জিহাদি – ৪

(চার)

এফবিআই অফিসারদের বিরুদ্ধে রাগ উগড়ে দিচ্ছেন পলাশভাই। তাঁর ছেলেমানুষি কথাগুলো শুনে হাসি পাচ্ছে কালকেতুর। ‘আমেরিকায় আর বিজনেস করুম না কালকেতুভাই। পুলিশের ব্যাভার দ্যাখলেন? হ্যারা থার্ড ওয়ার্ল্ডের কাউরে মানুষ বইল্যাই মনে করে না। হালায় আমি ফোন করলে ঢাকার পুলিশ কমিশনার নিজে ফোন তুলে। আর এহানে দ্যাখলেন তো, পুলিশ হারা রাত্তির বসাইয়া রাখল। আমাগো কুনো কথাই বিশ্বাস করল না!’

গাড়ি ড্রাইভ করছেন রোজিনা। তাঁর ডান পাশে বসে পলাশভাই। বেলা এগারোটা বাজে। গাড়ি ক্লিভল্যান্ড এয়ারপার্টের দিকে যাচ্ছে। সারা রাত্তির দু’চোখের পাতা এক করতে পারেনি কালকেতু। অসম্ভব উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে। এফবিআই অফিসাররা পলাশভাইকে একা একটা ঘরে বসিয়ে রেখেছিল। দফায় দফায় খুব রগড়েছে। এমন ব্যবহার করছিল যেন উনি টেররিস্ট। ঘাবড়ে গিয়ে পলাশভাইও ওদের প্রশ্নের উত্তরগুলো এমন ভাসা ভাসা দিচ্ছিলেন, শুনে কালকেতুও অবাক। যেমন, আপনি আমেরিকায় বিজনেস করেন বলছেন, কাদের সঙ্গে করেন? পলাশভাই বললেন, ‘সবার নাম মনে পড়ছে না। একটা কোম্পানির কথা বলতে পারি… ওয়ালমার্ট। ওখানে গারমেন্টস সাপ্লাই করি।’ শুনে এফবিআই অফিসাররা বিশ্বাস করছিলেন না।

ওয়ালমার্ট হল বিশাল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। যেখানে শাক সবজি, ফল, ফুল থেকে শুরু করে পোশাক, পানীয়, ইলেকট্রনিক গ্যাজেটস, উপহার সামগ্রী… সব পাওয়া যায়। সারা আমেরিকা জুড়ে ওদের প্রচুর শাখা। অফিসাররা জানতে চান, আমেরিকায় আপনার কোনও পরিচিত মানুষ থাকেন কি না? ভাগ্যিস, পলাশভাই তখন রোজিনার নামটা করেছিলেন। উনি তাচ্ছিল্যভরেই উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ইচ্ছে করলে ওর সঙ্গে আপনারা কথা বলতে পারেন। চেলসিতে থাকেন, উনি আমার বিজনেস অ্যাডভাইসার।’ নিউ ইয়র্কে ফোন করে রোজিনার সঙ্গে কথা বলার পর অবশ্য এফবিআই অফিসারদের মনোভাব বদলেছিল। ওঁরা আর রূঢ় আচরণ করেননি। উল্টে, কফি আর স্যান্ডউইচ খাইয়ে ভোরবেলায় ওদের লা কুইতা হোটেলে পৌঁছে দেন। ওই খাতিরদারিটাও পলাশভাইয়ের যথেষ্ট বলে মনে হয়নি।

‘নাইন ইলেভেনে আল কায়দার টেররিস্টরা ঠিইক করসিল, বোঝলেন কালকেতুভাই। দম্ভ, দম্ভই শেষ কইর‌্যা দিব এই দ্যাশটারে। অফিসারগুলান আমার সাথে কথা কইত্যাসিল, য্যান আমি হ্যাগো চাকর-বাকর।’ পলাশভাই রাগ চাপতে পারছেন না।

গাড়িতে ওঠার পর থেকে রোজিনা এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। এ বার বললেন, ‘আপনে শান্ত হন পলাশ। এফবিআই নিয়া না ভাইব্যা বরং চিন্তা করেন অ্যাভিস কোম্পানিরে ঠাণ্ডা কইরবেন কী কইর‌্যা?’

পলাশভাই বললেন, ‘ক্যান? হ্যাগো আবার হইলডা কী ম্যাডাম?’

‘হ্যাগো মার্সিডিজ গাড়িডার কী হাল হইসে, আপনে দ্যাখসেন? পলাইতে গিয়া টেররিস্টরা গাছে ধাক্কা মারসিল। সামনের দিকডা তুবরাইয়া গ্যাসে। আমাগো হিউস কমপেনসেশন দিতে অইব। আমি ইনসুরেন্স কোম্পানির সাথে কথা কইসি। হ্যারা গাড়িডার কারেন্ট ভ্যালু ডিম্যান্ড কইরব, কইল।’

‘হালায় ড্যামেজ কইরল একজন, গুণাগার দিতে অইব আমারে। কী বিচার কন দেহি কাইলকেতুভাই।’

প্রশ্নটা যে ওর উদ্দেশেই করা কালকেতু বুঝতে পারেনি। পিছনের সিটে বসে লুকিং মিররে ও তখন রোজিনার দিকেই তাকিয়ে। ভদ্রমহিলা যে যথেষ্ট সুন্দরী তাতে কোনও সন্দেহ নেই। গায়ের রং, পোশাক-আশাক, হেয়ার স্টাইল, বাচনভঙ্গি… সব মিলিয়ে আর যা-ই হোক, রোজিনাকে বাঙালি মেয়ে বলে ও মেলাতে পারছিল না। বয়স তিরিশ-বত্রিশের মধ্যে। উনি যথেষ্ঠ শিক্ষিত, অনেকগুলো ভাষা জানেন। গাড়িতে ওঠার পরই ওঁর কাছে একটা ফোন এসেছিল। তখন উনি স্প্যানিশে কথা বলছিলেন। একটু আধটু স্প্যানিশ জানে বলে, কালকেতু বুঝতে পারছিল, রোজিনা ওর লইয়ারের সঙ্গে কথা বলছেন। পলাশভাইকে যে সাময়িক ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা লইয়ারকে উনি জানালেন। এর পরই এমন চোস্ত ইয়াঙ্কি উচ্চারণে একজনের সঙ্গে রোজিনা কথা বললেন, তাতে কালকেতুর মনে হল, ভদ্রমহিলা জন্ম থেকেই আমেরিকায়।

‘ঘুমাইয়া পড়লেন নাহি কাইলকেতুভাই।’ সামনের সিট থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে পলাশভাই আরও বললেন, ‘ম্যাডাম কী কইল, হুনলেন না হি?’

অর্থাৎ গাড়ির ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। কালকেতু বলল, ‘শুনেছি। যে দেশের যা নিয়ম, আপনাকে তো মানতে হবেই।’

‘মগের মুলুক না হি? রোজিনা ম্যাডাম, আফনে একডা ট্যাহাও দিবেন না। আর কাইলই য্যান আমি দ্যাশে ফিরতে পারি, হ্যার ব্যবস্থা করেন।’

শান্ত গলায় রোজিনা বললেন, ‘অহন আফনের দ্যাশে ফেরা অইব না পলাশ। এফবিআই গ্রিন সিগন্যাল না দেওয়া পর্যন্ত আফনেগো এ দ্যাশে থাইকতে অইব।’

পলাশভাই চুপ করে থাকার পাত্তর নন। জেদ দেখিয়ে উনি বললেন, ‘আপনে তাইলে মিডিয়ার লোকজনরে ডাকেন। এনবিসি চ্যানেলের লিন্ডা গার্ডনাররে। আপনের সাথে তো হ্যার ভাল সম্পর্ক। বুঝাইয়া দ্যান, এফবিআই যারে তারে হ্যারাস করতে পারে না।’

এবার রোজিনা সামান্য বিরক্ত গলায় বললেন, ‘আফনে চুপ কইর‌্যা বসেন তো। এত চেইত্যা গেলে কাম চলে? লিন্ডারে বিরক্ত করনের কুনও দরকার নাই।’

‘তা ইলে আর কী, হাত-পা গুটাইয়া বইস্যা থাকেন।’

পলাশভাইয়ের গলায় অসন্তাোষের সুর শুনে রোজিনা এ বার বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন, ‘যে কেসে আফনেরে ইন্টারোগেশনের জন্য হ্যারা ডাকছিল, ইচ্ছা কইরলে নাইন্টি নাইন ইয়ারস জেলে ঢুকাইয়া দিতে পারে। যে ভদ্রমহিলার উফর হামলা হইসিল, হ্যায় কে জানেন? ইউনিসেফের ভেরি ভেরি ইম্পরট্যান্ট একজন লেডি… লিলি গডউইন। পুরা ইন্সিডেন্টডা ইন্টারন্যাশনাল ইস্যু হইয়া যাইব। মিডিয়ারে এর মধ্যে টাইনলে আফনের বিজনেস লাটে উইঠব। বোঝার চেষ্টা করেন।’

পলাশভাই মিউমিউ করে বললেন, ‘নাইনটি নাইন ইয়ারস ইন প্রিজন! কন কী ম্যাডাম?’

‘হান্ড্রেড ফিফটি ইয়ারসও অইতে পারে। টুইন টাওয়ার ভাইঙ্গা পড়ার পর একজন টেররিস্টের দ্যাড়শো বৎসর পানিশমেন্ট হইসিল। কী, হুইন্যা ডর লাগে না হি?’ কথাটা বলে রোজিনা হাসতে লাগলেন।

লুকিং মিররে রোজিনা ম্যাডামের মুখটা দেখে কালকেতুর মনে হল, এমন সুন্দর হাসি আর কখনও ওর চোখে পড়েনি। ভদ্রমহিলার সঙ্গে এখনও অবশ্য পলাশভাই পরিচয় করিয়ে দেননি। টেনশনে হয়তো ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক ধরে ওঁকে দেখার পর একটা জিনিস কালকেতু বুঝতে পেরেছে, রোজিনা ম্যাডামের উপর পলাশভাই খুব নির্ভরশীল। কে যেন একবার বলেছিল, পলাশভাই না কি বাংলাদেশের গৌরী সেন। দশ বারোটা গারমেন্টস কোম্পানি, দশটা চা বাগান এবং ঢাকা আর চিটাগাংয়ে দুটো বিশাল শপিং মলের মালিক। আসল ইনকাম এক্সপোর্টের ব্যাবসা। পলাশভাই বাংলাদেশ চেম্বার অফ কমার্সের প্রেসিডেন্ট। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই না কি প্রাইম মিনিস্টার বিলকিস বেগমের সঙ্গে উনি দেখা করতে পারেন। কিন্তু এখানে ওঁর ছেলেমানুষি দেখে কালকেতু সতিই মেলাতে পারছে না, ব্যাবসার অত বড় সাম্রাজ্য ভদ্রলোক সামলান কী করে?

নায়গারায় হোটেল ছাড়ার আগে পলাশভাই যখন রোজিনার সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন ওঁদের কথাবার্তায় কালকেতু জানতে পেরেছিল, গাড়িতে করে ওঁরা প্রথমে ক্লিভল্যান্ড এয়ারপোর্টে যাবেন। তার পর প্লেনে করে নিউ ইয়র্কে। জেলে যাওয়ার কথা শুনে পলাশভাই সেই যে মুখে কুলুপ এঁটেছেন, তার পর থেকে আর খোলেননি। জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে লাগল কালকেতু। ফ্রিওয়ের দু’পাশ দিগন্তব্যাপী সবুজ। জিপিএস দেখে গাড়ি চালাতে চালাতে ঘণ্টাখানেক পর হঠাৎ এক্সিট দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়লেন রোজিনা। একটা রেস্ট এরিয়ায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘নামেন আফনেরা। এড্ডু কফি খাওয়া যাক।’

ফ্রি ওয়ের মাঝে মাঝে রেস্ট এরিয়া করা আছে। হাইওয়ে বা ফ্রিওয়ে দিয়ে গাড়িতে যাঁরা যাতায়াত করেন, তাদের সুবিধার্থে। রেস্ট এরিয়ায় ওয়াশরুম আছে, কিছু দোকানপত্তরও। টয়লেটে ঘুরে আসা যায়, হালকা স্ন্যাকস খেয়ে নেওয়া যায়। ধূমপানের ইচ্ছেটাও মেটানো সম্ভব। গাড়ি থেকে নেমে কালকেতু সিগারেট ধরাল। রোজিনা ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে গেলেন। ভদ্রমহিলা মনে হয়, খুব ভোরে বাফেলোর প্লেন ধরেছিলেন। পলাশভাই স্টার বাকস-এ ঢুকলেন পছন্দমতো ব্রাজিলিয়ান কফি আনতে। খানিক পরে রোজিনা বাইরে বেরিয়ে পলাশভাইকে ধারে কাছে দেখতে না পেয়ে কালকেতুর কাছে এসে বললেন, ‘মি. নন্দী, কাল রাতে যা ঘটেছে, সে ব্যাপারে আমাদের ল’ইয়ার আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। আজ রাতে উনি আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে আসবেন। আপনি কিন্তু অন্য কোনও এনগেজমেন্ট রাখবেন না।’

ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল কালকেতু। বিকেলের দিকে ওদের গ্রাউন্ড জিরো দেখতে যাওয়ার কথা। নাইন ইলেভেনে টুইন টাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর, একই জায়গায় দুটো এখন জলাধার করা হয়েছে। তার গায়ে মৃত লোকদের নাম লেখা। জলাধারের উপর চারপাশ থেকে ক্রমাগত জলের ধারা নিচে নামছে মৃত লোকদের আত্মার শান্তির জন্য। পলাশভাই বলেছিলেন, ওখান থেকে সোজা নিয়ে যাবেন কাছেই রুচি বলে একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয়। একেবারে ডিনার সেরে ওরা বাড়িতে ফিরবেন। কিন্তু তখন তো জানতেন না, এমন একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বেন! দরকার হলে গ্রাউন্ড জিরো দেখার প্ল্যান বাতিল করে দিতে হবে। কেননা, উকিলের সঙ্গে পরামর্শটা অনেক বেশি জরুরি। ভেবে কালকেতু বলল, ‘নিশ্চয়ই। তবে আপনি কিন্তু একবার পলাশভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে রাখবেন।’

রোজিনা জিজ্ঞেস করলেন, ‘মি. নন্দী, কথাটা অন্যভাবে নেবেন না। কাল রাতে পলাশ এফবিআইয়ের সঙ্গে কী এমন বিহেভিয়ার করেছিলেন, যাতে ওরা চটে গেছিলেন?’

কালকেতু বলল, ‘আরে না…হোটেলে এসে কিন্তু ওঁরাই প্রথম দিকে খুব খারাপ ব্যবহার করে। পরে লোকাল পুলিশ যখন জানতে পারে, লিলি গডউইনকে আমিই বাঁচিয়েছি, তখন আমাদের দু’জনকে একসঙ্গে দেখে অফিসাররা খানিকটা নরম হন।’

রোজিনা বললেন, ‘পলাশ এমনি খুব সিম্পল মাইন্ডের। কিন্তু একটু খ্যাপা টাইপেরও। কাকে কী বলছেন তখন ওর মনে থাকে না। ওকে সামলাতে গিয়ে আমি অনেক সময় অসুবিধেয় পড়ে যাই।’

কালকেতু হেসে বলল, ‘সেটা আমিও টের পাচ্ছি। আসলে এফবিআই অফিসাররা যা জিজ্ঞেস করছিলেন, উনি যদি সাফ সাফ উত্তর দিতেন, তা হলে পরিস্থিতি অন্য-রকম হতো।’

‘তাই না কি? একটা উদাহরণ দিন তো।’

‘যেমন ধরুন, শেরিফের অফিসে একজন অফিসার ওকে জিজ্ঞেস করলেন, ডকুমেন্ট বলছে, মি. নন্দীকে আপনিই স্পনসর করে আমেরিকায় নিয়ে এসেছেন। কেন? পলাশভাই ইচ্ছে করলে সত্যি কথাটা বলে দিলে পারতেন। কিন্তু উনি বললেন, এটা পার্সোনাল ম্যাটার। উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।’

‘পলাশের মাথায় মাঝে মধ্যে অদ্ভুত খেয়াল চাপে, জানেন? উনি যে কেন ইন্ডিয়া থেকে আপনাকে নিয়ে এসেছেন, আমাকেও তখন তা বলেননি। ঢাকা থেকে ফোন করে আপনার নাম আর বায়োডেটা দিয়ে উনি শুধু বলেছিলেন, স্পনসরশিপের সব ডকুমেন্টস পাঠিয়ে দিতে।’

কালকেতু একটু অবাক হয়েই বলল, ‘সত্যিই আপনি জানতেন না, কেন আমাকে উনি নিয়ে এসেছেন?’

‘না। আজই উনি আমাকে বললেন। সে কথা থাক, আপনি বলুন, নায়গারা কেমন দেখলেন?’

‘অসাধারণ। একেকটা জায়গা আছে, একবার দেখে আশ মেটে না। দ্বিতীয়… তৃতীয়বার গেলেও সমান ভাল লাগে। আমারও ফের যেতে ইচ্ছে করবে। এই তো পলাশভাইও বলছিলেন, উনি বেশ কয়েকবার নায়গারায় গিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও, এবারও ওর মধ্যে সমান উচ্ছ্বাস দেখলাম।’

‘সে তো অন্য কারণে। ওই যে বললাম, ওঁর অদ্ভুত খেয়াল। এই দেখুন না, গত ডিসেম্বরে এখানে তখন বরফ পড়ছে। ঢাকা থেকে উনি তিনজনকে নিয়ে এলেন, যারা অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসের এক্সপার্ট। ওদের নিয়ে নায়গারায় গিয়ে পলাশ জিদ ধরলেন, জানুয়ারি মাসে ফলস-এর উপর দিয়ে হাঁটবেন। অনেক কষ্টে শেষ পযন্ত ওকে আমি থামাই।’

‘নায়গারার উপর দিয়ে হাঁটবেন মানে?’

রোজিনা হাসিমুখে বললেন, ‘কেন, আপনাকে উনি এই ইচ্ছেটার কথা বলেননি? বছরের শেষদিকে নায়গারা ফলস জমে যখন বরফ হয়ে যায়, তখন তার উপর দিয়ে হেঁটে উনি কানাডায় গিয়ে উঠতে চান। আজ পর্যন্ত ওয়ার্ল্ডের কেউ যা করতে পারেননি, উনি তা করে দেখাবেন। সে এক কাণ্ড, অ্যাডভেঞ্চার এক্সপার্টদের সঙ্গে বেশ কিছুদিন উনি শলাপরামর্শ করলেন। প্রচুর টাকা-পয়সাও খরচা করেন। কিন্তু নিউ ইয়র্ক সিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ওঁকে করতে দেননি।’

‘বাধা দেয় কেন?’

‘আরে, ওই সময়টায় নায়গারায় কোথাও কোথাও বরফের স্তর খুব পাতলা থাকে। তলায় তখন ঠান্ডা জলের চোরা স্রোত বয়। উপর থেকে কিছু বোঝা যায় না। একবার তলিয়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। একবার একজন সাউথ ইন্ডিয়ান ছেলে অ্যাডভেঞ্চারের নেশায়, পার্মিশন না নিয়েই নায়গারা ফলস-এর উপর থেকে ঝাঁপ মেরেছিল। তার বডি আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমন ডেঞ্জারাস এক্সপিডিশনে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কেন অনুমতি দেবে, বলুন তো?’

রোজিনা কথাটা শেষ করার সঙ্গেসঙ্গে কালকেতুর চোখে পড়ল, দু’হাতে ট্রে-তে তিন গ্লাস কফি নিয়ে স্টার বাকস কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পলাশভাই। একটা ইয়াং ছেলের সঙ্গে কথা বলছেন। একটু পরেই কাছে এসে উনি বললেন, ‘দ্যাখেন কাণ্ড। দ্যাশ থেইক্যা পলাইয়া আইসে। অহন দ্যাশের লোক দ্যাখলেই সাহায্য চায়।’

রোজিনা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এই পোলাডা? কার সাথে কথা কইত্যাসিলেন?’

কফিতে চুমুক দিয়ে পলাশভাই বললেন, ‘কইল তো ঢাকার পোলা। আমাগো দ্যাশের বাসা আমোদপুরের। এজেন্ট ধইর‌্যা ক্যানাডায় গ্যাসিল। কাজ-কাম পায় নাই। পলাইয়া আমেরিকায় ঢুইক্যা আইসে। হালা, হ্যারাই দ্যাশের বদনাম কইর‌্যা দ্যায়।’

ব্রাজিলিয়ান কফির অনবদ্য স্বাদ, দু’চুমুক দিতেই তিনজনের মনে যেন ফুরফুরে ভাবটা ফিরে এল। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। কফিশপের জানলা দিয়ে ওরা দেখতে পেল, পার্কিং এরিয়ায় একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। সেখান থেকে যিনি নেমে এলেন, তাঁকে দেখে তিনজনই চমকে উঠল। এফবিআই অফিসার জন মিকেল। পার্কিং স্পেসে ওদের গাড়ির ভেতর উঁকি মেরে কাউকে দেখতে না পেয়ে মিকেল কফি শপে ঢুকে এলেন। ভদ্রলোককে দেখে রোজিনা উঠে দাঁড়িয়েছেন। পলাশভাইয়ের মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কালকেতু বুঝতে পারল না, আবার কোনও পুলিশি ঝামেলায় পড়তে হবে কি না?

রোজিনা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার অফিসার? আপনি এখানে?’

‘একটা খারাপ খবর আছে ম্যাম। ইন্টারপোল সূত্রে একটু আগে আমরা খবর পেলাম, আইএস টেররিস্টরা আপনাদের পিছু ধাওয়া করেছে।’

শুনে রোজিনার মুখে আতঙ্কের ছাপ। বলেই ফেললেন, ‘মাই গুডনেস, এখন কী হবে?’

‘কী আর হবে।’ মিকেল বললেন, ‘ওরা খ্যাপা কুত্তার মতো হয়ে গেছে। আমরা জানতে পেরেছি, হিট লিস্টে মি. ন্যান্ডিও ঢুকে পড়েছেন। ওঁর জন্য টার্গেট মিস করায় টেররিস্টদের রাগটা এখন গিয়ে পড়েছে মি. ন্যান্ডির উপর। তাই আপনাদের প্রোটেকশন দেওয়ার জন্য আমাকে এখানে আসতে হল। নিউ ইয়র্ক সিটি পর্যন্ত পুলিশ আপনাদের এসকর্ট করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *