(বিয়াল্লিশ)
নিউ ইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে আছে ইমন। কাল রাতে কালকেতুছ্যার ফোন করে ওকে বলেছিলেন, ডালাসে যেতে হবে না। আলবুকার্ক থেকে ওঁরা ফিরে আসছেন। ও যেন গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্টে বেলা একটার সময় হাজির থাকে। আগে কখনও ইমন জেএফকে-তে আসেনি। বিশাল এয়ারপোর্টটা দেখে ও হকচকিয়ে গেছিল। টার্মিনালই আছে ছ’টা। একশো পঁচিশের বেশি গেট। ইমন গুগল সার্চ করে জেনে নিয়েছিল, জেটব্লু এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট আলবুকার্ক থেকে টার্মিনাল ওয়ানে এসে নামে। প্রতিদিন না কি আটশোর মতো ফ্লাইট অপারেট করে জেএফকে দিয়ে। যাত্রী সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি। টার্মিনাল ওয়ান দিয়ে ঢুকে ইমন দেখল, কথাটা সত্যি। ভিড়ে লোক গিজগিজ করছে।
কাল অনেক রাত পর্যন্ত কম্পিউটারের সামনে বসে ও কাজ করেছিল। বেশ বেলা করে ঘুম থেকে উঠেছে। পলাশছ্যারের সব সম্পত্তি রোজিনা ম্যাডাম গ্রাস করে নিচ্ছেন, এই চরম সত্যটা ও কীভাবে বলবে, ইমন ভেবে পাচ্ছে না। ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যাবে। তবুও, পলাশছ্যারকে হ্যাকিংয়ের খবরগুলো না দেওয়া পর্যন্ত ও শান্তি পাচ্ছে না। ভালই হয়েছে, উনি ফিরে আসছেন। জিহাদি হিসেবে ধরা পড়ে যাওয়ার পর থেকে এমনিতেই ও পালিয়ে যেতে পারলে বাঁচে। কিন্তু পলাশছ্যারের মুখোমুখি না হয়েও ওর কোনও উপায় নেই। ইমন জানে, যদি কেউ এখনও ওকে বাঁচাতে পারেন, তা হলে তিনি পলাশছ্যার। ফের ওর মনে হল, তেমন দরকার হলে ও ছ্যারের পা জড়িয়ে ধরে অনুরোধ করবে।
আলোয় ঝলমল করছে বিশাল লাউঞ্জ। কত ধরনের দোকান। রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি টেবলে বসে একই গ্লাস থেকে দুটি স্ট্র দিয়ে একটা কাপল আইসক্রিম খাচ্ছে। দেখে চোখ আটকে গেল ইমনের। খেতে খেতে দু’জনে হাসি-মজা করছে। কুসুম কি কোনওদিন রাজি হত, ওর সঙ্গে এভাবে আইসক্রিম খেতে? ‘মাইনসে কী কইব’ বলে ও ঘুরে বসত। মুসলিম মেয়েদের কত রকম অনুশাসনের মধ্যে দিয়ে জীবন কাটাতে হয়! কোনও মানে আছে? ক্যালিফেটে রোজ ওদের কোরাণ পড়তে হত। আরবিতে কোরাণের অনেকটাই ওর মুখস্ত হয়ে গেছিল। কোত্থাও বলা নেই, মেয়েদের ইচ্ছের কোনও মূল্য দিতে হবে না। আজকাল লেখাপড়া শেখা সত্ত্বেও মুসলিম মেয়েরা কেন যে পুরুষদের সমানাধিকার দাবি করছে না, সেটাই আশ্চর্যের।
হঠাৎই লাউঞ্জ হাততালির শব্দে গমগম করে উঠল। অনেক দূর থেকে শধটা ক্রমেই কাছে আসছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে সামনের দিকে তাকিয়ে ইমন দেখতে পেল, আমেরিকান সেনা বাহিনীর কয়েকজন জওয়ান হেঁটে আসছেন। তাঁদের দেখে লাউঞ্জের সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে সম্মান জানাচ্ছেন। পরনে জলপাই রঙের ছোপছোপ পোশাক, মাথায় টুপি, কাঁধে অটোমেটিক রাইফেল। কী ঝকঝকে চেহারা ওরই বয়সি জওয়ানদের। কেউ একজন বলে উঠলেন, ‘উই আর প্রাউড অফ ইউ ডাফবয়েজ।’ লোকটার দিকে হেসে তাকিয়ে কাঁধ সোজা করে জওয়ানরা হেঁটে গেলেন গেটের দিকে। ওঁরা বোধহয় কোনও ফ্লাইট ধরবেন। গেটের সামনে দাঁড়ানো যাত্রীরা ওঁদের দেখে পিছিয়ে এলেন।
ইউ এস আর্মির জওয়ানদের ডাফবয়েজ বলে না কি? একজন জওয়ানের এত সম্মান! সেলেব্রিটিদের কপালেও জোটে না। দেখে চোখে জল এসে গেল ইমনের। নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করল ওঁর। এই সেনাদের মতো ওরাও বন্দুক কাঁধে নিয়েছে, মর্টার চালানো শিখেছে। সেনাদের মতো কৃচ্ছÉসাধনের জীবনযাপন করেছে ক্যালিফেটে। কিন্তু কত তফাৎ সেনাদের সঙ্গে ওদের! সেনারা বীর… দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করেন। আর ওরা কাপুরুষ। ধর্মযুদ্ধ নামক এক অলীক স্বপ্নের পিছনে দৌড়ে কত দেশের সার্বভৌমত্ব নষ্ট করছে! বীরদের জন্য হাততালিটা এখনও থামেনি। ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে সেনাদের দলটার সঙ্গে। একটা বাচ্চা ছেলে মায়ের হাত ছেড়ে বেরিয়ে এসে, গোলাপের তোড়া তুলে দিল ওঁদের হাতে। ভবিষ্যতে সে হয়তো জলপাই রঙের পোশাক গায়ে চড়ানোর কথা ভাববে। ঝাপসা চোখে সেদিকে তাকিয়ে ইমনের মনে হল, হায় আল্লাহ, বড় ভুল হয়ে গেছে।
ওর যা শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে স্বচ্ছন্দে ঢুকে যেতে পারত। ওর মতো একজন এথিক্যাল হ্যাকার পেলে দেশের সিক্রেট সার্ভিস লুফে নিত। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার জন্য হয়তো ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ পুরস্কারও পেতে পারত। তখন ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে হেঁটে গেলে, হয়তো দেশবাসীরা এইভাবেই ওকে সম্মান জানাতেন। আম্মি হয়তো বুকে জড়িয়ে ধরে বলতেন, ‘অহন আমার মইর্যাও সুখ।’ কিন্তু কী হল শেষপর্যন্ত? রাজাকারের তকমা পাওয়া ওর দাদামশয় চূড়ান্ত অপমানের শিকার হয়েছেন। আর ইমন? ওকেও হয়তো বংশ পরম্পরায় ঘৃণা বহন করে যেতে হবে। এই মুহূর্তে কেউ যদি জানতে পারেন, ও জিহাদি, তা হলে দেশে কী পরিমাণ লাঞ্ছনা জুটবে ওর পরিবারের কপালে, ইমন আন্দাজ করতে পারে। নিজেকেই ও প্রশ্ন করল, আচ্ছা, নতুনভাবে জীবনটা ফের শুরু করা যায় না? কিন্তু, ওর জিহাদি জীবনের অধ্যায়টা কী করে মুছে ফেলবে, ইমন ভেবে পেল না।
হাততালির ঘোর কাটতে না কাটতেই ও শুনতে পেল, ‘কখন এসেছ ইমন?’
পাশ ফিরে কালকেতুছ্যারকে দেখে ইমনের চটক ভাঙল। পিছনে পলাশছ্যারকে দেখে ও একটু চমকে উঠল। ডান হাতে স্লিং লাগানো, হাফ হাতা শার্টের ডান হাতাটা ঝুলে আছে। ঘাড়ের এক পাশে লিউকোপ্লাস্ট। ছ্যারের কি কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল? চোখের কোণে কালি পড়ে গেছে। সদা হাস্যময় মুখটা কেমন যেন পাংশুটে। ওঁদের সঙ্গে রোজিনা ম্যাডামকে না দেখে ইমনের মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘ঘইণ্টাখানেক ওয়েট করতাসি। আফনেগো সাথে ম্যাডাম আহেন নাই?’
পলাশছ্যার বিড়বিড় করে বললেন, ‘আইলেও কোনও লাভ হইব বইল্যা মনে হয় না।’
হঠাৎ কালকেতুছ্যারের দিকে চোখ পড়ায় ইমন দেখল, ইশারায় উনি কথা বাড়াতে মানা করছেন। তাই ও বলল, ‘আপনেরা বাইরে গিয়া দাঁড়ান। আমি পার্কিং থেইক্যা গাড়িডা আনতাসি।’
এটা কী বললেন পলাশছ্যার! রোজিনা ম্যাডাম এলেও কোনও লাভ হবে না! তা হলে কি আলবুকার্কে দু’জনের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি হয়ে গেছে? ছ্যার বোধহয় জেনে গেছেন, ম্যাডামের কুকীর্তির কথা। বাজ পড়া গাছের মতো মনে হচ্ছে মানুষটাকে। কী এমন হল? ভাবতে ভাবতে রাস্তা পেরোল ইমন। টার্মিনাল ওয়ানের পার্কোম্যাট রাস্তার ওপাশে। লিফটে করে নিচের তলায় নেমে যেতে হয়। লিফটের জন্য অপেক্ষা করার সময় একটা সিদান গাড়ি থেকে রোহিতকে ও নামতে দেখল। পিছনের সিট থেকে নেমে এলেন ওর আম্মা-আববু। বোধহয় ওঁরা দেশে ফিরে যাচ্ছেন। সেই কারণেই প্লেনে তুলে দিতে এসেছে রোহিত। ডিকি থেকে সুটকেশগুলো নামাচ্ছে ও। ট্রোলির জন্য এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। যাতে চোখে না পড়ে, সেজন্য ইমন একটু ঘুরে দাঁড়াল।
তার পর আড়চোখে তাকিয়ে যাকে দেখল, তাকে ও একদম আশাই করেনি। কুসুম… গাড়ি থেকে নেমে কথা বলছে রোহিতের সঙ্গে। কুসুম যে নিউ ইয়র্কে, সে কথা তা হলে রোহিত জানত? তা হলে দু’জনের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। গোলাপি রঙের সালোয়ার আর কামিজ পরেছে কুসুম। রংটা ওর খুব প্রিয়, ওকে মানায়ও। একটা হাত ওর সদা ব্যস্ত থাকে ওড়না সামলাতে। ওড়না দু’কাঁধের নিচে ঝুলছে। পরীর মতো মনে হচ্ছে কুসুমকে। ইমনের একবার ইচ্ছে করল, কুসুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। কিন্তু কোন মুখে দাঁড়াবে? রোহিত ওর কলঙ্কময় অতীতের কথা জানে। নিশ্চয়ই কুসুমের কাছে উগড়ে দিয়েছে।
লিফট এসে দাঁড়িয়েছে। ভিতরে ওরই বয়সি ছিপছিপে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে। ইমন দ্রুত ঢুকে পড়ল লিফটের ভিতর। ছেলেটার দিকে একবার তাকাতেই ওর ষষ্ঠ ইদ্রিয় বলল, ‘সাইবধান। মনে করার চেষ্টা কর, পোলাডারে কোথায় দেখছস।’
দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই ছেলেটার হাতে পিস্তল উঠে এল। প্রথমেই আরবিতে খিস্তি মেরে বলল, ‘ইয়া এবেন আল শারমুতা। কুত্তীর বাচ্চা। পালাবি ভেবেছিস? তোর উপর আমাদের নজর আছে।’
তখনই একটু আগে শোনা হাততালির শব্দটা ইমন শুনতে পেল। বীরত্ব দেখানোর সময় এসে গেছে। হাতে হয়তো পাঁচ সেকেন্ডও সময় নেই। চট করে বাঁ দিকে সরে গিয়ে, ছেলেটার অণ্ডকোষ লক্ষ করে ও ডান পায়ে লাথি চালাল। ছেলেটা আশাই করেনি পিস্তল দেখেও ইমন পাল্টা আঘাত করবে। তলপেট ধরে বসে পড়ার সময় ওর হাত থেকে পিস্তলটা মেঝেতে ছিটকে পড়ল। সেটা দ্রুত কুড়িয়ে নিয়ে ইমন একবার ভাবল, চিরাগের মতো শাস্তি দেয়। এলোপাথাড়ি লাথি মেরে রাগ মেটায়। কিন্তু লিফট নিচের তলায় এসে দাঁড়াচ্ছে। পিস্তলটা পকেটে পুরে ইমন হুডির ঘোমটাটা মাথায় টেনে দিল। লিফট থেকে বেরনোর সময় ও পাল্টা খিস্তি দিয়ে বলল, ‘ইয়া শারমুতা। কুত্তা কোথাকার।’
ভাগ্যিস, গেটের বাইরে কোনও লোক দাঁড়িয়ে নেই। দরজা বন্ধ হওয়ার আগে ইমন দেখল, আরবি ছেলেটা তখনও কাতড়াচ্ছে। নিশ্চিন্ত মনে ধীরগতিতে হেঁটে ও গাড়ির কাছে গেল। বেশিক্ষণ এয়ারপোর্টে থাকাটা উচিত হবে না। লিফটের মধ্যে নিশ্চয়ই লুকোনো ক্যামেরা আছে। চোখে পড়ে গেলে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যাবে। প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে ইমন জেএফকে-তে এসেছিল। তার মানে, জহ্লাদগুলো ওর উপর নজর রেখেছিল। ছেলেটাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে ও আত্মপ্রসাদ অনুভব করল। এই সাহসটাই যদি ক্যালিফেটে ওরা দেখাতে পারত, তা হলে ওদের দিয়ে আরবরা বাথরুম পরিষ্কার করানোর কথা ভাবতেই পারত না। গাড়ি নিয়ে বেরনোর সময় ইমন টের পেল, সর্বনাশ। ব্রেক ঠিকঠাক কাজ করছে না। জিহাদিরা আঁটঘাট বেঁধেই ওকে খুন করতে এসেছিল। ব্রেকের তার কেটে দিয়েছে।
পলাশছ্যারেরা রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন। জিহাদি প্রতিপক্ষের কথা মাথায় না রেখে আগে ওঁদের বাসায় পৌঁছে দিতে হবে। এদিক ও দিক তাকিয়ে ইমন কাছেই একটা সিদান গাড়ি দেখতে পেল। ব্রেক ইন করে গাড়িটা নিয়ে বেরনোর সময় ও মুখটাকে রুমালে আড়াল করল। তখনই ওর চোখে পড়ল, জিহাদি ছেলেটা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। মোবাইল ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। ইমনের একবার ওর মনে হল, ধাক্কা মেরে ছেলেটাকে উড়িয়ে দেয়। কিন্তু জিঘাংসা দমন করে ও গাড়িটাকে উল্টো দিকের ফুটপাতে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল। ছ্যারদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে ওকে ফের এয়ারপোর্টে আসতে হবে। চুরি করা গাড়িটাকে ঠিক জায়গায় রেখে যাওয়ার জন্য।
পিছনের সিটে বসে ছ্যারেরা কথা বলছেন। কালকেতুছ্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘পলাশভাহ,এখন কোথায় যাবেন, কিছু ঠিক করলেন?’
পলাশছ্যার বললেন, ‘নিউ জার্সির বাসায় গিয়া কী কইর্যা থাকুম ক’ন। বাসা জুইর্যা হ্যার স্মৃতি। অহন পারুম না মশয়। আমারে নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে নিয়া চলেন।’
গাড়ি চালাচ্ছে বটে, কিন্তু ইমনের কান ছ্যারদের দিকে। ও বুঝতে পারল না, পলাশছ্যার তখন বললেন, ‘ম্যাডামের আইয়া কোনও লাভ অইব না।’ এখন বলছেন, ‘বাসা জুইর্যা হ্যার স্মৃতি।’ হয়েছেটা কী? ‘হ্যার’ বলতে পলাশছ্যার রোজিনা ম্যাডামকেই বোঝাচ্ছেন। তা হলে কি ম্যাডামের সঙ্গে পাকাপাকি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে? কী ভয়ানক একটা খবর! এই তো আলবুকার্ক যাওয়ার দিন ম্যাডাম কবুতরের মতো বকবক করছিলেন। পলাশছ্যারকে স্প্যানিশ আদবকায়দা শেখাচ্ছিলেন। কী খুশিই না মনে হচ্ছিল, তাঁকে দেখে। এমন কী মনোমালিন্য ঘটল, ম্যাডাম এত দূরে সরে গেলেন? প্রশ্নটা করতে গিয়েও ইমন মুখে কুলুপ এঁটে রাখল। নিজেকে মনে মনে বলল, ‘হালা, তুই হ্যাগো নোকরস্য নোকর। তর অত কিওরোসিটি দেখানোর দরগারডা কী হারামজাদা?’
পিছন থেকে কালকেতুছ্যার ওকে তখনই বললেন, ‘ইমন, তুমি তো নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টটা চেনো। আপাতত, সেখানেই স্যারকে নিয়ে চলো।’
শুনে কুঁকড়ে গেল ইমন। ওই অ্যাপার্টমেন্টে ও মাত্র একবারই গেছিল। সেদিন কেন গেছিল, কালকেতুছ্যারের মনে আছে তা হলে। থাকবেই না কেন? সেদিন উনি প্রাণে বেঁচে গেছিলেন। কী বিরাট অপরাধই না করতে গিয়েছিল সেদিন ইমন। এই রকম একটা দয়ালু মানুষকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিলে, নিশ্চিত ওকে আল্লাহ দোজখে পাঠাতেন। ছোট্ট কথায় ও উত্তর দিল, ‘জ্বী ছ্যার, চিনি।’
মিনিট পঁয়ত্রিশের ড্রাইভ। ইয়ার এন্ডিংয়ের ছুটি চলছে নিউ ইয়র্কে। ভর দুপুরে রাস্তায় গাড়ি খুব কম। অনেকটা পিছনে পুলিশের একটা গাড়ি হুটার বাজিয়ে আসছে। ইমনের বুকটা কেঁপে উঠল। গাড়ি চুরির কথা পুলিশ জেনে গেল না কি? লুকিং মিররে চোখ রেখে, ও দেখল, পুলিশের গাড়িটা থার্ড লেন ধরে ছুটছে। তার পিছনে একটা অ্যাম্বুল্যান্স। নাহ, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বোধহয় সামনে কোথাও অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। নর্থ আমেরিকায় বেশ কিছুদিন কাটানো হয়ে গেল। অভিজ্ঞতা থেকে ও জানে, এই দেশে ট্র্যাফিক পুলিশের জবাব নেই। হাইওয়ে বা ফ্রিওয়ের কোত্থাও ওঁরা চোখে পড়েন না। কিন্তু দরকার হলে চট করে হাজির হন। বিশেষ করে, কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে। সত্যিই, পুলিশের গাড়িটা ডানদিক দিয়ে ফ্যাশন অ্যাভেনিউতে ঢুকে পড়ল। নিশ্চিন্ত হয়ে ইমন গাড়ি ছোটাল চেলসির দিকে।
হঠাৎ পলাশছ্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ম্যাডামরে ছাড়া আমি বাঁচুম কী কইর্যা কাইলকেতুভাই?’
কাইলকেতুভাই বললেন, ‘অত উতলা হবেন না। দেখবেন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘আমার মন অন্য জানান দিতাসে। হ্যার ভরসায় আমি বাংলাদ্যাশের পাট চুকাইয়া দিতাসিলাম। ওহানকার বিজনেস গুটাইয়া এহানে সেটল করুম ভাবতাসিলাম। কিন্তু মাইনষে ভাবে এক, হয় আর এক। হ্যায় না থাইকলে আমারে দ্যাশে ফিইর্যা যাইতে অইব।’
পলাশছ্যারের গলায় আক্ষেপ আর হা হুতাশ শুনে ইমনের ভাল লাগছে না। ছ্যার এতটা ভেঙে পড়েছেন কেন, ও বুঝতে পারছে না। ম্যাডামকে ছ্যার এত ভালবাসেন, বাংলাদেশ থেকে একেবারে চলে আসার কথা পর্যন্ত ভাবছিলেন। তার মানে, কাল রাত থেকে ওর মাথার মধ্যে যে সব কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল, সব ভুল! গোপনে হ্যাকিং করে রোজিনা ম্যাডাম ছ্যারকে সর্বস্বান্ত করার কথা ভাবেনইনি। উল্টে, ছ্যারই স্বেচ্ছায় দেশের সব ব্যবসা বিক্রি করে দিয়ে এখানে সংসার পাততে চাইছিলেন? আলবুকার্কে হয়তো কোনও কারণে ম্যাডামের সঙ্গে ছ্যারের ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। ভালবাসার সম্পর্কে তো মাঝে মধ্যে টানাপোড়েন চলেই। আবার মিলমিশও হয়ে যায়। ছ্যার এত উদার মনের মানুষ, পারতেন না ম্যাডামকে ফের কাছে টেনে নিতে? ওঁকে ফেলে রেখে কেন ছ্যার নিউ ইয়র্কে চলে এলেন?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ইমন পৌঁছে গেল চেলসির অ্যাপার্টমেন্টে। গাড়ি থেকে নেমে কাইলকেতুছ্যার বললেন, ‘লাঞ্চের পর তুমি একবার আমার কাছে এসো ইমন। তখন শুনব, চিরাগের কী হল?’
ইমন বলল, ‘জ্বী ছ্যার। আমারে ফোন কইর্যা দিয়েন।’
দু’জন লিফটের দিকে এগিয়ে যেতেই ইমন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। দু’জনই এমন অন্যমনস্ক, টেরও পাননি চুরি করা গাড়িতে করে এসেছেন। ইমন সঙ্গেসঙ্গে মনস্থির করে নিল। গাড়িটা কাছাকাছি কোনও রেস্তোরাঁর পার্কিং স্পেসে রেখে দেবে। নিজে লাঞ্চ করে তার পর ফিরে আসবে এই অ্যাপার্টমেন্টে। গাড়িতে ওঠার আগে হঠাৎ ওর চোখে পড়ল পিছনের সিটে কয়েকটা বাংলা কাগজ পড়ে আছে। সম্ভবত, ছ্যারদের মধ্যে কেউ ফেলে রেখে গেছেন। বহুদিন পর চোখের সামনে বাংলা খবরের কাগজ। বাংলা অক্ষরগুলো ওকে টানতে শুরু করল। ট্যাবলয়েড সাইজের কাগজটার নাম ‘যুগযুগান্ত’। এই নামে কোনও কাগজ বেরোয়, ইমন জানতই না। কৌতূহলবশতঃ কাগজটা ও হাতে তুলে নিল। প্রথম পৃষ্ঠাতেই চোখ আটকে গেল ওর।
পাশাপাশি রোজিনা ম্যাডাম আর পলাশছ্যারের ছবি। তার নিচে বড় বড় করে হেডিং, ‘র্যাঞ্চে নেকড়ের তাণ্ডব, ক্ষত বিক্ষত প্রেমিক যুগল।’ ‘প্রেমিকার অবস্থা সঙ্কটজনক।’ পৃষ্ঠার তলার দিকে আরও একটা ছবি। নেকড়ের সঙ্গে লড়াই করছেন পলাশছ্যার। পাথুরে জমিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন রোজিনা ম্যাডাম। জ্যোৎস্না রাতে ঝরণার ধারে ছবিটা তোলা। তবুও, দু’জনকে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। দুটো ছবির মাঝে বিশদ খবর। দ্রুত কয়েকটা লাইন পড়ে ফেলল ইমন। ইয়াল্লাহ, তা হলে এই কারণেই পলাশছ্যার জীবন সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন!
যুগযুগান্ত কাগজে আরও একটা জিনিস লক্ষ করে ইমন চমকে উঠল। খবরটা লিখেছেন, নিউইয়ার্কের সংবাদদাতা রেজওয়ানা চৌধুরী। আরে, কুসুমের ভাল নামও তো রেজওয়ানা। আম্মু সেদিন বলছিল বটে, কুসুম খবরের কাগজের রিপোর্টার। এই খবরটা ও-ই লিখেছে না কি? ইমন মনোযোগ দিয়ে খবরটা পড়তে লাগল।
