(ছাব্বিশ)
সারাটা দিন আজ দু’জনের কেটেছে ডালাস শহরের মাইল কুড়ি দূরে প্লেনো বলে একটা জায়গায়। ওখানেই ওঁরা বাচ্চাদের ডিটেনশন সেন্টারখোলার কাজে অনেকটা এগিয়েছেন পলাশ ও রোজিনা। যারা বিল্ডিংটা বানিয়ে দেবেন, সেই কনসালটেন্ট কোম্পানির লোকজনও প্লেনোতে হাজির ছিলেন। এখন ওখানে বিশাল চারতলা পার্কোম্যাট, সেটাই প্রাইভেট জেল করা হবে। সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞরা বললেন, পরিকাঠামোর খুব একটা অদলবদল করতে হবে না। মাস তিনেকের মধ্যে বিল্ডিংটা তাঁরা এমন বদলে দেবেন, বাচ্চাদের ডিটেনশন সেন্টার হিসেবেও মন্দ হবে না। পলাশ সব দেখে শুনে খুব খুশি। এখন মিস লিলি গডউইনের কাছ থেকে সুপারিশ পত্র জোগাড় করা বাকি। কালকেতুভাই তাঁর কাছে নিয়েও যেতে চান। কিন্তু লিলি এখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তার উপর ক্রিসমাসের এক সপ্তাহ আগে থেকে অফিস-কাছারিতে সব গরহাজিরা শুরু হয়ে যায়। ফলে এখন আর কোনও কাজ এগোবে না।
নামকরা অনেকগুলো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ইদানীং তাদের হেড অফিস তুলে নিয়ে গেছে প্লেনোতে। আর একটা নতুন আইটি হাব হতে যাচ্ছে আমেরিকায়। ফলে ক্রমশ গুরুত্ব বাড়ছে জায়গাটার। আমেরিকানরা পারেনও আগাম ভাবতে। প্লেনোতে কর্পোরেট লোকজনের যাতায়াত ভবিষ্যতে বাড়বে, ভেবে নিয়ে ডালাসে ওঁরা তিনটে আলাদা এয়ারপোর্ট বানিয়েছেন। বিকেলবেলায় ডালাস থেকে প্লেনে ওঠার আগে পলাশভাই রোজিনাকে বলছিলেন, ‘দ্যাখেন, দ্যাখেন, আকাশে প্লেনের লাইন লাইগ্যা গ্যাসে। একটার পর একটা প্লেন নামতাসে আর উইড়া যাইতাসে। এয়ার ট্রাফিক কী বিজি। দুই-চাইর বসর পর প্লেনোরে আর চেনা যাইব না।’ প্লেনোর কথা পলাশভাইয়ের মাথায় ঢুকিয়ে ছিলেন রোজিনা। সেজন্য তিনিও খুশি খুশি মনে নিউ জার্সিতে ফিরেছেন।
সারা দিনের ব্যস্ততার পর বাসায় ফিরে অন্যদিন পলাশ আড্ডা মারার জন্য কালকেতুভাইকে ডেকে নেন। কিন্তু আজ রাতে গাড়ি থেকে নেমে রোজিনাই বারণ করেছিলেন, ‘থাউক, আইজ ওঁনারে ডাইকেন না। আফনেরে একডা খবর দেওনের আসে।’
পলাশ অতশত ভেবে কথা বলেন না। দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, ‘জানি, আফনে কী খবর দিবেন। আমার পোইষ্যপুত্তুররা আবার বেচাল কিসু করসে বুঝি?’
পোইষ্যপুত্তুর মানে চিরাগ আর ইমন। রোজই ওদের নিয়ে দু’জনের মধ্যে মন কষাকষি হয়। রোজিনা ওদের বের করে দিতে চান। পলাশভাই ধৈর্য ধরতে বলেন। ছেলে দুটোকে নিয়ে ওঁর কী যেন একটা প্ল্যান আছে। খুলে বলেনও না মানুষটা। রোজিনার আচমকা কী মনে হল, পলাশভাইয়ের মুখটা দু’হাতে টেনে আলতো চুমু দিয়ে বললেন, ‘না মশয়। হ্যারা নতুন কিসু করে নাই। আফনে যান, গোসল রুম থেইক্যা ফ্রেশ হইয়া আসেন। তার পর খবরডা হুইনেন।’
পলাশ বললেন, ‘তাইর আগে কাইলকেতুভাইরে একবার মুখ দেখাইয়া যাই। মানুষডার সাথে দুই দিন কথা হয় নাই। আফনে যান, বেড রুমে গিয়া আমার লইগ্যা ওয়েট করেন।’
ঘাড় নেড়ে রোজিনা বেডরুমের দিকে পা বাড়ালেন। লিভিং রুম থেকে একবার বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখলেন, আউট হাউসে তখনও আলো জ্বলছে। তার মানে জিহাদি ছেলে দুটোর কেউ না কেউ জেগে আছে। ওরা সারাদিন আউট হাউসে কী করে, তা রোজিনা রোজ রাতেই জানতে পেরে যান। আজকাল ফুরসত পেলেই তিনি ক্লোজ সার্কিট টিভি-র মনিটরে চোখ রাখেন। আউট হাউসে চিরাগ আর ইমন নিজেদের মধ্যে কী আলোচনা করে, সবই তিনি পর্দায় দেখতে পান। দরকার মতো পলাশকে তা জানিয়েও রাখেন। ছেলে দুটো অবশ্য সিসিটিভির কথা জানে না। প্রথম যে দিন রোজিনা ওদের দেখেন, সেদিনই তাঁর মনে সন্দেহ জেগেছিল। পলাশও বলেছিলেন, ‘আফনের ধারণাই ঠিক। আপাতত হ্যারা থাউক এহানে। কারে দিয়া কী কাম হয়, কেউ কইতে পারে না। ভবিষ্যতে হ্যারা আমাগো কামেও লাইগতে পারে।’ মানুষটার মাথায় মাঝে মাঝে অদ্ভুত খেয়াল চাপে বটে, কিন্তু উনি নির্বোধ নন।
পাশাপাশি দুটো বেডরুম। একটা পলাশের, একটা তাঁর। মাঝে একটা দরজা আছে। প্রথম প্রথম দরজাটা বন্ধই থাকত। এখন আর তার দরকার হয় না। নিজের বেডরুমে ঢুকে রোজিনা একটু অবাকই হলেন। ভোরবেলায় ডালাস যাওয়ার আগে যে অবস্থায় রেখে গেছিলেন, ঠিক সেই অবস্থায় পড়ে আছে। বিছানা অবিন্যস্ত, একধারে কাত হয়ে পড়ে রয়েছে ল্যাপটপ। ঘরের চেহারা দেখে রোজিনা বুঝতে পারলেন, লারেইনা আজ ঘর গোছগাছ করতে আসেনি। ও যে আসবে না, তাও কিন্তু বলে যায়নি। ঘণ্টায় তিরিশ ডলার রোজগারের আশায় সাধারণত মেয়েটা কামাই করে না। চেষ্টাও করে এ বাড়িতে একটু বেশি সময় দিতে। কিন্তু কী হল মেয়েটার? ওর কথা পড়ে ভাবা যাবে ভেবে, বাইরের পোশাক খুলে ফেললেন রোজিনা।
ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নায় নিজের নগ্ন দেহটা ভাল করে দেখলেন। না এখনও এতটুকু চর্বি জমেনি কোথাও। তলপেটে হাত দিয়ে তিনি বোঝার চেষ্টা করলেন, ভারি ভারি ঠেকছে কী না? নাহ, তেমন কোনও লক্ষণ নেই। অন্যদিন স্নান করার সময় সুগন্ধি জলে ভরা বাথটবে শুয়ে থাকতে রোজিনা ভালবাসেন। কিন্তু আজ সময় নেই। কালকেতুভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে পলাশ এখুনি ফিরে আসবেন। তাই, চুল না ভিজিয়ে শাওয়ার খুলে ঈষৎ উষ্ণ জলে তিনি স্নান সেরে নিলেন। তার পর পাতলা নাইটি পরে বেরিয়ে এসে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, শরীরের চড়াই-উতরাইগুলো কতটা স্পষ্ট, তা দেখার জন্য। নিজের শরীরটা পলাশের হাতে তুলে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করছেন রোজিনা। তার পর সুখবরটা দেবেন।
বিছানা থেকে ল্যাপটপ হাতে তুলে নিয়ে রোজিনা পলাশের ঘরে ঢুকে দেখেন, মানুষটা এখনও ফেরেনি। এখনও ওয়াশরুমে না কি? ভাবতে ভাবতে রোজিনার মনে হল, কাজের ব্যস্ততায় সারাদিন মেল চেক করা হয়নি। এখন দেখে নেওয়া যাক। পলাশের বিছানায় হেলান দিয়ে মোবাইলে মেল চেক করতে লাগলেন তিনি। ব্যাবসা সংক্রান্ত মেলগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ ড্যাডির পাঠানো একটা মেসেজ পেলেন। নিউ মেক্সিকো থেকে ড্যাডি রায়ান দেল বস্কে লিখেছেন, ‘ক্রিসমাসের ছুটি কাটাতে র্যাঞ্চে চলে এসো। অনেকদিন পর আমাদের আত্মীয় স্বজনরা সবাই হাজির থাকবেন। তোমার বাংলাদেশি বয়ফ্রেন্ডকে সবাই দেখতে চান। বিশেষ করে তোমার মাম্মি।’
এমনিতেই মেজাজ আজ ফুরফুরে। তার উপর ড্যাডির মেল পড়ে মন আরও ভাল হয়ে গেল রোজিনার। বছর তিনেক হল, ক্রিসমাসের ছুটিতে তাঁর নিউ মেক্সিকোতে যাওয়া হয়নি। ফি বছর এই সময়টায় পলাশ এসে হাজির হন বাংলাদেশ থেকে। ব্যাবসার কাজে দু’জনই এমন ডুবে যান যে, ক্রিসমাস থেকে নিউ ইয়ারস ইভ, কোথা দিয়ে চলে যায়, টেরও পান না। ড্যাডিকে কী উত্তর দেবেন, রোজিনা ভেবে পেলেন না। পলাশ একটু লাজুক টাইপের। আত্মীয়রা তাঁকে দেখতে চান, বললে উনি আরও যেতে চাইবেন না। একে তো স্প্যানিশ ভাষাটা জানেন না। তার উপর একেবারে মিশুকে নন।
ড্যাডির র্যাঞ্চ নিউ মেক্সিকোর আলবুকার্ক শহরের কাছে। একশো দু’নম্বর ফ্রিওয়েতে। কলম্বিয়ার ড্রাগ রুটের গায়েই পড়ে আলবুকার্ক। ওই শহরেই ড্যাডির তিনশো একর জমি ঘেরা একটা র্যাঞ্চ। সেখানে ঘোড়া, শূয়োর আর ভেড়া প্রতিপালন করা হয়। ছোটবেলা থেকে রোজিনা লোচ্চা টাইপের ড্রাগ মাফিয়াদের দেখতে অভ্যস্ত। কেননা, যাতায়াতের পথে মাফিয়াদের একটা অংশের ঠেক ছিল ড্যাডির র্যাঞ্চ। রাত-বিরেতে ড্রাগ পাচারের মাঝে মদের আসর বসত ক্যাসিনোতে। ড্রাগ মাফিয়াদের কেউ কেউ যে ওঁর দিকে হাত বাড়ায়নি, তা নয়। রোজিনা তাদের এমন হাল করেছেন, দ্বিতীয়বার উত্যক্ত করার সাহস আর কেউ দেখায়নি।
ওয়াশরুম থেকে খুট করে একটা শব্দ হল। ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে রোজিনা দেখলেন, দরজা খুলে পলাশ বেরিয়ে এলেন। ওঁর পরনে স্লিপিং গাউন। এমনিতেই পলাশ বেশ সুপুরুষ, তার উপর নো শেভ নভেম্বর পালন করার জন্য দাঁড়ি রেখেছেন। তাতে আরও রাশভারী লাগছে। রোজিনা নিশ্চিত, আত্মীয়রা কেউ ওঁর পছন্দের নিন্দে করবেন না। ফিয়াসেঁর দিকে এক পলক তাকিয়ে রোজিনা বললেন, ‘ড্যাডি আফনেরে দাওয়াত দিসে পলাশ। ক্রিসমাসের সময় র্যাঞ্চে যাইবেন না হি?’
বিছানায় বসে পলাশ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি লাস ভেগাস যামু ভাবসিলাম।’
মোবাইল সেট টেবলে রেখে রোজিনা দু’হাত উপরের দিকে তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন। এই ভঙ্গিতে তাঁর সুডৌল স্তন দুটো দুলে ওঠে। কোমরটা কত সরু, তা বোঝা যায়। তখন মারাত্মক সেক্সি দেখায়। তিনি জানেন, পলাশ নিজেকে সামলাতে পারবেন না। তাঁকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবেন। ঠিক তাই হল, পলাশ দু’হাত বাড়িয়ে তাঁকে বুকের উপর টেনে নিয়ে ক্লিভেজে মুখ ডুবিয়ে দিলেন। কিন্তু রোজিনা এত সহজে নিজেকে ধরা দেবেন না। যে খবরটা পলাশভাইকে দিতে যাচ্ছেন, তার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করা দরকার। তাই বেষ্টনী ছাড়িয়ে নিয়ে রোজিনা মৃদু ভর্ৎসনা করে বললেন, ‘কী ছেলেমানুষি করেন। ছাড়েন, একডা ইম্পরট্যান্ট কথা হইতাসে। হ্যার মধ্যে আমারে ঠেইস্যা ধরেন কী কইর্যা? জ্বালাতনের শ্যাষ নাই। হোনেন, ড্যাডিরে অনেকদিন দেখি নাই। মন খুব চাইতাসে, এ বার র্যাঞ্চে যাই।’
‘তাইলে চলেন। আফনে খুশ হইলে আমিও খুশ। চলেন, কাইলকেতুভাইরেও সাথে নিয়া চলেন।’
‘কোনও অসুবিধা নাই। কিন্তু আফনের পোইষ্যপুত্তর দুইজনের কী অইব? অগো দুইজনরে কিন্তু এহানে রাইখ্যা যাম না।’
‘ঠিক কইসেন, কহন কে কারে গুলি কইর্যা দিব, অগো বিশ্বাস করা যায় না।’
পলাশের কথা শুনে রোজিনা চুপ করে গেলেন। কাল রাতে আউট হাউসে ইমন আর চিরাগ যখন নিজেদের মধ্যে কথাকাটাকাটি করছিল, তখন মনিটরের সামনে বসে একা সব দেখেছেন রোজিনা। কী নিয়ে ওরা ঝগড়া করছিল, তাও তিনি শুনেছেন। ভাগ্যিস, সেই সময় লিভিং রুমে বসে পলাশ ড্রিঙ্ক করছিলেন কালকেতুভাইয়ের সঙ্গে। ঝগড়ার কারণটা পলাশকে বলেননি রোজিনা। শুধু বলেছেন, তর্কাতর্কিটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, চিরাগ পিস্তল তাক করে ইমনকে শাসিয়েছে। ওর কাছে পিস্তল আছে, সেটা রোজিনা জানতেন না। মনে হয়, ওদের দলের যে ছেলেটিকে চিরাগ কাল বাংলোতে নিয়ে এসেছিল, সে হাতিয়ারটা দিয়ে গেছে।
পিস্তল গায়েব করে দিতে রোজিনার অবশ্য খুব বেশি সময় লাগবে না। লারেইনাকে বলে দিলে, আউট হাউস গোছগাছ করার সময় পিস্তলটা ও হ্যাপিশ করে দিতে পারে। বাইশ-তেইশ বছরের পূর্ণ যুবতী। খুব বুদ্ধিমতী, সাহসী এবং বিশ্বস্ত। রোজিনা জানেন, পুলিশে চাকরি করার খুব ইচ্ছে লারেইনার। উৎসাহ দিয়ে আলবুকার্ক থেকে তিনিই মেয়েটাকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে এসেছেন। দরকার-অদরকারে ওকে টাকা পয়সা দিয়েও সাহায্য করেন। ইদানীং একটা বয়ফ্রেন্ডও জুটিয়েছে বোধহয়। রোজিনার চোখে পড়েছে, সেই ছেলেটা প্রায়ই গাড়ি করে ওকে নামিয়ে দিয়ে যায়। পিস্তল চুরি করা কেন, তিনি বললে লারেইনা ছলাকলায় বিছানায়ও টেনে নিয়ে যেতে পারে চিরাগকে। তার পর ধর্ষণের অভিযোগ তুলে ওর বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে।
চিরাগ ছেলেটাকে একদম সহ্য করতে পারেন না রোজিনা। ওর চোখ দেখলেই বুঝতে পারেন, সারা শরীরটা যেন চেটেপুটে খেতে চায়। জিহাদি জীবন কাটিয়ে এসেছে। হয়তো দীর্ঘদিন নারীসম্ভোগ করতে পারেনি। ওর কাম আরও বাড়িয়ে তোলার জন্য মাঝে মধ্যে ছেলেটাকে কাছে ডাকেন রোজিনা। মৃদু ভর্ৎসনাও করেন। অতিরিক্ত কামমোহিত হলে পুরুষরা বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়। তাই ইচ্ছে করেই,ওর যৌন আকাঙ্ক্ষায় সুড়সুড়ি দেন রোজিনা। চিরাগের দৌড় পরীক্ষা করবেন বলে। রেন্ডি বলে গাল দেওয়ার শোধটা এমনভাবে তুলবেন তিনি, যাতে ছেলেটা সারা জীবন মনে রাখে। নিজের উপর বিশ্বাস আছে রোজিনার। কেননা, ড্যাডির র্যাঞ্চে, চিরাগের চেয়েও বেশি খতরনাক ছেলেদের শায়েস্তা করেছেন তিনি।
‘কালকেতুভাইয়ের সাথে একবার পরামর্শ কইরবেন না হি?’ কথাটা বলেই পলাশ ওকে বুকের উপর টেনে নিলেন।
উফফ, মাথায় ঘিলু বলে কি কিছুই নেই মানুষটার? সারা শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে উত্তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছে। এইসময় কালকতুভাইয়ের কথা মনে আসে কী করে? স্লিপিং গাউনের ফাঁসটা একটানে খুলে দিয়ে রোজিনা টানটান হয়ে শুয়ে পড়লেন পলাশের শরীরের উপর। তার পর ফিসফিস করে বললেন, ‘প্লিজ অহন ওঁনার কথা থাউক। আগে আমারে ভালা কইর্যা আদর কইর্যা দ্যান।’ বলতে বলতে রোজিনা পলাশের ঠোঁট আলতো করে কামড়ে ধরলেন।
পলাশকে তাতিয়ে তোলার জন্য এটুকু ইঙ্গিতই যথেষ্ট। এর পরই চুম্বনের ঝড় উঠে যায়। সেই ঝড় থামতে মিনিট কুড়ি সময় লাগে। বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতাও তখন থাকে না রোজিনার। আজ কি একটু বেশি সময় নিলেন পলাশ? পাশে টানটান হয়ে শুয়ে রয়েছেন উনি। বুকটা হাঁপড়ের মতো ওঠা-নামা করছে। সেই বুকে মাথা রেখে রোজিনা বললেন, ‘আমারে জড়াইয়া ধরেন পলাশ। শরীরডা ঝিমঝিম করত্যাসে।’
পাশাপাশি দুটো ঘরের দরজার আগল যেদিন প্রথম খোলা হয়, সেদিনও একই কথা বলেছিলেন রোজিনা। শরীরটা ঝিমঝিম করত্যাসে। সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। সেই রাতে ও দিকের দরজায় টোকা মেরেছিলেন পলাশ। দরজা খুলে দিতেই বিছানা থেকে তাঁকে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে গেছিলেন নিজের ঘরে। দু’জনেই বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁরা অনভিজ্ঞ। পরদিন সকালেই আলবুকার্কে ফোন করে তাঁর বাংলাদেশি মাম্মিকে রোজিনা জানিয়ে দিয়েছিলেন, কী ঘটেছে। পলাশ বাংলাদেশি জানার পর মাম্মি খুব খুশি হন। কিন্তু সেইসঙ্গে সতর্কও করে দিয়েছিলেন, ‘বিয়া করার আগে কিন্তু বাচ্চা-কাইচ্যার কথা ভাইবো না রোজি মা। মনে রাইখো, তোমার বয়ফ্রেন্ড নন-আমেরিকান। হ্যারে বিয়া করার অনেক আইনি জটিলতা। হ্যায় কিন্তু চট কইর্যা আমেরিকান সিটিজেনশিপ পাইব না।’ মায়ের কথা অবশ্য রাখতে পারেননি রোজিনা। সেই খবরটাই আজ পলাশকে দিতে চাইছেন। প্রেগনেন্সির খবরটা তিনি আজই জানতে পেরেছেন ক্লিনিক থেকে।
হঠাৎই পলাশের ফোনটা বেজে উঠল। এত রাতে কে ফোন করতে পারে? ফোনের পর্দায় পলাশ সোয়াইপ করতেই ও প্রান্ত থেকে কেউ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইজ ইট পলাশ? নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে স্টিভ ম্যাকউইন বলছি।’
একটু অবাক হয়ে রোজিনার দিকে তাকিয়ে পলাশ বললেন, ‘পলাশ হিয়ার। এত রাতে…’
‘লারেইনা পেরেজ বলে কোনও মেয়েকে আপনি চেনেন?’
‘চিনি। আমার বাড়িতে কাজ করতে আসে।’
‘আমাদের কাছে কমপ্লেন এসেছে, আজ সকাল থেকে মেয়েটা নিখোঁজ। তাকে শেষবারের মতো দেখা গেছে আপনার বাড়িতে ঢুকতে। মেয়েটা কোথায়, আপনি কি জানেন?’
স্পিকারে দু’জনের কথাবার্তাই শুনতে পাচ্ছেন রোজিনা। তিনি তাড়াতাড়ি বিছানায় উঠে বসলেন। লারেইনা এ বাড়িতে আজ এসেছিল? কই, না তো? ফিসফিস করে কথাটা পলাশকে জানাতেই উনি পুলিশকে একই কথা জানিয়ে দিলেন। ও প্রান্ত থেকে পুলিশ অফিসার বললেন, ‘ঠিক আছে। পরে আপনার সঙ্গে ফের কথা হবে।’ বলে ফোনের লাইন কেটে দিলেন।
লারেইনা কি সত্যিই এ বাড়িতে এসেছিল? কালকেতুভাই বলতে পারবেন। কিন্তু এত রাতে তাকে ডিসটার্ব করা কি উচিত হবে? ওর কথা আর বলতে পারে, পলাশের দুই পোষ্যপুত্তুর। ওরাও সারাদিন বাড়ির বাইরে কোথাও যায়নি। ওদের কথা মনে হওয়া মাত্র একটা আশঙ্কা অনুভব করলেন রোজিনা। নগ্ন অবস্থাতেই তিনি বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লেন। তার পর সিসিটিভি ক্যামেরা অন করে খুঁজতেই দেখলেন, হ্যাঁ, সত্যিই, গেটের সামনে গাড়ি থেকে নেমে লারেইনা হাত তুলে বয়ফ্রেন্ডকে বিদায় জানাচ্ছে। তার পরই ওর কাছে একটা ফোন এল। কথা বলতে বলতে লারেইনা ক্যামেরার ফোকাস থেকে সরে গেল।
