(পঞ্চাশ)
চোখের পাতা বুঁজে আছেন অনেকক্ষণ ধরে। অথচ ঘুম আসছে না। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে লিলি ঢাকায় যাচ্ছেন। একা নন, বিজনেস ক্লাসে তাঁর সঙ্গে আরও অনেকে আছেন। মি. বাম কিম, পলাশ, কালকেতু, ইমন, রেজওয়ানা, মার্থা, সেও ইয়ুন ছাড়াও তাঁকে ঘিরে আছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের তিনজন অফিসার, ডা. কিংসফোর্ড আর ডা. সুধা রামচন্দ্রন। ডিনারের পর বিমানের আলো নিভিয়ে দিয়েছেন ফ্লাইট অ্যাসিসট্যান্টরা। ঢাকা পৌঁছতে এখনও ঘণ্টা চারেক বাকি। যাত্রীরা প্রায় সবাই ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। নাক ডাকার আওয়াজ শুনে লিলি একবার উল্টো দিকের কিউবিকলে তাকিয়ে দেখলেন, শব্দদূষণটা করছে পলাশ। বোধহয় বহুদিন পরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে। তাঁর আপনভাই! মানতে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। এতদিন যাকে চিনতেনই না, তাকে প্রথম প্রথম ভাই বলে মানতে তো একটু অসুবিধে হবেই।
রাত ন’টার সময় হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে যখন প্লেনটা টেক অফ করে, তখনই ককপিট থেকে পাইলট যাত্রীদের বলেছিলেন, ‘আমরা সৌভাগ্যবান, আজ আমাদের এই ফ্লাইটে একজন নোবেল লরিয়েট যাচ্ছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের তরফ থেকে আমরা মিস লিলি গডউইনকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।’ সঙ্গে সঙ্গে হাততালির বন্যা বয়ে গেছিল প্লেনে। লিলি প্রথমে অ্যানাউন্সমেন্টটা শোনেননি। তখন তাঁর মাথায় ঘুরছিল মোজাম্বিকের আর্ত শিশুদের কথা। মরিশাস থেকে তাঁর পাঠানো ত্রাণসামগ্রীর জাহাজ আজ সকালে বেইরা বন্দরে পৌঁছেছে। কিন্তু তার পর না কি লুটপাট হয়ে গেছে। তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের নিয়ে এই সমস্যা। ধৈর্যের অভাব, তার ফলে অশান্তি, অরাজকতা। খবরটা শোনা ইস্তক মন খারাপ লিলির। যাদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী পাঠালেন, তাদের হাতেই পৌঁছল না।
ফ্লাইট অ্যাসিসট্যান্টদের একজন গোলাপের তোড়া হাতে দিয়ে যাওয়ার পর লিলি বুঝতে পারেন, তাঁকে দেখার জন্য যাত্রীরা খুব উৎসুক। বেশিরভাগই বাংলাদেশি, লন্ডন থেকে দেশে ফিরছেন। কয়েকদিন আগে হয়তো কাগজে খবরটা পড়েছেন। পিছন থেকে অনেকেই এসে তাঁকে দেখে গিয়েছেন। হাত মিলিয়েছেন, অটোগ্রাফ নিয়েছেন, সেলফি তুলেছেন। ডিনার সার্ভ করার পর উৎসাহটা অবশ্য কমেছে। রেজওয়ানা বলছিল, তিনি যাচ্ছেন বলে ঢাকাতেও প্রচণ্ড উচ্ছ্বাস। মহম্মদ ইউনিসের পর তিনিই না কি দ্বিতীয় নোবেল লরিয়েট যাঁর জন্ম বাংলাদেশে। দীর্ঘ ছেচল্লিশ বছর পর ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে আসছেন। পিএম বিলকিস বেগম গণসংবর্ধনার আয়োজন করেছেন রমনা ময়দানে। সংসদ ভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শিশু কল্যাণ নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। রাতারাতি আমোদপুর গ্রাম না কি এখন বিখ্যাত বাংলাদেশে।
ডিএনএ রিপোর্ট মিলে যাওয়ার পর পলাশের পাগলামিরও শেষ নেই। ব্যাবসার কাজ ছেড়ে মাসখানেক ধরে তাঁর অ্যাকোয়াটিকা রেসিডেন্সির বাড়িতে বেচারি ছুটে ছুটে এসেছে। ঢাকার আইটেনারি ঠিক হয়ে যাওয়ার পর পলাশ একদিন তাল তুলল, ‘দিদিভাই, আমার অনুরোধ, আফনে দ্যাশে যাইবেন শাড়ি পইর্যা। কুসুম আফনেরে শিখাইয়া দিব, ক্যামন কইর্যা শাড়ি পরতে হয়। আগে থেইক্যা প্রাকটিস কইর্যা রাখেন। তাইলে দ্যাশে গিয়া নিজেরে ক্যারি করতে পাইরবেন।’ ওর আবদার শুনে লিলি হাসতে শুরু করেছিলেন তখন। সত্যিই, এথনিক পোশাকের মর্যাদাই আলাদা। তাঁতের শাড়ি পরে রোকেয়া যখন দেখা করতে আসত, তখন ওকে বেশ ভাল লাগত। দিন চারেকের মধ্যে পলাশ কোত্থেকে গোটা দশেক জামদানি শাড়ি এনে হাজির করেছিল। সেইসঙ্গে গলাবন্ধ ব্লাউজ। প্রথমদিন রেজওয়ানা শাড়ি পরিয়ে দেওয়ার পর নিজেকে আয়নায় দেখে লিলি চমকে গেছিলেন। এত সুন্দর লাগছিল তাঁকে দেখতে।
হালকা নীল রঙের কারুকার্য করা জামদানি শাড়ি পরে প্লেনে উঠেছেন লিলি। না, একটু শীত শীত করা ছাড়া তাঁর কোনও সুবিধে হচ্ছে না। মার্থা একজন ফ্যাশন ডিজাইনারকে ধরে এনেছিল। ঢাকার আবহাওয়া বিচার করে, সে ঠিক করে দিয়েছে, কোন অনুষ্ঠানে তিনি কী পরবেন। মার্চের প্রথম সপ্তাহ। কালবৈশাখী না হলে, কোনও কোনও দিন নাকি ঢাকায় বেশ গরম লাগতে পারে। ঘাম হলে খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়বেন লিলি। তখন পিঠের সুড়সুড়ানি বেড়ে যায়। ডা. কিংসফোর্ডকে এই কারণেই সঙ্গে এনেছে পলাশ। ডাক্তারি তো করবেনই, তা ছাড়া ভদ্রলোক খুব অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। পলাশ ওঁকে খৈয়াছড়ায় ঝরণা দেখাতে নিয়ে যাবে, হিচ হাইকিং করে। আমেরিকানরা এমন হুজুগেও হতে পারেন। এদিকে, কালকেতু একদিন কথায় কথায় বলেছিল, ম্যাডাম, শাড়ির সঙ্গে হাই হিল জুতোয় স্বচ্ছন্দবোধ করবেন না। তাই রেজওয়ানা শহরের ইন্ডিয়ান পাড়ায় গিয়ে ওয়েজ হিল জুতো কিনে এনেছে। আপাতত, সেটাই রয়েছে তাঁর পায়ে।
লিলির মনেই হচ্ছে না, তিনি নতুন কোনও জগতে যাচ্ছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বুঝে গেছেন, পলাশ আর ওর চারপাশের মানুষগুলো কী কেয়ারিং। সবসময় যেন সাহায্যের হাত বাড়িয়েই বসে আছে। ঘণ্টা দশেক আগে, হিথরোর এয়ারপোর্টে বসে গল্প করছিল কালকেতু। দলের একটা ছেলেটাকে দেখিয়ে ও বলেছিল, ‘এর সঙ্গে কেউ কি আপনার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ম্যাডাম? একে চেনেন?’
লম্বা, সুঠাম শরীরের ছেলেটাকে আগেও দেখেছেন লিলি। সবসময় কেমন যেন কুন্ঠিত হয়ে থাকে। পলাশের গাড়ি চালাতেও দেখেছেন তিনি মাঝে মধ্যে। লিলি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কে এই ছেলেটি?’
কালকেতু যা বলেছিল, তাতে কৃতজ্ঞতায় মন ভরে উঠেছিল লিলির। ইমন বলে এই ছেলেটা না কি একটা সময় জিহাদি ছিল। ও-ই প্রথম জানতে পারে, তাঁর ফাউন্ডেশনের টয় ডিভিশন থেকে প্রচুর অর্থ সরানো হয়েছে। পাল্টা হ্যাকিং করে সেই অর্থ আবার ফিরিয়েও এনেছে সে। ঈশ্বর না চাইলে এমনটা হতে পারে না কি? ছেলেটাকে ধন্যবাদ দেবেন বলে লিলি মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই সুযোগ পাননি। এয়ারক্রাফটে ওঠার পর ইমন আইল-এর একটা সিটে বসে পড়েছে। টয়লেটের খুব কাছাকাছি। ঘাড় ঘুরিয়ে লিলি ওকে দেখতে পাচ্ছেন। একটু আগেও ছোট আলোটা জ্বালিয়ে, ও একটা বই পড়ছিল। ডেইল কার্নেগির লেখা, লার্নিং ফ্রম মিসটেকস। এখন আলো বন্ধ করে দিয়ে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।
অন্য সময় লিলি যখন দূর পাল্লার কোনও ফ্লাইটে ওঠেন, তখন একটু বেশি পরিমাণেই রেড ওয়াইন খেয়ে নেন। চট করে চোখের পাতা বুঁজে আসে। কিন্তু এ বার নানা ভাবনা ঘুম আসতে দিচ্ছে না। সময় কাটানোর জন্য ইয়ারফোন লাগিয়ে কোনও সিনেমা দেখার ইচ্ছেটাও তিনি অনুভব করলেন না। মৃদু আলোয় সঙ্গী যাত্রীদের দিকে ফের একবার তাকালেন লিলি। কম্বল জড়িয়ে সবই ঘুমোচ্ছেন। পলাশের নাক ডাকা আপাতত বন্ধ। বেচারি আর কোনওদিন আমেরিকায় ফিরবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল। কিন্তু এখন ওর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, যেন যুদ্ধজয় করে ফিরছে। রোজিনার কথাও ওর মনে নেই। বেশ কয়েকবার পলাশ বলেছে, ‘আমার আর চাওনের কিছু নাই দিদিভাই। আফনেরে খুঁইজ্যা পাইসি, ব্যস। মায়ের মুখে হাসি ফুটসে। আর জীবনে কী চাই, কয়েন?’
গত কয়েকদিন ধরে পলাশ পরিবারের সবাইয়ের সম্পর্কে আন্দাজ দিয়েছে। গর্ভধারিণী মায়ের বয়স এখন পঁচাত্তর বছর। তাঁর সঙ্গে কথাও বলিয়ে দিয়েছে পলাশ। আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে মা কী বলছিলেন, লিলি অর্ধেক কথাই বুঝতে পারেননি। তবে, আক্ষেপের সুর ধরা পড়ছিল প্রতি কথায়। আমোদপুরে বোমা পড়ার পর তাঁর দুই ভাই ও এক বোনের মৃতদেহ না কি পাওয়া গেছিল নদীর পারে। কিন্তু মারাত্মক ভুল হয়েছিল সেদিন, বর্ডার পেরনোর তাড়ায় তাঁর খোঁজে পরিবারের কেউ হাসপাতালে যাওয়ার কথা ভাবেননি। কথায় কথায় মা আরও বলছিলেন, ‘তর জইন্য আমসত্ত্ব আর নাইরকেল নাড়ু বানাইয়া রাখুম বড়কি। তুই খাইতে ভালবাসতি। তর হয়তো মনে নাই। কিন্তু আমি ভুলি নাই। তুই আমার প্রথম সন্তান। তরে ভুলুম কী কইর্যা? যত হিগগির পারস, দ্যাশে আয় মা।’
নারকেল নাড়ুর কথায় এখন হেমলতা আন্টিকে মনে পড়ছে লিলির। কোড়ানো নারকেলের মাঝে ভাজা ক্ষীরের বড়ির পুর দিতেন আন্টি। গোথেনবার্গে তো বটেই নিউ ইয়র্কেও করে খাইয়েছেন অনেকদিন। আন্টি বলতেন, টাট্টিসারের নাড়ু। খেতে দারুণ লাগত তখন। সেই হেমলতা আন্টির সঙ্গে চল্লিশ বছর পর ফের দেখা হল প্রেসবাইটেরিয়ান হসপিটালে। কিন্তু এমন একটা পরিস্থিতিতে, যখন মেয়ের শোকে উনি পাথর। তবুও, চিনতে পেরে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন আন্টি। সবার সমানে বলেও ফেলেছিলেন, ‘মামণি, এলসা ডাইনিটা তর উফর এত অত্যাচার করসে, শাস্তি একদিন ঠিকই পাইব। আমার আইজ দুঃখ করনের কিছু নাই। এক মাইয়া চইল্যা গেল, আরেক মাইয়ারে ভগবান ফিরত আইন্যা দিল।’ রোজিনার কফিন তৈরি হওয়ার আগে অনেকক্ষণ ধরে ঢাকার হাসপাতাল আর আমোদপুরের গল্প করেছিলেন হেমলতা আন্টি।
যেন চোখের সামনে আমোদপুর গ্রামটাকে দেখতে পাচ্ছেন লিলি। কালীপুজোর সন্ধে। সাদা-লাল ডুরে শাড়ি পরে তিনি কালীমন্দিরের দিকে যাচ্ছেন। সঙ্গে পিঠোপিঠি দুই ভাই ও এক বোন। দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। পুজো শুরু হবে রাতে, শেষ হবে ভোরবেলায়। বছরের এই একটা দিনই বাসার বাইরে রাত কাটানোর সুযোগ। পুজোর জোগাড়ে মা-কাকিরা ব্যস্ত। হাজার একটা মাটির প্রদীপ সাজানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। বাবা-কাকারা ফানুস ওড়াচ্ছেন। কলকাতা থেকে নিয়ে যাওয়া আতসবাজি পোড়াচ্ছেন। এর পরই তাঁরা ভিড় করবেন চাতালের মাঝে হাড়িকাঠের সামনে। ছাগবলি শুরু হয়ে যাবে। রক্তের স্রোত নালা বেয়ে ভেসে যাবে নদীর দিকে। লিলির সতর্ক চোখ ভাই-বোনদের দিকে। মা বলে দিয়েছেন, ওদের সামলে রাখতে। কেউ যেন জ্বলন্ত প্রদীপের ধারে-কাছে না যায়।
ভাইবোনদের কালীদর্শন করাচ্ছেন লিলি। গর্ভগৃহের দরজাটা হাট করে খোলা। হ্যাজাকের উজ্জ্বল আলোয়, বাইরে থেকে মা কালীর জিভের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেলেন তিনি। মায়ের হাতে নরমুণ্ড ঝোলানো। দেখে নিজে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন। ভাইবোনদেরও হাতজোড় করে দাঁড়াতে বললেন। ঠিক সেইসময় মন্দিরের রোয়াক থেকে দাড়ি-গোঁফওয়ালা ভবা পাগলা তাঁকে দেখে বলে উঠল, ‘দেইখ্যা নে। শ্যাষবারের মতো মায়রে দেইখ্যা নে। কেউ তোরা বাঁইচ্যা থাকবি না। ভয়ংকর দুর্দিন আইতাসে।’ কথাগুলো বলে হুঙ্কার দিয়ে ভবা পাগলা রোয়াক থেকে লাফ দিয়ে নামল। তার পর চিৎকার করতে করতে নদীর দিকে ছুটে গেল। ভবার পাগলামি দেখে থরথর করে কাঁপছিলেন লিলি। পুজোর কাজ ছেড়ে এসে মা জড়িয়ে ধরেছিলেন ওকে। ভবা পাগলা যা বলে, তা না কি সত্যি হয়ে যায়। সঙ্গেসঙ্গে পূজোর আসরে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছিল। পাকিস্তানি সেনারা ঢাকায় গুলিগোলা চালাচ্ছে। ওরা কি আমোদপুরেও ঢুকবে?
সত্যিই এল সেই ভয়ংকর দিন। সকালে নুরুল চাচা বাসায় এসে বাবাকে বলল, ‘হুনতাসি পাকিস্তানি সোলজাররা আমাগো গেরামে বোমা ফেলতে আইব। চৌধুরীদাদা, আফনেরা যত হিগগির পারেন কালী মন্দিরে গিয়া আশ্রয় লন। গেরামের হগলরে খবরডা আমি গিয়া দিতাসি।’ কথাটা বলে নুরুলচাচা দৌড়ে বেরিয়ে গেছিলেন। সঙ্গেসঙ্গে মা-ঠাকুরমারা উলু দিতে শুরু করেছিলেন। মনে পড়ছে, খুঁটিনাটি সব মনে পড়ছে লিলির। সেই উলুর আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছিল এক বাসা থেকে অন্য বাসায়। অর্থাৎ কি না, সতর্ক হও, বিপদ আসছে। দুপুরের মধ্যে গেরামের সবাই গিয়ে উঠেছিলেন কালীমন্দিরের চাতালে। বাবা-কাকাদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, দেশে থাকা নিরাপদ হবে না। সেইসময় হঠাৎ আকাশ চিরে গর্জন। বোমা ফেলার জন্য পাকিস্তানের প্লেন আসছে। নুরুলচাচাই চিৎকার করে সবাই পালাতে বলেছিলেন নদীর দিকে। তার পরেই বিশাল আওয়াজ করে, প্রথম বোমাটা ফেটেছিল কালীমন্দিরের কাছে। কানে তালা লেগে গেছিল লিলির। সারা শরীরে জ্বলন অনুভব করেছিলেন তিনি।
হঠাৎ ধুপ করে একটা শব্দ কানে এল। চোখটা লেগে এসেছিল। চোখ খুলে লিলি দেখলেন, আমোদপুর নয়। তিনি প্লেনেই বসে আছেন। শব্দটা কোত্থেকে এল, বোঝার জন্য তিনি এ দিক ওদিক তাকালেন। তখনই মৃদু আলোয় লিলি অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন। টয়লেটের কাছে দু’জন ধস্তাধস্তি করছে। একজনের হাতে সিরিঞ্জের মতো কিছু একটা আছে। তার সেই হাত মুচড়ে ধরেছে অন্য একটি লোক। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় তলপেটে লাথি মেরে সে সিরিঞ্জধারীকে টয়লেটের ভিতর ঢুকিয়ে দিল। টয়লেটের ভিতরে ফের ধপাস করে একটা শব্দ। মারমুখী লোকটার মুখ দেখতে পাচ্ছেন না লিলি। বাইরে থেকে টয়লেট লক করে লোকটা মেঝেতে পড়ে থাকা সিরিঞ্জ, কম্বলে জড়িয়ে তুলে নিল। তার পর লম্বা পা ফেলে হেঁটে আসতে লাগল তাঁর দিকে। আতঙ্কে চোখ বন্ধ করে ফেললেন লিলি। ফ্লাইটে যে এই ধরনের একটা ঘটনা ঘটতে পারে, তা কোনওদিন ভাবতেও পারেননি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় লোকটা কী যেন বলে গেল। লিলির মনে হল, লোকটা নিশ্চিন্তে ঘুমোতে বলল।
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এত বড় ঘটনাটা। তিনি কি সত্যিই দেখলেন বা শুনলেন? না কি স্বপ্নের ঘোরে ছিলেন? এই তো একটু আগে তিনি আমোদপুরে কালীপুজো দেখতে পাচ্ছিলেন! ঢাকের আওয়াজ, প্রদীপের আলো, ফানুসের উড়ে যাওয়া, বোমা পড়া… সব। চোখ খোলার পর সব উধাও। এটা কি একটু বেশি রেড ওয়াইন পেটে যাওয়ার কুফল? লিলি নিজেকে প্রবোধ দিতে লাগলেন এই বলে, না, না, টয়লেটের সামনে কিছুই ঘটেনি। কিন্তু, একবার নয়, দু’দু’বার শব্দটা হয়েছিল। লিলি দ্বিধায়, সত্যিই হলে, অন্য কেউ তা শুনতে পেলেন না কেন? বিশেষ করে ফ্লাইট অ্যাসিসট্যান্টরা। টয়লেটের ডান দিকে দু’হাতের মধ্যেই ওরা বসেন। মারপিট হলে সর্বপ্রথমে ওঁরা টের পেতেন। উত্তেজনা প্রশমনের জন্য লিলি গভীর নিঃশ্বাস নিতে লাগলেন। একটা কথা তিনি বুঝতে পারলেন না, কিছু যদি হয়েই না থাকে, তা হলে একটু আগে কম্বলে ঢাকা লোকটা কেন তাঁর উদ্দেশে বলে গেল, ‘আর কোনও ভয় নাই।’ ওই লোকটাই বা কে?’
মানুষটার আশ্বাসেই হোক অথবা প্রাণায়ামের কারণে, লিলি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়লেন। কতক্ষণ ঘুমিয়েছেন, জানেন না। চোখ খোলার পর তিনি দেখতে পেলেন, বাম কিম তাঁর কিউবিকলের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন সেও ইয়ুনের সঙ্গে। আর কুন্ঠিত মুখে মাথা নীচু করে তা শুনছে কোরিয়ান মেয়েটা। প্লেনের আলো সব জ্বলে উঠেছে। জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ভোর হয়ে গেছে। টয়লেটের সামনে একটা ছোটখাটো ভিড়। প্রায় সবাই তাঁর সফরসঙ্গী। ঘুম জড়ানো চোখে লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে মি. কিম?’
বাম কিম বললেন, ‘কাল রাতে একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটে গেছে মিস গডউইন। আমরা জানতামই না, স্ট্যানলি গর্ডন এই ফ্লাইটে আমাদের সঙ্গে ট্রাভেল করছে।’
স্ট্যানলি গর্ডন! মানে… এই মাসখানেক আগেও যে তাঁর সিকিউরিটি গার্ড ছিল? সে কেন ঢাকায় যাচ্ছে, লিলি প্রথমে বুঝতে পারলেন না। প্রশ্নটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতেই বাম কিম বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনাকে আগেই বলেছিলাম, স্ট্যানলি চাকরি ছেড়ে দিয়ে মিচিগানে গিয়ে মুসলিম হয়েছিল। তখন থেকেই এফবিআই ওর উপর নজর রাখছিল। আপনাকে বলা হয়নি, স্ট্যানলি আইএস জিহাদিদের দলে যোগ দিয়েছে। আমার সন্দেহ, এই ফ্লাইটে ছদ্মবেশে ওকে পাঠানো হয়েছিল, কাউকে খুন করার উদ্দেশে।’
চমকে উঠে লিলি বললেন, ‘ছদ্মবেশে মানে?’
‘যাতে আমরা কেউ ওকে চিনতে না পারি। এই বিজনেস ক্লাসেই একেবারে পিছনের কিউবকলে ও বসেছিল। এক গাদা দাড়ি-গোঁফওয়ালা বৃদ্ধের সাজে। রাতে ওকে দু’একবার আমি দেখেওছি, স্টিকে ভর দিয়ে আপনার সিটের পাশ দিয়ে টয়লেটে যেতে। কিন্তু ওকে চিনতে পারিনি। একবার মনেও হয়েছিল, লোকটা ঘনঘন টয়লেটে যাচ্ছে কেন? তখন ভেবেছিলাম, হয়তো সুগারের রোগী। কিন্তু ও যে স্ট্যানলি, ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি।’
‘ও কি গান ক্যারি করছিল?’
‘না ম্যাডাম। স্টিকের ভিতর লুকিয়ে সিরিঞ্জ নিয়ে এসেছিল। তাতে হাইডোজের ইনসুলিন ভরা ছিল। ইনজেকশন দিয়ে কাউকে মেরে ফেলত। যে ওর টার্গেট ছিল, সে বোধহয় অনেক রাত অবধি জেগে ছিল। তাই ইনজেকশন পুশ করার সুযোগ পায়নি। ঘুমিয়ে পড়লে সে টেরও পেত না।’
শুনতে শুনতে লিলি শিউরে উঠলেন। তা হলে, জিহাদিরা এখনও তাঁর এবং কালকেতুর পিছু ছাড়েনি! তার মানে, কাল রাতে টয়লেটের সামনে যে দৃশ্য তিনি দেখেছিলেন, স্বপ্নের ঘোরে নয়, সেটা বাস্তব। কোনও রকমে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্ট্যানলি ধরা পড়ল কী করে?’
‘সেটাই জানার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের অফিসাররা। ওর সঙ্গে কথা বলছেন। টয়লেটের ভিতর অজ্ঞান অবস্থায় ও পড়েছিল। ম্যাডাম, এই স্ট্যানলি আপনার কিন্তু খুব ক্ষতি করেছে। এফবিআই অফিসারদের কাছ থেকে শুনেছি, এলসা গিনেসবেরিকে ও নিয়মিত আপনার সম্পর্কে খবর সাপ্লাই করত। আপনার কি মনে পড়ছে, নায়গারায় শ্যুট আউটের সময় ও আপনার ধারে কাছে ছিল না? এফবিআই অফিসাররা আমাকে বলেছেন, স্ট্যানলির সঙ্গে জিহাদিদের যোগাযোগ করিয়ে দেন এলসা গিনেসবেরিই। সেই কথা জেনে ওর বউ ওকে ছেড়ে চলে গেছে। আমার সন্দেহ হচ্ছে, স্ট্যানলি আজ আপনাকে খতম করার একটা শেষ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কে আপনাকে বাঁচালেন, জানি না।’
‘আমি জানি দিদিভাই।’ বলতে বলতে পলাশ কাছে এসে দাঁড়াল। ইমন বলে ছেলেটাকে ও ধরে এনেছে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে লিলি চমকে উঠলেন। ডানদিকের চোয়াল অস্বাভাবিক ফুলে রয়েছে। সেইসঙ্গে রক্তক্ষরণের চিহ্নও স্পষ্ট। ইমনকে দেখিয়ে পলাশ বলল, ‘স্ট্যানলি আফনেরে মারার জন্য আসে নাই দিদিভাই। হায় এই আহাম্মকরে খুন করতে চাইসিল। গদ্দারির শাস্তি দিব বইল্যা। বলদডা আমাগো কাউরে ডাকে নাই। দ্যাহেন, কী রিস্ক নিসিল। কাইল রাতে স্ট্যানলি যহন হ্যারে ইনজেকশন পুশ করতে যায়, তহন ইডিয়েটটা ফাল দিয়া উইঠা পড়ে। স্ট্যানলিরে আচ্ছা শিখখা দিসে। এমন রদ্দা মারসে, উইঠ্যা দাঁড়ানোর ক্ষমতা নাই। শূয়ারডার তহন মনে নাই, আর কয়দিন বাদে বিয়ার পিঁড়িতে দাঁড়াইব। দ্যাহেন, মুখের কী অবস্থা করসে। এয়ারপোর্টে হ্যার আম্মিও চিইনতে পাইরব না।’
কাল রাতের সেই মানুষটা তা হলে ইমন। যে নিশ্চিন্তে ঘুমোনোর পরামর্শ দিয়ে গেছিল! ফের একবার কৃতজ্ঞতায় মনটা ভরে উঠল লিলির। তিনি অভিজ্ঞ মানুষ। চট করে পরিস্থিতিটা বুঝে নিলেন। ইমন ছেলেটা বোধহয় জিহাদিদের সংশ্রব ছেড়ে ওর পরিবারের কাছে ফিরে যেতে চায়। হয়তো… হয়তো কেন, নিশ্চিতভাবেই পলাশ ওকে সাহায্য করছে। ছেলেটাকে ও দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জিহাদিরা সেটা সহ্য করবে কেন? স্ট্যানলি যদি সত্যিই ইনজেকশনটা দিতে পারত, তা হলে ইমনের মৃতদেহ ঢাকায় নামত। লিলি জানেন, ইনসুলিনের ওভারডোজ কতটা ড্যামেজ করতে পারে, মানব শরীরে। দুঃস্বপ্নের কথা মুহূর্তে ভুলে গিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কার বিয়ার কথা কইতাসো তুমি পলাশ।’
পলাশ বলল, ‘ক্যান, কেউ আফনেরে কয় নাই? হায় হায়। ইমনের বিয়ার কথা কইতাসি। পাত্রীও তো এই ফ্লাইটেই যাইতাসে।’ বলে পলাশ এদিক ওদিক তাকাল। তার পর বলল, ‘কুসুম… তুমি কই? এহানে আসো তো বইন। দিদিভাই তোমারে দ্যাখতে চাইতাসে।’
রেজওয়ানা কাছে এসে দাঁড়ানোর পরই ককপিট থেকে পাইলটের গলা শোনা গেল, ‘বিমানের সব যাত্রীকে অনুরোধ করছি, যে যার নিজের সিটে গিয়ে বসুন। সবাই সিটবেল্ট বেঁধে নিন। আর মিনিট পনেরোর মধ্যেই আমরা ঢাকার হজরত শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামব। ঢাকার আকাশ এখন পরিষ্কার। তাপমাত্রা প্রায় বত্রিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। আশা করি, আপনাদের যাত্রা সুখকর হয়েছে।’
রেজওয়ানা আর ইমন পাশাপাশি নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনকে সুন্দর মানিয়েছে। আড়চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে লিলি মনে মনে আশীর্বাদ করলেন।
সমাপ্ত
