জিহাদি – ৩৭

(সাঁইত্রিশ)

নিউ ইয়র্কে দু’একদিনের মধ্যে বড় ধরনের কোনও ঘটনা ঘটতে পারে। কালকেতুর মাথায় সুদীশের এই কথাটাই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে। লাঞ্চ করে ফিরে আসার পর ও অন্য কোনও কাজে মন বসাতে পারল না। বারবার ওর মনে হতে লাগল, চিরাগের খোঁজ নিতে পুলিশ এ বার পলাশভাইয়ের বাড়িতে যাবে। জিহাদিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ ওঁকে হেনস্থা করতে পারে। ওরা যে জিহাদি, পলাশভাই কি সত্যিই তা জানতেন না? উনি এতটাই সাধাসিধে মানুষ ধরে নেওয়া কি ঠিক? অন্তত রোজিনা ম্যাডামের আচার-আচরণে কখনোই মনে হত না, ছেলে দুটোকে, বিশেষ করে চিরাগকে উনি পছন্দ করেন। ওর সম্পর্কে বেশ কয়েকবার কড়া কথাও কালকেতু বলতে শুনেছে ম্যাডামকে। যে পলাশভাই ম্যাডামের পরামর্শ ছাড়া এক পাও এগোন না, তিনি কী করে সন্দেহজনক ছেলে দুটোকে আশ্রয় দিয়ে নিশ্চিন্তে ছিলেন? কালকেতু ঠিক করে নিল, সন্ধেবেলায় দেখা হলে পলাশভাইকে খোলাখুলি জিজ্ঞেস করবে।

চিরাগের ধরা পড়ার খবরটা কি মিডিয়া জানে? কথাটা মনে হওয়া মাত্রই কালকেতু টিভি চালিয়ে দিল। না, টিভিতে অন্য খবর দেখাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। এই খবরটা নিয়ে ডেমোক্রাটদের উষ্মা ফেটে পড়ছে। সরকারি কর্মচারীদের হাতে বেতন পৌঁছচ্ছে না। কী ভাবে সংসার চালাবেন তাঁরা, তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানাচ্ছেন তাঁরা চ্যানেলে। বিরাট মিছিল বেরিয়েছে নানা শহরে। ভারতে এ সব খবরই নয়। সরকারি কর্মীরা অফিস করবেন, অথচ মাইনে পাবেন না, এই সিদ্ধান্ত কোনও রাজনৈতিক নেতা নিতে সাহসই পাবেন না। এই খবরটা আমেরিকান মিডিয়া সারাদিন ধরে চটকাবে। বিরক্তিতে সোফা ছেড়ে উঠে কালকেতু বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এল। গোধূলিবেলায় আকাশে রং একেবারে বদলে হলুদ হয়ে গেছে। নদীতে সুদৃশ্য ইয়টগুলোর মধ্যে একটা বিলাসবহুল বোটও কালকেতুর চোখে পড়ল। সন্ধেবেলার পার্টির জন্য ঘাটের কাছাকাছি অপেক্ষা করছে।

ঘরের ভিতর সেল ফোনটা বাজছে। ফের ঘরে ঢুকে ফোন হাতে নিয়ে কালকেতু দেখল, পর্দায় লারেইনার হাসিমুখ। ওর পরনে ক্যারেটেকার সাদা পোশাক। কালকেতু বলল, ‘এতক্ষণ প্র্যাকটিস করছিলে না কি?’

লারেইনা বলল, ‘হ্যাঁ। নতুন বছরের শুরুতেই ব্ল্যাক বেল্টের পরীক্ষা দিতে হবে। তাই প্রিপারেশন নিচ্ছি। আপনি কী করছেন?’

‘তেমন কিছু নয়। তোমার রোজিনা ম্যাডামরা কোথায়, জানো।’

‘ওঁরা তো গেস্ট হাউসে নেই। মি. পলাশ হর্স ব্রিডিং সেন্টারে গেছেন। ওঁদের ফিরতে দেরি হবে। আপনার দায়িত্ব ওরা আমার উপর দিয়ে গেছেন।’ বলে হিহি করে হাসতে লাগল লারেইনা। ‘এখন বলুন, আপনি কোথায় যেতে চান?’

ওর প্রশ্ন শুনে কথাটা মাথায় খেলে গেল কালকেতুর। বলল, ‘মি. রায়ানের সঙ্গে কিছুসময় কাটানো যাবে?’

লারেইনা বলল, ‘কেন নয়? কখন দেখা করতে চান, বলুন?’

‘এখন সম্ভব হলে এখনই।’

‘দেখা করার কারণটা যদি উনি জানতে চান, তা হলে কী বলব?’

‘বোলো, ওর সাংবাদিক জীবনের গল্প শুনতে চাই।’

‘তা হলে উনি এখুনি রাজি হয়ে যাবেন। এই বিশাল র‌্যাম্পের মালিক হওয়া সত্ত্বেও উনি সেইদিনগুলোর কথা ভোলেননি। বলতে খুব আনন্দ পান। কিন্তু আগে আমাকে একবার ওঁর পিএসের সঙ্গে কথা বলতে হবে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। ঠিক আছে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি রিংব্যাক করছি।’

ফোনটা বন্ধ করে কালকেতু ফের টিভির দিকে মন দিল। পর্দার একপাশে চিরাগের মুখ। তার পরই পুরো পর্দা জুড়ে মেট্রো স্টেশনের পার্কিং চত্বর। পাশ দিয়ে রোজ যাতায়াত করে বলে কালকেতু চিনতে পারল। প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলছেন সিএনএন-এর সাংবাদিক। ভোর পাঁচটায় ট্রেন ধরতে গিয়ে তাঁর চোখে পড়ে একটা রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে সিঁড়ির কাছাকাছি। তখনই তিনি নাইন ওয়ান ওয়ানে ফোন করেন। নিউজ রিডার বলছেন, ‘ধৃত জিহাদির কোড নাম্বার আই সিক্সটি ফাইভ। অনেক দিন ধরে নিউ জার্সিতে এফবিআই তার খোঁজ করছিল। এফবিআই সূত্র থেকে একটু আগে জানা গেল, আই সিক্সটি ফাইভ সাইবার ক্রাইমের সঙ্গেও যে যুক্ত ছিল, তার প্রমাণ মিলেছে। সে এবং তার সঙ্গী মামুন মিলে চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের অ্যাকাউন্টস হ্যাক করেছিল। এই ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট মিস লিলি গডউইন। নিউ জার্সিতে পর পর দু’দিন দুই জিহাদিকে গ্রেফতার করল পুলিশ।’

খবরটা শোনার সঙ্গেসঙ্গে লিলি গডউইনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল কালকেতুর। গত পরশু দিনই ডিনার টেবলে অনেকক্ষণ ধরে ভদ্রমহিলার সঙ্গে ওরা গল্প করে এসেছে। বাচ্চাদের কল্যাণ নিয়ে কত কী উনি ভাবেন। বলছিলেন, অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে সংস্থাটা টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফাউন্ডেশনই ওঁর একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। অথচ, উনি একফোঁটা কৃতিত্বও নিজে নিতে চাননি। প্রতিটা কথায় বলছিলেন, তাঁর মেন্টর এলসা গিনেসবেরি ছাড়া তিনি এত বড় একটা সংস্থা গড়ে তুলতেই পারতেন না। আশ্চর্য, আমেরিকান মিডিয়া কতটা নির্দয় হতে পারে! এমন এক মহিলাকে প্রতিদিন নিন্দামন্দ করছে।

ডোর বেলের শব্দ শুনে কালকেতু উঠে দরজা খুলে দেখল, লারেইনা। ও বলল, ‘চলুন, আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি। মি. রায়ান এখন ক্যাসিনো কন্ট্রোল রুমে আছেন।’

গেস্ট হাউসে ঢোকার সময় দুপুরে ক্যাসিনো এরিয়াটা চোখে পড়েছিল কালকেতুর। একতলায় রিসেপশনের বাঁ দিকে। লিফটে করে নামার সময় লারেইনা বলল, ‘ইমন কি এখন ছুটিতে? না কি নিউ জার্সির বাড়ি পাহারা দিচ্ছে?’

কালকেতু খুব কৌতূহল হল বলে জানতে চাইল, ‘ম্যাডামের বাড়িতেই ওর থাকার কথা। কিন্তু হঠাৎ তুমি ওর কথা জিজ্ঞেস করলে কেন?’

‘টিভিতে দেখলাম, ওর কলিগ চিরাগ জিহাদি সন্দেহে ধরা পড়েছে। আমার অনেক আগেই সন্দেহ হয়েছিল মিঃ ন্যান্ডি। আউট হাউসে ক্লিনিং করতে গিয়ে, ওর বিছানার তলায় আমি জঙ্গিদের কিছু লিফটলেট আর সিডি পেয়েছিলাম। ম্যাডামকে সঙ্গেসঙ্গে তা জানাই। ম্যাডাম বলেছিলেন, কোনও অস্ত্র দেখতে পেলে লুকিয়ে তা নিয়ে আসতে। ওর বালিশের তলায় একটা জার্মান পিস্তলও একদিন দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা হাপিশ করতে পারিনি। তার পর একদিন ফাঁকা আউট হাউসে চিরাগ আমাকে মলেস্ট করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ও জানত না, আমি মার্শাল আর্টস জানি। ওকে আমি তুলে আছাড় মেরেছিলাম। ও আমাকে হুমকি দিয়েছিল, জানে মেরে দেবে। পরদিনই আমি কাউকে কিছু না বলে আলবুকার্কে চলে আসি।’

‘তুমি মি. পলাশ বা রোজিনা ম্যাডামকে কিছু জানালে না কেন?’

‘আমার উপায় ছিল না। চিরাগ আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল, গায়ে হাত দেওয়ার কথাটা যদি কাউকে বলি, তা হলে রোজিনা ম্যাডামকে খুন করে দেবে। চিরাগের অসভ্যতার কথা ম্যাডামকে আজই বলেছি, এয়ারপোর্ট থেকে গাড়িতে করে আসার সময়।’

লিফট থেকে বেরিয়ে এসে কালকেতু বলল, ‘আমার প্রশ্নটার উত্তর কিন্তু তুমি দাওনি।’

লারেইনা বলল, ‘কোন প্রশ্ন? ইমন সম্পর্কে? ছেলেটা চিরাগের মতো নয়। আমার সঙ্গে রিসেন্টলি ওর দেখা হয়েছিল, নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে। অনেকক্ষণ ধরে ও আমার সঙ্গে কথা বলেছিল। আপনি কি জানেন, ছেলেটা সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার? পেটের দায়ে গার্ডের চাকরি করছে?’

কালকেতুর কাছে এটা নতুন খবর নয়। ইমন নিজেও একবার ওকে বলেছিল। কিন্তু কতটা সত্যি, সুদীশকে জিজ্ঞেস করে বাজিয়ে দেখেনি। প্রসঙ্গটা আর না বাড়িয়ে লারেইনা পিছু পিছু ও ক্যাসিনোর ভিতর ঢুকে পড়ল। এর আগে জীবনে একবারই ক্যাসিনো দেখার সুযোগ পেয়েছিল নেপালের কাঠমান্ডুতে গিয়ে। কিন্তু র‌্যাঞ্চের এই ক্যাসিনোটা তার চেয়েও চারগুণ বড়। প্রায় হাজার খানেক মানুষ সিটে বসে নিবিষ্ট মনে জুয়া খেলছেন। তাঁদের মধ্যে ইয়ং ছেলে-মেয়েরা যেমন আছে, তেমনি সত্তর আশি বছর বয়সিরাও। হুইল চেয়ারেও এসেছেন কেউ কেউ। কালকেতু শুনেছে, ক্যাসিনোয় সবথেকে সহজ খেলা হল ব্ল্যাকজ্যাক। তাসের পাত্তি দিয়ে খেলতে হয়। জেতার সম্ভাবনা এই খেলাটাতেই সবথেকে বেশি। আরও দু’একটা খেলার নাম ও জানে। রুলেট, পোকার, ক্র্যাপস। কোনওটা ডাইস দিয়ে খেলতে হয়, কোনওটা চিপস দিয়ে। ও নিজে অবশ্য কোনওদিন খেলেনি।

টেবলগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা একটা লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লারেইনা বলল, ‘আমাদের বেসমেন্টে যেতে হবে। ওখানেই মি. রায়ানের অফিস।’

বেসমেন্টে নেমে কালকেতু অফিস দেখে হকচকিয়ে গেল। কম্পিউটারের সামনে বসে প্রচুর লোক কাজ করছেন। বিরাট একটা কাচের মনিটরে পুরো র‌্যাঞ্চটা দেখা যাচ্ছে। হাতে ওয়াকিটকি, নীল পোশাক পরা একদল সিকিউরিটি গার্ড লক্ষ রাখছেন, প্রতিটা অঞ্চলের দিকে। করিডর দিয়ে হাঁটতে হ্যাঁটাতে বেশ কয়েকটা নামী রেস্তোরাঁও চোখে পড়ল ওর। সুন্দরী মেয়েরা সাদা লো ফ্রক পরে রেস্তোরাঁয় ঢুকছে-বেরোচ্ছে। তাদের হাতে খাবার অথবা পানীয়ের ট্রে। উপরে যাঁরা জুয়া খেলছেন, মনে হয় তাঁদের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। কাঠমান্ডুতে কালকেতুর অভিজ্ঞতা হয়েছিল, রাত যত বাড়ে, ক্যাসিনোর আকর্ষণ তত বাড়ে। র‌্যাঞ্চে বোধহয় রাত বলে কিছু নেই।

মিঃ রায়ানের চেম্বারটা বুলেট প্রুফ কাচ দিয়ে ঘেরা। চেম্বারে ঢুকতেই কালকেতু জুঁই ফুলের গন্ধ পেল। রায়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, হাতজোড় করে পরিষ্কার বাংলায় আপ্যায়ন জানালেন, ‘আলেইকুম সেলাম। আসেন, বসেন।’

কথাটা বলে উনি স্মিত হাসিতে মুখটা ভরিয়ে দিলেন। কালকেতুও প্রতি নমস্কার করে বলল, ‘ধন্যবাদ।’

চেয়ারে বসে রায়ান ইংরেজিতে বললেন, ‘আর্লি সেভেন্টিজে আমি বছর তিনেক ঢাকায় ছিলাম। তখন ফ্লুয়েন্টলি বাংলা বলতে পারতাম। মাঝে অনেক বছর হয়ে গেছে। প্রায় ভুলে গেছি। রোজির মা অবশ্য আমাকে মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দ্যান।’

‘ঢাকার কথা কি আপনার এখনও মনে পড়ে?’

‘প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর হয়ে গেছে। খুব বেশি কিছু মনে নেই। ধানমণ্ডি অঞ্চলে প্রায়ই আমাকে যেত হত শেখ মুজিবর রহমানের বাড়িতে। বাংলাদেশ সংসদেও যেতাম। ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালের কথা আমার মনে আছে। লিবারেশন ওয়ারের সময় খবরের জন্য যেতাম। পরে যেতে হত, আমার ফার্স্ট ওয়াইফ অসুস্থ হওয়ার পর। তখন ঢাকায় ভাল প্রাইভেট হসপিটাল ছিল না।’

‘সকালে মি. গাটম্যান বলছিলেন, যে ছবিটার জন্য উনি পুলিৎজার পেয়েছিলেন, সেটা যাতে ছাপা হয়, তার জন্য আপনি না কি এডিটরকে কনভিন্স করেছিলেন?’

‘কথাটা ঠিক। বাচ্চা মেয়েটার জন্য রিচার্ড যা করেছিল, তার তুলনা নেই। কিন্তু পরে পুরো কৃতিত্বটা নিয়ে চলে গেলেন আরেকজন।’

‘আপনি কার কথা বলছেন?’

‘মিসেস এলসা গিনেসবেরি। অসম্ভব চতুর মহিলা। ওই নির্লজ্জ সুইডিশ মহিলা তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, ওয়ার ভিক্টিম বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে ফায়দা তোলা যাবে। রিচার্ড নিশ্চয়ই বলেছে, সেইসময় ঠিক যুদ্ধের পর মেয়েটা কতটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল সারা বিশ্বের। সবাই অর্থ সাহায্য করতে চায়। সেটা বুঝে ভদ্রমহিলা আগ বাড়িয়ে মেয়েটার অভিভাবক হয়ে সবসময় মিডিয়ার সামনে হাজির হতেন। আমি সেইসময় ঢাকায় ছিলাম বলে ভদ্রমহিলার মতলব বুঝতে পেরেছিলাম। তার পর থেকে ওঁকে নিয়ে লেখালিখি একেবারে বন্ধ করে দিই। যতদূর আমার মনে আছে, ডাক্তার জোন্সও চটে গিয়ে রেড ক্রসের কাছে ওঁর সম্পর্কে কমপ্লেন করেছিলেন।’

মি. রায়ান ঠিকই বলছেন। কালকেতুর মনে পড়ল, সুদীশ পেন ড্রাইভে যে পুরনো পেপারকাটিংসগুলো ওর কাছে পাঠিয়েছিল, তাতে বম্বিংয়ের পর মেয়েটার সম্পর্কে খবর ছিল আট-ন’মাস পর্যন্ত। তার পর কাগজে আর কোনও লেখা বেরোয়নি। মেয়েটা ট্রিটমেন্টের জন্য গোথেনবার্গে চলে যাওয়ার পর থেকে ঢাকার কাগজ থেকে উধাও হয়ে যায়। এলসা গিনেসবেরি কার অনুমতি নিয়ে ওকে তখন গোথেনবার্গে নিয়ে গিয়েছিলেন? প্রশ্নটা কালকেতুর মুখ থেকে বেরোতেই, রায়ান বললেন, ‘নতুন দেশ… তখন ডামাডোল চলছে বাংলাদেশে। বিপর্যস্ত অর্থনীতি। দলে দলে রিফিউজিরা দেশে ফিরে আসছেন। পাছে মেয়েটার কোনও ফ্যামিলি মেম্বার এসে হাজির হন, এই আশঙ্কায় ভুগছিলেন মিসেস গিনেসবেরি। তাই তাড়াহুড়ো করে ওকে নিয়ে গোথেনবার্গে চলে যান। শুনেছি, বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিয়েছিলেন উনি।’

আরও খোলসা করে জানার জন্য কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘বাচ্চা মেয়েটার নাম কি আপনার মনে আছে?’

রায়ান বললেন, ‘আসল নাম কী ছিল, আমি বা রিচার্ড কেউ জানতাম না। হাসপাতালে ওর নামটা রেজিস্টার্ড ছিল বেবি হিসেবে। নাম জানানোর মতো ক্ষমতা মেয়েটার ছিল না। আট-নয় মাস সে ট্রমার মধ্যে ছিল। তার মধ্যে ওর ফ্যামিলির কেউ খোঁজ করতেও আসেনি। কিন্তু, আপনি পার্টিকুলারলি ওই মেয়েটাকে নিয়ে জানতে চাইছেন কেন?’

কালকেতুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতার গোল্ডেন জুবিলি উপলক্ষে একটা ডকু ফিল্ম করতে চাইছেন। আমার উপর ভার পড়েছে, রিসার্চ করার। তাই কিছু তথ্য আমার জানা দরকার। মিসেস গিনেসবেরির সঙ্গেও আমার কয়েকদিন আগে দেখা হয়েছিল। বাচ্চা মেয়েটার সম্পর্কে কিছু বলতে চাইলেন না। তখনই আমার খটকা লেগেছিল। কী এমন ব্যাপার, যা উনি লুকোতে চাইছেন?’

‘বললাম তো, অসুস্থ বাচ্চা মেয়েটাকে ভাঙিয়ে উনি প্রচুর কামিয়ে নিচ্ছিলেন। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, গোথেনবার্গে ফিরে যাওয়ার পর উনি রেড ক্রসের চাকরিটা খোয়ান। কিছু করে খেতে হবে। সেই কারণে চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন নামে সেখানে একটা এনপিও খুলে ফেলেন। এটা করার দরকার হয়ে পড়েছিল। না হলে বিদেশি থেকে যে পরিমাণ অর্থসাহায্য আসছিল, তা আত্মসাৎ করা যেত না। আমি রিচার্ডকেও সব খুলে বলেছিলাম। কিন্তু ও একটু অন্য টাইপের মানুষ। আমাকে বলত, যা হচ্ছে, হতে দাও। আফটার অল, মেয়েটা তো সুস্থ থাকবে। কিন্তু এই চৌর্যবৃত্তি আমি মেনে নিতে পারছিলাম না।’

‘তা হলে, মিসেস গিনেসবেরি ফাউন্ডেশন লিলি গডউইনের হাতে তুলে দিলেন কেন?’

‘উনি ক্রমশ ধরা পড়ে যাচ্ছিলেন। মেয়েটাকে প্রথম দিকে বাংলাদেশের মুসলিম বলেও চালানোর চেষ্টা করেছিলেন মিসেস গিনেসবেরি। একটা মুসলিম নামও দিয়েছিলেন। মুসলিম ওয়ার্ল্ডের সহানুভূতি আদায়ের জন্য। সেইসময় সৌদি আরব থেকে ভাল পরিমাণ ডোনেশন আদায় করেছিলেন। গোথেনবার্গে তখন ওঁর ডান হাত ছিলেন ডা. গডউইন বলে একজন ডার্মাটোলজিস্ট। মেয়েটা যাতে চট করে সেরে না ওঠে, তার ব্যবস্থা করেন এই ডাক্তার। উনি ভুল ট্রিটমেন্টও করেছেন সেইসময়। ভাবতে পারেন, কী অমানবিক হতে পারে মানুষ, রোজগারের জন্য? ঢাকা থেকে তখন আমি একটা স্টোরি করেছিলাম, এই মতলববাজি নিয়ে। সুইডিশ সরকার তার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে। তড়িঘড়ি ডাক্তার গডউইন আমেরিকায় পালিয়ে যান। তার আগে মেয়েটাকে ব্যাপটাইজড করে তিনি দত্তক নিয়েছিলেন। যাতে ক্রিশ্চান কমিউনিটি বা চার্চ থেকে সাহায্য পাওয়া যায়। ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলেও মিসেস গিনেসবেরি বাঁচেননি। আর্থিক জালিয়াতির জন্য এক বছর ওকে সুইডেনের জেলে কাটাতে হয়েছিল।’

রায়ানের মুখে অতীতের এইসব কথা শুনে কালকেতু অবাক হয়ে যাচ্ছে। কথায় ঝাঁঝ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, উনি মারাত্মক চটে আছেন। রায়ান আরও কী উগড়ে দিতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় লারেইনা দরজা খুলে ঝড়ের গতিতে কী যেন বলল স্প্যানিশে। শোনার পর রায়ানের মুখ থেকে কে যেন রক্ত শুষে নিল। লাফ দিয়ে উঠে তিনি দ্রুত মনিটর রুমের দিকে এগোলেন। পিছন পিছন লারেইনা কাঁদতে কাঁদতে হাঁটছে। এই তো মেয়েটা একটু আগে হাসিমুখে কথা বলছিল। কী এমন হল, এখন কাঁদতে শুরু করেছে? দু’জনের কারও কথা কালকেতু বুঝতে পারেনি। বসে না থেকে ও উঠে গিয়ে মনিটর রুমে ঢুকল। সিকিউরিটির লোকেরা সবাই মনিটরের পর্দার দিকে তাকিয়ে। সেদিকে চোখ যেতেই কালকেতু শিউড়ে উঠল।

চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছে, ঝরণার কাছে দুটো নেকড়ের বিরুদ্ধে একা লড়াই করে যাচ্ছেন পলাশভাই। তার বাঁ হাতে একটা পাথরের টুকরো। ডান হাতে পিস্তল। জামা রক্তে ভিজে গেছে। তবুও, গুলি করে একটা নেকড়েকে ছিটকে ফেলে দিলেন পলাশভাই। গুলির শব্দে বাকি নেকড়েগুলো পিছিয়ে গিয়ে হিংস্র মুখে গরররর করছে। রোজিনা ম্যাডামের ছিন্নভিন্ন দেহটা জমিতে পড়ে। তাঁকে কামড়ে ধরার চেষ্টা করছে একটা নেকড়ে! দৃশ্যটা দেখার পর মাথায় চক্কর দিয়ে উঠল কালকেতুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *