জিহাদি – ৪৯

(উনপঞ্চাশ)

 দুঃসংবাদটা কালকেতু পেল বেলা দশটায়। ফোনে কাঁদতে কাঁদতে হেমলতা ম্যাডাম বললেন, ‘রোজিনা চইল্যা গেল কাইলকেতু।’

 উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছেন পলাশভাই। সবে ওঁরা একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করতে বসেছে। র‌্যাঞ্চ থেকে ফেরার পর এই প্রথম। পলাশভাই যেন শুনতে না পান, সেই কারণে কালকেতু উঠে বারান্দায় চলে গেল। তার পর ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, ‘কখন?’

‘এই তো মিনিট দশেক আগে। কাইল হারা রাইত চিৎকার কইর‌্যা পলাশরে গাল পারতাসিল। আইজ থাইম্যা গেসে। আমার ফুলের মতো মাইয়াটা এইভাবে মরব, ভাবতেও পারি নাই। পলাশ কোথায়? ফোনডা হ্যারে দ্যাও। আমি জাইনতে চাই, হ্যায় গত দুইদিন হাসপাতালে আসে নাই ক্যান?’

শোকগ্রস্ত মায়ের হাহাকার। শুনতে মোটেই ভাল লাগছিল না। বিশেষ করে, পলাশভাইকে গালাগাল দেওয়ার কথা শুনে। ফোনটা পলাশভাইকে এখন দেওয়া যাবে না। হেমলতা আন্টি হয়তো ওঁকে দু’চার কথা শুনিয়ে দিতে পারেন। তাই কালকেতু বলল, ‘উনি এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি ম্যাডাম।’

‘উইঠলে খবরডা দিও। আমরা বিকালের ফ্লাইটে রোজির বডি র‌্যাঞ্চে লইয়া যাম। ওখানেই গোর দিম। পলাশ যদি পারে, একবার য্যান হাসপাতালে আসে। হ্যার বিবেক যা কয়, কইরব।’

ফোন ছেড়ে দেওয়ার পর কালকেতু এসে ফের ব্রেকফাস্ট টেবলে এসে বসল। সঙ্গে সঙ্গে পলাশভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফোনডা হাসপাতাল থেইক্যা আইসিল, তাই না?’

ঘাড় নেড়ে কালকেতু বলল, ‘হ্যাঁ। রোজিনা ম্যাডাম এক্সপায়ার করে গেছেন।’

‘আপদ গেছে।’ বিড়বিড় করে কথাটা বলে পলাশভাই কফির কাপটা হাতে তুলে নিলেন। চুমুক দিয়ে বললেন, ‘এইবার দ্যাশে ফেরার সময় হইসে কাইলকেতুভাই। শিউলিদিদির সঙ্গে আফনে একবার কথা কইয়েন। হ্যায় যেইদিন ঢাকায় যাইব, আমরাও হেইদিন ফিরুম। আফনে কী ক’ন?’

কালকেতু বলল, ‘তা হলে তো খুব ভাল হয়। দু’চার দিনের মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষাটা করিয়ে নেওয়া যাক। রিপোর্টটা কালেক্ট করেই না হয় আমরা দু’জন মিস লিলির কাছে যাব।’

ব্রেকফাস্টে খাবার বলতে ব্রেড, বাটার, দুধ আর সেদ্ধ ডিম। কফি শেষ করে পলাশভাই ব্রেডে মাখন লাগাতে লাগলেন। দেখে কালকেতু একটু অবাকই হল। উনি একবারও জিজ্ঞেস করলেন না, রোজিনা ম্যাডাম কখন মারা গেলেন। গত পরশুদিন মেক্সিকান জ্যোতিষী সালিনাসের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে পলাশভাইকে অন্য রকম মানুষ বলে মনে হচ্ছে কালকেতুর। রাগে মুখ থমথম করছিল সেদিন। গাড়িতে উঠেই উনি বলেছিলেন, ‘কারে বিশ্বাস করুম ক’ন তো ভাই। আফনে যারে আফনজন মনে করতাসেন, হ্যায় পিছন থেইক্যা ছুরি মারতাসে। মানষের উফর বিশ্বাসই হারাইয়া গেল আইজ।’

ইমন তখন গাড়ি চালাচ্ছিল। তাই কোনও প্রশ্ন করার ইচ্ছে হয়নি কালকেতুর। পলাশভাই সহজ সরল টাইপের। হয়তো ইমনের সামনেই উগড়ে দিতেন, আপনজনটা কে, কেন মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়েছেন? হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিল। পলাশভাই সেখানে যেতে চাইলেন না। উল্টে, ইমনকে বললেন, ‘চেলসির অ্যাপার্টমেন্টে আইজ যাম না। আমাকে নিউ জার্সিতে লইয়া চলো। ইসেলিনের বাংলোয় কাম আসে।’ কেন জানে না, কালকেতুর মনে হয়েছিল, জ্যোতিষী সালিনাস পলাশভাইকে এমন কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, যা শুনে মানুষটা একেবারে বদলে গেছেন। গত পরশুদিন থেকে উনি একবিন্দু মদ ছোঁননি। একবারও রোজিনা ম্যাডামকে নিয়ে হা হুতাশ করেননি। ইমনকে ঘরে ডেকে নিয়ে সারাদিন ধরে শুধু কম্পিউটারে মুখ গুঁজে রয়েছেন।

কাল সন্ধেবেলায় লিলি গডউইনের অফিস থেকে ফিরে আসার পর কালকেতু যখন সব খুলে বলে, এতদিন ধরে ওর পরিশ্রম সফল হওয়ার মুখে, তখন বিস্ময় ফেটে বেরোচ্ছিল পলাশভাইয়ের মুখ থেকে। উনি বলেছিলেন, ‘লোগে ঠিগই কয়, এক কূল গেলে আরেক কূল পাওয়া যায়। এত বিরাট মাপের একডা মানুষ আমার শিউলিদিদি! ক’ন কী?’ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উনি সব জানতে চেয়েছিলেন। লিলি ম্যাডাম ডিএনএ টেস্ট করতে রাজি হয়েছেন, শুনে পলাশভাই বলেছিলেন, ‘উফফ, আমি যে বিশ্বাসই কইরতে পারতাসি না কাইলকেতুভাই। আফনে তো মিরাকল করসেন। মায়রে গর্ব কইর‌্যা কইসিলাম, কাইলকেতুভাই যহন কেসডা হাতে নিসেন, শিউলিদিদিরে খুঁইজ্যা বাইর কইরবেনই। অহন আমার বুড়া মায় যদি খবরডা হোনেন, তাইলে আনন্দে ফাগল হইয়া যাইব। আফনেরে আমি ছাড়তাসি না কইলকেতুভাই। চলেন, শিউলিদিদিরে সাথে লইয়্যা হবাই ঢাকায় যাই। আফনে কিন্তু না কইরবেন না।’

ঢাকায় রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য লিলি অনাথ আশ্রম খুলতে চান জেনে, পলাশভাই লাফিয়ে উঠেছিলেন, ‘ক’ন কী? হ্যারে কিছু কইরতে অইব না। আমি সাহায্য করুম। আমোদপুরে আমার একটা হাউসিং কমপ্লেক্স তৈরি হইয়া পইড়্যা আসে। শ’খানেক বিল্ডিং তো অইবই। শিউলিদিদিরে ক’ন, পুরা কমপ্লেক্স আমি হ্যার অনাথ আশ্রমের জন্য দান করুম। আফনে কাইল হকালেই হ্যার কাসে আমারে নিয়া চলেন।’

মিস গডউইন নোবেল পিস প্রাইজ পাচ্ছেন পলাশভাই কেঁদেই ফেলেছিলেন। তখনই গত দু’তিন দিন ধরে গুমড়ে থাকার কথাটা মুখ ফস্কে বলে ফেলেন। ‘মি. সালিনাস তাইলে ঠিকই কইসিলেন। খুব শিগগির আফনে দুইডা খবর পাইবেন। একডা খুশির খবর। অন্যটা দুঃখের। কোনডা আগে হুনবেন, মনডা শক্ত কইর‌্যা লন। আমি কইলাম, দুঃখের খবরডা আগে ক’ন। মি. সালিনাস কইলেন, আফনের সব থেইক্যা প্রিয় মানুষ, আফনেরে এমন দাগা দিব, আফনে সুইসাইড করার কথাও ভাবতে পারেন। হ্যায় পিছন থেইক্যা ছুরি মারতাসে। আফনের ট্যাহাপয়সা গাপ কইর‌্যা দিতাসে। আফনে সতর্ক থাকেন।’

কালকেতু জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি কি রোজিনা ম্যাডামের কথা বলছেন? মি. সালিনাস বললেন, আর আপনি তা বিশ্বাস করে নিলেন?’

‘তহনই বিশ্বাস করি নাই। কিন্তু পরে মনে পড়সিল, ইমন আমারে কিন্তু ওয়ার্নিং দিসিল। র‌্যাঞ্চে ফোন কইর‌্যা আমারে কথাডা কইতে চাইসিল। কিন্তু, আমি হ্যারে ধমক দিসিলাম।’

‘ইমন জানতে পেরেছিল কী করে?’

‘আমাগো অ্যাকাউন্টস হ্যায় হ্যাক কইর‌্যা জানতে পারসিল। রোজিনা কী ডেঞ্জারাস মাইয়া হুনবেন? কাইল আফনে যহন এই বাসায় ছিলেন না, তহন নিক বইল্যা যে সুইপার এহানে কাম করে, হ্যায় নিজে আইসিল ট্যাহা চাইতে। হালা অ্যালকোহলিক, ড্রাগ অ্যাডিক্ট বাস্টার্ড। কয় কি না, তুমি আমার ওয়াইফ রোজিনারে মাইর‌্যা ফেলার চেষ্টা করসো। অহনই হাজার ডলার দাও। নাইলে তোমার এগেইস্টে পুলিশের কাছে গিয়া কমপ্লেন করুম। আরও হুনবেন?’

প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পলাশভাই আরও বলেছিলেন, রোজিনা ম্যাডাম না কি লকার থেকে নিকের ওয়েডিং রিং আনতে এই বাংলোতে পাঠিয়েছিলেন লারেইনাকে। সেই রিং আঙুলে পরে ম্যাডাম কবরে যেতে চান। বাংলোয় এসে লারেইনা শুধু রিং নেয়নি, পুরো লকার ফাঁকা করে পালাচ্ছিল। ইমন ওকে কায়দা করে পুলিশের হাত তুলে দিয়েছে। এতসব ঘটনা ঘটে গেছে, অথচ কালকেতু কিছুই জানত না। যা বুঝতে পারছে, তাতে এখন পলাশভাই মারাত্মক রেগে আছেন ম্যাডামের উপর। এই অবস্থায় ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই পারছে না কালকেতু। কিন্তু, মুশকিলের কথা হল, লিলি ম্যাডামকে ও কথা দিয়ে এসেছে, হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে হেমলতা আন্টির সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবে।

পলাশভাই এখন কোনও কথা না বলে খেয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় ডোর বেলের আওয়াজ। উঠে গিয়ে দরজা খুলে কালকেতু দেখল, রেজওয়ানা দাঁড়িয়ে। ওর হাতে একটা প্যাকেট। বলল, ‘গুড মর্নিং। পলাশছ্যার আছেন?’

কালকেতু বলল, ‘হ্যাঁ। ভেতরে এসো।’

ব্রেকফাস্ট টেবলে গিয়ে পলাশভাইয়ের দিকে প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে রেজওয়ানা বলল, ‘ছ্যার, রিপোর্টগুলান বাইর হইসে। আপনে যেভাবে কইছসিলেন, হেইভাবেই।’

‘ইমনরে লইয়্যা খবরডা কবে ছাপসো?’

‘আজই ঢাকায় বাইর হইসে ছ্যার। এহনে আসার আগে ঢাকা থেইক্যা যা ফিড ব্যাক পাইলাম, খুউব ফেভারেবল। আফনের কথামতো খবরডা ফ্রন্ট পেজে ছাপা হইসে। এড্ডু দ্যাখবেন না হি?’

পলাশছ্যার আবার আগের মতো। স্নেহচ্ছলে বিরক্তি দেখিয়ে বললেন, ‘তোমার তো দেহি, কান্ডজ্ঞান বইল্যা কিসু নাই। এহানে ইন্ডিয়ার একজন টপমোস্ট জার্নালিস্ট প্রেজেন্ট থাইকতে, তুমি আমারে রিপোর্ট দ্যাখতে কইতাসো। কাইলকেতুভাই দ্যাখেন তো, কুসুম কীরম লিখসে?’

রেজওয়ানার ডাকনাম তা হলে কুসুম! ও একবার বলেছিল বটে, আমোদপুর গ্রামের সূত্রে পলাশভাইকে চেনে। ওর ডাকনামটা পলাশভাই জানতেই পারেন। রেজওয়ানা যুগযুগান্ত কাগজটা এগিয়ে দিতেই, কালকেতু দেখল, আটচল্লিশ পয়েন্টে হেডিং ‘সোনার বাংলার সোনার ছেলে।’ তার তলায় চোদ্দো পয়েন্টে লেখা ‘নিউ ইয়র্ক থেকে রেজওয়ানা চৌধুরী। তার নিচে ইমনের বড় একটা ছবি। খবরে দ্রুত চোখ বোলাল কালকেতু। গাজিপুরে জঙ্গিদের হাত থেকে কীভাবে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী বিলকিস বেগমের প্রাণ ইমন বাঁচিয়েছিল, তার বিস্তৃত বর্ণনা। বঙ্গবন্ধু ওয়ান গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে যে ফিদাইন অ্যাটাক হতে পারে, সেই খবরটা বাংলাদেশ সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সকে প্রথম জানায় ইমন। মেধাবী ইঞ্জিনিয়ার ইমন আমেরিকায় সামান্য একটা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে। মোটামুটি সব তথ্যই কালকেতুর জানা। রেজওয়ানা এমন সুন্দর ভাবে লিখেছে, বাংলাদেশে ইমনের জন্য সহানুভূতির বন্যা বইবে। একটা বক্স স্টোরিও আছে। পিএম বিলকিস বেগমের ইন্টারভিউ। উনি বলেছেন, ইমনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। ওর জন্য সরকারি চাকরি অপেক্ষা করছে।’

কাগজটা টেবলে রেখে কালকেতু বলল, ‘খুব ভাল লিখেছ রেজওয়ানা। আমিও এত ভাল লিখতে পারতাম না। তোমাকে ফ্রুটজুস খাওয়ানো উচিত।’

শুনে পলাশভাই প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন। বহুদিন পরে মানুষটার মুখে হাসি দেখতে পেল কালকেতু। পলাশভাই হাসি থামিয়ে বললেন, ‘দেহো কুসুম, দেহো। বড় মাপের মাইনষেরাই হ্যায় কথা কইতে পারে। আমাগো দ্যাশে টালেন্ট কম নাই কাইলকেতুভাই। এই মাইয়াডারে আমি আমেরিকায় চাকরি দিয়া নিয়া আইসি। যুগযুগান্ত কাগজে আমার টোয়েন্টি পার্সেন্ট শেয়ার আছে। আমারে যহন হ্যারা ফাইনান্স কইরতে কইল, তহন কুসুমের কথা আমার মাথায় ছিল। আমি কইলাম, ফাইনান্স করুম, যদি আমার গেরামের এক মাইয়্যারে আফনেরা রিপোর্টারের চাগরি দ্যান।’

ফ্রিজ থেকে ফ্রুটজুস নিয়ে এসে কালকেতু বলল, ‘আপনি অনেকদিন ধরে চেনেন রেজওয়ানাকে?’

‘হ্যার আববুরে চিনি ছোটবেলা থেইক্যা। বসরে এক দুইবার আমোদপুরে গেরামে যাই। তহন সবার সাথে দেখা হয়। হ্যার আববু একদিন কইসিল, মাইয়া বাংলায় এমএ পরীক্ষায় ফার্স্ট হইসে। আফনের এতবড় বিজনেস। একডা কোথাও চাকরি দ্যান। আমার ইমপোর্ট কোম্পানিতে আফতাবের কথা তো আফনে হুনসেন। হ্যার ডিপার্টমেন্টে দিম ভাবসিলাম। কিন্তু আফতাব কুসুমরে চিনত। ও-ই কইল, ছ্যার কুসুম ভালা কবিতা ল্যাখে। হ্যায় ল্যাখালেখির কাম পাইলে খুশি অইব।’

উল্টোদিকে চেয়ারে বসে রেজওয়ানা মিটিমিটি হাসছে। হালকাভাবেই কালকেতু জিজ্ঞাসা করল, ‘পলাশভাই, ইমনকে আমেরিকায় আনার পিছনেও কি আপনি?’

‘না। আহাম্মকডা শখ কইর‌্যা জিহাদি হইসিল। আমাগো গেরামের পোলা। হ্যার দাদামশয় মণিরুল সাহেবরে চিনতাম। অনেকেই কইত, ইমনের মতো ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট একশো মাইলের মধ্যে নাই। ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। একদিন হুনি, ফরেনে চাকরি লইয়্যা পোলাডা চইল্যা গেছে। আমাগো দ্যাশেও ভালা ভালা পোলা মাইয়ারা কেউ দ্যাশে থাইকতে চায় না। আফনেগো দ্যাশের মতোন প্রবলেম। ইমন আমারে চিনত না। কিন্তু হ্যার কথা আমি প্রথম জাইনতে পারি, দুবাইয়ে আমি কিডন্যাপড হওয়ার পর। রফিকুল নামে এক জিহাদি দুবাইয়ে হ্যার কথা আমারে কইসিল। শুইন্যা আমি তো অবাক। অত বড় একডা বংশের পোলা শ্যাষে কী দুখখে জিহাদি হইল?’

‘ওর সঙ্গে কি আপনার দুবাইতে দেখা হয়েছিল?’

‘না মশয়। হ্যার খোঁজ নিতে আমারে কইসিল আফনের সামনে যে মাইয়াডা বইস্যা আসে, হ্যার আববু। আরে, পোলাগুলার আক্কেল দ্যাহেন কাইলকেতুভাই। জিহাদিই যহন হইবি মনস্থির করছস, তহন প্রেম করতে গেলি ক্যান। আমি তো বুঝি না। কুসুমের আববু একদিন আমার ঢাকার বাসায় আইস্যা কইল, আমার মাইয়ারে বাঁচান পলাশ মিঞা। মাইয়া নাওয়া-খাওয়া ছাইড়া দিসে। কী, তোমাগো লাভ স্টোরি আমারে কইতে অইব, না হি তুমি কইব্যা কুসুম?’

লজ্জায় মাথা নিচু করল রেজওয়ানা। পলাশভাই ফের বলতে শুরু করলেন, ‘ইমনের খোঁজ দিসিল হ্যার দলের মাইনষেরাই। বাংলাদ্যাশের জামাইতিরা আমারে মাসকয়েক আগে আমারে ফোন কইর‌্যা কইল, ইমন কানাডা থেইক্যা আমেরিকায় গেসে একটা অপারেশন করতে। লাকিলি, হ্যায় আমার চোখেও পইড়্যা গেল, নায়গারা ফলস দ্যাখতে গিয়া বাফেলোর যে হোটেলে আমরা উঠসিলাম, সেহানে। তার পর হ্যায় নিজেই আইস্যা যোগাযোগ করে নিউ ইয়র্ক আসার পথে রেস্ট এরিয়ার ক্যাফেটোরিয়ায়। মুখ দেইখ্যাই মনে হইসিল, কষ্ট আর আতঙ্কের মধ্যে আসে। আমি ইচ্ছা কইর‌্যা হ্যারে আমার নেমকার্ড দিসিলাম। জানি, কামডা ভালা করি নাই। কিন্তু, এই মাইয়াডার মুখের দিকে তাকাইয়া আমারে কইরতে হইসিল। অহন আমার একডাই কাম বাকি। আহাম্মকডারে দ্যাশে নিয়া যাওয়া।’

রেজওয়ানার কাছে ফোন এসেছে। ও উঠে গিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কার সঙ্গে কথা বলছে। এমন সময় ফের ডোর বেল বাজার শব্দ। হাসপাতাল থেকে হেমলতা আন্টিরা কেউ এলেন না কি? কালকেতু দরজা খুলে দেখে, ইমন। আজ কোট প্যান্ট পরে বেশ সেজেগুজে এসেছে। খুব বিনীতভাবে বলল, ‘ছ্যার আমারে আইতে কইসিলেন।’

ভিতরে ঢুকে পলাশছ্যারকে দেখে ইমন খুব কুন্ঠার সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‘আমারে কোথায় যাইতে অইব না হি ছ্যার?’

‘তোমার মুখে আর কোনও কথা নাই ইমন।’ হঠাৎ ধমকে উঠলেন পলাশভাই। ‘যহনই দেখা হয়, তুমি জিগাও, কোথায় যাইতে অইব না হি ছ্যার। তোমারে যা কইর‌্যা আনতে কইসিলাম, আনসো?’

‘আনসি ছ্যার।’ বলে পকেট থেকে একটা পেন ড্রাইভ বের করে ইমন এগিয়ে দিল। বলল, ‘হ্যার মধ্যে সব হিসাব নিকাশ আছে। আফনের কী গেসে, আর কী আসে…সব ইনফর্মেশন।’

‘হোনো, তোমার আম্মু কাইল আমারে ফোন করসিলেন। তুমি নাহি সুটি পাইলে ফতেমার নিকাহতে দ্যাশে যাইতে চাও? তোমারে আমি সুটি দিলাম।’

ইমনের মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ও বলল, ‘আম্মি আফনের নাম্বার পাইল কোত্থেকা ছ্যার?’

পলাশভাই ফের ধমকে উঠলেন, ‘হারামজাদা, তুমি কি মনে করো, আমোদপুরে আমার আর কেউ নাই? হুইনা রাখো, তোমার দাদামশয় মণিরুল সাহেবরে আমি ভালা কইর‌্যা চিনতাম। আমার আববু যহন গারমেন্টস ফ্যাক্টরি স্টার্ট করেন, তহন তোমার দাদামশয় হ্যারে এক লাখ ট্যাহা লোন দিসিলেন। তহন থেইক্যা তোমার ফেমিলির হবাই রে আমি চিনি। তুমি আমারে দেহো নাই, হোস্টেলে পড়াশুনা করতা বইল্যা। জিহাদি অইবার স্বপ্ন দেখসিলা। অহন মোহভঙ্গ হইসে তো? চলো, দ্যাশে ফিইর্য চলো।’

‘কিন্তু আমি দ্যাশে ফিরুম কী কইর‌্যা? আমার উপায় নাই ছ্যার। জিহাদিরা আমারে ছাইড়ব না।’

‘হেইডা আমার উফর ছাইড়্যা দাও। লজ্জা করে না তোমার? আববুর এহন-তহন অবস্থা। ফতেমার বিয়া হইয়া গেলে তোমার আম্মুরে দ্যাখব কে? দ্যাশে চলো, তোমার বিয়াও ওই একই দিনে দিম আমি। তোমার আম্মি হব ব্যবস্থা কইরা রাইখব কইসে।’

‘ছ্যার, ফিইর‌্যা গেলে দ্যাশের পুলিশ আমারে অ্যারেস্ট কইরব।’

ফের ধমকে উঠলেন পলাশভাই। টেবল থেকে তুলে যুগযুগান্ত কাগজটা এগিয়ে দিয়ে উনি বললেন, ‘ছবিটা চিনতে পারতাসো তো? বারান্দায় গিয়া ল্যাখাডা পড়ো। কেউ তোমারে অ্যারেস্ট কইরব না।’

পলাশভাই এ বার উঠে দাঁড়ালেন। তার পর বললেন, ‘চলেন কাইলকেতুভাই। শিউলিদিদিরে বাসা থেইক্যা তুইল্যা একবার হাসপাতালে যাই। গিয়া দেহি, হ্যামলতা আন্টি হ্যারে চিনতে পারেন কি না। ততক্ষণ ইমন বলদডা বোঝাপড়া কইর‌্যা নিক কুসুমের সাথে। আমাগো থাকার দরগার নাই।’

অবাক কাণ্ড, কথাটা বলে ইয়াং ছেলেদের মতো পলাশভাই চোখ টিপলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *