(দশ)
অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সির ব্যালকনিতে বসে যোগ ব্যায়াম করছেন লিলি গডউইন। বছর পাঁচেক আগে ইউনিসেফেরই কোনও কাজে তিনি লস অ্যাঞ্জিলেসে গেছিলেন। বাম কিম তাঁকে চৌধুরী যোগা সেন্টারে নিয়ে যান। সেইসময় সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করার সময় হাঁটুতে সামান্য ব্যথা অনুভব করছিলেন। আর্থারাইটিস বলে ভয় হচ্ছিল লিলির। সপ্তাহখানেক যোগা সেন্টারে গিয়ে তিনি বেশ উপকার পান। যোগ ব্যায়ামের উপর তাঁর বিশ্বাস এসে যায়। তার পর থেকে বিশ্বের যে কোনও প্রান্তেই থাকুন না কেন, প্রতিদিন সকালে এক ঘণ্টা যোগ ব্যায়াম আর ধ্যান করার জন্য সময় বের করে নেন। তাঁর শরীরে আপাতত কোনও সমস্যা নেই। শুধুমাত্র পিঠের কোঁচকানো চামড়াটা ছাড়া। মাঝে মাঝেই তাঁকে ডার্মাটোলজিস্টের কাছে ছুটতে হয়।
অন্যদিন যোগ ব্যায়াম করার পর লিলি ধ্যানে বসেন। তখন মনটা খুব শান্ত থাকে। কিন্তু আজ অস্থির। বারবার রোকেয়ার মুখটা ভেসে উঠছে তাঁর চোখের সামনে। গত দু’দিন অনেক চেষ্টা করেও ঢাকায় বেচারিকে ফোনে ধরতে পারেননি। তিনি বুঝতেই পারছেন না, মেয়েটাকে ফের হাসপাতালে ভর্তি হতে হল কেন? কোনও রকমে কপালভাতি শেষ করে আধ ঘণ্টার মধ্যেই লিলি উঠে পড়লেন। ব্যালকনির রেলিংয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই যে দৃশ্যটা তিনি দেখলেন, তাতে মন ভরে গেল। কুইন্সে আড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সি ক্যাসেলের ধাঁচে গড়া একটা হাউজিং কমপ্লেক্স। ঠিক মাঝখানে একটা বিরাট ইউ আকারের সরোবর আছে। তার চারপাশ জুড়ে প্রচুর গাছ। সেই গাছের পাতার রং বদলাতে শুরু করেছে।
হ্যালোইনের দু’চারদিন আগে থেকেই এখানকার গাছে পাতার রং বদলাতে শুরু করে। সবুজ থেকে হলুদ, তার পর গেরুয়া। ক্রমশ গেরুয়া থেকে লাল, তার পর বাদামি হতে সময় নেয় দিন দশেক। তার পর শীতের ঠিক আগে সব পাতা ঝরে যায়। গাছের নিচে পড়ে থাকা বিচিত্র বর্ণের পাতা দেখলে মনে হয়, কোনও শিল্পী যত্ন করে তা এঁকে রেখেছেন। আমেরিকায় অগুণতি ন্যাশনাল পার্ক। ‘ফল কালার’ অর্থাৎ পাতায় রঙের খেলা শুরু হলেই লোকে বনাঞ্চলে ছুটে যায় প্রকৃতির বিচিত্র লীলা দেখার জন্য। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট ধরে লিলি দেখলেন, সূর্যের আলো গাছের পাতার উপর এসে পড়েছে। মনে হচ্ছে, সূর্য তার এক একটা রং ঢেলে দিয়েছেন একেকটা গাছে। লিলি জানেন, এই অপরূপ শোভা খুব বেশিদিন দেখা যাবে না। থ্যাঙ্কস গিভিং ডে আর ক্রিসমাসের মাঝের সময়টুকুর মধ্যে গাছগুলো নেড়া হয়ে যাবে।
ছোটবেলায় ড্যাডি এই সময়টায় পুরো পরিবার নিয়ে প্রতিবার ছুটি কাটাতে যেতেন ইস্ট আর সাউথ ইস্ট কোস্টের দিকে। নিউ জার্সি, জর্জিয়া, ভার্জিনিয়া, টেনিসি, নিউ ক্যারোলাইনা। একবার অ্যাটলান্টাতেও নিয়ে গেছিলেন। সেখান থেকে দু’শো মাইল দূরে স্মোকিং মাউনটেন্স বলে একটা জায়গায়। তখন লিলি হাই স্কুলের ছাত্রী। সেই কারণেও আরও বেশি করে মনে আছে অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা। দিগন্তব্যাপী পাহাড়ের ঢেউ। এক একটা পাহাড়ের পুরো ঢাল জুড়ে গাছের একেক রকম রং। সবুজ, হলুদ, গেরুয়া, লাল, বেগুনি। কোথাও কোথাও ঝরণা নেমে এসে টেনেসি নদীতে মিশে যাচ্ছে। রাস্তার দু’পাশে জঙ্গলের মধ্যে কোথাও লম্বা শিংওয়ালা এলক হরিণ, কোথাও আবার কালো ভালুক দেখেছিলেন লিলি। মনে আছে, গাটলিনবার্গ বলে একটা জায়গায় সালামান্ডার বলে এক ধরনের কালো টিকটিকি দেখে তিনি মারাত্মক ভয় পান। সেই ভয় ভাঙানোর জন্য ড্যাডি তাঁকে বলেছিলেন, সালামান্ডারের চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাকের নাকি খুব চাহিদা। ধনী মানুষরা সেই পোশাক আভিজাত্যের অঙ্গ বলে মনে করে।
ইউনিসেফের পরামর্শদাত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে লিলি এমন ব্যস্ত, ‘ফল কালার’ দেখতে যাওয়ার সুযোগই পান না। স্মোকিং মাউনটেন্স এখন হেরিটেজ সাইট। ইউনিসেফের কর্তা হিসেবে, তিনি যখন ইচ্ছে সেখানে যেতেই পারেন। তিনি জানেন, স্মোকিং মাউনটেন্সে প্রতি বছর এত ট্যুরিস্ট যান, আমেরিকার আর কোথাও তেমন যান না। প্রায় এক কোটি দশ লাখের মতো। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন বা নায়গারার থেকেও অনেক বেশি ট্যুরিস্ট। প্রতি বছরই শীত আসার আগে লিলি একবার মনে করেন, ভাই ড্যানিয়েলকে নিয়ে ফের গাটলিনবার্গে যাবেন। মেয়েবেলার স্মৃতিটা ফের ঝালিয়ে আসবেন। কিন্তু ড্যানিয়েল চাকরি করে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের লন্ডন অফিসে। ক্রিসমাসের সময় ছাড়া আর ছুটি পায় না।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই গুগল যন্ত্রের মিষ্টি আওয়াজ শুনতে পেলেন লিলি। অ্যালার্ম বাজছে, ‘হাই লিলি, নাউ ইট ইজ এইট ও’ক্লক। দিস ইজ দ্য টাইম টু টেক বাথ।’
শুনে ভিতরে ঢুকে এলেন লিলি। এখন নানা ধরনের অ্যাপস পাওয়া যায়। স্মার্ট হোমের কনসেপ্ট দিনকে দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। ঘর-দোরের অনেক কাজ রোবো করে দেয়। দরজা খুলতে বা বন্ধ করতে হয় না। বাড়ির আলো জ্বালাতে অথবা নেভাতে হয় না। গুগল হোমই সব করে দেয়। লিলি জানেন, অ্যালার্ম বাজার সঙ্গেসঙ্গে আপনা থেকেই কফি মেকার কাজ শুরু করে দিয়েছে। ঘরে ঢুকে একটু পরেই ধূমায়িত কফির কাপ হাতের সামনে তিনি পেয়ে যাবেন। বাথরুমে স্নান করতে ঢুকলে শাওয়ারটাও আপনা থেকে কাজ শুরু করে। গুগল হোম এখন বয়স্ক মানুষদের বিরাট সাহারা। মানুষ ক্রমশ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। শুধু পরিবার কেন, বহু মানুষের দেশ পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে।
স্নান আর ব্রেক ফাস্ট সেরে লিভিং রুমে এসে লিলি দেখলেন, বাম কিম সু তাঁর জন্য বসে আছেন। ভদ্রলোক দক্ষিণ কোরিয়ান। বয়স চল্লিশের নিচে। কাজ ছাড়া আর কিছু বোঝেন না। থাকেন অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সির অন্য একটা অ্যাপার্টমেন্টে। কোনও আলোচনা থাকলে শনি বা রবিবার সকালের দিকে উনি চলে আসেন। দু’জনে মিলে চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন নিয়ে আলোচনায় বসেন। বছরে একটা বড় চ্যারিটি শো করে ওঁরা টাকা তোলেন। সে ব্যাপারেই কোনও কথা বলতে এসেছেন। তাঁকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাম কিম বললেন, ‘গুড মর্নিং ম্যাম। কাল রাতে ঢাকায় কি কথা বলতে পেরেছিলেন?’
সোফায় বসে লিলি বললেন, ‘না। অনেক রাত পর্যন্ত চেষ্টা করেছি। উল্টোদিকে রিং হয়েই যাচ্ছে। কেউ ফোন তুলছেন না। বুঝতে পারছি না, রোকেয়া ফোন ধরার মতো অবস্থায় আছে কি না? দেখি, এখন একবার চেষ্টা করে।’ বলেই ঘড়ির দিকে একবার তাকালেন লিলি। নিউ ইয়র্কে সকাল ন’টা বাজে। তার মানে ঢাকায় এখন রাত্তির আটটা। ঢাকা ঠিক এগারো ঘণ্টা এগিয়ে। রোকেয়া যদি হসপিটালে থাকে, তা হলে এখনও ঘুমোয়নি। বার দুয়েক ডায়াল করার পর লিলি লাইন পেয়ে গেলেন। তাঁর গলা শুনেই ও প্রান্তে কান্নায় ভেঙে পড়ল রোকেয়া, ‘ম্যাডাম, আমি খুব বিপদের মইধ্যে পড়সি। আমারে বাঁচান।’
লিলি জানতে চাইলেন, ‘কেন, কী হয়েছে রোকেয়া?’
‘এহানে আমার খুব অ্যান্টি পাবলিসিটি হইয়া গ্যাসে। কাগজ লিখছে, বুলেট ইনজুরির ইন্সিডেন্টডা নিয়া আমি এহানকার মিডিয়ার কাছে যা কইসিলাম, তা না হি সব ঠিক না। ম্যাম, রিসেন্টলি আফনের সাথে কি ঢাকার কোনও সাংবাদিক যোগাযোগ করসিল?’
‘হ্যাঁ। তার নাম রেজওয়ানা চৌধুরী। চেনো না কি তাকে? কী লিখেছে সে?’
‘না, চিনি না। হ্যায় লিখছে, আফনে না হি প্রথমে আমারে চিনতে পারেন নাই। আমার গায়ে যহন গুলি লাগে, তহন নাহি আফনে ধারে-কাছে ছিলেন না। বাফেলোর পুলিশ কইসে, শ্যুট আউট হয় নাই। হসপিটাল কইসে, বুলেট ইনজুরির কথা হ্যারা জানে না। এহানে জামায়েত সাপোর্টাররা কাইল আমার এগেনস্টে রাস্তায় মিছিল বাইর করসিল। অ্যাডমিনিস্ট্রেশনরে কইসে, আমি সিমপ্যাথি আদায়ের জন্য না হি মিথ্যা কথা কইসি। আমার এনজিও এক সপ্তাহের মইধ্যে বন্ধ কইর্যা না দিলে, বন্ধুর আপিস ভাঙচুর কইরব।’
শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন লিলি। হামলার ঘটনা গোপন রাখতে গিয়ে রেজওয়ানার কাছে তাঁকে একটা অসত্য কথা বলতে হয়েছে। তার মাশুল যে রোকেয়াকে এ ভাবে দিতে হবে, তিনি ভাবতেও পারেননি। কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ‘আসলে, আমি চাইনি আমার উপর হামলার খবরটা মিডিয়া জানুক। তা হলে রোহিঙ্গাদের উপর থেকে আমেরিকান মিডিয়ার সিমপ্যাথি সরে যেত। আমি ওদের কল্যাণের জন্য এত চেষ্টা করছি, অথচ ওরা আমাকেই খুন করতে চাইছে? এখানকার মিডিয়া এটা ভালভাবে নিত না। তুমি এক কাজ করো, ঢাকার কোনও কাগজের রিপোর্টারকে আমায় ফোন করতে বোলো। যা ঘটেছে, ইন ডিটেল, তাঁকে আমি বলে দেব।’
‘তাইলে আমি বাঁচুম ম্যাডাম। মুশকিলটা কী জানেন, বাংলাদ্যাশ গর্ভমেন্ট-এরও লস অফ ফেস হইসে। ইউএসএ অ্যামবেসিরে হ্যারা চিঠি লিখসিল, রোকেয়া সুলতানার সাথে কী হইসিল আমাগো জানান। অহন কাগজে উল্টাপাল্টা রিপোর্ট বাইর হওয়ার জন্য হ্যারাও আমার উপর চইট্টা গ্যাসে।’
‘শুনে খারাপ লাগছে রোকেয়া। কিন্তু, কী আর করা যাবে। কারোর কাছে মুখ না খোলার কথাটা তোমাকে আমার বলে দেওয়া উচিত ছিল। এ নিয়ে তুমি আর দুশ্চিন্তা কোরো না। যা করার, এ বার আমি করব। এখন বলো, তোমাকে ফের হসপিটালে ভর্তি হতে হল কেন?’
‘ঢাকায় ফেরার পর থেইক্যা প্যাটে প্রচণ্ড পেইন হইতাসিল ম্যাডাম। আল্ট্রা সোনোগ্রাফির করার পর ডিসকভার হইল, প্যাটে স্প্রিলন্টারের একডা টুকরো রইয়্যা গ্যাসে। তাই সেকেন্ড টাইম অপারেশন কইরতে হইল। অহন ঠিক আসি।’
ডাক্তারের তরফে মারাত্মক অপরাধ। কমপ্লেন হলে, চূড়ান্ত অবহেলার জন্য বাফেলোর সার্জেনকে প্রচুর অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের মানুষরা এ সব অধিকার আদায় করতে জানে না। আর কথা না বাড়িয়ে লিলি বললেন, ‘আমি এখান থেকে স্টেটমেন্ট দিচ্ছি রোকেয়া। যাতে তোমার সম্পর্কে লোকের ভুল ভাঙে। কিন্তু এই প্রসঙ্গ নিয়ে তুমি মিডিয়ার কাছে আর মুখ খুলবে না, ক্যামন?’
ও প্রান্তে রোকেয়া বোধহয় আন্দাজ করেছে, লাইনটা তিনি কেটে দেবেন। তাই ও বলল, ‘ম্যাম, লাইনটা ছাইড়েন না। হোনেন, আফনেরে কিছু ছবি পাঠাইতাসি। দ্যাখলে বুঝতে পাইরবেন, মায়ানমার গর্ভমেন্ট মুখে আফনেগো যা কইতাসে, কাজে তার কুনও লক্ষণ নাই।’
লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার তা মনে হচ্ছে কেন?’
‘মায়নমার গর্ভমেন্ট মুখে কইত্যাসে রোহিঙ্গাগো দ্যাশে ফিরাইয়া নিব। কিন্তু অহনও রাখাইন থেইক্যা দলে দলে লোক পাঠাইতাসে বাংলাদ্যাশে। রোজ নৌকা কইর্যা ক্যারাভাঁন আইতাসে ছ্যাফ নদীর উপর দিয়া। বুড়া-বুড়ি আর মাইয়্যাগো কিছু কইত্যাসে না। কিন্তু পোলাপান দ্যাখলেই ছুইড়া ফ্যালাইয়া দিতাসে ছ্যাফ নদীতে। দুধের শিশুরেও ছাড়ে নাই ম্যাম। সেই ছবি তুলসে আমার এনজিওর ফোটোগ্রাফার। দ্যাখলে আফনের চোখ ফাইট্টা পানি বাইর হইয়্যা আইসব। পাঠামু?’
ইউনিসেফে শিশু কল্যাণের দায়িত্বে রয়েছেন লিলি। দৃশ্যটা চিন্তা করে তিনি আঁতকে উঠলেন। বাচ্চাদের উপর মায়ানমার আর্মির ক্রোধের কারণটা কী, বুঝতে পারলেন না? জিজ্ঞাসা করায় রোকেয়া বলল, ‘রোহিঙ্গা পপুলেশন যাতে না বাড়ে, তাইর জইন্য বাচ্চাগুলানরে অরা মাইর্যা ফ্যালতাসে। প্রেগনেন্ট বউ-ঝি দ্যাখলেও হ্যাগো একই ট্রিটমেন্ট। এই ভায়োলেন্স বন্ধ করা দরকার ম্যাম।’
ফোনেই লিলি বুঝতে পারছেন রোকেয়া খুব উত্তেজিত। ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ওকে শান্ত করার জন্য তিনি বললেন, ‘ছবিগুলো তুমি তাড়াতাড়ি পাঠাও। ইউনিসেফের একজিকিউটিভ বোর্ডের মিটিং আছে, দু’দিনের মধ্যে। রোহিঙ্গাদের প্রবলেম নিয়েই। আমি ছবিগুলো মেম্বারদের দেখাতে চাই। এখন ছাড়ি, কেমন?’ বলে লাইন কেটে দিলেন লিলি।
বাম কিম কৌতূহলী চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে লিলি অল্প কথায় জানালেন, মায়নমারের আর্মি কী ধরনের অত্যাচার চালাচ্ছে বাচ্চাদের উপর। স্টেটলেস মানুষের সংখ্যা কীভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশ্বের এক প্রান্তে… দূর প্রাচ্যে একদল রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে নৌকো করে। তাচ্ছিল্য করে তাদের বলা হচ্ছে, বোট পিপল। বিশ্বের আরেক প্রান্তেও, বাসে করে অথবা হেঁটে দেশ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে একদল হন্ডুরান। তাদের দলটাকে বলা হচ্ছে, ক্যারাভাঁন। বোট পিপল আর ক্যারাভাঁনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ইউনিসেফ কর্তাদের সবার মুখে চিন্তার ভাঁজ। একটা চতুর্থ বিশ্ব গড়ে উঠতে যাচ্ছে এই দেশহীন, নাগরিকত্বহীন মানুষদের জন্য। ওদের কে বোঝাবে, দেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় পাওয়া কতটা কঠিন।
বাম কিম বললেন, ‘একটা খবর শুনলে আপনার ভাল লাগবে না ম্যাডাম। কালই ইন্টারপোলের এক অফিসারের কাছে খবরটা পেলাম। হন্ডুরাস থেকে যে লোকগুলো দেশ ছেড়েছিল, তারা এল সালভাদোর পেরিয়ে মেক্সিকোয় ঢুকে পড়েছে। তাদের উপর মেক্সিকো পুলিশ খুব নিষ্ঠুর আচরণ করছে। একটু আগে টিভিতে আমি দেখে এলাম।’
এ রকমটা যে হবে, লিলি আগেই আন্দাজ করেছিলেন। হন্ডুরাস সরকারের চরম ব্যর্থতা এই মানুষগুলো দেশত্যাগী হতে বাধ্য করেছে। কিন্তু মেক্সিকোতে ঢুকেও ওঁরা কী করবেন? মেক্সিকো সরকারের অর্থনেতিক অবস্থা খারাপ। দেশ ছেড়ে মেক্সিকানরাই আমেরিকায় লুকিয়ে চুরিয়ে ঢুকছে। ওরা হন্ডুরানদের দায়িত্ব নিতে রাজি হবে কেন? মার্কিন মিডিয়া অবশ্য আগেভাগেই বলে দিয়েছে, হন্ডুরানদের আসল টার্গেট হল আমেরিকায় পৌঁছনো। যদি তাই হয়, তা হলে কী ভয়ানক পরিস্থিতি! একটা দেশের মানুষ একটু ভালোভাবে দিন গুজরানের জন্য, দুটো দেশ টপকে তৃতীয় দেশে ঢোকার চেষ্টা করছে। সেনা, পুলিশ, গুলি, গোলা-বারুদ… কোনও কিছুরই পরোয়া করছে না। কতটা দিশাহীন হলে মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমনটা করতে পারে? বাম কিমের মুখে খবরটা শুনে লিলি টিভি চালিয়ে দিলেন। এনবিসি বা সিএনএন কী বলছে শোনার জন্য।
প্রথমেই পর্দায় যে ছবিটা ভেসে উঠল, তা দেখে আঁতকে উঠলেন লিলি। হেলিকপ্টার থেকে নেওয়া শট। মেক্সিকোর বর্ডারে কোনও একটা শহরের রাস্তায় বিশাল জমায়েত। পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করছে হন্ডুরানরা। জনতার একেবারে সামনের সারিতে কিছু টিনএজ ছেলে মেয়ে। তাদের পিছনেই শিশু কোলে মহিলারা। তাদেরও অনেক পিছনে শক্তসমর্থ পুরুষরা। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ লাঠি চার্জ করার সাহস পাচ্ছে না। বাচ্চা ছেলে-মেয়ে আর মহিলারা আহত হবেন বলে। জমায়েতে লোক দেখে লিলি অবাক হয়ে বললেন, ‘কত লোক হন্ডুরাস ছেড়ে চলে আসতে চাইছে মি. কিম?’
বাম কিম উত্তর দিলেন, ‘আন্দোলনটা শুরু করেছিলেন মাত্র চারজন। রাজধানী তেগুসিগালপার বাস ডিপোতে গিয়ে তাঁরা ফেসবুকে একটা পোস্ট করেন। এই অপদার্থ দেশে আমরা আর থাকছি না। আমাদের সঙ্গে আর যাঁরা দেশত্যাগ করতে চান, তাঁরা বাস ডিপোতে চলে আসুন। প্রথম যে বাসটা ছাড়ে সালভাদোরের দিকে, তাতে তিরিশ-পঁয়ত্রিশ জন ছিলেন। কিন্তু সেদিনই সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটে পোস্টটা ভাইরাল হয়ে যায়। ম্যাডাম, কমেন্টেটররা বলছিলেন, এল সালভাদোরে প্রায় চার হাজার হন্ডুরান ছিলেন। মেক্সিকো বর্ডারে মিছিল পৌঁছনোর পর না কি সেই সংখ্যাটা বেড়ে ছয় হাজারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।’
টিভির পর্দায় জমায়েত দেখে লিলির মনে হল, সংখ্যাটা ওইরকমই হতে পারে। কিন্তু এ কী! মিছিলে হঠাৎ হুড়োহুড়ি শুরু হল কেন? লিলি দেখলেন, পিছনের দিক থেকে লাঠি, আর সামনের দিক থেকে জল কামান চার্জ করে পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। লাঠির আঘাতে প্রচুর মানুষ রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছেন। মহিলা ও শিশুরা রাস্তা থেকে নেমে ক্ষেতের আলপথ দিয়ে দৌড়চ্ছেন। টিভির ক্যামেরা সেই দৃশ্য তোলার জন্য পিছু ধাওয়া করেছে। সামনেই ছোট একটা নদী। সেই নদীর ঢাল দিয়ে উঠে আসছে ছয় সাত বছরের একটা মেয়ে। তার ঠিক পিছনেই হঠাৎ কাঁদানে গ্যাসের খট করে একটা শধ। সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। ক্যামেরা থেমে গেছে। পর্দা জুড়ে শুধু মেয়েটার আতঙ্কভরা মুখ। তার পরনের পোশাক ছিন্নভিন্ন।
টিভি দেখতে দেখতে এক মুহূর্তের জন্য লিলির চোখের সামনে সব আবছা। পর্দায় দেখা ওই মেয়েটাকে আগে কোথাও তিনি দেখেছেন। কিন্তু কোথায়, সেটা তিনি মনে করতে পারলেন না। বোধহীন শূন্য চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন ফ্রকপরা মেয়েটির দিকে।
