জিহাদি – ১৬

(ষোলো)

লিভিং রুমে ঢুকে ইমন দেখল, ডাইনিং টেবলে বসে দাবা খেলছেন পলাশছ্যার আর কালকেতু নন্দী বলে সেই ইন্ডিয়ান। দেখেই ওর দাদামশায়ের কথা মনে পড়ল। ছোটবেলায় দাদামশায়ের কাছে ও দাবা খেলা শিখেছিল। এত ভাল শিখেছিল যে, পরপর তিন-চারটে চাল আগাম ভেবে নিতে পারত। ঢাকায় তখন নিয়াজ মুর্শেদের খুব নাম। প্রথম বাঙালি গ্র্যান্ডমাস্টার দাবাড়ু। দাদামশায় বলতেন, ‘তুই চেষ্টা কইরলে নিয়াজ মুর্শেদ হইতে পারবি।’ ওদের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে একবার অতিথি হিসাবে এসেছিলেন মুর্শেদ। ওকে দেখে ইমনের তখন খুব ইচ্ছে হয়েছিল, সিরিয়াসলি দাবা খেলাটাকে নেবে। কিন্তু সব ওলট পালট হয়ে গেল।

বোর্ডে বোড়ের অবস্থাগুলো একনজর দেখেই ইমন বুঝতে পারল, ঘোড়ার একটা চাল ঠিকমতো দিতে পারলে পলাশছ্যার কিস্তিমাত করতে পারবেন। কিন্তু অন্য একটা চাল দিতে গিয়ে মুখ তুলে, ওদের দু’জনকে দেখে ফেললেন উনি। তারপর বললেন, ‘আইস ইমন। একডা ইম্পরট্যান্ট কথা আসে তোমাগো সাথে।’

শুনে বুক গুড়গুড় করে উঠল ইমনের। ওদের সম্পর্কে পলাশভাই সব জেনে ফেলেছেন না কি? গতকাল রাতেই চিরাগ একবার বলেছিল, ‘রোজিনা ম্যাডাম যদি আমাদের পিছনে বেশি স্পাইং করেন, তা হলে ফল ভাল হবে না বলছি। আমার হাতের টিপ তো তুই জানিস। এই ঘরে বসেই ওর কপাল ফুঁটো করে দেব। কাকপক্ষীও টের পাবে না।’ কথাটা শুনে ইমন একটু অবাকই হয়েছিল। রোজিনা ম্যাডাম কীভাবে স্পাইং করছেন, কখন করছেন, সেকথা ভেবে। দু’দিন ধরে ও দেখছে, চিরাগ খুব অস্থির। যা বলছে, তা করেও ফেলতে পারে। ওর প্রাণে দয়া-মায়া বলে কিছু নেই। ও মনে মনে আল্লাহকে ডাকল, কথায় কথায় পলাশছ্যার যেন এখন এমন কিছু বলে না বসেন, যাতে চিরাগ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বিনম্র মুখে ও বলল, ‘জ্বী ছ্যার, কন, কী কইবেন।’

‘হোনো, কাইল হগালে তোমাগো একজনরে একবার নিউ ইয়র্ক যাইতে অইব। কীভাবে যাইব্যা, কও?’

 প্রশ্নটা শুনে ইমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু একটু অবাকও হল। কীভাবে যাবে মানে? জিপিএস দেখেই তো চলে যাওয়া যায়। নিউ ইয়র্ক থেকে পালিয়ে আসার দিন ওরা আই টু সেভেন্টি এইট ফ্রিওয়ে ধরে এসেছিল। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার মতো লেগেছিল। উত্তরে ইমন সেই কথাটাই বলল।

‘এই ছ্যার কাইল হগালে নিউ ইয়র্ক যাইব।’ কালকেতুকে দেখিয়ে পলাশভাই বললেন, ‘ইন্ডিয়ার খুব মানী লোগ। খবরের কাগজের রিপোর্ডার। যত্ন কইর‌্যা লইয়্যা যাইবা, ক্যামন?’

চিরাগ মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে। ইমন কিন্তু হাতজোড় করে নমস্কার জানিয়ে কালকেতুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কখন যাইবেন ছ্যার? টাইমটা জানাইলে ভালা হয়।’

দাবার বোর্ড থেকে মুখ তুলে কালকেতু বললেন, ‘এই ধরো, লাঞ্চের পর। বেলা একটায় বেরিয়ে যাব। আমাকে একবার ম্যানহাটনে যেতে হবে। নিউ ইয়র্ক টাইমস অপিসে।’

শুনে মনে মনে হাসল ইমন। এই কয়েকদিন আগে যে লোকটাকে খুন করার জন্য নায়গারা থেকে ফলো করে ও নিউ ইয়র্কে গেছিল, তাকেই পাশে বসিয়ে ফের ওই শহরে নিয়ে যেতে হবে। ইচ্ছে করলে গাড়িটা নিয়ে ও উধাও হয়ে যেতে পারে। তার পর নির্জন কোনও হাইওয়েতে নিজের জিঘাংসাটাকে ও চরিতার্থ করতে পারে। কিন্তু সে রকম কোনও অনুভূতি ওর হল না। আল্লাহ কী চান, ইমন জানে না। ঘাড় নেড়ে ও বলল, ‘জ্বী জ্বী ছ্যার। ঠিক আসে।’

লিভিং রুম থেকে চিরাগকে নিয়ে ইমন বেরিয়ে আসছিল, এমন সময় মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে পলাশছ্যার বললেন, ‘আরে চিরাগ, তুমি যাও কুথায়? তুমি মুইচ দাঁড়িতে মুখ ভর্তি কইর‌্যা রাখসো ক্যান? তুমিও আমার মতো নো শেভ নভেম্বর করত্যাস না হি?’

চিরাগ বলল, ‘না স্যার, কয়েকদিন আগে স্বপ্ন দেখেছি, আববু মারা গেছে। তাই সেভ করিনি।’

কথাটা বলে চিরাগ ফের পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু পলাশছ্যার বলে উঠলেন, ‘খাঁড়াও, খাঁড়াও। অত হড়বড় করতাসো ক্যান? কত বয়স হইসে তোমার আববুর?’

‘স্যার, পঞ্চাশও হয়নি।’

‘অত চিন্তা করো ক্যান? হেইডা মরণের বয়স না হি। হোনো, নিজের স্বপ্ন দ্যাখলে, পরের হয়। তোমার আববু সহি সেলামতই আছেন। যাউক গা, যে লইগ্যা তোমারে ডাকছিস, হোনো। তোমারে একডা জিনিস দেখাইমু। দেইখ্যা যাও।’ কথাটা বলেই রিমোট কন্ট্রোল হাতে নিয়ে পলাশছ্যার টিভি চালিয়ে দিলেন।

সত্তর ইঞ্চির টিভির পর্দায় ইমন দেখল, মেন বিল্ডিংয়ের লিভিং রুমে চিরাগ এসে দাঁড়িয়েছে। এ দিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে কী যেন খুঁজছে। নিজের চোখকে ইমন বিশ্বাস করতে পারল না। বিস্ফারিত চোখে ও দেখল, বেপরোয়াভাবে চিরাগ একবার কোনও একটা ঘরে ঢুকে গেল। দু’তিন মিনিট পর বাইরে বেরিয়ে এসে একটা ফুলদানি সরিয়ে পিছনে কী যেন দেখল। তার পর পর্দা সরিয়ে ফের অন্য একটা ঘরে গিয়ে ঢুকল। ইতিমধ্যে কোথাও টেলিফোন বাজতে শুরু করেছে। সেই শব্দ শুনে চিরাগ দ্রুত লিভিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে এল। পর্দায় ইমন দেখল, তখন বিকেল চারটে পনেরো। ওর মনে পড়ল, এই সময়টায় ও আউট হাউসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আশ্চর্য, নির্জন বাড়িতে চিরাগ কেন ঢুকেছিল? ওর কোনও বদ মতলব ছিল না তো?

 ‘রোজিনা ম্যাডাম প্রথম দিনই তোমারে কইয়্যা দিসিল, বিনা পার্মিশনে মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকবা না। ক্যান ঢুকসিলা, কইব্যা?’ কড়া গলায় পলাশছ্যার জিজ্ঞেস করলেন।

ইমন চমকে উঠে চিরাগের দিকে তাকাল। ওর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ও কী উত্তর দেবে, ইমন বুঝতে পারল না। পলাশছ্যার ওর উত্তরে সন্তুষ্ট না হলে ওদের বিদেয় করে দিতে পারেন। ইমনের বুকের ভিতরটা লাফাতে লাগল। কিন্তু চিরাগ কঠিন মনের ছেলে। কোনও পরিস্থিতিতেই… ভাঙবে তো মচকাবে না। ও বলল, ‘আপনার এই বাড়িতে জিন আছে স্যার।’

মুহূর্তে চিরাগের উপর থেকে সন্দেহের ছায়াটা সরে গেল। ইমনেরও মনে হয়েছে, এই বাসায় জিন আছে। বিশেষ করে সেদিন রাতে নিজের চোখে এক ছায়ামূর্তিকে জঙ্গলের দিকে ভ্যানিশ হতে দেখার পর থেকে, ওর বিশ্বাসটা দৃঢ় হয়েছে। এ নিয়ে চিরাগের সঙ্গে ওর একপ্রস্থ আলোচনাও হয়েছে। বন্ধুর সমর্থনে সে কথাই ও বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু পলাশছ্যার একবার কালকেতুর দিকে তাকিয়ে তার পর হেসে উঠে বললেন, ‘কী কইর‌্যা বোঝলা? জিন-টিনে তুমি বিশ্বাস করো না হি?’

চিরাগ ভয় পাওয়ার গলায় বলল, ‘আমার কথা বিশ্বাস করুন স্যার। আজ যখন আপনারা কেউ বাড়িতে ছিলেন না, তখন আউট হাউস থেকে খুটখাট আওয়াজ পাচ্ছিলাম। জানলায় একবার একটা শ্যাডোও দেখতে পেলাম। মনে হল, কোনও মহিলা ঘরে ঘুরে বেরাচ্ছে। তাকে হাতেনাতে ধরার জন্য আমি লিভিং রুমে ঢুকেছিলাম। কিন্তু কাউকে খুঁজে পাইনি।’

পলাশছ্যার বললেন, ‘অহন বুঝসি। জিন না, হ্যায় লারেইনা। একডা মেক্সিকান মাইয়া আমার বাসায় ক্লিনিংয়ের কাম করতে আসে। হ্যারে আগে দেখো নাই?’

‘না স্যার। কিন্তু মেয়েটা বাসায় ঢুকল কী করে?’

‘হ্যার কাসে বাসার চাবি আসে। নিজের সময়মতো আইস্যা এহানে কাম কইর‌্যা যায়। যাউক গা, তোমারে তহন ফোন করলাম, তুললা না ক্যান? রিং হইত্যাসিল, হোনো নাই?’

চিরাগ বলল, ‘শুনেছিলাম। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হল, জিন ফোন করেছে। তাই ভয়ে ধরিনি।’

কথাগুলো শুনে যেন খুব মজা পেলেন পলাশভাই। বললেন, ‘ডর লাগসে? হা হা হা, আরে, ডর লাগনের কিছু নাই। হ, কে য্যান আমারে কইছিল, এই বাংলোতে অনেকদিন আগে একজন সুইসাইড করসিল। তার জিন ঘুইর‌্যা বেরায়। তবে সে আমাগো কুনও ক্ষতি করে নাই। হোনো, ফাঁকা বাসায় ঢুইক্যা জিন দ্যাখসো… হেই গল্প আবার রোজিনা ম্যাডামের কাছে কইরো না য্যান। হুনলে হ্যায় কিন্তু চেইত্যা যাইব। যাও, অহন তোমরা যাও।’

এত সহজে ছাড়া পেয়ে যাবে, ইমন ভাবতেও পারেনি। লিভিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় ও সাহস করে বলল, ‘ছ্যার, যদি কিছু মনে না করেন, তাইলে একডা কথা কমু?’

হাতে একটা বোড়ে ধরা, পলাশছ্যার বললেন, ‘তুমি আবার কী কইব্যা? তুমিও জিন দ্যাখস না হি?’

‘না, ছ্যার।’ পা চালিয়ে টেবলের কাছে গিয়ে ইমন বলল, ‘আপনে ঘোড়ার চালডা দ্যান। তাইলে কিস্তিমাত কইরতে পারবেন।’

বোর্ডের দিকে একবার ভাল করে তাকিয়ে পলাশছ্যার বললেন, ‘রাইট। তুমি ঠিকই কইস ইমন। এই ন্যান কাইলকেতুভাই। কিস্তিমাত করত্যাসি।’ চালটা দিয়ে পলাশছ্যার শূন্যে দু’হাত ছুড়ে দিলেন। তা দেখে কাইলকেতুস্যার হাসতে লাগলেন।

ইমন লিভিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে আসছিল। পিছন থেকে পলাশছ্যার ডাকলেন, ‘ইমন হোনো হোনো। অ্যাদ্দিন খেলতাসি। কাইলকেতুভাইরে হারাইতে পারি নাই। তোমার জইন্য আইজ প্রথম জিতলাম। নাও, এই ইনাম লইয়্যা যাও। কাইল নিউ ইয়র্কে গিয়া খরচা কইরো।’ বলে কয়েকটা একশো ডলারের নোট এগিয়ে দিলেন উনি।

আউট হাউসের দিকে হাঁটার সময় ইমন মনে মনে চটেই গেল চিরাগের উপর। ওকে না জানিয়ে মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকে চিরাগ খুব অন্যায় করেছে। বিনা কারণে ও ভিতরে যায়নি। নিশ্চয়ই ওর কোনও অভিসন্ধি ছিল। রোজিনা ম্যাডাম থাকলে, এত সহজে ওকে ছেড়ে দিতেন না। প্যাঁচানো প্রশ্ন করে ঠিক চিরাগের পেট থেকে কথা বের করে নিতেন। আউট হাউসে পৌঁছে গম্ভীর মুখে চিরাগ সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। গোসল করে এসে একটা কথাও না বলে ও সোফায় বসে টিভি খুলে দিল। সেদিন রাতে আম্মি-আববুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার পর থেকে চিরাগ আজকাল খুব উল্টোপাল্টা কথা বলছে। ইমন ওর হাবভাব একেবারেই পছন্দ করছে না। তবুও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না। কারণ ওর কৃতজ্ঞতাবোধ। কাবুলের ট্রেনিং ক্যাম্পে যেদিন ও প্রথম চিরাগকে দেখে, সেদিনই যে ওকে বন্ধু বলে স্বীকার করে নিয়েছিল।

আউট হাউসের সোফায় বসে থাকতে থাকতে সেদিনকার কথাটা ইমনের মনে পড়ল। পাহাড়ের কোলে রুক্ষ একটা প্রান্তর। তার মধ্যে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে ওদের ক্যাম্প। নতুন জিহাদিদের সেখানে ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছিল। দুবাই থেকে সদ্য ওখানে গিয়ে খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়েছিল ইমন। শ’দেড়েক জিহাদিদের ট্রেনিং ক্যাম্প সেটা। ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন দেশের ছেলে সব। লেবানন, ইয়েমেন থেকে শুরু করে চ্চেনিয়া, উজবেকিস্তানেরও। ক্যালিফ যিনি, তিনি ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মুসলিম। মহম্মদ আলজাওয়াকি। কাবুলে যাওয়ার আগেই ইমন শুনে ফেলেছিল, কাফেরদের মুণ্ডচ্ছেদনে ওদের ক্যালিফ বিশ্বরেকর্ড করে ফেলেছেন। হাজার দেড়েকেরও বেশি মুণ্ডুকেটেছেন। নিষ্ঠুরতায় তাঁর না কি জুড়ি নেই পৃথিবীতে।

ক্যালিফ আলজাওয়াকিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতাও ভোলেনি ইমন। সেদিন চিরাগের সঙ্গেও ওর প্রথম আলাপের দিন। কাবুলেভোরবেলায় একটা ফাঁকা জায়গায় ওরা… নতুন রিক্রুটরা সারিবদ্ধ দাঁড়িয়েছিল। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে একটা হেলিকপ্টার উড়ে আসতে দেখেছিল ইমন। হেলিপ্যাডে সেই কপ্টার নামতেই কয়েকজন কম্যান্ডারের সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিলেন ক্যালিফ। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, পাঠানদের সাদা ঝুল পোশাকে আরও বেশি লম্বা দেখাচ্ছিল ক্যালিফকে। মাথায় বিন লাদেনের মতো সাদা পাগড়ি। লম্বা কাঁচা-পাকা দাড়ি। লম্বা ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি সেদিন। ইসলামের জন্য নিজেকে কেন কুরবানি দেওয়া দরকার, মিঠে বুলিতে বুঝিয়ে ছিলেন। ক্যালিফের শান্ত সমাহিত চেহারাটা দেখে ইমন ভাবতেও পারেনি এই মানুষটা নরবলি দিতে ওস্তাদ!

ক্যালিফ যতক্ষণ ছিলেন, ততক্ষণ পিন পড়ার আওয়াজও পাওয়া যায়নি। তার পর কম্যান্ডারদের হাঁকডাক শুরু হল। ফিজিক্যাল ট্রেনিংয়ের নামে টর্চার। দশজন কম্যান্ডারের দায়িত্বে ছোট ছোট দল। রোল কল-এ কে কোন দেশের পরিচয় নেওয়ার সময় ইমন বাংলাদেশ বলার পর হাসির রোল উঠেছিল দলে। তখন ওর চোখে পড়েছিল, লাইনে একটা ছেলে মুখ কঠিন করে দাঁড়িয়ে। সে হল চিরাগ। জীবনে কখনও খেলাধুলো বা শরীরচর্চা করেনি ইমন। পড়াশুনোয় ভাল, বইতেই মুখ গুঁজে পড়ে থাকত। পাহাড়ি রাস্তায় দৌড় শুরু হওয়ার পরই ও টের পেয়েছিল, অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। মাইল দেড়েক দৌড়নোর পরই হাঁফাতে হাঁফাতে ও বসে পড়েছিল একটা পাথর খণ্ডের উপর। তখনই কম্যান্ডার পিছিয়ে এসে ওর পাছায় লাথি মেরে ছিলেন। মুখ খিঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘রান, বাস্টার্ড রান।’ ওর দুরবস্থা দেখে অন্যরা হাসছিল।

দলে ভাল স্বাস্থ্যের ছেলে সবাই। দৌড়তে দৌড়তে খাঁড়াই রাস্তায় অনেকটা উঁচুতে পৌঁছে গিয়েছে। প্রাণপণ তাদের পিছনে ছুটতে গিয়ে ইমনের মাথা চক্কর দিতে শুরু করেছিল। তখনই চিরাগ পিছিয়ে এসে ওকে বলে, ‘তুই আমার সঙ্গে জগিংশুরু কর। একবার যদি বুঝতে পারে তুই ফিজিক্যালি উইক, তা হলে এঁরা তোকে নিয়ে র‌্যাগিং করবে।’ সেই মুহূর্ত থেকেই চিরাগ ওর বন্ধু হয়ে গেছিল। গত পাঁচ বছরে বেশ কয়েকবার ওদের ক্যাম্প বদলেছে। কিন্তু ওদের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়নি। কসোভোর ক্যাম্পে গিয়ে সেটা আরও গাঢ় হয়েছিল। তাই কখনও কখনও রেগে গেলেও চিরাগকে ও কড়া কথা বলতে পারে না।

আউট হাউসে ফিরে এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি চিরাগ। টিভি বন্ধ করে এ বার বলল, ‘ফ্রিজে কী আছে, বের কর ভাই। খিদে পেয়েছে।’

সুযোগ পেয়ে ইমন বলল, ‘কামডা তুই কিন্তু ভাল করস নাই চিরাগ। আইজ আর এট্টু হইলে ধরা পইড়্যা যাইতি। নেহাত পলাশছ্যার ভালা মানুষ, তাই…’

চিরাগ বাধা দিয়ে বলল, ‘পলাশছ্যার বাড়ি ছিলেন না। তবুও, আমাকে দেখে ফোন করলেন কী করে, কিছু বুঝতে পারলি? ’

প্রশ্নটা শুনে একটু থমকে গেল ইমন। সত্যিই তো পলাশছ্যার তখন বাড়ির বাইরে অন্য কোথাও ছিলেন। তা হলে উনি কী করে, জানতে পারলেন, চিরাগ ফাঁকা বাড়িতে ঘুরে বেরাচ্ছে? একটু চিন্তা করে ও বলল, ‘ছ্যারের বাড়িতে মনে হয় কোনও গুগল অ্যাপস লাগানো আছে।’

‘ঠিক ধরেছিস।’ চিরাগ বলল, ‘ওনার মোবাইলে এমন একটা অ্যাপস লাগানো আছে, যা বাড়ি পাহারা দেয়। বাড়িতে না থাকলেও বাড়ির সব খবর উনি পেয়ে যান। মোবাইল ফোন সঙ্গে সঙ্গে ওকে অ্যালার্ট করে দেয়। এইসব অ্যাপস সাধারণ লোকে অ্যাফোর্ড করতে পারে না। কিন্তু পলাশস্যারের পক্ষে সম্ভব।’

‘তুই কী কইর‌্যা অ্যাপ্রিহেন্ড করলি?’

‘জিহাদি ক্যাম্পে তুই বোধয় মন দিয়ে কিছু শিখিসনি ইমন। টেকনিক্যাল ক্লাসগুলো যখন হত, তখন কি ঘুমাতি? ক্যাপ্টেন জেসি একবার আমাদের এই ধরনের অ্যাপস-এর কথা বলেছিলেন। অ্যাপস বুঝানোর আগে তোকে একটা প্রশ্ন করি। পলাশছ্যার কে, কেমন মানুষ, তুই কতটা জানিস?’

ইমন বলল, ‘বিজনেসম্যান, সাদাসিধা ভালা মানুষ। ক্যান, তর কী মনে হয়?’

‘বিজনেসম্যানের ভালমানুষ হওয়া কঠিন। দ্যাখ ভাই, তোর হয়তো কথাটা ভাল লাগবে না। কিন্তু প্রথম দিনেই আমার মনে খটকা লেগেছিল। এই সময়ে যখন নিজের ভাইকেও মানুষ আশ্রয় দেয় না, তখন তোর পলাশছ্যার আমাদের ভালামতোন না চিনেই বাসায় থাকতে দিলেন কেন? ব্যাপারটা আমি হজম করতে পারিনি। মানুষটা আসলে কে, তা জানার জন্য জিহাদি নেট ওয়ার্ক ঘাঁটাঘাটি করছিলাম। খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম, বাংলাদেশি জিহাদিদের সাথে ওনার লিঙ্ক আছে।’

ইমন অবিশ্বাসের সুরে বলল, ‘হইতেই পারে না। তুই জিহাদি নেট ওয়ার্কের লিঙ্ক পাইলি কী কইর‌্যা?’

‘এ গুলো ইন্টারেস্ট থাকলেই জানা যায়। তোর নিশ্চয় মনে আছে, ক্যালিফেটে থাকার সময় আমি দিনের অনেকটা টাইম সফটওয়ার রুমে কাটাতাম। তুই তখন প্লে স্টেশন রুমে টাইম পাস করতি। কাউন্টার স্ট্রাইক বলে একটা পপুলার গেম ছিল। বসে বসে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতি।’

শুনে ইমন মনে মনে হাসল। ফিজিক্সের একজন এমএসসির মুখে ওকে সফটওয়ার সংক্রান্ত জ্ঞান শুনতে হচ্ছে! আরে সুমুন্ধির পোলা, তুই আমার সম্পর্কে কতটা জানস? স্কুল লাইফেই আমি কম্পিউটার গুইল্যা খাইসিলাম। হ্যাকিং শব্দটা তহন থেইক্যা জানি। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময় আমি হইয়া উঠসিলাম এথিক্যাল হ্যাকার। বাংলাদ্যাশের সিক্রেট এজেন্সি দুই একবার আমার হেল্প নিসিল। তার পর এমন একটা ঘটনা ঘটল, দ্যাশের উপর আমার ঘেন্না ধইর‌্যা গেল। তুই জানস না, জিহাদি এজেন্টরা আমারে ক্যান নিসিল। রাশিয়া আর রোমানিয়ান হ্যাকারগো সাথে কন্টাক্ট রাখার জইন্য।

চিরাগ যা বলল, তা অবশ্য ঠিক। ক্যালিফেটের প্লে স্টেশনে স্ফূর্তির অভাব ছিল না। ওখানে বসে ওয়ার গেমস খেলতে ওর ভাল লাগত। তখন সদ্য মর্টার চালানো শিখছে। কাঁধে এম সিক্সটিন রাইফেল উঠেছে। ধীরে ধীরে শরীরটাও শক্তপোক্ত হচ্ছে। নিজেকে সিলভেস্টার স্ট্যালোন বলে মনে হত ইমনের। তবে, কাঁধে অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও ও কখনও মানুষ খুন করেনি। অত সাহসই হয়নি ওর। এক পলকে কাবুল থেকে মনটাকে নিউ জার্সিতে ফিরিয়ে আনল ইমন। এ কী বলছে চিরাগ! পলাশছ্যারের সঙ্গে বাংলাদেশি জিহাদিদের যোগাযোগ আছে! ও কী করে নিশ্চিত হল?

‘তোর এই কথাগুলান যে হত্যি, তার প্রমাণ কী?’

‘এই আউট হাউসের তলায় একটা চোরা কুঠুরি আবিষ্কার করেছি। ডিনারের পর তোকে সেখানে নিয়ে যাব। গেলেই বুঝবি। অনেক কিছু জানতে পারবি।’

চোরা কুঠুরির কথা শুনে ইমন চমকে উঠে তাকাল চিরাগের দিকে। ও সন্ধান পেল কী করে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *