(তেরো)
ইন্দো-পাক স্টোর থেকে দরকারি কয়েকটা জিনিস কিনতে গেছে ইমন। মাথায় হুডি-র ঘোমটা দিয়ে। যাতে চট করে কেউ ওকে চিনতে না পারে। ওখানেই হঠাৎ ওর সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল রোহিত দাশগুপ্তের। ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে আসছে। তাতে কলা, আঙুর, আপেল, স্ট্রবেরির প্যাকেট, আর কিছু সবজি। এখানে উইক এন্ড ছাড়া বাজার করার সময় কেউ পায় না। আজ শনিবার, তাই হয়তো রোহিত শপিং করতে বেরিয়েছে। আম্মির কাছে বহুদিন আগে ইমন শুনেছিল, চাকরিসূত্রে রোহিত এখন নিউ জার্সিতে। বাঁকের মুখে দেখা হতেই ট্রলি দাঁড় করিয়ে রোহিত বলে উঠল, ‘এই ইমন, তুই এহানে?’
ছোটবেলার বন্ধু, ঢাকায় আমোদপুরে ওরা একই পাড়ায় থাকত। বছর পাঁচ-ছয় পর দেখা। রোহিত ওর সম্পর্কে কতটুকু জানে, ওর জিহাদি জীবন সম্পর্কে আদৌও কিছু জানে কি না, ইমনের কোনও আন্দাজ নেই। ও পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তুই এহানে কোথায় থাকস, আগে ক।’
রোহিত বলল, ‘ইসেলিন বইল্যা একডা জায়গায়। বছর দুয়েক আসি। আরে, তর সম্পর্কে মাসিরে জিজ্ঞাস কইরলে ঠিক কইতে পারে না। তুই আমেরিকার কোথায় থাকস, কোন কোম্পানিতে চাকরি করস। মেসো… মানে তর বাবা একবার লস অ্যাঞ্জিলেসের কথা কইসিল। তর সাথে এইভাবে দেখা অইব, ভাইবতেও পারি নাই। তুই বদলি হইয়া এহানে কবে আইলি?’
প্রশ্নটা শুনে ইমন খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে গেল। মাসি… মানে রোহিত ওর আম্মির কথা বলছে। আম্মি ওর সম্পর্কে জানেটাই বা কী? শুধু জানে, ও বিদেশে বিরাট চাকরি করে। মাসে মাসে টাকা পাঠায়। ঢাকায় ওর বাড়ির লোকেদের কাছে যা শুনেছে, রোহিত সম্ভবত ততটাই জানে। অস্বস্তি কাটিয়ে, হুডি-র ঘোমটা খুলে হেসে ইমন বলল, ‘এই তো মাস ছয়েক হইল, এহানে আইসি। আগে সাড়ে চাইর বসর লস অ্যাঞ্জিলেসে সিলাম। খুব ভাল সিলাম রে। এহানকার মতোন ঠান্ডা ওহানে পইড়ত না। হুনলাম, এহানে না কি এন্ড অফ দ্য ইয়ার বরফ পড়ে?’
‘ঠিক শুনছস।’ তার পরই রোহিত কাকে যেন ডাকল, ‘রিয়াঙ্কা, এদিকে এসো। দরকার আছে।’
ট্রলির পাশে এসে দাঁড়াল একটা বিবাহিতা মেয়ে। তার হাতে রুটির প্যাকেট। রোহিত পরিচয় করিয়ে দিল, ‘হ্যায় আমার ওয়াইফ রিয়াঙ্কা। আর রিয়াঙ্কা… এ হইল ইমন। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। স্কুল আর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে আমরা একই ক্লাসে পড়তাম।’
দু’হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে রিয়াঙ্কা বলল, ‘রোহিতের মুখে আপনার সম্পর্কে এত কথা শুনেছি যে, খুব কিউরিসিটি হত, কবে আলাপ হবে। প্রতিদিনই একবার-দু’বার আপনার কথা ও তুলবেই।’
ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘কী এত কয় আমার সম্পর্কে?’
‘এই যেমন… আপনি কলেজের টপার ছিলেন। আপনার ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার। আপনার মতো মন কারও হয় না। আপনার লাভ স্টোরিও আমার সব জানা হয়ে গেছে। যাক, দেখা যখন হয়েই গেল, তখন আপনাকে ছাড়ছি না। চলুন, আমাদের বাসায় চলুন। লাঞ্চ করে তবে যাবেন।’
শুনে মনে মনে হাসল ইমন। রোহিত যা বলছে, সব ঠিক। কিন্তু কলেজের টপার এখন তালা ভাঙার জাদুকর। একজন হ্যাকার। কুখ্যাত জিহাদি, যাকে এফবিআইয়ের কোনও অফিসার শুট অ্যাট সাইট করে দেবে। একটা মতাদর্শের পিছনে না ছুটলে রিয়াঙ্কার চেয়েও বেশি সুন্দরী একটা মেয়েকে নিয়ে ওর একইভাবে শপিং করে বেড়ানোর কথা। তার নাম কুসুম। একটা সময় যাকে বেহেস্তের নূর বলে মনে হত ওর। কষ্টটা বুকে চেপে রেখে ইমন বলল, ‘আমার সম্পর্কে রোহিত বাড়াইয়া বাড়াইয়া যা ক’য়, বিশ্বাস কইরেন না ভাবী।’
রিয়াঙ্কা বলল, ‘আপনি কিন্তু আমার কথার উত্তর দিলেন না ইমনভাই।’
রোহিতও সায় দিয়ে বলল, ‘চল না। বাসায় গেলে আরও দুইডা চেনা মুখ দেখতে পাবি। এ বার দুগগা পুজার সময় ঢাকায় গিয়া বাবা আর মাকে নিয়া আইসি। তরে দেখলে হ্যারাও খুউব খুশি অইব। তর সাথে দেখা হইয়া ভালাই হইল, বুঝলি। থ্যাঙ্কস গিভিংয়ের সময় অফিস থেইক্যা কয়েকডা দিন ছুটি পাওয়া যাইব। তহন মা-বাবারে লস অ্যাঞ্জিলেস নিয়া যাওয়ার প্ল্যান করতাসি। কোন কোন জায়গা মাস্ট ভিজিট… তর কাছ থেইক্যা জাইন্যা নিম।’
সর্বনাশ! লস অ্যাঞ্জিলেসে কখনও যায়নি ইমন। হলিউড আর বেভারলি হিলস-এর নাম শুধু শুনেছে। রোহিত যদি ডিটেলে জানতে চায়, তা হলে ও খুব মুশকিলে পড়ে যাবে। বাবা-মাকে নিজের কাছে নিয়ে এসে রোহিত ছেলের কর্তব্য করছে। ভিসার নিয়ম অনুযায়ী অন্তত মাস ছয়েক ওঁদের একটানা আমেরিকায় রাখতে পারবে। কিন্তু আম্মি-আববার প্রতি ও কী কর্তব্য করল, ভাবতেই ইমন অস্বস্তিতে পড়ল। কেটে পড়ার জন্য ও বলল, ‘আইজ না ভাই। অন্য কোনওদিন তর বাসায় যামু। মেসে আমার রুম পার্টনার আমার জইন্য বইস্যা আসে। আমি ফিইর্যা না গেলে ও বাইর হইতে পারব না।’
কথাটা রোহিত পাত্তা দিল বলে ইমনের মনে হল না। ট্রলিটা বউয়ের হাতে দিয়ে ও বলল, ‘তুমি যা কেনার কিইন্যা নাও রিয়া। আমরা দুই বন্ধু রেস্টুরেন্টে গিয়া একডু বসি।’
কথাটা রোহিত মন্দ বলেনি। রিসেন্টলি ও ঢাকা থেকে ঘুরে এসেছে। রোহিতের কাছ থেকে দাদামশায় এবং দেশের কিছু খবর পাওয়া যেতে পারে। ভেবে ইমন রাজি হয়ে গেল। ও বলল, ‘চল, তাইলে।’
ক্যাফেটোরিয়ার দিকে হাঁটার সময় রোহিত জিজ্ঞেস করল, ‘তুই অহনও টয়োটা কোম্পানিতেই আছস, না কি অন্য কোথাও জয়েন করছস।’
রোহিতের ভুল ভাঙানোর দরকার নেই। ইমন বলল, ‘না, অন্য কোথাও জয়েন করি নাই। আমার এইচ ওয়ান বি ভিসা এক্সপায়ার হইতে আর ছয়মাস বাকি। তার পর কী করুম, জানি না।’
‘যা-ই করস, ঢাকায় ফিইর্যা যাওনের কথা ভাবিস না ভাই? আমোদপুরের পাট তুইল্যা দিয়া রিসেন্টলি ঢাকার ধানমন্ডিতে একটা দোতলা বাড়ি কিনসি। মা-বাবারে আনার লইগ্যা দ্যাশে গিয়া দেহি, কী অশান্তি। জেনারেল ইলেকশন আইতাসে। ঢাকায় রোজ রোজ মিটিং-মিছিল। একদিন আওয়ামী লিগের সাপোর্টাররা বাইরায়, তো নেক্সড ডে গণ ফোরাম বা জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের পোলারা। রাস্তায় রিকশার ভিড়, যহন তহন বোম ব্লাস্ট। দশ-বারো দিনের মধ্যে আমি অতিষ্ঠ হইয়া গেসিলাম। কালীপুজোর আগে পলাইয়া আইসি। আমি ভাই ঠিক করসি, দ্যাশে আর ফিরুম না। যে কইর্যাই হোক, এহানে গ্রিন কার্ড ম্যানেজ করুম।’
দেশ নিয়ে তেমন কোনও মাথাব্যথা নেই ইমনেরও। দেশ বলে যে কিছু ওর আছে, সেটা দেশ ছেড়ে চলে আসার সময়ই ও ভুলে গেছে। জিহাদি মওলানারা এমনভাবে তখন ওর ব্রেন ওয়াশ করেছিলেন। ওঁরা বলতেন, ইসলাম বিপন্ন। ওঁদের কথা তখন ইমনরা বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু পাঁচ-পাঁচটা বছর জিহাদিদের সঙ্গে বাস করার পর এক ঝটকায় ওর নেশা কেটে গেছে। এখন ওর মনে হচ্ছে, ঝুট, সব ঝুট। আসলে বিপন্ন আরব জগৎ। একটা জিগির তুলে ওরাই মুসলিম বিশ্বের একাংশকে দলে টানছে। রোহিতের কোনও সমস্যা নেই। টিকে থাকতে পারলে, ও একদিন গ্রিন কার্ড পেয়ে যাবে। কেননা, ওর নাম রোহিত দাশগুপ্ত। কিন্তু ইমন মুসলমান। ওকে লুকিয়ে চুরিয়ে থাকতে হবে। মুসলমানরা এতটাই ধিক্কৃত এ দেশে।
ক্যাফেটোরিয়ায় নানা ধরনের স্ন্যাকস পাওয়া যায়। খাবারের ছবিগুলো দেখে ইমনের পেটে খিদে মোচড় দিয়ে উঠল। আসলে বেকারির তৈরি কিছু খাবার কেনার জন্যই ও ইন্দো-পাক স্টোরে এসেছিল। ও জানত, এখানে বাংলাদেশিদের যাতায়াত বেশি। চেনা কারও সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে। ইসেলিনে পলাশ ছ্যারের বাড়ির কাছেই একটা ওয়ালমার্ট আছে। ইমন অ্যাদ্দিন সেখানেই টুকটাক জিনিস কিনতে যেত। কিন্তু কপালে লেখা আছে, রোহিতের সঙ্গে দেখা হবে। সেটা খণ্ডাবে কে? ভাগ্যিস, আজ ইন্দো-পাক স্টোরে এসেছিল। রোহিতের কাছ থেকে ঢাকার খবর জানা যাচ্ছে। সুযোগ পেলেই ও প্রশ্ন করবে, জামায়েতিদের সঙ্গে আইএস জঙ্গিদের বন্ডিং কতটা। ঢাকায় কয়েকজন ব্লগারকে জিহাদিরা নিষ্ঠুরভাবে মেরেছে। সে খবর ওদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক অথবা আল জাজিরা নিউজ চ্যানেল মারফৎ নিয়মিত পায়ইমন।
কাউন্টার থেকে দু’হাতে দুটো ট্রে নিয়ে এসে রোহিত চেয়ারে বসে বলল, ‘টার্কিস স্যান্ডউইচ নিয়া আইলাম। খাইয়া দ্যাখ। মনে হয়, তর ভালা লাইগব।’
ট্রে-র দিকে তাকিয়ে পুরনো একটা কথা মনে পড়ল ইমনের। রোহিতের বাবা সুধাংশু দাশগুপ্ত ছিলেন একটা প্রাইমারি স্কুলের টিচার। নুন আনতে ওদের পান্তা ফুরোত। স্কুল লাইফে তো বটেই, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময়ও ইমনের মনে পড়ে না, রোহিত কোনওদিন টিফিন আনত। আম্মি ওর জন্য যা টিফিন দিত, রোহিতের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ইমন খেয়ে নিত। দিনগুলো যে কী সুন্দর ছিল! টিফিন বক্স খুলে তখন ইমন বলত, ‘আম্মি আইজ তর লইগ্যা পরোটা আর গোস্ত পাঠাইসে। খাইয়্যা দ্যাখ, তর ভালা লাইগব।’
স্যান্ডউইচে কামড় দেওয়ার আগে ইমন বলল, ‘ভাবী নাই। হ্যারে বাদ দিয়া খাওয়া কী ঠিক হইতাসে?’
রোহিত বলল, ‘তাতে কী হইসে? রিয়াঙ্কা বিরাট একডা ফর্দ নিয়া আইসে। জিনিস কিনতে হ্যার খানিকডা সময় লাইগব। ভীষণ আন্ডারস্ট্যান্ডিং মাইয়্যা। ও কিসু মনে কইরব না।’
‘তুই বিয়া করলি কবে?’
‘বছর দেড়েক আগে। বাবার বন্ধুর মাইয়্যা। মা আগেই রিয়ারেপছন্দ কইর্যা রাখসিল। ইনফোসিসে আমি চাকরি পাওয়ার পরই মা কইল, বিদেশে তরে একা যাইতে দিমু না। বিয়া কইর্যা, বউ নিয়া তবে যাবি। বড়দের কথা ফেইলতে পারলাম না।’
‘রিয়া কি বাংলাদ্যাশের?’
‘না, ইন্ডিয়ার করিমগঞ্জের। মুক্তিযুদ্ধের সময় হ্যার বাবা ঢাকা ছাইড়্যা ইন্ডিয়ায় চইল্যা গেসিলেন। ওহানেই সেটল হইয়া যান। রিয়া লেখাপড়া করসে কলকাতায়। মাস কমিউনিকেশন-এ এমএ। ছাড় হ্যার কথা। তরে দেইখ্যা আমার এত ভাল লাগতাসে, কী কমু। একডা কথা কইলে তুই বিশ্বাস কইরবি না ইমন। আমি যেদিন এইচ ওয়ান বি ভিসা হাতে পাইলাম, হেইদিন প্রথমেই তর কথা মনে পড়সিল। তুই পাশে না থাইকলে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি পাওয়া সম্ভব অইত না। মনে আসে, লাস্ট দুইড্যা সেমিস্টারের ট্যাহা তুই জোগাড় কইর্যা না দিলে, আমারে কলেজ ছাইড়তে অইত।’
হপ্তা দুয়েক আগেও কেউ যদি এ সব কথা বলে ওর মন ভেজানোর চেষ্টা করত, তা হলে তার উপর মারাত্মক ঘেন্না হত ইমনের। চিরাগ নির্ঘাত বলত, হালায় সিস্টেমের দাস। বাড়ি-গাড়ি, বউ-বাচ্চা, মোটা মাইনার চাকরি নিয়া সুখে সংসার করতাসে। এইসব ক্লীব মানুষগুলার বাঁইচা থাকার অধিকার নাই। হ্যাগো খুন করো। হ্যার বউরে তুইল্যা নিয়া গিয়া অত্যাচার করো। জিহাদিদের শেখানো হয়েছে, খুন বা বলাৎকার করার সময় কষ্ট দাও। কিন্তু এখন ইমন অনেক বদলে গেছে। ও বলল, ‘পুরানা কথা ছাড়। ক, এ বার আমাগো বাড়িতে গেসিলি না হি?’
‘হ্যাঁ, তগো চৌধুরী মঞ্জিলে গেসিলাম।’ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে রোহিত বলল, ‘মাসির মুখেই হুনলাম, বহুদিন তুই যোগাযোগ করস না। তবে প্রতি মাসে নিয়ম কইর্যা না হি ট্যাহা পাঠাস।’
‘দাদামশায়ের খবর কিছু জানস?’
‘খুব ভালা না রে ইমন। মাসি তরে কইতে মানা করসিল। তবে তুই যহন হুনতেই চাইতাছস, তহন কই। ট্রায়াল শ্যাষ হইয়া গ্যাসে। কালীপুজার পরদিনই কোর্টের ভারডিক্ট বাইর হওনের কথা। মেসোর মুখে হুনলাম, দাদামশায়ের ফাঁসির সাজা হইতে পারে। সুপ্রিম কোর্ট হ্যায় কেসে তিনজনের ফাঁসি দিসে। মেসোর শরীলও ভাইঙা গ্যাসে। মাসি কইতাসিল, মেসোর প্রোস্টেটে ক্যানসার ধরা পড়সে। হ্যায় খুব দিশাহারা হইয়্যা গ্যাসে। ছোটবেলায় তর সাথে যহন চৌধুরী মঞ্জিলে যাইতাম, তহন বাড়িডা থেইক্যা বাইরাতে ইচ্ছা কইরত না। এত সুন্দর সিল। কিন্তু অহন পোড়োবাড়ি হইয়্যা গ্যাসে… গিয়া বেশিক্ষণ বইসতেই পারলাম না। ছুডিপাইলে এগবার ঢাকায় ঘুইর্যা আসিস ইমন। মাসির পাশে গিয়া তর দাঁড়ানো দরকার।’
দাদামশয় মণিরুল চৌধুরীর বয়স এখন আশি বছর! ক’দিনই বা উনি বাঁচবেন? তবুও, ওঁর ফাঁসির সাজা হতে পারে! দেশবাসীরা ওঁর গায়ে রাজাকারের তকমা এঁটে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনাদের না কি উনি সমর্থন করেছিলেন। রাজনীতিতে একেক জনের বিশ্বাস একক রকম থাকতেই পারে। কিন্তু সেই অপরাধে পাঁচ দশক পর ওই অশীতিপরমানুষটা এভাবে মরতে হবে? ভাবতেই মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে ওঠার তাপ টের পেল ইমন। মনে পড়ল, ওর জিহাদি হওয়ার পিছনে এটাই সবথেকে বড় কারণ ছিল। মসজিদের উপর রাগ। সমাজ, রাষ্ট্রের উপর রাগ।
জিহাদিদের বুকলেট, ভিডিয়ো ওই সময়টাতেই ঢাকার ছাত্রমহলে ছড়িয়ে পড়ছিল। পশ্চিমের দেশের ইসলামি নেতাদের জ্বালাময়ী ভাষণ টানতে শুরু করেছিল ইমনদের মতো কিছু ছাত্রকে। ওঁরা বলতেন, সবকিছু ভেঙে দাও। গুঁড়িয়ে দাও। জিহাদ ঘোষণা করো। মসজিদের অশিক্ষিত মৌলভীরা অ্যাদ্দিন যা বলতেন, তোমার আগের প্রজন্ম… বাপ-ঠাকুর্দারা মাথা নিচু করে তা মেনে নিতেন। তোমরা নবীন প্রজন্ম, তোমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াও। প্রশ্ন করতে শেখো। শরিয়তের সম্মান রক্ষা করো। শহিদ হলে আল্লাহ আরও বেশি করে তোমাদের কাছে টেনে নেবেন।
ইমন অ্যাদ্দিন এই স্বপ্নের পিছনে ছুটছিল। বুকের ভিতর তুষের আগুন। দাদামশয়কে যারা জেলে ঢুকিয়েছিল, তাদের কোনওদিন ও ক্ষমা করতে পারবে না। ও ঠিকই করেছিল, আওয়ামি লিগের দুই আঞ্চলিক নেতা, সুপ্রিম কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর আর বিচারপতিকে নিজের হাতে শাস্তি দেবে। ধানমন্ডিতে বোমা বিস্ফোরণের ছকও কষেছিল। কিন্তু সিরিয়ার রাক্কায় ওদের হেড কোয়ার্টারস থেকে গ্রিন সিগন্যাল না আসায় সেই পরিকল্পনা ধামাচাপা পড়ে যায়। কম্যান্ডারকে তখন ইমন এমনও বলেছিল, প্রয়োজনে ফিদাইন অর্থাৎ কি না সুইসাইড বম্বার হয়েও ও ঢাকায় যেতে চায়। কেননা, কসোভোর ক্যাম্পে তখন ওদের কাছে খবর পৌঁছেছিল, ঢাকায় ওদের সংগঠন ক্রমশ মজবুত হচ্ছে। চিনাদের কাছ থেকে এক ডজন হাই কোয়ালিটি সুইসাইড জ্যাকেট পাওয়া গেছে। সেইসঙ্গে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্রও।
এখন অবশ্য পরিস্থিতি পুরো পাল্টেছে। জিহাদিদের দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর প্রায় একসপ্তাহ কেটে গেছে। ও বা চিরাগ এখনও দলের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। ওরা জানে, জিহাদিরাও ওদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। গদ্দারির শাস্তি কী, তাও ওরা জানে। পাবলিক স্টোরেজ থেকে পালিয়ে আসার দিন দু’জন খুব বুদ্ধিমানের মতো একটা কাজ করেছিল। নিজেদের আসল পাসপোর্ট, আর ডলারের নোটগুলো নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। রোহিত ওকে আম্মির পাশে গিয়ে দাঁড়াতে বলছে। ওর পক্ষে দেশে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও, সঙ্গে পাসপোর্ট আছে। একবার চেষ্টা করে দেখতে পারে। রোহিতের মুখের দিকে ইমন তাকিয়ে রইল। তার পর প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ও বলল, ‘কুসুমের কোনও খবর জানস না হি রোহিত?’
‘জানুম না ক্যান?’ রোহিতের গলার স্বর হঠাৎ বদলে গেল। ‘হ্যারা অহন আর আমোদপুরে নাই। ধানমন্ডিতে চইল্যা গ্যাসে। মাসির কাছ থেইক্যা ঠিকানা লইয়্যা একদিন হ্যাগো বাসায় গেসিলাম।’
‘কুসুম অহন কী করে?’
‘কুসুম ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়াইত। কিন্তু মাস দুয়েক আগে চাকরি নিয়া বিদেশে চইল্যা গ্যাসে। হ্যার এক ফুফাতো ভাই না কি এখন বিলকিস সরকারের মন্ত্রী। সে-ই চাকরির ব্যবস্থা কইর্যা দিসে। কুসুম অহনও নিকাহ করে নাই। হ্যার আববু এ নিয়া খুব আফসোস করতাসিল আমার কাসে।’
‘হ্যার আববু আমার কথা জিজ্ঞাস করল না?’
‘তেমন কিছু না। তবে, তর সম্পর্কে হ্যার আববুর অনেক কমপ্লেন। তুই বিদেশে চইল্যা আইলি অথচ কুসুমরে কিসু জানাইলি না, ক্যান ইমন? ও তরে এত ভালাবাসত, অথচ তুই ক্যান সম্পর্কডা ছিন্ন করলি ভাই? হেইডা আমার কাছেও রহস্য।’
কুসুমের চেহারাটা ওর চোখের সামনে ভাসছে। দশ বছরের প্রেম। সম্পর্কের সুতোটা ইমন নিজেই একটানে ছিড়ে ফেলেছিল, যেদিন গভীর রাতে বাংলাদেশের পুলিশ দাদামশায়কে টানাহিঁচড়ে করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছিল। দু’দিন পর সেই লাঞ্ছনার ছবি খবরের কাগজে প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। রাতারাতি চৌধুরী মঞ্জিল হয়ে গেছিল ঘৃণ্য রাজাকারদের বাড়ি। তার অল্পদিনের মধ্যে ইসলামিক স্টেটস-এর এজেন্ট তৈমুর সাহেব ওর দুবাই যাওয়ার টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বাড়ির লোকেরা জানত, ও দুবাইয়ে চাকরি পেয়েছে।
স্যান্ডউইচ খাওয়ার ফাঁকেই হঠাৎ রোহিত বলে উঠল, ‘দ্যাখ ইমন, টিভিতে কী কইতাসে, দ্যাখ। বাংলাদেশি দুই টেররিস্ট না হি নিউ জার্সির কোনও বাসায়লুকাইয়া আসে। কী মুশকিল ক তো, হ্যাগোর লইগ্যা আমাগো দ্যাশের বদনাম হইয়া যায়।’
মুখ তুলে ইমন টিভির দিকে তাকাল। নিউজ রিডার বলছে, ‘এফবিআই সোর্স জানাচ্ছে, দুই জিহাদি খুব রিসেন্টলি নিউ জার্সিতে এসে লুকিয়ে রয়েছে। একজনের ডান হাতে চোট-আঘাত আছে। এখানে এসে ওরা বড় ধরনের নাশকতার ছক কষছে। কয়েকদিন আগে ব্রুকলিন ব্রিজের কাছে একটা পাবলিক স্টোরেজে জঙ্গিদের গোপন ডেরায় হানা দিয়ে এফবিআই একজনকে আটক করে। তার কাছ থেকে জানা যায়, ডেরায় আরও দু’জন থাকত। একজন বাংলাদেশি ও অন্যজন ইন্ডিয়ান। দু’জনই আইএস-এর মদতপুষ্ট। কানাডার বর্ডার পেরিয়ে আমেরিকায় ঢুকেছিল। এফবিআই তল্লাশি চালাচ্ছে।’
শুনতে শুনতে বুকের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। রোহিতের কাছে যাতে ধরা পড়ে না যায়, সেই কারণে টিভির দিক থেকে চোখ সরিয়ে ইমন বলল, ‘নিজেরে মুসলমান কইতে এখন লইজ্জা করে রে রোহিত। কে জানে, পুলিশ আমাগো মেসে আইস্যাও উৎপাত কইরব কি না। আমার পাসপোর্টও তো বাংলাদ্যাশের। তুই হিন্দু আর তর সাথে বউ আসে, তর কিছু হইব না। জানি না, আমাগো কপালে কী আসে। চট কইর্যা তুই তর কন্টাক্ট নাম্বারটা দে। পরে তর সাথে যোগাযোগ করুম।’
কোনওরকমে রোহিতের নাম্বারটা লিখে নিয়ে ইন্দো-পাক স্টোর থেকে বেরিয়ে এল ইমন।
