জিহাদি – ৪৬

(ছেচল্লিশ)

রোজিনা ম্যাডামের শারীরিক অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। ভোরবেলায় হাসপাতাল থেকে হেমলতা আন্টি খবর দিলেন, ম্যাডামের ডান হাতটা অসাড় হয়ে গেছে। ভাল লক্ষণ নয়। কালকেতু বুঝতে পারছিল না কী করবে? হাসপাতালে গিয়ে আন্টির পাশে দাঁড়াবে, না কি পলাশভাইকে সামলানোর জন্য অ্যাপার্টমেন্টে থেকে যাবে। পলাশভাইকে সবসময় চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে। বেঁচে থাকার আগ্রহটাই যেন উনি হারিয়ে ফেলেছেন। মদ্যপান করেই যাচ্ছেন। বারণ করা সত্ত্বেও শুনছেন না। গতকাল নিউ জার্সি থেকে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেছিল। অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে কালকেতু দেখে, পলাশভাই ক্যাপ্টেন মর্গানের বোতল খুলে বসে আছেন। মুখে একটাই কথা, ‘রোজিনা ম্যাডাম না থাইকলে আমি বাঁচুম কী কইর‌্যা, কন দেহি?’

রোজিনা ম্যাডাম কেমন আছেন, সে সম্পর্কে পলাশভাইকে কিছু জানানো হয়নি। র‌্যাঞ্চ থেকে নিউ ইয়র্কে আসার দিন সকালে উনি হাসপাতালে ম্যাডামকে দেখতে গেছিলেন। দূর থেকে দেখেই বুঝে গেছেন, বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। ম্যাডাম সেদিন আবোল তাবোল বকছিলেন। ওদের সন্তান হলে, তার নাম কী রাখবেন, তা নিয়ে একাই কথা বলে যাচ্ছিলেন নিজের সঙ্গে। আবার কখনও ধমকাচ্ছিলেন, ম্যাক বলে র‌্যাঞ্চের এক সিকিউরিটি গার্ডকে। গেস্টদের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার না করলে, পুলিশের হাতে তুলে দেবেন। ডাক্তার বললেন, ডেলিরিয়ামের মতো হয়েছে। এর পরের স্টেজ হালুসিনিয়েশন। কাঁচের দেওয়ালের এ পাশে পলাশভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে কালকেতুর মনে হয়েছিল, এ কোন পাপের শাস্তি পেতে হচ্ছে ম্যাডামকে? পলাশভাই তো চোখ মুছতে মুছতে সরে গেছিলেন।

রায়ান অস্ট্রিয়া থেকে যে ডাক্তারকে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি জবাব দিয়ে গেছেন। নিউ ইয়র্কের প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতালের কেবিনেই পড়ে আছেন রায়ান আর হেমলতা আন্টি। মৃত্যুর পথে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে দেখছেন মেয়েকে। রোজিনা ম্যাডামের মুখ দিয়ে সর্বদা লালা গড়াচ্ছে। এই লালা না কি ভয়ানক সংক্রামক। তাই ম্যাডামের ধারে কাছে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। র‌্যাবিজ আসলে জলাতঙ্ক রোগ। জল বা জলীয় কিছু দেখলেই ম্যাডামের শরীরে খিঁচুনির লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। প্রচণ্ড উগ্র আচরণ করছিলেন। ডাক্তার বলে গেছেন, ভাইরাস সংক্রমণ সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমে পৌঁছলে ম্যাডাম আগামী কালও মারা যেতে পারেন। আবার এই অবস্থা মাস ছয়েক ধরেও চলতে পারে। ম্যাডামের সুস্থ হয়ে ওঠার কোনও সম্ভাবনা নেই।

অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সকালের নিউ ইয়র্ক দেখছে কালকেতু। হাতে ধূমায়িত কফির কাপ। হেমলতা আন্টির ফোনটা পাওয়ার পর দুঃশ্চিন্তায় আর ও শুয়ে থাকতে পারেনি। বারান্দায় আসার আগে একবার পলাশভাইয়ের বেডরুমে উঁকি মেরেছিল। দেখেছে, উনি গভীর নিদ্রায় মগ্ন। মাস তিনেক আগে যে পলাশভাই ওর গল্ফগ্রিনের বাড়িতে গেছিলেন, সেই প্রাণচঞ্চল মানুষটা আর নেই। কালকেতু নিজেও অবাক, যে কাজের জন্য ও আমেরিকায় এসেছিল, অর্থাৎ কি না শিউলিদিদিকে খুঁজে বের করা, ঘটনাচক্রে সেই চিন্তা-ভাবনা ওর মাথা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ও বুঝতে পারছে, কলকাতায় বসে নিজস্ব গণ্ডীর মধ্যে রহস্যভেদ করা যতটা সহজ, বর্হিবিশ্বে এসে সেই কাজটা করা ততটাই কঠিন। দেশের আর কোনও রহস্যভেদী, ওর মতো এই চ্যালেঞ্জ, কখনও নিয়েছেন কি না, কালকেতু জানে না। যদি ও সফল হয়, তা হলে অসাধারণ একটা কীর্তি করে ফেলবে।

লিলি গডউইন কয়েকদিন আগে ফোনে অনুরোধ করেছিলেন, র‌্যাঞ্চ থেকে ফিরলে ও যেন ফাউন্ডেশনের অফিসে গিয়ে একবার দেখা করে। কিন্তু কালকেতুর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ও ঠিক করে রেখেছে, জন রিডের কাছ থেকে ছবিগুলো পেলে, তবে যাবে। র‌্যাঞ্চে থাকার সময় কম্পিউটার গ্রাফিক্স এই আর্টিস্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল লারেইনা। শিউলিদিদির ছয় বছর বয়সের ছবিটা দিয়ে কালকেতু তাঁকে অনুরোধ করেছিল, এই মেয়েটি পঞ্চাশ বছর বয়সে কেমন দেখতে হতে পারে, সেটা কি জানা সম্ভব? রিড খুব বিচক্ষণ মানুষ। কেন দরকার, সেটা জেনে নিয়ে উনি উৎসাহ দেখিয়ে ছিলেন সেদিন।

রিড বলেছিলেন, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চেহারা বদল অনেকগুলো ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে। কোন আবহাওয়া বা পরিবেশে তিনি থাকছেন, কতটা স্বাচ্ছন্দে তিনি বড় হয়েছেন, নীরোগ থেকেছেন কি না, কতটা মানসিক চাপ তাকে নিতে হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তবুও, মূল চেহারাটা থেকে যায়। খুঁটিয়ে দেখলে মানুষটাকে চেনা কঠিন হয় না। কালকেতু তখন লিলি গডউইনের কথা বলেছিল। নায়গারা ফলস-এর কাছে লিলি গডউইনের সঙ্গে তোলা ওদের সেলফিটা ওর মোবাইল ফোনেই ছিল। সেটা দেখিয়ে কালকেতু বলেছিল, ‘খবরের কাগজের ছবিটার সঙ্গে এই ভদ্রমহিলার মিল আছে কি না, সেটাই আপনাকে বলে দিতে হবে।’

রিড বলেছিলেন, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং। আপনার এই কেসের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারব ভেবে, আমার খুব ভাল লাগছে। আমাকে দু’তিনটে দিন সময় দিন। ভদ্রমহিলার অন্তত তিন চারটে এজ গ্রুপের ছবি, মনে হচ্ছে আপনাকে দিতে পারব।’ এখনও ছবিগুলো হাতে পায়নি কালকেতু। পেলে বুঝতে পারত, ঠিক লক্ষে যাচ্ছে কি না। আলবুকার্কে থাকলে হয়তো তাগাদা মারতে পারত। কিন্তু সেটা তো সম্ভব হল না। র‌্যাঞ্চ থেকে চলে আসার সময় কালকেতু ওর মেল অ্যাড্রেস দিয়ে এসেছে রিডকে। এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই ওর কাছে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার সময়ই সুদীশের ফোন পেল কালকেতু। ও প্রান্ত থেকে সুদীশ বলল, ‘বাঙালের চাকরিটা বেঁচে গেল, বুঝলি।’

‘বাঙাল’ মানে প্রিয়তোষবাবুর কথা বলছে। তখনই কালকেতুর মনে পড়ল, ঢাকায় ফিদাইন অ্যাটাকের কথা। কাল রাতে ভদ্রলোককে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে ওরা দু’জন চলে এসেছিল। ঢাকায় শেষ পর্যন্ত কী হল, সেটা জানার আগ্রহে কালকেতু তাই জিজ্ঞেস করল, ‘ফিদাইন অ্যাটাক আটকানো গেল?’

‘হ্যাঁ। আমাদের একটা কথা আছে না, ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি বাড়ে। ঠিক সেই রকম। আসল কাজটা করে দিলাম ইমন আর আমি। পুরো ক্রেডিট নিয়ে গেলেন প্রিয়তোষবাবু। এই একটু আগে এটিএন ঢাকা চ্যানেলটা দেখছিলাম। তাতে ভদ্রলোকের ফাটাফাটি প্রশংসা। ঢাকা থেকে ওরা ফোন ইন করেছিল। টিভিতে বাঙালটা বলল, এইরকম একটা সাবোতাজ যে হতে পারে, সেটা না কি আগেই বাংলাদেশ ইন্টেলিজেন্সের কাছে খবর ছিল। শালা, এই ফালতু কেতা নেওয়ার কারণেই আমি বাঙালদের সহ্য করতে পারি না। আমি যদি ইন্টারপোলকে অ্যাকটিভ না করতাম, তা হলে…।’

গলার ঈর্ষার সুর শুনে কালকেতু হাসতে লাগল। বাধা দিয়ে ও বলল, ‘তুই এত জেলাস হচ্ছিস কেন ভাই? ভদ্রলোক একটা জাতীয় দুর্যোগ সামলালেন, তাতে যদি ওঁর পদোন্নতি হয়, তাতে তোর তো কোনও ক্ষতি নেই। ফিদাইন বম্বারকে কি শেষ পর্যন্ত ওরা ধরতে পেরেছেন?’

‘হ্যাঁ, গাজিপুরে সে ধরা পড়েছে। টিভির খবরেই শুনলাম, সে পুরুষ নয়, গাজিপুরেরই এক মেয়ে। নাম ফিরোজা খাতুন। সে আবার এক জিহাদি রফিকুল আলমের বউ। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, দুবাইতে তোর পলাশভাইকে যারা কিডন্যাপ করেছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র এই রফিকুলই পুলিশের কাছে ধরা পড়েছিল। সে এখন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। গাজিপুরে জিহাদিদের প্ল্যান ছিল, পিএম-এর ফাংশন চলার মাঝে রফিকুলের মুক্তির দাবিতে ওরা প্রথমে স্লোগান দেবে। প্রতিশ্রুতি না পেলে ফিদাইন অ্যাটাক করবে। ফিরোজা বোরখার নিচে সুইসাইড জ্যাকেটটা এমনভাবে পরেছিল, যাতে দেখে মনে হয়, ও সাত-আটমাসের গর্ভবতী। পুলিশ প্রথমে চালাকিটা ধরতে পারেনি। ভাবতেই পারেনি, কোনও মেয়ে ফিদাইন অপারেশনে সামিল হতে পারে। তাই মেয়েটা একেবারে সামনের সারিতে গিয়ে বসতে পেরেছিল।’

কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘ও ধরা পড়ল কী করে?’

‘জিহাদিরা ফিদাইন অপারেশনে যখন কাউকে পাঠায়, তখন তাকে কেপ্টাগন নামে এক ধরনের ট্যাবলেট খেতে দেয়। এই টাবলেট খেলে মানুষের মধ্যে ভয়ডর চলে যায়। তখন তার মনে হয়, যে কাজটা তাকে করতে দেওয়া হয়েছে, সেটা করতেই হবে। যদি জান চলে যায়, তাতেও পরোয়া নেই। তখন তার ব্যথা বেদনার অনুভূতিটাও থাকে না। ফিরোজার মধ্যে সেই অস্বাভাবিকতা পুলিশ টের পেয়েছিল। এগেইন থ্যাঙ্কস টু ইমন। জিহাদিদের বাংলাদেশি লিঙ্ক থেকে ফিরোজার ছবি ও উদ্ধার করে দিয়েছিল। সেটাই সার্কুলেট করা হয় পুলিশে। ইমন ছেলেটা দেশের জন্য এত ভাল একটা কাজ করল, কিন্তু কোনও দাম পাবে না কেন, বল? বাঙাল প্রিয়তোষের জায়গায় আমি থাকলে কী করতাম, জানিস? এই সুযোগে ইমন ছেলেটাকে ন্যাশনাল হিরো বানিয়ে দিতাম। বেচারি অন্তত দেশে ফেরার সুযোগটা পেত।’

‘ইমনকে নিয়ে তোরা আপাতত কী ভাবছিস রে?’

‘আমেরিকায় থাকাটা ওর পক্ষে সেফ না। ওর উপর যাতে বাংলাদেশি মানুষের সিমপ্যাথি জাগে, দরকার হলে সে রকম একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করতে হবে। আর এটা করতে পারে, মিডিয়া। হ্যাঁরে, বাংলাদেশি সেই মেয়ে সাংবাদিকটার কোনও কন্টাক্ট নাম্বার তোর কাছে আছে? দেখি, ওর সাহায্য নেওয়া যায় কী না।’

কালকেতু বলল, ‘হ্যাঁ, রেজওয়ানা চৌধুরীর ফোন নাম্বার আমার কাছে আছে। হোল্ড কর, তোকে দিচ্ছি।’

রেজওয়ানার ফোন নাম্বারটা সুদীশকে দিয়ে কালকেতু বলল, ‘আর কী খবর আছে আছে, বল।’

সদীশ বলল, ‘রোকেয়া সুলতানা বলে ঢাকার একজন সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্টকে কি তোর মনে আছে?’

কালকেতু বলল, ‘ভাল মনে আছে। নায়গারায় জিহাদিদের গুলিতে উনি ইনজিওর্ড হয়ে ছিলেন। পরে ঢাকায় মারা যান।’

‘ইয়েস, লিলি গডউইন তাঁর নামেই ঢাকায় অনাথ আশ্রম খুলছেন। খুব শিগগির উনি ঢাকায় যাবেন। আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, লিলি যেখান থেকে জার্নিটা শুরু করেছিলেন, সেখানেই শেষ করবেন।’

কালকেতু বলল, ‘তোর মুখে ফুল চন্দন… সরি… চপ-কাটলেট পড়ুক। তোর ধারণা যেন সত্যি হয়। ভদ্রমহিলা আমাকে একবার দেখা করতে বলেছিলেন। ঠিক করেছি, খুব শিগগির ওর কাছে যাব।’

‘বেস্ট অফ লাক। ফিরে এসে জানাস, কী হল। এখন ছাড়ি।’ বলে সুদীশ লাইনটা ছেড়ে দিল।

বেলা বারোটার সময়, চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে ঘর থেকে বেরোতেই কালকেতু দেখল, পলাশভাই লিভিং রুমে বসে কার সঙ্গে যেন ফোনে খুব চেঁচিয়ে কথা বলছেন। লিলি গডউইনের কাছে যাচ্ছে, কথাটা পলাশভাইকে বলে যাওয়া উচিত। সেই কারণে কালকেতু দাঁড়িয়ে পড়ল। অন্য প্রান্তে যে কথা বলছে, তার নাম আফতাব। সে পলাশভাইয়ের এক্সপোর্ট কোম্পানির কোনও কর্মী। কথাবার্তায় কালকেতু বুঝতে পারল, ব্যাবসা নিয়ে নয়। আফতাব ছেলেটা বিয়ে করার জন্য দু’সপ্তাহের ছুটির কথা আগে থেকে ম্যাডামকে বলে রেখেছিল। কিন্তু কাগজে ম্যাডামের দুর্ঘটনার কথা পড়ার পর মত বদলেছে। বিয়েটা ও পিছিয়ে দিতে চায়।

এ দিক থেকে পলাশভাই তাকে বোঝাচ্ছেন, ‘আহাম্মকের মতোন কাম কইরো না আফতাব। যারে বিয়া করবা মনস্থির করসো, হেই মাইয়্যাডার কথা তুমি ভাববা না? এ কী কথা? মাইয়াগো বিয়া তো জীবনে এগবারই হয়। হ্যায় মনডা প্রস্তুত কইর‌্যা বইস্যা আসে। আর তুমি হারে দাগা দিবা? না, না, আমাগো কথা এক্কেরে ভাইবো না। তোমরা হনিমুনে চইল্যা যাইও। দ্যাশে ফিইর‌্যা তোমাগো আমি আশীর্বাদ কইর‌্যা আসুম।’

আফতাব বলে ছেলেটা বোধহয় ওদিকে গাইগুই করছিল, এ দিক থেকে পলাশভাই ধমকে উঠলেন, ‘বলদের মতো কথা কইও না। যা কইলাম, কইরো।’

বলেই লাইনটা উনি কেটে দিলেন। তার পর ওকে চোখে পড়ায় বলে উঠলেন, ‘দ্যাখসেন কাইলকেতুভাই। আইজকাইলকার পোলারা মাইয়াগো সেন্টিমেন্টই বোঝে না। হালায় কয়, আফনেগো এই অবস্থা। বিয়া করুম কী কইর‌্যা? যার সাথে বিয়া ঠিক হইসে, হ্যায় আমাগো গেরাম আমোদপুরের মাইয়া। তাইলে খুইল্যাই কই। ইমনের ছোট বুইন ফতেমা। আগেই বোধয়, এগবার কথাবার্তা হইসিল। পরে আফতাবের আববুরে কনভিন্স কইর‌্যা আমিই বিয়ার ঘটকালি করসিলাম। আফতাব ব্রিলিয়ান্ট পোলা। আমার এক্সপোর্ট কোম্পানি হ্যায় নিজেই সামাল দিতাসে। তা’ছাড়া, নারাণগঞ্জে হ্যাগো বিশাল সম্পত্তি। ফতেমা সুখে থাইকব হ্যার কাসে। বিয়ার পর হ্যাগো হনিমুনে দুবাইতে যাওনের কথা। প্লেনের টিকিট আমিই পাঠাইয়া দিসিলাম। আর দ্যাহেন, অহন বলদটা কইতাসে বিয়া পিছাইয়া দিবো।’

শুনে পলাশভাইয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কালকেতু। মানুষটা কী ধাতুর তৈরি! অধস্তন কর্মচারীর জন্যও এত ভাবেন? উল্টো দিকে, মালিকের সঙ্গেও কর্মচারীদের কী সুন্দর সম্পর্ক। আজকাল দেখাই যায় না। তা হলে, ওর ধারণাই ঠিক। পলাশভাই এমনি এমনি ইমনকে আশ্রয় দেননি। সফট কর্নার আছে বলে, উনি ঝুঁকি নিয়েও গ্রামের ছেলেকে নিজের কাছে রেখেছিলেন। শুধু তাই নয়, ওর পরিবারের লোকজন যাতে ভাল থাকে, আমেরিকায় বসে সে চিন্তাও মানুষটা করে যাচ্ছেন। কালকেতুর মনে অনেকগুলো প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে এল। বিশেষ করে, ইমনকে নিয়ে। কিন্তু সে সব প্রশ্ন করার সময় এখন কি না, ও বুঝে উঠতে পারল না। প্রসঙ্গ বদলে ও বলল, ‘পলাশভাই, আমি একটু লিলি গডউইনের অফিস থেকে ঘুরে আসছি। উনি আমায় ডেকেছেন। আপনার ডালাস প্রোজেক্টটা নিয়ে কি ওঁকে কিছু জিজ্ঞেস করব?’

পলাশভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডালাসের কোন প্রোজেক্টের কথা, ক’ন তো?’

‘চাইল্ড প্রোকেটশন সেন্টার। প্লেনোতে আপনি আর ম্যাডাম যেটা স্টার্ট করতে চাইছিলেন।’

‘না, না। জিজ্ঞাস কইর‌্যা কোনও লাভ নাই। সেন্টার খুইল্যা কী অইব? ম্যাডামই থাইকব না, প্রোজেক্ট চালাইব কে? এহানে সব বিকরিবাট্টা কইর‌্যা আমি দ্যাশে ফিইর‌্যা যাম। যান, আফনে পারলে ইমনরে একবার ফোন কইর‌্যা ডাকেন। হ্যার সাথে আমার দরকার আসে।’

একটু ইতস্তত করেই কালকেতু জিজ্ঞাসা করল, ‘ইমনকে নিয়ে কোথাও বেরোবেন না কি?’

পলাশভাই বললেন, ‘হ। প্রথমে এহানকার মেক্সিকান পাড়ায় যামু। ওহানে মারসেডো সালিনাস বইল্যা একজন ব্ল্যাক ম্যাজিসিয়ান আসেন। রোজিনা ম্যাডাম হ্যারে খুব বিশ্বাস কইরতেন। ট্যাহা-পয়সা খরচ কইরলে হ্যায় মরা লোগরেও না হি বাঁচাইয়া দিতে পারেন। হ্যার সাথে আইজ দেখা করুম। তার পর যাম হাসপাতালে। ভালা কথা, আইজ ম্যাডামের আম্মির কাছ থেইক্যা কোনও খবর পাইসেন না হি?’

মি. সালিনাসের কথা রোজিনা ম্যাডাম একদিন বলেছিলেন বটে। যিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, শিউলিদিদি এখনও বেঁচে আছেন। তবে অভিশাপের কারণে ফ্যামিলি থেকে ছিটকে গেছেন। টাকা পয়সা খরচ করলে না কি তাঁর খোঁজ পাওয়া যাবে। কথাটা মনে পড়ায় কালকেতু মনে মনে হাসল। মন যখন দুর্বল হয়, তখন লোকে জ্যোতিষীর কাছে যায়। মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যই পলাশভাই মি. সালিনাসের কাছে যেতে চাইছেন। বাধা দেওয়া উচিত না। তবুও, পলাশভাইকে একা ছেড়ে দিতে মন চাইল না কালকেতুর। ম্যাডামের ডান হাত প্যারালাইজড হয়ে গেছে শুনলে পলাশভাই আরও মুষড়ে পড়বেন। তাই ও বলল, ‘ম্যাডাম একইরকম আছেন। ইমনকে আসতে বলে দিচ্ছি। নিউ জার্সির বাসা থেকে ওর আসতে ঘণ্টাখানেক তো লাগবেই। আমি না হয় অন্য একদিন গিয়ে লিলি ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করে আসব। আজ চলুন, আপনার সঙ্গে মি. সালিনাসের কাছে যাই। আমারও ওকে দেখার খুব ইচ্ছে।’

পলাশভাই সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘চলেন তাইলে। একা একা আমার ভালা লাগতাসে না কাইলকেতুভাই। হায় হায়…আমি যে ম্যাডামরে ভুলতে পারতাসি না। এই অ্যাপার্টমেন্টে যে হ্যারে লইয়্যা আমি সংসার পাতুম, ঠিক করসিলাম। অ্যাপার্টমেন্টে হর্বত্র হ্যার ছোঁয়া। হায় রে, আইজ পর্যন্ত কোনও মানষের ক্ষতি করি নাই। কাউরে কটু কথা কই নাই। মিথ্যার আশ্রয় লই নাই। কোন পাপে জেসাস ক্রাইস্ট আমারে শাস্তি দিতাসেন, জানি না।’ বলতে বলতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে পলাশভাই দু’হাতে মুখ ঢাকলেন।

যীশু খ্রীস্টের কথা শুনে কালকেতু চমকে উঠল। পলাশভাই তা হলে ক্রিশ্চান! ম্যাডামকে পাওয়ার আশায় উনি কি ধর্মও পরিবর্তন করেছিলেন? এতদিন একসঙ্গে রয়েছে। অথচ পলাশভাইয়ের সম্পর্কে ওর কত কী অজানা রয়ে গেছে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *