জিহাদি – ৩৮

(আটত্রিশ)

সকালে ঘুম থেকে উঠেই বমি বমি ভাব। দাঁত ব্রাশ করার সময়ই টের পেলেন লিলি। হজমের গণ্ডগোল হল না কি? এমনিতে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকেন তিনি। পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছেন। রাতের দিকে হালকা কিছু খেয়েই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন। লিলি মনে করার চেষ্টা করলেন, কাল রাতে এমন কী খেয়েছেন, যাতে অ্যাসিডিটি হতে পারে? না, এমন কোনও স্পাইসি খাবার তো খাননি। একটা ভেজ স্যান্ডউইচ আর এক গ্লাস কোল্ড কফি খেয়েই তিনি শুয়ে পড়েছিলেন। তা হলে বমি পাচ্ছে কেন? একটু আধটু শরীর খারাপ হলে রেসিডেন্সিরই এক আবাসিক এবং প্রতিবেশী ডাক্তার সুধা রামচন্দ্রনকে তিনি ফোন করে দেন। ভারতীয় মেয়েটা এসে যা ওষুধ দেওয়ার, দিয়ে যায়।

লেজার ট্রিটমেন্টের সময় ডা. কিংসফোর্ড নতুন ওষুধ দিয়েছিলেন। বমি বমি ভাবটা কি তারই রিঅ্যাকশন? লিলি মনে মনে বললেন, বমি যদি হয়, তা হলে ডা. কিংসফোর্ডের ফার্মাসিস্টকে তিনি একবার ফোন করবেন। আমেরিকায় ডাক্তাররা ডায়গনোসিস করেন বটে, কিন্তু ওষুধ লিখে দেন ফার্মাসিস্টরা। শরীরের অস্বস্তিটা টেনশনের জন্যও হতে পারে। গত দুটো দিন হ্যাকিং নিয়ে লিলি মারাত্মক চিন্তায় ছিলেন। বারবার সেই পরিস্থিতিটার কথা ভেবেছেন, ফাউন্ডেশনের হাফ মিলিয়ন ডলার যদি মরিশাসের ওই কোম্পানির অ্যাকাউন্টে চলে যেত, তা হলে কী হত? ট্রাস্টিদের… বিশেষ করে এলসা আন্টিকে তিনি কী জবাব দিতেন? কোম্পানির অ্যাকাউন্টস সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব যে একমাত্র তাঁর। আরও গুরুতর ব্যাপার, চ্যারিটি শো-য়ের এই সময়টায় অর্থের খুব প্রয়োজন।

এফবিআইয়ের সাইবার সেল তদন্ত করে যাওয়ার পরই সেদিন অফিস থেকে ফোন করে অ্যান্ডিকে সব জানিয়ে ছিলেন লিলি। অ্যান্ডি আশ্বাস দিয়েছিল, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি লাস ভেগাস থেকে একজন সফটওয়ার এক্সপার্টকে পাঠাচ্ছি। সে সব গুছিয়ে দেবে।’

থ্যাঙ্কস গিভিং ডে-র পর থেকে অ্যান্ডি বেশ কয়েকবার নিউ ইয়র্কে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে এসেছে। ওঁর ভালবাসার উত্তাপটা আরও বেশি করে টের পাচ্ছিলেন লিলি। অ্যান্ডি রাত্রিবাস করায় দু’জনের মধ্যে শারীরিক মিলনও হয়েছে। অনাস্বাদিত সেই সুখ দু’জনকে আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে ইদানীং। লিলির খুব ইচ্ছে ছিল, ক্রিসমাসের ছুটিতে তিনি লাস ভেগাসে যাবেন। কিন্তু মাঝখান থেকে সাশা, ড্যানিয়েলরা বাচ্চাদের নিয়ে তাঁর কাছে ছুটিটা কাটাতে চাওয়ায় সেই ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি। অ্যান্ডি বলেছে, নিউ ইয়ার্স ইভ দু’জনে একসঙ্গে কাটাবে অ্যাটলান্টিকের কোনও নির্জন দ্বীপের রিসর্টে। কাউকে তাঁরা বলে যাবেন না। অ্যান্ডি নিজে প্লেন চালিয়ে নিয়ে যাবে সেখানে। এবং আগামীকালই সেইদিন।

গুগলকে কফির অর্ডার দিয়ে, সোফায় বসে একবার প্রেসার মেপে নিলেন লিলি। খুব একটা গড়বড় নেই। একশো তিরিশ আর পঁচাশি। অ্যান্ডিকে ফোন করতে যাবেন, এমন সময় ফের গলার কাছে বমি উঠে এল। ওয়াশরুমে গিয়ে হড়হড় করে বমি করার পর একটু সুস্থবোধ করতে লাগলেন লিলি। নাহ, সুধাকে একবার ফোন করা উচিত। কথাটা মনে হতেই তিনি ফোন করলেন। নাম্বার দেখেই বুঝতে পেরেছে সুধা। বলল, ‘গুড মর্নিং ম্যাম। আপনার শরীর ঠিক আছে তো?’

লিলি বললেন, ‘না। মনে হয় বিগড়েছে। সকাল থেকে বমিভাব পাচ্ছিল। একবার হয়েওছে।’

সুধা বলল, ‘ঠিক আছে ম্যাম, আমি আসছি। হাসপাতালে যাওয়ার পথে আপনাকে দেখে আসব।’

হাতে অনেক কাজ। অ্যান্ডির সঙ্গে ছুটি কাটাতে যাওয়ার আগে সব সেরে ফেলতে হবে। চাইন্ড কেয়ার ইউনিট গুলো থেকে মান্থলি রিপোর্ট এসেছে। সেগুলিতে চোখ বোলানোর জন্য ফের লিলি সোফায় গিয়ে বসলেন। ল্যাপটপে মেল খুলে প্রথম রিপোর্টেই দেখলেন, ডালাস ইউনিটের বাচ্চারা স্কুলের পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছে। কিন্তু উঁচু ক্লাসের কয়েকটি ছেলের মধ্যে অদ্ভুত আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। ইউনিটের ডাক্তার বলেছেন, ড্রাগ অ্যাডিকশনের লক্ষণ। মেল পড়েই চমকে উঠলেন লিলি। কী সর্বনাশ! স্কুলের মধ্যে ড্রাগ ঢুকল কী করে? সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফোন করলেন ডালাস ইউনিটের ইনচার্জ ডলি স্যান্ডারসনকে। ‘আমাকে খুলে বলো, কী করে হল?’

‘ম্যাম, কয়েক সপ্তাহ আগে মিসেস গিনেসবেরি স্কুল ভিজেটে এসেছিলেন। তিনি বাচ্চাদের টফি দিয়ে যান। তার পর থেকে কয়েকটা বাচ্চার মধ্যে টফির চাহিদা বেড়ে যায়। ডাক্তারের মনে হচ্ছে, সেই টফিতে ড্রাগ মেশানো ছিল।’

শুনে লিলি রেগে গেলেন, ‘তুমি কার উপর দোষ চাপাচ্ছ, জানো? উনি এতটা ইরেসপন্সিবল হতেই পারেন না। ভাল করে খোঁজ নিয়ে দেখো, অন্য কোনও সোর্স থেকে ড্রাগ আসছে কি না?’

ডলি বলল, ‘ম্যাম, তা হলে আমাকে লোকাল অ্যাডমিনিট্রেশনের সাহায্য নিতে হবে। আপনি অনুমতি দিলে আমি পুলিশকে জানাতে পারি।’

লিলি বললেন, ‘আমাকে একটু ভাবতে দাও। বাচ্চাগুলো কেমন আছে?’

‘ওদের আইসোলেশনে রেখেছি। এমনিতে নর্মাল, কিন্তু কোনও কোনও সময় ভায়োলেন্ট হয়ে যাচ্ছে।’

‘কে টফিগুলো বাইরে থেকে আনছে, জানতে পেরেছ? কাউকে সন্দেহ হয়?’

‘ম্যাম, একজনকে কড়া নজরে রেখেছি। পেড্রো পেরেজ বলে একজন সিকিউরিটি স্টাফকে। মিসেস গিনেসবেরি তাকে চাকরি দেওয়ার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিলেন।’

শুনে লিলি একটু অবাকই হলেন। একে তো এলসা আন্টি ডালাসের ইউনিটে যাবেন, তা তাঁকে জানাননি, তার উপর তাঁকে না জানিয়ে একজনকে চাকরিতে বহাল করে এলেন! ট্রাস্টি বোর্ডের মেম্বার হিসেবে অবশ্য এমন কোনও গর্হিত কাজ করেননি। আচমকা ইউনিটে হাজির হতেই পারেন, কী রকম চলছে, তা দেখার জন্য। কিন্তু পেড্রো ছেলেটার ডকুমেন্টস ভেরিফিকেশন হয়েছিল কি? প্রশ্নটা করতেই ডলি বলল, ‘এমনিতে সব ঠিক আছে ম্যাম। ছেলেটাকে নিজে এলসা ম্যাডাম নিয়ে আসেন। কিন্তু ভিক্টিম বাচ্চাদের একজন আমাদের বলে ফেলেছে, টফি তারা পাচ্ছে পেড্রোর কাছ থেকে।’

‘ডলি, পুলিশকে ইমিডিয়েট জানাও। আমি মি. বাম কিমকে ডালাসে পাঠাচ্ছি। খবরটা যদি লিক হয়, তা হলে আমাদের খুব বদনাম হয়ে যাবে।’

‘ঠিক আছে ম্যাম।’

ল্যাপটপের দিকে ফের চোখ দিলেন লিলি। দ্বিতীয় মান্থলি রিপোটর্টা বোস্টনের। পড়তে পড়তে চমকে উঠলেন তিনি। ওই ইউনিটের কয়েকজন বাচ্চার ডায়েরিয়া হয়েছে। পানীয় জল থেকে সংক্রমণ। হচ্ছেটা কি? কয়েকজন বাচ্চাকে না কি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। বাচ্চাদের শরীর স্বাস্থ্যের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকেন লিলি। কোনও বাচ্চা যদি মারা যায়, তা হলে চ্যারিটি নেভিগেটর কম পয়েন্ট দেবে। পানীয় জল খারাপ হল কী করে? প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল, অথচ বোস্টন ইউনিট তাঁকে খবরটাই বা দেয়নি কেন? ফোন করতেই বোস্টনের ইনচার্জ জুলিয়া কার্টার বলল, ‘ম্যাম, বাচ্চারা সুস্থ হয়ে গেছে। আপনি চিন্তা করবেন ভেবে জানাইনি। তা ছাড়া, এলসা ম্যাডাম সব নিজের চোখে দেখে গেছিলেন। উনি বলেছিলেন, ওয়াটার রিজার্ভার বদলানোর কথা আপনাকে জানাবেন।’

এটা তাঁর কাছে একটা খবর। লিলি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এলসা আন্টি কবে বোস্টন গেছিলেন?’

‘এই মাসের প্রথম সপ্তাহে। দু’দিন এখানে উনি ছিলেন। অ্যাকাউন্টসও চেক করে গেলেন।’

লিলি হিসেব করে দেখলেন, এলসা আন্টি তার পর তাঁকে দেখতে নিউ ইয়র্কের হাসপাতালে এসেছিলেন। আশ্চর্য, বোস্টন ইউনিট ভিজিট করার কথা তখন কিন্তু বলেননি। তা হলে কি উনি নজরদারি শুরু করেছেন? না, না, তা কী করে হবে? আন্টি তাঁকে অপত্যস্নেহে মানুষ করেছেন। কোনও কারণেই তাঁকে অবিশ্বাস করাযায় না। দু’হাতে মুখ ঢেকে লিলি সোফায় বসে রইলেন। সময়টা খারাপ যাচ্ছে। পর পর এমন সব ঘটনা ঘটছে, তিনি সেই অপবাদ আর নিতে পারছেন না। বিশেষ করে, তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক কারচুপির অপবাদ। বাংলাদেশিদের কাগজ যুগযুগান্ত না কি লিখেছে, মরিশাসের কোনও ফাইনান্সিয়াল কোম্পানিতে তিনি না কি মানি ট্রান্সফার করেছেন! এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর হয় না।

‘মে আই কাম ইন ম্যাডাম?’

মুখ তুলে লিলি দেখলেন, লিভিং রুমের দরজায় বাম কিম দাঁড়িয়ে। ওঁর আসারই কথা ছিল। লিলি বললেন, ‘প্লিজ আসুন। আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম।’

‘আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, কোনও কারণে আপসেট? আবার কী হল ম্যাডাম?’

ডালাস আর বোস্টন ইউনিটের কথা বলতে গিয়েও চেপে গেলেন লিলি। বললেন, ‘কিছু না। রেজওয়ানা বলে বাংলাদেশি যে মেয়েটা সেদিন হাসপাতালে আমার ইন্টারভিউ নিতে এসেছিল, তার কন্টাক্ট নাম্বারটা কি আপনার কাছে আছে মি. কিম?’

‘হ্যাঁ আছে। তার সঙ্গে আমার একটু আগেই কথা হল। আপনাকে ধরার চেষ্টা করেছিল, পায়নি। আমাকে মেয়েটা জিজ্ঞাসা করছিল, চ্যারিটি শো-তে রিহান্ন ফেন্টি গাইতে আসছে কি না? কিন্তু আপনি তাঁকে খুঁজছেন কেন ম্যাডাম?’

‘মেয়েটা যে কাগজের রিপোর্টার, তারা লিখেছে, আমি না কি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার চেষ্টা করছি। এবং সেই কারণেই…।’

মাঝপথেই তাঁকে থামিয়ে দিলেন বাম কিম। বললেন, ‘আমি ওই রিপোর্টের ইংরেজি তর্জমাটা পড়েছি ম্যাম। এটা সত্যি, আপনি নন, আমাদেরই ফাউন্ডেশনের একজন সিরিয়াসলি চেষ্টা করছেন পিস প্রাইজের জন্য। নামটা শুনলে আপনি বিশ্বাস করবেন না।’

‘কে তিনি? আমাকে বলুন।’

‘মিসেস এলসা গিনেসবেরি। মাফ করবেন ম্যাডাম, গুজবটা কিছুদিন আগেই আমার কানে এসেছিল। কিন্তু পরে কনফার্ম করেছি।’

হাঁ করে বাম কিমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন লিলি। এতক্ষণ রেজওয়ানা বলে মেয়েটার উপর রাগ হচ্ছিল। এখন মনে হচ্ছে, ওর দোষ কী? ওদের রিপোর্টাররা খবর পেলে তো ছাপবেই। বাম কিম যখন বলছেন, তখন খবরের খানিকটা ভিত্তি আছে। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কার কাছে কনফার্ম করলেন?’

‘ম্যাডাম, আগেই আপনাকে বলেছি, ইন্টারপোলের কিছু অফিসারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। তাদের কাছে জানতে পারলাম, মিসেস গিনেসবেরি প্রাণপণ চেষ্টা করছেন, সিলেকশন লিস্টে তাঁর নামটা তোলার। উনি জুরিদের কেনারও কাজ শুরু করে দিয়েছেন। দুঃখের কথা হল, আজকাল নোবেল, অস্কার এইসব প্রাইজগুলো এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে। আপনার যদি কেনার সামর্থ না থাকে, তা হলে প্রভাবশালী অন্য কেউ, তাঁর স্বার্থে আপনার জন্য প্রাইজ জোগাড় করে দেবে।’

‘এলসা আন্টির জন্য এমন কেউ আছেন না কি?’

‘আছেন ম্যাডাম। তিনি একজন ডেমোক্রাট সেনেটর। প্রেসিডেন্ট আ্যাডামসের কট্টর বিরোধী। এ কথা আপনাকে জানাব না ভেবেছিলাম। দু’হাজার আঠারো সালে শেষবার নোবেল পিস প্রাইজ দেওয়া হয়। তা জয়েন্টলি পেয়েছিলেন কঙ্গোর গাইনোকলজিস্ট ডেনিস মুকওয়েজে আর ইরাকের মেয়ে নাদিয়া মুরাদ। চূড়ান্ত কয়েকজনের তালিকা থেকে এই দু’জনকে বেছে নেন জুরিরা। সেবারও মিসেস গিনেসবেরি তালিকায় ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নামটা তোলাতে পারেননি। এ বার কোমর বেঁধে নেমেছেন।’

‘নোবেল শান্তি পুরষ্কার দেওয়া হয় কিসের জন্য মি. কিম?’

বাম কিম হেসে বললেন, ‘বিশ্বশান্তির কোনও উল্লেখ্য অবদানের জন্য। ডেনিস মুকওয়েজে কঙ্গো যুদ্ধের সময় প্রায় দশ হাজার রেপ ভিক্টিমের চিকিৎসা করে, তাদের সুস্থ করে তোলেন। কোনও কোনও মহিলার একাধিকবারও অপারেশন করেছিলেন। আর নাদিয়া নিজেই একজন ওয়ার ভিক্টিম। ওর যখন উনিশ বছর বয়স, তখন আইএস জঙ্গিরা ওকে ইরাকের এক গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে গেছিল। বছর তিনেক যৌনদাসীও করে রাখে। সেখান থেকে পালিয়ে নাদিয়া কোনওভাবে জার্মানিতে যান। তার পর থেকেই যুদ্ধে সেক্সচুয়াল ভিক্টিম মহিলাদের সাহায্যে একটা সংস্থা গড়ে তোলেন।’

লিলি বললেন, ‘তাই যদি হয়, তা হলে এলসা আন্টিরও প্রাইজ পাওয়া উচিত। ওয়ার ভিক্টিম বাচ্চাদের জন্য উনিও তো কিছু কম করেননি।’

বাম কিম স্মিত হেসে উত্তর দিলেন, ‘তা সত্ত্বেও উনি পাবেন না। কেননা, ওঁর বিরুদ্ধে পুলিশ রিপোর্ট আছে। আর্থিক জালিয়াতির জন্য উনি একবার জেলে গেছিলেন।’

চমকে উঠে লিলি বললেন, ‘কী বলছেন আপনি? কই, আমি তো কখনও শুনিনি?’

‘শুনবেন কী করে? আপনি তখন নিউ ইয়র্কে চলে এসেছেন। ম্যাডাম, আগে কখনও বলিনি, কিন্তু এ বার কথাটা যখন উঠেছে, তখন খোলাখুলি আপনাকে বলি, এই মহিলা থেকে সাবধান। সারা জীবন ইনি আপনাকে ভাঙিয়ে খেয়েছেন। আপনার ইমেজ এখন এত বেড়ে গেছে, ইনি তা সহ্য করতে পারছেন না। আপনাকে তাই ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন। ইনি সফল হলে পুরো ফাউন্ডেশনের বারোটা বেজে যাবে। কাল এফবিআইয়ের সাইবার সেলের ফাইন্ডিংস থেকে আমি বুঝে গেছি।’

শুনতে শুনতে দুর্বলবোধ করছেন লিলি। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ফাইন্ডিংসটা কী?’

‘মিসেস গিনেসবেরি আপনার নামে আর্থিক কারচুপির অপবাদ লেপে দিতে চাইছেন। আপনাকে গতকাল একটা কথা বলেছিলাম, মনে আছে কি না জানি না। আমাদের টয় ডিভিশনের অ্যাকাউন্টস থেকে বিশাল একটা অঙ্ক মরিশাসের এক ফাইনান্সিয়াল অর্গানাইজেশনে পাচার হয়ে গেছিল। ইন্টারপোল এফবিআইকে জানিয়েছে, মিসেস গিনেসবেরি একটা সময় ছুটি কাটাতে প্রায়ই মরিশাসে যেতেন। আপনার নাম করে উনিই বাংলাদেশের রোকেয়া সুলতানাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ডোনেশন হিসেবে তোলা কিছু অর্থ মরিশাসের ওই অর্গানাইজেশনে জমা দিতে। মারা যাওয়ার আগে সেকথা রোকেয়া তাঁর ছেলেকে বলে যান। টেপ করা সেই জবানবন্দি ইন্টারপোল পেয়ে গেছে। বাংলাদেশের মিডিয়ার কাছ থেকে।’

‘কিন্তু আমাকে অপদস্থ করে এলসা আন্টির কি লাভ মি. কিম? আমাকে যদি মুখ ফুটে একবার উনি ফাউন্ডেশন থেকে চলে যেতে বলেন, আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা করব না ছেড়ে দিতে।’

‘ঘুণাক্ষরেও এ কথা মনে স্থান দেবেন না ম্য্যাম। আপনি চলে যেতে চাইলেও আমরা আপনাকে যেতে দেব? কিছুতেই না। মিসেস গিনেসবেরিকে এফবিআই অলরেডি ফ্রেম করার কথা ভাবছে। ওঁর সঙ্গে জঙ্গি কানেকশনেরও সূত্র খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে। রেড ক্রস থেকে ঘাড়ধাক্কা খাওয়ার পর মিসেস গিনেসবেরি মোসুলের এক আইএস ক্যালিফেটে নার্সের চাকরি করতে গেছিলেন। সেইসময় এক জিহাদি মামুন আল ফরখ-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে সেইসময় মামুন হাসপাতালে ছিল। মিসেস গিনেসবেরি তখনই জানতে পারেন, মামুন একজন ক্র্যাকার। রিসেন্টলি মামুন নিউ জার্সিতে ছিল। ওকেই আমাদের অ্যাকাউন্টস হ্যাকিংয়ের কাজে লাগিয়ে ছিলেন মিসেস গিনেসবেরি।’

‘কী বলছেন আপনি?’

‘ঠিকই বলছি ম্যাডাম। আমার তো মনে হচ্ছে, নায়গারায় আপনার উপর টেররিস্ট অ্যাটাকের পিছনেও মিসেস গিনেসবেরির হাত ছিল। আপনি যে নায়গারায় যাচ্ছেন, সেটা একমাত্র উনিই জানতেন। ওখানে জঙ্গিরা যদি সফল হত, তা হলে উনি ফাউন্ডেশন পুরোপুরি কবজা করে নিতেন।’

অপ্রত্যাশিত কথাগুলো শুনতে শুনতে লিলি সত্যিই অসুস্থবোধ করছেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে বাম কিম হয়তো কিছু আন্দাজ করেছেন। সোফা ছেড়ে উঠে এসে উনি বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনাকে দেখে আমার ভাল লাগছে না। আমি এখুনি ডাক্তার ডাকছি।’

কথাটা ওঁর মুখ থেকে বেরতে না বেরতেই সুধা রামচন্দ্রনের সহাস্য মুখটা লিলি দেখতে পেলেন লিভিং রুমের দরজায়। বাম কিমও তাঁকে চেনেন। উনি বললেন, ‘আপনি ঠিক সময়ে এসেছেন। ম্যাডামকে একটু পরীক্ষা করে দেখুন। মনে হচ্ছে, উনি ভাল নেই।’

সুধা বললেন, ‘চলুন, আপনার গেস্ট রুমে চলুন। দেখি, প্রবলেমটা কী।’

গেস্ট রুমে গিয়ে লিলি ডিভানে শুয়ে পড়লেন। কয়েক মিনিট ধরে ধরা-বাঁধা চেক আপ করে সুধা মুচকি হাসলেন। তার পর বললেন, ‘কনগ্র্যাটস ম্যাম। আপনি কনসিভ করেছেন। মা হতে যাচ্ছেন। বেটার লেট দ্যান নেভার।’

শুনে সঙ্গেসঙ্গে লিলি বিছানায় উঠে বসে বললেন, ‘কী বলছেন? আপনি সিওর?’

সুধা বললেন, ‘আমার তো তাই মনে হচ্ছে। কাল আমার লোক এসে আপনার ইউরিন স্যাম্পল নিয়ে যাবে। তার পর ডেফিনিট বলতে পারব।’

মাথা ঘুরতে শুরু করেছে লিলির। তিনি প্রেগনেন্ট! হ্যাঁ, অ্যান্ডির সঙ্গে একাধিকবার তাঁর যৌনমিলন হয়েছে। এবং কোনও প্রোটেকশন ছাড়াই। কেননা, এতদিন ধরে তিনি জানতেন, কোনওদিন মা হতে পারবেন না। কথাটা তাঁকে বলেছিলেন এলসা আন্টি। সেইসময় অ্যান্ডিকে তিনি জীবনসঙ্গী করার কথা ভাবছিলেন। তা হলে এলসা আন্টি তাঁকে মিথ্যে কথা বলেছিলেন? তিনি কি চাননি, বোনপো অ্যান্ডির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হোক?

তা হলে তো মি. কিমের কথাটাই ঠিক। এলসা আন্টি তাঁকে সারা জীবন ভাঙিয়ে খেয়েছেন! কিম আর যা যা বলছিলেন, মন থেকে কোনওটাই উড়িয়ে দিতে পারলেন না লিলি। গর্ভবতী হওয়ার খবরটা অ্যান্ডিকে এখনই দেবেন কি না, তিনি মনস্থির করতে পারলেন না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *