোঁজ নেয়। এই কথাটা আম্মির কাছে জেনে ইমনের বুকের ভিতরটা কুসুমের জন্য হু হু করে উঠল। আবেগ ওকে টানতে শুরু করল, দেশের দিকে। কিন্তু যুক্তি বলল, চেষ্টা করিস না। তর পক্ষে দেশে ফেরা কোনওমতেই সম্ভব না ইমন। হয় তর মৃত্যু অইব জিহাদিগো বুলেটে। না হয় সুদীশ ছ্যারেরা তরে টাইন্যা হিঁচড়্যা লইয়্য যাইব জেলে।
সরাসরি না বলে দিয়ে আম্মিকে দুঃখ দিতে চাইল না ইমন। ও বলল, ‘আম্মি আমার মালিকরে রিকোয়েস্ট করুম। উনি যদি সুটি দেন, তা ইলে দ্যাশে ফিরতেও পারি। আপনে আমার জন্য ফতিমার বিয়া ঝুলাইয়া রাইখবেন না। ফতিমা কি কাসাকাসি আসে? তাইলে দ্যান, হ্যার সাথে কথা কই।’
আম্মি বললেন, ‘হ্যায় বাসায় নাই। ঢাকায় খালার কাছে গ্যাসে। অহন খুব খুশি। আর হোন, কুসুমের আববু জাইনতে চাইতাসেন, আমেরিকায় তুই কোন শহরে থাকস?’
‘কহন কোথায় থাকি, ঠিক নাই আম্মি। আমারে অহন মালিকের সাথে ডালাস বইল্যা একডা জায়গায় যাইতে অইব। নিচে অরা ওয়েট করতাসেন। আফনেরা ভালা থাইকেন। আমি ছাড়ি।’ শেষ কথাটা বলার সময় ইমনের গলা ধরে এল। ও জানে, কোনওদিনই আর ও ফোন করবে না। ফোন এলেও হয়তো ধরার সুযোগ পাবে না। জট পাকিয়ে গেছে ওর জীবনে। পাছে কুসুমের আববু কথা বলতে চান, সেই ভয়ে ইমন তাড়াতাড়ি লাইন কেটে দিল। তখনই ওর মনে প্রশ্নটা ফিরে এল, কুসুমের আববু ওর ফোন নাম্বারটা পেলেন কোথা থেকে? চিন্তা করার সময় ওর একবার পলাশছ্যারের কথা মনে এল। রোজিনা ম্যাডাম আর কালকেতুছ্যারের কথাও। কেননা, এঁরা তিনজন ছাড়া ফোন নাম্বার আর কেউ জানেন না। পরক্ষণেই সন্দেহটা মন থেকে ইমন সরিয়ে দিল। অ্যাবসার্ড। কুসুমের আববুকে ওঁরা চিনবেন কী করে? তা হলে কি রোহিত? নাহ, ওয়ালমার্টে ও রোহিতের ফোন নাম্বারটা নিয়েছিল বটে, কিন্তু নিজের নাম্বারটা রোহিতকে দেয়নি।
নিউ জার্সির আকাশে ঘন মেঘ। ওয়েদার ফোরকাস্ট আছে, সকাল ন’টা থেকে বৃষ্টি হতে পারে। তার আগে ঝোড়ো বাতাস বইবে। এই বাতাসটাই ডেঞ্জারাস। বারান্দা থেকে উঠে এসে ইমন কম্ফর্টারটা ভাঁজ করে তুলে রাখল বিছানায়। গোসল করার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নায় ও দেখল, খোঁচা দাড়ি বেরিয়েছে। খোঁচা দাড়ি একেবারেই পছন্দ করত না কুসুম। ওর সঙ্গে কোথাও দেখা করতে গেলে, ইমন শেভ করে যেত। কুসুমই ওকে শেভিং লোশন উপহার দিত। ব্র্যান্ডের নাম এখনও ইমনের মনে আছে… ব্রুট। গন্ধটা গালের সঙ্গে অনেকক্ষণ লেগে থাকত। ব্রুট লাগানোর পর একবার কুসুমের গালের সঙ্গে নিজের গাল ঘসে দিয়েছিল ইমন। তাতে মারাত্মক রেগে কুসুম বলেছিল, ‘এই র’ম অসভ্যতা কইরলে আর তোমার কাসে আসুম না।’ কত তুচ্ছ একটা ঘটনা। হঠাৎ মনের ভিতর জানান দিয়েই মিলিয়ে গেল।
পলাশছ্যার ওকে ডালাস যেতে বলেছেন। হয়তো আর এখানে ফিরে আসা হবে না। ওর পোশাক-আশাক, নিত্য ব্যবহার্য জিনিস যা কিছু আছে, সব গুছিয়ে নিতে হবে। দাঁড়ি কামাতে কামাতে ইমন প্ল্যান করে নিল। ছয়-সাতটা স্টেট পেরিয়ে ওকে টেক্সাসে পৌঁছুতে হবে। ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, কেনটাকি, টিনেসি, আরকানসাস… তার পর টেক্সাস। দূরত্ব প্রায় দেড় হাজার মাইলের মতো। কুঁয়াশা বাধ না সাধলে প্রায় পনেরো-ষোলো ঘণ্টার ড্রাইভ। রাতের দিকে ট্রাভেল করলে ট্রাফিকের ঝামেলা নেই। সময় একটু কম লাগতে পারে। পুলিশকেও এড়ানো যাবে। মুখ-চোখে জল দেওয়ার সময় ইমন স্থির করে রাখল, সন্ধে হলেই ও বেরিয়ে পড়বে।
তার আগে পলাশছ্যারের অসমাপ্ত কাজটা ওর সেরে ফেলা দরকার। বিছানার উপর ইমন ল্যাপটপ খুলে বসল। কাল রাতে অনেকক্ষণ ধরে ও চেষ্টা করেছিল হ্যাক করার। এ খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো কঠিন। তবে হ্যাকিংয়ের কাজ খানিকটা সহজ করে দিয়েছিল মামুন। ল্যাপটপের পাশে একটা কাগজের চিরকুটে কোডের অসংখ্য পারমুটেশন ও কম্বিনেশন। মনে হয়, চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টস হ্যাক করার কাজটা মামুন শুরু করেছিল অনেকদিন আগে। নেটওয়ার্কে ঢোকার পাসওয়ার্ড কেউ ওকে সাপ্লাই করেছিল। নিউ জার্সিতে আসার পর চিরাগই সম্ভবত ওর মাথায় ঢোকায়, যতটা পারো, পলাশছ্যার আর রোজিনা ম্যাডামের সর্বনাশ করো। ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টস ইমন মেরামত করে দিয়েছে। এখন পলাশছ্যারের উপকার ফিরিয়ে দেওয়ার পালা ওর।
চিরকুট থেকে পলাশছ্যারের কোম্পানি শিউলি এক্সপোর্টস-এর পাসওয়ার্ড খুঁজতে লাগল ইমন। ঘণ্টা তিনেক কঠিন চেষ্টার পর আল্লার মর্জিতে ও শেষপর্যন্ত বেরও করে ফেলল। বিরাট একটা দুঃশ্চিন্তার ভার মাথা থেকে নেমে যেতেই ওর খিদে পেয়ে গেল। কাল রাতে ওর কপালে শুধুমাত্র ম্যাক ডি-র একটা বার্গার জুটেছিল। ফ্রিজ খুলে ও দেখল, আপেল, আঙুর আর কলা পড়ে আছে। আপেলে কামড় দিতেই… এত ঠান্ডা সেটা, ওর দাঁতে কনকনানি শুরু হয়ে গেল। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনতে কিছুটা সময় নেবে। আপেল টেবলের উপর রেখে, কম্পিউটারের পর্দায় চোখ দিতেই ইমন দেখল, তিনদিন আগে শিউলি এক্সপোর্টস-এর অ্যাকাউন্টস থেকে বিরাট অঙ্কের ডলার আলবুকার্কের একটা ব্যাঙ্কে ট্রান্সফার করা হয়েছে। ওই অ্যাকাউন্টের মালিক হেমলতা দেল বস্কে। রোজিনা ম্যাডামের কোনও রিলেটিভ হবেন। কেননা, ম্যাডামেরও পদবি দেল বস্কে। ইমন বুঝতে পারল না, চিরাগই যদি মামুনকে দিয়ে হ্যাকিং করায়, তা হলে ডলার হেমলতা দেল বস্কের অ্যাকাউন্টসে যাবে কেন? তা হলে কি হ্যাকিংয়ের পিছনে অন্য কেউ?
পলাশছ্যার কি এই মানি ট্রান্সফারের কথা জানেন? ওঁর মেল চেক করলেই তা জানা যাবে। মেল খুলে ইমন খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে গেল। ব্যাবসাজনিত অসংখ্য মেল। প্রতিটা ওপেন করে দেখতে গেলে সারাটা দিন লেগে যাবে। বেছে বেছে কয়েকটা মেল খুলে ও অবাক হয়ে দেখল, মাসখানেক আগে ছ্যার ঢাকায় ওর দুটো শপিং মল আর চা বাগানগুলো বেচে দেওয়ার জন্য কয়েকজনের সঙ্গে দর কষাকষি করছেন। গারমেন্টস কোম্পানিগুলোও হাত থেকে ছেড়ে দেওয়ার কথাবার্তা চালাচ্ছেন। মেলগুলো পড়তে পড়তে, ইমনের আশঙ্কা হল, পলাশছ্যার বোধহয় কোনও কারণে আর বাংলাদেশে থাকতে চাইছেন না। অথবা থাকতে পারছেন না। ছ্যার রোজিনা ম্যাডামের পরামর্শ মতো চলেন। তা হলে কি উনি এসব রোজিনা ম্যাডামের কথায় করছেন? হয়তো রোজিনা ম্যাডামকে বিয়ে করে এখানেই উনি সংসার পাততে চান। মন্দ কী? দু’জনকে সুন্দর মানাবে।
বাইরে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। গাছ-গাছালির শনশনানির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে ভিতরে বসেই। শিলাবৃষ্টির কারণে জানালার কাচগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম। যেন কেয়ামতের দিন এসে গেছে। বাসার চার পাশে অসংখ্য দেবদারু আর পাইন গাছ। একটা ভেঙে পড়লে আউট হাউস গুঁড়িয়ে যাবে। নির্জন ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে ইমনের মনে হল, হ্যাকিং যেন দোজখ যাত্রার মতো। লোভের আগুনের দ্বার একটার পর একটা পেরিয়ে যেতে বাধ্য করে। কৌতূহল মেটাতে মেটাতে রোজিনা ম্যাডামের লিঙ্ক পেয়ে গেল ইমন। কী খেয়াল হল, ম্যাডামের ডেটা ও হ্যাক করতে লাগল। ইয়াআল্লাহ, এ কী দেখছে ও? পলাশছ্যারের সব সম্পত্তি তো রোজিনা ম্যাডাম গ্রাস করে নিচ্ছেন! পলাশছ্যার কি তা বুঝতে পারছেন না?
