(এক)
নায়গারা ন্যাশনাল স্টেট পার্ক থেকে বেরিয়ে এসে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে পলাশভাই বললেন, ‘কাইলকেতুভাই, গাড়িডা কোথায় রাখসিলাম, আপনের কি মনে আসে?’
শুনে মনে মনে হাসল কালকেতু। প্রশ্নটা করার কথা তো ওর। পলাশভাই-ই ওকে নায়গারা ফলস দেখাতে নিয়ে এসেছেন। সেই ক্লিভল্যান্ড থেকে নিজে ড্রাইভ করে। সক্কালবেলায় দুজনে বেরিয়ে পড়েছিল। বেলা দেড়টা নাগাদ বাফেলো শহরের একটা হোটেলে এসে উঠেছে। ঝকঝকে রোদ্দুর। গাড়িতে আসার সময় পলাশভাই ওকে অন্তত বারচারেক শুনিয়েছেন, ‘এই নিয়া আমার পাঁইচবার হইয়া গেল। আমাগো কপাল ভালা বোঝলেন। আইজ ওয়েদার ডিসটার্ব করব না। মোবাইলে দ্যাখলাম, পুরা দিনডাই সানি ডে। আগে যে কয়বার নায়গারায় আইসিলাম, প্রতিবারই বৃষ্টি পাইসি।’
অন্য কোথাও হলে ওয়েদার ফোরকাস্ট-এ বিশ্বাস করত না কালকেতু। কিন্তু আমেরিকার আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের ও উড়িয়ে দিতে পারছে না। ওরা যা বলেন, তা একশোভাগ ঠিক হয়। নিউ ইয়র্কের আকাশে একদিন ঘন মেঘ। যখন তখন বৃষ্টি নামতে পারে। কয়েকটা জিনিস কেনার জন্য প্লাজায় যাওয়া দরকার ছিল। কালকেতু বেরোবে কি না ইতস্তত করছে, এমন সময় মোবাইলে ওয়েদার চার্ট দেখে পলাশভাই বললেন, ‘বেলা তিনডার আগে বৃষ্টি নাইমব না। চলেন কাইলকেতুভাই। শপিং কইর্যা আসি।’ সত্যিই, সেদিন বৃষ্টি নামল ঠিক তিনটের সময়। দশ মিনিট আগে বা পরে নয়।
নায়গারা স্টেট পার্কের অনতিদূরেই ফুটপাতে বিমূঢ় অবস্থায় পলাশভাইয়ের পাশে কালকেতু দাঁড়িয়ে। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে ও দেখল, রাত প্রায় আটটা। পলাশভাই মনে করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, তাঁর মার্সিডিজ গাড়িটা কোথায় রেখেছেন। যে মানুষ আগে আরও চারবার নায়গারায় এসেছেন, তাঁর অন্তত ভুলে যাওয়ার কথা নয়। কালকেতুর মনে পড়ল, আজ পার্কের ঠিক বাইরে পৌঁছে পলাশভাই একবার বলেছিলেন, ‘স্ট্রেঞ্জ। একে উইক এন্ড, তার উপর সানি ডে। তাও পার্কিং স্পেস ফাঁকা! ট্যুরিস্ট গো হইলডা কী?’
কথাগুলো বলতে বলতে উনি একটা পার্কিং স্পেসে গাড়ি লাগিয়ে ওকে নামতে বলেছিলেন। খুশি খুশি গলায় তখন বলেছিলেন, নায়গারা ফলস-এর এত কাছে না কি আগে কোনোবার গাড়ি রাখতে পারেননি। কোথাও কোনও ট্যুরিস্টের দেখা নেই। রাস্তার ধারে শুধু একটা পার্কিং মিটার দাঁড় করানো আছে। সেখানেই আগেভাগে পার্কিং ফি দিয়ে রাখতে হয়। সেই মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে, কী সব পড়ে এসে পলাশভাই বেজার গলায় বলেছিলেন, ‘না, এহানে গাড়ি রাখা যাইব না। হ্যাঁরা নতুন নিয়ম করসে। আপনে যতক্ষণই গাড়ি রাখেন না ক্যান, পুরা দিনের ভাড়া দিতে অইব।’
টাকা-পয়সার উপর যে পলাশভাইয়ের খুব মায়া, তা কখনও মনে হয়নি কালকেতুর। সারাদিনের জন্য পার্কিং ভাড়া দিতে হলে উনি যে খুব মুশকিলে পড়বেন, তাও নয়। মানুষটাই অদ্ভুত। যাকে বলে ‘ফুল অফ কন্ট্রাডিকশনস।’ বাফেলোয় যে হোটেলটায় এসে উঠেছেন, রাত পিছু তার ভাড়া হাজার ডলার। এত বিলাস বহুল হোটেলে কালকেতু অন্তত কখনও থাকার সুযোগ পায়নি। অথচ সামান্য বাড়তি পার্কিং ফি দেওয়া নিয়ে পলাশভাই এত ইতস্তত করছেন! এই ক’দিনে টুকরো টুকরো কথাবার্তায় ওঁর মুখে কালকেতু শুনেছে, খুব সাধারণ অবস্থা থেকে আজ উনি হাজার হাজার কোটি ডলারের মালিক। হতে পারে, দারিদ্রের দিনগুলোর কথা উনি ভুলতে পারেননি।
কালকেতুর স্মৃতিশক্তি অবশ্য অতটা খারাপ নয়। চট করে ওর মনে পড়ল, পলাশভাই কাছাকাছি কোথাও একটা পাঁচতলা পার্কোম্যাট-এর দোতলায় উঠে গাড়িটা রেখেছিলেন। সেই পার্কোম্যাট-এর পাশেই একটা ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ ছিল। তার নামটাও কালকেতুর মাথা থেকে হারিয়ে যায়নি। দ্য হাউস অফ ইন্ডিয়া। এদিক ওদিক তাকাতেই ওর চোখে পড়ল, রাস্তায় বাঁকের মুখে ওরা দুজন সেই রেস্তোরাঁর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। রাত্তির বলে বুঝতে পারেনি। লাল-নীল নিওনের আলোয় রেস্তোরাঁর নামটা জ্বলজ্বল করছে। কাচের ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে প্রচুর লোক আহারে ব্যস্ত।
বেলা দেড়টা থেকে দু’জনের পেটে সলিড কিছু পড়েনি। পলাশভাই বলেই দিয়েছিলেন, ‘নায়গারা দেখার পর খিদা-টিদা সব ভুইল্যা যাইবেন কাইলকেতুভাই। হ্যায় অইল প্রকৃতির বিস্ময়… স্পট ছাইড়্যা আপনের আসতেই ইচ্ছা করব না।’
সত্যিই তাই, এতক্ষণ খাওয়ার কথা মনেই ছিল না কালকেতুর। রেস্তোরাঁ দেখে ওর খিদে মোচড় দিয়ে উঠল। পলাশভাইকে ও বলল, ‘চলুন, আগে ডিনারটা সেরে নিই। আপনার গাড়ি কাছাকাছিই আছে।’
পলাশভাই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘ঠিক কইসেন। ঠান্ডা বাতাস দিতাসে। চলেন, আগে ভিতরে গিয়া বসি।’
বাইরে থেকে অতটা বোঝা যাচ্ছিল না। ভিতরে ঢুকে কালকেতু দেখল, প্রায় শ’খানেক লোক একসঙ্গে বসে খাচ্ছেন। বেশিরভাগই দক্ষিণ ভারতীয়। সারাদিন ধরে নায়গারা ফলস দেখে তাঁরা এসে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছেন। সূর্য ডুবে যাওয়ার পরও ট্যুরিস্টরা ফলস-এর আশপাশ ছেড়ে যান না। রাতে উল্টো দিকের অংশ কানাডা থেকে নায়গারার গায়ে লাল-নীল-হলুদ আলো ফেলা হয়। তখন খুব সুন্দর লাগে দেখতে। নায়গারার আরও একটা আকর্ষণ আছে। রাত্তির ঠিক দশটার সময় আতসবাজির খেলা দেখানো হয়। বেশিক্ষণের জন্য নয়। মাত্তর পাঁচ মিনিট। সেটা দেখার জন্যও অনেকে আশপাশে অপেক্ষা করেন। কালকেতু বুঝতে পারল, সেই কারণে অনেকে রেস্তোরাঁয় বসে গল্পগুজব করছেন।
পলাশভাই রেস্তোরাঁর ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলছেন। নিশ্চয়ই খাবারের দাম নিয়ে। একটু পরে হয়তো এসে বলবেন, ‘নিউ ইয়র্কে ষোলো আনা বেঙ্গলি ফুডের একটা রেস্টুরেন্ট খুললে ক্যামন হয়, ক’ন তো কাইলকেতুভাই? মেইন আইটেম থাইকব পদ্মার টাটকা ইলিশ। দাঁড়ান, কাইলই রোজিনা ম্যাডামের সাথে একবার আলোচনা করুম।’ এই রোজিনা মহিলাটিকে কালকেতু এখনও চোখে দেখেনি। পলাশভাইয়ের কে হন, উনি তাও বলেননি। কথাবার্তায় ওর মনে হয়েছে, রোজিনা পলাশভাইয়ের বিজনেস অ্যাডভাইসার। ভদ্রমহিলা নিউ ইয়র্কে থাকেন। কাল সকালে ম্যানহাটনে সেই বাড়িতেই গিয়ে ওরা উঠবে।
কোণের দিকে দুটো ফাঁকা চেয়ার দেখে, একটাতে কালকেতু বসে পড়ল। তখনই সেই ভদ্রমহিলার দিকে ওর চোখ গেল। পরনে ঘিয়ে রঙের লেডিস স্যুট। মাথায় চকোলেট রঙের ফেডোরা হ্যাট। গায়ের রং একবারে মাখনের মতো। বয়স কত হবে? পঞ্চাশের উপরে নিশ্চয়ই নয়। মুখ জুড়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুণীদের মতো অদ্ভুত প্রশান্তি। চেহারায় মঙ্গোলিয়ান আদল। কালকেতু বুঝতে পারল না উনি কোন দেশের। এক একজনকে দেখলেই কালকেতুর মনে হয়, ইনি আলাদা। ভগবান এঁকে বিশেষ কোনও কাজে পাঠিয়েছেন। কেন জানে না, ভদ্রমহিলাকে দেখেও ওর তাই মনে হল।
ভদ্রমহিলাকে কালকেতুর প্রথম চোখে পড়ে বেলা দু’টো-আড়াইটের সময়। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে তখন নায়গারা ফলস-এর দিকে অবাক বিস্ময়ে ও তাকিয়ে আছে। বিশাল জলরাশি প্রায় দু’শো ফুট উপর থেকে সশব্দে আছড়ে পড়ছে। সূক্ষ্ম জলকণা মেঘের মতো আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। বাতাসে ভেসে সেই জলবিন্দু ওদের চোখ-মুখেও এসে লাগছে। পলাশভাই তখন একবার বলেছিলেন, ‘পার মিনিট সিক্সটি থাউজেন্ড গ্যালন পানি উপর থেইক্যা নিচে পড়তাসে। অনন্ত কাল ধইর্যা পইড়াই যাইতাসে। দ্যাখেন, নিচের দিকটা ক্যামন কুয়াশায় মতোন হইয়া গ্যাসে। চলেন কাইলকেতুভাই, নিচে যাই। একটা লঞ্চ ট্রিপ আসে। হ্যারে কয়, মেইড অফ দ্য মিস্ট। ফলস-এর এক্কেরে নিচে আমাগো লইয়্যা যাইব।’
ব্রিজের উপর থেকেই কালকেতু দেখতে পাচ্ছিল, নায়গারা একটামাত্র জলপ্রপাত নয়। পাশাপাশি তিন তিনটে জলপ্রপাতের সমাহার। পলাশভাই বলেছিলেন, সবথেকে বড় যেটা, সেটা হল কানাডা আর আমেরিকার সীমান্তে। তার নাম হর্সশু ফলস। বাকি দুটো… আমেরিকান ফলস আর ব্রাইডাল ভেইল ফলস আমেরিকার মাটিতে। নদীর এ পারে নিউ ইয়র্ক স্টেট। উল্টো দিকে, কানাডার ওন্টারিও শহরটার বাড়ি ঘর দেখে কালকেতুর মনে হচ্ছিল, খুবই সমৃদ্ধ। ব্রিজ থেকে কালকেতুর চোখে পড়ছিল, নদীর ওপারে একটা মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিংসের উপর থেকে নিচে…পুরোটাতেই নিওন আলোয় ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন। যাতে ট্যুরিস্টদের চোখে পড়ে। ক্যাসিনোর টোপ দেখিয়ে তাঁদের কানাডায় নিয়ে যাওয়া যায়।
নদীর এপার থেকে দুটো লঞ্চ ছাড়ে ফলস-এর উদ্দেশে। জলের ছিটেয় যাতে শরীর ভিজে না যায়, সেজন্য সওয়ারি ট্যুরিস্টদের সবার গায়ে নীল রঙের উইঞ্চেটার। নদীর ওপারে ওন্টারিও থেকে আরও দুটো লঞ্চ যাতায়াত করছে ফলস-এর কাছাকাছি। তার ট্যুরিস্টদের গায়ে লাল রঙের উইঞ্চেটার। দু’রকম রং কেন, জানতে চাওয়ায় পলাশভাই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ওন্টারিওর দিক থেকে নায়গারাকে আরও সুন্দর লাগে বলে অনেক ট্যুরিস্টই ওখানে যেতে চান। কিন্তু আমেরিকান ভিসা নিয়ে ও দেশে ঢোকা যাবে না। আবার কানাডার ট্যুরিস্টরাও ভিসা ছাড়া আমেরিকায় ঢুকে পড়তে পারেন না। জলপথে কেউ যাতে ওদিক থেকে এ দিকে বা উল্টোটা না করতে পারেন, সেই কারণে দু’দেশের ট্যুরিস্টদের জন্য দু’রঙের উইঞ্চেটার।
ব্রিজের উপর লোকজনের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। পলাশভাই মিনিটে মিনিটে সেলফি তুলছেন। রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে উনি হঠাৎ এক ভদ্রমহিলার হাতে মোবাইল সেট এগিয়ে গিয়ে অনুরোধ করলেন, ‘এক্সকিউজ মি ম্যাডাম, উইল ইউ টেক পিকচার ফর আস?’
এমন কিছু অন্যায় আবদার পলাশভাই করেননি। অপরিচিতের হাতে মোবাইল সেট তুলে দিয়ে অনেক ট্যুরিস্টই নিজেদের ছবি তোলাচ্ছেন। কিন্তু ভদ্রমহিলাকে অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গে পলাশভাইয়ের হাত থেকে সেটটা কেড়ে নিয়ে একজন খুব রূঢ়গলায় বললেন, ‘গো অ্যাওয়ে ম্যান। ডোন্ট ডিসটার্ব হার।’
পরনে সাধারণ পোশাক। লম্বা-চওড়া কালো লোকটা এমন বিচ্ছিরিভাবে মেজাজ দেখাল, কালকেতু অবাক হয়ে গেছিল। ভদ্রমহিলার বডিগার্ড না কি? পরক্ষণেই ও টের পেল, লোকটা একা নয়। সাদা চামড়ার আরও একজন কড়া চোখে পলাশভাইয়ের দিকে তাকিয়ে। তার কোমরে আবার রিভলবার গোঁজা। সে পলাশভাইকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। আশ্চর্য, ভদ্রমহিলা কিন্তু হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। চোখের ইশারায় বডিগার্ড দু’জনকে সরে দাঁড়াতে বলে, হাত বাড়িয়ে কালকেতুর মোবাইল সেটটা চেয়ে নিলেন। তার পর দু’জনের ছবি তুলে দিয়ে স্মিত হেসে বললেন, ‘কাম ক্লোজ সন, লেট আস হ্যাভ আ গ্রুপফি টুগেদার।’
মাত্তর পনেরো-কুড়ি সেকেন্ডের ব্যাপার। একটু অবাক হলেও, পলাশভাই হয়তো খেয়ালই করেননি। কিন্তু ভদ্রমহিলা অন্যদিকে চলে যাওয়ার পর কালকেতুর মনে হয়েছিল, ওঁর নিরাপত্তা বলয়টা আরও বড়। আরও কয়েকজন ওঁকে ঘিরে আছেন। তবে বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই। উনি নিশ্চয়ই কোনও ভিভিআইপি হবেন।
রেস্তোরাঁর ভিতর অবশ্য উনি এখন একাই বসে। আশপাশের চার-পাঁচটা সিট ফাঁকা। বডিগার্ডদের কেউ বোধহয় ওঁর জন্য খাবার আনতে গেছেন। ভদ্রমহিলার সঙ্গে একবার কালকেতুর চোখাচোখি হল। কিন্তু উনি চিনতে পারলেন বলে কালকেতুর মনে হল না। একটু পরে পলাশভাই এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী খাইবেন, কন কাইলকেতুভাই? ইন্ডিয়ান ছাড়া আর কিৎসু পাওয়া যাইব না। যদি মেক্সিকান অথবা কন্টিনেন্টাল খাইতে চান, তাইলে হোটেলে ফিইরা যাইতে অইব।’
সকালে ক্লিভল্যান্ড থেকে আসার সময় কোনও একটা রেস্ট এরিয়ায় মেক্সিকান ফুড খাইয়েছিলেন পলাশভাই। নাচোস, টাকো… কালকেতুর মন্দ লাগেনি। ক্লিভল্যান্ড শহরে ইতিমধ্যেই বার তিনেক কন্টিনেন্টাল খাওয়া হয়ে গেছে ওর। মন প্রাণ ভাত-ডাল চাইছে। ও তাই বলল, ‘আজ ইন্দো-বাংলা টেস্ট করা যাক।’
পলাশভাই বললেন, ‘ইন্দো-বাংলা পাইবেন কোথায়? এহানে পঞ্জাবি ফুড-এর থালি। তবে সব ভেজ আইটেম। ব্যুফের ব্যবস্থা আসে। দেরহাদুন চালের ভাত, ডাল মাখনি, ভাজি, পালক পনির, ডিমের ঝোল, গোলাপ জামুন আর কাস্টার্ড। আপনে বসেন। আমি গিয়া নিয়া আসি।’
বলার ভঙ্গি দেখে মনে হল, আইটেমগুলো পলাশভাইয়ের খুব পছন্দ হয়নি। একটু অসন্তুষ্ট মুখেই উনি থালি আনতে গেলেন। তখনই কালকেতুর চোখে পড়ল, ভিভিআইপি মহিলার টেবলে আরও একজন মহিলা এসে হাজির হয়েছেন। দু’জনে নিচুগলায় কথা বলছেন। আর মাঝে মাঝে লস্যির গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন। একটা ব্যাপার লক্ষ করে কালকেতু চমকে উঠল, ভিভিআইপি মহিলার পরনে এখন আকাশ-নীল রঙের লেডিস স্যুট। টুপির রঙও বদলে গেছে। চকোলেট রঙের বদলে সাদা টুপি। অবাক কাণ্ড, ওঁর পরনের আগের পোশাক অর্থাৎ ঘিয়ে রঙের স্যুট, এখন পাশের মহিলার গায়ে। ওঁরা কি পোশাক বদলাবদলি করে নিয়েছেন? কখন করলেন?
অপরাধ জগতের খোঁজ খবর রাখে বলে কালকেতুর মনে হল, নিরাপত্তার কারণেই এই পোশাক বদলের ছক। হাই প্রোফাইল রাষ্ট্রনায়কদের জন্য ডামি-র ব্যবস্থা থাকেই। কিন্তু এই ভিভিআইপি মহিলা আসলে কে? উনি কি উগ্রপন্থীদের হিট লিস্টে আছেন? না হলে আমেরিকার মতো জায়গায় ওঁর জন্য এত সিকিউরিটির ব্যবস্থা থাকবে কেন? মনে মনে কালকেতু ঠিক করে নিল, ভদ্রমহিলার ছবি ওর মোবাইলে আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় একবার খোঁজ করে দেখতে হবে, কোনও পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায় কি না?
আধঘণ্টা পর খাওয়া শেষ করে কালকেতু যখন রেস্তোরাঁর বাইরে এসে দাঁড়াল, তখন হু হু করে বাতাস বইছে। পলাশভাই পার্কোম্যাট থেকে গাড়ি আনতে গেছেন। গায়ে জ্যাকেট, মাথায় হুডি চাপিয়ে কালকেতু আয়েস করে সিগারেট ধরাল। তখনই ওর চোখে পড়ল, ঠান্ডার প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য রেস্তোরাঁর দুই ভদ্রমহিলা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। কালকেতুর কানে এল, ভিভিআইপি মহিলা বলছেন, ‘খুব শিগগির আমাগো একটা ডিসিশনে আইসতে অইব। অগো জানাইয়া দ্যান, য্যান ভায়েলেন্সে জড়াইয়া না পড়ে।’ কথাগুলো শুনে কালকেতু চমকে উঠল। ভদ্রমহিলা বাংলায় কথা বলছেন! তা হলে কি উনি বাংলাদেশি! নিশ্চিত হওয়ার জন্য ও আরও দু’পা এগিয়ে গেল।
এ দিকে, রাস্তার বাঁকের মুখে একটা কালো মার্সিডিজ রেস্তোরাঁর দিকে টার্ন নিয়েছে। কালকেতু দেখতে পেল, ড্রাইভারের দরজার কাচ ধীরে ধীরে নেমে আসছে। ড্রাইভারের মুখে ভূতের মুখোশ। আর ক’দিন পরেই আমেরিকায় হ্যালোইন উৎসব। ভূত বা মৃত প্রিয়জনকে স্মরণ করার দিন। লোকে ভূতের মুখোশ, প্রেতাত্মার পোশাক পরে অন্যদের ভয় দেখায়, মজা করে। কালকেতুর সে রকমই কিছু মনে হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ ও লক্ষ করল, স্টিয়ারিংয়ের উপর রাখা ড্রাইভারের ডান হাতের পাশ দিয়ে আরেকটা হাত উঠে আসছে। সেই হাতে ধরা একটা পিস্তল। জানলার কাচ ধীরে ধীরে নিচে নামছে। পলকেই কালকেতু বুঝতে পারল, নলটা কার দিকে তাক করা হতে পারে।
গাড়ির জানলাটা পুরো খোলার আগেই এক ঝটকায় ভিভিআইপি মহিলাকে ও নিজের দিকে টেনে আনল। সঙ্গে সঙ্গে রেস্তোরাঁর জানলার কাচ বিরাট শব্দে ভেঙে পড়ল। তা হলে ওর ধারণাই ঠিক। ভূতের মুখোশ পরা লোকটা ভদ্রমহিলাকেই লক্ষ করেই গুলি চালিয়েছে! চলন্ত গাড়ি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফের গুলির শব্দ। অন্য ভদ্রমহিলা চওড়া ফুটপাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। রক্তে ফুটপাত ভিজে যাচ্ছে। স্পিড বাড়িয়ে গাড়িটা অন্ধকারে উধাও হয়ে গেল। কালকেতু স্পষ্ট শুনতে পেল, গাড়ির ভিতর থেকে কেউ বা কারা অজানা ভাষায় স্লোগান দিচ্ছে।
ওর দু’হাতের মধ্যে ভিভিআইপি মহিলা তখন থরথর করে কাঁপছেন। রেস্তোরাঁ থেকে হুড়োহুড়ি করে ট্যুরিস্টরা সবাই বেরিয়ে এসেছেন। কোনও রকমে তাঁদের ভিড় কাটিয়ে ভদ্রমহিলাকে পাঁজকোলা করে তুলে নিয়ে কালকেতু রেস্তোরাঁর ভিতরে ঢুকে এল। ভদ্রমহিলার মাথা থেকে টুপি খুলে গেছে। সেইসঙ্গে সোনালি রঙের পরচুলাও। ওঁর হ্যান্ডব্যাগটা বাইরে কোথাও পড়ে গেছিল। কেউ একজন তুলে এনে ওঁর হাতে দিলেন। চোখ বুঁজে ভদ্রমহিলা বিড়বিড় করে কী যেন বলছিলেন। ওঁকে চেয়ারে বসিয়ে দেওয়ার পর কেউ একজন জলের বোতল এগিয়ে দিতেই, এক ঢোঁক গলায় দিয়ে, উনি মোলায়ম স্বরে কালকেতুকে বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ মাই সন। ইউ হ্যাভ সেভড মাই লাইফ।’
