(আট)
ব্রুকলিন ব্রিজের ধারে একটা পাবলিক স্টোরেজ-এর পিছন দিকে গাড়ি থামিয়ে তৌফিক জিজ্ঞেস করল, ‘এখনও ব্লিডিং হচ্ছে?’
অস্ফুট স্বরে ইমন উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।’
ডান হাতের তালুতে মারাত্মক যন্ত্রণা। বাঁ হাত দিয়ে জায়গাটা ও চেপে ধরে আছে। চেলসির অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পালিয়ে আসার মাঝে প্রায় পনেরো মিনিট সময় কেটে গেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে এই সময়টায়। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করেছে ইমন। তবুও, মুখ ফুটে একটা আওয়াজও করেনি। জিহাদিরা ব্যথা বেদনার ঊর্ধে। ট্রেনিং ক্যাম্পে এই কথাটাই ওদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তৌফিক ড্রাইভারের সিট থেকে নেমে এসে ডান দিকের সামনের দরজাটা খুলে দিল। খামিসও পিছনের দরজা খুলে নেমে এল। ইমনকে বাইরে বেরিয়ে আসায় সাহায্য করতে করতে তৌফিক বলল, ‘ইস, সিটটা রক্তে ভেসে গেছে। চলো, তোমাকে বেসমেন্টে পৌঁছে দিয়ে আমাকে ফিরে আসতে হবে। রক্তের কোনও চিহ্ন যেন গাড়িতে না থাকে। আমেরিকান কুত্তাগুলোর হাতে যেন তোমার ব্লাড স্যাম্পল না পৌঁছয়।’
ব্রুকলিন ব্রিজ দিয়ে নদীর এ পারে আসার সময়ও নিউ ইয়র্কের স্কাইলাইন জ্বলজ্বল করছিল ইমনের চোখের সামনে। কত উঁচু উঁচু বাড়ি, তাতে কত আলোর বাহার! ওই বাড়িগুলোতে যারা থাকেন, সেই ইহুদি আর ইসাইরা চূড়ান্ত ভোগ বিলাসের মাঝে দিন কাটান। এমনটাই ওদের ধারণা দিয়েছেন, ট্রেনিং ক্যাম্পের মাতব্বররা। এই কাফেরদের জন্য আজ ইসলাম ধর্ম বিপন্ন। যেখানে সুযোগ পাবে, এঁদের সেখানে নিধন করাই তোমাদের একমাত্র কাজ হবে। সেই কাজটাই আজ করতে গেছিল ইমন আর খামিস। কিন্তু সফল হতে পারল কই? হাতে ক্ষত নিয়ে ফেরার যন্ত্রণা তো আছেই। পরের চ্যাপ্টারটা আরও ভয়ংকর হতে যাচ্ছে। ইমন জানে, ওর অবস্থা চিরাগের মতো হবে। ক্যাম্পে ফিরে গেলে কম্যান্ডাররা এর পর ওর সঙ্গেও নির্দয় ব্যবহার করবেন।
তৌফিকের সাহায্য নিয়ে চোরাকুঠুরিতে পৌঁছে ইমন সোফায় এলিয়ে পড়ল। ঘরের এক কোণে মেডিক্যাল বক্স আছে। ওকে নিজেকেই শ্রুশ্রষার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসার সময় চট করে ও ক্ষতস্থানে রুমাল জড়িয়ে নিয়েছিল। রুমালটা ভিজে চপচপ করছে রক্তে। রুমাল সরাতেই ওর চোখে পড়ল, ডান হাতের তালুর উল্টো দিকে বেশ বড় একটা ক্ষত। রক্ত দেখেই ওর মনে হঠাৎ হিংস্রভাব জেগে উঠল।
তৌফিক ক্ষত দেখে ‘ইয়াআল্লাহ’ বলে আঁতকে উঠেছে। ওর সামনে ইমন এমন কিছু করবে না, যাতে ছেলেটার মনে হয়, জিহাদি হওয়ার যোগ্যতা ওর নেই। কথাটা ভাবা মাত্রই ইমনের হাতের ব্যথা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সোফা ছেড়ে উঠে গিয়ে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে, গরম জল দিয়ে ক্ষতের জায়গাটা ভাল করে ধুয়ে ফেলল ও। সিদ্ধান্ত নিতে সামান্য ভুল। আর তার জন্য এই চোট। প্ল্যান ছিল, চেলসির ওই অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে খামিস লিফটের দিকটায় গার্ড দেবে। আর ও নক করে দরজা খোলাবে। দরজায় নক করতে হবে এই কারণে যে, নন্দী বলে লোকটার যেন মনে হয়, বিল্ডিংয়েরই কেউ ভূত সেজে মজা করতে এসেছে। আর দরজা খোলা পেলেই ইমন ঘরের ভিতরে ঢুকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ইন্ডিয়ান কাফেরটাকে গুলি করে বেরিয়ে আসবে।
কিন্তু ওইসময় কী যে হল? বারচারেক নক করার পরও কেউ দরজা খুলল না। তখন ওর উচিত ছিল, আরও দু’একটা মিনিট অপেক্ষা করা। কিন্তু খামিসের তাগাদায় অতি উৎসাহী হয়ে, নিজে দরজা খুলতে গিয়ে বিপদটা ও ডেকে আনল। ডান হাতের মাঝের আঙুলটা বেঁকে রয়েছে। সোজা করতে গেলেই চিড়িং চিড়িং করছে। ইমন বুঝতে পারল, চোটটা এমন জায়গায় হয়েছে, পিস্তল কেন, আগামী কয়েকটা দিন ও লোহার পিনও ধরতে পরবে না। মলম লাগানোর জন্য মেডিক্যাল বক্সের দিকে তাকাতেই ও শুনল, ‘ইমন, তোর হাতে ইনজুরি হল কী করে? দেখি, দেখি।’
বেসিনের আয়নায় ইমন দেখল, ওর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে চিরাগ। ও যে এতক্ষণ কুঠুরিতে ছিল, ইমন টেরই পায়নি। জিহাদি ক্যাম্পে একমাত্র ওরা দু’জন নিজেদের নাম ধরে কথা বলে। ইমনের ডান হাত টেনে চোটের গভীরতা দেখে চিরাগও আঁতকে উঠল। ঘরের অন্য কোণে গিয়ে ও মেডিক্যাল বাক্সটা নিয়ে এল। তার পর মলম খোঁজার ফাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর সঙ্গে খামিস যাচ্ছে শুনে সকালেই তোকে বলেছিলাম, সাবধান। কী করে চোট লাগল, বললি না তো? এত ডিপ কাট হল কী করে?’
বলতে বলতে চিরাগ মেডিক্যাল বাক্স থেকে হেকিমি মলম বের করে আনল। কাফেরদের তৈরি করা কোনও ওষুধ জিহাদিরা ব্যবহার করে না। সিরিয়ান হেকিমরা যে দাওয়াই দেন, সেটাই জিহাদিদের ব্যবহার করতে হয়। ক্যাম্পে ইমন দেখেছে, ভেষজ ওষুধগুলো খুব কার্যকরী। ক্ষতস্থানে চিরাগ মলম লাগিয়ে দেওয়ার সময় ওর জ্বালা জ্বালা করতে লাগল। তবুও মুখ বুঁজে সহ্য করে ও উত্তর দিল, ‘অ্যাকশনে পাঠানোর আগে হালারা ভাল কইর্যা খোঁজ খবর নেয় না। এমন অবস্থায় পড়সিলাম, ফিইর্যা আইসতে পারতাম না।’
‘কেন? কামাল শূয়ারটা ভুল ব্রিফিং দিয়েছিল না কি?’
‘ভুল-ভালা প্ল্যানিং। হালায়… আমরা গিয়া দেখি, হাইরাইজ বিল্ডিং। গ্রাউন্ড ফ্লোরের হলঘরে হ্যালোইন পার্টি শুরু হইসে। সব ফ্ল্যাটের লোক ভূত-প্রেতের কস্টিউম পইর্যা নিচে নাইম্যা আইসে। লিফটে কইর্যা অনবরত লোক নামতাসে আর উঠতাসে। আমাগোও অরা হলঘরে টানতাসিল। তখনই বুঝসিলাম, সাইলেন্টলি কাম সারন যাইব না। তাই পিস্তলে সাইলেন্সার লাগাইয়া রাখসিলাম। কিন্তু…’
‘কিন্তু ফ্ল্যাটে ঢোকার সুযোগই পাসনি বোধহয়?’
‘আরে না, দরজার লক খুইল্যা, ডাইন হাতে মাকারভ পিস্তলটা বাগাইয়া সবে ফ্ল্যাটে ঢুকত্যাসি, পুরা বডি ভিতরে দিবার আগেই হাতে আইস্যা লাগল কাঁচের বিরাট ফুলদানি। সঙ্গে সঙ্গে পিস্তলটা ছিটকা কুথায় য্যান চইল্যা গেল। ফিনকি দিয়া রক্ত। বিপদ বুইঝ্যা খামিস হাইত ধইর্যা দিল টান। কইল, লিফটের দিকে ছুট দে। ভাগ্যিস, কেউ আমাগো চেজ করে নাই। হালায় দরজায় যে আই হোল আসে, কামাল চুতমারানি তা কয় নাই। আই হোল দিয়া আমারে দেইখ্যা, ভিক্টিম আগেই অ্যালার্ট হইয়া গেসিল।’
ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে চিরাগ বলল, ‘তোর কপালে দুঃখ আছে ভাই। তোর এই চোট সারতে অনেক সময় নেবে। তার চেয়েও বড় কথা, তৌফিককে সকালবেলায় বলতে শুনলাম, কম্যান্ডার রববানি কাল নিউ ইয়র্কে আসছে। আমার মতো তোকেও কিন্তু রগড়াবে।’
সেটা যে বলার অপেক্ষা রাখে না, ইমন তা জানে। নিশ্চয়ই উনি এতক্ষণে জেনে গিয়েছেন মিশন সাকসেসফুল হয়নি। কোনও কথা না বলে ইমন ওর বিছানায় গিয়ে বসল। রববানিদের ধারণা, বাংলাদেশি আর ইন্ডিয়ানরা দুর্বলচিত্ত। ওঁদের চোখে কামাল আর খামিসরা অনেক বেশি সাহসী। তাই ওরা দু’জন যে সম্মানটা পায়, তা ইমন বা চিরাগদের কপালে জোটে না। কামাল নায়গারা থেকে ফিরে এসে পুরো দোষ চিরাগের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। অথচ কামাল ঠিকভাবে গাড়ি চালাতে পারলে চিরাগ ব্যর্থ হত না। কম্যান্ডার রববানির কাছে সরাসরি এই অভিযোগটা করলে উনি বিশ্বাসই করবেন না। উল্টে, ইরাকি-সিরিয়ানদের মতো লড়াকু জাতির বদনাম করার জন্য চিরাগের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
নিউ ইয়র্কে গত দু’দিন ধরে ভাল বৃষ্টি হয়েছে। এমনিতেই একটু ঠাণ্ডা। কিন্তু বেসমেন্টে চব্বিশ ঘণ্টা এ সি চালু থাকে বলে, ইমনের আরও শীত শীত করছে। উঠে গিয়ে হিটার চালু করে দেবে কি না যখন ও ভাবছে, তখনই হলঘরে ঢুকে এল তৌফিক। এর মধ্যেই ওর পোশাক বদলানো হয়ে গেছে। ওর হাতে পলিথিনের ব্যাগে খাবারের প্যাকেট। তাতে লেখা মিরচি। ব্রুকলিনে ব্রিজের ধারে মিরচি বলে একটা রেস্তোরাঁ আছে। তাতে পাকিস্তানি খাবার পাওয়া যায়। বিরিয়ানির গন্ধে ইমনের খিদে দু’গুণ বেড়ে গেল। খাবারের প্যাকেট ডাইনিং টেবলের উপর রেখে তৌফিক জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার হাতের ব্যথা কেমন বি টেন? ডাক্তার ডাকার দরকার আছে না কি?’
ইমন বলল, ‘না প্রয়োজন নাই। চিরাগ মলম লাগাইয়া দিসে।’
‘ভেরি গুড।’ কথাটা বলে মৃদু হেসে তৌফিক ব্যাগ থেকে অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের চারটে প্যাকেট বের করে আনল। তার পর জিজ্ঞেস করল, ‘খামিস কোথায়? এখনও আসেনি?’
চিরাগ বলল, ‘না। ওকে গেটের দিকে যেতে দেখলাম।’
‘ছেলেটা খুব মিস্টিরিয়াস টাইপের। কামাল আর ও দুটোই শয়তান। ওদের তোমরা বিশ্বাস কোরো না।’
কথাটা শুনে ইমন একবার চিরাগের মুখের দিকে তাকাল। চোখের ইশারায় চিরাগ বলল, মুখ খুলিস না।
অ্যালুমনিয়াম ফয়েলের দুটো প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে তৌফিক বলল, ‘বিরিয়ানি এনেছি। চট করে খেয়ে নাও দোস্ত। এরপর কতদিন তোমাদের কপালে ঠিকমতো খাওয়া জুটবে না, কে জানে?’
তৌফিক নিজেও ডাইনিং চেয়ারে বসে পড়েছে। ওদের ঘরে আগে টেবল বা চেয়ার কিছুই ছিল না। স্টোরেজে কেউ হয়তো গচ্ছিত রেখে গেছে কিছু দিনের জন্য। সেই মালিকের অজান্তে তৌফিক তা নামিয়ে এনেছে। জিহাদিদের সুখ-স্বাচ্ছন্দের দিকে ওর খুব নজর। তিনটে ফয়েলের প্যাকেট টেবলে সাজিয়ে তৌফিক ডাকল, ‘মিরচির বিরিয়ানি খুব নামকরা। তোমাদের মনে হবে, মায়ের হাতের রান্না খাচ্ছ।’
ইমন ডান হাত দিয়ে খেতে পারবে না। কিচেন থেকে একটা বড় চামচ নিয়ে এসে চিরাগ বলল, ‘কী রে, বাঁ হাতে খেতে পারবি, না কি তোকে খাইয়ে দেব?’
ইমন গম্ভীর হয়ে বলল, ‘দরকার নেই।’
প্রথম চামচ মুখে দিয়েই ইমনের মনে হল, এমন সুস্বাদু বিরিয়ানি মায়ের হাতেও কোনওদিন খায়নি। ওদের আমোদপুরে সবথেকে ভাল বিরিয়ানি রাঁধত সিরাজচাচা। কারও বাড়িতে নিকাহ বা অন্য কোনও অনুষ্ঠান হলে আগে সিরাজচাচার ডাক পড়ত। বিরিয়ানি খেতে খেতে ইমন হাতের ব্যথা, অ্যাকশনে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার আক্ষেপ, কম্যান্ডার রববানির রক্তচক্ষু, শাস্তির আশঙ্কা… সব ভুলে গেল। চিরাগ আর তৌফিক নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ইমন চুপচাপ শুনতে লাগল। কামালের খুব নিন্দে করছে তৌফিক। দু’তিনদিন আগে মিরচির এই বিরিয়ানি না কি কামাল ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিল, এই খাবার কুত্তারাও খাবে না। রাত বারোটার সময় কুড়ি মাইল ড্রাইভ করে গিয়ে ওকে কামালের পছন্দমতো খাবার নিয়ে আসতে হয়েছিল। তৌফিক বলল, ‘দোস্ত, লোকটার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল, ক্যাম্পে রোজ ফাইভ স্টার হোটেল থেকে ওর জন্য খাবার আসে। আপদটা বিদেয় হয়েছে, এর থেকে ভাল আর কিছু হয় না।’
জিহাদিদের সম্পর্কে প্রচুর কৌতূহল তৌফিকের। রাতের দিকে ও বেসমেন্টে এলে জিহাদিদের জীবন নিয়ে গল্প শুনতে চায়। আমেরিকানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা আগ্রহভরে শোনে। কথায় কথায় তৌফিক একবার বলেছিল, গত কুড়ি বছর ও আমেরিকায় আছে বটে, কিন্তু দেশটাকে ও একেবারেই পছন্দ করে না। সাদ্দাম হুসেনের খুন, টিভিতে দেখার পর থেকেই না কি আমেরিকানদের উপর ওর রাগ আরও বেড়েছে। আমেরিকানদের কোনও ক্ষতি হলে ও খুব আনন্দ পায়। আবেদন করা সত্ত্বেও, এখনও ওকে গ্রিন কার্ড দেওয়া হয়নি। তার একমাত্র কারণ, ও মুসলমান। জিহাদিদের দেখাশুনো করতে করতে একবার না কি তৌফিকের মনেও হয়েছিল, ধর্মরক্ষার যুদ্ধে নেমে পড়বে। কিন্তু কামালের মতো কয়েকজন জিহাদিকে দেখে ওর ধারণা হয়েছে, এরা মানুষ নয়, পিশাচ। তাই সভয়ে পিছিয়ে যায়।
মন খুলে কথা বলছে তৌফিক। ওকে দেখে এতদিন ইমনের মনে হত, আরব দেশের কেউ। কিন্তু এই প্রথম ও বলল, ওরা পাকিস্তানি। ওদের আসল বাড়ি লাহোরে। ওর বাবা নিউ ইয়র্কে ট্যাক্সি চালাতেন। ওর যখন চার বছর বয়স, তখন লাহোর থেকে উনি পুরো পরিবারকে এখানে নিয়ে আসেন। তৌফিক অস্টিন ইউনিভার্সিটি থেকে বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ডিগ্রি নিয়েছে। আগে ও একটা ফার্নিচার কোম্পানিতে কাজ করত। কিন্তু এই স্টোরেজে চাকরি পাওয়ার পর সেই কাজ ছেড়ে দেয়। এখন মালিকের খুব বিশ্বস্ত। ওর কথা শুনতে শুনতে ইমন এইবার বুঝতে পারল, ছেলেটা শুরু থেকেই ওদের প্রতি এত সিমপ্যাথেটিক কেন। আফটার অল, একই সাবকন্টিনেন্টের মানুষ তো।
পাকিস্তান দেশটাকেও তৌফিক ঘেন্না করে। বলল, জীবনেও ওই দেশে আর ফিরে যাবে না। পাকিস্তানের দু’মুখো নীতি ও সহ্য করতে পারে না। জিহাদিদের লুকিয়ে সাহায্য করব, আবার আমেরিকানদের কাছে ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে দাঁড়াব, এ কেমন কথা! ইমন বাংলাদেশি শুনে তৌফিক বলেই ফেলল, ‘তোমরা ঠিকই করেছিলে, পাকিস্তানিদের লাথি মেরে তাড়িয়ে।’ শুনে ইমন মনে মনে হাসল। আজ পর্যন্ত এমন একজন পাকিস্তানিকে ও পায়নি, যে বলেছে,বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে তোমরা ভাল করেছ! মাত্তর কয়েকদিনের আলাপ। তবুও তৌফিক যে ওদের জন্য খাবার এনেছে, সেজন্য ইমন নীরবে কৃতজ্ঞতা জানাল।
তৌফিক একটু আগে একটা খাঁটি কথা বলে ফেলেছে। খামিস আর কামালকে তোরা বিশ্বাস করিস না। ওদের সম্পর্কে চিরাগই প্রথম সন্দেহটা করে, নায়গারা থেকে ফিরে আসার পর। কিন্তু খামিস আজ ওর সঙ্গে যা করল, তাতে সন্দেহটা বিশ্বাসে গিয়ে দাঁড়াল। বিরিয়ানি খেতে খেতে ইমনের মনে পড়ল, নক করার পরও যখন অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খুলছিল না, তখন খামিসই ওর মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। ও তাগাদা দিচ্ছিল, ‘লকটা ভেঙে ফেলছিস না কেন জানোয়ার? লিফটে করে কেউ এই ফ্লোরে উঠে এলে তোকে তো বেঘোরে জান দিতে হবেই, আমিও বেঁচে ফিরব না। যা করার তাড়াতাড়ি কর।’ খামিসের কথায় বেশি অ্যাগ্রেসিভ হতে যাওয়াটাই ইমনের কাল হল। এখন মনে হচ্ছে, খামিস ইচ্ছে করেই তখন প্যানিক তৈরি করেছিল। যাতে কাজটা ও করে আসতে না পারে।
…বিরিয়ানি খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার আগে তৌফিক ওর বালিশের তলায় কী যেন গুঁজে দিয়ে গেল। মুখ ধুয়ে এসে বালিশ উল্টে ইমন দেখে, মোবাইল ফোন। জিহাদিদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক আছে। ইন্টারপোলেরও সাধ্য নেই, আঁড়ি পেতে কাউকে ধরা। বাড়ির লোকেদের সঙ্গে ওরা যাতে কথা বলতে পারে, তার জন্য কোনও কোনওদিন তৌফিক ফোন ধার দিয়ে যায়। সাবধান করে দিয়ে যায়, ফোন দিয়ে যাওয়ার কথা যেন কম্যান্ডাররা জানতে না পারেন। ওদের হাতে মোবাইল ফোন দেখলে কম্যান্ডাররা মারাত্মক চটে যাবেন। কম্যান্ডাররা বলেন, জিহাদিদের নিজেদের পরিবার বলে কিছু থাকতে নেই। ক্যাম্পে ঢোকার পরই ওদের বলে দেওয়া হয়েছে, বাড়ি-ঘর, মা-বাবা, ভাই-বোনের কথা ভুলে যাও। তোমাদের পরিবারকে দেখাশুনো করার দায়িত্ব আমাদের। জিহাদিরাই তোমাদের পরিবার।
মায়ের সঙ্গে বহুদিন কথা বলা হয়নি। হাতে চোট পাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে, ফোনে মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য বেসমেন্ট থেকে বেরিয়ে ইমন সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে লাগল। জানলা দিয়ে কিসের আলো যেন বিপবিপ করছে। বাইরে তাকিয়েই ও চমকে উঠল। দেখতে পেল, নিউ ইয়র্ক পুলিশের লাল-নীল আলোওয়ালা গাড়ি নিঃশধে স্টোরেজ ঘিরে ফেলছে। পুলিশ রে-ই-ড করেছে!! চিরাগকে খবরটা দেওয়ার জন্য ইমন দুড়দাড় করে নিচে নেমে এল। দু’জনে যাতে একসঙ্গে পালাতে পারে। নীচে নেমেই ও দেখল, চিরাগের দু’হাতে দুটো কিট ব্যাগ। করিডরে দাঁড়িয়ে ও ফিসফিস করে বলল, ‘আমি সব গুছিয়ে রেখেছিলাম। সময় নষ্ট করিস না। চল, পালাই।’
আধঘণ্টা পর মিরচি রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে চিরাগ বলল, ‘তুই এত অবাক হচ্ছিস কেন ভাই। নাইন ইলেভেনে ফোন করে পুলিশকে আমিই খবরটা দিয়েছিলাম। কামাল আর খামিসকে ধরিয়ে দেব বলে।’
ইমন বলল, ‘যদি জানাজানি হইয়া যায়?’
চিরাগ বলল, ‘এত কথা ভাবার সময় নেই। শোন, তৌফিক গাড়ি আনতে গেছে। আজ রাতেই ও আমাদের নিউ জার্সিতে পৌঁছে দেবে। নায়গারা থেকে আসার সময় যে বাংলাদেশি গাঁড়লটা তোকে নেমকার্ড দিয়েছিল, কী নাম যেন তাঁর… পলাশ চৌধুরী… সেই কার্ডটা তুই বের করে রাখ। নিউ জার্সিতে আমরা তাঁর কাছেই যাব।’
