জিহাদি – ২০

(কুড়ি)

নিউ ইয়র্ক টাইমস অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে কালকেতু একটু হকচকিয়ে গেল। মিডলটাউন ম্যানহাটনের এইটথ অ্যাভেনিউতে তিপ্পান্ন তলা বাড়ি। নিউ ইয়র্কের সবথেকে উঁচু দশটা বাড়ির অন্যতম। ফুটপাথ থেকে উপরের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যায়। কোন তলায় গেলে রিচার্ড গাটম্যানের দেখা পাওয়া যাবে ভাবতে ভাবতে কালকেতু কাচের দরজা সরিয়ে ভিতরে ঢুকল। আজকাল খবরের কাগজের অফিসে কারও সঙ্গে দেখা করতে গেলে চট করে দেখা করা যায় না। নানা রকম চেকিংয়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। মিডিয়ার অফিসেও টেররিস্টরা হানা দিচ্ছে। মি. গাটম্যান ওর সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। বিল্ডিংয়ের ভিতর ঢুকে কালকেতু দেখল, বিরাট রিসেপশনের পুরো ফ্লোরটা লাল কার্পেটে মোড়া। দুটো কাউন্টারে দু’জন বসে আছেন। একজন মহিলা ও অন্যজন পুরুষ। ও কিছু বলার আগেই ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন, ‘মে আই হেল্প ইউ জেন্টেলম্যান।’

কালকেতু বলল, ‘আমি একজন ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট। আপনাদের একজন ফোটোগ্রাফারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি। তাঁর নাম রিচার্ড গাটম্যান। তাঁর সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে?’

‘একটু অপেক্ষা করুন। আমি দেখছি, উনি এখনও আছেন কি না?’

কথাটা বলেই ফোনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাগলেন মহিলা। এদিক ওদিক তাকিয়ে তখনই কালকেতুর চোখে পড়ল দেওয়ালটা। পুরো দেওয়াল জুড়ে বড় নেমপ্লেটের সাইজে অসংখ্য কাচের পর্দা। তাতে নীল আলোর বিন্দু জ্বলছে-নিভছে। সেদিকে ভালভাবে তাকাতেই কালকেতু দেখল, প্রতিটি প্লেটে মুহুর্মুহু খবর বদলাচ্ছে। সারা বিশ্ব জুড়ে যেখানে যা ঘটছে, তার খবর। জাপান থেকে শুরু করে আমেরিকা। আইসল্যান্ড থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। অবাক হয়ে ও খবরগুলোতে চোখ বোলাতে লাগল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিকি অ্যাডামস হুমকি দিয়েছেন, মেক্সিকো সীমান্ত জুড়ে পাঁচিল তোলার জন্য তিনি যতদূর যাওয়ার যাবেন। ইয়েমেনে শিশুদের উপর অত্যাচার অব্যাহত। ব্রিটেনে ফের ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোট হতে পারে।

ভারতের খবরও চোখে পড়ল কালকেতুর। দিল্লিতে এনডিএ সরকারের এক মন্ত্রী এম জে আকবর পদত্যাগ করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মহিলাঘটিত কেলেংকারির অভিযোগে। আকবর কলকাতার এক নামী ইংরেজি কাগজের সম্পাদক ছিলেন। তিনি নিরানববুইজন লইয়ার নিয়োগ করেছেন, মানহানির মামলা করার জন্য। একেকটা লাইন প্লেটে ফুটে ওঠার সঙ্গেসঙ্গে আলো জ্বলছে। মাত্র চার-পাঁচ লাইনে পুরো খবর জানা হয়ে যাচ্ছে। আরেকটা প্লেটে কালকেতু দেখল, কেরলে ঘূর্ণিঝঞ্ঝায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন আমেরিকায় এসেছেন, প্রবাসী মালয়ালিদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য চাওয়ার জন্য। খেলার খবরও আছে। বিশ্ব ব্যাডমিন্টনের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের পিভি সিন্ধু।

‘এক্সকিউজ মি জেন্টেলম্যান।’

রিসেপশনিস্ট মহিলার গলা শুনে কালকেতু সে দিকে তাকাতেই উনি বললেন, ‘সরি, আপনি যাঁকে খুঁজছেন, তিনি কয়েক বছর আগে রিটায়ার করে গেছেন। মি. গাটম্যান এখন ডালাসে থাকেন।’

শুনে একটু মুষড়ে পড়ল কালকেতু। মি. গাটম্যানের বয়স এখন পঁচাত্তর থেকে আশির মধ্যে। ওঁর তো রিটায়ার করারই কথা। এটা আগে মনে হলে অ্যাদ্দূর ছুটে আসার দরকারই পড়ত না। ও বলল, ‘মি. গাটম্যানের কি কোনও কনটাক্ট নাম্বার পাওয়া যাবে?’

‘সিওর।’ বলে নোটপ্যাড থেকে কাগজ কেটে নিয়ে মহিলা খসখস করে লিখতে শুরু করলেন। তার পর সেই চিরকুট এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মি. গাটম্যানের অ্যাড্রেস, ফোন নাম্বার লিখে দিলাম। আপনি কি অন্য আর কারও সঙ্গে দেখা করতে চান। তা হলে আপনাকে আঠারোতলায় যেতে হবে। ওখানে আমাদের এডিটোরিয়াল ডিপার্টমেন্ট।’

দু’জনের নাম সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল কালকেতুর। গ্যারি স্মিথ আর রব হিউজ। প্রথমজনের সঙ্গে ওর আলাপ হয়েছিল অলিম্পিকে। শেষজনের সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলে। ওঁদের লেখা নিয়মিত পড়ত বলে কালকেতু নিজে যেচে আলাপ করেছিল দুই সাংবাদিকের সঙ্গে। তবে ওঁরা মনে রেখেছেন কি না, সন্দেহ। ভদ্রমহিলা উত্তরের অপেক্ষায় ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন দেখে কালকেতু নাম দুটো বলেই ফেলল। উনি ফের ফোনে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করে বললেন, ‘সরি জেন্টেলম্যান। ওঁরা টাইমসের স্টাফ নন। দু’জনেই ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট। টাইমস ওঁদের কলাম কেনে। আপনার নেমকার্ড থাকলে দিয়ে যান। মি. গাটম্যান কোনও কারণে এখানে এলে, তাঁকে কার্ডটা দিতে পারব।’

কাজের কাজ কিছুই হল না। মনে খানিকটা হতাশা নিয়েই কালকেতু ফের রাস্তায় নেমে এল। মাথা হেলিয়ে বাড়িটার শেষতলা দেখার চেষ্টা করেও সফল হল না। দু’একদিন আগে রোজিনা ম্যাডাম গল্প করতে করতে একবার বলছিলেন, ‘টাইমস বিল্ডিংটা নিউ ইয়র্কের লোকেদের কাছে খুব গর্বের। সবাই একবার ছাদে যেতে চায়। টিকিট কাটলে ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একশো দু’তলায় আপনি যেতে পারবেন। কিন্তু টাইমস বাড়ির ছাদ আপনার ধরাছোঁয়ার বাইরে। গার্ডদের ফাঁকি দিয়ে আজ পর্যন্ত বাইরের মাত্র দু’জন ছাদে পৌঁছতে পেরেছিল। বাইরের দেওয়াল দিয়ে ক্লাইম্ব করে। কী ডেঞ্জারাস ব্যাপার ভাবুন। অ্যারেস্ট হওয়ার পর দু’জনই বলেছিল, ওরা মেসেজ দেওয়ার জন্য এই ঝুঁকিটা নেয়। একজন টেররিস্টদের বিরুদ্ধে, অন্যজন স্টেটলেস মানুষদের সমর্থনে।’

বিকেল তিনটে বাজে। ম্যানহাটনের রাস্তায় লোক গিজগিজ করছে। বিরাট অফিস বাড়িগুলোর গায়ে নিওনের বিশাল বিশাল ডিজিটাল বিজ্ঞাপন। আনমনা হয়ে কালকেতু টাইমস স্কোয়্যারের দিকে হাঁটতে লাগল। পলাশভাই কাল রাতে বলছিলেন, ‘নিউ ইয়র্ক হইল গিয়া ওয়ার্ল্ডের গ্রেটেস্ট সিটি। আর নিউ ইয়র্কের বেস্ট জায়গা হইল টাইমস স্কোয়্যার। গিয়া দাঁড়াইলেই আফনের আর নড়তে ইচ্ছা করব না কাইলকেতুভাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আফনে রাস্তাতেই কাটাইয়া দিতে পারেন। হ্যার মতো সেফ জায়গা আর কোথাও নাই।’ কালকেতুর মনে হল, পলাশভাই ঠিক। ও নিজেও বিশ্বের অনেক নামী শহরে গেছে… লস অ্যাঞ্জিলেস, শিকাগো, রোম, লন্ডন, প্যারিস, টোকিও, বেজিং। কিন্তু কোথাও এমন প্রাণের সজীবতা লক্ষ করেনি।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই কালকেতুর চোখ গেল, কাটি রোল বলে একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের দিকে। সাইনবোর্ডে লেখা—মাটন রোল, এগ রোল থেকে শুরু করে লস্যি পর্যন্ত পাওয়া যায়। লস্যি খাওয়ার লোভে ও রেস্টুরেন্টের ভিতর ঢুকে পড়ল। তেমন হাই ফাই কিছু নয়। কলকাতার হেদুয়া বা আমহার্স্ট স্ট্রিটের রেস্টুরেন্টের মতো। তফাৎ হল পুরো রেস্টুরেন্টটাই পুরনো দিনের বাংলা আর হিন্দি সিনেমার পোস্টারে মোড়া। আওয়ারার রাজ কাপূর, নয়া দৌড়ের দিলীপকুমার-বৈজয়ন্তীমালা, গাইডের দেবানন্দ, জঞ্জিরের অমিতাভ বচ্চন, ডিসকো ডান্সারের মিঠুন চক্রবর্তী, হারানো সুরের উত্তমকুমার, আঁধির সুচিত্রা সেন। চিকেন রোলের দাম চার ডলার, লস্যির পাঁচ। পলাশভাই সঙ্গে থাকলে নিশ্চয়ই বলতেন, ‘কন কী কাইলকেতুভাই! রোলের প্রাইস তিইনশো ট্যাহার উফর? আফনের কইলজ্যা আসে। গলা দিয়া নামাইতে পারলেন কী কইর‌্যা? না, না চলেন, ম্যাকডি-তে যাই।’ ম্যাকডি মানে ম্যাকডোনাল্ডস। সেখানকার ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ অর্থাৎ আলুভাজার দাম অবশ্য আরও বেশি, সাত ডলার।

নামেই ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট, আসলে চালান বাংলাদেশিরা। রোল আর লস্যির অর্ডার দিতে গিয়ে সেটা টের পেল কালকেতু। যারা খেতে ঢুকেছে, তারাও বাঙালভাষায় কথা বলছে। খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে কালকেতু এক কোণে গিয়ে বসল। ইমনকে বলে দিয়েছে বিকেল চারটের সময় টাইমসের অফিসের সামনে থেকে ওকে তুলে নিতে। ম্যানহাটন এরিয়ায় গাড়ি পার্ক করার জায়গা নেই। ইমন নিশ্চয়ই দূরে কোথাও পার্ক করেছে। হাতে এখনও ঘণ্টাখানেক সময় আছে। নিশ্চিন্তে খাওয়া শেষ করে কালকেতু ফের গিয়ে টাইমস অফিসের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। ভেবে ও চিকেন রোলে কামড় দিল।

তখনই ওর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। বাঁ হাত দিয়ে কোনও রকমে পকেট থেকে সেটটা বের করে পর্দায় একটা অচেনা নাম্বার দেখতে পেল কালকেতু। লং ডিসট্যান্স কল। এই সময় বিদেশ থেকে কে ওকে ফোন করতে পারে? সোয়াইপ করে ফোন অন করতেই ও প্রান্ত থেকে ও শুনতে পেল, ‘আমি কি কালকেতু নন্দীর সঙ্গে কথা বলছি?’

ভরাট ও বেশ কর্তৃত্বব্যঞ্জক গলা। এই ধরনের গলা সাধারণত পুলিস বা আর্মির লোকদের হয়। কালকেতু বলল, ‘হ্যাঁ, বলছেন। আপনি?’

‘আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি রিটায়ার্ড কর্নেল নপরাজিত মজুমদার। আপনার নাম্বারটা আমি সংগ্রহ করেছি টুলটুল চাকলাদারের কাছ থেকে।’

টুলটুল মানে রমাদার ছেলে। যার আগ্রহে কালকেতুকে পলাশভাইয়ের কেসটা হাতে নিতে হয়েছে। কর্নেল মজুমদারের নামটা পুরনো কোনও কাগজের কাটিংয়ে ও দেখেছে। মনে পড়ায় কালকেতু সাগ্রহে বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন। আপনার নামটা আমি জানি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তো আপনি ঢাকায় ছিলেন।’

‘কালকেতুবাবু, আপনার সঙ্গে কি এখন কথা বলা যাবে?’

‘কোনও অসুবিধে নেই। নিউ ইয়র্কে এখন বেলা সাড়ে তিনটে।’

‘গুড। আপনি ওয়ার ভিক্টিম যে মেয়েটিকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছেন, তার সম্পর্কে কিছু ইনফর্মেশন আমি দিতে পারি। সেই কারণেই আপনাকে ফোন।’

কালকেতু বলল, ‘সো নাইস অফ ইউ কর্নেল। বলুন, কী বলতে চান?’

ফেসবুক মারফৎ টুলটুলের সঙ্গে কীভাবে তাঁর যোগাযোগ হয়, সে কথা জানিয়ে কর্নেল বললেন, ‘মেয়েটির নাম কী ছিল, বলতে পারব না। ঢাকার হসপিটালে ওকে ভর্তি করা হয়েছিল, বেবি নামে। তখন বেশ কয়েকবার আমি ওকে দেখতে গেছিলাম। ওর সম্পর্কে আমাকে একটা রিপোর্ট দিতে হয়েছিল জেনারেল মানেকশ’র কাছে। হোল ইন্ডিয়ান আর্মি প্রে করেছিল, যাতে মেয়েটা বেঁচে যায়। কী ভয়ানক বার্ন হয়েছিল, আপনারা ধারণাও করতে পারবেন না। শরীরের পিছন দিকটা পুড়ে দগদগে ঘা হয়ে গেছিল। বেবি অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করত। ও মারা গেলে আমাদের খুব বদনাম হয়ে যেত।’

বুঝতে না পেরে কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘কেন বলছেন একথা?’

‘বলছি এই কারণে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের আর্মি পাঠানো নিয়ে তখন আমেরিকা আর চিন খুব অসন্তুষ্ট ছিল। ওরা মনে করেছিল, ইন্ডিয়া অহেতুক পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মাথা গলাচ্ছে। ইন্ডিয়ার পিছনে সোভিয়েত রাশিয়া আছে জেনে, পাকিস্তানকে মদত দেওয়ার জন্য ওরা মনে মনে প্রস্তুতও হচ্ছিল। ভাবুন, কী একটা ভোলাটাইল পলিটিক্যাল সিচুয়েশন তখন। বেবি মেয়েটি যে গ্রামে থাকত, সেই আমোদপুরে বম্বিং নিয়ে একটা মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল সেইসময়। আমরা প্রোপাগন্ডা করেছিলাম, বম্বিং পাকিস্তান আর্মি করেছে। কিন্তু আমি আপনাকে বলছি, সেদিন ওই গ্রামে পাকিস্তান আর্মি এয়ার স্ট্রাইক করেনি। করেছিল ইন্ডিয়ান আর্মি।’

কালকেতু চমকে উঠে বলল, ‘কী বলছেন আপনি? ঢাকায় প্রথম এয়ার স্ট্রাইক সেটা। তা হলে মুক্তিযোদ্ধাসহ পঞ্চাশ-ষাটজন গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছিল ইন্ডিয়ান আর্মির বম্বিংয়ে?’

‘ঠিকই বলছি। এও বলছি, এয়ার স্ট্রাইক করার ইচ্ছা আমাদের ছিল না। কিন্তু রাজাকার বাহিনি পুরো বোকা বানিয়ে দিয়েছিল আমাদের। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, রাজাকার বাহিনি হল তারা, যারা চায়নি বাংলাদেশ হোক। পাকিস্তান গর্ভমেন্টই আর্মস ট্রেনিং দিয়ে এদের তৈরি করেছিল। এই রাজাকারদের মাধ্যমেই পাকিস্তান আর্মি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ঢুকে শিক্ষক ও ছাত্রদের দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছিল। অপারেশন সার্চলাইটের সময় নয় মাস ধরে শহরে, গ্রামে লক্ষ লক্ষ নিরীহ বাঙালিকে ওরা মার্ডার করে।’

‘কিন্তু রাজাকাররা আপনাদের বোকা বানালেন কী করে?’

‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে রাজাকার বাহিনির একজন আমাদের কাছে মিথ্যে খবর দিয়েছিল, পাকিস্তান ইনফ্যান্ট্রি আমোদপুর গ্রামে একটা কালীমন্দির দখল করতে যাচ্ছে। সেইসঙ্গে গ্রামের মানুষদেরও ওরা মেরে ফেলবে। আমরা তখন দিন দুয়েক হল ইস্ট পাকিস্তানে ঢুকেছি। খবরটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তিনটে এয়ারক্র্যাফট ওই গ্রামের দিকে পাঠিয়ে দিই।’

‘খবরের সত্যতা যাচাই করার কথা আপনারা ভাবেননি?’

‘তেমন প্রশ্নই ওঠেনি। ঢাকায় আমাদের ইন্টেলিজেন্স তখন মুক্তিবাহিনি। কে রাজাকার, কে মুক্তিযোদ্ধা কয়েকটা দিন আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। আসলে কী হয়েছিল জানেন, আমাদের খবর দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গে রাজাকাররা আমোদপুর গ্রামেও একটা কথা রটিয়ে দিয়েছিল, পাকিস্তান আর্মি গ্রাম অ্যাটাক করার জন্য আসছে। ওরা কালীমন্দিরের ভিতর ঢুকবে না। যদি বাঁচতে চাও, তা হলে তাড়াতাড়ি কালীমন্দিরে গিয়ে আশ্রয় নাও। ওদের কথা শুনে ভয়ে গ্রামবাসীরা কালীমন্দিরে গিয়ে জড়ো হয়েছিল। আকাশে ফাইটার প্লেন দেখে রাজাকাররা রটিয়ে দেয়, পালাও। আর পালাতে গিয়েই আমাদের বোমার আঘাতে কালীমন্দিরের কাছাকাছি প্রচুর লোক মারা যায়। বুঝতেই পারছেন, এর পিছনে কত বড় কন্সপিরেসি ছিল?’

‘আপনারা ভুলটা বুঝতে পারলেন কী করে?’

‘আমেরিকায় আমাদের হাইকমিশনের মাধ্যমে। তিন-চার দিন পর নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে এই বেবি মেয়েটার আগুনে পোড়া নেকেড ছবি বেরিয়েছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে সারা আমেরিকা চমকে উঠেছিল। ওদের ওয়ার এক্সপার্টরাই প্রথম আবিষ্কার করেন, ছবিতে যে ফাইটার প্লেনগুলো দেখা গেছে, সেগুলো ভারতের। সোভিয়েত রাশিয়া থেকে কেনা। পাকিস্তানের হতেই পারে না। কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা হতে হতে অবশেষে খবরটা আমাদের কানে এসে পৌঁছয়। সেইসময়কার প্রাইম মিনিস্টার মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ডিফেন্স মিনিস্টারকে খোঁজ নিতে বলেন। বেবি মেয়েটার ছবি সেইসময় কতটা ইম্পরট্যান্ট হয়ে উঠেছিল, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। মেয়েটা তখন মারা গেলে ইন্ডিয়ার ভাবমূর্তি বিরাট ধাক্কা খেত।’

‘মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান আর্মি হঠাৎ সারেন্ডার করেছিল কেন কর্নেল মজুমদার?’

‘দ্যাট আই কান্ট ডাইভালজ। দেয়ার ওয়ার লট অফ রিজনস টু সারেন্ডার। এ ছাড়া ওদের কোনও উপায় ছিল না। ওদের নাইনটি থ্রি থাউজেন্ড সোলজার আমাদের হাতে বন্দি ছিল।’

‘পরে রাজাকার বা বন্দিদের বিরুদ্ধে আপনারা ব্যবস্থা নেননি?’

‘হয়তো নেওয়া হত। কিন্তু ওদিকে থেকে ইয়াইয়া খান হুমকি দিলেন, রাজাকার বা বন্দিদের বিরুদ্ধে যদি আমরা কোনও অ্যাকশন নিই, তা হলে পাকিস্তানে বাস করেন, এমন তিরিশ লাখ হিন্দুকে ওরা মেরে ফেলবেন। তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমাদের প্রাইম মিনিস্টার চুপ করে যান।’

‘বেবি মেয়েটি সম্পর্কে আর কিছু জানেন?’

‘আপনি এলসা গিনেসবেরির কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারবেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় উনি ঢাকার রেড ক্রস সেন্টারে চিফ মেট্রন ছিলেন। হাসপাতালে কয়েকদিন যাতায়াত করার জন্য মিসেস গিনেসবেরির সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক হয়ে গেছিল। পরে শুনেছি, মিসেস গিনেসবেরি না কি বেবিকে গোটেনবার্গে নিয়ে যান বেটার ট্রিটমেন্টের জন্য। আপনি সুইডেনের রেড ক্রস অফিসে ফোন করলে এলসা গিনেসবেরির হদিশ পাবেন। মিসেস গিনেসবেরির সঙ্গে ঢাকায় তখন আরও একজন অল্পবয়সি নার্সকে দেখতাম। তিনি বাঙালি। মাফ করবেন, তাঁর নামটা আমার মনে নেই। ঢাকায় কাফি বীর বলে একজন আছেন, তাঁর কাছেও আপনি মিসেস গিনেসবেরির কনটাক্ট নাম্বার পেতে পারেন।’

কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘কে এই কাফি বীর?’

‘বাংলাদেশের একজন ফিল্ম ডিরেক্টর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে উনি একটা ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানাচ্ছেন। গত সপ্তাহে কাফি বীর কলকাতায় আমার কাছে এসেছিলেন। বেবি সম্পর্কে নানা কথা আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন। গোথেনবার্গে গিয়ে উনি মিসেস এলসা গিনেসবেরির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও করছেন। কিন্তু মিসেস গিনেসবেরি না কি সহযোগিতা করেননি। কাফি বীরের মেল অ্যাড্রেস আর ফোন নাম্বার আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

শুনে একটু দমে গেল কালকেতু। ওর মতো আরও একজনও তা হলে শিউলিদিদিকে খুঁজে বেরাচ্ছেন! অবশ্য এই বেবিই শিউলিদিদি কি না, তা নিশ্চিত নয়। না, আর ঢিলে দেওয়া যাবে না। শিউলিদিদির কাছে কাফি বীর পৌঁছনোর আগেই ওকে পৌঁছতে হবে। ও বলল, ‘থ্যাঙ্কস কর্নেল মজুমদার। কলকাতায় ফিরে অবশ্যই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব। আর এর মধ্যে যদি মেয়েটি সম্পর্কে কোনও কিছু আপনার মনে পড়ে, তা হলে আমাকে জানাবেন।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *