(একুশ)
নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরে গাড়ি গ্যারাজে ঢুকিয়ে ইমন বুঝতে পারল না, মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকবে কি না? সারাদিন গাড়িটা আনলক করা ছিল। গাড়ির রিমোটই যে ওর কাছে ছিল না। আউট হাউসের দিকে পা বাড়ানোর আগে কালকেতুকে ও বলল, ‘ছ্যার। রোজিনা ম্যাডামরে কইয়া দিবেন, গাড়ির দরজা খুলা আসে। রিমোট দিয়া হ্যায় য্যান লক কইর্যা দ্যান।’
কালকেতুছ্যার বললেন, ‘রোজিনা ম্যাডাম জানেন। ফোনে ওঁর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। তাও তুমি একবার নিজে গিয়ে বলো।’
বাধ্য হয়ে ইমন মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকল। রোজিনা ম্যাডামের মুখোমুখি হতে ওর ইচ্ছে করে না। ভদ্রমহিলার চোখের চাউনিটা এমন, যেন মনের ভিতরটাও পড়ে ফেলতে পারেন। কালকেতুছ্যার গেস্ট রুমে ঢুকে যাওয়ার পর, লিভিং রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ইমন দেখল, মুখোমুখি সোফায় রোজিনা ম্যাডাম কাগজপত্তর নিয়ে বসেছেন পলাশছ্যারের সঙ্গে। দু’জনে কথা বলায় ব্যস্ত। হঠাৎ মুখ তুলে ওকে দেখামাত্রই পলাশছ্যার বললেন, ‘আইসো ইমন, আইসো। এত দেরি হইল ক্যান? তুমি না হি আইজ ম্যাজিক দ্যাখাইস?’
রোজিনা ম্যাডাম সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, ‘গাড়ির লক তুমি খুললে কী করে ইমন?’
ইমন বলল, ‘জ্বী ম্যাডাম, ম্যাজিক না। জানলার রাবার সরাইয়া, চাপ দিতেই কাচ নাইম্যা গেল। তহন হ্যান্ডেল দিয়া দরজা খুলতে অসুবিধা হয় নাই।’
‘আইজ ব্রুকলিন ব্রিজ দিয়া কোথায় গেসিলা?’
শুনে ভিতরে ভিতরে চমকে উঠল ইমন। আজ সত্যিই কাইলকেতুছ্যারকে ড্রপ করার পর ও ব্রুকলিন ব্রিজ পেরিয়ে তৌফিকের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিল। ম্যাডাম জানলেন কী করে? জিপিএস মারফৎ জানা যায়, গাড়ি সারাদিনে কোথায় কোথায় ট্র্যাভেল করেছে। কিন্তু রোজিনা ম্যাডাম তো সেটাও চেক করার সুযোগ পাননি। ওঁর মোবাইল ফোন বা হাতঘড়িতেও কি কোনও অ্যাপস লাগানো আছে? যা দিয়ে উনি গাড়ির গতিবিধি জানতে পারেন? তৌফিকের সঙ্গে আজ দেখা হয়নি। তাই উত্তর দেওয়ার সময় ইমন চেষ্টা করল চিরাগের মতো স্মার্ট হতে, ‘ম্যাডাম, ব্রুকলিন ব্রিজের ঠিক নিচেই মিরচি বইল্যা একডা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আসে। সেহানে বিরিয়ানি খাইতে গেসিলাম। পাবলিক স্টোরেজে কাম করনের সময় ওহানে রোওজ খাইতে যাইতাম। রেস্টুরেন্টের হক্কলে আমার চেনা।’
শুনে পলাশছ্যার সোৎসাহে বলে উঠলেন, ‘আরে বাঃ, ওহানে কি হায়দরাবাদি বিরিয়ানি পাওয়া যায়? অনেকদিন খাই নাই। চলেন ম্যাডাম, সবাই মিইল্যা কাইল হ্যায় রেস্টুরেন্টে খাইয়্যা আসি।’
রোজিনা ম্যাডাম ওর দিকে পলকহীন তাকিয়ে আছেন। ইমন পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। রেস্টুরেন্টে কেউ ওকে চেনে না। মাত্র একবারই তৌফিকের কল্যাণে ও ওখানকার বিরিয়ানি খেয়েছে। সেটা হায়দরাবাদি না রাওয়ালপিণ্ডির, ও জানে না। পলাশছ্যাররা সবাই মিলে যদি ওই রেস্টুরেন্টে যান, তা হলে ও ধরা পড়ে যাবে। ইমন সামলে নেওয়ার জন্য বলল, ‘ছ্যার, হ্যায় রেস্টুরেন্ট আফনেগো মতো হাই ফাই মাইনষের জইন্য না। ওহানে গেলে আফনেরা কম্ফর্টেবল হইতে পারবেন না।’
রোজিনা ম্যাডাম হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বন্ধু কোথায় ইমন? ঘরে নেই দেখলাম।’
ইমন একটু অবাক হওয়ার ভঙ্গি করল, ‘জানি না ম্যাডাম। ঠিক দ্যাখসেন? ওয়াশরুমে যাইতে পারে। হ্যারে পাঠাইয়া দিম না হি?’
পলাশছ্যার বললেন, ‘না, না। আসলে কী হইসে জানো। তোমাগো ঘরে যে টিভিটা আসে, তাতে ইয়াপ চ্যানেল লাগাইয়া দিলাম। যাতে তোমরা ইন্ডিয়া আর বাংলাদ্যাশের টিভি চ্যানেলগুলা এহানে বইস্যা দ্যাখতে পারো। দ্যাশে কী হইতাসে, তোমাগো জানা দরকার। জিটিভি, এবিপি আনন্দ, এটিএন, বিটিভি… সব দেইখতে পাইবা।’
‘থ্যাঙ্কয়ু ছ্যার।’ ইমন উচ্ছ্বসিত হওয়ার ভান করল। দেশের খবর জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ওর নেই। কিন্তু ও এমন কিছু করবে না, যাতে রোজিনা ম্যাডামের সন্দেহ হতে পারে। ভদ্রমহিলা খরদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে। ওঁর চোখের দিকে তাকালেই মনে হয়, এই জিজ্ঞেস করে বসবেন, ‘আমারে চকমা দিতে পারবা না। তোমাগো হিস্ট্রি আমার জানা আসে।’ লিভিং রুমে থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসার জন্য ইমন বলল, ‘ছ্যার, কাইল কহন আমাগো লাইগব কইয়্যা দ্যান। রেডি থাকুম।’
রোজিনা ম্যাডাম বললেন, ‘হোনো, কাইল হক্কালে তোমরা দুইজন আউট হাউসে থাকবা না। লারেইনা গিয়া রুম সার্ভিস কইর্যা আইব। যা অবস্থা করস, কওনের না।’
‘জ্বী ম্যাডাম। থাকুম না। অহন আমি যাম? চিরাগ আমার জইন্য বইস্যা আসে। আমি গেলে হ্যায় ডিনারে বইসব।’
হাত নেড়ে ওকে চলে যেতে বলে পলাশছ্যার ফের কাগজপত্রে মন দিলেন। লিভিং রুমের বাইরে বেরিয়ে ইমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। টাকাপয়সা থাকলে মানুষ কী না করতে পারে? পাঁচ বছর আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর, ইমন আর বাংলা চ্যানেল দেখার সুযোগ পায়নি। ক্যালিফেটে ইংলিশ আর আরবি চ্যানেলগুলো দেখতে ওর মোটেই ভাল লাগত না। প্রথম দু’তিনটে বছর তো ভাষাই বুঝতে পারত না। পরে আরবি আর ফারসি ভাষাটা মোটামুটি রপ্ত করতে পেরেছে। কসোভোয় থাকতে ও বিবিসি দেখত। কানাডা ও আমেরিকায় এসে ওরা সিএনএন বা এনবিসি দেখার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু এইসব চ্যানেল দেখলে বুকের ভিতরটা ভয়ে এখন শিরশির করে। মনে হয়, জিহাদিদের ধোঁকা দিতে পারলেও, এফবিআইয়ের নজর ওরা এড়াতে পারবে না।
আউট হাউসে ঢুকে ইমন দেখল, সোফায় বসে চিরাগ বাংলা চ্যানেল দেখছে। বাংলায় কোনও মহিলা ভাষণ দিচ্ছেন। গলার স্বরটা শুনে ওর চেনা চেনা লাগল। প্রাইম মিনিস্টার বিলকিস বেগম। উনি কী বলছেন, তাতে কান দেওয়ার আগে, ওকে দেখে চিরাগ টিভিটা বন্ধ করে দিল। জিজ্ঞেস করল, ‘তোর এত দেরি হল? আমি তো ভাবলাম, এফবিআই তোকে ধরে ফেলেছে।’
গা থেকে হুডিটা খুলতে খুলতে ইমন বলল, ‘নিউ ইয়র্ক থেইক্যা রওয়ানা দিলাম সাড়ে চাইরটায়। বাসায় ফিরতেই পলাশছ্যার ডাইক্যা কথা কইলেন। তুই হারাডা দিন করলিডা কী, ক?’
‘দুপুরে বসে বসে ইন্ডিয়ান চ্যানেলে কুরবান বলে হিন্দি সিনেমা দেখছিলাম। আমাদের মতো জিহাদিদের নিয়ে গল্প। লন্ডন মেট্রোতে আল কায়দার লোকেরা কয়েকবছর আগে ব্লাস্ট করেছিল। সেই ঘটনাটাই ঝেড়ে দেওয়া। হিরো সেফ আলি খান।’
‘তর কথা শুইন্যা মনে হইতাসে, ভালা লাগে নাই।’
‘লাগবে কী করে? ফিল্ম বানালেই হল? আরে, ক্যালিফেটে একজন জিহাদি কেমনভাবে থাকে, তার অভিজ্ঞতা না থাকলে কী করে ফিল্ম দাঁড়াবে? নবাবের ব্যাটাকে দিয়ে কি জিহাদির রোল করানো যায়? শেষের দিকটা ভাল লাগছিল না। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে দেখি, বাংলা চ্যানেল এসে গেছে।’
হাতে ধরা হুডিটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলল ইমন। তার পর ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে বলল, ‘হালায় হারাডা দিন একবারই পানি প্যাটে গ্যাসে। টাকরা শুকাইয়া আইসে।’ বলে ঢকঢক করে পানি খেতে লাগল। প্রায় হাফ বোতল খালি করে দেওয়ার পর ঢেকুর তুলে বলল, ‘আইজ কী কাণ্ড হইসে, জানস? তর ধারণাই হত্য হইয়া যাইত। ইন্টারপোলের যে অফিসার আমাগো দুইজনরে ধরার জইন্য নিউ জার্সিতে আইসে, হ্যারে ড্রাইভ কইর্যা আমি নিউ ইয়র্কে পৌঁছাইয়া দিলাম।’
সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিরাগ বলল, ‘সে কী, উনি তোর গাড়িতে উঠলেন কী করে?’
‘হ্যায় কাইলকেতুছ্যারের ফ্রেন্ড। আমাগো মতো বাঙালি। হারাডা রাস্তা জিহাদিগো কথা কইতে কইতে গ্যালেন। হ্যার মুখেই হোনলাম..,’ বলতে বলতে ইমন থেমে গেল।
চিরাগ ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘থেমে গেলি কেন, বল।’
‘হুনলে তর ভালা লাইগব না, থাক।’
‘না, না, তবুও তুই বল।’
‘তুই হেইদিন যে স্বপ্নডা দেখসিলি, হেইডা সত্যি হইয়া গ্যাসে। হিন্দু মৌলবাদীরা তর আববুরে গুলি কইর্যা মারসে। তগো বাসা জ্বালাইয়া দিসে। তর মা আর বুইন করিমগঞ্জের বাসস্ট্যান্ডের কাসে একটা ঝুপড়িতে গিয়া উঠসে।’
শুনে চিরাগ থম মেরে গেল। তার পর হাঁটু গেড়ে প্রার্থনার ভঙ্গিতে কার্পেটের উপর বসে পড়ল। ওর চোখের পাতা বোজা। মুখের পেশিগুলো ক্রমশ শক্ত হচ্ছে। কয়েকদিন আগে চিরাগ যখন ওই স্বপ্নটা দেখার কথা বলেছিল, তখন ওকে আবেগপ্রবণ মনে হচ্ছিল। আজ খবরটা শুনে ওকে তেমন বিচলিত বলে মনে হল না। স্বপ্নের সত্যি-মিথ্যে, ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় ও আগ্রহই দেখাল না। অথচ ক্যালিফেটে থাকার সময় নিজের মতো করে ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারত। একবার তো ওর সঙ্গে এক সিরিয়ান জিহাদির হাতাহাতির অবস্থা হয়েছিল। এন্টারটেনমেন্ট রুমে হিন্দি সিনেমা ‘শোলে’ দেখার পর সেই সিরিয়ান ছেলেটা হেমা মালিনীকে জড়িয়ে একটা কুৎসিত স্বপ্নের কথা বলেছিল। শুনে চিরাগ সহ্য করতে পারেনি। এটা সেইসময়কার কথা যখন জিহাদিদের যৌনস্বপ্ন দেখা পাপ। তখনও হস্তমৈথুনের অনুমতি দেননি ক্যালিফরা।
জিহাদিদের আলোচনার প্রিয় বিষয় ছিল স্বপ্ন। নিজের দেখা স্বপ্ন নিয়ে কথা বলার থেকে জিহাদিরা অনেক বেশি পছন্দ করত অন্যের দেখা স্বপ্ন নিয়ে মতামত দিতে। ক্যালিফ বলতেন, স্বপ্নের গুরুত্ব অপরিসীম। উনি ওসামা বিন লাদেনের প্রসঙ্গ টেনে আনতেন। ইমন নিজের কানে শুনেছে, ক্যালিফ একদিন বলেছিলেন, আমেরিকায় টুইন টাওয়ার অ্যাটাকের এক বছর আগে লাদেন স্বপ্নে দেখেছিলেন, পাইলটের বেশে জিহাদিরা ফুটবল ম্যাচ খেলছে আমেরিকান টিমের সঙ্গে। স্বপ্নের অর্থটা না কি লাদেন ধরে ফেলেছিলেন। তখনই ঘনিষ্ঠ লোকদের ডেকে বলেন, আমেরিকানদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য এমন কোনও প্ল্যান বানাও, যাতে পাইলটদের দরকার হয়। সেই প্ল্যানেরই চূড়ান্ত পরিণতি টুইন টাওয়ারে বিমান হানা। ইমনের মনে পড়ল, আববুর মৃত্যু দেখার স্বপ্নটাকে নিয়ে মাঝে একদিন চিরাগ ব্যাখ্যা করেছিল এই বলে, ‘আমার জীবনে খুব শিগগির আনএক্সপেক্টেড কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’
খানিকক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়ে চিরাগ বলল, ‘তোর কি মনে হয়, ইন্টারপোল অফিসারটা যা তোর সামনে আলোচনা করছিল, সেটা ঠিক?’
‘তর অবিশ্বাস হওয়ার কারণ?’
‘দ্যাখ, পুলিশ ভয় দেখানোর জন্য অনেক সময় বানিয়ে বানিয়ে আজগুবি কথা বলে। কিন্তু তোর কথা থেকে একটা জিনিস বুঝতে পারছি, আমাদের সম্পর্কে কিছু না কিছু খবর ওই ভদ্রলোকের কাছে আছে। উনি আমার সম্পর্কে যা বলেছেন, সেটা যাতে আমার কানে তুই পৌঁছে দিস, সেই কারণেই বলেছেন। সাইকোলজিক্যাল প্রেসার দেওয়ার জন্য। ভদ্রলোককে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না। আবার অস্বীকারও করছি না। উনি আর কী কী বলছিলেন, মনে করে বল তো।’
যতটুকু মনে ছিল, ইমন ধীরে ধীরে সব বলল। জিহাদিদের মাফ করে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হবে, এই কথাটা শোনার পর চিরাগ বলে উঠল, ‘ব্যাস, ব্যাস, আর বলার দরকার নেই। আমি সব বুঝতে পারছি। উনি যা বলেছেন, তার দশ পার্সেন্টও যদি সত্যি হয়, তা হলেও ধরে নে, আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ক্যালিফেটে ফিরে গেলে আমেরিকানদের বোমায় মরতে হবে। দেশে ফিরে গেলে হিন্দুদের মাঝে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হয়ে বাঁচতে হবে। আর যদি এফবিআইয়ের হাতে ধরা পড়ি, তাহলে সারা জীবন জেলে পচে মরতে হবে। কুইক, খুব কুইক, ঠান্ডা মাথায় আমাদের ডিসিশন নিতে হবে ইমন। আমরা কোন জীবনে ফিরে যাব।’
চিরাগের মুখে হতাশাজনক কথা শুনে ইমন দমে গেল। গোসল করার জন্য উঠে ও ওয়াশরুমের দিকে গেল। হাতে চোট লাগার পর থেকে অনেকদিন ও ডান হাত ব্যবহার করতে পারত না। ক্ষতের জায়গায় যাতে জল লেগে না যায়, তার জন্য বাঁ হাতে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিত। ডান হাতের গ্লাভস আর ব্যান্ডেজ খুলে ও দেখল, ঘা অনেকটা শুকিয়ে এসেছে। সিরিয়ান হেকিমদের ভেষজ দাওয়াই অব্যর্থ। তৌফিক বলেছিল, ক্ষতের দাগ একেবারে মিলিয়ে যাবে। মলম প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সেই মলমই আনার চেষ্টায় ও আজ তৌফিকের সঙ্গে দেখা করতে গেছিল। কিন্তু দেখা পায়নি।
বাঁ হাতে মুখে জলের ঝাপটা দেওয়ার পর আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে ইমন চমকে উঠল। এ কী চেহারা হয়েছে! আত্মীয়-স্বজনরা প্রায় সবাই বলত, ‘তুই তর দাদামশয়ের চেহারা পাইছস। ইয়াং এজ-এ বন্দুক লইয়া তর দাদামশয় যখন বাঘ শিকার কইরতে যাইত, তখন হ্যারে নবাবজাদা বইল্যা মনে অইত।’
বাংলাদেশ হওয়ার পর থেকেই না কি দাদামশায়ের চেহারা ভাঙতে শুরু করে। এই দাদামশায়কে নিয়ে ইমনের মনে একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব ছিল। কিন্তু সেই গর্বে চিড় ধরতে শুরু করে, স্কুলে নিচু ক্লাসে পড়ার সময়। তখন বন্ধুদের অনেকেই তাচ্ছিল্য করে ওকে বলত, ‘তুই তো রাজাকারের নাতি।’ রাজাকার কথাটা মানে বোঝার বয়স তখনও ইমনের হয়নি। স্কুলে উঁচু ক্লাসে পড়ার সময় মানেটা ও বুঝতে পারে, অর্থাৎ কি না দেশদ্রোহী। তখন মনের মধ্যে একটা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, দাদামশয়ের যদি কখনও মনে হয়েই থাকে, পাকিস্তান দেশটাকে দ্বিখণ্ডিত করা উচিত নয়, তা হলে তিনি কি ভুলটা করেছিলেন? প্রত্যেকটা মানুষের একটা নিজস্ব রাজনৈতিক মতামত থাকতেই পারে। এই যে চাকমারা নিজেদের জন্য আলাদা ভূখণ্ড চাইছে, ওরাও কি তা হলে দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত হয়ে থাকবে? মুক্তিযোদ্ধারাও তো তা হলে একটা সময় দেশদ্রোহী ছিল। এখন তাঁরা কেউ বীর, কেউ শহিদ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংজ্ঞাটা কেমন পাল্টে যায়!
চোখ-মুখে পানির ঝাপটা দেওয়ার সময় চিরাগের প্রশ্নটা ইমনের মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে লাগল। কোন জীবনটা ওদের বেছে নিতে হবে? সত্যিই কি কাইলকেতুছ্যারের ফ্রেন্ড গাড়িতে বসে ইচ্ছে করে জিহাদিদের সম্পর্কে আশাব্যঞ্জক কথাগুলো বলছিলেন। তা হলে কি চিরাগের ধারণাই ঠিক, কোনওভাবে উনি আন্দাজ করেছেন, ওরা জিহাদি? যদি তা-ই বুঝতে পারতেন, তা হলে গ্রেফতার করছেন না কেন? এলোমেলো ভাবনাগুলো মন থেকে ইমন সরিয়ে দিল।
তার পর ওয়াশরুম থেকে ঘরে ফিরে এসে দেখল, চিরাগ ডিনার সাজাচ্ছে। নান, তন্দুরি চিকেন আর ডাল মাখনি। মাইক্রোওভেনে সদ্য গরম করেছে। তন্দুরি চিকেন থেকে ধোঁয়া উঠছে। কাছেই নিউ জার্সির ইন্ডিয়ান পাড়া। সেখানকার কোনও দোকান থেকে বোধহয় চিরাগ কিনে এনেছে। খেতে খেতে বাংলা কোনও চ্যানেল দেখবে। ভেবে টিভির রিমোট খুঁজতে লাগল ইমন। কিন্তু চিরাগ ওকে বলল, ‘এখন টিভি খুলিস না প্লিজ। আগে খেয়ে নে। তার পর ইচ্ছে হলে দেখিস।’
খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত চিরাগ কোনও কথা বলল না। কাচের প্লেট দুটো ধুয়ে ও র্যাকে সাজিয়ে রাখল। তার পর ওর দিককার আলো নিভিয়ে, সেঁধিয়ে গেল কম্ফর্টারের ভিতর। সোফায় বসে ইমন টিভি চালাতেই দেখল, পর্দায় কোথাও বিক্ষোভের ছবি দেখাচ্ছে। আরে, এ তো ঢাকার বায়তুল মোককারম মসজিদের রাস্তা। একদল লোক দোকানপাট ভাঙচুর করছে। পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে তাদের তাড়া করেছে। কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটাচ্ছে। নিউজ রিডারের গলা শুনতে পেল ইমন, ‘আজ মণিরুল চৌধুরির ফাঁসির খবর প্রচার হওয়ার পরই জামায়েতি সমর্থকরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বায়তুল মোককারম চত্বর থেকে সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার সর্বত্র। জামায়েতিদের ঠেকানোর জন্য কোথাও কোথাও পুলিশকে গুলি চালাতে হয়েছে। রমনায় তিনজন জামায়েতি পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন। ধানমণ্ডীতে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের বাসার সামনেও বিডিআর-কে গুলি চালাতে হয়েছে।’
তা হলে সত্যিই দাদামশয়ের ফাঁসি হয়ে গেল! খবরটা শুনতে শুনতে কেঁপে উঠল ইমন। টিভির পর্দায় দাদামশয়ের ছবি। নিউজ রিডার বলছেন, ‘গতমাসেই সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রাজাকার মণিরুল চৌধুরির ফাঁসির সাজা শুনিয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য খুনের মামলা চলছিল। সবথেকে মারাত্মক অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমোদপুরের কালীমন্দিরের কাছে কিছু গ্রামবাসীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা। অভিযোগ প্রমাণিত, মিথ্যা খবর দিয়ে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বিভ্রান্ত করেছিলেন। তাঁরই প্ররোচনায় ভারতীয় সেনা আমোদপুরে বোমাবর্ষণ করে। মণিরুল চৌধুরিকে কবে ফাঁসি দেওয়া হবে, তা গোপন রাখা হয়েছিল। সোমবার গভীর রাতে তাঁর পুত্রবধূ সাজেদা বেগমকে সেন্ট্রাল জেলে নিয়ে আসা হয়। ভোর পাঁচটায় শাস্তির সাজা কার্যকর করা হয়। ফাঁসির আগে মণিরুল চৌধুরি তাঁর অন্তিম ইচ্ছার কথা পুত্রবধূকে জানিয়ে গিয়েছেন।’
সাজেদা বেগম মানে ওর আম্মি। দাদামশায় কোন অন্তিম ইচ্ছের কথা আম্মিকে জানিয়ে গেলেন? খবরটা শুনতে শুনতে চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল ইমনের। এই কারণেই কি চিরাগ ওকে ঘরে ঢুকতে দেখে টিভি বন্ধ করে দিয়েছিল? যাতে দাদামশয়ের ফাঁসির খবরটা ওকে শুনতে না হয়? হঠাৎ ইমনের ইচ্ছে হল, চিরাগের কাছে গিয়ে বলে, ‘এই ওঠ। চল, আমরা আবার ক্যালিফেটে ফিরে যাই।’
