জিহাদি – ১৮

(আঠারো)

পার্লারে চুল কাটতে গিয়ে কুইন্সে অ্যাড্রিয়াটিকো রেসিডেন্সিতে ফিরতে পারেননি লিলি গডউইন। গত চারদিন ধরে তিনি হাসপাতালেই রয়েছেন। সিনেগগে গুলি, বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গেসঙ্গে তাঁর অসুস্থতার খবরও মিডিয়া জড়িয়ে দিয়েছে। সারাদিনই নিউজ চ্যানেলের ভ্যান হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। মিডিয়ার কারও সঙ্গে কথা বলেননি লিলি। তাঁর হয়ে বুলেটিন দিয়ে যাচ্ছেন বাম কিম। সিনেগগে গুলি চলার জন্য সেদিন তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল। এক ইহুদি পরিবারের সন্তানের নামকরণ অনুষ্ঠান চলছিল সেই সময়।সেদিনই হত্যাকারী নিউজ চ্যানেলে ফোন করে তাঁর পরিচয় জানিয়ে দেয়। ইহুদি পরিবারের উপর তার ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণেই না কি সে প্রথমে গুলি এবং পরে গ্রেনেড চার্জ করেছিল। পরে নিউ ইয়র্ক পুলিশ পঞ্চাশ বছর বয়সি সেই হত্যাকারীকে গ্রেফতার করে।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিনই সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন লিলি। কিন্তু বিকেলের দিকে তাঁকে দেখতে এসে ইউনিসেফের কর্তারা পরামর্শ দিয়ে যান, আরও দু’তিনটে দিন বিশ্রাম নিন। বাম কিমও তখন মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘ম্যাডাম, এর আগেও একবার আপনি বাড়িতে টিভি দেখার সময় বম্ব ব্লাস্টের দৃশ্য দেখে সেন্সলেস হয়ে পড়েছিলেন। এ বার পার্লারের কাছে তাই হল। বোমার শধ শুনে কেন আপনি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তার ডাক্তারি ব্যাখ্যা জানা দরকার। এই হাসপাতালে আপনার পরিচিত একজন সাইকিয়াট্রিস্ট আছেন। ডাক্তার ইউপা সনা মিটার। ওঁর সঙ্গে একবার কনসাল্ট করে নিলে ভাল হয়।’

ডাক্তারের নামটা বাম কিম ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করেছিলেন বলে প্রথমে চিনতে পারেননি লিলি। পরে বুঝতে পারলেন উপাসনা মিত্র। ভদ্রমহিলা কলকাতার, পড়াশুনো ইংল্যান্ডে। কিন্তু চাকরি করতেন লস অ্যাঞ্জিলেসের এক হাসপাতালে। চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের ওয়ার্কশপে তিনি একবার এসেছিলেন চাইল্ড সাইকোলজি নিয়ে বলার জন্য। বিশেষ করে, যুদ্ধের কারণে অনাথ হওয়া বাচ্চাদের মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে। ডাক্তার উপাসনা এখন নিউ ইয়র্কে? ডাক্তারের নামটা শুনে লিলি থেকে যান হাসপাতালে। কিন্তু এখন শুভানুধ্যায়ীদের ভিড়ে মাঝে মাঝে তিনি বিরক্তবোধ করছেন। সকাল-বিকাল ফুলের তোড়ায় কেবিন ভরে যাচ্ছে। ফাউন্ডেশনের জন্য তিনি অনেকের কাছে কৃতজ্ঞ, আবার ইউনিসেফের জন্য অনেকেই তাঁর কৃপাপ্রার্থী। কাকে তিনি আসতে মানা করবেন? মিডিয়ায় খবরটা বেরিয়ে যাওয়ায় যত গণ্ডগোল!

ডাক্তার উপাসনা সকালে লিলিকে নিয়ে এসেছেন নিজের চেম্বারে। শারীরিক অসুবিধের কথা একবারও তিনি জিজ্ঞেস করছেন না। উনি শুধু নিজের কৌতূহল মিটিয়ে নিচ্ছেন। রোগ সম্পর্কে যত না প্রশ্ন, তার চেয়ে বেশি জানার আগ্রহ চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন সম্পর্কে। ‘ম্যাডাম, চ্যারিটি নেভিগেটর রিপোর্টে দেখলাম, আপনাদের ফাউন্ডেশন এখন আমেরিকার এক নম্বরে রয়েছে। খুব জানতে ইচ্ছে হয়, কী করে পারলেন, এত বড় একটা এনপিও গড়ে তুলতে?’

 প্রথম প্রশ্নটা শুনেই ডাক্তার উপাসনা সম্পর্কে ধারণা বদলে গেছিল লিলির। ডাক্তারির কাজটা শুধু মাত্র মেডিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা নয়। সঙ্গে সঙ্গে পেসেন্ট সম্পর্কেও ভালমতো খোঁজখবর নিয়ে, তার পর রোগ নিরাময়ে নামা। কথাটা তখন মনে হয়েছিল এই কারণে, চ্যারিটি নেভিগেটরের রিপোর্ট দেখার কথা ডাক্তার উপাসনার নয়। আমেরিকায় প্রায় নয় হাজারের মতো এনপিও বা নন প্রফিট চ্যারিটিবল অর্গানাইজেশন আছে। তারা কোত্থেকে কীভাবে টাকা তোলে, কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে খরচ করে, সেটার উপর নজরদারি করার জন্য সরকার অনুমোদিত একটা সংস্থার নাম চ্যারিটি নেভিগেটর। প্রতি বছর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে একটা র‌্যাঙ্কিং লিস্ট তৈরি করে এরা। এনপিওগুলোতে যারা নিয়মিত ডোনেশন দেন, তাদের কাছেও সেই তালিকাটা যায়। যাতে ডোনাররা অবহিত হতে পারেন, কোন এনপিও কতটা স্বচ্ছ। ভবিষ্যতে কোন সংস্থাকে তাঁর ডোনেশন দেওয়া উচিত। চ্যারিটি নেভিগেটরের সেই তালিকায় গত তিন বছর ধরে লিলি গডউইনের চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন এক নম্বরে।

 প্রশ্নটা এত ভাল লেগেছিল যে লিলি বলে ফেলেছিলেন, ‘এত বড় একটা ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা আমার একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ ব্যাপারে সবথেকে প্রথমে আমার আগ্রহ জাগান, আমার মাতৃসমা এক সুইডিশ মহিলা এলসা গিনেসবেরি। উনি আমার মেন্টরও বলতে পারেন। উনি তখন রেড ক্রসের সিনিয়র নার্সের পদ থেকে সদ্য অবসর নিয়েছেন।’

‘আপনি কীভাবে ওঁর সংস্পর্শে আসেন মিস গডউইন?’

‘খুব ছোটবেলায় পিঠের ক্ষতের জন্য আমাকে বহুদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল। এলসা আন্টি তখন সেবা যত্ন করে আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন। আমার উপর ওঁর খুব মায়া পড়ে গেছিল। ওঁর মুখেই শুনেছি, আমি যখন খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠি, তখন আমার পরিবারের লোকজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এলসা আন্টি তখন নিজেই রাজি হন, আমার দায়িত্ব নিতে।

‘আপনি আমেরিকায় এলেন কীভাবে?’

‘আমার ড্যাডি আমাকে নিয়ে এসেছিলেন। ডাক্তার অ্যালেন গডউইন। উনি খুব নামকরা ডার্মাটোলজিস্ট। গোটেনবার্গে আমার চিকিৎসা করতেন। ওঁর নিজের তখন সন্তান ছিল না। এলসা আন্টির থেকে আমাকে উনি দত্তক নিয়েছিলেন। পরে আমি যখন স্কুলে, তখন ড্যাডি চাকরি নিয়ে নর্থ ক্যারোলাইনাতে চলে আসেন। তার পর আমার এক ভাই ও বোন হয়। মাম্মি বছর তিনেক আগে মারা গেছেন। কিন্তু ড্যাডি এখন থাকেন নিউ ইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজে। বছর দুয়েক আগে পাকাপাকিভাবে উনি এখানে চলে এসেছেন।’

‘মিসেস এলসা গিনেসবেরির সঙ্গে এখনও কি আপনার যোগাযোগ আছে?’

‘হ্যাঁ আছে। এই তো মিডিয়া মারফৎ খবরটা জেনে উনি হাসপাতালে আমাকে ফোন করেছিলেন। উনি আমার চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মেম্বার। ওঁর বয়স এখন আশির কাছাকাছি। কিন্তু এখনও কতটা কর্মঠ, না দেখলে আপনি বিশ্বাস করতে পারবেন না। চাইল্ড সাইকোলজি নিয়ে পিএইচডি করার পর আমি তখন ইউনিসেফে চাকরি পেয়েছি। নাইন্টিজ-এর শেষের দিক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। অথবা সিভিল ওয়ার চলছে। খবরের কাগজে প্রায়ই আর্ত বাচ্চাদের ছবি দেখতাম। তাদের সাহায্য করার জন্য আমাকে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হত। তখন এলসা আন্টি আমাকে বললেন, যুদ্ধের কারণে ওই অনাথ শিশুদের জন্য কিছু একটা করলে হয় না? ছোট একটা এনপিও ওঁর ছিলই। সেটাকে আরও বড় করে, চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের আইডিয়া ওঁর মাথায় আসে। সেটা ইউনিসেফকে জানাতেই ওরা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে উৎসাহ দেন। প্রথম বিরাট অঙ্কের একটা ডোনেশন দিয়েছিল মার্কিন সরকার। আপনি একটা কাজ করুন ডক্টর। আমাদের ওয়েব সাইটে গেলে ডিটেল ইনফর্মেশন পেয়ে যাবেন।’

উপাসনা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ম্যাডাম, আপনার আর্লি লাইফ নিয়ে তা হলে ভাল বলতে পারবেন একমাত্র এলসা গিনেসবেরি, তাই না?’

লিলি বললেন, ‘অবশ্যই। তবে কতটা আপনাকে বলবেন, সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। এর আগে মিডিয়ার লোকজন ওর কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু উনি বলতে চাননি। আমি নিজেও কৌতূহলী হয়ে একবার জানতে চেয়েছিলাম। উনি বলেছিলেন, জানতে চেও না। তোমার ক্ষতি হয়ে যাবে। আপনি বরং আমার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’

‘আপনার সমস্যাটা কী মিস গডউইন? বাম কিম বলছিলেন, বম্ব ব্লাস্টের দৃশ্য দেখলে না কি আপনি সেন্সলেস হয়ে যাচ্ছেন? অ্যাম আই রাইট?’

‘উনি ঠিকই বলেছেন।’

‘সত্যিই কখনও কোথাও চোখের সামনে বম্ব ব্লাস্ট হতে দেখেছেন ম্যাডাম? একটু ভেবে বলুন তো?’

‘মনে পড়ে না। আমার চাইল্ডহুড নিয়ে যখনই ভাবতে যাই, তখনই মাথায় খুব যন্ত্রণা অনুভব করি। এলসা আন্টি বারণ করে দেওয়ার পর আমি আর চেষ্টাই করি না। এমনিতেই সারা জীবন পেন কিলার খেয়ে আমার পেটে চড়া পড়ে গেছে। কখনও কখনও ভাবি, আর বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না।’

‘চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনাকে কতটা স্ট্রেস নিতে হয় ম্যাডাম? রিসেন্টলি এমন কি কোনও ঘটনা ঘটেছিল, যা আপনাকে খুব বিচলিত করেছে? আমার কাছে লুকোবেন না।’

চট করে নায়গারার ঘটনাটার কথা মনে পড়ে গেল লিলি গডউইনের। ডাক্তারের কাছে মুখ বন্ধ রাখা উচিত না। তাই তিনি বললেন, ‘স্ট্রেস তো নিতেই হয়। সারা বিশ্বের এখন কত ধরনের এথনিক সমস্যা। তার ফলে বিশ্বের একটা বিরাট একটা অঞ্চল জুড়ে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। সেখান থেকে এমন অনাথ বাচ্চাদের এনে আমরা আশ্রয় দিচ্ছি, যাদের বাবা-কাকারা পরস্পরের বিরুদ্ধে একে ফর্টিসিক্স নিয়ে লড়ছে। বুঝতেই পারছেন, একই ছাদের তলায় তাদের মানুষ করার কতটা স্ট্রেস। তবে আমার কপাল ভাল, সহকর্মীরা সেই স্ট্রেস আমাকে বুঝতেই দেন না। আপনার কাছে গোপন করব না। কিছুদিন আগে নায়গারায় কেউ বা কারা আমাকে লক্ষ করে গুলি করেছিল। প্রাণে বেঁচে গেছি।’

‘আই সি।’ উপাসনা বললেন, ‘ইদানীং আর কোনও ইন্সিডেন্ট যা আপনাকে প্রচণ্ড ভাবাচ্ছে?’

লিলি বললেন, ‘ইয়েমেনের বাচ্চারা। যখনই ওদের কথা ভাবছি, তখনই মনটা দুঃখে ভরে যাচ্ছে। হাজার হাজার বাচ্চা না খেতে পেয়ে ওখানে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। তাদের বয়স পাঁচ থেকে পনেরোর মধ্যে। দাঁড়ান, একটা বাচ্চার ছবি আপনাকে দেখাই। তা হলে বুঝতে পারবেন, কী অবস্থা।’ কথা বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে মোবাইল ফোনটা টেনে নিলেন লিলি। বাটন টিপে হাড় জিরজিরে একটা মেয়ের ছবি বের করে উনি বললেন, ‘এই মেয়েটার বয়স বারো বছর। দেখতেই পারছেন, দিনের পর দিন অভুক্ত থাকার জন্য কী হাল হয়েছে। শরীরের খাঁচা দুমড়ে গেছে। হাড়ের উপর চামড়াটা শুধু লেগে রয়েছে।’

‘মাই গুডনেস! এদের জন্য আপনারা এইড পাঠাচ্ছেন না কেন?’

‘পাঠানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ইয়েমেনে সিভিল ওয়ার চলছে। শিয়া-সুন্নির লড়াই। দেশটা ইরানের দিকে ঝুঁকে পড়ায় সৌদি আরব চটে গেছে। ইয়েমেনে ওরা নিয়মিত এয়ার স্ট্রাইক করে যাচ্ছে। আমার ফাউন্ডেশনের লোকজন জাহাজে করে খাবার-দাবার আর ওষুধ নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সৌদি আরব সেনারা সেসব বন্দরে আটকে দিয়েছে। ডিসট্রিবিউট করতে দেয়নি।’

খানিকক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলেন উপাসনা। আর পর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার ঘনিষ্ঠ এমন কোনও বন্ধু কি আছে, যাকে আপনি মনের কথা খুলে বলেন? তার সঙ্গে আমায় কথা বলতে হবে।’

লিলি বললেন, ‘যে বয়সে বন্ধুত্ব হয়, সেই বয়সে আমি বিছানায় শয্যাশায়ী থাকতাম। জানলার কাচ দিয়ে দেখতাম, প্রতিবেশী সমবয়সি ছেলে-মেয়েরা কোর্ট ইয়ার্ড বা লনে বাস্কেটবল খেলছে। ইচ্ছে থাকলেও আমার শরীর তখন পারমিট করত না। ড্যাডি চিকিৎসা করে যখন একটু সুস্থ করে তুললেন, তখন মাম্মি কারও সঙ্গে মিশতে দিতেন না, ইনফেকশনের ভয়ে। তখন ওঁরা দু’জনই আমার বন্ধু ছিলেন। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় নিজে চলাফেরা করতে পারতাম। তখন অবশ্য মাম্মির অত কড়াকড়ি ছিল না।’

‘ম্যাডাম, কখনও আর পাঁচটা মেয়ের মতো আপনার বিয়ে করার ইচ্ছে হয়নি?’

প্রশ্নটা শুনে লিলি থমকে গেলেন। মুহূর্তে তাঁর চোখের সামনে আন্দ্রিয়াস অ্যান্ডারসন… অ্যান্ডির হ্যান্ডসাম চেহারাটা ভেসে উঠল। এলসা আন্টির বোনপো। ইউনিভার্সিটিতে তাঁর সহপাঠী। দু’জনে মিলে সেন্ট্রাল পার্কে বসে আইসক্রিম খাওয়া, ম্যানহাটনের রাস্তা দিয়ে টাইমস স্কোয়্যারে হেঁটে যাওয়া, ব্রডওয়েতে গিয়ে সিনেমা দেখা, লাইব্রেরিতে বসে একসঙ্গে পড়াশুনা করা… কত স্মৃতি। অ্যান্ডি এখন লাস ভেগাসের একটা হোটেলের মালিক। ও বিয়ে করতে চেয়েছিল। কিন্তু লিলি সেই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার আগে এলসা আন্টি একটা কঠিন সত্য জানিয়ে ছিলেন। ‘জীবনে মা হতে পারবে না।’ শুনে লিলি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করেননি। অ্যান্ডিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এখনও অ্যান্ডি প্রতি বছর থ্যাঙ্কস গিভিংয়ের সময় গিফট আর ক্রিসমাসের সময় নিয়মিত কার্ড পাঠায়। বছরে এই দু’দিন মাত্র ফোন করে। দু’জনের সম্পর্ক ঠিক এই জায়গায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে। ডক্টর উপাসনা উত্তর শোনার আগ্রহে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে লিলি বললেন, ‘বিয়ে করার ইচ্ছে একবার হয়েছিল। কিন্তু শরীরের অপূর্ণতা আমাকে বেশিদূর এগোতে দেয়নি।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ মিস গডউইন। আজ এটুকুই। পরে একদিন আবার বসা যাবে।’ বলে উপাসনা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

করিডর দিয়ে নিজের কেবিনের দিকে ফেরার সময় হঠাৎ লিলির মনে পড়ল, এ বার থ্যাঙ্কস গিভিং ডে-টা কি পেরিয়ে গেছে? দু’একদিনের মধ্যে হওয়ার কথা। হাসপাতালে শুয়ে থাকার জন্য তাঁর মনে নেই। অ্যান্ডি কি এ বারও গিফট পাঠিয়েছে? কে জানে, হয়তো কুরিয়্যর মারফৎ সেই গিফট আড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সির বাড়িতে পৌঁছে পড়ে রয়েছে। তিনি জানেনও না। লিফটে করে দশতলায় উঠতেই লিলি দেখলেন, বাম কিম অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন কেবিনের সামনে। কাছে এসে উনি বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনার এত দেরি হচ্ছে দেখে আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। ইউপা সনা কী বললেন?’

লিলি বললেন, ‘কাউন্সিলিংয়ের জন্য আরও একদিন ডাকবেন।’

‘ম্যাডাম, আমাদের এক বড় ডোনার আপনার জন্য অনেকক্ষণ রিসেপশনে অপেক্ষা করছেন। ওঁকে কি উঠে আসতে বলব?’

‘ভদ্রলোক কোত্থেকে এসেছেন মি. কিম?’

‘লাস ভেগাস থেকে। ওখানকার সবথেকে বড় হোটেল… ভেনিসিয়ানের অন্যতম মালিক আন্দ্রেয়াস অ্যান্ডারসন।’ বলতে বলতে বাম কিম খুব উত্তেজিত, ‘নামটা শুনতেই চিনতে পারলাম, গত বছর উনি হাফ এ মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দিয়েছিলেন। ম্যাডাম আপনি তো কখনও বলেননি, ওকে চেনেন? মিডিয়ায় আপনার অসুস্থতার খবর শুনে লাস ভেগাস থেকে উনি উড়ে এসেছেন। জানি না, এতক্ষণ বসে আছেন কি না। আপনি যদি বলেন, তা হলে আমি নিজে গিয়ে ওকে ডেকে আনতে পারি।’

কী আশ্চর্য! একটু আগেই অ্যান্ডির মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। সে এখন সশরীরে নিউ ইয়র্কে! এমন ঘটনাও ঘটে! ভেবে আনন্দের ঢেউ খেলে গেল সারা শরীরে। কী ভেবে লিলি প্রশ্ন করলেন, ‘মি. কিম, থ্যাঙ্কস গিভিং ডে-টা কি আজকে?’

‘হ্যাঁ ম্যাডাম, কেন বলুন তো?’

‘নাহ, তেমন কোনও কারণ নেই। চলুন, আমিই আপনার সঙ্গে রিসেপশনে যাই। আফটার অল, উনি আমাদের বড় ডোনার। ওকে খাতির করা উচিত।’

বাম কিম অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। দেখে, মনে মনে হেসে ফের লিফটের দিকে পা বাড়ালেন লিলি গডউইন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *