জিহাদি – ৪৫

(পঁয়তাল্লিশ)

আউট হাউসের ঘরে বসে ছটফট করছে ইমন। সারা দিনে পর পর এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেল, আর টেনশন নিতে পারছে না ও। আজ দুপুরে জেএফকে এয়ারপোর্টে জিহাদি ছেলেটা যদি গুলি চালিয়ে দিত, তা হলে এতক্ষণে ওর লাশ কোনও হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকত। ওকে আইডেন্টিফাই করার মতো কাউকে পাওয়া যেত না। কামাল ও খামিস ধরা পড়েছে। চিরাগ আর মামুনও জেলে। তবুও, জিহাদিরা ওর পিছু ছাড়েনি। এটাই ইমনের উদ্বেগের কারণ। এয়ারপোর্টে ও বুঝতে পেরেছে, প্রতি মুহূর্তে জিহাদিরা ওর উপর লক্ষ রাখছে। যে করেই হোক, আমেরিকা থেকে ওকে পালিয়ে যেতেই হবে। না গেলে, সবসময় ওকে মৃত্যুভয় নিয়ে বাঁচতে হবে। কিন্তু পালাবে কীভাবে, সেটা ইমন বুঝে উঠতে পারছে না। সেইসঙ্গে আর যে ভাবনাটা ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে, সেটা হল, পালিয়ে যাবেই বা কোথায়?

দুপুরে রোজিনা ম্যাডামের খবরটা যুগযুগান্ত কাগজে পড়ে, ইমনের মন আরও ভেঙে গেছে। এই মুহূর্তে পলাশছ্যার এমন একটা মানসিক অবস্থায় রয়েছেন যে, অন্য কারও ব্যাক্তিগত সমস্যা নিয়ে নিশ্চয় মাথা ঘামাতে পারবেন না। এই বিশাল মহাদেশের কোথাও না কোথাও কিছুদিনের জন্য আত্মগোপন করে থাকা যায়। বিশেষ করে, পলাশছ্যারের মতো ক্ষমতাবান কোনও মানুষের হাত মাথায় থাকলে। এমন প্রচুর মানুষ এখানে অনুপ্রবেশ করে দিব্যি জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু জিহাদিদের থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার পর, বাঁচার একটা নতুন পথ আঁকড়ে ধরতে চায় ইমন। সুদীশছ্যারের কথাগুলো ওর মাথায় ঢুকে গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ও সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। সুদীশছ্যার যদি আশ্বাস দেন, তা হলে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করতেও ও রাজি।

দুপুরে নিউ ইয়র্কে সুদীশছ্যারকে ও পলাশছ্যারের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে দেখেছিল। সঙ্গে আরও এক ভদ্রলোক ছিলেন। তখনই ইমনের মাথা খেলে গিয়েছিল, সামনে গিয়ে বলে, ‘ছ্যার আফনের সাথে এড্ডু দরকার আসে।’ কাল রাতে মামুনের কম্পিউটার ঘেঁটে ও যা জানতে পেরেছে। সেটা সুদীশছ্যারকে জানিয়ে দেওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ওর। না জানালে আর ক’দিন পর বাংলাদেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। কিন্তু এক পা এগিয়েও ইমন শেষে তিন পা পিছিয়ে যায়। কাইলকেতুছ্যারের অনুমতি না নিয়ে সরাসরি কথা বলাটা উচিত হবে না। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া হয়ে যাবে। তখন কাইলকেতুছ্যারের ফোনের অপেক্ষায় ইমন গাড়িতেই বসেছিল। অনেক পরে ছ্যার ফোন করে বললেন, ‘তুমি নিউ জার্সিতে ফিরে যাও সুমন। কাল সকালে ফের চলে এসো।’ চুরি করা গাড়িটা কলম্বাস সার্কেলের কাছে একটা পার্কোম্যাটে রেখে ইমন মেট্রো ধরে নিউ জার্সিতে চলে এসেছিল।

টেনশন কাটানোর জন্য ইমন বাইরে লনে বেরিয়ে এসে দেখল, গোধূলিবেলায় আকাশের রঙ একেবারে হলুদ। আমোদপুরে এইসময়টায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি বাসায় ফিরে আসত। তিরের ফলার মতো দল বেঁধে। নদীর ধারের গাছগুলো ওদের কলকাকলিতে ভরে ওঠত। বোধহয় সারাদিনের হিসেব নিকেশ করত ওরা ওই সময়। কিন্তু, পলাশছ্যারের এই বাংলোটা আশ্চর্য রকমের শান্ত। পিছনদিককার জঙ্গলে পাখির কলরবও শোনা যাচ্ছে না। ইমন লক্ষ করল, লনের ঘাস বেশ বড় হয়ে গেছে। তারই মধ্যে দুটো ধূসর রঙের খরগোস কুটকুট করে ঘাস চিবোচ্ছে। ডানদিকের ছোট সুইমিং পুলে ঝরা পাতা ভাসছে। বাড়ির মালিকরা নেই। পরিচর্যা করার লোকও নেই। ইমনের মনে পড়ল, সুইমিং পুলে একদিন ঝরা পাতা দেখে রোজিনা ম্যাডাম মারাত্মক চটে গেছিলেন। নিক বলে যে লোকটা লনে ঘাস ছাঁটতে আসে বা সুইমিং পুলে ক্লোরিন ছেটায়, তাকে খুব বকাবকি করেছিলেন সেদিন।

পকেটে রাখা ফোনটা হঠাৎ বেজে উঠল। সুইচ অন করে ইমন দেখল, পর্দায় কাইলকেতুছ্যার। ও বলল, ‘সেলাম আলেইকুম ছ্যার। কহন যাইতে অইব ক’ন।’

কাইলকেতুছ্যার বললেন, ‘নিউ ইয়র্কে তোমাকে আসতে হবে না ইমন। জাস্ট চেক করলাম, তুমি বাংলোয় আছ কি না। আমরা এখুনি নিউ জার্সির বাসায় ঢুকছি।’

কথাটা শেষ হতে না হতেই লোহার গেট একদিকে সরে যেতে থাকল। একটা রোলস রয়েস ঢুকতে দেখল ইমন। সামনের সিট থেকে যিনি নামলেন, তাঁকে চিনতে পারল না ও। পিছনের সিট থেকে যিনি নেমে এলেন, তাঁকে দেখে ও চমকে উঠল। এই সেই লায়লা বলে মহিলা, যাঁকে ইমন পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল। ভদ্রমহিলা তা হলে কথা রাখলেন না। পুলিশকে সব বলে দিয়েছেন! পুলিশ নিশ্চয়ই গ্রেফতার করতে এসেছে ওকে। লায়লার পিছনেই কাইলকেতুছ্যার আর সুদীশছ্যার। গাড়ি থেকে নেমে কাইলকেতুছ্যার লায়লাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাল করে দেখুন তো, এখানেই আপনাকে আটকে রাখা হয়েছিল কি না?’

লায়লা একবার মেন বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করলেন। তার পর আউট হাউস দেখিয়ে বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, এখানে। সেটা ভাল বলতে পারবে, এই ছেলেটা। কেননা, এই ছেলেটাই আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ স্টেশনে।’

সুদীশছ্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইমন, লায়লা যা বলছেন, সত্যি?’

মাথা নিচু করে ইমন বলল, ‘হ ছ্যার।’

‘আমাদের নিয়ে চলো সেই জায়গাটায় যেখানে তুমি আর চিরাগ লায়লাকে আটকে রেখেছিলে।’

ইমন অসহায় ভঙ্গিতে বলল, ‘আফনেরা ঠিক কইতাসেন না ছ্যার। চিরাগের সাথে মামুন বইল্যা একজন সিল। আমি কিছু জাইনতাম না।’

ছ্যারদের সঙ্গে আসা অচেনা ভদ্রলোক হঠাৎ ঠাস করে ওর গালে চড় মেরে বললেন, ‘তুই সিলি না মানে? হালার পো হালা, তহন তুই কোথায় সিলি?’

চড় খেয়ে চোখে পানি চলে এল ইমনের। ও বলল, ‘আমি তহন ডিউটিতে সিলাম। চিরাগ হ্যারে চোরাকুঠুরিতে লুকাইয়া রাখসিল। আমি জানুম কী কইর‌্যা?’

অচেনা ভদ্রলোক ফের হাত তুলে শাসালেন, ‘আবার একডা দিম না হি? কোথায় চোরাকুঠুরি, আমাগো দ্যাখা।’

গালে হাত বুলোতে বুলোতে ইমন আউট হাউসের ভিতরে ঢুকে এল। সুইচ টিপতেই সোফা সরে গিয়ে চোরাকুঠুরির দরজাটা বেরিয়ে পড়ল। সেটা দেখিয়ে ও বলল, ‘এই দ্যাহেন।’

অচেনা ভদ্রলোক বললেন, ‘সুদীশভাই, আপনি নিচে নাইম্যা দেইখ্যা আসেন। লায়লারেও সাথে লইয়্যা যান। আমি ততক্ষঁণ হাতের সুখ কইর‌্যা লই।’

কাঠের সিঁড়ি দিয়ে সুদীশছ্যার, কাইকেতুছ্যার আর লায়লা নিচে নেমে যাওয়ার পর কোত্থেকে সাহস জোটাল ইমন কে জানে? ও জিজ্ঞেস করল, ‘ছ্যার আপনের পরিচয়ডা জাইনতে পারি?’

‘আমার পরিচয় জাইন্যা তুই কী করবি?’

‘আপনে কাইলকেতুছ্যারের সাথে আইসেন, তাই কিসু কইলাম না। নাইলে, আফনেরে দেখাইতাম, আমার হাতের জোর আফনের থেইক্যাও বেশি।’

‘ক’স কী হালা? ঠিগ আসে, যহন জাইনতেই চাইতাসস, তহন কই, আমি বাংলাদ্যাশ সিক্রেট ইন্টেলিজেন্সের অফিসার প্রিয়তোষ সাহা। আমার কামই অইল, জিহাদিগো প্যাট থেইক্যা কথা বাইর করা। অহন চুপ কইর‌্যা থাক।’

কথা বলতে বলতে প্রিয়তোষছ্যারের চোখে পড়ল, একটা ল্যাপটপ খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পা চালিয়ে টেবলের কাছে গিয়ে উনি বললেন, ‘কম্পিউটারে কাম করে কে? তুই না হি?’

এই রে, ইমন প্রমাদ গুণল। মামুনের জিহাদি লিঙ্ক খুঁজে বের করে কাল রাতে ইমন অনেক কথা জানতে পেরেছে। প্রিয়তোষছ্যার সব ঘেঁটে দেবেন না কি? উত্তর না দিয়ে ও চুপ করে প্রিয়তোষছ্যারের গতিবিধি লক্ষ করতে লাগল। মামুনের সঙ্গে ক্যালিফেটের কারও চ্যাট খোলা অবস্থায় রয়েছে। কম্পিউটার সম্পর্কে যদি ভদ্রলোকের সামান্য জ্ঞান থাকে, তা হলে পর্দায় সবকিছুই উনি দেখে ফেলবেন। প্রিয়তোষছ্যারের ধৈর্য বোধহয় একটু কম। পর্দায় কী লেখা রয়েছে, তাতে চোখ না বুলিয়ে উনি ফের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে, উত্তর দিতাসস না যে?’

‘আফনেই তো আমারে চুপ কইর‌্যা থাইকতে কইলেন।’

‘তুই তো দেহি ত্যাড়াব্যাকা টাইপের পোলা। ল্যাপটপডা কার, অহন ক’ দেহি?’

‘মামুনের, যারে আফনেরা ধরসেন।’ এর পরই প্রশ্ন উঠবে, ল্যাপটপে কী ল্যাখা আসে ক’। বলতে ইমনের আপত্তি নেই। কিন্তু বললে সুদীশছ্যারদের সামনে ও বলবে। তাই প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য ও বলল, ‘ছ্যার, আফনে বাংলাদ্যাশ থেইক্যা আইসেন?’

প্রশ্নটা শুনে জ্বলন্ত চোখে তাকালেন প্রিয়তোষছ্যার। কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় কথা বলতে বলতে চোরাকুঠুরি থেকে উঠে এলেন কাইলকেতুছ্যারেরা তিনজন। সুদীশস্যার বললেন, ‘ফরেনসিক লোকদের আসতে বলে দিয়েছি। ওঁরা কিছু এভিডেন্স জোগাড় করে নিয়ে যান। মামুন আর চিরাগকে ফ্রেম করতে আমাদের সুবিধে হবে।’

প্রিয়তোষছ্যার বললেন, ‘লায়লা কি জায়গাটা চিনতে পেরেছে?’

‘হ্যাঁ।’ কথাটা বলে সুদীশছ্যার ওকে বললেন, ‘ইমন, তোমার এখানে কফি বানানোর ব্যবস্থা আছে না কি? যদি থাকে, তা হলে ভাল করে কফি বানাও তো আমাদের জন্য।’

শুনে ইমন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এই দলটার সঙ্গে কাইলকেতুছ্যার আছেন। যতটা খারাপ পরিস্থিতির কথা ও ভাবছে, ততটা হয়তো হবে না। ও বলল, ‘ব্যবস্থা আসে ছ্যার, দুই মিনিট সময় দ্যান।’

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কফি বানিয়ে ইমন পিছন ফিরে দেখে, লায়লা চুপ করে সোফায় বসে আছেন। বাকি তিনজন ল্যাপটপের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন আলোচনা করছেন। ওকে দেখে ট্রে থেকে কফির কাপ তুলে নিয়ে সুদীশছ্যার বললেন, ‘ল্যাপটপে এই চ্যাট কাদের মধ্যে হচ্ছিল, তুমি জানো ইমন। দেখে তো মনে হচ্ছে কনর্ভাসেশনটা হচ্ছিল জিহাদিদের মধ্যে।’

ইমন বলল, ‘ঠিগ ধরসেন ছ্যার। কথা হইতাসিল মামুন আল ফরখের সাথে ক্যালিফেটের কোনও কম্যান্ডারের। আরবি ভাষায় ল্যাখা।’

‘আমারও তাই মনে হচ্ছিল। কী লেখা আছে, তুমি বলতে পারবে?’

‘পারুম ছ্যার। পাঁইচ বসর হ্যাগো সাথে ঘর করসি। আরবি আমি পইড়তে পারি। এহানে যা ল্যাখা আসে, তা হুনলে আফনেরা চিক্কুর দিয়া উইঠবেন।’

ভ্রু কুঁচকে প্রিয়তোষছ্যার বলে উঠলেন, ‘হ্যালায় যা জিজ্ঞাস করতাসে, আগে তার উত্তর দে। নাইলে এমন কানচাপাটি দিম, উইঠ্যা দাঁড়াইতে পারবি না।’

প্রিয়তোষছ্যারকে হাত তুলে থামালেন সুদীশছ্যার। নরম গলায় বললেন, ‘কী লেখা আছে, বল তো ইমন?’

‘জিহাদিরা বাংলাদ্যাশের গাজিপুরে ফিদাইঁন অপারেশন কইরব। কীভাবে কইরব, ল্যাখা আসে।’

শোনামাত্র সুদীশছ্যার চমকে উঠে তাকালেন প্রিয়তোষছ্যারের দিকে। তার পর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কবে করতে চায়, পড়ে আমাদের বলো তো?’

দু’জনের মুখে উদ্বেগের ছায়া দেখে ইমন মনে মনে হাসল। কাল রাতেই বার দুয়েক চাটগুলো ও পড়ে ফেলেছিল। জেনে গেছে, জিহাদিরা বাংলাদেশে কী করতে যাচ্ছে। প্রথমে ও বুঝতে পারেনি, এই ফিদাইন অপারেশনের গুরুত্ব কতটা? পরে গুগল ঘেঁটে জানতে পারে, জিহাদিরা সফল হলে, পুরো বাংলাদেশ প্যারালাইজড হয়ে যাবে। মহাকাশে বাংলাদেশের একটাই মাত্র স্যাটেলাইট। জিওস্টেশনারি কমুনিকেশন অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং স্যাটেলাইট… বঙ্গবন্ধু ওয়ান। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের নামে। সেই স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন গাজিপুরে। সেখানে যদি ফিদাইন অপারেশন হয়, তা হলে আড়াইশো মিলিয়ন ডলারের স্যাটেলাইট অকেজো হয়ে যাবে।

সুদীশছ্যার জানতে চাইলেন, ফিদাইন অপারেশন কবে হতে পারে। ল্যাপটপের সামনে বসে, পর্দায় চোখ রেখে ইমন বলল, ‘ফোর্থ ফেব্রুয়ারি ছ্যার। আইজ এহানে থার্ড ফেব্রুয়ারির ইভনিং। তার মানে হইল গিয়া ঢাকায় ফোর্থ ফেব্রুয়ারি মর্নিং। আইজই দুপুরে ওহানে বোম্বব্লাস্ট অইব।’

‘কও কী ইমন? কোথায় ব্লাস্ট অইব, আগে কও তো।’ প্রিয়তোষছ্যার জিজ্ঞাসা করলেন।

‘কইলাম তো… গাজিপুরে। বঙ্গবন্ধু ওয়ান স্যাটেলাইটের গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে। সেহানে একডা ফাংশন আসে আইজ দুপুরে। পিএম সেহানে থাইকবেন।’

‘পিএম-এর ফাংশনে ফিদাইঁন অপারেশন… কী সাংঘাতিক!’

প্রিয়তোষছ্যারের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ‘কী সাংঘাতিক’ কথাটা বলেই উনি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে কারও সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলেন। ইমন দেখল, ভদ্রলোকের হাত কাঁপছে। ওঁর ওই অবস্থা দেখে সুদীশছ্যার বললেন, ‘আপনি টেনশন করবেন না প্রিয়তোষভাই। আগে জেনে নেওয়া যাক, আপনাদের পিএম-এর গাজিপুরে যাওয়ার কথা আছে কি না।’

প্রিয়তোষছ্যার বললেন, ‘ক’ন কী সুদীশভাই। টেনশন করুম না? ফিদাইনরা ডেঞ্জারাস টাইপের হয়, হেইডা আফনের চে আর কে ভাল জানে? প্যাটে বম্ব বাঁইধ্যা একডা লোক ব্লাস্ট কইরব। নিজে মইরব, অন্যদেও মাইর‌্যা ফেইলব। আমাগো পিএম-এর অবস্থা যদি আফনেগো রাজীব গান্ধীর মতোন হয়, তাইলে আমাগো হক্কলের চাকরি যাইব। ভাবেন তো, এই কয়েকমাস আগে পিএম রিইলেকটেড হইয়া আইসেন। অহন ফিদাইন অপারেশন সাকসেসফুল হইলে, আমাগো দ্যাশে সিভিল ওয়ার লাইগ্যা যাইব। আমারে অহনই প্রাইম মিনিস্টার অফিসে খবরডা জানাইতে অইব।’

প্রিয়তোষছ্যার বারবার ঢাকার লাইন ধরার চেষ্টা করছেন। অথচ পাচ্ছেন না। আউট হাউসের বাইরে লনে গিয়ে উনি পায়চারি করছেন। পাগলের মতো ছটফট করছেন। অথচ, ইমন দেখছে, সুদীশছ্যার কী আশ্চর্য রকমের ঠান্ডা মাথার মানুষ! ইন্টারপোলের হেড অফিস লিওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে খবরটা জানিয়ে দেওয়ার পর উনি কাইলকেতুছ্যারকে বললেন, ‘লিওঁ থেকে এতক্ষণে ঢাকায় খবর চলে গেছে। ওরা ওখান থেকে প্রিয়তোষবাবুকে ফোন করবেন।’

ইতিমধ্যে লন থেকে আউট হাউসে ফিরে এসেছেন প্রিয়তোষছ্যার। বললেন, ‘ইমনভাই, চ্যাট থেইক্যা আর কী নিউজ পাইল্যা আমারে কও দেহি।’

‘ইমনভাই’ সম্বোধনটা শুনে মনে মনে হাসল ইমন। কিন্তু চড় খাওয়ার কথা ও ভোলেনি। প্যাঁচ মেরে ও জিজ্ঞেস করল, ‘আর কী জানতে চান, ক’ন।’

প্রিয়তোষছ্যার এত নার্ভাস, কথার মারপ্যাঁচ ধরতেই পারলেন না। পাশ ফিরে উনি বললেন, ‘ইমপ্লিকেশনডা বুঝতে পারতাসেন সুদীশভাই। গাজিপুরে ব্লাস্ট হইলে হারা দ্যাশের টেলিকমুনিকেশন সিস্টেম শ্যাষ। ব্রডকাস্টিং, টেলিকাস্টিং অইব না। ব্যাঙ্কিং সিস্টেম অচল হইয়া যাইব। পুরা বাংলাদ্যাশে অ্যানার্কি শুরু হইব। না, না, হেউডা হইতে দেওন যায় না।’

কাইলকেতুছ্যার এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন। প্রিয়তোষছ্যারকে উনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের দেশে কোনও ব্যাকআপ সিস্টেম নেই?’

‘আর একডা গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন আসে। চিটাগাংয়ের বেতবুনিয়ায়। হেইডা বড় না। গাজিপুরে কিছু হইলে, ইমিডিয়েটলি আমাগো ইন্ডিয়ার কাছে হেল্প নিতে অইব।’

ঢাকার পিএম অফিস থেকে ফোনের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তিন ছ্যার মিলে আলোচনা করছেন, পিএম যাতে গাজিপুরে না যান, সে ব্যাপারে দ্রুত কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে। দরকার হলে ফাংশনটাই বন্ধ করে দিতে হবে। এমন সময় প্রিয়তোষছ্যারের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। মনে হয়, ঢাকা থেকে ফোন। রিং টোন শুনে ইমন চমকে উঠল। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’ দেশের জাতীয় সংগীত। কত বছর পর শুনল ইমন! শুনে ওর বুকের ভেতরটা আবেগে উথলে উঠল। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সোনার বাংলা। কী মধুর শব্দ দুটো। বহুদিন পর ইমনের মনে হল, দেশ হল মা। মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে থাকা যায় না কি? গত পাঁচ বছর ধরে কী ভুলটাই না ও করেছে।

নিজেকে ফের ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করল ইমনের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *