(দুই)
বাফেলো মেডিক্যাল সেন্টারে কেবিনের ভিতর বসে নিউ ইয়র্ক টাইমসে চোখ বোলাচ্ছেন লিলি গডউইন। নায়গারায় শ্যুট আউটের খবরটা কাগজে বেরিয়েছে কি না, তা দেখার জন্য। তিনি চাননি, খবরটা মিডিয়ার কাছে যাক। চিফ সিকিউরিটি স্টাফ স্ট্যানলি গর্ডনকে তিনি বলেই দিয়েছিলেন সে কথা। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর হেড লাইনগুলো দেখে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন, নাহ খবরটা বেরোয়নি। কাল রাত বারোটার সময়ই এফবিআইয়ের দুজন অফিসার হাসপাতালে তাঁর বয়ান নিতে এসেছিলেন। কিন্তু তখন তিনি গুলিবিদ্ধ রোকেয়া সুলতানাকে নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে পায়চারি করছেন। কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে ছিলেন না। তাই অফিসারদের তিনি আজ সকালে আসতে বলেছেন।
রোকেয়া সুলতানা হলেন বাংলাদেশের নামকরা একজন সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। তাঁর চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি। বহুদিনের পরিচিত। আসলে ওর সঙ্গে একান্তে কথা বলার জন্য লিলি গডউইনের নায়গারা দেখতে যাওয়া। রোকেয়া বলেছিল, ব্যাপারটা সিরিয়াস এবং খুব আর্জেন্ট। ইচ্ছে করলে লিলি নিউইয়র্কে ওঁর ফাউন্ডেশনের অফিসেই রোকেয়াকে ডেকে নিতে পারতেন। কিন্তু প্রোটোকল মেনে মিটিংটা করতে গেলে অনেক সময় লেগে যেত। তাছাড়া মিডিয়ার উৎপাত তো ছিলই। তখন রোকেয়াই বলেছিল, ‘আমি এখন কানাডার ওন্টারিওতে আছি। মিটিংটা নায়গারাতে করা যেতে পারে। আপনার কোনও অসুবিধে না থাকলে আমি ওখানে চলে যেতে পারি।’ রোকেয়ার কপাল ভাল। এই সময়ে জার্মানদের বিয়ার ফেস্টিভ্যাল চলছে নায়গারাতে। জার্মানরা এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন লিলিকে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার কাজটা হয়ে যাবে ভেবে, লিলি রাজি হয়ে গেছিলেন।
ঠিক হয়েছিল, দুজনে দেখা করবেন এমন একটা জায়গায়, যেখানে পরিচিত কোনও মানুষজনের চোখে পড়বেন না। তখনই সিকিউরিটি গার্ডদের তিনি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের নামটা বলে দেন। নায়গারা দেখতে এসে একবার ওখানে পাঞ্জাবি লস্যি খেয়েছিলেন। স্বাদটা য়োগার্তের মতো, কিন্তু মিষ্টি। জমাট দইয়ের মতো নয়, চুমুক দিয়ে খেতে হয়। গার্ডরা একবার নিরাপত্তার কথা তুলেছিল। তবুও লিলি পাত্তা দেননি। কিন্তু গোপনে কথা বলতে এসে যে এমন বিপদের মধ্যে পড়বেন, তা তিনি ভাবতেও পারেননি। রেস্তোরাঁর বাইরে অচেনা ছেলেটা আচমকা যদি হাত ধরে না টানত, তা হলে এতক্ষণে তিনি মর্গে পড়ে থাকতেন। ছেলেটা যেন ঈশ্বরের দূত হয়ে হাজির হয়েছিল।
এ নিয়ে দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন লিলি। গত বছর প্যারিসেও তিনি ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারতেন। ইউনিসেফের গুডউইল অ্যাম্বাস্যাডার হয়ে তিনি গেছিলেন স্টেটলেস কুর্দদের সমস্যার কথা শুনতে। নতরডম ক্যাথিড্রালের কাছে সেবার বোমা বিস্ফোরণ করেছিল উগ্রপন্থীরা। কিন্তু সিকিউরিটি গার্ডদের কাছে আগাম খবর দিয়ে রেখেছিল এফবিআই। শেষ মুহূর্তে তাঁর কনভয় বেরিয়েছিল বটে, কিন্তু তিনি তাতে যাননি। ফলে লিলি বেঁচে যান।
ওয়াশিংটন পোস্ট কাগজেও গুলিগোলার কোনও খবর নেই। কিন্তু প্রথম পৃষ্ঠায় একটা হেডলাইন দেখে লিলি চমকে উঠলেন। তুরস্কের সৌদি দূতাবাসের ভিতর ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক সাংবাদিক জামাল খাস্তোগিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ইনি সৌদি আরবের প্রিন্স মহম্মদ বিন সালমানের কট্টর সমালোচক ছিলেন। রাজরোষে পড়ে বছর দুয়েক আগে খাস্তোগি রিয়াধ থেকে পালিয়ে এসে আমেরিকায় আশ্রয় নেন। তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, সৌদিতে ফিরে গেলে খুন করা হবে। কয়েকদিন আগে বিবাহবিচ্ছেদের কাগজপত্র আনার জন্য খাস্তোগি ইস্তানবুলে সৌদি দূতাবাসে যান। ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, খাস্তোগি ইস্তানবুলে যাচ্ছেন জেনে প্রিন্স সালমান তাঁর দেশের উনিশজন গুপ্তঘাতককে কূটনীতিকের ছদ্মবেশে সেখানে আগে পাঠিয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞও ছিলেন। দূতাবাসের ভিতর খাস্তোগি ঢোকার পর তাঁকে খুন করা হয়। তাঁর দেহ টুকরো টুকরো করে না কি গুপ্তঘাতকরা সৌদি আরবে নিয়ে গেছে। প্রিন্স সালমানের সন্তুষ্টির জন্য।
রুদ্ধশ্বাসে খবরটা পড়ে লিলি গডউইন চমকে উঠলেন। এ তো হলিউড ব্লক বাস্টারের গল্প! জামাল খাস্তোগিকে তিনি ভাল করে চেনেন। তাঁর প্রেস কনফারেন্সে নিয়মিত আসতেন। খাস্তোগির বহু লেখা তিনি ওয়াশিংটন পোস্ট-এ পড়েওছেন। সত্যিই নির্ভীক সাংবাদিক বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলেন। সৌদি আরবে মানবাধিকার এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা কীভাবে পদপিষ্ট করা হচ্ছে, তা নিয়ে খাস্তোগি মাঝে মধ্যেই সোচ্চার হতেন। তাঁর একটা খবর তো সারা বিশ্ব তোলপাড় করে দিয়েছিল। গরিব দেশগুলো থেকে শিশুদের কিনে নিয়ে গিয়ে বিপদজনক ক্যামেল রেস-এ জকির কাজ করানো। উটদের দৌড়ে জকির কাজ করতে গিয়ে অনেক শিশু মারা যায় প্রতি বছর। ইউনিসেফকে জড়িয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত আরব দেশে ওই মারণ খেল বন্ধ করতে পেরেছিলেন লিলি গডউইন।
খাস্তোগির মৃত্যুর খবরটা ওয়াশিংটন পোস্ট-এ ধৈর্য ধরে পড়ে লিলি আন্দাজ করতে পারলেন, আমেরিকার রাজনীতিতে আরেকটা ঝড় আসছে। মিডিয়া এই কলঙ্কজনক ঘটনার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নিকি অ্যাডামসকে জড়ানোর চেষ্টা করবে। কেন তিনি খাস্তোগির রহস্যজনক মৃত্যুর ব্যাপারে কৈফিয়ত চেয়ে প্রিন্স সালমানের উপর চাপ সৃষ্টি করবেন না? মিডিয়ায় এমনও বলা হবে, প্রিন্স সালমানের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক মধুর। আমেরিকার কাছ থেকে সৌদি একশো দশ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনছে বলে প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস কিছুতেই সৌদি প্রিন্সকে চটাবেন না। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তুলে শেষ পর্যন্ত ইউনিসেফের কোর্টে বল ঠেলে দেওয়া হবে।
কেবিনের দরজায় নক করার শব্দ শুনে লিলি গডউইন বললেন, ‘কাম ইন।’
হাসপাতালেরই একজন নার্সিং স্টাফ। হাতে ফুলের তোড়া। হাসিমুখে মেয়েটা বলল, ‘গুড মর্নিং ম্যাম। এ তোড়াটা বাম কিম সু নামে একজন আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।’
রেনবো রোজেস ব্যোকে। সাদা-লাল-হলুদ-নীল…চার-পাঁচ রঙের গোলাপ দিয়ে বানানো। লিলি এই ধরনের তোড়া খুব পছন্দ করেন। শুভেচ্ছা জানানোর জন্য লোকে পাঠায়। হাতে নেওয়ার আগে লিলি নার্সকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলেন, সিকিউরিটি স্টাফরা ফুলের তোড়া পরীক্ষা করে দেখেছে কি না। কথাটা মুখ থেকে বেরোনোর আগে তিনি দেখলেন, সিকিউরিটি চিফ স্ট্যানলি গর্ডন কেবিনের মধ্যে ঢুকে এসেছে। মাথা ঝুঁকিয়ে গুড মর্নিং জানিয়ে স্ট্যানলি চোখের ইশারায় জানাল, ফুলের তোড়া ওরা পরীক্ষা করে দেখেছে। তোড়াটা বাম কিম সু পাঠিয়ে থাকলে কোনও সমস্যা নেই। তাঁর নাম করে কুমতলবে কেউ পাঠাতেই পারে। বাম কিম চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনে তাঁর সহকর্মী। কাল রাতেই নিউ ইয়র্ক থেকে উনি ফোন করেছিলেন। হামলার কথা শুনে বলেছিলেন, ভোরবেলায় বাফেলোর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়বেন। নিউ ইয়র্ক থেকে প্লেনে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়। হয়তো এতক্ষণে এসেও গেছেন।
ফুলদানিতে তোড়াটা গুছিয়ে দিয়ে নার্স ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর স্ট্যানলি বিনম্র গলায় বলল, ‘ম্যাম, কাল রাতে যা ঘটেছে, তার জন্য আমরা দুঃখিত।’
লিলি বললেন, ‘নেভার মাইন্ড। কারা অ্যাটাক করেছিল, জানা গেছে?’
‘এফবিআই থেকে দু’জন সিনিয়র অফিসার এসে বসে আছেন। তাঁদের মুখেই শুনতে পাবেন। ম্যাম আমরা কি তাঁদের পাঠিয়ে দেব?’
লিলি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। সত্যি কথা বলতে কী, উগ্রপন্থীরা নিউ ইয়র্ক স্টেট-এ ঘোরাফেরা করছে, এ কথা তিনি এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না। নাইন-ইলেভেনে টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়ার পর বুশ প্রশাসন থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, উগ্রপন্থা কার্যকলাপ আমেরিকা থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা হবে। প্রেসিডেন্ট তো স্লোগানই দিয়েছিলেন, ‘ওয়ার অন টেরর।’ কী হল সেই প্রতিশ্রুতির? লিলি জানেন, তাঁর উপর আক্রমণের খবর মিডিয়া জানতে পারলে বিরাট প্রতিক্রিয়া হবে। তারা প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসকে তুলোধোনা করে ছাড়বে। ফের চ্যানেলে চ্যানেলে দেশের দুই নিরাপত্তা সংস্থা সিআইএ আর এফবিআইয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কথা উঠবে।
উগ্রপন্থীদের মোকাবিলা করার জন্য নতুন একটা ফোর্স তৈরি করা হয়েছে প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে। মিডিয়া এমন প্রশ্নও তুলবে, সেই ফোর্সের অফিসাররা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন? তাঁরা জানতে পারলেন না কেন, উগ্রপন্থীরা খোদ নিউ ইয়র্ক স্টেট-এ বসে ষড়যন্ত্র করছে? তাঁর এসব ভাবনা-চিন্তার মধ্যেই কেবিনের ভিতর ঢুকে এলেন এফবিআইয়ের দুই অফিসার। একজন পুরুষ, অন্যজন মহিলা। পুরুষ অফিসার নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘ম্যাম, আমার নাম জন মিকেল। আর এ আমার কলিগ সুশান ব্রাউন। আপনাকে একটা সুখবর দিই। কাল যে মার্সিডিজ গাড়ি থেকে শ্যুট আউট হয়েছিল, চুরি করা সেই গাড়িটা পাওয়া গেছে।’
আমেরিকায় কোনও অপরাধ করে পার পাওয়া কঠিন। লোকাল পুলিশ বা এফবিআই অফিসাররা এমন দক্ষ, অপরাধীদের ঠিক খুঁজে বের করবেই। লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় পাওয়া গেল?’
‘গোট আইল্যান্ডসে। গাড়িটা জঙ্গলের ভিতর অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল ।’
গোট আইল্যান্ডস জায়গাটা নায়গারা নদীর ধারে। হর্সশু ফলস দেখার জন্য ওখান দিয়ে যেতে হয়। রাস্তার সর্বত্র ক্যামেরা বসানো আছে। মনিটরে ক্লিপিংস দেখে সহজেই বের করা সম্ভব গাড়ির গতিবিধি। লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘টেররিস্টদের কেউ কি ধরা পড়েছে?’
‘ম্যাম, আজ দুপুরের মধ্যেই তারা ধরা পড়ে যাবে। আমাদের ধারণা, ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ দিয়ে একটু আগে তারা কানাডায় ঢুকে পড়েছে। ওখানকার হেলিকপ্টার পুলিশ ফ্রিওয়েতে সেই গাড়ি ফলো করছে।’
আমেরিকা আর কানাডার সংযোগকারী সেতু হল ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ। লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক’জন রয়েছে সেই গাড়িতে?’
‘পার্কোম্যাটের ক্যামেরায় ছবি দেখে আমাদের মনে হচ্ছে, মার্সিডিজ গাড়িটা চুরি করার সময় ওরা তিনজন ছিল। ওরা কোন দেশের এখনও আমরা আইডেন্টিফাই করতে পারিনি। ছেলেগুলোর বয়স অবশ্য পঁচিশ-ছাব্বিশের বেশি নয়। ইন্টারপোল সন্দেহ করছে, ওরা জিহাদি। ওদের সম্পর্কে আরও তথ্য আমাদের দেবে বলেছে।’
‘হামলাটা কারা করেছিল, কেউ দাবি করেছে?’
‘হ্যাঁ ম্যাম। আই এস-এর বাংলাদেশ উইং। কাতারের আল জাজিরা চ্যানেলে ফোন করে এরা দাবি করেছে, মায়ানমারে রোহিঙ্গা সম্প্রদায় নিয়ে আপনার একটা কড়া মন্তব্যের জন্য আপনার উপর এই আক্রমণ। যাতে সারা বিশ্বের নজর কাড়া যায়। আল জাজিরা এখনও খবরটা টেলিকাস্ট করেনি। গোপন রেখে আমাদের সাহায্য চেয়েছে, দাবিটা কতখানি অথেনটিক যাচাই করার জন্য।’
‘আই সি।’ লিলি চিন্তিত মুখে জন মিকেলের দিক থেকে চোখ সরালেন। আইএস জঙ্গিরা তা হলে বাংলাদেশেও সংগঠন বাড়াচ্ছে! এটা আগে তিনি কখনও শোনেননি। নিশ্চয় তাঁর উপর হামলাকারীরা কেউ বাংলাদেশের। রোহিঙ্গাও হতে পারে। এমনিতে কাউকে উগ্রপন্থায় সামিল করাটা মারাত্মক অপরাধ। বাংলাদেশি অথবা রোহিঙ্গা ছেলেটিকে হয়তো বিরাট কোনও প্রলোভন দেওয়া হয়েছে। মায়ানমার থেকে তাড়া খেয়ে রাখাইন অঞ্চলের মুসলমান অর্থাৎ রোহিঙ্গারা নানা দেশে বেআইনিভাবে ঢুকে পড়ছে। এই স্টেটলেস রোহিঙ্গাদের নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে ইউনিসেফ গভীর চিন্তায়।
রোহিঙ্গারা সত্যিই অত্যাচারিত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ইউনিসেফের হয়ে লিলি মাস দুয়েক আগে ইয়াঙ্গনে গিয়েছিলেন। সেখানে ভাল অভ্যর্থনা পাননি। বৌদ্ধভিক্ষুরা তাঁকে কালো পতাকা দেখিয়েছিলেন। রোহিঙ্গারাও তাঁর উপর প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট। কেননা, এত অরাজকতার মাঝেও প্রতি বছর রোহিঙ্গা মহিলারা কেন গাদা গাদা বাচ্চার জন্ম দিচ্ছেন, এ প্রশ্নটা তিনি তুলেছিলেন। তাতে হয়তো ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা চটেছেন। মায়ানমারে ঘটনাপ্রবাহ যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে লিলি বুঝতেই পারছিলেন, ইসলামিক দেশগুলোর ইন্ধনে এ বার রোহিঙ্গারা হিংসার পথ নেবে। আল জাজিরার খবরটা শুনে এ বার তিনি নিশ্চিত হলেন, আইএস জঙ্গিরা কেন তাঁকে টার্গেট করেছে। জন মিকেলকে তাই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘যে গাড়ি থেকে শ্যুট আউট করা হয়েছিল, সেটা কার, তা কি জানা গেছে?’
মিকেল বললেন, ‘গাড়িটা আসলে অ্যাভিস কোম্পানির। দু’দিন আগে ক্লিভল্যান্ড এয়ারপোর্ট থেকে অ্যাভিস কোম্পানির ওই মার্সিডিজ গাড়িটা যিনি ভাড়া নিয়েছিলেন, তিনিও একজন বাংলাদেশি। ম্যাম, তাঁর নাম পলাশ চাউডুরি। গাড়িটা আজই নিউইয়র্ক এয়ারপোর্টে অ্যাভিস কোম্পানিকে তার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটা তিনি দিতে পারেননি। উনি বলছেন, রেস্তোরাঁর পাশে যে পার্কোম্যাটে উনি গাড়িটা রেখেছিলেন, সেটা আনতে গিয়ে দেখেন, নেই। শুনে আমাদের বিশ্বাস হয়নি। আপাতত আমরা নায়গারায় শেরিফের অফিসে মি. পলাশকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি।’
‘মি. মিকেল, আমার উপর হামলার খবরটা কি মিডিয়া জানে?’
‘এখনও পর্যন্ত, না। তবে ঘটনার সময় ওখানে যারা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি করলে, আমাদের কিছু করার নেই।’
‘মি. মিকেল, আমি চাই না, কাল রাতের ঘটনা নিয়ে মিডিয়ায় একটা লাইনও বেরোক। টেররিস্টরা নিউ ইয়র্ক স্টেটে হামলা করেছে, এই খবরটা ডেমোক্রাটদের কানে গেলে গভর্মেন্ট অস্বস্তিতে পড়বে।’
‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন ম্যাম। মিডিয়ার কেউ জানতে পারবে না। শেরিফের কাছ থেকে যখন আমরা খবরটা পাই, তখনই বুঝতে পারি, এটা ফেডারেল ক্রাইম। এফবিআইয়ের এক্তিয়ারে। স্টেট পুলিশের নাক গলানোর দরকার নেই। ফলে খবরটা লিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
‘আপনাদের কি মনে হচ্ছে অফিসার, প্রাইম টার্গেটটা কি আমিই ছিলাম?’
মিকেল ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘ম্যাম, আপনার কি অন্য কিছু মনে হচ্ছে?’
‘গুলিটা যার গায়ে লেগেছে, তিনি… রোকেয়া সুলতানাও কিন্তু বাংলাদেশি। তাই প্রশ্নটা মনে এল।’
‘ওঁর সঙ্গে কথা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এখনও উনি ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। ওঁর সম্পর্কে যদি আমাদের কিছু ইনফর্মেশন দিতে পারেন, ভাল হয়।’
‘ঢাকায় রোকেয়ার একটা এনজিও আছে, যার নাম বন্ধু। উনি আমাদের ফাউন্ডেশনের সঙ্গেও যুক্ত। আমার অফিসে বাম কিম সু-কে ফোন করলেই রোকেয়া সম্পর্কে ডিটেল তথ্য পেয়ে যাবেন। বাম কিম অবশ্য আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এখানে এসে পড়বেন।’
কথাটা শেষ হতে না হতেই দরজায় বাম কিম সু-র সহাস্য মুখটা দেখতে পেয়ে লিলি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। যাক, এমন একজন এলেন, যাকে ভরসা করা যায়।
