(চব্বিশ)
গার্ডের ডিউটি শেষ করে আউট হাউসে ফিরে এল চিরাগ। দেখল, ইমন মনোযোগ দিয়ে কী একটা বই পড়ছে। বরাবরই ওর বই পড়ার নেশা। ক্যাম্পেইমন সময় পেলেই রিলিজিয়াস বই এনে পড়ত। প্রয়োজনে বিশেষ বিশেষ অংশগুলো উদ্ধৃত করতেও পারত। কোরান পড়তে পড়তে কখনও কখনও ওকে কাঁদতেও দেখেছে চিরাগ। ক্যালিফেটে নতুন জিহাদিদের মধ্যে এই কান্না একটা কম্পিটিশনের চেহারা নিত একেক সময়। কোরান পড়ার সময় যে যত করুণ সুরে কাঁদতে পারবে, কেঁদে ধর্মীয় আকুলতা ফুটিয়ে তুলতে পারবে, সে মৌলভীদের তত প্রিয় হয়ে উঠতে পারবে। এই প্রতিযোগিতায় চিরাগও একটা সময় নেমে পড়েছিল। লোক দেখানো নমাজ পড়ত দিনে পাঁচ ওয়াক্ত করে। কারণ-অকারণে ঘরের এককোণে হাঁটু গেড়ে বসত আল্লাহর কৃপা প্রার্থনার জন্য।
কাল দুপুর থেকেই ইমন একটু চুপচাপ। ওর মনের ভিতর যা ঝড় বয়ে গেল! পরশু রাতে টিভিতে দাদামশায়ের ফাঁসির খবর শুনে ও মারাত্মক অস্থির হয়ে পড়েছিল। সারা রাত একই কথা বলে বিরক্ত করেছিল, ‘চল, আইএস ক্যাম্পে ফিইর্যা যাই।’ ওর মনের মধ্যে থেকে ক্রোধের সেই আগুনটা নিভে গেছে বোধহয়। তাই দু’দিন ধরে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা আর বলছে না। পড়াশুনো করা ভাল প্রকৃতির ছেলে। জিহাদি জীবন ওর সঙ্গে খাপ খায় না। ও কী বই পড়ছে, সেটা জিজ্ঞাসা করতে গিয়েও চিরাগ চুপ করে গেল। খানিকক্ষণ পরে পোশাক বদলে বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে ও বলল, ‘রেন্ডিটাকে নিয়ে তোর পলাশস্যার ফিরে এসেছে কি না, ইমন জানিস?’
বই থেকে একবার মুখ তুলে ইমন কড়া চোখে ওর দিকে তাকাল। চিরাগ জানে, রোজিনা ম্যাডাম সম্পর্কে কোনও কটু কথা ইমন পছন্দ করে না। এর আগেও রেন্ডি কথাটা ও বলে ধমক খেয়েছে। কিন্তু বেশ্যাকে রেন্ডি ছাড়া আর কী বলবে? রোজিনা ম্যাডামের উগ্র মেক আপ আর পোশাক-আশাক দেখে তো তাই মনে হয় চিরাগের। বুকের দিকে তাকালে ওর শরীর গরম হয়ে যায়। কাবুল, করাচি, মোসুল, রাক্কায় মেয়েরা বোরখায় সারা শরীর ঢেকে রাখত। ওরা চোখ ছাড়া আর কিছু প্রদর্শন করত না। কসোভো, অন্টারিও বা নিউ ইয়র্কে পোশাকের ব্যাপারে অত রাখঢাক নেই মেয়েদের। সেইসঙ্গে কোন পুরুষ কীভাবে তাকাল, তা নিয়ে এরা মাথা ঘামায় না। রোজিনা ম্যাডামের মধ্যেও সেই বেপরোয়া মনোভাব লক্ষ করেছে চিরাগ। উনি যে পোশাকই পরুন না কেন, ক্লিভেজ এমন বেরিয়ে থাকে, চিরাগের মনে হয়, তাতে মুখ ঘষে।
ইদানীং ওর যৌনক্ষুধাটা বেড়েছে। ক্যালিফেটে ধরে আনা বন্দি সিরিয়ান আর লেবানিজ মেয়েরগুলোর নগ্ন দেহ যখন-তখন ওর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অ্যাকশন সেরে ফিরে আসার পর যে সব জিহাদির শরীর ঠান্ডা করার দরকার হত, তাদের ওই মেয়েদের ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হত। চিরাগের কপালে মাত্র একবারই প্রাইজ জুটেছিল। যেদিন প্রায় এক মাইল দূর থেকে গুলি করে একজন আমেরিকান জওয়ানকে ও মেরে ফেলেছিল। মেয়েদের শরীর থেকে সুখ নেওয়ার অভিজ্ঞতা অবশ্য সেই প্রথম নয়। করিমগঞ্জে থাকার সময়ই ও প্রায়ই যৌনক্ষুধা মেটাত। ওর মতো লোচ্চা ছেলে করিমগঞ্জে আর একটাও ছিল না। ইমনের কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে, চিরাগ উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।
ক্যালিফেটে থাকার সময় চিরাগ দেখেছে, জিহাদিরা নিজেদের জীবন সম্পর্কে সত্যি কথাটা কখনও বলে না। বেশিরভাগ জিহাদিরই অতীতটা কলঙ্কময়। অপরাধ জীবন থেকে সরে এসে ওরা মুজাহিদ্দিন হয়ে গেছে, একটা কাল্পনিক জগতের টানে। সেখানেও যদি বুঝতে পারে ঠকেছে, তার থেকে হতাশার আর কিছু হয় না। এখন চিরাগের মনে সেই হতাশা ঘুরে ফিরে আসছে। শরীরের চাহিদা প্রবল, কিন্তু কেউ জানে না, সেটা মেটানোর ক্ষমতা এখন ওর নেই। রাক্কায় ওর সেই ক্ষমতাটা কেড়ে নিয়েছিল আরব জিহাদিরা। মাস তিনেক ওকে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল। নিজেকে এখন হিঁজড়ে ছাড়া আর কিছু মনে হয় না চিরাগের। যতবার কথাটা মনে হয়, ততবারই রোজিনা ম্যাডামকে ধর্ষণ করার ইচ্ছেটা ওর জাগে।
ইমনকে সেদিন নিজের সম্পর্কে চিরাগ যা বলেছিল, সব মিথ্যে। ফিজিক্সে এমএসসি, ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ করার সুযোগ! হা হা হা, গান্ডুটা সব বিশ্বাস করে নিয়েছে। আসল কথা হল, কোনও রকমে ও স্কুলের চৌকাঠ পেরিয়েছিল। ছোটবেলাতেই বদসঙ্গে পড়েছিল। বাংলাদেশের সিলেট থেকে চোরাপথে ড্রাগস আসত। তার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকত সারাদিন। ড্রাগস কেনার জন্য হাতসাফাই, ছোটখাটো চুরি-চামারি করতে হত ওকে। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় একবার পুলিশের হাতে ও ধরা পড়েছিল। লক আপেই ওর সঙ্গে আলাপ হয় ফরিদ মিঞার। কুশিয়ারা নদীর ধারে তার দেশি মদ আর ড্রাগসের ঠেক ছিল। মাসখানেক জেল খাটার পর ফরিদ মিঞার দলের লোকেরাই ওকে ছাড়িয়ে আনে। বাড়িতে ফিরে গেছিল চিরাগ, কিন্তু আববু লাথি মেরে ওকে বের করে দেন। সেই থেকে আববুর উপর ওর রাগ আর ঘৃণা বহুদিন জমা হয়ে ছিল।
কুশিয়ারা নদীর ধারেই শাগরেদদের কারও না কারও ঠেক-এ ওর দিন কাটত। করিমগঞ্জে মুসলিম জনসংখ্যা হিন্দুদের তুলনায় অনেক বেশি। মহরমের দিন ওখানে তাজিয়া নিয়ে বিশাল বিশাল মিছিল হত। একবার মহরমের মিছিলে রাস্তায় আম্মা-আববুদের সঙ্গে ওর দেখা হয়ে যায়। আম্মুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে আববু ওকে জুতো খুলে মারতে ওঠেন। রাগ আর সামলাতে পারেনি চিরাগ। সবার সামনে আববুর মাথায় পিস্তল ধরে ট্রিগার টিপে দেয়। সারা জেলায় পিতৃহন্তা হিসেবে ওর বদনাম হয়ে যায়। এর পর গা ঢাকা দেওয়ার জন্য চিরাগ বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে বছর দুয়েক সেখানে ছিল। এইসময়ে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের গুলিতে ফরিদ মিঞার ইন্তেকাল হয়। শাগরেদদের অনুরোধে চিরাগ করিমগঞ্জে ফিরে স্মাগলিং ব্যাবসাটা কবজা করে। সেইসঙ্গে তোলা আদায়, গুণ্ডাগর্দিতে জেলার ত্রাস হয়ে ওঠে।
নারীমাংসের প্রতি লোভ চিরাগের মধ্যে কোনওদিনই জাগত না, স্বপ্না বলে মেয়েটা ওর জীবনে না এলে। নদীর ধারে এক গরিব হিঁদুবাড়ির বউ, ছলাকলায় ওস্তাদ। মেয়েটার তীব্র যৌন আকর্ষণ চিরাগকে পাগল করে দিয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যেই ও বুঝতে পারে, স্বপ্না শাগরেদদের মধ্যে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিচ্ছে। পুলিশকেও গোপনে খবর সরবরাহ করে। ইতিমধ্যে অসমের রাজনীতিতে পালাবদল ঘটছে। কেন্দ্রীয় সরকারের মতো হিন্দু মৌলবাদীদের দল অসমে ক্ষমতা দখল করার মতো শক্তি বাড়িয়ে ফেলেছে। করিমগঞ্জে তখন হিন্দুদের আস্ফালন শুরু হয়ে গিয়েছে। চোরাপথে সিলেটে গরু পাচার করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেইসময় একদিন সাগরেদদের একজন এসে খবর দেয়, স্বপ্না বজরঙ্গবলী দলের কোনও এক নেতার বাড়িতে গোবর্ধন পুজোয় কীর্তন গাইতে গিয়েছে। কীর্তনের আসর থেকে ওকে তুলে চিরাগ প্রথমে ঠেক-এ নিয়ে যায়। হাত-পা বেঁধে একের পর এক পাঁচ-ছয়জন মিলে ধর্ষণ করে। তার পর স্বপ্নার যৌনাঙ্গে গুলি করে দেহটা কুশিয়ারা নদীতে ফেলে দেয়।
স্বপ্নার বীভৎস মৃত্যু বিশাল বিতর্কের ঢেউ তুলেছিল সারা অসম জুড়ে। রাতের অন্ধকারে চিরাগ পালিয়ে গিয়েছিল ত্রিপুরায়। আর কখনও করিমগঞ্জে ফেরার সুযোগ পায়নি। স্বপ্নার সঙ্গে প্রেম, নিকাহ, ওর বাড়িতে হিন্দুদের চড়াও হওয়া… সব বাজে কথা। আগরতলা থেকে কলকাতা, তার পর কীভাবে ও কাবুল পৌঁছেছিল, সেটা আরেক রোমহর্ষক কাহিনি। সিনেমা করার জন্য সেই কাহিনি কেউ চাইলেও চিরাগ তা জানাবে না। ফের চিৎ হয়ে শুয়ে আড়চোখে ইমনের দিকে তাকিয়ে চিরাগ দেখল, ইংরেজি বইটার নাম ‘লাইফ অফ আ জিহাদি।’ লাল প্রচ্ছদে কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা মুখ। কাঁধ থেকে বেয়নেট উঁকি মারছে। ইমন গর্দভটা মাথা নিঁচু করে, অন্যের মনগড়া জীবন কাহিনি পড়ে যাচ্ছে।
ফের চোখ বুজতেই রোজিনা ম্যাডামের মালকিন মালকিন গলাটা ওর কানে ধাক্কা মারল। ‘আজ দুপুরে এ বাসায় কাকে ধরে এনেছিলে চিরাগ?’
শুনে তখন চমকে উঠেছিল ও। আজ দুপুরে সত্যিই ও ডেকে এনেছিল তৌফিককে। বাসায় কোথায় কী অ্যাপস ফিট করা আছে, অথবা গোপন ক্যামেরা… ধরা পড়ে যাবে। এই দুর্ভাবনাটা ওর ছিলই। তাই সদর দরজা দিয়ে তৌফিককে ভিতরে আনেনি চিরাগ। বেসমেন্টের চোরাকুঠুরি দিয়ে নিয়ে এসেছিল। ওদের আউট হাউসের নিচে যে চোরাকুঠুরিটা আছে, সেটা গিয়ে শেষ হয়েছে উল্টো দিকের পার্কে। বেশ কয়েকবার ওই পথে যাওয়া আসাও করেছে চিরাগ। ঘরের ভিতর দিককার দরজাটা কার্পেটের তলায়। উপর থেকে কিছু বোঝা যায় না। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে, টানেল ধরে পাক্কা চার মিনিট হেঁটে গেলে ফের কাঠের সিঁড়ি। উঠে পার্কের পরিত্যক্ত টয়লেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া যায়। ওর অত সাবধান হওয়াটাও কাজে লাগেনি। কুত্তিটা জেনে ফেলেছে, তৌফিক এসেছিল। মুখ কাঁচুমাচু করে চিরাগ উত্তর দিয়েছিল, ‘ছেলেটার সঙ্গে মিঠাস রেস্টুরেন্টে আলাপ হয়েছিল। কথা বলার লোক নেই। তাই ডেকে এনেছিলাম।’
রোজিনা ঘাড় ঘুরিয়ে কড়া গলায় বলেছিলেন, ‘আর কখখনও এনো না। যাও, এ বার তুমি যেতে পারো।’
বাধ্য চাকরের মতো ঘাড় নেড়ে চিরাগ চলে এসেছিল। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে, ম্যাডামের গুমোর ভাঙবে। তৌফিক একটা গ্লক নাইন্টিন হ্যান্ডগান দিয়ে গেছে। অস্ত্রটা হাতে নেওয়ার পর থেকেই ওর মধ্যে পুরনো নিষ্ঠুর সত্ত্বাটা ফিরে আসছে। মনে হচ্ছে, রোজিনা ম্যাডামের পরীর মতো সাজানো শরীরটার উপর একদিন এমন অত্যাচার করবে, যা ওলাকেও করেনি। রাক্কা শহরের এক নামকরা ডাক্তার সামি মারওয়ানের মেয়ে ওলা। রোজিনা ম্যাডামের মতোই সেক্সি। বয়স তেইশ-চব্বিশের বেশি নয়। কী কুক্ষণেই না সিরিয়ান মেয়েটা ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল।
এই তো সেদিনের ঘটনা। আমেরিকান সেনাদের মদতপুষ্ট সিরিয়ান বাহিনি তখন পাল্লা দিয়ে লড়ছে জিহাদিদের সঙ্গে। শহর কবজায় রাখতে গিয়ে, একটা সময় প্রচুর জিহাদি জখম হচ্ছিল। ডাক্তারের অভাব, তাই তাদের চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছিল না। সিভিলিয়ান ডাক্তাররা একদমই চাইছিলেন না, জিহাদিদের শরীরে ছুরি-কাঁচি চালাতে। কেননা, চিকিৎসায় কোনও রকম ভুলভ্রান্তি হলে, জিহাদিদের কোপ তাঁদের উপর গিয়ে পড়ছিল। একটা সময় ক্যালিফেট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, হাসপাতাল, ক্লিনিক আর ওষুধের দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ হাতে না নিলে আহত জিহাদিদের বাঁচানো যাবে না। রাতের দিকে টহল দেওয়ার সময় ডাক্তারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিরাগরা জানে মেরে দেওয়ার হুমকি দিত তখন। এই রকম এক পরিস্থিতিতে ওলাকে প্রথম দেখে চিরাগ।
কী আশ্চর্য, ওলার কথা ভাবতে ভাবতেই মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখতে পেল ও। ইরাক, সিরিয়া, তুরস্কের মেয়েরা সৌদি আরব বা ইরানের মেয়েদের মতো পর্দানসীন নয়। রাস্তা-ঘাটে তাদের দেখতে পাওয়া যায়। তবে আব্রু ঢেকে রাখা অবস্থায়। লোক পাচার করে, এমন এক স্মাগলারের মারফৎ ক্যালিফেটে সদ্য খবর এসেছে, ডাক্তার মারওয়ান সপরিবারে গ্রিস হয়ে আমস্টারডমে পালিয়ে যাচ্ছেন। সেটা ঠিক কি না, তা জেনে আসার দায়িত্বটা পড়েছে চিরাগের উপর। রাতের অন্ধকারে ডাক্তার মারওয়ানের ক্লিনিকে গিয়ে ও দেখে, প্রচুর লোক চিকিৎসার জন্য বসে আছেন। দেখেই মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে ওর। ডাক্তার মারওয়ানকে বলল, ‘এখখুনি চলুন, আপনাকে আমাদের ক্যালিফেটে যেতে হবে।’
ডাক্তার মারওয়ান বললেন, ‘কী করে যাব? এই পেশেন্টদের তা হলে কে দেখবে?’
‘আপনারা অন্য কোনও ডাক্তারের কাছে যান।’ বলতে বলতে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওলা। গায়ের রং ধবধবে ফরসা। মুখটা অদ্ভুত ধরনের নিষ্পাপ। পরনে সিরিয়ান মেয়েদের ট্র্যাডিশনাল পোশাক থোয়াব। গলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত মোড়া ফুলছোপ সিল্কের লম্বা গাউন। তা সত্ত্বেও, মেয়েটা শরীরের যৌন আবেদন লুকিয়ে রাখতে পারেনি। কয়েক পা সামনে এগিয়ে, ওর কাছে গিয়ে চিরাগ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কে তুমি? তোমার এত সাহস হল কী করে?’
‘আমি সিরিয়ারই মেয়ে… ওলা। আপনার মতো বিদেশ থেকে আসিনি।’
পেশেন্টদের মধ্যে বয়স্ক তিন-চারজন উঠে এসে বললেন, ‘আপনি বাইরে গিয়ে ওয়েট করুন। ডাক্তার মারওয়ানকে আমরাই এখন ছাড়ব না। আপনাদের উৎপাতে দিনের বেলায় কোনও ডাক্তারকে চেম্বারে পাওয়া যায় না। আমরা কার কাছে যাব?’
পিছন থেকে আরও দশ বারোজন সায় দিল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। বাইরে যান। এখন ডিসটার্ব করবেন না।’
ওঁদের কথায় পিছিয়ে গেলে জিহাদিদের বদনাম হয়ে যাবে। তাই কোমরের পিস্তলে হাত রেখে চিরাগ বলল, ‘ডাক্তার মারওয়ানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। ওকে ক্যালিফেটে নিয়ে যেতে হবে।’
ওলা দৃঢ় গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী অভিযোগ শুনি?’
‘আমাদের কাছে খবর আছে, উনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।’
‘মিথ্যে অভিযোগ। উনি দেশ ছেড়ে যদি পালিয়েই যাবেন, তা হলে কয়েকদিন আগে এই ক্লিনিক খুললেন কেন? বিনে পয়সায় সাধারণ লোকের চিকিৎসা করছেন কেন?’
মেয়েটাকে তর্ক করতে দেখে সারা শরীর রাগে জ্বলে যাচ্ছে চিরাগের। ও বলল, ‘বেশ তোমার কথাই ঠিক বলে ধরে নিচ্ছি। উনি যতক্ষণ ইচ্ছে এখানে বসে বসে চিকিৎসা করুন। তুমি আমাদের সঙ্গে ক্যালিফেটে চলো। উনি ক্যালিফেটে গেলে তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।’
ক্লিনিকের হল ঘরে ‘হায় আল্লাহ’ ধরনের একটা আওয়াজ ছড়িয়ে গেল। চেয়ার ছেড়ে পেশেন্টরা প্রায় সবাই উঠে দাঁড়িয়েছে। তাদের চোখ-মুখে প্রতিবাদের চিহ্ন। চিরাগের একে ফর্টি সেভেন চালিয়ে দিতে ইচ্ছে করল। অন্য কোনও জিহাদি হয়তো সেটাই করত। কিন্তু পরক্ষণেই ক্যালিফের ভিডিয়োতে একটা কথা ওর মনে পড়ল, ‘এমন কিছু তোমরা এখন করবে না, যাতে সাধারণ লোকের সমর্থন আমরা হারিয়ে ফেলি। ওদের বুঝতে দাও, ওদের জন্যই ধর্মযুদ্ধে আমরা জিততে চাইছি।’ তখনই ওর হাত ধরে টানল সঙ্গী আরেক জিহাদি ওমর। ইংরেজিতে বলল, ‘মেয়েটাকে ছেড়ে দাও। ওকে শায়েস্তা করার অনেক সুযোগ পরে পাওয়া যাবে। ওকে আমি চিনি। মসজিদের কাছে একটা ডাক্তারখানায় বসে।’
নিজের মান বাঁচানোর জন্য, ওমরকে দেখিয়ে চিরাগ চিৎকার করে বলল, ‘এর কথায় তোমাদের আমি ছেড়ে দিচ্ছি। কিন্তু রাতের মধ্যে ক্যালিফেটে না পৌঁছলে ডাক্তার মারওয়ানকে কাল শেষ করে দিয়ে যাব।’ কথাটা শেষ হওয়ার পর ওলার মুখের দিকে চোখ পড়েছিল চিরাগের। পাতলা ঠোঁটের আড়ালে তাচ্ছিল্যের হাসি। ওলার মুখটা ও মনের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল। দাঁত টিপে বলেছিল, ‘এই হাসির মূল্য তোকে চুকাতেই হবে রেন্ডি কোথাকার। বিদেশি বলার ঔদ্ধত্যেরও…।’ তখন চিরাগ স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি, ওলা মেয়েটাকে ধর্ষণ করার অপরাধে ওকে পুরুষত্ব খোয়াতে হবে।
‘চিরাগ, এই চিরাগ। কী ক’স? ফের স্বপ্ন দ্যাখতাসিলি না কি?’
চোখ খুলে চিরাগ দেখল, কোথায় ওলা? ও আউট হাউসে শুয়ে আছে। ধড়মড় করে উঠে বসে ও বলল, ‘রাক্কা ক্যাম্পের স্বপ্ন দেখছিলাম।’
ইমন বলল, ‘ভুইল্যা যা হ্যায় দিনগুলার কথা।’
‘ভুলতে তো চাই। কিন্তু পারছি কোথায়? শালা কুত্তার মতো জীবন কাটাচ্ছি। তোর রোজিনা ম্যাডাম আমাদের গলায় বকলস পরিয়ে দিয়েছে। যখন যেভাবে চাইবে, আমাকে সেভাবে চলতে হবে না কি? মেয়েদের কথায় ওঠ-বোস করার অভ্যেস আমার নেই।’
‘রোজিনা ম্যাডামের উফর তর রাগটা কিসের লইগ্যা, আমি তো বুঝতে পারতাসি না।’
‘তুই বুঝতে পারবি না। শোন, ইসলামে মেয়েদের স্থান সবসময় পুরুষদের নিচে। পুরুষদের কাছে চিত হয়ে না শুলে ওদের জীবন বৃথা। আরে, এই রোজিনা মহিলা তো দেখি সবার উপর ছড়ি ঘোরায়। কীসের এত দেমাক? পলাশছ্যারের কে হয়, তুই কি জানিস? গুগল সার্চ করে সেদিন দেখলাম, পলাশছ্যার বিয়েই করেননি। তা হলে ইনি কে? এক বিছানায় শুচ্ছেন। রেন্ডি ছাড়া ইনি আর কী হতে পারেন?’
‘চি-রা-গ।’ রেন্ডি কথাটা শুনে ইমন চিৎকার করে উঠল। ‘তরে কইসি না, রোজিনা ম্যাডাম সম্পর্কে তুই নোংরা কথা কইবি না। আরেকবার যদি ক’স, তাইলে আমার মতোন খারাপ আর কেউ অইব না।’
ইমনের হুমকি শুনে চিরাগ মুখ বেঁকিয়ে হাসল। এতক্ষণ যা চাইছিল, তাতে ও সফল। ইমনকে ঝগড়ায় টেনে আনতে পেরেছে। ও পাল্টা গলার জোর দেখিয়ে বলল, ‘কী করবি অ্যাঁ, কী করবি, তুই বল। রেন্ডিকে রেন্ডি ছাড়া আর কী বলব।’
কথাটা বলেই বালিশের তলা থেকে চিরাগ গ্লক নাইন্টিন হ্যান্ডগানটা বের করে আনল। তার পর তাক করল ইমনের দিকে। এই পিস্তলটা তৌফিক আজ ওকে দিয়ে গেছিল।
