জিহাদি – ৫

(পাঁচ)

আমেরিকায় হ্যালোইন বলে একটা উৎসব আছে। তারই একটা পার্টিতে যাবেন বলে তৈরি পলাশভাই। পরনে কালো রঙের থ্রি-পিস স্যুট। বো টাই। মানুষটাকে চেনাই যাচ্ছে না। গায়ের রং বেশ ফর্সা। তার উপর মেকআপ করেছেন। স্বচ্ছন্দে ওকে এখন আমেরিকান বা মেক্সিকান বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। হাতে ভুতের মুখোশ। সেটা মুখে দিয়ে পলাশভাই বললেন, ‘দ্যাহেন তো, আমারে চিনতে পারেন না হি?’

কিম্ভুতকিমাকার চেহারাটা দেখে কালকেতুর হাসি পেয়ে গেল। দুপুরে পলাশভাই ওকে ওয়ালমার্টে নিয়ে গেছিলেন। ওই ভূতের মুখোশটা কেনার জন্য। হ্যালোইন উপলক্ষে নানা ধরনের অদ্ভুত কস্টিউম দোকানে দোকানে বিক্রি হয়। পলাশভাই একটা কিংকংয়ের মুখোশ কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রোজিনা ম্যাডাম পছন্দ করবেন না ভেবে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যান। রোজিনার জন্য উনি উইচ হ্যাট আর ক্যাটস আই কিনেছেন। ডাইনিদের টুপি আর কালো বেড়ালের চোখ। এইসব কস্টিউম পরেই না কি পার্টিতে যেতে হয়।

ওয়ালমার্টে কস্টিউমের বাজার বেশ জোরদার। ছোট থেকে বড় সাইজের নরকঙ্কাল, করোটি, সাদা জালের উপর কালো মাকড়সা, কাক, কালো বেড়াল বিক্রি হচ্ছে। কালকেতুর চোখে পড়েছিল, প্রচুর মানুষ বেছে বেছে বিভিন্ন ধরনের ভূত-প্রেত, দত্যি দানোর কস্টিউম কিনছেন। ওয়ালমার্ট স্টোরের সামনে ডাঁই করা হলুদ কুমড়ো। একেকটার চার-পাঁচ কিলোর মতো ওজন হবে। কুমড়োগুলোর গায়ে বিদঘুটে চোখ আর মুখ আঁকা। লোকে নাকি বাড়ির সামনে কুমড়ো বসিয়ে রাখে হ্যালোইনের কয়েকদিন আগে থেকে।

হ্যালোইনের আনন্দে টেররিস্টদের কথা মনেও নেই কালকেতুদের। লাঞ্চের সময় রোজিনা কালকেতুকে হ্যালোইন ডে সম্পর্কে খানিকটা আইডিয়া দিয়েছেন। ভূত-প্রেতের দিন। এই দিনে মৃত প্রিয়জনদের লোকে স্মরণ করে। পাড়ায়, পার্কে এবং হোটেলের বলরুমগুলোতে সন্ধেবেলায় পার্টি। ভূত সেজে মানুষ জনকে ভয় দেখানোও চলে। ছেলেছোকরারা না কি অদ্ভুত কস্টিউম পরে হানা দেয় প্রতিবেশীদের বাড়িতে। শুনে রোজিনাকে কালকেতু বলেছিল, ‘এ রকম একটা দিন বাঙালিরা হিন্দুরাও পালন করে। কালীপুজোর সময় ভূত চর্তুদশীতে। মা আর বাবার দিকের মৃত চৌদ্দো পুরুষকে তর্পণের দিন।’

শুনে রোজিনা মন্তব্য করেছিলেন, কলকাতায় আপনারাও ওইদিন হ্যালোইন পার্টি চালু করে দিন না। কস্টিউম বিক্রি করে কিছু ব্যবসা তো হবে। ইউরোপ, আমেরিকাকে দেখে আপনারা শেখেন না কেন? এই দুটো কন্টিনেন্টে এমন কোনও উৎসব নেই, যার সঙ্গে বাণিজ্য নেই। কায়দা করে থার্ড ওয়ার্ল্ডে এরা কী করে ভ্যালেন্টাইনস ডে-র সেলিব্রেশনটা ঢুকিয়ে দিল, কখনও ভেবেছেন?’

হ্যালোইন পার্টিতে যাওয়ার জন্য সেজে গুজে রোজিনাও বেরিয়ে এসেছেন। পার্টিতে না কি একটা কনটেস্ট হয়, কার কস্টিউম সেরা। ডাইনির সাজে রোজিনাকে দেখে কালকেতুর মনে হল, পৃথিবীর সেরা ডাইনি সুন্দরী। মাথায় ছুঁচোলো, লম্বা কালো টুপি। চোখে আধমুখ ঢাকা বেড়াল-চশমা। পলাশভাইয়ের হাতে হাত ধরে দু’জনে র‌্যাম্পে হাঁটার মতো কয়েক পা এগিয়ে এলেন। স্টেজে না কি এমন ভাবেই ওঁদের হাঁটতে হবে। বেরিয়ে যাওয়ার আগেও রোজিনা একবার ওকে বললেন, ‘ফাঁকা বাড়িতে একা বসে আপনি কী করবেন? আমাদের সঙ্গে আপনি কিন্তু যেতে পারতেন। গেলে আপনার একটা নতুন অভিজ্ঞতা হত।’

দুপুরে আরও একবার এই অনুরোধটা উনি করেছিলেন। কিন্তু কালকেতু রাজি হয়নি। ওর কাছে অনেক বেশি ইম্পরট্যান্ট ফোনে সুদীশ নাগের সঙ্গে কথা বলা। কালকেতুর দীর্ঘদিনের বন্ধু সুদীশ এখন ইন্টারপোল-এর অফিসার। ওর ফোন করার কথা ফ্রান্সের লিওঁ থেকে। ইন্টারপোল হল আন্তর্জাতিক পুলিশবাহিনি। তাদের হেড কোয়ার্টার লিওঁতে। দু’দিন আগে কলকাতা থেকে সুদীশ লিওঁতে পৌছেছে। ওর কাছে কয়েকটা তথ্য চেয়ে কালকেতু একটা মেল করেছিল। এখন সুদীশের সঙ্গে ওকে কথা বলতেই হবে। না হলে যে কাজের জন্য ওকে পলাশভাই আমেরিকায় নিয়ে এসেছেন, তা একবিন্দু এগোবে না।

বাফেলোয় পুলিশের ঝামেলায় সেই কাজে মাঝে বাধা পড়েছিল। পলাশভাইয়েরা হ্যালোইন পার্টিতে বেরিয়ে যাওয়ার পর কালকেতু নিশ্চিন্তে ল্যাপটপ নিয়ে বসল। মাস দেড়েক আগেও ও চিনত না পলাশভাইকে। পরিচয় হওয়ার দিনটার কথা ওর স্পষ্ট মনে আছে। গল্ফগ্রিনে ওর হাউসিং কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ড রণজিৎ একদিন নীচ থেকে ফোন করে বলল, ‘স্যার, আপনার কাছে দু’জন ভিজিটর এসেছেন। উপরে পাঠিয়ে দেব?’

কালকেতু জিজ্ঞেস করছিল, ‘কী নাম বলল?’

‘একজনের নাম টুলটুল চাকলাদার। উনি বলছেন, ওঁকে আপনি চেনেন না। কিন্তু ওঁর বাবা নাকি আপনার খুব পরিচিত।’

‘বাবার নামটা কী, জিজ্ঞেস করো তো?’

কয়েক সেকেন্ড পর রণজিৎ বলেছিল, ‘রমাপ্রসাদ চাকলাদার। উনি নাকি আপনাদের সঙ্গে চাকরি করতেন।’

চট করে মনে পড়ে গেছিল কালকেতুর। আরে, রমাদা। একটা সময় ওদের কাগজে চিফ ফোটোগ্রাফার ছিলেন। ওদের থেকে অনেক সিনিয়র। বছর খানেক আগে উনি মারা গেছেন। একটা সময় কাগজের জন্য দারুণ দারুণ ছবি তুলেছেন রমাদা। ওঁর একটা ছবি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছিল। সেই রমাদার ছেলে হঠাৎ ওর কাছে! রণজিৎকে ও বলেছিল, ‘ভদ্রলোকদের উপরে পাঠিয়ে দাও।’

মিনিট তিনেক পরে রণজিতের সঙ্গে দরজার সামনে যে দু’জন এসে দাঁড়াল, তাঁদের একজনের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি না। তার পরনে জিনসের প্যান্ট আর হাফ হাতা পাঞ্জাবি। মাথার চুল পিছন দিকে ঝুটি বাঁধা। চশমার ফাঁকে উজ্জ্বল দুটো চোখ। মুখের আদল রমাদার মতোই। কালকেতুর বুঝতে অসুবিধে হয়নি, এ রমাদার ছেলে টুলটুল।

অন্যজনের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। পরনে থ্রি পিস স্যুট। সম্ভ্রান্ত চেহারা, দেখেই বোঝা যায়, প্রচুর পয়সাকড়ির মালিক। আট আঙুলে সোনা-রূপার আংটিতে রত্ন বসানো। গ্রহদের কবজা করার জন্য ধারণ করেছেন। নিশ্চয়ই বড় বিজনেসম্যান। প্রোমোটারও হতে পারেন। ভদ্রলোকের একহাতে বিরাট একটা মিষ্টির বাক্স। আসার সময় লেক গার্ডেন্সের মোড়ে বলরাম মল্লিকের দোকান থেকে কিনে এনেছেন। অন্য হাতে, চকচকে রঙিন পলিথিনের প্যাকেট। তার গায়ে লেখা পলাশ গারমেন্টস। টুলটুলের হাতে একটা বড় খাম। প্রণাম করার চেষ্টায় ও মাথা নীচু করতেই কালকেতু বলল, ‘থাক থাক। ভেতরে এসো।’

টুলটুল এমন একটা দিনে এসেছিল, যেদিন কালকেতুর টাইট সিডিউল। ক্যালকাটা ক্লাবে একজন ওর জন্য অপেক্ষা করবেন। মিনিট পনেরোর মধ্যে বেরতে না পারলে, ওঁর কাছে পৌঁছনো যাবে না। ড্রয়িং রুমে সোফায় বসার পর কালকেতু তাই টুলটুলকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বলো, কী কারণে দেখা করতে এসেছ।’

শুনে টুলটুল লজ্জিত মুখে বলল, ‘আঙ্কল, আমি জানি, আপনি খুব ব্যস্ত মানুষ। কিন্তু আপনার খুব বেশি সময় নেব না। যে কারণে এসেছি, সেটা বলার আগে আপনার সঙ্গে পলাশবাবুর আলাপ করিয়ে দিই। ইনি পলাশ চৌধুরী…’

টুলটুল কথাটা শেষ করার আগেই হাতজোড় করে নমস্কার জানালেন ভদ্রলোক। তার পর বলে উঠলেন, ‘ঢাকায় আমার ছুটো বিজনেস আসে। অ্যাকচুয়ালি আমার দরকারেই টুলটুলভাই আমারে আফনের এহানে লইয়্যা আইসে।’ কথাটা বলতে বলতেই ভদ্রলোক পলিথিনের ব্যাগটা কালকেতুর দিকে এগিয়ে দিলেন। তার পর বললেন, ‘আফনের লইগ্যা পদ্মার কয়েকডা ইলিশ আনসি। বিশ কেজির মতো উজন অইব। অহনই ফ্রিজে ঢুকাইয়া দেন। গ্যারান্টি দিয়া কইতে পারি, কইলকাত্তার মার্কেটে এই ইলিশ পাইবেন না।’

বাংলাদেশিরা এমনিতেই খুব দিলদরিয়া টাইপের হন। পলাশবাবু ওকে চেনেন না, জানেন না। তা সত্ত্বেও এত ইলিশ বয়ে এনেছেন। কাজের মেয়ে রেণুকে ডেকে কালকেতু বলেছিল, মাছগুলো ফ্রিজে তুলে রাখতে। তার পর পলাশবাবুর প্রয়োজনটা কী, তা জানার জন্য ও টুলটুলের দিকে তাকিয়েছিল। হাতে ধরে রাখা খাম থেকে একটা ছবি বের করে, সেটা এগিয়ে দিয়ে টুলুটুল বলেছিল, ‘এই ছবিটা আপনি আগে দেখুন। তার পর বলব, কেন এসেছি?’

ছবিটার দিকে তাকাতেই কালকেতুর স্মৃতির কোঠরে কে যেন ঘণ্টা বাজাতে শুরু করেছিল। এর আগেও কোথায় যেন দেখেছে। ছবিতে একজন ছয়-সাত বছরের মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে নদীর ঘাট থেকে দৌড়ে উঠে আসছে। তার পরনে শুধু ইজের। অনাবৃত উর্ধাঙ্গের কোনও কোনও অংশ আগুনে ঝলসে গেছে। তার চোখ- মুখে প্রচণ্ড আতঙ্ক। মেয়েটার পিছনে বিরাট কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী। আকাশ ছেয়ে ফেলেছে। তারই মাঝে বাড়ি ঘরদোর জ্বলছে। কাছেই একটা মন্দিরের একাংশ দেখা যাচ্ছে। মেয়েটার আশপাশে আরও কয়েকজন দৌড়ে পালাচ্ছে। দু’একটা দেহ রাস্তায় পড়ে। ছবিটা দেখেই কালকেতুর মনে হল, সাধারণ দাঙ্গা বা লুটপাটের সময় তোলা নয়। তার থেকে আরও অনেক বড় দুর্ঘটনার সময়কার। ধোঁয়ার কুণ্ডলীর বিশালত্বই তার প্রমাণ। মোট কথা, একটা অসাধারণ ছবি। নিশ্চয়ই রমাদার তোলা। না হলে টুলটুল পাবে কী করে? কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘রমাদা এই ছবিটা কবে তুলেছিলেন?’

টুলটুল বলল, ‘একাত্তর সালে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়।’

শুনে সঙ্গে সঙ্গে কালকেতুর মনে পড়ে গেল। ছিয়ানববুই সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে ওদের কাগজে সাপ্লিমেটারি বেরিয়েছিল। তাতে রমাদার এই পুরনো ছবিটা হাফ পেজ ছাপা হয়েছিল। সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে আর্টিকেল লিখেছিলেন বরুণদা। রিপোর্টার বরুণ গাংগুলি। সেই সময় ইন্ডিয়ান আর্মি মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধই শুরু হয়ে গেছিল ভারতের। বরুণদা সেই যুদ্ধ কভার করার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলেন। অনেক পরে বরুণদার মুখে কালকেতু শুনেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের ভয় দেখানোর জন্য পাক সেনাবাহিনী লোকালয়ে বোমা ফেলেছিল। টুলটুলের আনা ছবিটা তা হলে সেইসময়কার।

‘এ ছবিটা অ্যাদ্দিন পর তুমি পেলে কোথায় টুলটুল?’

প্রশ্নটা করতেই টুলটুল বলেছিল, ‘আপনি তো জানেন, বাবার স্টুডিয়ো ছিল পার্ক সার্কাস ময়দানের কাছে। বাবা রিটায়ার করার পর থেকে সেই স্টুডিয়োটা অ্যাদ্দিন আমিই চালাচ্ছিলাম। কিছুদিন আগে সেখানে আগুন লাগে। বাবার তোলা বহু মূল্যবান ছবি পুড়ে যায়। আমি কিছু বাঁচাতে পেরেছিলাম। সেগুলো গুছিয়ে রাখতে গিয়ে হঠাৎ একটা খামে এই বাচ্চা মেয়েটার ছবি আমার চোখে পড়ে। খুব যত্ন করে ছবিটা একটা ড্রয়ারে রাখা ছিল। সঙ্গে একটা চিঠিও। সেই চিঠির ফোটো কপি আমি নিয়ে এসেছি। পড়লেই বুঝতে পারবেন, আমি বা পলাশবাবু কেন আপনার শরণাপন্ন হয়েছি।’

কথাগুলো বলেই টুলটুল চিঠির খামটা এগিয়ে দিয়েছিল। সেটা হাতে নিয়ে কালকেতু জিজ্ঞেস করে, ‘এই ছবিটার কথা পলাশবাবু জানলেন কী করে? উনি তো ঢাকায় থাকেন।’

ফের কথার মাঝে পলাশবাবু বলে উঠলেন, ‘সোশ্যাল নেট ওয়ার্কের মাইধ্যমে। টুলটুলভাই ফেসবুকে ছবিডা আপলোড কইর‌্যা একডা অ্যাপিল করসিলেন। কেউ যুদি মাইয়্যাডারে চিইনতে পারেন, জানান। আমার বুড়া মা ছবিডা দেইখ্যাই কাঁইন্দ্যা ফ্যালায়। কয়, পলাশ রে… হ্যায় তর শিউলিদিদি। আমাগো বড়কি। বাবার মুখে হুনতাম, মুক্তিযুইদ্ধের সুময় আমাগো আমোদপুরে বোমা পড়সিল। হ্যার পর থেইক্যা শিউলিদিদিরে আর পাওয়া যায় নাই। তহন অবশ্য আমার জন্ম হয় নাই।’

পলাশভাইকে বাধা দিয়ে কালকেতু জিজ্ঞেস করে, ‘এতদিন পর আপনার শিউলিদিদির ছবিটা দেখে আপনার মা চিনতে পারলেন কী করে?’

পলাশভাই বলেছিলেন, ‘ক্যান জানেন, এই ছবিডা মক্তিযুইদ্ধের সময় কইলকাতার কাগজে বাইর হইসিল। রিফুজি হইয়া তহন আমাগো ফেমিলি কইলকাতায়। তহন দ্যাখসিল বইল্যা ছবিডার কথা মায়ের মনে সিল। আমোদপুরে বম্বিংয়ের পর শিউলিদিদি হারাইয়্যা যায়। আমার বাবা আর তার খোঁজ পায় নাই।’

পলাশবাবু চুপ করতেই টুলটুল বলেছিল, ‘আসলে এটা আমারই কৌতূহল বলতে পারেন। বাবার তোলা ছবিটা দেখার পরই আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগে। পরিবারের শিকড় থেকে যে মেয়েটা উপড়ে গেছে, সে এখন কোথায়, কীভাবে বেঁচে আছে, সেটা খোঁজ করে দেখলে কেমন হয়। পরিবারের সঙ্গে ফের মেয়েটাকে কি মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব? বাবাও এই রকম একটা ইচ্ছের কথা চিঠিতে লিখে গেছেন। মূলত, এই কারণে ছবিটা আমি ফেসবুকে দিয়েছিলাম। আমার ভাগ্য ভাল, পরিবারটাকে খুঁজে বের করতে পেরেছি। এবার টার্গেট মহিলাকে খুঁজে পাওয়া। আর এজন্যই আপনার কাছে আমাদের আসা। পলাশবাবুর ধারণা, পারলে আপনিই পারবেন, ওর দিদিকে খুঁজে বের করে দিতে।’

‘আরে মশয়, আফনে তো হুধু রিপোর্টার না।’ কথার সূত্র ধরে পলাশভাই বলেছিলেন, ‘আফনেগো ভাষায় কী য্যান কয়, রহস্যভেদীও। অনেক আশা নিয়া আফনের কাসে আইসি। আমারে ফিরাইয়া দিবেন না। যত ট্যাহা লাগে, আমি খরচা করুম। আমার দিদিকে যে খুঁইজ্যা দিতে পাইরব, আমি ঠিক করসি, তারে আমি এক কোটি ট্যাহা ইনাম দিমু।’

শুনে কালকেতুর হাসি পেয়ে গেছিল। বহু মানুষ ওর কাছে বহু সমস্যা নিয়ে আসেন। আজ পর্যন্ত তাঁদের কেউ এমন টাকার টোপ দেননি। সত্যি বলতে কী, কাজটা তো সহজ নয়। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ঢাকার কাছাকাছি কোনও গ্রাম থেকে, যুদ্ধের ডামাডোলে একটা বাচ্চা মেয়ে হারিয়ে গেছিল। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে দলে দলে শরণার্থীরা এ পার বাংলায় চলে এসেছিলেন। বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর খুব বেশি মানুষ ফিরে যাওয়া নিরাপদ মনে করেননি। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন। তাঁদের মধ্যে ছবির এই বাচ্চা মেয়েটা কোথায় আশ্রয় পেয়েছিল, কে জানে? এখন তাঁর বয়স তিপ্পান্নের উপর। প্রৌঢ়াই বলা যায়। চেহারায়ও অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। এই বিশাল পৃথিবীতে এখন তিনি কোথায়, আদৌও বেঁচে আছেন কি না, বলা মুশকিল। তাঁকে খুঁজে বের করা শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভব।

তবুও, জগতে কত রকম মিরাকলও তো আজও ঘটে। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার রামপলের কথা কালকেতুর তখন মনে পড়েছিল। ইডেনে টেস্ট ম্যাচ খেলতে এসে রামপল কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে গেছিল। খুঁজতে খুঁজতে কুমারটুলির এক প্রাচীন বাড়িতে তাকে আবিষ্কার করে কালকেতু জানতে পেরেছিল, রামপল তার পূর্বপুরুষদের সন্ধানে ওই বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়েছিল। দশপুরুষ আগে কুমারটুলি পাড়ার অভয় পাল নামে একজন, জীবিকার সন্ধানে চাঁদপাল ঘাট থেকে জাহাজে করে চলে গেছিলেন ত্রিনিদাদে। কলকাতায় খেলতে এসে পরিবারের শিকড় খুঁজতে খুঁজতে রামপল ঠিক পৌঁছে গেছিলেন পাল বাড়িতে। পলাশভাইয়ের অনুরোধ ফেলতে পারেনি কালকেতু। ভেবেছিল, তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। শিউলিদিদির খোঁজ পাওয়া গেলেও যেতে পারে। তাই দায়িত্বটা ঘাড়ে নিয়েছিল। সেই সূত্রেই ওর নিউ ইয়র্কে আসা।

পলাশভাইয়ের নির্জন অ্যাপার্টমেন্টে বসে নিবিষ্ট মনে ল্যাপটপে গুগল সার্চ করছে কালকেতু। হঠাৎ ওর মনে হল, দরজায় কেউ নক করছে। পলাশভাইরা কি তা হলে ফিরে এলেন? তা কী করে সম্ভব? আধ ঘণ্টাও হয়নি ওঁরা পার্টিতে গেছেন। যাওয়ার সময় বলেও গেছিলেন, ফিরতে অনেক রাত হবে। নিঃশধে হেঁটে ও সদর দরজার কাছে এল। আই হোল দিয়ে দেখল, ভূতের মুখোশ পরা দু’জন বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লাঞ্চ করার সময় কথায় কথায় রোজিনা একবার বলেছিলেন, প্রতিবেশী ছেলে ছোকরারা হ্যালোইনের রাতে ভূত-প্রেত, দত্যি-দানোর সাজে এসে হাজির হয়। নিয়ম হচ্ছে, তাদের লজেন্স, ক্যান্ডি বা চকোলেট দিয়ে বিদেয় করা। কিন্তু দরজার বাইরে যারা দাঁড়িয়ে আছে, তাদের দেখে কালকেতুর মনে হল না, নিছক মজা করার জন্য হাজির হয়েছে। ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলল, শিয়রে বিপদ। আগে বাঁচার কথা ভাবো। হ্যালোইনের রাতে মুখোশ পরে কেউ মার্ডার করে গেলে, সিসিটিভির ছবিও কাজে আসবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *