জিহাদি – ২৫

(পঁচিশ)

গতকাল রাতে সিএনএন চ্যানেলে একটা টক শো দেখার পর, কালকেতুর ইচ্ছে হয়েছিল, লিলি গডউইনের সঙ্গে একবার দেখা করতেই হবে। ব্রেকিং নিউজের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ওর চোখ আটকে গেছিল। ‘অ্যাডামসের আমলে আরেক কেলেঙ্কারি।’ ‘লিলি গডউইনের বিরুদ্ধে বিরাট অভিযোগ।’ লিলি গডউইনের নামটা দেখে ও চমকে উঠেছিল। ‘নায়গারায় টেররিস্ট হামলার খবর চেপে দেওয়ার অভিযোগ।’ ‘ঘটনার জের বাংলাদেশেও।’ ‘ওই হামলায় মৃত এক বাংলাদেশের সমাজসেবী মহিলা।’ ‘তাঁর চিকিৎসায় গুরুতর গাফিলতির অভিযোগ।’ ‘বাফেলোর মেডিক্যাল হাসপাতালের বিরুদ্ধে।’ একের পর এক খবর পর্দায় ভেসে উঠছে। এক পাশে লিলি গডউইনের মুখ।

প্যানেলে বসেছেন দুই বিশেষজ্ঞ। তাঁদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, একজন ডেমোক্রাট, অন্যজন রিপাবলিকান। লিলি গডউইন এবং তাঁর চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন সম্পর্কে যা তা বলে যাচ্ছেন ডেমোক্রাট ভদ্রলোক। অন্যদিকে, রিপাবলিকান দলের আইনজীবী মহিলা লিলিকে সমর্থন করে নানা যুক্তি দিচ্ছেন। দু’জনে খানিকক্ষণ পর একমত হয়ে গেলেন, হামলার ঘটনা চেপে দিয়ে এফবিআই অন্যায় করেছে। অফিসার জন মিকেল এবং বাফেলোর শেরিফকে শো কজ করা উচিত। এর পরই পর্দায় ভেসে উঠল এলসা গিনেসবেরির মুখ। লিলি গডউইনের হয়ে উনি অনেক ভাল ভাল কথা বলতে লাগলেন। কয়েকদিন আগে কালকেতু এই ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলার জন্যই গোথেনবার্গে মেল করেছিল।

যে প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা চলছে, তার পুরোটাই কালকেতুর চোখের সামনে ঘটেছে। লিলি গডউইনের মতো একজন সম্ভ্রান্ত সমাজসেবী মহিলা, এই রকম একটা রাজনৈতিক তরজায় জড়িয়ে গেলেন, ভেবেই ওর অস্বস্তি হচ্ছিল। ওর আরও খারাপ লেগেছিল শুনে, অ্যাঙ্কর যখন বললেন, ‘মিস গডউইন এই মুহূর্তে অসুস্থ। চারদিন আগে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে তাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়নি।’ মুহূর্তে ওর চোখের সামনে করুণাময়ী একটা মুখ ভেসে উঠেছিল। নায়গারায় গাড়িতে ওঠার আগে যিনি বলছেন, ‘ইউ হ্যাভ সেভড মাই লাইফ, সান।’ তখনই কালকেতু ঠিক করে নিয়েছিল, ও হাসপাতালে লিলি গডউইনের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। উনি চাইলে সিএনএন-এ গিয়ে সত্যি কথা বলতেও ও রাজি।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করে দিয়েছিলেন মি. বাম কিম। ঠিক বেলা বারোটার সময়। হাসপাতালের এক্সিট গেটের সামনে কালো রঙের একটা লিমুজিন এসে দাঁড়াল। সঙ্গেসঙ্গে বাম কিমের ফোন, ‘নেমে আসুন। আমার গাড়িটা আপনার ঠিক সামনেই। আমাকে ফলো করে যান।’

লিমুজিন থেকে ছোট্টখাট্টো চেহারার এক ভদ্রলোক বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। মঙ্গোলিয়ান টাইপের মুখ। গুগল সার্চ করে কালকেতু কাল রাতেই জানতে পেরেছে, বাম কিম দক্ষিণ কোরিয়ান। চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের একজন বোর্ড মেম্বার। বহু বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। মিস গডউইনের খুব আস্থাভাজন। হাসপাতাল বিল্ডিংয়ের ভিতর ঢোকার পর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘মিস গডউইন কেমন আছেন এখন?’

বাম কিম বললেন, ‘মিডিয়া যেভাবে পিছনে লেগেছে, তাতে ভাল থাকবেন কী করে? আমাদের দেশে মিডিয়াকে বড্ড বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়ে গেছে। থাক সে কথা। চলুন, ম্যাডামের কেবিনে।’

কেবিনে ঢুকে কালকেতুর মনে হল, ও হোটেলের কোনও সুইটে এসেছে। লিলি গডউইন সোফার এককোণে বসে আছেন। তাঁর পাশে যিনি, তাঁকে ও আশাই করেনি। এলসা গিনেসবেরি। আরে, এই তো ঘণ্টা তিনেক আগে ভদ্রমহিলাকে ও টিভিতে দেখে এল। এর মধ্যেই গোথেনবার্গ থেকে উনি নিউ ইয়র্কে চলে এসেছেন! এলসা বেশ বয়স্ক, গলার কাছের চামড়াগুলো কুঁচকে গিয়েছে। তবুও ওঁর সৌন্দর্যে ঘাটতি পড়েনি। মাতৃময়ী মুখ, এইরকম এক নার্সের শুশ্রূষা পেলে রোগী এমনিতেই ভাল হয়ে যাওয়ার কথা। কালকেতু মনে মনে ছকে নিল, সুযোগটা ছাড়বে না। ভদ্রমহিলা কাফি বীরকে পাত্তা দেননি। কিন্তু ও খানিকক্ষণ কথা বলবেই। যতই ভদ্রমহিলা ওকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন না কেন।

কেবিনে ঢোকা মাত্রই লিলি গডউইনের মুখে মিষ্টি হাসি দেখতে পেল কালকেতু। তার মানে, ভদ্রমহিলা ওকে ভোলেননি। ফুলের তোড়াটা ও এগিয়ে দিতেই উনি সাগ্রহে নিলেন। ঘরে সোফায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও কয়েকজন বসে আছেন। একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোক এবং আরও দু’জন মহিলা। একজনকে ওর এশিয়ান অরিজিন বলে মনে হল। বাম কিম ওকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর একে একে সবাই উঠে এসে হ্যান্ডশেক করে গেলেন। আন্দ্রিয়াস অ্যান্ডারসন ও সাশা ও’নীল। এলসা গিনেসবেরির বোনপো আর লিলি গডউইনের বোন। এশিয়ান অরিজিন বলে যাকে মনে হয়েছিল, তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিক, রেজওয়ানা। পরিচয় পর্বের শেষে কালকেতু এগিয়ে গিয়ে এলসার সামনে দাঁড়াতেই উনি হাতজোড় করে বললেন, ‘নমস্কার। আপনার নামটা কোথাও দেখেছি বলে মনে হচ্ছে?’

নমস্কার কথাটা শুনে কালকেতু মজা পেল। মুক্তিযুদ্ধের সময় এলসা গিনেসবেরি দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ছিলেন। ওখানেই হয়তো নমস্কার কথাটা শুনে থাকবেন। সুযোগ পেয়ে ও বলল, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম, আপনাকে আমি একটা মেল পাঠিয়েছিলাম।’

এলসা ম্যাডাম বললেন, ‘ইয়েস। এবার আমার মনে পড়েছে। কিন্তু লিলির অসুস্থতার খবরে এমন দুঃশ্চিন্তায় ছিলাম যে, আপনাকে উত্তর দিতে পারিনি। ঠিক আছে, লিলি একটু পরেই চেক আপের জন্য নিচে যাবে। তখন আমরা কথা বলে নেব।’

লিলি এইসময় রেজওয়ানাকে বললেন, ‘নায়গারায় সেদিন কী হয়েছিল, এই জেন্টেলম্যান তার সাক্ষী। তুমি এর সঙ্গে কথা বললেই সব বুঝতে পারবে। হ্যাঁ, কালকেতু এখন বলো, কেন আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছিলে? আমি তোমাকে অনেক আগেই এক্সপেক্ট করেছিলাম।’

লিলি এমন নিষ্পাপ দৃষ্টিতে তাকালেন, কালকেতুর সব গুলিয়ে গেল। ও বলল, ‘ম্যাডাম, আপনার নামে টিভিতে কুৎসা আমার সহ্য হচ্ছিল না। নায়গারায় হামলা তো আপনি করাননি। উল্টে আমি যা দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে, টেররিস্টদের টার্গেট ছিলেন আপনি। মিডিয়া আপনাকে দোষারোপ করছে কেন?’

আন্দ্রিয়াস বললেন, ‘এই কথাগুলো আপনি টিভি চ্যানেলে বলতে পারবেন?’

কালকেতু বলল, ‘কেন পারব না? সেই ব্যাপারে মিস গডউইনের পার্মিশন নিতেই তো এসেছি। সেদিন যা ঘটেছিল, আমি বলতে চাই।’

লিলি বললেন, ‘থাক। তুমি না জড়ালেই ভাল করবে। আমি জানি, তোমার উপর একবার অ্যাটাক হয়ে গেছে। আমার জন্য তুমি আবার বিপদে পড়ো, আমি চাই না। অন্য কোনও প্রয়োজন থাকলে আমাকে বলতে পারো।’

চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার খোলার জন্য পলাশভাই একবার ওঁর কাছে যেতে চান সুপারিশের চিঠি নিতে। কথাটা মনে পড়া সত্ত্বেও, কালকেতু বলতে পারল না। ওই অনুরোধটা করার জায়গা হাসপাতাল নয়। ও বলল, ‘একটা অনুরোধ নিয়ে হয়তো পরে আপনার কাছে যেতে পারি। আগে আপনি সুস্থ হয়ে নিন।’

‘তা হলে বাম কিমের সঙ্গে তুমি যোগাযোগ রেখো।’

কথা বলেই লিলি একবার ঘড়ির দিকে তাকালেন। তার পর পাশ ফিরে এলসা ম্যাডামকে বললেন, ‘ডা. কিংসফোর্ড বলছেন, লেজার ট্রিটমেন্ট অন্তত বার পাঁচেক নিতে হবে। আজই শুরু করতে চান।’

এলসা ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোর্স শেষ হতে কতদিন লাগবে?’

‘দিন দশেক মনে হয়। আমি চাইব, আরও তাড়াতাড়ি যাতে শেষ হয়। চ্যারিটি শো-র বেশিদিন বাকি নেই। আমি রোগ নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। শো নিয়ে অ্যান্ডি আমাকে কয়েকটা প্রস্তাব দিয়েছে। আপনিও হয়তো জানেন সেকথা।’

‘শুনেছি, শো-টা ও লাস ভেগাসে নিয়ে যেতে চায়। মন্দ কী? আমাদের অনেক খরচ বেঁচে যাবে।’

‘তা হলে তো খুব ভাল হয়।’ শুনেই বলে উঠলেন লিলি ম্যাডামের বোন সাশা ও’নীল। এতক্ষণ চুপ করে কথা শুনছিলেন। এ বার বললেন, ‘শো-তে এ বার কাকে নিয়ে আসছ তোমরা?’

‘অ্যান্ডি চায়, রিহান্না ফেন্টিকে দিয়ে গান গাওয়াতে।’

সাশা বললেন, ‘আমিও ওর নামটাই বলতে যাচ্ছিলাম।’

‘কে এই মেয়েটা? আগে তো কখনও নাম শুনিনি?’ এলসা ম্যাডাম জানতে চাইলেন।

‘আমার ছেলেমেয়েরা তো সারাদিন ওর গান শুনছে। এখন আমেরিকার নাম্বার ওয়ান সিঙ্গার গ্র্যান্ডমা। বার্বাডোজের মেয়ে। একটা সময় ডামি সিঙ্গার ছিল। কিন্তু এখন ওর একেকটা অ্যালবাম মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। ব্রিটনি স্পিয়ার্সরা অনেক পিছনে চলে গেছে। আমি তোমাকে বলছি দিদি, রিহান্নাকে যদি আনতে পারো, তা হলে তোমার চ্যারিটি শো মারাত্মক হিট হয়ে যাবে। ওর সঙ্গে তোমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কথা বলে নিও।’

‘কেন, এত তাড়াহুড়োর কী আছে?’

‘গসিপ কলামে দেখলাম, রিহান্না না কি এক সৌদি প্রিন্সকে বিয়ে করছে। তার নাম হাসান জামাল। রিহান্নাকে না কি সে এক মিলিয়নের একটা ডায়মন্ড রিং উপহার দিয়েছে। দেখো, তোমাদের শো-এর ডেট যেন ওর বিয়ের সঙ্গে ক্ল্যাশ না করে।’

সাশার আগ্রহ দেখে লিলি, এলসা ম্যাডাম, আর আন্দ্রিয়াস হাসতে লাগলেন। বাম কিমের সঙ্গে সেই মুহূর্তে লিলির চোখের ইশারায় কী যেন কথা হয়ে গেল। তার পরই লিলি ম্যাডাম বললেন, ‘এবার আমি উঠি। ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।’

মিনিট দুয়েকের মধ্যে ঘর ফাঁকা হয়ে গেল। এলসা ম্যাডামের মুখোমুখি বসে কালকেতু। ম্যাডাম ওকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার মেল আমি মন দিয়ে পড়েছি। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না, তুমি সেই মেয়েটার খোঁজ করছ কেন?’

পলাশভাইয়ের ইচ্ছের কথা জানিয়ে কালকেতু বলল, ‘আর কিছুই না। বাংলাদেশি এক ভদ্রলোক তাঁর দিদিকে ফিরে পেতে চান। আপনি কি জানেন, তিনি কোথায়?’

এলসা ম্যাডাম বললেন, ‘বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ারের সময় আমরা বেশ কয়েকটা বাচ্চা মেয়ের ট্রিটমেন্ট করেছিলাম। সব ক’টাই বার্ন কেস। কিন্তু তুমি যাকে খুঁজছ, সে এদের মধ্যে ছিল কি না, আমার পক্ষে এখন বলা সম্ভব নয়। প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল।’

প্রথম উত্তরটা শুনে কালকেতু বুঝে গেল, এলসা ম্যাডাম ঠিকঠাক উত্তর দেবেন না। ও বলল, ‘ম্যাডাম, আমি সেই মেয়েটার কথা জানতে চাইছি, যার ছবি নিউ ইয়র্ক টাইমসে বেরিয়েছিল।’

এলসা ম্যাডাম বললেন, ‘ওহ, তুমি বেবির কথা জানতে চাইছ? হ্যাঁ, মনে পড়ছে, একটা সময় ওর প্রাণের ভয় ছিল। ওর ছবি কাগজে বেরনোর পর পাকিস্তানের খুব বদনাম হয়ে গেছিল। সারা বিশ্বের মানুষ ধিক্কার জানাচ্ছিল। পাক গুপ্তচররা চায়নি, মেয়েটা বেঁচে থাকুক। হাসপাতালের বার্ন ওয়ার্ডে ইন্ডিয়ান আর্মি ওকে আগলে রেখেছিল। সেইসময় কী অসম্ভব যন্ত্রণা যে মেয়েটা সহ্য করেছে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন।’

‘মেয়েটিকে আপনি গোথেনবার্গে নিয়ে গেছিলেন, তাই না?’

‘আরে না, না। বেবি মেয়েটা তো মাসখানেকের মধ্যেই মারা গেছিল। বেটার ট্রিটমেন্টের জন্য আমি যে বাচ্চাকে গোথেনবার্গ নিয়ে গেছিলাম, তার নাম ছিল রোশনি।’

বাধা দিয়ে কালকেতু বলল, ‘আপনি নিশ্চিত যে, মেয়েটার নাম ছিল রোশনি। শিউলি নয়?’

‘হান্ড্রেড পার্সেন্ট… রোশনি। মেয়েটা ট্রমা থেকে ফিরে আসতেই সময় নেয় প্রায় মাসআটেক। অনেকেই ওর ট্রিটমেন্টের দায়িত্ব নেবেন বলেছিলেন। কিন্তু কেউ কথা রাখেননি। আমরা রেড ক্রসের লোকেরা বাংলাদেশ থেকে চলে আসছিলাম। মেয়েটির উপর আমাদের সবার মায়া পড়ে গিয়েছিল। ওকে ঢাকায় ফেলে রাখতে আমাদের মন চাইছিল না। সেইসময় বিশ্বের অন্যতম সেরা ডার্মাটোলজিস্ট ডা. গডউইন গোথেনবার্গে ক্লিনিক চালাতেন। তাই তখন আমিই উৎসাহ দেখিয়ে রোশনিকে ডা. গডউইনের কাছে নিয়ে যাই।’

‘রোশনি এখন কেমন আছেন?’

‘শুনেছি, ওর পিঠের ক্ষত এখনও পুরো সারেনি। পেন কিলার খেয়ে ওকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। তাই বলে জীবনযুদ্ধে ও হার মানেনি। ঈশ্বর ওকে দিয়ে অনেক মহৎ কাজ করিয়ে নিচ্ছেন।’

‘উনি কোথায়, সেটা কি বলা যেতে পারে?’

‘প্লিজ জানতে চাইবেন না। আর্লি লাইফ নিয়ে ওর মাথাব্যথা নেই। সেসব ওর স্মৃতি থেকে মুছেও গেছে। ও কোন পরিবারের মেয়ে, কোন দেশের সঙ্গে ওর শিকড় বাঁধা… এখন ওর কাছে সব অর্থহীন। সারা বিশ্ব জুড়েই ওর পরিবার। এটুকু আপনাকে বলতে পারি, রোশনি নিজেও সঠিক জানে না, ওর অতীত কী? কেউ জিজ্ঞেস করলেও বলতে পারবে না।’

‘কিন্তু ওর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক যাদের, তারা তো ওর খোঁজ করবেনই।’

‘আশ্চর্য!’ এলসা ম্যাডাম বিরক্ত, ‘এতদিন তাঁরা কোথায় ছিলেন? কী এমন ঘটল, যাতে ওর খোঁজ পড়ল?’

‘ম্যাডাম, আমি সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আপনার কাছে এসেছি। পরিবারের লোকেরা মেয়েটিকে ফিরে পেতে চান। সেটা কি অন্যায়? এই তো কয়েক মাস আগে, দক্ষিণ কোরিয়ায় এক ছেলে তার মাকে উত্তর কোরিয়া থেকে খুঁজে পেলেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর। গৃহযুদ্ধের কারণে ছেলে আর মা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিলেন। এ রকম পুনর্মিলনের ঘটনা তো বিশ্বে কত ঘটছে।’

‘অস্বীকার করছি না।’ এলসা ম্যাডাম বললেন, ‘কিন্তু আমি কিছু বলতে পারব না। তার কারণ আইনের বেড়াজালে আমি বাঁধা। বলার ইচ্ছে ছিল না। তবুও বলছি, মেয়েটির জীবনী নিয়ে একটা ফিল্ম তৈরি হচ্ছে হলিউডে। প্রি প্রোডাকশনের কাজ অলমোস্ট মাঝপথে। প্রোডিউসার আমাকে চুক্তিপত্রে সই করিয়ে রেখেছেন, ছবিটা রিলিজ না হওয়া পর্যন্ত মেয়েটির আইডেন্টিটি প্রকাশ করতে পারব না। কথাটা আপনাকে বিশ্বাস করে বললাম। আশা করি, আপনি জানতে চাইবেন না, প্রোডিউসারটি কে? প্লিজ আমার হাতে আর সময় নেই। আমি উঠি। আমাকে গোথেনবার্গের প্লেন ধরতে হবে।’

আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। লিফটে করে নিচে নামার সময় কালকেতুর একটু রাগও হতে লাগল এলসা ম্যাডামের উপর। বাইরে থেকে মনে হয়, মাতৃময়ী। কিন্তু আসলে ধুরন্ধর মহিলা। একগাদা মিথ্যে কথা বলে গেলেন। কর্নেল মজুমদার বেবি বলে যে মেয়েটার কথা সেদিন বললেন, সে না কি একমাসের মধ্যে মারা গেছিল! তার জায়গায় রোশনি বলে একটা মেয়ের গল্প ফাঁদলেন এলসা ম্যাডাম। উনি হয়তো জানেন না, কাকে তিনি গোথেনবার্গে নিয়ে গেছিলেন, সে তথ্য ইন্টারপোল ইচ্ছে করলেই বের করে ফেলতে পারে। ওঁর কথামতো, যদি রোশনি বলে কেউ সত্যিই থাকে, তবে তার পরিচয়ই বা গোপন করার এত চেষ্টা কেন? চট করে আরও একটা প্রশ্ন কালকেতুর মাথায় এল। লিলি গডউইনের সঙ্গে এলসা ম্যাডামের সম্পর্ক নিয়ে। কথাবার্তা শুনে তো মনে হল, লিলি ম্যাডামকে উনি খুব স্নেহ করেন। এবং সম্পর্কটা বহুদিনের। ইস, কালকেতুর আফসোস হতে লাগল। কায়দা করে ওর জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, দু’জনের সম্পর্কের সূত্রপাতটা হয়েছিল কীভাবে?

এলসা ম্যাডাম হয়তো পরিষ্কার করে কিছু বলবেন না। উত্তরটা জানা যেতে পারে লিলি গডউইনের কাছ থেকে। কালকেতু ঠিক করে নিল, লিলি গডউইন সম্পর্কে আলাদা করে খোঁজখবর নেবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *