জিহাদি – ৩৩

(তেত্রিশ)

নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ জার্সিতে ফেরার পথে ইমন একবার ওয়ালমার্টে গাড়ি পার্ক করল। বেলা দুটো বাজে। কিছু খাবার কিনে নেওয়া দরকার। পলাশছ্যারেরা কবে ফিরবেন, তা জানা নেই। নিজেদের উদরপূর্তির ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। পার্কিং স্পেস থেকে হেঁটে ওয়ালমার্টের ভিতর ঢোকার সময় ও রোহিতকে দেখতে পেল। ট্রলি ঠেলে এগোচ্ছে। পিছন থেকে ও ডাকল, ‘এই রোহিত, রোহিত।’

যেন শুনতে পায়নি, এমন ভাব করে রোহিত এগিয়ে যেতে লাগল। দ্রুত পা চালিয়ে কাছে গিয়ে ইমন বলল, ‘এ্যাই হালা, ডাকতাসি, হুনোস না ক্যান?’

আগের দিন দেখা হওয়ার পর রোহিতের চোখ-মুখে উচ্ছ্বাস লক্ষ করেছিল ইমন। আজ শুকনো মুখে বলল, ‘শুনব না কেন? তোর সঙ্গে কথা বলতে আমার ভয় হচ্ছে ইমন। প্লিজ, তুই যা।’

শুনে ইমনের মনে হল, কেউ ওকে শুকনো জমিতে আছাড় মেরেছে। আহত গলায় ও বলে উঠল, ‘কী কইতাস তুই? কী হইসে খুইল্যা আমায় ক’ ভাই।’

এ দিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে রোহিত বলল, ‘সেদিন তোর সঙ্গে দেখা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ এসে হাজির হয়েছিল আমার বাসায়। তোর ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করছিল। পুলিশ বলল, তুই না কি জিহাদি হয়ে গেছিস!’

চিরাগের মতো স্মার্ট হয়ে গেল ইমন। বলল, ‘আইশ্চর্য! তর সাথে দেখা হওয়ার পর পুলিশ তো আমারও কাসে আইসিল। তর সম্পক্কে আমারে একই কথা জিগাইল। এক কাম কর, আমি জিহাদি কি না, আমার অফিসে খোঁজ নিয়ে দ্যাখ। তাইলেই ট্যার পাবি।’

‘কেন মিথ্যে কথা বলছিস ইমন? তোর অফিসে খোঁজ করেছিলাম। টয়োটা কোম্পানি থেকে বলল, তোর নামে ওদের কোনও এমপ্লয়ি নেই। প্লাস, এই ওয়ালমার্টের সিসিটিভির ফুটেজ পুলিশ আমায় দেখিয়েছে। তুই আর আমি যখন রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছিলাম, সেইসময়কার ছবি। পুলিশ তোকেই খুঁজছে। ইসস, আমি ভাবতেই পারছি না, আমার কলেজের একজন টপার, সে জিহাদি হয়ে মানুষ খুন করে বেরাচ্ছে। মাসি এ কথা জানতে পারলে হয়তো মরেই যাবে। মাসি-মেসোর জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে।’

ইমন বলল, ‘তর কোথাও ভুল হইতাসে। চল, তর সাথে আমি পুলিশের কাসে যাম।’

রোহিত পাত্তাই দিল না কথাটার, ‘থাক ভাই। বউ-বাচ্চা নিয়ে সংসার করি। অনেক কষ্টে একটা চাকরি জোগাড় করেছি। তোর জন্য সব ভেসে যাক, আমি চাই না। প্লিজ, তুই যা। দেখা হলে আর কখনও আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করিস না।’

কথাটা বলেই ট্রলি ঠেলে সবজির দোকানগুলোর দিকে হাঁটা দিল রোহিত। সেদিকে তাকিয়ে ইমনের মাথা নিঁচু হয়ে গেল। কেনাকাটা করার ইচ্ছেটাই ওর উবে গেল। ওর আসল পরিচয় রোহিত জেনে গেছে। খবরটা আমোদপুরে পৌঁছতে সময় নেবে না। আম্মি খুব ধর্মভীরু টাইপের। দাদামশয়ের ফাঁসির পর বিরাট একটা শক পেয়েছে। ওর সম্পর্কে খবরটা মৃত্যুশেল হয়ে যাবে আম্মির কাছে। কেনাকাটার ইচ্ছেই উবে গেল। পার্কিং স্পেসে ফিরে আসার সময় ওর লায়লার কথা মনে হল। ইমন জানে না, পুলিশের কাছে জবানবন্দি দেওয়ার সময় লায়লা কতটা রেখে ঢেকে বলেছে। পুলিশ খুঁচিয়ে ওর পেট থেকে কথা বের করে নেবেই। আর তখন চিরাগের খোঁজ করতে এসে পুলিশ ওকেও ছাড়বে না।

কাম হোয়াট মে। ভাবতে ভাবতে একটা ঘোরের মধ্যে গাড়ি চালিয়ে ইমন পলাশছ্যারের বাসায় এসে পৌঁছল। চিরাগ ইতিমধ্যে ফিরে এসেছে কি না, ও নিশ্চিত নয়। একটু পরেই ওর মনে পড়ল, গেটের রিমোট কন্ট্রোল তো ওর কাছে। চিরাগ বাসায় ঢুকতেই পারবে না। গাড়ি গ্যারেজ করে ও আউট হাউসে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। ইস, পলাশছ্যারেরা বাসায় ফিরে যখন চিরাগের কুকর্মের কথা জানতে পারবেন, তখন এক মিনিটও দেরি করবেন না, দু’জনকেই বের করে দিতে। রোজিনা ম্যাডামের যা মেজাজ, তাতে পুলিশ ডেকে ধরিয়েও দিতে পারেন। পরক্ষণেই একটা কথা ভেবে ইমনের গা হিম হয়ে গেল। বাসার বাইরে থাকলেও তো বাসার ভিতর কোথায় কী হচ্ছে, পলাশছ্যার তা জেনে যান। এমন অ্যাপস না কি ওঁর ঘড়ির সঙ্গে ফিট করা আছে। আগের বার চিরাগকে অপদস্থ করেছিলেন, লুকিয়ে বাসার ভিতর ঢোকার জন্য। এ বারও কি ওঁরা জেনে গেছেন, আউট হাউসে কী ঘটেছে?

বিছানায় শুয়ে থাকার সময় হঠাৎ ইমনের মনে পড়ল, চিরাগের বিছানার তলা থেকে উদ্ধার করা ক্যালিফের ভাষণ দেওয়া সিডি আর কিছু জিহাদি লিফলেট গাড়ির ভিতর পড়ে রয়েছে। বাইরে কোথাও ফেলে দিয়ে আসার জন্য ও সেগুলো নিয়ে গেছিল। কিন্তু রোহিতের কথাবার্তা শুনে এত আপসেট হয়ে পড়ে, ভুলেই গিয়েছে সিডিগুলোর কথা। দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে ইমন ঘরের ভিতর তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল, আরও আপত্তিকর কিছু পাওয়া যায় কি না? ডিপ ফ্রিজ খুলে ও দেখতে পেল, পিস্তলটা লুকোনো রয়েছে। হাতে নিয়ে চেম্বার খুলে ও দেখল, ছটা গুলিই আছে। সঙ্গে সঙ্গে ও পিস্তলটা পকেটে পুরে নিল। চিরাগ কি নিচে চোরাকুঠুরিতেও কোনও অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে? হয়তো সকালে চোখে পড়েনি। তবুও, যাচাই করার জন্য, ইমন ফের সুইচ টিপে সোফা সরাল।

চোরাকুঠুরির অফিস ঘরে ঢুকে দুটো ল্যাপটপের দিকে তাকাতেই ইমন বুঝতে পারল, একটা কেউ ব্যবহার করছিল। উঠে যাওয়ার আগে বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছে। তা হলে কি মামুন? কারও সিস্টেমে হ্যাকিং করছিল না কি? কার সর্বনাশ করছিল? কৌঁতূহল হতেই ওর আঙুলগুলো সচল হয়ে উঠল। উইন্ডোস কম্পিউটার নিয়ে কাজ করতে ও স্বচ্ছন্দ। কয়েক মিনিট ঘাঁটাঘাটি করার পর ইমন বুঝতে পারল, মামুন হ্যাকিং করার জন্য ওয়ারশার্ক সফটওয়ার ব্যবহার করেছে। কর্পোরেট তথ্য চুরি করে, প্রতিদ্বন্ধী কোম্পানিকে সেই তথ্য বেচে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই সফটওয়ার কাজে লাগে। ল্যাপটপের পাশে একটা পেনড্রাইভ পড়ে আছে। সেটাকে ল্যাপটপে ঢুকিয়ে খানিকক্ষণ পরই ইমন পর্দায় দেখতে পেল প্রতিষ্ঠানের নাম। চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন টয় ডিভিশন। আরে, এটা তো সেই ম্যাডামের অর্গানাইজেশন, যাঁকে চিরাগ খুন করতে গেছিল নায়গারায়। কী যেন নাম? লিলি গডউইন। ছিঃ, জিহাদিরা এত নিচে নাইম্যা গ্যাসে! বাচ্চা পোলাপানগো ভালা-র জন্য একডা অর্গানাইজেশন, হ্যার ট্যাহাও চুরি করত্যাসে?

ভদ্রমহিলার সঙ্গে কালকেতুছ্যারের ভাল পরিচয় আছে। ছ্যারকে জানিয়ে দিলে লিলি গডউইন বড় ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে যাবেন। পেন ড্রাইভে টয় ডিভিশনের সব ডেটা তুলে নিয়েছে মামুন। বিশেষ করে মার্কেটিং আর সেলস-এর সব তথ্য। অন্য যে কোনও খেলনা কোম্পানির হাতে দিলে তারা লুফে নেবে। ক্রিসমাস ইভ-এর রাতে অপারেশনের জন্য বেরোনোর মুখে মামুন পেন ড্রাইভটাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। ভেবেছিল, ফিরে এসে নিশ্চিন্তে বাকি সব ডেটা বের করে নেবে। ইমন গাল দিল, ‘চুইতমারানির পোলা, ভাবসিলি পার পাইয়া যাবি। আরে, তর বাপ এহানে বইস্যা আসে। যা গরমিল করছস, এহানে বইস্যাই আমি ঠিক কইর‌্যা দিমু।’

অতীতে ঢাকায় বহুবার বহুলোকের সাহায্যে এসেছে ইমন। খচ্চর প্রোগ্রামারদের শায়েস্তা করার জন্যও অনেকে ওকে নিয়ে যেতেন। বিশেষ করে, কর্পোরেট জগতের লোকজন। প্রোগ্রামারদের উপর নজরদারির কাজটা ওকে দিয়ে বিনে পয়সায় করিয়ে নিতেন। দু’একবার বাংলাদেশ রাইফেলসকেও ইমন সাহায্য করেছে। একটা লিঙ্ক ধরিয়ে দিয়ে ওরা জানতে চেয়েছিল, হ্যাক করে বলে দিতে হবে, দু’দেশের মধ্যে কী কী অস্ত্র কেনা-বেচা হয়েছে। দেশের সুরক্ষার প্রশ্ন। ইমন কাজটা করে দিয়েছিল। নিজেকে অপার ক্ষমতার অধিকারী বলে ওর মনে হয়েছিল। সারা বিশ্ব যেন হাতের মুঠোয়। কিন্তু পরে বিডিআর-এর আরেকটা কাজ করতে গিয়ে ও টের পায়, রাশিয়ান লিঙ্ক হ্যাক করা দুঃসাধ্য। সফটওয়ার টেকনোলজিটাকে ওরা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। দাদামশায়কে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে দেশ সম্পর্কে ইমনের বিতৃষ্ণা এসে যায়। পরে আর কখনও বিডিআরের অনুরোধ শোনেনি।

অপরাধের জন্য যারা এই দুষ্কর্মগুলো করে, তাদের হ্যাকিং কালচারে বলা হয়, ক্র্যাকার বা ব্ল্যাক হ্যাটস। আর যারা নিজেদের মুনাফার কথা না ভেবে কাজটা করে, তাদের বলা হয় হোয়াইট হ্যাটস। ব্ল্যাক আর হোয়াইট হ্যাটসের মাঝে আরেক ধরনের হ্যাকার আছে। তারা গ্রে হ্যাটস। এরা মজা করার জন্য কারও সিস্টেমে ঢোকে। কিন্তু পরে ব্ল্যাক হ্যাটসদের দলে ভিড়ে যায়। জিহাদি ক্যাম্পে ব্ল্যাক হ্যাটসদের কাজটাই করত মামুন। হালায়, অহন পুলিশ কাস্টোডিতে। ইমন আফসোস করল, হায় রে, কালকেতুছ্যারের বন্ধু সুদীশছ্যারের ফোন নাম্বারটা যদি ওর কাছে থাকত, তা হলে চিরাগ আর মামুনের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারত।

কম্পিউটারে বসে ঘণ্টা দুয়েক ধরে চুরি মেরামতির কাজটা করার পর ইমন যখন উপরে উঠে এল, তখন ওর মারাত্মক খিদে পেয়েছে। চোরাকুঠুরির দরজাটা বন্ধ করে ও প্রথমেই টিভি চালিয়ে দিল। তার পর ফ্রিজ থেকে ম্যাকডি-র দুটো ভেজ বার্গার বের করে চিবোতে লাগল। আমেরিকান টিভিতে আজকাল রোজই প্রেসিডেন্ট নিকি অ্যাডামসের সমালোচনার বন্যা। কেউ ওঁকে বলছেন জোকার, কেউ লায়ার বলতেও ছাড়ছেন না। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কংগ্রেসের বনিবনা হচ্ছে না। ভদ্রলোক মেক্সিকান বর্ডারে ইস্পাতের দেওয়াল তুলবেনই। অনুপ্রবেশকারীদের আটকানোর জন্য। অন্যদিকে, ডেমোক্রাটরা জিদ ধরেছেন কিছুতেই সেই অর্থ বরাদ্দ করবেন না। কংগ্রেসে ডেমোক্রাটদের সংখ্যা বেশি। প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস হুমকি দিচ্ছেন, দেওয়াল তোলার অর্থ না দিলে কমপ্লিট শাট ডাউন করে দেবেন। এর মানে, সরকারি কর্মীরা বেতন পাবেন না। এতে বিরাট জনবিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হবে তাঁকে। তবুও, তিনি পিছু হটবেন না।

বার্গার চিবানোর সময় ইমন ভাবতে লাগল, প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসকেও কি জিহাদি বলা যায়? আইএস সমর্থকরা ধর্মযুদ্ধে নেমে জিহাদ ঘোষণা করেছে। নির্বোধের মতো শিয়া আর সুন্নিরা নিজেদের মধ্যে কোন্দল করে যাচ্ছে। আর সেই সুযোগে বিধর্মীরা একটা দলকে সমর্থন করার নাম করে, ক্রমশ নির্মূল করে দিচ্ছে মুসলিমদের। এ যেন সেই ঈশপের গল্পের মতো। রুটি ভাগ করা নিয়ে দুই বানরের ঝগড়া। মধ্যস্ততায় নেমে পুরো রুটিটাই উদরস্থ করে ফেলল নেকড়ে। প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসও তো নেকড়ের ভূমিকাটা নিয়েছেন। মাঝখান থেকে অস্ত্র কেনার বায়না পেয়ে যাচ্ছেন জিহাদি আক্রান্ত দেশগুলো থেকে। ধর্মীয় কারণে মামুনদের যদি জিহাদি বলা হয়, তা হলে প্রেসিডেন্ট অ্যাডামকেও জিহাদি বলা হবে না কেন? ওঁর জিহাদ রাজনৈতিক কারণে। মেক্সিকান জাতিটাকে উনি বিচ্ছিন্ন করে দিতে চান। উনিও তো একই অপরাধ করে যাচ্ছেন। তা হলে নেকড়ের ভূমিকটা ওকে পালন করতে দেওয়া হবে কেন?

প্রতি দশ মিনিট অন্তর টিভি চ্যানেলে পশ্চিম এশিয়ায় আইএস-এর কার্যকলাপ নিয়ে খবর থাকে। এবং সবটাই আমেরিকানদের কৃতিত্ব নিয়ে। আর আমেরিকান মাটিতে কোনও জিহাদি ধরা পড়লে তো কথাই নেই। একটা খবর শুনে ইমন নড়েচড়ে বসল। মিচিগানের এক মসজিদে তিনজন ক্রিশ্চান ধর্ম বদলে মুসলিম হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন প্রাক্তন সেনা। একজন কোনও সিকিউরিটি এজেন্সিতে চাকরি করতেন। আর তৃতীয়জন কার্পেন্টার। পুলিশের ধারণা, জিহাদি হওয়ার তাগিদে এই তিনজন ধর্ম বদলেছে। পুলিশ এদের উপর নজর রাখছে। শুনে ইমন একটু অবাকই হল। আমেরিকায় মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা নগণ্য। এক শতাংশের সামান্য বেশি। উল্টে, মুসলিমরাই গ্রিন কার্ড পাওয়ার আশায় ক্রিশ্চান হয়ে যাচ্ছে। সেখানে কোন দুর্বুদ্ধিতে লোকগুলো ধর্মান্তরিত হচ্ছে?

টিভি দেখার সময়ই লনে ধুপ করে একটা আওয়াজ শুনতে পেল ইমন। বব ক্যাটের উৎপাত ভেবে অতটা গুরুত্ব দিল না ও। বব ক্যাট সাইজে বেশ বড়। পিছনের জঙ্গল থেকে প্রায়ই খাবারের লোভে বাসায় ঢুকে পড়ে। একদিন সন্ধেয় লন পেরিয়ে আউট হাউসে আসার সময় বব ক্যাটের জ্বলজ্বলে দুটো চোখ দেখে ও ভয় পেয়ে গেছিল। বার্গার খাওয়া শেষ করে ইমন প্যাকেটটা বিনস-এ ফেলতে যাবে, এমন সময় দেখে, দরজায় চিরাগ দাঁড়িয়ে। তার মানে পাঁচিল টপকে ও-ই ভিতরে ঢুকে এসেছে। চোখাচোখি হতে চিরাগ জিজ্ঞাসা করল, ‘রোহিতের বাসা থেকে কখন এলি ইমন?’

তার মানে, রোহিত আরও একবার আউট হাউসে এসেছিল। এবং ওর জন্য লিখে রাখা চিরকুট দেখেছে। চিরাগের মুখে ক্রুর হাসি। দেখে ইমনের ভাল লাগল না। সঙ্গে সঙ্গে ও স্থির করে নিল, যা হওয়ার আজই চূড়ান্ত কিছু হয়ে যাক। তবুও, মাথা ঠান্ডা রেখে ও বলল, ‘ঘণ্টাখানেক আগে।’

চিরাগ বলল, ‘তোকে নেমতন্ন করেছিল। রোহিত কিছু খেতে দেয়নি বুঝি?’

হাতে ধরা ম্যাকডি-র প্যাকেট বিনস-এ ফেলে এসে ইমন খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘হ্যার বাসায় গেসিলাম। কিন্তু ঢুইকতে পারি নাই। দূর থেইক্যা দেখি, রোহিতের বাসার সামনে সিটি পুলিশের গাড়ি দাঁড়াইয়া আসে। দেইখ্যা আমি পলাইয়া আইসি। তুই গেসিলি কোথায়?’

ঘরে ঢুকে নিজের বিছানায় পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে শুয়ে পড়ল চিরাগ। প্রশ্নটার কোনও উত্তর দিল না। পুলিশের ভয় দেখানো সত্ত্বেও ওর মুখের রেখায় কোনও বদল নেই। এমন ডেসপারেট হয়ে গেছে। ইমন সতর্ক হয়ে ওর দিকে লক্ষ রাখতে লাগল। আগেরবার আউট হাউসে ফিরে নিশ্চয়ই চিরাগ একবার চোরাকুঠুরিতে গেছে। লায়লাকে দেখতে না পেয়ে ও কতটা ক্ষিপ্ত, সেটা ইমন আন্দাজ করতে পারছে। সন্দেহটা ওর উপরই পড়া স্বাভাবিক। ও ঠিক করে রাখল, চিরাগ যতক্ষণ না নিজে থেকে লায়লার কথা তুলবে, ততক্ষণ ও উচ্চবাচ্য করবে না।

চিরাগ বিছানায় উঠে বসে বলল, ‘কমান্ডার রববানি নিউ জার্সিতে এসেছে। তার সঙ্গে দেখা করতে গেছিলাম। সন্ধেবেলায় ওকে এখানে নিয়ে আসব। তুই কিন্তু তখন থাকিস।’

ইমন জানে, এখন বুঝতে পারে, চিরাগ ওকে ভয় দেখাচ্ছে। অ্যাদ্দিন ওকে ধোঁকা দিয়ে এসেছে। পাল্টা ওকেও ধাঁধায় ফেলতে হবে। আগের মতো ও প্রতিবাদ করল না। উল্টে বলল, ‘তরে হ্যায় মারধর করেন নাই?’

‘মারবে কেন? আমি কী অন্যায় করেছি? কামালের মতো একটা খাঁজা মাল আমার সঙ্গে পাঠিয়েছিল। নায়গারায় সাকসেস পাইনি কেন, ওকে আমি বুঝিয়ে বলেছি।’

‘হ্যায় আর কী কইল? আমাগো ক্যালিফেটে ফিরত নিয়া যাইব?’

‘সে রকম কোনও কথা হয়নি। কাল পরশুর মধ্যে উনি মিচিগানে যাবেন। আমাদেরও তৈরি থাকতে বললেন। মিচিগানে জিহাদি অ্যাক্টিভিটি শুরু হয়ে গ্যাছে। অনেকে ইসলামে কনভার্ট হয়েছে।’

‘হ, এড্ডু আগে আমিও টিভিতে খবরডা হুনলাম। কিন্তু, সিএনএন যে একডা ব্যাড নিউজও দিল। রাক্কার হাফ টেরিটোরিগর্ভমেন্ট ফোর্স দখল কইর‌্যা ফ্যালছে। হালায় ওয়েস্ট এশিয়ায় না কি জিহাদিগো টিইকতে দিব না। হত্য না হি?’

‘বাজে কথা। আর কেউ ঠাঁই দিক না দিক, আমাদের জন্য পাকিস্তান আছে। আফগানিস্তানে তালিবানরা আছে। দ্যাখ না, আর ক’দিন পর জিহাদিরা পাকিস্তানকে কোথায় তুলে নিয়ে যায়। পাকিস্তানে বসে আল কায়দা, আর জইশ ই মহম্মদ মিলে পুরো ইন্ডিয়াকে তছনছ করে দেবে। যাক গে, তোর সঙ্গে এসব আলোচনা করা বৃথা। তুই একটু বাইরে যা। এখন আমি প্রেয়ারে বসব।’

বিছানা থেকে নেমে চিরাগ হাঁটু ভাঁজ করে বসল। কোনও অ্যাকশনে যাওয়ার আগে জিহাদিরা প্রেয়ার করতে বসে। আল্লাহতালার কৃপা প্রার্থনা করে। তখন কেউ বিরক্ত করুক, চায় না। চিরাগের মতলবটা কী? ওকে খুন করার আগে প্রস্তুত হচ্ছে না কি? না, না, পলাশছ্যারের বাড়িতে ইমন খুন খারাপি হতে দেবে না। ছল করে চিরাগকে বাইরে কোথাও নিয়ে যেতে হবে। তার পর কে কাকে খুন করে, দেখা যাবে। পকেটে এখন পিস্তল আছে। তার পুরো চেম্বার ভরা। একটা গুলিই যথেষ্ঠ। চিরাগ সবে প্রেয়ার শুরু করেছে, ওকে চটানোর জন্যই ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘রববানিরে এহানে আনবি, যদি রাইতে থাইকতে চায়, তাইলে খাওয়াইবি কী?’

কড়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে চিরাগ বলল, ‘সেই ব্যবস্থাটা তুই করে রাখ। মিঠাস থেকে ভেজ আইটেম কিন্তু আনিস না। পাশের পাকিস্তানি দোকানটা থেকে বিফ, টার্কি যা পাবি, নিয়ে আয়। খাবার পছন্দ না হলে কমান্ডার রববানি কিন্তু তোর উপর ঝাল ঝাড়বেন।’

ইমন বলল, ‘তাইলে ভাই, তুই আমার উপর দায়িত্ব দিস না।’

চিরাগ খেপে গেল কথাটা শুনে। লাফ দিয়ে উঠে প্রথমে ফ্রিজের কাছে গেল। ডিপ ফ্রিজের ডোর খুলে একবার নজরে বুলিয়ে, প্রত্যাশিত জিনিসটা না পেয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘মাদারচোত, আমার পিস্তল কোথায় বল? খুদা কছম, তোকে আজ খুনই করে ফেলব।’

মায়ের নামে গালি! শুনে ইমনের রক্ত গরম হয়ে গেল। ও দাঁড়িয়ে উঠে বলল, ‘কী কইলি তুই?’

চিরাগ বলল, ‘মাদারচোত, মাদারচোত। হালা গদ্দার…’ বলতে বলতে চিরাগ আরও কাছে এগিয়ে আসছে। মাথা ঠিক রাখতে না পেরে সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলটা বের করে ইমন ট্রিগার টিপে দিল। অনভ্যস্ত হাত কাঁপছে। লক্ষভ্রষ্ট হয়ে গুলিটা গিয়ে লাগল দেওয়ালে। চিরাগের চোখ থেকে বিস্ময় ঠিকরে বেরোচ্ছে। ও ভাবতেই পারেনি, ইমন গুলি করে দেবে।

‘তোর এত সাহস? কোত্থেকে হল? রেন্ডি রোজিনার সঙ্গে শুয়েছিলি নাকি? মাদারচোত, আমি জানি, ইন্টারপোল অফিসারের কাছে আমার সম্পর্কে সব ইনফর্মেশন তুই দিয়েছিস। লায়লা মাগিটাকে তুই-ই পুলিশ স্টেশনে ছেড়ে এসেছিস। তোর বাঁচার অধিকার নেই।’ বলেই বুনো জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল চিরাগ। ইমন তৈরিই ছিল। সঙ্গেসঙ্গে বাঁ দিকে সরে গিয়ে ও সজোরে কনুই চালাল চিরাগের মুখ লক্ষ করে। চিরাগ ছিটকে গিয়ে পড়ল দরজার বাইরে। ওর নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে লাগল। ইমন টের পেল, রক্ত দেখে ওর জিহাদি সত্ত্বাটা ফের জাগছে। চিরাগ উঠে দাঁড়ালে ক্ষ্য্যাপা কুত্তার মতো আক্রমণ করবে। ও যাতে আর দাঁড়াতে না পারে, বাইরে গিয়ে চিরাগকে দমাদম লাথি আর ঘুসি মারতে শুরু করল ইমন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *