(তেতাল্লিশ)
আলবুকার্ক থেকে জেটব্লু এয়ারওয়েজের ফ্লাইট ওড়ার পর পাইলট বলেছিলেন, নিউ ইয়র্কে আজ ঝকঝকে রোদ্দুর। পুরো দিনটাই সানি। লাঞ্চ সেরে গেস্টরুমের বারান্দায় বেরিয়ে কালকেতু দেখল, সাত তলার উপর থেকে নিউ ইয়র্কের স্কাইলাইনটা অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে। আকাশটা ঘন নীল। দূরে নববুই-একশো তলার বিখ্যাত বাড়িগুলোর গা থেকে রোদ্দুর ঠিকরে পড়ছে। আড়াইশো থেকে পাঁচশো মিটার উঁচু, আকৃতি দেখলেই বোঝা যায়, কোন বাড়ির কী নাম। প্রথমেই ওর চোখে পড়ল ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। আগে যেখানে ছিল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার… নাইন ইলেভেনে ভেঙে পড়া সেই টুইন টাওয়ার। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, ক্রাইসলার বিল্ডিং, ব্যাঙ্ক অফ আমেরিকা টাওয়ার, নিউ ইয়র্ক টাইমস অফিস, সেন্ট্রাল পার্ক টাওয়ার, রকফেলার প্লাজা, মেটলাইফ আর ট্রাম্প টাওয়ার…। নিউ জার্সিতে যাওয়ার আগে যে ক’দিন কালকেতু এই অ্যাপার্টমেন্টে ছিল, তখন রোজিনা ম্যাডাম ওকে বাড়িগুলো চিনিয়ে ছিলেন। কে জানত, মাত্র কয়েকটা দিনের ব্যবধানে ম্যাডামের এইরকম বিয়োগান্ত পরিণতি হবে?
পলাশভাই মারাত্মক শক পেয়েছেন। এখনও তার ধাক্কা সামলে উঠতে পারেননি। অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেই উনি সোফায় মুখ ঢেকে খানিকক্ষণ বসে রইলেন। তার পর সেই যে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন, আর বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন না। অনেক বুঝিয়ে কালকেতু ওঁকে লাঞ্চ টেবল পযন্ত নিয়ে এসেও কিছু খাওয়াতে পারেনি। এক গ্লাস ফলের রস খেয়ে পলাশভাই উঠে গেলেন। বারবার উনি রোজিনা ম্যাডামের প্রসঙ্গ তুলছেন। আজ সন্ধের ফ্লাইটেই ম্যাডামকে অবশ্য নিয়ে আসছেন রায়ান আর হেমলতা। নিউ ইয়র্কের সেরা হাসপাতাল প্রেসবাইটেরিয়ানে ভর্তি করতে। অস্ট্রিয়া থেকে একজন র্যাবিজ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসছেন ওঁকে দেখতে। কিন্তু গতকাল বিকালে র্যাঞ্চের হাসপাতালে গিয়ে রোজিনা ম্যাডামকে দেখে এসেছে। তার পর থেকে কালকেতু আর কোনও ডাক্তারের উপরই ভরসা রাখতে পারছে না। ম্যাডামের সারা শরীর এমন বীভৎস ফুলে গেছে যে, সেরে ওঠার সম্ভাবনা খুব কম।
রোজিনা ম্যাডামকে ছেড়ে পলাশভাই আসতে চাইছিলেন না। কিন্তু সুদীশের কথায় ওঁকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে কালকেতু। কেননা, সুদীশ ফোন করে বলেছিল, ইন্টারপোল পলাশভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে চায়। কালকেতু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেন, কোনও প্রবলেম হয়েছে না কি?’ সুদীশ উত্তর দেয়, ‘বাংলাদেশ সিক্রেট সার্ভিস-এর কিছু কোয়ারিজ আছে। ভদ্রলোককে তুই ধরে বেঁধে নিয়ে আয়।’ পলাশভাইয়ের মানসিক অবস্থা জানানোর পর সুদীশ বলেছিল, ‘বাংলাদেশ সিকিওরিটি ইন্টেলিজেন্স ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে চায়। সেই ফাঁকে আমার সঙ্গেও ওঁর আলাপ হয়ে যাবে। উনি তো চাইছিলেন, আমার সঙ্গে আলাপ করতে। আরে, আমি থাকব। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’ হেমলতাকে কথাটা জানাতেই উনি বলেছিলেন, ‘আপনারা দু’জন আগে চলে যান। আমরা পরে যাচ্ছি।’
সুদীশরা কখন আসবে, নিশ্চিত করে কিছু বলেনি। বারান্দা থেকে গেস্ট রুমে ঢুকে কালকেতু বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল। এই অ্যাপার্টমেন্টে আগে ও সবসময় রোজিনা ম্যাডামের উজ্জ্বল উপস্থিতি টের পেত। রোজ অত ব্যস্ততা সত্ত্বেও উনি একবার করে গেস্ট রুমে আসতেন। কোনও অসুবিধে হচ্ছে কি না, জেনে যেতেন। পলাশভাইয়ের খেঁয়ালিপনা নিয়ে মাঝে মধ্যেই উনি হাসিঠাট্টা করতেন। কিন্তু কখনই মাত্রার বাইরে যেতেন না। কালকেতুর মনে পড়ল, ও নিউ ইয়র্কে আসার পরদিনই পলাশভাই আর ওকে, রোজিনা ম্যাডাম টেনে নিয়ে গেছিলেন, বাড়ির কাছে আর্ট মিউজিয়ামে। সেদিন নামী শিল্পীদের আর্ট ওয়ার্ক নিলাম হচ্ছিল। রোজিনা ম্যাডাম কয়েক হাজার ডলার দিয়ে ডেলগাদোর একটা ছবি কিনেছিলেন। অত দাম! পলাশভাইয়ের মনঃপূত হয়নি।
গাড়িতে ফেরার সময় আলোচনা হচ্ছিল, ছবিটা কোথায় টাঙানো হবে। পলাশভাই সাদাসিধে উত্তর দিয়েছিলেন, লিভিং রুমে। যাতে সবাই দেখতে পায়। কালকেতুরও সেটাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ম্যাডাম বলেছিলেন, একদম না। ছবিটা গেস্টরুমে রাখবেন। লোক দেখানোর জন্য উনি কেনেননি। এটা একটা ইনভেস্টমেন্ট। দশ বছর পর এই ছবিটা বিক্রি করলে দ্বিগুণেরও বেশি দাম পাবেন। কথাটা শুনে পলাশভাই তারিফ করেছিলেন, ‘হেইডা কিন্তু আমার মাথায় ঢোকে নাই ম্যাডাম।’ তখন রোজিনা ম্যাডাম বলেছিলেন, ‘কালকেতুভাই, দাঁত থাকতে তো লোকে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। আমি যখন থাকব না, তখন আপনাদের পলাশভাই আমার অভাবটা টের পাবেন।’ কত খাঁটি একটা কথা! ডেলগাদোর ছবিটা এখনও গেস্ট রুমের দেওয়ালে টাঙানো আছে। হয়তো আগামী দশ বছরও ওইভাবে ঝুলে থাকবে। কিন্তু রোজিনা ম্যাডাম নাও থাকতে পারেন।
আজ কেমন যেন সব শূন্য শূন্য মনে হচ্ছে। সত্যিই, ম্যাডামকে ছাড়া পলাশভাই এই অ্যাপার্টমেন্টে থাকবেন কী করে? সর্বত্রই ওঁর রুচি আর যত্নের ছাপ। অ্যাপার্টমেন্টের দেওয়ালের রং, আসবাবপত্র, আলোর সাজ, মায় প্রতিটা শো পিস রোজিনা ম্যাডামের পছন্দ করা। আইকিয়া বলে হোম ফার্নিশিংয়ের একটা শো রুম আছে। সেখান থেকে প্রায়ই উনি বেলজিয়ান অথবা ফ্রেঞ্চ শো পিস কিনে আনতেন। শখের জিনিস কেনা নিয়েও পলাশভাইয়ের সঙ্গে ওঁর মিষ্টি ঝগড়া হত। কালকেতুর মনে আছে, একবার ম্যাডাম মাইকেল কর্সের একটা হ্যান্ডব্যাগ কিনে এনেছিলেন। মাইকেল কর্স মেয়েদের হ্যান্ডব্যাগের খুব নামী ব্র্যান্ড। তার দাম শুনে পলাশভাই চমকে উঠেছিলেন, ‘ক’ন কী ম্যাডাম! দু’লাইখ ট্যাহা!’
তখন রোজিনা বলেছিলেন, ‘অত অবাক হওনের কী আছে? আফনাগো দ্যাশে লেডিস হ্যান্ডব্যাগ তো খেজুর পাতা, তাল পাতা আর ব্যাত দিয়া তৈরি হয়। হ্যায় ব্যাগ নিয়া আমি পার্টিতে যাম না হি? যা বোঝেন না, তা নিয়া কথা কইবেন না।’ পলাশভাই তখন আমতা আমতা করে বলতেন, ‘আমি তো খারাপ কই নাই। আফনের হাতে মাইকেল কর্স মানাইব। কিন্তু ভাবেন তো, আমাগো অফিসের মিসেস ডরোথি হ্যায় ব্যাগ নিয়া ঘুইর্যা বেরাইতাসে। লোকে কী কইব?’ রোজিনা মৃদু ধমক দিয়ে বলতেন, ‘থামেন তো। ফের লুজ টক। আমি কিন্তু ডরোথিরে কইয়্যা দিমু।’
টুকরো টুকরো স্মৃতি। মনে পড়ার ফাঁকেই কালকেতু টের পেল, ডোর বেল বাজছে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই ও দেখল, সুদীশ দাঁড়িয়ে। ওর সঙ্গে এক বাংলাদেশি ভদ্রলোক। লিভিং রুমে আসার সময়ই সুদীশ পরিচয় করিয়ে দিল, ‘কালকেতু, ইনি প্রিয়তোষ সাহা। বাংলাদেশ সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের অফিসার। তোর পলাশভাইয়ের সঙ্গে ইনি কথা বলতে চান।’
কালকেতু লক্ষ করেনি, ডোর বেলের আওয়াজ শুনে পলাশভাইও নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। উনি বললেন, ‘আসেন, আসেন। আইজ আফনেগো ঠিকঠাক আপ্যায়ন করতে পারুম না। বাসার মালকিন অসুস্থ… হ্যায় হাসপাতালে।’
উনি আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বাধা দিয়ে প্রিয়তোষবাবু বললেন, ‘আমরা জানি। ভেরি স্যাড। আফনেরে ডিসটার্ব কইরতাম না। কিন্তু আমারে পরশুর মধ্যে দেশে ফিইর্যা যাইতে অইব। প্রাইম মিনিস্টারের অর্ডার। কেননা, তার পরের দিনই উনি কলম্বো যাইবেন। সার্ক কান্ট্রির কী একডা মিটিং আসে।’
প্রিয়তোষবাবু বোধহয় একান্তে কথা বলতে চান পলাশভাইয়ের সঙ্গে। সুদীশ চোখের ইশারায় বলল, বারান্দায় চলে যেতে। কালকেতু সঙ্গে সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। কয়েক সেকেন্ড স্কাইলাইনের দিকে তাকিয়ে থেকে সুদীশ বলল, ‘অনেক কপাল করলে, এসব জায়গায় থাকা যায়, বুঝলি কালকেতু।’
কালকেতু ঠাট্টা করে বলল, ‘আক্ষেপ করিস না ভাই। অনেক কপাল করলে তোর মতো ইন্টারপোল অফিসার হওয়া যায়।’
‘কলকাতার বিডন স্ট্রিটের যে বাড়িটায় আমি থাকি, তার কথা তুই ভাব। তা হলেই বুঝতে পারবি, আফসোসটা কেন করছি। যাক সে কথা। পলাশভাই লোকটাকে তো তুই বেশ কিছুদিন ধরে দেখছিস। ওর সম্পর্কে তোর অ্যাসেসমেন্ট কী, শুনি।’
‘হ্যাপি গো লাকি টাইপ। রোমান্টিক। ওপেন হার্টেড। কখনও কখনও হুইমজিক্যাল বলেও মনে হয়।’
‘এই রকম একটা লোক মাল্টি মিলিওনিয়ার হল কী করে, তোর মনে কখনও প্রশ্ন জাগেনি?’
কালকেতু ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘আমার তো মনে হয়, লোকে মাল্টি মিলিওনিয়ার তিনরকম ভাবে হতে পারে। এক, যদি কেউ পৈতৃক সম্পত্তি পায়। দুই, কোনও ক্রিমিনাল অ্যাকটিভিটির সঙ্গে যুক্ত থাকলে। তিন পলিটিক্যাল পাওয়ারের আশীর্বাদ পেলে। যেমন ধর, আমাদের দেশের উদাহরণ দিলে… এক, বিড়লাভাইয়েরা। দুই, নীরব মোদি-বিজয় মালিয়া। তিন, মুকেশ আম্বানি, অনিল আম্বানি।’
‘কারেক্ট। তোর পলাশভাইয়ের ক্ষেত্রে তৃতীয় কারণটা প্রযোজ্য। ওঁর বাবা সুধাময় চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। উনি পাক সেনাদের অত্যাচারে কলকাতায় পালিয়ে যান। ওখানে খুব অ্যাকটিভ ছিলেন। সেইসূত্রে শেখ মুজিবর রহমানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। বাংলাদেশ হওয়ার পর পরিচয়টা ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছয়। সুধাময়বাবু সামান্য একটা গারমেন্টস ফ্যাক্টরি দিয়ে ব্যাবসা শুরু করেছিলেন। কারও কাছ থেকে লোন নিয়ে। পরে অবশ্য সোনালি ব্যাঙ্ক মদত দিয়েছে। সেই ব্যাবসাটাই পলাশভাই বাড়িয়ে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের এখনকার প্রাইম মিনিস্টারের উনি খুব স্নেহধন্য ছিলেন। কিন্তু, রিসেন্টলি বাংলাদেশের সিকিওরিটি ইন্টেলিজেন্স… মানে বিএসআই-য়ের হাতে কিছু ডকুমেন্টস এসেছে, যা তোর পলাশভাইকে বিপদে ফেলতে পারে।’
‘কী ধরনের ডকুমেন্টস?’
‘জিহাদিদের ফান্ডিং করা নিয়ে। তুই নিশ্চয় জানিস, বাংলাদেশে আইএস সংগঠন বাড়াচ্ছে। জামায়েতিদের মধ্যে ওরা ঢুকে গেছে। কয়েকজন ব্লগারকে পর পর ওরা খুন করেছে। ব্লগারদের মধ্যে একজন ছিলেন ঢাকার কাগজের নামকরা সাংবাদিক। সেই কেসের তদন্তে নেমে প্রথম বিএসআই জানতে পারে, পলাশভাইয়ের সঙ্গে জিহাদিদের লিঙ্ক আছে।’
‘পলাশভাই আর জিহাদি গ্রুপ! কোথাও একটা ভুল হচ্ছে রে।’
‘পলাশভাই সম্পর্কে তুই কতটুকু জানিস, কালকেতু? তুই কি জানিস, গতবার আমেরিকায় আসার পথে জিহাদিরা ওঁকে কিডন্যাপ করেছিল?’
‘কই, উনি তো আমাকে কিছু বলেননি।’
‘তা হলে আমার কাছে শোন। দুবাইয়ে পলাশভাইয়ের দু’দিন থাকার কথা ছিল। এয়ারপোর্ট থেকে উনি যখন হোটেলের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন জিহাদিরা ওঁকে তুলে নিয়ে যায়। দিন দুয়েক আটকেও রেখেছিল। জিহাদি জামায়েতিরা ডিম্যান্ড করেছিল, চিনাদের কাছ থেকে ওরা দশটা সুইসাইড বম্বারদের জ্যাকেট কিনতে চায়। তার দাম পলাশভাইকে দিতে হবে। উনি প্রথমে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু জিহাদিরা ঢাকায় ওঁর শপিং মলে ব্লাস্ট করবে বলে ভয় দেখায়। ব্লাস্টে বেশ কয়েকজন মারা যান। সেই সূত্র ধরেই, ইন্টারপোলের সাহায্য নিয়ে বিএসআই দুবাই থেকে রফিকুল আলম বলে এক বাংলাদেশি জিহাদিকে ধরে। তার মুখ থেকে পুলিশ জানতে পারে, পলাশভাই সুইসাইড জ্যাকেট কেনার জন্য হাওলায় চিনাদের টাকা দিয়েছিলেন। নারাণগঞ্জ থেকে সেই জ্যাকেটগুলো পুলিশ পরে উদ্ধারও করে। বিএসআই প্রথমে পলাশভাইকে ঘাঁটাতে চায়নি। কেননা, ওরা জানত, ভদ্রলোক পিএমের ঘনিষ্ঠ। কিন্তু, প্রায় একবছর কেসটা চাপা পড়ে থাকার পর, ইদানীং পিএমও থেকেই চাপ দেওয়া হয়, খোঁজখবর নাও।’
শুনে কালকেতু প্রমাদ গুনল। জিহাদিরা জোর করে র্যানসাম আদায় করেছে। ব্যাবসায়ী অথবা শিল্পপতিদের কাছ থেকে এভাবে চাপ দিয়ে অর্থ আদায়… নতুন কিছু নয়। কিন্তু রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গেও তাঁদের আপোষ করে চলতে হয়। কিন্তু রাষ্ট্রশক্তি যদি ইচ্ছে করে, তা হলে কাউকে ফ্যাসাদেও ফেলতে পারে। পলাশভাইও সে রকম কোনও পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন না কি? না হলে এক বছর পর ফের তদন্ত শুরু হল কেন? চট করে কালকেতুর মনে হল, কয়েকদিন আগে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল। সেইসময় একদিন পলাশভাই গুম হয়ে লিভিং রুমে বসে ছিলেন। তখন রোজিনা ম্যাডামকে ও বলতে শুনেছিল, ‘আফনেরে এত কইর্যা কইলাম, জামায়েতিগো ফান্ডিং করতে অইব না। আফনে আমার কথা হুনলেন না। অহন সামলাইবেন কী কইর্যা, ভাবেন।’ কথাটা মনে পড়ায় কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘বাংলাদেশের পিএম পলাশভাইয়ের উপর চটলেন কেন রে?’
সুদীশ বলল, ‘নির্বাচনের সময় পলাশভাই এমন একটা পলিটিক্যাল পার্টিকে টাকা দিয়েছিলেন, যারা আওয়ামী লিগের বিরোধী। নামটা তোকে বলেই দিচ্ছি। জামায়েতি পার্টি। ভায়োলেন্স করার কারণে, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার জামায়েতিদের নেই। তবুও ওরা ঘুরপথে বিএনপি… মানে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির হয়ে এবার নির্বাচনে নেমেছিল। কিন্তু গোহারান হেরে গেছে। বুঝতেই পারছিস, পিএম-এর রাগের কারণটা কী হতে পারে। কাণাঘুষোয় পলাশভাই বোধহয় কিছু শুনেছিলেন। আমেরিকায় আসার কয়েকদিন আগে উনি পিএমকে ফোনও করেন। কিন্তু পিএম ফোন ধরেননি।’
‘বিএসআই কি পলাশভাইকে অ্যারেস্ট করবে?’
‘আপাতত নয়। প্রিয়তোষবাবু শুধুমাত্র কথা বলতে এসেছেন। সত্যিই ওঁর সঙ্গে জিহাদিদের কোনও কানেকশন আছে কি না জানতে। তবে, বোকার মতো কয়েকটা কাজ কিন্তু পলাশভাই করে ফেলেছেন। যেমন, চিরাগ আর ইমনকে বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া। জিহাদিদের উপর এই সিমপ্যাথিটা উনি দেখাতে গেলেন কেন? উনি ভাল করেই জানতেন, ছেলে দুটো জিহাদি।’
কালকেতু বলল, ‘চিরাগের কথা বলতে পারব না। আমি এটুকু জানি, পলাশভাইয়ের গ্রাম আমোদপুরের ছেলে ইমন। হয়তো সেই কারণেই…সফট কর্নার, বলতে পারিস।’
‘ইমন এখন কোথায় রে? এখানে, না কি নিউ জার্সিতে?’
‘এখানে। নিচে পার্কিং স্পেসে কোথাও আছে। কেন, ওকে ডাকব?’
‘এখন না। ওর সঙ্গে আমি আর প্রিয়তোষভাই আলাদা করে কথা বলব। ওর সম্পর্কে আমার কাছে যা খবর আছে, তাতে মনে হয়, ছেলেটা ব্রিলিয়ান্ট। এথিক্যাল হ্যাকিংয়ের কাজটা খুব ভাল করে জানে। বাংলাদেশ ডিফেন্স বা সিকিউরিটি এজেন্সিগুলো ওকে কাজে লাগালে, উপকার পাবে। তোর মুখে শুনেছি, ছেলেটা সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে চায়। সেটা ওকে আমাদের সামনে বলতে হবে। তার পর দেখি, ওকে দেশে ফেরানোর জন্য আমরা কিছু করতে পারি কি না।’
‘পলাশভাই কিন্তু সেই কারণেই ওকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তো উনি নিজেই ফেঁসে রয়েছেন।’
সুদীশ হেসে বলল, ‘অত ভাবিস না। আমি যদ্দুর শুনেছি, পলাশভাই একবার পিএম-এর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেই সব ঠিক হয়ে যাবে। পিএম ওঁকে ছেলের মতো ভালবাসেন। তা না করে উনি বাংলাদেশ থেকে ব্যাবসা গুটিয়ে নিয়ে এ দেশে থেকে যেতে চাইছেন। সেই কারণেও পিএম ওর উপর আরও চটেছেন। পারলে তুই একটু ওঁকে বোঝাস।’
শুনে কালকেতু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। জিজ্ঞেস করল, ‘চিরাগ এখন কোথায় রে?’
সুদীশ বলল, ‘হাসপাতাল ঘুরে ও এখন নিউ জার্সির হাডসন কারেকশনাল সেন্টারে। এমন একটা সেলে আছে যেখানে, মার্ডারার আর রেপিস্টদের ভিড়। রোজই খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে অথবা ওয়াশরুমে স্নান করতে যাওয়ার সময় চিরাগ প্রচণ্ড মারধর খাচ্ছে। এগেইন থ্যাঙ্কস টু ইমন। বলতে গেলে ও-ই চিরাগকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। সে এক অন্য গল্প।’
‘চিরাগ ছেলেটা খুব খতরনাক টাইপের। পলাশভাইয়ের খুব ক্ষতি করে দিত।’
‘ওর সম্পর্কে একটা ইন্টারেস্টিং খবর তোকে দিচ্ছি। কিন্তু কোত্থাও ডাইভালজ করবি না। তুই নিশ্চয় জানিস, কারেকশনাল সেন্টারগুলো কী রকম হোমোসেক্সচুয়ালদের আখড়া। ওখানে অন্য বন্দিরা জেনে গেছে, চিরাগ হিজড়ে। ওর লিঙ্গ নেই। ফলে ওর জীবন আরও দুবির্ষহ হয়ে উঠেছে। বন্দিরাই মারধর করে ওর পেট থেকে কথা বের করে নেয়। চিরাগ না কি স্বীকার করেছে, জন্ম থেকে ও হিজড়ে নয়। সিরিয়ার রাক্কায় ও একবার ওলা বলে একটা সিরিয়ানমেয়েকে আটকে রেখে দিনের পর দিন রেপ করেছিল। সিরিয়ান জিহাদিরা সে কথা জানতে পেরে ক্যালিফেটের মধ্যেই ওর লিঙ্গ কেটে নেয়। ভারতীয় হয়ে একজন সিরিয়ান মেয়েকে রেপ করার অপরাধে। তোকে একদিন বলেছিলাম না, আরব দেশের জিহাদিরা নন-আরব জিহাদিদের খুব নিচু চোখে দেখে। এটা তার গ্লেয়ারিং একজাম্পল।’
কথা বলতে বলতে ঘরের দিকে তাকিয়ে সুদীশ বলল, ‘চল, ভিতরে যাই। তোর পলাশভাই আবার উল্টোপাল্টা কিছু বলে ফেললেন কি না, গিয়ে শুনি।’
সুদীশের পিছুপিছু কালকেতু ঘরে ঢুকে এল। লিভিং রুমে ঢুকে ও শুনতে পেল, পলাশভাই খুব উৎসাহের সঙ্গে প্রিয়তোষবাবুকে বোঝাচ্ছেন, খৈয়াছড়ায় উনি কীভাবে নায়গারার ফলসের বিকল্প তৈরি করবেন!
