(এগারো)
ঘরে গাঢ় অন্ধকার। শুধু ডিজিটাল ঘড়ির লাল আলোটা জ্বলছে। প্রতি সেকেন্ডে সময় বদলাচ্ছে। বিছানায় শুয়ে আড়চোখে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ইমন দেখল, রাত প্রায় দুটো বাজে। আউট হাউসের একটা রুমে ওদের ঠাঁই হয়েছে। পাবলিক স্টোরেজের বেসমেন্টে যে ঘরটায় ওরা থাকত, তার থেকে অনেক ভাল। বাথরুমে স্নান করতে ঢুকে, প্রথমে সেটা ওরা টের পায়। সুন্দর বাথটব, কমোড, তাকে রাখা নানা সুগন্ধি সাবান, শ্যাম্পু, বডিলোশন, এমন কী গিজারও আছে। প্রায় দু’দিন ওরা কুত্তার মতো ঘুরে বেড়িয়েছে। বাথটবে সুগন্ধি জলে শুয়ে থাকার সময় পলাশছ্যারের উপর কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেছিল ইমনের। জীবনে এই রকম একটা পর্যায় আসবে, ও ভাবতেও পারেনি। জিহাদিরা সবসময় কুরবানির কথা বলে। ধর্মযুদ্ধে যদি কোনওদিন জেতে, সারা বিশ্ব ইসলামিক রাষ্ট্রে ভরে গেলে, তার পর জীবনটা এমন আরামে কাটাতে পারবে কী না, সে কথা কখনও কেউ ওদের বলেনি।
ওদের আশ্রয় দেওয়ার আগে রোজিনা ম্যাডাম বলে দিয়েছিলেন, অনুমতি ছাড়া মেন বিল্ডিংয়ে ঢোকা চলবে না। বাড়ি পাহারা দেওয়া ছাড়া, কখনও কখনও ড্রাইভিং করার জন্য এ দিক সেদিক যেতে হতে পারে। ঘণ্টাখানেক আগেও, দু’জন বারান্দায় বসে চুপচাপ ভাবছিল, দ্বিতীয় শর্তটা পালন করবে কী করে? এফবিআই এতক্ষণে ওদের ছবি জোগাড় করে ফেলেছে। হয়তো ফিঙ্গারপ্রিন্টও পেয়ে গিয়েছে। কতদিন আর ওরা লুকিয়ে রাখতে পারবে নিজেদের? কী ভয়ানক অনিশ্চয়তার মধ্যেই না পড়েছে। এ সব ভাবতে ভাবতেই ওরা দেখতে পেল, মেন বিল্ডিংয়ের আলোগুলো একে একে নিভে গেল। তার পর এমন হু হু করে বাতাস বইতে লাগল, দু’জনে বাধ্য হয়ে ঘরে ঢুকে এসেছে। আলাদা বেডে কম্ফর্টারের ভিতর সেঁধিয়ে গিয়েছে। এই আরামটুকু কতক্ষণ স্থায়ী হতে পারে, ইমনের কোনও আন্দাজ নেই। রাত পোহালেই হয়তো এফবিআই অথবা জিহাদিদের কেউ এসে দরজার সামনে দাঁড়াতে পারে।
অন্ধকারে চোখ খুলে রেখেই ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘কী করা যায়, ক তো চিরাগ? রাক্কার হেড কোয়ার্টার্সে কি আমাগো একবার খবর দেওয়া উচিত?’
সিরিয়ার অন্য শহরগুলো থেকে তাড়া খেতে খেতে এখন একমাত্র রাক্কা শহরের শিবিরই বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে জিহাদিরা। আমেরিকানদের আক্রমণের ধাক্কা সামলাতে পারছে না, আইএস। গতকাল আউটহাউসে বসে সারাদিন টিভির দিকে নজর রেখেছে ইমন। তখন পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছে চিরাগ। টিভিতে ইমন দেখেছে, দু’তিনদিন আগে সিরিয়ায় আমেরিকান সেনারা প্রায় দেড় হাজার জিহাদিকে মেরে ফেলেছে, রিমোট কন্ট্রোলে উড়ন্ত ড্রোন থেকে বোমা ফেলে। ড্রোন মারফৎ আক্রমণ করার জন্য আমেরিকানদের আর লোকক্ষয় হচ্ছে না। অন্য দেশের জন্য অহেতুক লড়াই করতে গিয়ে আমেরিকানরা মারা যাচ্ছে বলে, এ দেশে আগে যে চেঁচামেচিটা হচ্ছিল, সেটা এখন বন্ধ। ট্রেনিং ক্যাম্পে কম্যান্ডাররা ওদের বলতেন, আমেরিকান টিভি চ্যানেলের খবর সত্যি নয়। ওরা নিজেদের ঢাক পেটায়। অন্য জিহাদিদের মতো ইমনও সে কথা বিশ্বাস করত। কিন্তু আমেরিকায় পা দেওয়ার পর ওর ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। ইসলামি বিপন্নতা নিয়ে এই দেশটার কোনও মাথাব্যথা নেই।
চিরাগকে যে প্রশ্নটা করেছিল, ও তার কোনও উত্তর দেয়নি। এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল না কি? তাই ফের ইমন জিজ্ঞাসা করল, ‘ঘুমাইয়া পড়ছস না হি।’
এ বার চিরাগ উত্তর দিল, ‘না রে, তোর প্রশ্নটা নিয়ে আমি ভাবছি। তোর কি মনে হয়, রাক্কার হেড কোয়ার্টার্সে খবর দিলে, ওরা কেউ আমাদের উদ্ধার করার রিস্ক নেবে?’
ইমন বলল, ‘আমার তা মনে হয় না। একজন সিরিয়ান বা ইরাকির জন্য হ্যারা যা করত, আমাগো জন্য তার কিছুই কইরব না। আমরা অহন না ঘর কা, না ঘাট কা। মোস্ট ইম্পরট্যান্ট থিং, এই দ্যাশ থেইক্যা হ্যারা আমগো বাইর কইরব কী কইর্যা? আমরা কানাডা দিয়া ঢুকসিলাম। ওই রুট ধইর্যাই আমাগো ফিরতে অইব। কিন্তু এফবিআই নিশ্চয়ই নজর রাখতাসে। বর্ডার ক্রস করার আগেই অরা আমাগো ধইর্যা ফেলব।’
‘তৌফিকের সাথে একবার কন্টাক্ট করলে ক্যামন হয়, বল তো? ও একটু সিমপ্যাথেটিক। ওর কাছ থেকে একটা সাজেশান পাওয়া যেতে পারে। মেক্সিকান বর্ডার দিয়ে পালালে কেমন হয়?’
‘কিন্তু তৌফিকরে আমরা পামু কোথায়? আমার মনে হয়, একটু রিস্কি হইয়া যাইব। টিভিতে অবশ্য কইল, পাবলিক স্টোরেজ থেইক্যা শুধু মাত্র একজনই অ্যারেস্ট হইসে। হ্যায় ইমাদ খামিস। তৌফিকের কথা কিন্তু কয় নাই।’
‘সবই ঠিক আছে। কিন্তু টিভিতে এও বলেছে, দুই টেররিস্ট পলাতক। একজনের হাতে চোট আছে। এই পয়েন্টটাই ডেঞ্জারাস। তুই লক্ষ করছিলি কী না, জানি না। রোজিনা ম্যাডাম যখন আমাদের সাথে কথা বলছিলেন, তখন তোকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তোমার ডান হাতে গ্লাভস কেন? এখন তো তেমন ঠান্ডা পড়েনি? তুই একটা উত্তর দিয়েছিলি বটে, কিন্তু উনি কনভিন্সড হননি। আমি তো তখন ভয় পেয়ে গেছিলাম, তোকে আবার গ্লাভস খুলতে না বলেন। তোকে আমি অ্যালার্ট করে দিচ্ছি ইমন, এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে কিন্তু সাবধানে ডিল করতে হবে।’
চিরাগের অনুমানটা যে সঠিক, ইমন মনে মনে তা সমর্থন করল। রোজিনা ম্যাডামকে যে এড়িয়ে চলতে হবে, ও তা বুঝে গেছে। কিন্তু গোদের উপর বিষফোঁড়া, সকালের দিকে এ বাড়ির কোর্ট ইয়ার্ডে ওর এমন একজনকে চোখে পড়েছে, যাকে দেখে ও চমকে উঠেছিল। আরে, এই তো সেই ইন্ডিয়ানটা, কালকেতু নন্দী, যাকে খুন করতে ওকে পাঠানো হয়েছিল নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে। নায়গারার লা কুইতা হোটেল থেকে লোকটাকে ওরা ফলো করেছিল। পলাশ ছ্যার আর রোজিনা ম্যাডামের সঙ্গে যখন কালকেতু লোকটা হোটেলের লবিতে দাঁড়িয়েছিল, তখন প্রথম ওঁকে ভাল করে দেখে। ওঁদের কথাবার্তায় ইমন বুঝে যায়, পলাশ ছ্যার বাংলাদেশি এবং যথেষ্ঠ ধনী। দ্বিতীয়বার ওঁরা চোখে পড়েন মাঝরাস্তায় রেস্ট এরিয়ার কফিশপে। স্টার বাকস-এর লাইনে ইমন যেচে আলাপ করে পলাশছ্যারের সাথে। বাংলাদেশি পরিচয় দেওয়ায়, ভাবতেও পারেনি, ভদ্রলোক নিজের নেমকার্ড এগিয়ে দেবেন। ইমন এমন একটা ভাব করেছিল, খুব কষ্টের মধ্যে আছে। ভাগ্যিস, অভিনয়টা করেছিল। তাই আজ, চরম দুর্দিনে পলাশছ্যারের বাসায় কম্ফর্টারের তলায় শুয়ে রয়েছে।
অন্ধকার ঘরে খানিকক্ষণ আবার চুপচাপ। মুজাহিদ্দিন জীবনে ওরা বাঙ্কারে শুতে অভ্যস্ত। গোলাগুলি আর বোম্ব ব্লাস্ট-এর শধ শুনেও ঘুমোতে ওদের অসুবিধে হত না। কিন্তু নিউ জার্সির এই বাড়িটা নিঃঝুম। বাইরে থেকে শুধুমাত্র সোঁ সোঁ শধ ভেসে আসছে বাতাসের। টিভিতে ওয়েদার ফোরকাস্ট বলেছে, কাল সকালের দিকে বৃষ্টি হবে। তাপমাত্রা নেমে যাবে শূন্যের নিচে। এই রকম একটা প্রতিকূল মরশুমে যদি পলাশছ্যার আশ্রয় না দিতেন, তা হলে কি হত ভাবতেই শিউরে উঠছে ইমন। কিছুক্ষণ আগে রাক্কায় যোগাযোগ করবে কি না, এ নিয়ে ওর মনে দ্বন্ধ ছিল। তখন মনে হয়েছিল, ওদের একজন শিকার একই বাড়িতে আছে, এই খবরটা যদি রাক্কার হেড কোয়াটার্সে ও জানায়, তা হলে ওখান থেকে অর্ডার আসবে, কাফেরটাকে এখুনি শেষ করে দাও। মৃত্যুটা যেন এমন পৈশাচিক হয়, আর পাঁচটা কাফের ইয়াদ রাখে। কিন্তু তারপর?
এই প্রশ্নটার কোনও উত্তর রাক্কা দেবে না। বুঝে নিতে হবে। পালিয়ে আসতে পারলে ইসলামের কাজে লাগো। না হলে শহিদের মতো মৃত্যু বরণ করো। শুয়ে শুয়ে কথাটা ভাবার সময়, ইমন ততটা আবেগপ্রবণ হয়ে উঠল না, যতটা হত ক্যাম্পের বিছানায় শুয়ে থাকার সময়। এরপর? এরপর? এই দুটো শধ বারবার ওর মাথায় হাতুড়ি মারতে শুরু করল। না, না, অতঃপর আগুপিছু না ভেবে এখন থেকে কোনও কাজ ইমন আর করবে না। প্রতি মুহূর্তে নিজের মনকে প্রথম প্রশ্নটা করবে, ‘কেন?’ তার পরের প্রশ্নটা নিয়ে ভাববে, ‘এরপর?’
এই দুটো প্রশ্নই ব্রাত্য জিহাদিদের ক্যাম্পে। কথাটা এতদিন ওর মনে হয়নি। কিন্তু গত দু’দিনে প্রশ্ন দুটো কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। কম্যান্ডাররা কালকেতু লোকটাকে খুন করতে বলেছিল। কেন বলেছিল, অনেক ভেবে, অনেক আলোচনা করেও চিরাগ আর ইমন কোনও উত্তর খুঁজে পায়নি। কালকেতুর সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য ওরা জানে না। শুধু শুনেছে, লোকটা না কি একটা বই লিখেছে, যাতে ইসলামকে অপমান করেছে। কিন্তু মানুষটাকে দেখে ওদের মনে হয়নি, এমন একটা জগতে বাস করে, যেখানে ইসলামকে অপদস্থ করার মতো কোনও কাজ করতে পারে।
শুয়ে থাকার সময় হঠাৎ ইমনের মনে হল, অহেতুক খুন খারাপির মধ্যে নিজেদের জড়ানোর কি আর প্রয়োজন আছে? দরকার নেই জিহাদিদের সঙ্গে আর কোনও সম্পর্ক রাখার। একবার যখন বেরিয়ে এসেছে, তখন আর ওই নিষ্ঠুর জগতে গিয়ে ঢুকবে না। অনেকক্ষণ ধরে কথাটা ও মনে নাড়াচড়া করতে লাগল। কথাটা মন খুলে চিরাগকে বলবে কি না, ইমন ঠিক করতে পারল না। চিরাগ যদি ওকে গদ্দার বলে! যদি বলে, ‘ছি: ইমন, তোর মনে যদি এই ছিল, তা হলে পাঁচটা বছর নষ্ট করলি কেন?’
চোখের পাতা জোড়া লাগছে না ইমনের। সকালের দিকে সিকিউরিটি গার্ডকে দিয়ে ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন পলাশছ্যার। হাতে কয়েকটা একশো ডলারের নোট গুজে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ট্যাহাগুলা রাখো, তোমাগো কাজে লাগব।’
এত ব্যস্ত একটা মানুষ, তবুও খুঁটিনাটি কত দিকে তাঁর নজর। ভেবে মনটা খুব নরম হয়ে গেছিল ইমনের। পল্যাশছ্যার বিশ্বাস করে নিয়েছেন, ওদের কাছে টাকাপয়সা কিছু নেই। আসলে টাকা পয়সার প্রয়োজন আপাতত ওদের নেই। দরকার শুধু একটা নিরাপদ আশ্রয়। রোজিনা ম্যাডাম যদি তাতে বাধ সাধেন, তা হলে কিছু করার নেই। চিরাগ বলছিল, এক মিনিটে তাঁকে খতম করে দিতে হবে। আজ থেকে এক সপ্তাহ আগেও কথাটা ভাবতে ইমনের বুক কাঁপত না। কিন্তু নোটগুলো হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় ওর মনে হল, কোনও পরিস্থিতিতেই ও পলাশছ্যারের কোনও ক্ষতি হতে দেবে না। এমন কিছু করবে না, যাতে উনি কষ্টে বা বিপদে পড়তে পারেন।
ঠিক এই সময়টায় ফুঁপিয়ে কান্নার শধ শুনতে পেল ইমন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শধটা থেমেও গেল। চিরাগ ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই। কিন্তু চিরাগের মতো পাষাণ মনের ছেলে ঘুমের ঘোরেও কাঁদবে বলে ওর মনে হল না। পাঁচ বছর আগে কাবুলের ট্রেনিং ক্যাম্পে ওর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনওদিন ওকে কাঁদতে দেখেনি ইমন। কম্যান্ডারদের হাতে রাইফেলের গুঁতো খেয়েও ও জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে থেকেছে। চোখে জল আসার মতো অনেক ঘটনা দেখে ইমন যখন সরে গেছে, তখন চিরাগের মুখে বিজাতীয় উল্লাস লক্ষ করেছে। পাশ ফিরে উল্টোদিকের বিছানার দিকে তাকিয়ে ইমন অবাক হয়ে গেল। চিরাগ দু’হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ও কম্ফর্টার ছেড়ে বেরিয়ে এল। হেঁটে গিয়ে পাশের বিছানায় বসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হইসে চিরাগ?’
চিরাগ বলল, ‘এখনই একটা খুব খারাপ স্বপ্ন দেখলাম ইমনভাই।’
‘বাড়ির কাউরে নিয়া স্বপ্ন?’
‘হ্যাঁ। দেখলাম, করিমগঞ্জে আমাদের বাড়ির কাছে কুশিয়ারা নদীর কিনারে গুলি গোলা চলছে। আম্মি এসে আমাকে বলল, হিন্দুরা তোর আববুরে মেরে ফেলেছে। ওদের তুই ছাড়িস না চিরাগ। বন্দুক আর বটিটানিয়ে দৌড়ে যা। অন্তত একটা মুন্ডু কেটে আমার কাছে নিয়ে আয়।’
কসোভোর ক্যাম্পে থাকার সময় শেষবার করিমগঞ্জের খবর নিয়েছিল চিরাগ। তখন বলেছিল, ওদের অসমে না কি খুব অশান্তি চলছে। হিন্দুরা না কি মুসলিমদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিচ্ছে। ওর পরিবারকেও না কি কারা হুমকি দিয়েছে। একবার ভীষণ ক্রোধে চিরাগ বলেও ফেলেছিল, ‘হিন্দু মৌলবাদীরা কিন্তু ভাল করছে না ইমন।’ দেশ নিয়ে নিজে কোনও ভাবনা-চিন্তা করত না বলে ইমন তখন বলত, ‘ছাইড়্যা দে। দ্যাশ নিয়া ভাইব্যা আমরা কী করুম? ভুইল্যা যা।’ কিন্তু ও যে ভুলে যায়নি, তার প্রমাণ, এ ধরনের স্বপ্ন দেখা। বোধহয় ওর অবচেতন মনে, এই রকম একটা আশঙ্কা ঘোরাফেরা করে।
চিরাগ বলল, ‘ভুল করেছি। বিরাট ভুল করেছি ইমন। জানোয়ার জিহাদি এজেন্টদের বিশ্বাস করে মারাত্মক ভুল করেছি। গত দুইদিন ধরে খালি ভাবছি, এত পড়শুনো করে শেষ পর্যন্ত কী করলাম? ফিজিক্সে এমএসসি করার পর গুয়াহাটি ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করার জন্য ডাক পেয়েছিলাম। সেইসব ছেড়ে এসে এখন কুত্তার মতোন জীবন কাটাচ্ছি। কী ইডিয়েট আমি, বল দেখি।’
শুনে চমকে উঠল ইমন। ওর লেখাপড়ার কেরিয়ার এত ভাল, কই, আগে কখনও তো বলেনি। ও কি সত্যি কথা বলছে? চিরাগকে বিশ্বাস করা কঠিন। ইমন শুনেছিল, রাইফেল শ্যুটিংয়ে না কি একবার স্টেট চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল চিরাগ। চেষ্টা করলে ইন্ডিয়ার হয়ে এশিয়ান কম্পিটিশনেও যেতে পারত। ওর তো শ্যুটার হওয়ার কথা। কেন জিহাদি হওয়ার কথা ভাবল? কে ওর মাথায় এসব ঢোকাল? চিরাগের দিকে তাকিয়ে ইমন অবশ্য একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেল, জিহাদি জীবন থেকে বেরিয়ে আসা সম্পর্কে ও যা ভাবছে, চিরাগও সেই লাইনে চিন্তা করছে। ও বলল, ‘করিমগঞ্জে একবার ফোন করবি না হি?’
মুখ তুলে তাকিয়ে চিরাগ বলল, ‘কী করে?’
‘আমার লগে তৌফিকের ফোনডা আসে।’
‘আগে তো আমাকে বলিসনি! দে, ফোনটা দে।’
ফোন খোঁজার জন্য ঘরের লাইট জ্বালাতে গিয়েও কী ভেবে নিজেকে সংযত করল ইমন। বাইরে থেকে কারও যদি নজরে পড়ে! অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে, কিট ব্যাগ থেকে ও ফোনটা বের করে আনল। সুইচ টিপে বুঝল, চার্জ শেষ হয়ে গেছে। গত দু’দিন ধরে ফোন ব্যাগেই পড়ে আছে। চার্জ না থাকারই কথা। সে কথা চিরাগকে জানাতে ও বলল, ‘আমার কপাল খারাপ। দেশের বাড়িতে নিশ্চয়ই খারাপ কিছু হয়েছে ইমন। না হলে মনডা উতলা হত না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘এড্ডু আগে তুই যা কইলি, হেইডা কি মন থেইক্যা কইছস। হঠাৎ তর ক্যান মনে হইল, যা করছস, ভুল করছস?’
চিরাগ বলল, ‘কম্যান্ডারদের টর্চার আর সহ্য করতে পারছিলাম না ভাই। তুই তো দেখেছিস, কসোভো ক্যাম্পে মর্টার চালানো শিখতে গিয়ে একবার কী বেধড়ক মার খেয়েছিলাম? এখনও সোজা পা ফেলে হাঁটতে পারি না। আরব জিহাদিরা মুখে এক কথা বলে, কাজে আর এক করে। সিরিয়ায় তুই দেখিসনি, গলায় পা দিয়ে কীভাবে ওরা টাকা আদায় করত অর্ডিনারি লোকদের কাছ থেকে? দেখিসনি, কীভাবে মেয়েগুলোকে বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে এনে ওরা রেপ করত। শরিয়েতে কি এইসব কথা লেখা আছে?’
‘তুই জিহাদি হইলি ক্যান চিরাগ? তর এত ব্রিলিয়ান্ট কেরিয়ার…।’
‘হিন্দু মেয়ের সাথে প্রেম হয়েছিল।’ জীবন কাহিনি শোনাতে লাগল চিরাগ, ‘স্বপ্না আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। লুকিয়ে ওকে নিকাহ করেছিলাম। হিন্দু মৌলবাদীরা এসে আমাদের বাসা থেকে স্বপ্নাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায়। একদিন পরই ও সুইসাইড করে। হিন্দুরা এসে আমাদের বাসা তছনছ করে। আমাকে মেরেই ফেলত, যদি না কুশিয়ারা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আমি পালাতাম। গুয়াহাটিতে এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে উঠলাম। একদিন ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছি। হঠাৎ একটা ওয়েব লিঙ্ক পেলাম। দু’চারদিন পরে বুঝলাম, ওটা মুজাহিদ্দিনদের ওয়েব লিঙ্ক। তখন মুসলমানদের উপরও আমার রাগ। এই কারণে রাগ, ওরা কেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়াল না? এইভাবে এক মাসের মধ্যে আমি জিহাদি হয়ে গেলাম।’
চিরাগ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল। মুখে আঙুল দিয়ে ওকে আর কিছু বলতে মানা করল ইমন। জানালার পাশে কিছু নড়াচড়া হতে দেখেছে। নিঃশধে বিছানা ছেড়ে নেমে এসে পা টিপে টিপে ও জানালার দিকে এগোল। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে জানালার পাল্লাটা ও অল্প সরিয়ে দেখল, লম্বা লম্বা পা ফেলে কেউ জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার পরনে সাদা পোশাক। হঠাৎ সে অন্ধকারে ভ্যানিশ হয়ে গেল।
