(উনত্রিশ)
প্লেনে উঠলে কখনও জানালার ধারের সিটে বসেন না রোজিনা। আকাশ থেকে নিচের দিকে তাকাতে তাঁর ভয় লাগে। কয়েক বছর আগে একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বোস্টন থেকে নিউ ইয়র্কে ফেরার পথে থান্ডার স্টর্মের মধ্যে পড়েছিলেন সেবার। এয়ারক্রাফটের একটা ডানা কাত হয়ে গেছিল। প্লেনটা এত কাঁপছিল, রোজিনার মনে হয়েছিল, এই বোধহয় ভেঙে পড়বে। আর তিনি বাঁচবেন না। দু’হাতে সিটের হ্যান্ডেল চেপে ধরে মনে মনে প্রভু যিশুকে ডেকেছিলেন। সেই এয়ারোফোভিয়া কাটাতে তাঁর অনেকদিন সময় লেগেছিল। তার পর থেকে প্লেনে চাপলেই তিনি আইল-এর সিটে বসেন। টেক অফের সময় থেকে ল্যান্ডিং পর্যন্ত পারতপক্ষে জানালার দিকে তাকান না।
আজ ক্রিসমাসের সকালে আলবুকার্ক যাওয়ার প্লেন ধরেছেন রোজিনা। উইন্ডো সিটে কালকেতুভাই, মাঝে পলাশ এবং আইলের সিটে তিনি। ড্যাডির আমন্ত্রণে ছুটি কাটাতে ওঁরা র্যাঞ্চে যাচ্ছেন। ভোর ছ’টায় নিউ জার্সির বাংলো থেকে যখন ওরা বেরোন, তখন হালকা বরফ পড়ছে। তাপমাত্রা মাইনাসের অনেক নিচে। তবুও, দেশের বাড়িতে যাওয়ার আনন্দে ঠান্ডা বোধ করছিলেন না রোজিনা। ক্রিসমাস ইভ কাটিয়ে নিউ জার্সি তখন ঘুমোচ্ছে। এয়ারপোর্টমুখী অত ব্যস্ত একটা রাস্তা শুনশান। এয়ারপোর্টেও লোকজন খুব কম। এয়ারক্রাফট প্রায় অর্ধেক ফাঁকা।
লারেইনার দুঃশ্চিন্তায় গত দু’তিনটে রাত্তির ভাল করে ঘুমাতে পারেননি রোজিনা। রোজ ঘুম থেকে ওঠার পরই ওর মনে সেই দুর্ভাবনাটা ফিরে এসেছে। গেল কোথায় মেয়েটা? দিন তিনেক ওর পাত্তাই নেই। ওর সম্পর্কে পুলিশের কাছে কমপ্লেনটাই বা করল কে, রোজিনা সেদিন জানতে চাননি। নিউ জার্সিতে যে মেয়েটার সঙ্গে ও রুম শেয়ার করে থাকে, সে হতে পারে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে ফোন করেছিলেন রোজিনা। সে বলল, ইউনিভার্সিটি ছুটি বলে প্রায় সপ্তাহখানেক আগে হিউস্টনে বাবার কাছে চলে গিয়েছে। আলবুকার্কে লারেইনার বাড়িতে নিশ্চয়ই এখনও ওর উধাও হওয়ার খবরটা পৌঁছয়নি। পৌঁছলে এতক্ষণে ওর মা ফোন করতেন। রোজিনার অস্বস্তির সবথেকে বড় কারণ, র্যাঞ্চে পৌঁছবার পরেই লারেইনার মায়ের সঙ্গে দেখা হবে। যদি ওর কথা ওঠে, তা হলে তিনি কী বলবেন?
আমেরিকায় ইয়ং মেয়েরা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে নাইট আউট করেই। এটা নিয়ে এখানে বাবা-মায়েরা কেউ কিছু ভাবেই না। একই ছাদের তলায় থাকলে মায়ের কর্তব্য, মেয়ের হ্যান্ডব্যাগে কণ্ডোমের প্যাকেট রেখে দেওয়া। যাতে মেয়ে গর্ভবতী হয়ে না পড়ে। আর মেয়েরা আলাদা থাকলে দায়িত্ব তার নিজের। বড় ভরসা করে লারেইনার মা মেয়েকে ছেড়ে দিয়েছিলেন রোজিনার কাছে। পরোক্ষে একটা দায় তো থেকেই গিয়েছে। মেয়েটার উধাও হওয়ার খবর এখন দিলে আন্টি বলতেই পারেন, ‘এই ক’দিন জানাওনি কেন?’ তী উত্তর দেবেন, প্লেনে বসে তা ভেবেই যাচ্ছেন রোজিনা।
ক্রিসমাসের এই সময়টায় সবাই ছুটি কাটাতে ব্যস্ত। কোথায় আর কার কাছে খোঁজ নেবেন রোজিনা? পলাশের ধারণা, বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে লারেইনাও কোথাও বেড়াতে গেছে। আলবুকার্কেও মায়ের কাছে যেতে পারে। কিন্তু এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মেয়ে লারেইনা নয়। আর কাউকে না বলুক, মেয়েটা ওঁকে অন্তত বলে যেত। কয়েকদিন আগে অবশ্য ও বলেছিল, ওর এক বন্ধু আদেলিনা আলবুকার্ক থেকে এই প্রথম আসছে নিউ ইয়র্কে। তাঁকে শহরটা ঘুরিয়ে দেখাতে হবে। লারেইনা কি তা হলে নিউ ইয়র্কের কোথাও আছে? সেই কারণেই কাজে আসতে পারেনি? দুর্ভাবনার সবথেকে বড় কারণ, মেয়েটা ফোন তুলছে না। ওর ফোন বেজেই যাচ্ছে। রোজিনা অবশ্য একটা ব্যাপারে নিশ্চিত, বলপ্রয়োগ করে কেউ ওর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। অন্য মেয়েরা উধাও হয়ে গেলে যে সব সম্ভাবনার কথা প্রথমে মাথায় আসে, লারেইনার ক্ষেত্রে সেটা প্রযোজ্য না। পুলিশ হতে চাওয়ায় মেয়েটা সেল্ফডিফেন্স ট্রেনিং নিয়েছে।
কাল রাতে কালকেতুভাই ওদের নিয়ে গেছিলেন মিস লিলি গডউইনের বাড়ি। ক্রিসমাস ইভের নেমতন্ন ছিল। অনেক রাতে ওরা তিনজন বাড়িতে ফিরে এসেছেন। ওই সময়টুকুতেই লারেইনার কথা রোজিনা ভুলে ছিলেন। ডিনার টেবলে পান করার সময় ক্রিসমাস উইশ জানাচ্ছেন সবাই একে একে। ঠিক সেই সময় কালকেতুভাই চমৎকারভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে ওঁদের প্রোজেক্টের কথা বললেন। প্লেনোতে ওদের চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার খোলার কথা। শুনে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে উঠে লিলি গডউইন বললেন, ‘আপনাদের এই মহৎ প্রচেষ্টা আটকাবে না। ইউনিসেফে আমার দুই কলিগ এখানে আছেন। আমার সঙ্গে তাঁরাও যতদূর সম্ভব, আপনাদের পাশে থাকবেন। নতুন বছরের শুরুতে আপনারা যাতে জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের অ্যাপ্রুভাল পান, তা দেখব।’ সত্যিই কালকেতুভাইয়ের তুলনা নেই। রিপোর্টার তো, গুছিয়ে ঠিক সময় ঠিক কথাটা উনি বলতে পারেন।
কাল লিলি গডউইনের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরোনোর পর খুশির মেজাজে রয়েছেন পলাশভাই। বিছানায় শোয়ার আগে জড়িয়ে ধরে একবার উনি জিজ্ঞেসও করেছিলেন, ‘আমার ক্রিসমাস গিফট আফনের ক্যামন লাগল ম্যাডাম?’
গিফট মানে, চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টারের অর্ধেক মালিকানা। তখন উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি রোজিনা। চুম্বনের তীব্রতায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, কতটা খুশি তিনি। ইস, বেচারিকে এখনও সুখবরটা দেওয়াই হল না। বাবা হতে যাচ্ছে। শুনলে পলাশের চোখ-মুখে কী ধরনের আনন্দের অভিব্যক্তি ফুটে উঠবে, সেটা তিনি আন্দাজ করতে পারেন। রোজিনা ঠিকই করে রেখেছেন, র্যাঞ্চে কয়েকটা সুন্দর স্পট আছে। ঝরণার ধারে বসে পলাশভাইকে জানাবেন, তাঁর ক্রিসমাস গিফটের কথা।
ঘাড় ঘুরিয়ে তাঁর প্রিয় মানুষটার দিকে একবার তাকালেন রোজিনা। তখনই চোখাচোখি হয়ে গেল। পলাশ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ভাবতাসেন ম্যাডাম?’
রোজিনা হেঁয়ালি করে বললেন, ‘ভাবতাসি, এত সুখ আমার সইব কি না। প্লেনে ওঠার পর থেইক্যা আমার ডাইন চোখ লাফাইতাসে। ভালা লক্ষণ না।’
‘কী আজে-বাজে কথা ক’ন।’
‘ধরেন, এই প্লেনডা যদি ক্র্যাশ করে, তাইলে? যতক্ষণ না ল্যান্ড করতাসে, ততক্ষণ বিশ্বাস নাই। তার উফর বাসায় আফনের দুই পোইষ্যপুত্তুররে রাইখ্যা আইলাম। হ্যাগো উফর আমার ভরসা নাই।’
‘চিন্তা কইরেন না। রিমোট কন্ট্রোলে সব লক কইর্যা আইসি। লক ভাঙার সাইধ্য হ্যাগো নাই। উল্ডা পাল্ডা না ভাইব্যা, আপনে আলবুকার্কের বাসার কথা ক’ন। র্যাঞ্চের কথা অনেক হুনসি। হলিউডের ছিনেমায়ও দ্যাখসি। আমার নতুন একডা অভিজ্ঞতা অইব।’
‘তিনশো একরের উফর ড্যাডির র্যাঞ্চ। সিনিক বিউটি সুপার্ব। আফনে রোম্যান্টিক মানুষ। এনজয় করবেন পলাশ। হর্স রাইডিং বা হান্টিংয়ে আপনার যদি ইন্টারেস্ট থাকে, তাইলে আরও ভালা লাইগব। আমার ড্যাডির র্যাঞ্চের ঘোড়া নর্থ আমেরিকায় খুব ফেমাস। গিয়া দেইখতে পাইবেন, হর্স কোর্স স্ট্যালিয়নে ভর্তি। দেখলেই চড়তে ইচ্ছা করব। হান্টিং স্পটও আছে জঙ্গলে। তবে, ভয়ের ব্যাপার হইল র্যাটল স্নেক আর উলফ। হ্যাগো কামড় খাইতে খাইতে আমি দুইবার বাঁইচ্যা গেসি।’
পলাশভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘অ্যানাকোন্ডা নাই?’
হিহি করে হেসে উঠলেন রোজিনা। তাঁর দাঁতের পাটি মুক্তোর মতো একবার ঝিলিক দিয়ে উঠল। রোজিনা বললেন, ‘কী বাচ্চাগো মতোন কথা ক’ন পলাশ। নর্থ আমেরিকায় অ্যানাকোন্ডা? অ্যানাকোন্ডা দ্যাখতে চান তো আফনেরে যাইতে অইব অ্যামাজনে। সাউথ আমেরিকায়।’
পলাশ জিজ্ঞেস করলেন, ‘হান্টিং স্পটের কথা কী য্যান কইতাসিলেন?’
‘ইচ্ছা করলে র্যাঞ্চের লাগোয়া ফরেস্টেও যাইতে পারেন। সেহানে হরিণ, ভালুক, নেকড়া, মাইগ্র্যান্ট বার্ডও আসে। র্যাঞ্চে অনেক লোক পাইবেন, যারা হান্টিং কইরতে আসেন। আমার ড্যাডি আর আঙ্কলরা উইক এন্ড-এ ফরেস্টে যান। হরিণ মাইর্যা আনেন। হরিণের মাংস পঁচাইয়া খাইলে যা টেস্ট হয়, ভুইলতে পারবেন না। চলেন, এইবার আফনেরে খাওয়াইমু।’
‘আমি খাইসি। ফর ইয়োর ইনফর্মেশন, আমার দাদামশায়ও খুব ভালা হান্টার সিলেন। হ্যায় খুলনায় গিয়া সুন্দরবন থেইক্যা প্রতিবসর রয়াল বেঙ্গল টাইগার শিকার কইর্যা আসতেন। আমোদপুরে আমাগো বাসায় গেলে দেইখতে পাইবেন স্টাফ করা বাঘের মুণ্ডু দেওয়ালে টাঙানো আসে। দাদামশায় না কি কালীপূজায় বইসতেন বাঘের চামড়ার আসনে। আচ্ছা, একডা কথা জিগাই, ফরেস্টে যে হব হরিণ, ভালুক, নেকড়ে থাকে, হ্যারা র্যাঞ্চের ভিতর কখনও ঢোকে?’
‘লোহার ফেন্সিং দেওয়া আছে। তবে, অনেক সময় ফেন্সিং টপকাইয়্য ভিতরে ঢুইক্যাও পড়ে। আফনের ভয়ের কিছু নাই। র্যাঞ্চের ফরেস্টে যে হব ভালুক, নেকড়ে থাকে, তারা কেউ ম্যানইটার না।’
‘আমাগো সুন্দরবনে কিন্তু বাঘেরা ম্যানইটার। গেরামে ঢুইক্যা মানুষ তুইল্যা নিয়া যায়।’
‘আপনে আমারে আমোদপুরের বাসায় লইয়্যা গেলেন কই?’
‘এইবার মনস্থির করসি, আফনেরে লইয়া যাম। খৈয়াছড়া প্রোজেক্টটা কিন্তু আমার মাথা থেইক্যা যায় নাই। আফনে খৈয়াছড়া ফলস দ্যাখলেই বুঝতে পাইরবেন, কত বড় প্রোজেক্ট অইতে পারে।’
কালকেতুভাই এতক্ষণ চুপ করে দু’জনের কথা শুনছিলেন। হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রোজেক্টটা কী ম্যাডাম?’
রোজিনা মিষ্টি হেসে বললেন, ‘আপনাকে বলেননি এখনও। পলাশের ড্রিম প্রোজেক্ট। ওদের দেশের খৈয়াছড়া ওয়াটার ফলস-কে উনি নায়গারা বানাতে চান।’
শুনে প্রসন্ন হলেন পলাশভাই। বললেন, ‘আফনে যতই মশকরা করেন না ক্যান ম্যাডাম, আমি করুমই। পৃথিবীর দুই প্রান্তে দুই ওয়ান্ডার। আমেরিকায় নায়গারা, বাংলাদ্যাশে খৈয়াছড়া। দুইডা নামের মধ্যে কী রিদমিক মিল আছে লক্ষ করসেন?’
পলাশভাইকে উসকে দেওয়ার জন্য কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘আরে প্রোজেক্টটা কী, সেটা কি আগে ডিটেলে শুনতে পারি?’
‘ক্যান পারবেন না?’ রোজিনার দিকে একবার লজ্জিত মুখে তকিয়ে পলাশভাই বলতে শুরু করলেন, ‘আমাগো চিটাগংয়ে খৈয়াছড়া ঝরণা হইল গিয়া বাংলাদেশের সবথেইক্যা বড়। লোকে ক’য় ঝরণার রানি। পাকিস্তানের আমলে কেউ জানত না মিরসরাই উপজিলায় হ্যায়রকম একডা ঝরণা আসে। পাহাড়, জঙ্গল মিলাইয়া জায়গাডা এমন দুর্গম, কেউ কুনওদিন খোঁজ নিতেও যায় নাই পানি আইতাসে কুনখান থেইক্যা। দ্যাশ স্বাধীন হওয়ার পর ট্যুরিস্টরাই ডিসকভার করে খৈয়াছড়াতে অত সুন্দর একডা ঝরণা আসে।’
কালকেতু থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ঝরণা আর জলপ্রপাত কি এক হল পলাশভাই? আপনি খৈয়াছড়া ঝরণাকে নায়গারা ফলস বানাবেন কী করে?’
শুনে রোজিনা উৎসাহিত হয়ে বললেন, ‘একজ্যাক্টলি, কালকেতুভাই আপনি ঠিক জায়গাটা ধরেছেন।’
হাত তুলে আমাদের থামিয়ে দিলেন পলাশভাই, ‘আগে হোনেন। ভাল কইর্যা না হুইন্যা প্রশ্ন তোলেন ক্যান? আমাগো দ্যাশের টপ জিওলজিস্টগো লইয়া আমি বারকয়েক মিটিং করসি। হ্যারা কইসেন, পসিবল। ফ্যাক্ট রিমেন্স, খৈয়াছড়া ফাউন্টেন-এর ওয়াটার সোর্স পাহাড়ের কোনও গুহা। ফ্যাক্ট রিমেন্স, নায়গারার জন্ম হইসিল কোনও গ্লেসিয়ার থেইক্যা। হেই আইস এজ-এ। বর্তমানে হ্যার ওয়াটার সোর্স এরি লেক। নায়গারার মতো পার মিনিট ষাইট হাজার গ্যালন পানি ঢালার ক্যাপাসিটি খৈয়াছড়ার নাই। বাট উই ক্যান মেক ইট পসিবল। খৈয়াছড়ার ওয়াটার সোর্স চেঞ্জ কইর্যা।’
পলাশভাই বলছেনটা কী? একটু অবাক হয়েই কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘কীভাবে?’
‘জিওলজিস্টরা কইসেন, যদি ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কোর্স চেঞ্জ কইর্যা চিটাগংয়ে আনা যায়, তা ইলে সম্ভব।’
ভূতাত্ত্বিকদের মতো বিশেষজ্ঞ নয় কালকেতু। সাধারণ জ্ঞান থেকে প্রশ্নটা ও করল, ‘কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ওয়াটার লেভেল অত উচুঁতে নিয়ে যাওয়া কী করে সম্ভব?’
‘গুড কোয়েশ্চেন।’ পলাশভাই বললেন, ‘খৈয়াছড়া ঝরণার আইটডা ধাপ আসে। যত নিচে নামসে, পানির ফ্লো তত ওয়াইড হইসে। এইটথ কাসকেড অর্থাৎ কী না, অষ্টম ধাপের হাইট খুব বেশি না। ব্রহ্মপুত্রের পানি সেখানে টানা যাইব। হ, পাঁইচ, ছয় হাজার কোটি ট্যাহার প্রোজেক্ট। হেইডা সাকসেসফুল করতে হইলে গর্ভমেন্টের গ্রিন সিগন্যাল দরকার। প্রাইম মিনিস্টারের সাথে একবার কথা কইসি। উনি কইসেন হেইডার ব্যাপারে পলিটিক্যাল ডিসিশন নিতে অইব। ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স নষ্ট অইতে পারে কী না, তা নিয়া আলোচনা কইরতে অইব সায়েন্টিস্টগো সাথে। আফনে খোদার উফর খোদগিরি কইরবেন, সবদিক ভাইব্যা চিন্তা কইর্যাই তো আগাইতে অইব।’
কালকেতু বলল, ‘উনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের দেশে নদীর উপর দেদার বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। পঁচিশ-তিরিশ বছর পর এখন দেখা যাচ্ছে, তার ফল ভাল হয়নি। নেচারের এগেনস্টে যাওয়া একেবারেই ঠিক হয়নি।’
কথার রেশ ধরে রোজিনা বললেন, ‘তার থেকেও বড় কথা, এত বড় প্রোজেক্ট নিয়া ফায়দাটা কী হবে? শুধু নাম কামানোর জন্য অর্থ খরচ করার পক্ষপাতী আমি নই। অর্থটা কতদিনে রিটার্ন আসবে, সেটা আগে কষে নেওয়া দরকার। আমি বাবা কর্পোরেট দুনিয়ার লোক। আগে ডলারের হিসেব করে তার পর এগোনোর কথা ভাবি।’
পলাশভাই হার মানার পাত্তর নন। বললেন, ‘হ্যায় দ্যাখেন কাইলকেতুভাই, ম্যাডাম কী ক’য়। আমার এত ট্যাহাপয়সা নিয়া করুমডা কী? সেই তো খালি হাতেই যাইতে অইব। খবরের কাগজে দ্যাখেন নাই, ফোর্ড ফ্যামিলির পোলা অহন খোল করতাল লইয়্যা ইসকনে হরি সংকীর্তন করত্যাসে। হ্যাগো তো ডলারের অভাব নাই। তাও ক্যান করত্যাসে? স্যাটিসফ্যাকশনের জন্য। ম্যাডাম হেইডাই বুঝতে পারতাসেন না।’
রাজিনা বললেন, ‘আফনের ট্যাহা, যা ইচ্ছা তাই কইরতে পারেন। কিন্তু বিজনেস অ্যাডভাইসার হিসেবে আমি আফনেরে কইতে পারি, খৈয়াছড়াতে যদি কিছু কইরতেই হয়, তাইলে র্যাঞ্চ খোলেন। আফনের মুখে যা হুনছি, তাতে জায়গাটায় র্যাঞ্চ অইতে পারে। ঘোড়া পালেন, কাউরে যাতে ঘোড়া কিনতে আরব দ্যাশে যাইতে না হয়। গরু পালেন। বিফ বিক্রি তো অইবই, মিল্ক প্রোডাক্টও তৈরি কইরতে পারেন। র্যাঞ্চে হ্যাচারিও মন্দ অইব না। মাল্টিপল সোর্স অফ ইনকাম অইতে পারে। লাস্ট বাট দ্য লিস্ট, ট্যুরিজম বিজনেসও চালাইতে পারেন। কত লোকের চাকরি অইতে পারে, ভাবসেন কহনও? চলেন, ড্যাডির র্যাঞ্চে গেলেই আফনে ট্যার পাইবেন, কী কইতে চাইতাসি।’
পলাশভাই উত্তরে কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় ককপিট থেকে ক্যাপ্টেনের গলা, ‘আমেরিকান এয়ারলাইন্স আপনাদের ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। আর পনেরো মিনিটের মধ্যে আমরা আলবুকার্ক এয়ারপোর্টে নামব। আলবুকার্কের তাপমাত্রা এখন মাইনাস টু। ক্লিয়ার স্কাই, সানি ডে। প্লিজ, আপনারা সিটবেল্ট বেঁধে নিন।’
মিনিট কুড়ি পর লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে বেরোতেই রোজিনার চোখে পড়ল, মাম্মির গা ঘেঁষে লারেইনা দাঁড়িয়ে। মাই গুডনেস, মেয়েটা আলবুকার্কে চলে এসেছে! কাছে এসে মেয়েটা হাগ করতেই রোজিনা একটু ধমক দেওয়ার সুরেই বললেন, ‘তুমি কি জানো, তোমাকে পুলিশ খুঁজছে?’
লারেইনা কোনও উত্তর দেওয়ার আগেই মাম্মি বললেন, ‘ওকে বকাবকি করিস না রোজি। ওর কোনও দোষ নেই। তোরা এখানে আসছিস শুনে আমিই ফোন করে ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। তোর ঘর পরিষ্কার করে রাখার জন্য। শোনামাত্র ও আলবুকার্ক চলে এসেছে।’
‘কিন্তু মাম্মি আমাকে তো ও বলে আসবে। কী চিন্তা হচ্ছিল, কী বলব।’
লারেইনা বলল, ‘ম্যাডাম, সিকিউরিটি গার্ড চিরাগ আপনাদের কিছু জানায়নি?’
শুনে রোজিনা বললেন, ‘না। আগে বলো, ফোনে তোমায় পাচ্ছিলাম না কেন?’
হিহি করে হেসে ফেলল লারেইনা। বলল, ‘শপিং মলে ভিক্টোরিয়া বেকহ্যামের দোকানে লিপস্টিক কিনতে গেছিলাম আমি আর আদেলিনা। সেল ফোনটা ওখানে হারিয়ে ফেলেছি।’
