জিহাদি – ১৭

(সতেরো)

নিউ ইয়র্কে রওনা হওয়ার মুখেই বাধা। ফোর্ড গাড়ির লক খোলা যাচ্ছে না। কাল রাতে রিমোটটা রোজিনা ম্যাডামের কাছে ছিল। উনি আর পলাশভাই সক্কালবেলায় কোথাও বেরিয়েছেন অন্য গাড়ি নিয়ে। পার্কিং স্পেসে নেমে কালকেতু দেখল, ইমন আর চিরাগ দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি ড্রাইভ করে ওকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার কথা ইমনের। ছেলেটা বলল, ‘প্রবলেম হইয়া গ্যাসে ছ্যার। লেটেস্ট মডেলের পুশ বাটন স্টার্ট গাড়ি। রিমোট না থাকলে খোলা যাইব না। আফনে একবার রোজিনা ম্যাডামরে ফোন করেন।’

কাল রাতে ডিনার করার সময়ই রোজিনা বলেছিলেন, পলাশভাই নিউইয়র্কে যেতে পারবেন না। বেলা এগারোটায় ওদের কোথাও বিজনেস মিটিং আছে। আজ নাস্তার সময় তো বটেই, লাঞ্চের সময়ও দেখা না হতে পারে। মিটিং কতক্ষণ চলবে, ওরা জানেন না। বেলা দুটো আড়াইটা অবধিও গড়াতে পারে। তাই সকালে কালকেতু নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত ছিল। রোজিনা ম্যাডামকে এইসময় ফোন করা উচিত হবে কি না, ও বুঝতে পারল না। ইমনকে ও বলল, ‘লক খোলার অন্য কোনও উপায় নেই? দেখো না, কোনও মেকানিক পাওয়া যায় কী না?’

ইমন বলল, ‘মোবাইলে আফনে একবার চেক কইর‌্যা দ্যাখেন। কাছাকাছি কোনও অটো সেন্টার আছে কি না, ফোনেই ইনফর্মেশনটা পাওয়া যাইব।’

ইমন ঠিকই বলেছে। পকেটে মোবাইল ফোন থাকলে আমেরিকায় সব কিছুই হাতের মুঠোয়। সব সমস্যার সমাধান করা যায়। ফোন ঘাঁটবে, না কি রোজিনা ম্যাডামকে ফোনে ধরবে… কালকেতু ঠিক করতে পারল না। মুশকিল হচ্ছে, সুদীশেরও আজ নিউ ইয়র্কের ইন্টারপোল অফিসে যাওয়ার কথা। সুদীশ বলেছিল, বেলা দেড়টার সময় হোটেল থেকে ওকে তুলে নিতে। একটু আগেই ওর সঙ্গে ফোনে কথা হয়ে গেছে। সে বেচারি এতক্ষণে হোটেলের লবিতে এসে বসে আছে। ওকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করানো ঠিক হবে না। বাধ্য হয়েই কালকেতু ইমনকে বলল, ‘উবের সেন্টার থেকে গাড়ি ডেকে নেওয়া যায় না?’

ইমন বলল, ‘যায়। কিন্তু আফনে নিউ ইয়র্ক থেইক্যা ফিরবেন… অনেক ট্যাহা ভাড়া নিয়া নিব।’

এই সময় কালকেতু দেখল, চিরাগ ছেলেটার সঙ্গে ইমনের চোখে চোখে কী যেন কথা হয়ে গেল। তারপরই ইমন বলল, ‘ছ্যার, আফনে লিভিং রুমে গিয়া বসেন। দেহি, আমি কী কইরতে পারি।’

লিভিং রুম থেকে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তার মানে লারেইনা ঘর পরিষ্কারের কাজ করছে। এখন ওখানে গিয়ে বসা সম্ভব না। লারেইনা সকালের দিকে ঘণ্টা তিনেক কাজ করে এ বাড়িতে। সন্ধেবেলায় যায় একটা স্পোর্টস পাব-এর রেস্তোরাঁয়। রোজিনা ম্যাডামের মুখে কালকেতু শুনেছে, দিনের বেলায় মেয়েটা পড়াশুনো করে ইউনিভার্সিটিতে। সবসময় হাসিখুশি, দেখা হলেই গুড মর্নিং জানায়। লিভিং রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে কালকেতু সিগারেট ধরাল সময় কাটানোর জন্য। কিন্তু মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ও ইঞ্জিন চালু হওয়ার মসৃণ শব্দ শুনতে পেল। তখনই চিরাগ ছেলেটা এসে বলল, ‘ছ্যার, গাড়ির লক খোলা গেছে। এ বার কোনও অসুবিধে নেই।’

অবাক হয়ে কালকেতু বলল, ‘বাঃ। কী করে খুললে?’

চিরাগ বলল, ‘আমরা যে স্টোরেজে কাজ করতাম, সেখানে প্রায়ই এ ধরনের সমস্যা হত। ইমন টুকটাক পারে, এ সব কাজ করতে।’

হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কালকেতু দেখল, সোয়া একটা বাজে। যাক, খুব বেশি দেরি হয়নি। বেলা আড়াইটের মধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমস অফিসে পৌঁছলেও ওর চলবে। ইমন কী করে লকটা খুলল, সে কথা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে কালকেতু মনে মনে ছকে নিল সারাদিনে কী কাজ করবে। গত দু’দিনে সুদীশের দেওয়া পেন ড্রাইভ থেকে ও কয়েকটা তথ্য পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন কাগজে ওয়ার ভিক্টিম মেয়েটাকে নিয়ে খবর। ছয় বছরের মেয়েটাকে ঢাকার মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিলেন রিচার্ড গাটম্যান বলে একজন আমেরিকান ফোটোগ্রাফার। নিউ ইয়র্ক টাইমসে ডিন জোন্স বলে একজন ডাক্তারের সাক্ষাৎকারও আছে। বোমা পড়ার তিন দিন কেটে যাওয়ার পরও মেয়েটার জ্ঞান ফেরেনি। ওকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন ডাক্তার-নার্সেরা।

দিন সাতেক পর ঢাকার ‘ইত্তেফাক’ কাগজে বেরিয়েছিল, ভারতীয় সেনাবাহিনির একজন কর্নেল হাসপাতালে মেয়েটাকে দেখতে গিয়েছেন। তাঁর নাম কর্নেল নপরাজিত মজুমদার। যুদ্ধে এত মানুষ আহত হওয়া সত্ত্বেও, কর্নেল মজুমদার কেন ওই বাচ্চা মেয়েটাকে দেখতে গিয়েছিলেন, কালকেতুর মাথায় ঢোকেনি।

মাস তিনেক পর ‘দৈনিক বাংলা’ কাগজে একটা চমকপ্রদ খবর, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমান বলেছেন, মেয়েটিকে সুস্থ করার সব খরচ নতুন সরকার দেবে। প্রয়োজন হলে তাকে বিদেশে পাঠানো হবে। ব্যাস, তার পর বাংলাদেশের কোনও কাগজে মেয়েটাকে নিয়ে আর কোনও খবর নেই। প্রায় মাস আটেক পর নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবর, রেড ক্রশের ডাক্তার পেড্রো কিউবায় নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মেয়েটিকে। কেননা, হাভানায় উন্নতমানের স্কিন গ্রাফটিং এবং প্লাস্টিক সার্জারির চিকিৎসা হয়।

কয়েকদিন পর কানাডার ‘টোরেন্টো স্টার’ কাগজ লিখেছে, বাংলাদেশ সরকার যদি চায়, তা হলে মেয়েটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে তারা রাজি। প্রায় ওই সময়েই গোটনবার্গের একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা জানিয়েছে, মেয়েটির ভার তারা নিতে চায়। মেয়েটির কথা তারা জানতে পেরেছে, রেড ক্রশের এক সুইডিশ নার্স মিসেস এলসা গিনেসবেরির কাছ থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন।

মেয়েটাকে নিয়ে তা হলে সেইসময় সারা বিশ্বে আলোচনা হয়েছিল! আসলে মেয়েটার ঝলসে যাওয়া শরীরের ওই ছবিটা এত অ্যাপিলিং ছিল যে, আর্ন্তজাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তান ভিলেন হয়ে গিয়েছিল। পেপার কাটিংসগুলো পড়তে পড়তে কিন্তু একটাই প্রশ্ন কালকেতুর মনে উঠে আসছিল, যাকে নিয়ে এত হই চই, সেই মেয়েটার পরিবারের কোনও খোঁজ করেননি কেন কেউ? এমনও হতে পারে, সেইসময় ওর পরিবার রিফিউজি হয়ে ভারতের কোথাও আশ্রয় নিয়েছিল।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের লেখায় টুকরো তথ্য থেকে বোঝাই যাচ্ছে, গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবারের মেয়ে ছিল। বোমা পড়ার সময় ওর পরিবারের কয়েকজন মারাও যায়। কালী মন্দিরের আশপাশে ওর ভাই-বোনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। যুদ্ধের ডামাডোলে হয়তো ওর ফ্যামিলির বাকি লোকেরা ধরেই নিয়েছিল, মেয়েটিও বেঁচে নেই। বোমায় ছিন্নভন্ন হয়ে গিয়েছে। সেইজন্য কেউ খোঁজ করেনি। পলাশভাই একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার প্রায় এক বছর পর রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্প থেকে ওঁর বাবা আমোদপুরে ফিরে যান।

‘ছ্যার, হোটেল ফরচুন আইস্যা গেছে।’

ইমনের কথায় জানলা দিয়ে তাকিয়ে কালকেতু দেখল, গাড়ি হোটেলের গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দূর থেকে ও সুদীশকে দেখতে পেল। স্যুট-টাই পরে দাঁড়িয়ে। ওকে খুব হ্যান্ডসাম লাগছে। লালবাজার থেকে ও সিঙ্গাপুরে চলে যাওয়ার পর ওর চেহারার মধ্যে একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে। গোয়েন্দা অফিসারের থেকেও এখন ওকে বেশি কর্পোরেট অফিসের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে মনে হয়। ড্রাইভ ওয়ে দিয়ে গাড়ি গেটের সামনে দাঁড়ানোর পর কালকেতু ডাকল, ‘উঠে আয়।’

গাড়িতে উঠেই সুদীশ বলল, ‘যাক, তোর সময়জ্ঞানটা তা হলে হয়েছে। ঠিক টাইমে এসেছিস।’

কালকেতু বলল, ‘থ্যাঙ্কস টু ইমন। ও ব্রেক ইন না করলে আসতে পারতাম না ভাই।’

সুদীশ জিজ্ঞেস করল, ‘তার মানে?’

গাড়ির লক খোলা নিয়ে সমস্যার ব্যাপারটা দু’এক কথায় বলেই কালকেতু অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল। ‘তোর ব্যস্ততা এখন কেমন রে?’

‘কেন বল তো?’

‘আরে, পলাশভাই তোর সঙ্গে আলাপ করতে চান। তুই আমার বন্ধু, ইন্টারপোলে আছিস শুনে, উনি মাথা খারাপ করে দিচ্ছেন, কবে আমার বাড়িতে নিয়ে আসবেন। আজ ফেরার পথে একবার যাবি?’

‘বলতে পারছি না। ইন্টারপোল অফিসে আজকের মিটিংটা কখন শেষ হবে, বুঝতে পারছি না। তোর পলাশভাইয়ের বাড়িতে আমাকে এমনিতেই একবার যেতে হবে।’

‘তোর সেই বাংলাদেশি আর ইন্ডিয়ান টেররিস্ট এখনও ধরা পড়েনি?’

‘না। ওদের গোপন ডেরায় এফবিআই রেইড করেছিল, সেটা তো আগের দিনই তোকে বলেছি। ওদের যে দুটো পাসপোর্ট পাওয়া গেছিল, এখন দেখা যাচ্ছে সে দুটো ফেক। ওদের নাম রফিকুল আলম আর ফিরহাদ আলি নয়। তবে, ওদের জিহাদি কোড নাম্বারটা আমরা পেয়েছি। বি টেন আর আই সিক্সটি ফাইভ। এই চ্যানেলটা ধরেই আমাদের এগোতে হবে। ইন্টারপোলের রেকর্ড ঘেঁটে আমরা দেখলাম, আই সিক্সটি ফাইভ অসমের করিমগঞ্জের ছেলে। ছেলেটা ডেয়ার ডেভিল টাইপের ছিল। যাই হোক, অসমে আমাদের লোকজন খোঁজ নিচ্ছে।’

কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘আর বাংলাদেশি ছেলেটা?’

‘তোকে বলব না ভেবেছিলাম। তবুও বলছি, এই সেই টেররিস্ট যে, নিউ ইয়র্কে তোকে খুন করতে গেছিল। এফবিআই ওয়ান হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত। অ্যাপার্টমেন্টের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা থেকে ওর একটা ইমেজ পাওয়া গেছে। মুখে ভূতের মুখোশ ছিল, তা সত্ত্বেও। কম্পিউটার গ্রাফিক্স মারফৎ মুখটা ক্লিন করে বি টেনের একটা ভাসাভাসা ছবি আমাদের হাতে এসেছে। দু’তিনদিন আগে ইন্দো-পাক স্টোরে একজন বাংলাদেশিকে রেস্টুরেন্টে বসে খেতে দেখা গেছে, যার সাথে বি টেনের খানিকটা মেলে। মোটামুটি এটা ঠিক, ছেলে দুটো নিউ জার্সি থেকে এখনও চলে যায়নি বা যেতে চায়নি। আমাদের জালে ধরা পড়বেই।’

‘আমাদের সাব কন্টিনেন্ট থেকে কেন ছেলেরা জিহাদি হচ্ছে? তোদের কী ধারণা?’

‘আউট অব ফ্রাস্ট্রেশন। ব্যক্তিগত জীবনে কোনও না কোনও আঘাত পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে অ্যাডভেঞ্চার করতে যাচ্ছে। আমাদের সময় ছেলেরা যেমন নকশাল হয়ে যেত। একবার পা বাড়িয়ে ফেললে তো আর ফেরার কোনও পথ ওদের সামনে খোলা থাকে না। এই যে বাংলাদেশি ছেলেটার কথা তোকে বলছিলাম, তার অবস্থা প্যাথেটিক। এফবিআইয়ের কাছে খবর আছে, মামুন আল-ফারখ বলে এক সিরিয়ান জিহাদি একে খুঁজে বেরাচ্ছে নিউ জার্সিতে। পেলেই খুন করে দেবে। এফবিআই যে মামুনের উপর লক্ষ রাখছে, সেটা আবার সে জানে না।’

‘আমি বুঝতে পারছি না, টেররিস্টরা আমাকে মারার চেষ্টা করল কেন? আমেরিকায় আমি যে কাজে এসেছি, তার সঙ্গে ওদের তো কোনও শত্রুতা নেই।’

‘কেন তোকে খুন করতে বলা হয়েছিল, সেটা বোধহয় ওরা নিজেরাও জানত না। এই জিহাদিদের তো কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। ইসলামের নামে এরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। কত নিরীহ লোক যে ওয়েস্ট এশিয়ায় মারা যাচ্ছে, তার হিসেব নেই। মাঝে মাঝে খারাপ লাগে কিছু কেস হিস্ট্রি দেখে। আমাদের সাবকন্টিনেন্ট থেকে কিছু ছেলে এই সো কলড হোলি ওয়ারে ঢুকেছে। কারও বয়স কুড়ি-বাইশ। কারও পঁচিশ-তিরিশ। ফর নাথিং, লাইফ বরবাদ করে ফেলল। ধর্মযুদ্ধের কাজে এদের ডেকে নেওয়া হয় বটে, কিন্তু জিহাদিদের কাছেও এরা ভাল ট্রিটমেন্ট পায় না। আসলে এদের দিয়ে কায়িক পরিশ্রমের কাজগুলো করানো হয়। এরা কেউ মিলিট্যান্টদের গাড়ি চালায়, রান্নাবান্না করে, বাসন ধোয়, জামাকাপড় কাচে। বলতে গেলে খিদমত খাটে।’

‘কী বলছিস তুই!!’

‘ঠিকই বলছি। কখনও কখনও চূড়ান্ত রিস্কি কাজেও ঠেলে দেওয়া হয় এদের। আর এরা বোকার মতো ঝাঁপিয়েও পড়ে তাতে। এই যেমন, নায়গারায় ওই বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে খুন করতে পাঠানো হয়েছিল। নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টে তোকে। ক্যালিফেট থেকে বেরিয়ে অ্যাকশন করতে যাওয়ার পর এদের অনেকে আবার পালিয়েও যায়। অথবা দুঃসাহসিক কম্ম করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারায়। শখের জিহাদিদের সংখ্যা ইদানীং এমন কমে যাচ্ছে, ওদের ওয়েবসাইটে সেদিন দেখলাম, ক্যালিফরা আবেদন করেছেন, যত শিগগির সম্ভব প্রচুর নতুন ছেলে-মেয়ে জোগাড় করো।’

‘ধরা পড়লে এদের কী শাস্তি হয় রে?’

‘ফাঁসি, মিনিমাম লাইফলং ইম্প্রিজনমেন্ট। তবে, যারা রাজসাক্ষী হয়, তাদের কথা আলাদা। বুদ্ধিমানের মতো এরা কেউ যদি আর্মি বা পুলিশের কাছে সারেন্ডার করে, তা হলে প্রাণে তো বাঁচবেই, সুস্থ জীবনে ফিরেও যেতে পারে। দ্যাখ, আমি তো ঠিক করেছি, বাংলাদেশি আর ইন্ডিয়ান জিহাদি দুটোকে যদি আমি ধরতে পারি, তা হলে ওদের অপশন দেব। হয় তুমি রাজসাক্ষী হও, না হয় সারা জীবন জেলে পচে মরো। এই দ্যাখ না, অসমের যে ছেলেটা… আই সিক্সটি ফাইভ… এখানে লুকিয়ে আছে, অথচ তার বাড়ির অবস্থা কী ভয়ানক, সম্ভবত ও জানে না। হিন্দু র‌্যাডিক্যাল গ্রুপের লোকেরা ওর বাবাকে গুলি করে মেরেছে। ওর একভাই নিখোঁজ। ওর মা-বোন করিমগঞ্জের বাস স্ট্যান্ডের কাছে একটা ঝুপড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। মা আর বোন জানেই না, ছেলেটা জিহাদি হয়ে গেছে।’

‘ওর বাবাকে হিন্দুরা মেরে ফেলল কেন?’

‘অনুপ্রবেশকারীর তকমা দিয়ে। তুই তো জানিস, সেন্ট্রাল গর্ভমেন্ট নতুন একটু পলিসি নিয়েছে, ১৯৭২ সালের পর যারা বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছে, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে। হয়তো ছেলেটার বাবা মানতে চায়নি। আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল। সেই কারণে হিন্দু র‌্যাডিক্যাল গ্রুপের রাগ। তুই ভাব, আই সিক্সটি ফাইভের কানে যখন এই খবরটা পৌঁছবে, তখন ওর মনে কী রিঅ্যাকশন হতে পারে? একদিকে যেমন বাড়িতে ফিরতে পারবে না, তেমনই জিহাদিদের ক্যালিফেটে। এদের কী করা উচিত জানিস, সারেন্ডার করা।’

‘কী গ্যারান্টি আছে, তোরা এদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দিতে পারবি?’

‘একজাম্পল আছে। ব্রিটেনে সম্ভব হয়েছে, আমেরিকায় হয়েছে। যারা অনুতপ্ত, তাদের ক্ষমার চোখে দেখা হচ্ছে। দু’তিন বছর জেল খাটার পর এরা কেউ সিকিউরিটি ফোর্সে চাকরি করছে। কেউ বই লিখছে। এমন কী, কেউ কেউ ইউনিভার্সিটিতে জিহাদি বিরোধী লেকচার দিয়ে ভাল রোজগারও করছে। যাদের পেটে বিদ্যে আছে, তাদের চাকরি পেতেও অসুবিধে হচ্ছে না।

‘এই মেসেজটাই তোরা জিহাদিদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিস না কেন?’

‘সে চেষ্টা শুরু হয়েছে। আমি তো সেদিন একটা ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে বলেছি, জিহাদের পথে যারা চলে গেছে, তাদের ভয় দেখিও না। সমাজের মূল স্রোতে যারা ফিরে আসতে চায়, তাদের ফিরে আসতে দাও। বন্দি জিহাদিদের প্রকৃত জ্ঞানী মৌলবীদের সামনে দাঁড় করিয়ে দাও। ইসলাম নিয়ে তারা সত্যি কথাটা শুনুক। শরিয়তে কী লেখা আছে, কী নেই। তা হলেই ওরা বুঝতে পারবে, আসল-নকল কী?’

‘তুই হয়তো ঠিকই বলেছিস সুদীশ।’

কথায় কথায় গাড়ি মিডটাউন ম্যানহাটনে পৌঁছে গিয়েছে। ফর্টি ফোর্থ স্ট্রিটে ইন্টারপোল অফিসের সামনে সুদীশ নেমে যাওয়ার পর কালকেতু পিছনের সিট বদলে সামনে চলে এল। তখনই ইমন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘ছ্যার, কিছু মনে কইরেন না, একডা কথা জিগামু?’

কালকেতু বলল, ‘এত ইতস্তত করছ কেন ইমন, বলো।’

‘আফনের এই বন্ধুডা হুনলাম ইন্টারপোলে কাম করে?’

‘হ্যাঁ। বড় অফিসার। থাকে কলকাতায়। কেন বলো তো?’

‘না, কথাবার্তা শুইন্যা খুব ভালা লাগল। কাইন্ড হার্টেড ম্যান।’

শুনে মনে মনে হাসল কালকেতু। সুদীশ দয়া-মায়া করার মানুষ, শুনলে কলকাতার কোনও অপরাধী বিশ্বাস করবে না। সত্যি কথা বলতে কী, ওর কথাবার্তা শুনে আজ কালকেতু নিজেও খুব অবাক। কখনও কখনও ওর মনে হচ্ছিল, সুদীশ যা বলছে, মন থেকে বলছে না। কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে বলছে। একটু পরেই ওর কৌতূহল মিটে গেল, ফোনে একটা মেসেজ পেয়ে। ‘এতক্ষণ যে বাংলাদেশি জিহাদির কথা তোকে বলছিলাম, সে তোর গাড়ি চালাচ্ছে। এই ছেলেটাই নিউ ইয়র্কে তোকে খুন করতে গেছিল। ওর ডান হাতে গ্লাভস দেখতে পাচ্ছিস? তোরই কীর্তি। কাচের ফুলদানি লাগার ক্ষত। এখনও সারেনি। শোন, কাউকে কিছু বলিস না। ওকে আর ওর সাঙাৎকে চোখে চোখে রাখিস। ওদের সময়মতো তুলে নেব পলাশভাইয়ের বাড়ি থেকে।’

মাই গুডনেস! বাঁ দিকে আড়চোখে তাকিয়ে কালকেতু দেখল, সত্যিই ইমন ছেলেটার ডান হাতে গ্লাভস! সুদীশ কি মজা করার জন্য মেসেজটা পাঠিয়েছে? না, ও তো সে রকম মানুষ না। ইমন ছেলেটাকে দেখে অবশ্য মনে হয় না, জিহাদি। নম্র ভদ্র ছেলে। জিহাদিদের সম্পর্কে কালকেতু যতটা পড়াশুনো করেছে, সে রকম মোটেই না। ওর সঙ্গী ছেলেটা রাফ টাইপের। সে জিহাদি হলেও হতে পারে। পরক্ষণেই পলাশভাইয়ের জন্য কালকেতুর দুঃশ্চিন্তা শুরু হল। উনি কি জানেন, ছেলে দুটোর আসল পরিচয়? ওঁর বাড়ি থেকে ছেলে দুটো ধরা পড়লে এফবিআই যে পলাশভাইকেও ছাড়বে না। নাহ, ছেলে দুটোকে এবার থেকে চোখে চোখে রাখতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *