জিহাদি – ৪৭

(সাতচল্লিশ)

কাইলকেতুছ্যার ফোন করে ওকে নিউ ইয়র্ক যেতে বলেছেন। সিদান গাড়িটা নিয়ে বেরোবে, এমন সময় ডোর বেলের আওয়াজ শুনল ইমন। সিকিউরিটি সিস্টেমের সুইচ টিপে ও দেখল, পর্দায় লারেইনার মুখ। সদর দরজার বাইরে মেয়েটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর পরনে জিনস, লেদার জ্যাকেট। চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। এমনিতে মেয়েটার বয়স কুড়ি-টুড়ি হবে। কিন্তু হেয়ার স্টাইল বদলানোর জন্য ওকে আরও কমবয়সি লাগছে। মেয়েটার মুখ এমন নিষ্পাপ, ওকে দেখেই ইমনের মনটা ভাল হয়ে গেল। হাসিমুখে ও বলল, ‘তুমি! দাঁড়াও, দাঁড়াও, দরজা খুলে দিচ্ছি।’

সেন্ট্রাল পার্কে যেদিন লারেইনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেদিন ও নিজে যেচে এসে কথা বলেছিল। কিন্তু আজ ইমনের মনে হল, ওকে বাংলোয় দেখে মেয়েটা খুশি হয়নি। বোধহয়, আশা করেনি। পর্দায় ওকে দেখে লারেইনা বলেই ফেলল, ‘তুমি এখনও নিউ ইয়র্কে যাওনি?’

সদর দরজা খুলে দিয়ে ইমন লনের মাঝামাঝি এগিয়ে এসে বলল, ‘গাড়িটা নিয়ে জাস্ট বেরোচ্ছিলাম। আর একটু দেরি করলে তুমি কিন্তু আমাকে পেতে না।’

লারেইনা বলল, ‘জানি। তুমি কি আমার জন্য কয়েক মিনিট ওয়েট করবে প্লিজ। তা হলে তোমার সঙ্গে আমি ফিরে যাব। আসলে একটা জরুরি দরকারে আমাকে আসতে হল। ক্রিসমাসের ছুটিতে আমি একটা কিট ব্যাগ এখানে রেখে গেছিলাম। সেই ব্যাগে আমার মার্শাল আর্টের পোশাক আর বাকি সব সরঞ্জাম রয়েছে। আজ ইউনির্ভাসিটিতে আমাকে ব্ল্যাকবেল্টের পরীক্ষা দিতে হবে। সেই কারণে ব্যাগটা নিতে এলাম।’

‘কোথায় রেখেছ তোমার ব্যাগ?’

‘মেন বিল্ডিংয়ে, আমার লকারে।’ বলে বাংলোর দিকে হাঁটতে লাগল লারেইনা। কয়েক পা এগিয়ে কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে ও বলল,‘কাল সারা রাত হাসপাতালে কাটিয়েছি। সরাসরি ওখান থেকে এলাম। আসার ইচ্ছে ছিল না। নেহাত পরীক্ষাটা আজ দিতেই হবে। না পারলে আরও ছ’মাস পিছিয়ে যাব। হেমলতা আন্টিই আমাকে জোর করে পাঠালেন। জানি না, ফিরে গিয়ে রোজিনা ম্যাডামকে জীবিত দেখব কি না।’

শুনে বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল ইমনের। ম্যাডামের অবস্থা এতটাই খারাপ না কি? তা হলে পলাশছ্যারের কী হবে? সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে ছ্যারকে নিয়ে আসার সময়ই ও টের পেয়েছে, ভালবাসা কাকে বলে। কতটা খাঁটি হতে পারে। ইমনের মনে হয়েছে, ভালবাসা হল অনাবিল আনন্দে বেঁচে থাকা। যা গড়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, নির্ভরতা, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে। পলাশছ্যার প্রতি কথাতেই সেদিন বলছিলেন, ‘ম্যাডামরে ছাড়া আমি বাঁচুম কী কইর‌্যা?’ সত্যিই, ছ্যারের পক্ষে বাঁচা অসম্ভব। কিন্তু, একজন ভালামানুষের প্রতি আল্লাহ এতটা নির্দয় হতে পারেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহর মনে ভাল কোনও উদ্দেশ্য আছে। লনের ধারে দাঁড়িয়ে ইমন মনে মনে প্রার্থনা করল, সব কিছু যেন আবার আগের মতো হয়ে যায়। রোজিনা ম্যাডাম যেন আগের মতোই মালকিন হিসেবে বাসায় ফিরে আসেন।

লারেইনা মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকে গেল। ইমন জানে, ওর কাছে এক সেট চাবি থাকে। মেয়েটা রোজিনা ম্যাডামের এমনই বিশ্বস্ত। মিনিট দুয়েকের মধ্যে কাঁধে কিট ব্যাগ ঝুলিয়ে, বেরিয়ে এসে ও বলল, ‘একটা বিরাট ভুল হয়ে গেছে ইমন। রোজিনা ম্যাডাম ওঁর একটা জিনিস নিয়ে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু এখন দেখছি, তাড়াহুড়োয় ওঁর লকারের চাবি আনতে ভুলে গেছি।’

ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘কী করবে এখন?’

হাতঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে লারেইনা বলল, ‘আমার পরীক্ষা বেলা তিনটের সময়। এখন ফের নিউ ইয়র্কে গিয়ে চাবি নিয়ে ফিরে আসতে অনেক সময় লেগে যাবে। তার চেয়ে বরং পরীক্ষা দেওয়ার পর একবার চেষ্টা করে দেখব। হয়তো সন্ধে হয়ে যাবে। কিন্তু কোনও উপায় নেই, আমাকে ফের আসতেই হবে।’

ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডামের জিনিসটা কাল সকালে এসেও তো নিয়ে যেতে পারো।’

‘সেই সুযোগটা পাব কি না জানি না। ম্যাডামের অবস্থা খুবই খারাপ। যে কোনও সময় উনি আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারেন। মরার আগে উনি একটা ইচ্ছাপূরণ করতে চান। সেই দায়িত্বটা উনি আমাকে দিয়েছেন। সেটা পূরণ করতে না পারলে, সারা জীবন নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।’

‘আমি কি একবার লকার খোলার চেষ্টা করব লারেইনা?’

‘তুমি! তুমি লকার খুলবে কী করে? তোমার কাছে তো চাবি নেই।’

ব্রেক ইন করা ওর কাছে জল-ভাতের মতো ব্যাপার। ও যে তালা খোলার জাদুকর, সেটা লারেইনার জানার কথা না। ইমন রসিকতা করার ভঙ্গিতে বলল, ‘ছোটবেলায় গ্র্যান্ডমার লকার খুলে প্রায়ই কয়েন চুরি করতাম। চলোই না, একবার দেখি, সেই স্কিলটা এখনও আছে কী না।’

‘তুমি কি সিরিয়াস?’

‘কেন, তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি। পরখ করে দেখে নাও তা হলে।’

‘বেশ চলো।’ কথাটা বলেই লারেইনা ফের মেন বিল্ডিংয়ের দিকে পা বাড়াল। ইমনও ওর পিছু নিল। এই বাসায় ও এতদিন ধরে আছে, কিন্তু কোনওদিন লিভিংরুম ছাড়া অন্য কারও ঘরে কোনওদিন ও ঢোকেনি। ম্যাডামের ঘরে ঢুকে লারেইনা আলো জ্বালিয়ে দিতেই, চারদিকে তাকিয়ে ইমন হতভম্ব হয়ে গেল। পাঁচতারা কোনও হোটেলের কামরা বলে মনে হচ্ছে। বিলাসের কোনও খামতি নেই। বেলজিয়াম কাচের একটা ঝাড়বাতি সিলিং থেকে ঝুলছে। তার আলোয় ছিটকে বেরোচ্ছে বৈভবের দম্ভ। এইসব রুম ঝকঝকে তকতকে করে রাখার দায়িত্বে আছে লারেইনা। রুমের প্রতিটি কোণ চেনে। ও সুইচ টেপায় একটা সাদা দেওয়াল ধীরে ধীরে সরতে শুরু করল। ইমন দেখল, স্টিলের কয়েকটা লকার রয়েছে ভিতরে। ‘কোনটা?’ ইমন প্রশ্ন করতেই লারেইনা আঙুল দিয়ে লকারটা দেখিয়ে দিল।

কয়েক সেকেন্ড জরিপ করে ইমন বলল, ‘পারলে একটা টুল বক্স আর গ্লাভস নিয়ে এসো। দেখি, খুলতে পারি কি না।’

মালিকের বিনা অনুমতি বা অনুপস্থিতিতে লকার খোলা আইনত দণ্ডনীয়। কথাটা মনে পড়ায় ইমন দ্বিধায় পড়ল। আবার কোনও ঝামেলায় পড়বে না তো? মুহূর্তের মধ্যে ও ঠিক করে নিল, কীভাবে লকার খুলছে,লারেইনাকে তা দেখাবে না। ইচ্ছে করেই ও গ্লাভস আনতে বলল। কোথাও ওর ফিঙ্গার প্রিন্ট থেকে যাক, এটা ইমন চায় না। মেয়েটাকে অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। তবুও, সাবধানের মার নেই। জিহাদি জীবন ওকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। নিজেকে আর কোনও ধরনের অপরাধমূলক কাজকর্মের সঙ্গে ইমন জড়াবে না। ম্যাডামের শেষ ইচ্ছে পূরণ করার জন্য মেয়েটা ওর সাহায্য চাইছে। খুলে দিলে ক্ষতি কী?

কয়েক মিনিটের মধ্যে লারেইনা টুল বক্স আর গ্লাভস এনে দিল। বক্সটা খুলে ইমন বলল, ‘তুমি কি এক কাপ কফি খাওয়াতে পারবে লারেইনা? মনে হয়, তার মধ্যেই লকারটা আমি খুলে ফেলতে পারব।’

কথাটা শুনে লারেইনা অবাক চোখে তাকাল। ওর চোখে এই প্রথম সন্দেহ দেখতে পেল ইমন। মাত্র ওই একটা চাউনিই ওকে সতর্ক করে দিল। লারেইনা চলে যাওয়ার পর মিনিট দুয়েকের মধ্যেই আঙুলের ভোজবাজিতে লকারটা ইমন খুলে ফেলল। দরজার পাল্লা টেনে ও দেখতে পেল, ছোট বড় অনেকগুলো জুয়েলারি বক্স সাজানো রয়েছে। আরও ভেতরে থরে থরে গোছানো ডলারের নোট। সঙ্গেসঙ্গে পাল্লা দুটো ও বন্ধ করে দিল। ওর মনের ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ‘তুই ঠিক করতাসস না ইমন। মাইয়াডার কথায় বিশ্বাস কইর‌্যা, তুই যা করলি, হেইডা ক্রাইম।’

পরক্ষণেই পাশ ফিরে ইমন দেখতে পেল লারেইনাকে। নিঃশধে কখন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, ও টেরও পায়নি। মেয়েটার হাতে ধূমায়িত কফির কাপ। এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘খুলতে পেরেছ?’

কফির কাপ হাতে নিয়ে ইমন বলল, ‘হ্যাঁ, খুলেছি। কিন্তু লকারটা বন্ধ করতে পারব না। সেই টেকনিক কিন্তু আমার জানা নেই।’

‘দরকারও নেই। যদি কিছু মনে না করো, তুমি বাইরে গিয়ে একটু অপেক্ষা করবে, প্লিজ। ম্যাডাম যে জিনিসটা আমাকে নিয়ে যেতে বলেছেন, সেটা খুঁজতে হবে।’

কোনও প্রশ্ন না করে ইমন চুপচাপ ম্যাডামের বেডরুমের বাইরে বেরিয়ে এল। ওর মন বলতে লাগল, মারাত্মক একটা ভুল করে ফেলেছে। লারেইনাকে কতটুকুই বা ও চেনে? মেয়েটা যদি লকার ফাঁকা করে দেয়, তা হলে? দোষটা তো ওর উপরই এসে পড়বে। কেননা, সবাই জানে, ও একা এই বাংলো পাহারা দিচ্ছে। ছি ছি, পলাশভাই কী ধারণা করবেন, ওর সম্পর্কে? ওর উপর কাইলকেতুছ্যার বা সুদীশছ্যারের আস্থাও নষ্ট হয়ে যাবে। এইসব এলোমেলো ভাবনায় ইমনের মন চঞ্চল হয়ে উঠল। কফি শেষ করে কাপটা ঘরে রাখতে গিয়েও ও পিছিয়ে এল। পর্দার ফাঁক দিয়ে হঠাৎ ওর চোখে পড়ল, যা ভেবেছিল, সেটাই ঠিক। লকার থেকে বের করে জুয়েলারি বক্স আর ডলারের বান্ডিলগুলো লারেইনা ওর কিট ব্যাগে ভরছে। দেখে ইমনের মারাত্মক রাগ হল। লারেইনার ওই নিস্পাপ মুখটার আড়ালে এত বড় একজন লোভী মানুষ লুকিয়ে আছে?

সময় ইমনকে অনেক অভিজ্ঞতা দিয়েছে। নিজেকেই ও বলল, ‘হালা, অহন মাথা গরম কইরলে চইলব না। ঠান্ডা মাথায় লারেইনারে শিখখা দিতে অইব।’ বাংলো থেকে বেরিয়ে এসে, হাতের কাপটা ও সুইমিং পুলের জলে ছুঁড়ে ফেলল। যাতে ওর ফিঙ্গার প্রিন্ট না পাওয়া যায়। মনে মনে ও তারিফও করল, চুরির কী সুন্দর সময়ই না বেছেছে লারেইনা! রোজিনা ম্যাডাম মৃত্যুশয্যায়, পলাশছ্যারের মাথার ঠিক নেই। বাংলোয় ওঁরা কবে ফিরবেন, কেউ জানেন না। খুব শিগগির যে চুরি ধরা পড়বে, সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। ইমন বুঝতে পারল না, এত বড় বিশ্বাসভঙ্গের কাজটা লারেইনা করতেই বা গেল কেন? না, না, ওকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। শাস্তি ওকে পেতেই হবে। দ্রুত প্ল্যান ছকে নিয়ে, মোবাইল ফোন বের করে, সুদীশছ্যারকে একটা মেল করে দিল ইমন। তার পর চুপচাপ গিয়ে বসে রইল সিদানে। খানিক পরে লুকিং মিররে ও দেখল, কিট ব্যাগটা এত ভারী হয়ে গেছে, লারেইনা টানা হিঁচড়ে করে নিয়ে আসছে।

গাড়ির কাছে এসে লারেইনা মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘আমি কলম্বাস সার্কেলের কাছে যাব। ওখানে আমার বয়ফ্রেন্ড দাঁড়িয়ে থাকবে। আমাকে লিফট দেবে, প্লিজ?’

ইমনও হেসে বলল, ‘সিওর। উঠে পড়ো। আমি তো কলম্বাস সার্কেলের পাশ দিয়েই যাব।’

‘থ্যাঙ্কস’ বলে ব্যাগটা পিছনের সিটে রেখে, লারেইনা সামনের সিটে এসে বসল।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ইমন জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডামের জিনিসটা কি খুঁজে পেলে?’

‘পেয়েছি। অনেক কষ্টে। একটা ওয়েডিং রিং। ম্যাডামের হাসবেন্ড ওঁকে দিয়েছিলেন।’

‘হাসবেন্ড মানে? কার কথা বলছ তুমি?’

‘তুমি জানো না? রোজিনা ম্যাডামের হাসবেন্ড… নিক। এতদিন বাংলোয় আছ, তাঁকে কখনও দেখোনি? সপ্তাহে তিনদিন করে এসে উনি লনের ঘাস ছেঁটে দিয়ে যান, সুইমিং পুল পরিষ্কার করেন। একটু ভাবো, তা হলেই নিককে তোমার মনে পড়বে। লালচে মুখ, প্যাকাটে চেহারা, ময়লা পোশাক পরা। দেখলেই বোঝায় যায়, ড্রাগ অ্যাডিক্ট।’

সঙ্গেসঙ্গে লোকটাকে ইমনের মনে পড়ল। রোজিনা ম্যাডাম একদিন লোকটাকে প্রায় ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছিলেন, সুইমিং পুলের জলে, গাছের ঝরা পাতা ভাসছিল বলে। ওই ভিখারী টাইপের লোকটা ম্যাডামের স্বামী! বিশ্বাস করতে মন চাইল না ইমনের। লারেইনা গল্প বানাচ্ছে না কি? প্রশ্নটা ও করেই ফেলল, ‘নিজের হাসবেন্ডকে দিয়ে ম্যাডাম ঝাড়ুদারের কাজ করাতেন কেন?’

‘সে এক লম্বা গল্প। অস্টিন ইউনির্ভাসিটিতে পড়ার সময় ম্যাডাম প্রেমে পড়েছিলেন নিকের। পড়াশুনো শেষ করে উনি বিয়ে করে ফেলেন নিককে। র‌্যাঞ্চে ফিরে যাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই ম্যাডাম বুঝতে পারেন, নিককে বিয়ে করে মারাত্মক ভুল করেছেন। তখন ঘাড় থেকে নামানোর উপায় আর নেই। শ্বশুরের পয়সায় দেদার স্ফূর্তির সুযোগ কেউ ছাড়ে? নিক রাতদিন ড্রাগের নেশা করে থাকতেন। গেস্টদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন। ওঁর উৎপাতে রায়ান আঙ্কল আর হেমলতা আন্টি খুব বিরক্ত হয়ে গেছিলেন। রোজিনা ম্যাডামও রেগে গেলে মারধর করতেন নিককে। কিন্তু কখনও ডিভোর্স দিতে চাননি। শেষে রায়ান আঙ্কলকে স্বস্তি দিতেই ম্যাডাম নিককে নিয়ে চলে আসেন নিউ ইয়র্ক সিটিতে। সুন্দর মুখের জয় সর্বত্র। জানোই তো সে কথা। একজন রিপাবলিকান সেনেটরের সুনজরে পড়ে ম্যাডাম চাকরি জুটিয়ে নেন ইমপোর্ট সেক্রেটেরিয়াটে। ওখানে মি. পলাশের সঙ্গে আলাপ। রেস্ট ইউ নো ইমন।’

গাড়ি চালাতে চালাতে ইমন প্রশ্ন করল, ‘পলাশছ্যার কি নিকের কথা জানেন?’

লারেইনা বলল, ‘না। নিকের সঙ্গে ম্যাডামের সমঝোতা হয়ে আছে। যতদিন উনি ডলার সাপ্লাই করে যাবেন, ততদিন নিক চুপ করে থাকবেন। আর যতদিন মি. পলাশ সেই ডলার সাপ্লাই দেবেন, ততদিন ম্যডাম তাঁর সঙ্গে প্রেমের অভিনয় চালিয়ে যাবেন।’

‘কী বলছ তুমি লারেইনা?’

‘ঠিকই বলছি। রোজিনা ম্যাডাম যে কী ডেঞ্জারাস মহিলা, তুমি ভাবতেও পারবে না। নিকের সঙ্গে ওর কথাবার্তা আমি একদিন শুনে ফেলেছিলাম। শুনলে তুমি হয়তো বিশ্বাসই করবে না, মি. পলাশের সবকিছু ধীরে ধীরে ম্যাডাম আত্মসাৎ করে নিচ্ছেন। আর সেই অর্থ উনি হেমলতা আন্টির নামে জমা দিচ্ছেন আলবুকার্কের এক ব্যাঙ্কে। মি. পলাশ বছরে একবার করে আমেরিকায় আসেন। অত তলিয়ে দেখার ইচ্ছেও দেখান না। রোজিনা ম্যাডাম মাঝে ওঁকে বুঝিয়ে ছিলেন, বাংলাদেশের সব ব্যবসা গুটিয়ে. নিয়ে এখানেই পাকাপাকি চলে আসতে। কিন্তু মি. পলাশ জানেন না, যেদিন নিঃস্ব হয়ে যাবেন, সেদিন রোজিনা ম্যাডাম নিকের মতো, ওঁকে দিয়ে ঝাড়ুদারের কাজ করাবেন। আমি জানি, তুমি মি. পলাশকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করো। তাই তোমাকে সত্যি কথাটা বললাম।’

সেন্ট্রাল পার্কে বসে মাসখানেক আগে এই লারেইনাই কত প্রশংসা করেছিল রোজিনা ম্যাডামের। আজ একেবারে উল্টো কথা বলছে। যা বলছে, তা কিন্তু মিথ্যে নয়। হ্যাকিং করে চার-পাঁচদিন আগে ইমন সব কুকর্মের কথাই জানতে পেরেছে ম্যাডামের। লারেইনাকে উসকে দেওয়ার জন্য ও বলল, ‘কিন্তু তুমিই তো বলেছিলে, রোজিনা ম্যাডাম তোমার মেন্টর।’

লারেইনা দপ করে জ্বলে উঠে বলল, ‘এখনও সেটা অস্বীকার করছি না। ওঁর দেখানো রাস্তাতেই তো আমি হাঁটতে চাইছি। জেনে রাখো, আমি এবং আমার মম ওঁকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। আর সেই কারণেই ওঁর কাছ থেকে যা শিখেছি, সেটা ওঁকে ফেরত দিতে চাইছি।’

ওর গলার স্বর শুনে ইমন চমকে উঠে বলল, ‘তার মানে?’

‘তা হলে শোনো। তোমাকে আগেও বলেছি, আমার ড্যাড ওঁদের র‌্যাঞ্চের সিকিউরিটি চিফ ছিলেন। তোমাকে বলেওছিলাম, উনি মারা যান ড্রাগ ডিলারদের গুলিতে। আসলে তা নয়। ড্যাডকে গুলি করে মেরেছিলেন রোজিনা শয়তানিটা। শখ করে উনি তখন পিস্তল চালানো শিখছিলেন। মার্ডার করেও ম্যাডাম অনুতপ্ত ছিলেন না। রায়ান আঙ্কলকে বলেছিলেন, ভুল হয়ে গেছে। ভাগ্যিস, আমার মম সেই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। না হলে আমরা জানতেই পারতাম না, ড্যাডের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল। রায়ান আঙ্কল অনেক খরচ করে কেসটা চাপা দেন। তার পর থেকে উনি আমাদের ভরনপোষণের ভার নেন। তখনই আমি ঠিক করি, এর বদলা একদিন আমি নেব। ম্যাডামের যাতে সাজা হয়, তার চেষ্টা করব। কিন্তু ওঁকে সাজা দেওয়ার ব্যবস্থা স্বয়ং ঈশ্বরই করেছেন। ওঁর মৃত্যুটা যেভাবে হতে যাচ্ছে, তা পাপের শাস্তি ছাড়া আর কী?’

ইমন আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। মুখ ফুটে বলে ফেলল, ‘তুমিও তো একটু আগে একটা পাপ করে এলে লারেইনা। সেটা কি ঠিক করলে? তোমাকেও তো ঈশ্বর শাস্তি দেবেন।’

কথাটা শুনে লারেইনা ঘুরে বসল। ওর চোখ-মুখে রাগ ফুটে বেরচ্ছে। হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা পিস্তল বের করে হিসহিসিয়ে ও বলল, ‘তা হলে তুমি দেখে ফেলেছ। হ্যাঁ, হ্যাঁ, লকারটা আমি ফাঁকা করে দিয়েছি। কিন্তু আমি মনে করি, কোনও পাপ করিনি। এটা আমার প্রাপ্য ছিল। ড্যাডের জীবনের দামও বলতে পারো। কাল রাতে হাসপাতালে ম্যাডাম যখন আমাকে ইশারায় বোঝালেন, নিকের দেওয়া ওয়েডিং রিংটা এনে দিতে, সেটা পরে উনি কবরে যেতে চান, তখনই মাথায় আগুন জ্বলে উঠেছিল। ওঁর আঙুলে এখনও কিন্তু পরানো রয়েছে, মি. পলাশের দেওয়া প্ল্যাটিনামের রিং। তখনই ঠিক করে ফেলি, আমাকেও আখের গুছিয়ে নিতে হবে। ম্যাডাম আরও বলেছিলেন, লকারের চাবি ওঁর কাছে নেই। মি. পলাশের কাছে আছে। তাই আমি যেন নিউ জার্সিতে গিয়ে তোমার সাহায্য নিই। কেননা, তুমি না কি তালা খোলার ব্যাপারে এক্সপার্ট।’

ওহ, তা হলে লারেইনা সব প্ল্যান করেই বাংলোতে গিয়েছিল। অভিনয়ে এই মেয়েটাও কম যায় না। বাইরের দিকে তাকিয়ে ইমন দেখল, ব্রুকলিন ব্রিজ পেরিয়ে এসেছে। আর অল্প সময়ের মধ্যে কলম্বাস সার্কেল পৌঁছে যাবে। ওখানেই কিট ব্যাগ নিয়ে লারেইনার নেমে যাওয়ার কথা। ঠান্ডা মাথায় ও বলল, ‘অত এক্সাইটেড হওয়ার কোনও কারণ নেই লারেইনা। পিস্তলটা তুমি হ্যান্ডব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে নাও। ম্যানহাটনের রাস্তা সিসিটিভি ক্যামেরায় ভর্তি। পরে ধরা পরে যেতে পারো। আমার দিক থেকে তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। আমাকে অন্তত মি. পলাশের কাছে যেতে দাও। ম্যাডামের ছলনার কথা উনি অন্তত জানুন।’

অনুরোধটা মেনে নিল লারেইনা। পিস্তল হ্যান্ডব্যাগে ঢুকিয়ে গম্ভীর মুখে বসে রইল। একটু পরে কলম্বাস সার্কেলে পৌঁছে দূর থেকে ইমন দেখতে পেল সুদীশছ্যারকে। রাস্তায় ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে সাধারণ পোশাকে আরও দু’জন। মোড় পেরিয়ে, গাড়ি থামিয়ে ইমন বলল, ‘তুমি কি ওয়েডিং রিংটা হাসপাতালে দিতে যাবে লারেইনা?’

বাঁকা হেসে লারেইনা বলল, ‘তোমার মাথা খারাপ? দেল বস্কে ফ্যামিলির কারও মুখদর্শন আমি আর করতে যাব না। বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে আমি আপাতত কানাডায় চলে যাচ্ছি। ওখানেই সেটল করব।’ বলতে বলতে ও ব্যাগটা নামিয়ে রাস্তায় পা দিল।

গাড়ি ফের স্টার্ট দিয়ে, ইমন মনে মনে বলল, যা ভাবছ, তা কিন্তু হবে না। একটু এগিয়ে লুকিং মিররে ও দেখল, সুদীশছ্যারেরা তিনজন মিলে লারেইনাকে ঘিরে ধরেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *