জিহাদি – ৩

(তিন)

গাড়িটা বাফেলো শহরে ঢোকার আগে চিরাগ নিচু গলায় একবার বলল, ‘ইমন দ্যাখ তো, ধারে-কাছে কোনও রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ে কি না?’

সাই সাই করে ঘণ্টায় সত্তর মাইল গতিতে গাড়ি ছুটছে ফ্রিওয়ে ধরে। স্টিয়ারিং কামালের হাতে। পিছনের সিটে জড়োসড়ো হয়ে বসে ওরা দু’জন। কোথায় যাবে, তার ঠিক নেই। যে কাজের জন্য ওরা তিনজন নায়গারায় এসেছিল, তাতে সফল হয়নি। রেস্টুরেন্টের কথা তুললেই কামাল খিস্তি দেবে। বলবে, ‘এই আখো ইল শারমুতাহ… তোদের লজ্জা করে না। একে তো জিহাদিদের নাম ডোবালি। তার উপর খেতে চাইছিস!’ আরবি ভাষায়, ‘আখো ইল শারমুতাহ’ কথাটার মানে হল, কুত্তীর ভাই। কোনও ভুল-ভ্রান্তি হলে প্রায়ই এই গালটা ইমনদের খেতে হয়।

আজ কানাডার দিক থেকে ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ পেরিয়ে যখন ওরা তিন জিহাদি নায়গারা ফলস-এ যায়, তখন বেলা আড়াইটে বাজে। তিনজন তিন দেশের। ইমন বাংলাদেশি, কামাল ইরাকি, আর চিরাগ অসমের করিমগঞ্জের ছেলে। নায়গারা স্টেট পার্কে ঢোকার আগে একটা রোডসাইড স্টল থেকে ওরা সেইসময় মাত্র একটা করে বার্গার খেয়েছিল। সেটা অনেক আগে হজম হয়ে গেছে। এখন রাত সাড়ে দশটা। খিদে পাওয়াটা স্বাভাবিক। ইমনেরও পেট চুইচুই করছে। কথাটা বলবে না, বলবে না করেও ইমন বলে ফেলল। দেখল, কামালও অনীহা দেখাল না। ফ্রিওয়ের ধারে দু’তিনটে রেস্তোরাঁয় ঢুঁ মেরে ওরা বুঝতে পারল, বাফেলো শহরে রাত দশটার মধ্যেই রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তখন কামালই বলল, ‘ওয়ালমার্টে চল, আমি জানি রাত দুটো অবধি খোলা থাকে।’

শহরের কোথায় ওয়ালমার্ট আছে, জিপিএস-এর মাধ্যমে খুঁজে বের করা যায়। ওয়ালমার্টে ঢুকে ওরা দেখে, সাবওয়ে রেস্তোরাঁটা খোলা আছে। চেয়ারে বসতেই ইমনের শরীরটা ছেড়ে দিল। সারাটা দিন মারাত্মক ধকলের মধ্যে দিয়ে গেছে। কম্যান্ডারের নির্দেশ মতো ওরা তিনজন আজ খুন করতে এসেছিল লিলি গডউইন বলে এক বয়স্ক মহিলাকে। বেলা তিনটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ওরা ভদ্রমহিলাকে স্রেফ ফলো করে গেছে। খুন করার সুযোগ পায়নি। বেলা বাড়ার সঙ্গেসঙ্গে ট্যুরিস্টদের ভিড় শুরু হল নায়গারা ফলস-এর পার্কে। অন্ধকার হওয়ার আগে পর্যন্ত চিরাগ শ্যুটিং রেঞ্জের মধ্যে আনতেই পারল না ভদ্রমহিলাকে। ওই গিজগিজে ভিড়ের মাঝেই কামাল মাঝে মধ্যে চিরাগকে ওস্কাচ্ছিল, ‘এইবার ঝেড়ে দে।’ চিরাগের হাতে যা টিপ, তাতে হয়তো কাজটা হাসিল করতে পারত। কিন্তু ও সাহস পায়নি। তা হলে ভিড় এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত পার্কিং স্পেস অবধি পৌঁছতে পারত না। তার আগেই ভদ্রমহিলার সিকিউরিটি গার্ডরা গুলিতে ওদের তিনজনকেই ঝাঁঝরা করে দিত।

সাবওয়ের কাউন্টারে বসা মেয়েটার কাছে খাবারের অর্ডার দিতে গেল কামাল। এর আগে ও একবার আমেরিকায় ঘুরে গেছে। এখানকার নিয়মকানুন সব জানে। চেয়ারে বসে থাকতে থাকতেই একটু পরে ইমন দেখল, কামাল পছন্দমতো সবজি দিয়ে স্যান্ডউইচ বানাতে ব্যস্ত। ও যেমন যেমন বলছে, মেয়েটা তেমনভাবেই বানিয়ে দিচ্ছে। সাবওয়ে হল বিরাট ফুড চেন। ইমন শুনেছে, এদের স্যান্ডউইচ খুব বিখ্যাত। বিশেষত্ব হল, খদ্দেররা পছন্দমতো সেটা বানিয়ে নিতে পারেন। একেকটা স্যান্ডউইচ সাইজে এত বড় যে, একটা খেলেই পেট ভর্তি হয়ে যায়।

ওর উল্টোদিকের চেয়ারে চিরাগ মুখ শুকনো করে বসে আছে। এক পলক তাকিয়েই ইমন বুঝতে পারল, ছেলেটা মারাত্মক টেনশনে। লিলি গডউইনকে খুন করার দায়িত্ব ছিল ওর উপর। পারেনি বলে অপরাধবোধে নয়, চিরাগ গুটিয়ে রয়েছে আশঙ্কায়। ব্যর্থতার জন্য কম্যান্ডাররা ওকে প্রচণ্ড মারধর করবেন ভেবে। সত্যি বলতে কী, খুন করার মতো গুরু দায়িত্ব ওদের স্তরের জিহাদিদের পক্ষে চট করে পাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু কম্যান্ডাররা চিরাগের উপর আস্থা রেখেছিলেন, কেননা মানুষকে খুন করতে ওর হাত কাঁপে না। অসাধারণ ওর হাতের টিপ। কাবুলে একবার এক মাইল দূর থেকে অদ্ভুত নিশানায় এক আমেরিকান জওয়ানকে ও হত্যা করেছিল স্যাস স্নাইপার দিয়ে। বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সেই গুলি। ওর এই দক্ষতাটা দেখে কম্যান্ডাররা খুব খুশি হন। সেই কারণেই কসোভোর ক্যাম্প থেকে ওকে পাঠানো হয়েছে নায়গারায়।

কার গাফিলতিতে চিরাগ টার্গেট মিস করল, ইমনকে সেটা ভাবাচ্ছে। লক ভেঙে গাড়ি চুরি করার ভার পড়েছিল ওর উপর। এটা ওর বাঁ হাতের খেল। পার্কোম্যাটে মার্সিডিজ গাড়িটা চুরি করার পরই ওর পিছনের সিটে বসে থাকার কথা ছিল। দক্ষ ড্রাইভার, তাই পালানোর সময় স্টিয়ারিং কামালের হাতে। এই ছিল প্ল্যান। কিন্তু নায়গারা পৌঁছনোর পর কামাল ফোনে কারও কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানাল, লিলি গডউইন এখনও হোটেল থেকেই বেরোননি। তখন ও-ই পরামর্শ দিল, ‘চল, ততক্ষণ আমরা নায়গারা ফলস দেখে নিই। এত কাছে এসেছি। জীবনে আর দেখার সুযোগ পাব কি না সন্দেহ।’ কিন্তু ফলস দেখার জন্য ফুটব্রিজে গিয়ে ওরা অবাক। দেখে লিলি গডউইন সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! সেইসময় ভুল খবর দেওয়ার জন্য চিরাগ চটে গিয়ে কামালকে আরবি ভাষায় খিস্তি মেরেছিল, ‘ইবন ইল শারমুতাহ।’ মানে, কুত্তীর ছেলে। ভাগ্যিস, কথাটা কামালের কানে যায়নি। গেলে হাতাহাতি হয়ে যেত দু’জনের মধ্যে।

ক্যালিফেট থেকে নির্দেশ এসেছিল, তিনজনের গ্রুপের ক্যাপ্টেন কামাল। ও যা বলবে, বাকি দুজনকে তা শুনতে হবে। কিন্তু কামালের উপর ভরসা রাখতে পারছিল না চিরাগ। লিলি গডউইনের গতিবিধি সম্পর্কে ও যা বলছিল, তা ভুলভাল। ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় উনি ঢোকার পর কোত্থেকে এক মহিলা এসে ওর সঙ্গে আড্ডা দিতে বসলেন। এটা কামাল জানত না। রেস্তোরাঁ থেকে লিলি গডউইনের বেরিয়ে আসা আর মার্সিডিজ চালিয়ে কামালের রেস্তোরাঁর দোরগোড়ায় পৌঁছনোর মাঝে কয়েক সেকেন্ডের দেরি। তাতেই সব প্ল্যান ভেস্তে গেল। কামাল ওইসময়টায় স্পিড তোলায় বাঁকের মুখে গাড়ির টাল সামলাতে পারেনি। মনে হয়, এই কারণেই চিরাগও নিশানা ঠিক রাখতে পারেনি। ইমনের অবশ্য একবার মনে হয়েছিল, কামাল ইচ্ছে করেই এটা করল। ও চায়নি, কাফের নিধনের জন্য চিরাগ প্রশংসা পাক কম্যান্ডারের কাছে?

তার পর গোট আইল্যান্ডসে পৌঁছে গাড়ির ওই অ্যাক্সিডেন্ট? পুলিশ ওদের তাড়া করেনি। অথচ গাড়ির গতি সামলাতে না পেরে কামাল গাছের গুঁড়িতে গিয়ে ধাক্কা মারল। কী বিপদেই না পড়েছিল ওরা তখন। ভাগ্যিস, সেইসময় আকাশে আতসবাজির খেলা চলছে। বাজির আওয়াজে চাপা পড়ে গিয়েছিল ধাক্কা মারার বুউম শব্দ। অত রাতে গোট আইল্যান্ডসে লোকজন থাকে না বললেই চলে। জঙ্গলের মাঝে জায়গাটায় ঘন অন্ধকারও। ওরা কী করে পার্কের বাইরে বেরিয়ে আসবে, সেটা ভেবে তিনজনের মুখই শুকিয়ে গেছিল। তখন কামালই বলল, ‘এখানে যে কোনও একটা গাড়িতে ব্রেক ইন কর ইমন। যাতে আমরা বাফেলোর মোটেল অবধি পৌঁছতে পারি।’ ফলে ইমনকে ফের একবার বাঁ হাতে খেল দেখাতেই হল। লক খোলার ব্যাপারে ও এমন ওস্তাদ, সামান্য একটা লোহার পিন দিয়েও কাজটা ও সারতে পারে।

দ্বিতীয়বার চুরি করা ফোর্ড গাড়িটা করেই ওরা ওয়ালমার্টে এসেছে। কামাল ঠিক করেছে, এই গাড়িটা ওরা এখানেই ফেলে রেখে যাবে। নিউ ইয়র্ক স্টেট পুলিশ নিশ্চয়ই এতক্ষণে দুটো গাড়ি চুরির কমপ্লেন পেয়ে গেছে। ইতিমধ্যে হয়তো খোঁজাখুজিও শুরু করে দিয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় সর্বত্র ক্যামেরা বসানো, ঘাপটি মেরে বসে থাকা পুলিশ পেট্রোল। হুটার বাজিয়ে যে কোনও সময় ফোর্ড গাড়িটাকে আটকাতে পারে। ওয়ালমার্ট থেকে বেরিয়ে ওরা কোথায় যাবে, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ক্যাপ্টেন কামালের। ঘাড় ঘুরিয়ে ও দেখল, কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে কামাল ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে। হয়তো কম্যান্ডারদের কাছ থেকে ফোন এসেছে। কার্যসিদ্ধি হল কি না, ওরা তা জানতে চাইছে।

‘ইবন ইল শারমুতাহ।’ কামালের দিকে তাকিয়ে চিরাগ ফের আরবি গালটা দিল। বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠেছে, ওর চোখ-মুখ থেকে রাগ আর ঘৃণা ফুটে বেরচ্ছে। সকালবেলায় অন্টারিওর হোটেল থেকে ওরা তিনজন যখন বেরোচ্ছিল, তখন আত্মবিশ্বাসে চিরাগের মুখটা ঝকমক করছিল। এখন তার চিহ্নমাত্র নেই।

ইমন ওকে বলল, ‘এত চেইত্যা গেছস ক্যান ভাই?’

‘শুয়ারের বাচ্চাটাকে খুন করার জন্য আমার হাত নিসপিস করছে।’

‘চিরাগ, অহন উল্টাপাল্টা চিন্তা করিস না। আমাগো দুই হাত পিছনেই কিন্তু পুলিশ। মাথায় রাখিস।’

চিরাগ পাল্টা কী বলতে যাচ্ছিল, কামালের ডাক শুনে চুপ করে গেল। কাউন্টার থেকে কামাল তাচ্ছিল্য দেখিয়ে ডাকল, ‘হুই ইয়া মনাশেফ বেঙ্গলিস, তোদের খাবারটাও আমাকে নিয়ে যেতে হবে না কি। পেট ভরাতে চাস তো এখানে এসে ট্রে নিয়ে যা।’

ইরাকের ছেলে কামাল আরবি, কুর্দ, আর্মেনিয়ান ছাড়াও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। কিন্তু যখন গাল দেয়, তখন আরবিতে। ইমন জানে, ইয়া মনাশেফ কথাটার মানে বীর্যহীন। ক্যালিফেটে বহুবার ওরা শুনেছে। কামালের কথায় পাত্তা দেবে না বলে চিরাগ গোঁ ধরে বসে আছে। গ্রুপ ক্যাপ্টেনের কথা না শোনার মূল্য ক্যালিফেটে গিয়ে দিতে হবে। ভেবে, ইমন সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে ওর আর চিরাগের ট্রে দুটো নিয়ে এল। যা ভেবেছিল, তাই হল। ওদের সঙ্গে এক টেবলে না বসে কামাল গিয়ে বসল দূরের একটা টেবলে। ক্যালিফেটেও ইমনরা দেখেছে, আরবিরা সবসময় বুঝিয়ে দেয়, ওরা উঁচু স্তরের জিহাদি। যারা আরব নয়, এমন মুসলমানরা ওদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসার যোগ্য নয়।

অপমান হজম করে ইমন চুপচাপ স্যান্ডউইচে কামড় দিল। সাবওয়েতে ওরা ছাড়া আর কোনও খদ্দের নেই। অত রাতে বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটাও প্রায় ফাঁকা। চিরাগ ট্রে-র সামনে চুপ করে বসে। স্যান্ডউইচ মুখে দেওয়ার কোনও তাগিদ দেখাচ্ছে না। মাথা গরম ছেলে। ওর মাথায় কী ঘুরছে, কে জানে? সেটা বোঝার জন্য ইমন সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘তর এত বড় ভুল হইল ক্যান ভাই?’

‘ভুল তো আমার হয়নি।’ চিরাগ ফোঁস করে উঠল। কামালের দিকে একবার তাকিয়ে তার পর বলল, ‘ভুল যার হয়েছে, তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। আমি ঠিক টার্গেটেই মেরেছি। কিন্তু লিলি গডউইন যে অন্য একজনের সঙ্গে ড্রেস বদলে নিয়েছিলেন, এই ইনফর্মেশন খানকির ছেলেটা আমায় দেয়নি। ও আমাকে ডিসক্রেডিট করতে চেয়েছিল। আমি যখন ভুল বুঝতে পারলাম, তখন সময় নষ্ট করিনি। আমার সেকেন্ড বুলেটটা যার গায়ে লেগেছে, সে আর উঠে দাঁড়াবে না।’

‘মাকারভ পিস্তলটা কি তোর সঙ্গেই আছে?’

‘না। কামাল হ্যান্ডওভার করতে বলেছিল। এটাই না কি কম্যান্ডারের অর্ডার ছিল। শুয়ারটা আমার মোবাইল ফোনটাও কেড়ে নিয়েছে।’

শুনে ইমন আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ স্যান্ডউইচ শেষ করে চিরাগের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। ওর ঘুম ঘুম পাচ্ছে। কোনও একটা নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে এখনই বিশ্রাম নেওয়া উচিত। কামালের দোষ নেই। ও ফোর্ড গাড়িটা আগে মোটেল পর্যন্ত নিয়ে যেতে চেয়েছিল। পরে বোধহয় ও চিন্তা করে দেখেছে, গাড়ি খুঁজতে খুঁজতে পুলিশ মোটেলে পৌঁছে যেতে পারে। কী দরকার ঝুঁকি নিয়ে? নায়গারার মতো একটা ট্যুরিস্ট স্পট-এ শ্যুট আউট হয়েছে। পুলিশ এই ঘটনাটাকে মোটেই সহজ ভাবে নেবে না। তার চেয়েও বড় কথা, অ্যাটাকটা হয়েছে ভিভিআইপি এক মহিলার উপর। এই বিপদ থেকে ওদের উদ্ধার পাওয়ার জন্য ইমনের মনে হচ্ছে, যা করার তা রাতের মধ্যে ওদের করে ফেলা উচিত।

ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলতে বলতে কামাল ওদের সামনে এল। তার পর লাইন কেটে দিয়ে রূঢ় গলায় বলল, ‘এই কুত্তারা শোন, তোদের জন্য একটা ভাল খবর আছে।’

ইমন মুখ তুলে তাকাল, কিন্তু কোনও প্রশ্ন করল না।

কামাল বলল, ‘কম্যান্ডারের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। এখানকার খবর শুনে উনি বললেন, পাছায় লাথি মেরে তোদের প্যাসিফিক ওশানে ফেলে দেওয়া উচিত। জিহাদি হয়ে তোদের লাভ নেই। বরং দেশে ফিরে গিয়ে তোরা মায়ের… মুখ দিয়ে শুয়ে থাক।’

কথাটা আরবিতে ও বলল, ‘কেসস ইমাক’। অর্থাৎ কী না মায়ের যৌনাঙ্গে। শুনে ইমন চট করে একবার চিরাগের দিকে তাকাল। দেখল, ওর হাতের মুঠি শক্ত হয়ে গেছে। যে কোনও মুহূর্তে রাগে ও ফেটে পড়তে পারে। কিন্তু প্রকাশ্যে মারামারিতে জড়িয়ে পড়লে ফল ভাল হবে না।

‘অপদার্থ, জঞ্জাল। হাঁ করে দেখছিস কী? চল, পার্কিংয়ে আমাদের জন্য গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের এখন বাফেলো মেডিক্যাল হাসপাতালে যেতে হবে।’

ইমন প্রশ্ন করল, ‘হাসপাতালে কেন?’

মুখ খিঁচিয়ে কামাল বলল, ‘তোরা মরদ কী না, সেটা পরীক্ষা করার জন্য রে বেজন্মা। ইয়েলান এল কিস হালি খালাকাক। মায়ের যেখান থেকে বেরিয়েছিস, তার দিব্যি। শোন যে আমেরিকান বেশ্যাটাকে মারতে এসেছিস, সে এখন হাসপাতালে। কম্যান্ডার অর্ডার দিয়েছে, তাকে তো মারতেই হবে। সেইসঙ্গে যে ওই বেশ্যাটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছে, তাকেও খাল্লাস করতে হবে। এ দুটো কাজ যদি না পারিস, তা হলে কম্যান্ডার বলল, তোদের দিয়ে লিঙ্গ চোষাবে।’

শেষের বাক্যটা চিরাগ শুনতে পায়নি। তার আগেই চেয়ার ছেড়ে উঠে ও সাবওয়ে থেকে বেরিয়ে গেছে। কামালের কথা শুনে চট করে রেস্তোরাঁর দৃশ্যটা ইমনের চোখের সামনে ভেসে উঠল। চিরাগ গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে যে লোকটা লিলি গডউইনের হাত ধরে টেনেছিল, তাকে দেখেছে ও। বয়স তিরিশের এ পাশেই হবে। নীল রঙের হুডি পরেছিল। তবে মজবুত শরীরের। ইমনের মনে হয়েছিল, সিকিউরিটি স্টাফ নয়। অর্ডিনারি পাবলিক। ইন্ডিয়া অথবা পাকিস্তানের হবে। লোকটার রিফ্লেক্স ঈর্ষা করার মতো। কিন্তু সেই লোকটাকে ওরা পাবে কোথায়?

একটু ইতস্তত করে প্রশ্নটা ও করতেই কামাল বলল, ‘লোকটা বাফেলোয় লা কুইতা বলে একটা হোটেলে এসে উঠেছে। ওর নাম-ধাম, ছবি, সব একটু পরেই আমার পকেটে এসে যাবে। তোদের চিন্তা করার দরকার নেই। এখন চল, আগে হাসপাতালে গিয়ে বেশ্যা মাগিটাকে সাবাড় করি।’

অবসাদে উঠে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে না ইমনের। শরীর একটা নরম বিছানা চাইছে। হায় রে জিহাদি জীবন! ইমন মনে মনে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করল, এই জীবন থেকে কি আদৌ মুক্তি পাবে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *