(নয়)
নিউ জার্সিতে ইসেলিন বলে একটা জায়গায় পলাশভাইয়ের বাংলো বাড়ি আছে। চেলসির অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মাত্র ঘণ্টাখানেকের ড্রাইভ। একতলা বাড়িটা একেবারে ছবির মতো। পিছনের দিকটায় ঘন জঙ্গল। কিন্তু সামনের দিকে মখমলের মতো মসৃণ ঘাসের লন। বাড়ির সামনেই একটা সুইমিং পুল আছে। তাতে নীল জল টলটল করে। বাংলোর চারপাশটা পাথরের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। অনুমতি ছাড়া বাইরের লোকদের ঢোকা মুশকিল। লোহার কারুকাজ করা বিশাল সদর দরজা। খোলে রিমোট কন্ট্রোলে। বাইরে থেকে কেউ ডোর বেল টিপলে তার মুখটা ঘরে বসেই সিকিউরিটি সিস্টেমের পর্দায় দেখতে পাওয়া যায়। মালিকের মরজি, সে প্রবেশাধিকার পাবে কি না। গেটে গার্ড অবশ্য আছে। দিনে-রাতে দু’বেলা দু’জন পাহারা দেয়। দু’দিন আগে নিরাপত্তার বলয়ে ঘেরা এই রকম বাংলোয় পলাশভাই নিয়ে এসেছেন কালকেতুকে।
হ্যালোইনের রাতে পার্টি থেকে চেলসির অ্যাপার্টমেন্টে ফিরেই হামলার নজির দেখে পলাশভাই বলেছিলেন, ‘আর আমি রিস্ক নিমু না কাইলকেতুভাই। কাইলই আফনেরে আমার নিউ জার্সির বাংলোতে নিয়া যামু। এহানে আফনে সেফ না।’ তার পর প্রায় সারারাত্তির সিটি পুলিশ আর এফবিআইকে গালাগাল করে ছিলেন। ‘এহানে আফনের কিছু হইয়া গেলে আমি ফুল্লরাভাবীর কাছে মুখ দেখাইমু কী কইর্যা? হালায় অপদার্থ পুলিশ। অহনও টেররিস্টগুলান ফ্রিলি ঘুইর্যা বেরাইতাসে।’
সেদিন রাতে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে দরজার সামনে রক্ত দেখে রোজিনা ম্যাডামের মুখও ফ্যাকাশে হয়ে গেছিল। সঙ্গে সঙ্গে উনি নাইন ওয়ান ওয়ানে ফোন করেছিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুলিশ, অ্যাম্বুল্যান্স আর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি একসঙ্গে এসে হাজির। যা ঘটেছিল, কালকেতু খুঁটিয়ে তা বলেছিল পুলিশকে। সদর দরজা আস্তে আস্তে ফাঁক হতে দেখে প্রথমে ও ঘরের আলো নিভিয়ে দেয়। আসলে একটু সময় চেয়েছিল। যাতে ঘরের ভিতর ঢুকে ধাতস্থ হতে জঙ্গিটা একটু সময় নেয়। দ্রুত আশপাশে তাকিয়ে কালকেতু তখন হাতের সামনে কাচের একটা ফুলদানি পেয়েছিল। সেটা শক্ত করে ধরে জঙ্গি ছেলেটাকে আর সময় দেয়নি। পিস্তল ধরা হাত লক্ষ করে সজোরে ছুঁড়ে মেরেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ‘আম্মি’ বলে একটা আর্তনাদ। কাঠের মেঝেতে ধাতব কিছু পড়ে যাওয়ার ঠক আওয়াজ। তার পরই লিফটের দিকে কেউ ছুটে গেছিল। তখনই ও হাত দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। কয়েক সেকেন্ড পর কালকেতু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাক, এ বারের মতো প্রাণটা বেঁচে গেল।
‘আপনি বলেই কমব্যাট করতে পেরেছেন কালকেতুভাই।’ অনেকক্ষণ পর রোজিনা বলেছিলেন, ‘পলাশ ঠিকই বলছেন। চলেন, কাল ব্রেক ফাস্টের পর আমরা নিউ জার্সিতে চলে যাই।’
পুলিশ ঘণ্টাখানেক তদন্ত করে পিস্তলটা খুঁজে পেয়েছিল। যাওয়ার সময় বলে গেছিল, ‘যে গাড়ি করে টেররিস্টরা পালিয়েছে, সেটা আইডেন্টিফাই করা গেছে। ব্রুকলিন ব্রিজ দিয়ে গাড়িটাকে যেতে দেখা গেছে। মনে হয়, আজ রাতেই আমরা ওদের ধরে ফেলতে পারব।’
শুনে বিশ্বাস করেননি পলাশভাই। বলেছিলেন, ‘আগেরবারও নায়গারায় হ্যারা এক কথা কইসিল। গাড়ি ধরসিল, মানুষ ধইরতে পারে নাই। হ্যারা ঘোড়ার ডিম প্রসব কইরব।’
গত দু’দিন ধরে পলাশভাইয়ের মাথা এমন গরম, সেভও করেননি। মুখে হালকা দাঁড়ি গজিয়েছে। সবসময় চিন্তার ছাপ। তৃতীয়দিন নিউ ইয়র্ক থেকে পুলিশ ফোন করে জানাল, কামাল গামা বলে একজন ইরাকি টেররিস্টকে ওরা আটক করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, গোপন ডেরায় তার সঙ্গে আরও তিন জঙ্গি ছিল। একজনের হাতে চোটের চিহ্ন আছে। পুলিশ তার সন্ধান করছে। রোজিনার মুখে এই খবরটা শোনার পর থেকে পলাশভাই ফের ফুরফুরে মেজাজে। কখন যেন একবার বললেনও, ‘নিউ ইয়র্ক পুলিশরে যতটা অকম্মা ভাবসিলাম, ততডা না, বোঝলেন কাইলকেতুভাই। দ্যাখবেন, ঠিক অরা বাকি তিনজনরে ধইর্যা ফেইলব।’
যে কাজের জন্য কালকেতুর নিউ ইয়র্কে আসা অর্থাৎ পলাশভাইয়ের শিউলিদিদিকে খুঁজে বের করা… তার কিছুই এগোয়নি। নায়গারা ট্রিপের পর থেকে সে ব্যাপারে কোনও উচ্চবাচ্যও করছেন না পলাশভাই। মানুষটাই এমন হুজুগে। ওর পিছনে লাখ চারেক টাকা ইতিমধ্যেই খরচা করে ফেলেছেন। অথচ একবারও জিজ্ঞাসা করেননি, আসল কাজ কতদূর এগোল। মনে মনে অস্বস্তি অনুভব করছে কালকেতু। কলকাতায় থাকার সময় ও কিছুটা রিসার্চ করে এসেছিল। রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পেও গিয়েছিল। কেননা, শরণার্থীদের বড় একটা দলের ঠাঁই তখন হয়েছিল ওই ক্যাম্পে। তার পর সুদীশের সঙ্গে কথা বলে ও ঠিক করেছিল, খোঁজ শুরু করবে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর পুরনো ফাইল দেখে। বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় ওই কাগজে বেশ কয়েকদিন লেখালিখি হয়েছিল শিউলিদিদিকে নিয়ে। কালকেতুর এমনই দুর্ভাগ্য, নিউ ইয়র্কে দিন তিনেক কাটানো সত্ত্বেও একবারও খবরের কাগজের অফিসে যাওয়ার সময় বা সুযোগ ও পায়নি।
নাহ, আর আলসেমি করে লাভ নেই। আজ একবার নিউ ইয়র্কে যাওয়ার কথা তুলবে বলে কালকেতু ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, পলাশভাই লিভিং রুমের সোফায় বসে, ঘনঘন সেলফি তুলছেন রোজিনা ম্যাডামের সঙ্গে। কাঁধে হাত দিয়ে, কোমর জড়িয়ে ধরে। হঠাৎ সেলফি তোলার এত উৎসাহ কেন, তাও আবার ঘনিষ্ঠ পোজে, কালকেতুর বোধগম্য হয়নি। মোবাইল সেটটা আইফোন এক্স… একেবারে লেটেস্ট মডেলের। নায়গারাতে যাওয়ার আগের দিন পলাশভাই অ্যাপল স্টোরে গিয়ে কিনে এনেছেন, দুর্দান্ত ছবি ওঠে বলে। হাজার ডলার দাম শুনে মাথা ঘুরে গেছিল কালকেতুর। পলাশভাই তখন ওর জন্যও একটা সেট কিনতে চাইছিলেন। কিন্তু কালকেতুই বাধা দিয়ে বলে, ‘আগে আপনার শিউলিদিদিকে খুঁজে বের করি। তার পর যা উপহার দিতে চান, নেব।’
ওকে লিভিং রুমে ঢুকতে দেখে পলাশভাই সোফায় একটু সরে বসে, আন্তরিকভাবে ডাকলেন, ‘আসেন, আসেন কাইলকেতুভাই। আফনের সাথেও সেলফি তুইল্যা রাখি।’
হালকাভাবেই কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘হঠাৎ এত সেলফি তোলার ইচ্ছে হল কেন?’
ওঁর হয়ে উত্তর দিলেন রোজিনা, ‘উনি নো শেভ নভেম্বর পালন করবেন বলে।’
বুঝতে না পেরে কালকেতু বলল, ‘তার মানে?’
‘পুরো নভেম্বর মাসটায় উনি শেভ করবেন না। দেখছেন না, হ্যালোইনের পরদিন… মানে পয়লা নভেম্বর থেকে আপনার পলাশভাই গোঁফ-দাঁড়ি রাখতে শুরু করেছেন। একমাস কাটবেন না। সেই কারণে এখন সেলফি তুলে রাখছেন। পয়লা ডিসেম্বর শেভ করার আগে ফের উনি সেলফি তুলে মিলিয়ে দেখবেন, ওঁর লুক কতটা চেঞ্জ হয়েছিল।’
‘হঠাৎ এই অদ্ভুত শখের কারণ?’
পলাশভাই বললেন, ‘শখ না কাইলকেতুভাই। হ্যার পিছনে একডা মহৎ উদ্দেশ্য আসে। আমেরিকায় নো শেভ নভেম্বর পালন কইর্যা, লোগে যে ট্যাহাডা বাঁচায়, তা দান করে ক্যানসার ফাউন্ডেশনে। ক্যানসার সম্পর্কে পাবলিকের অ্যাওয়ারনেস বাড়ানোর লইগ্যা এই টার্গেট। এই ট্যাহা অরা খরচা করে ক্যানসার নিয়া রিসার্চ করব বইল্যা। হেইডা একডা ওয়েব সাইট বেইসড অর্গানাইজেশন। নো শেভ করার আগে সেহানে রেজেস্ট্রি কইরতে হয়। আসলে কী জানেন কাইলকেতুভাই, ক্যানসার হইলে পেসেন্টের চুল দাঁড়ি উইঠ্যা যায়। ভাল হইয়্যা গেলে ফের হ্যাগো চুল গজায়। সেই লক্ষ্যেই আফনে ট্যাহা ডোনেশন দিতাসেন। নিউজপেপারে কত লেখালেখি হইসে, আফনের চোখে পড়ে নাই?’
শুনে কালকেতু একটু অবাকই হল। আমেরিকানরা পারেনও ভাবতে। ক্যানসার রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এমন একটা অভিনব আইডিয়া বের করেছেন যাতে, সাধারণ লোককেও এই মহান ব্রতে জড়িয়ে নেওয়া যায়। যার যা সামর্থ, তা নিয়ে পাশে এসে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু ডোনেট করার জন্য পলাশভাইয়ের দাড়ি রাখার দরকার কী? উনি ধনকুবের মানুষ। এমনিতেই প্রচুর টাকা ডোনেশন দিতে পারেন। তার জন্য এমন কৃচ্ছসাধন ওঁর না করলেও চলে।
আরও একটা কথা কালকেতুর মাথায় এল। সেটা হল, নো শেভ নভেম্বর থেকে আর কত টাকা উঠতে পারে? প্রশ্নটা করতেই পলাশভাই বললেন, ‘ক’ন কী? লোগে যদি মুইচ আর দাঁড়ি শেভ না করে, তাইলে পার মান্থ কম কইর্যা একশো ডলার বাঁচাইতে পারে। ভাবেন তো, পাঁচ লাইখ লোক সামিল হইলেও পঞ্চাইশ কোটি ডলার। মানে হাফ আ বিলিয়ন! আফনেগো ট্যাহায় সাড়ে তিনশো কোটি! কম না হি?’
কৌতূহল হওয়ায় কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘এই একটা মাস কি এখানে সেলুন-টেলুন বন্ধ থাকে?’
রোজিনা হেসে বললেন, ‘না, না। ওদেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকে। নভেম্বর মাসে কেউ চুল-দাঁড়ি কাটতে গেলে সেলুনে ফিফটি পার্সেন্ট ছাড় দেয়। অনেকে আবার দাড়ি-গোঁফ ট্রিম করতে যায়। সেটা অ্যালাউড। পলাশ যে হিসেবটা দিলেন, আমার মনে হয়, সেটা ঠিক না। মেয়েদের পার্টিসিপেশনের কথা উনি বলেননি। আমেরিকান মেয়েরা হাতে-পায়ে লোম পছন্দ করে না। লোম শেভ করার খরচাও কিন্তু কম নয়। মাস গেলে পার হেড টোয়েন্টি টু টোয়েন্টি ফাইভ ডলার। সেটাও হিসেবের মধ্যে রাখুন।’
পলাশভাই বললেন, ‘এই মাসডায় পুরা… আফনে ক্যাম্পেনডা লক্ষ কইরবেন কাইলকেতুভাই। লোকে নো শেভ নভেম্বরের টি শার্ট আর হুডি পইর্যা ঘুইর্যা বেড়াইতাসে। মাইয়াগো হাতেও নো শেভ নভেম্বর লেখা ব্রেসলেট। কোট বা ব্লেজারের পকেটে ল্যাপেল পিন। রাস্তায় বাইর হইলেই আফনে বুঝতে পাইরবেন, কারা ব্রত পালন করতাসে। আমেরিকানরা যা করে, অন্য লেভেলে উইঠ্যা করে। সত্যিই, এই জাতটারে হ্যাটস অফ করতে অইবই।’
পলাশভাইয়ের মুখে আমেরিকানদের প্রশংসা শুনে রোজিনা মিটিমিটি হাসছেন। এ বার বললেন, ‘কালকেতুভাই, আপনার কাছ থেকে একটা প্রশ্ন আশা করেছিলাম। ভেবেছিলাম, আপনি জানতে চাইবেন, এরা নভেম্বর মাসটাকেই বেছে নিল কেন?’
কালকেতু বলল, ‘অ্যাপারেন্টলি আমার যা মনে হচ্ছে, সেটা বলি?’
পলাশভাইও সকৌতূকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন। দেখে কালকেতু বলল, ‘নভেম্বর মাসে সবে ঠান্ডা পড়তে শুরু করে। দাড়িটা স্কিন প্রোটেকশনের কাজ করে। মনে হয়, আরও একটা কারণ থাকলেও থাকতে পারে। দাড়ি-গোঁফ পুরুষদের ব্যক্তিত্ব অনেক বাড়িয়ে দেয়। ক্রিসমাসের ঠিক আগে দেখতেও ভাল লাগে।’
‘ঠিকই কইসেন।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলেন পলাশভাই। তার পর রোজিনার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হ্যার আইকিউ লেভেল আমার-আফনের থেইক্যা অনেক বেশি। কালকেতুভাইরে জইধ কইরতে পারবেন না। হ, হত্যই, আসল কারণডা কিন্তু থ্যাঙ্কস গিভিং ডে, ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ারস সেলিব্রেশন। নভেম্বরে দাঁড়ি-গোঁফ রাইখলে পরপর এই তিনডা অকেশনে পুরুষগো পুরুষ-পুরুষ দেখায়।’
সুযোগ পেয়ে কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘একটা জিনিস আমি বুঝতে পারছি না, এক মাস শেভ না করলে একজন মানুষের দাড়ি-গোঁফ কতটা আর বাড়তে পারে?’
‘হাফ ইঞ্চি, তার বেশি না। কিন্তু লোকে আফনের দিগে আলাদা চোখে তাকাইব। বুঝব, সমাজের প্রতি আফনে কর্তব্য পালন করতাসেন।’
রোজিনার বোধহয় কোথাও যাওয়ার তাড়া আছে। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উনি বললেন, ‘আপনারা আলোচনা চালিয়ে যান। এখানকার ইন্ডিয়ান পাড়ায় আমার একটা বিজনেস মিটিং আছে। আমি যাই। লাঞ্চে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে।’
দু’পা এগিয়ে কী মনে পড়ায়, ফের ঘুরে দাঁড়িয়ে উনি পলাশভাইকে বললেন, ‘হোনেন, মেন গেটের দুইজন সিকিউরিটি গার্ড ছুটি চাইসে। ক্রিসমাসের সময় দ্যাশে যাইতে চায়। আমি দুই হপ্তায়ের ছুটি দিসি। আর এজেন্সিরে ফোন কইর্যা দিসি, দুইজন নতুন গার্ড পাঠাইতে। আফনে হ্যাগো সাথে কথা কইয়া নিবেন। অরা য্যান, বুইঝ্যা শুইন্যা লোগ পাঠায়।’
কথাগুলো পলাশভাইয়ের কানে গেল বলে কালকেতুর মনে হল না। নো শেভ নভেম্বরের আলোচনার রেশ ধরে উনি বললেন, ‘আমাগো বাংলাদ্যাশেও একডা ক্যানসার ফাউন্ডেশন আসে। পার ইয়ার আমার কাছ থেইক্যা ভাল ট্যাহা নেয়। কিন্তু, দুঃখের কথা কী কমু, ট্যাহা কোথায় খরচ করে জাইনতে চাইলে, জানায় না। অনেস্টি বইল্যা আর কিছু অবশিষ্ট নাই, বোঝলেন কাইলকেতুভাই।’
পলাশভাইয়ের সঙ্গে কী কথা আলোচনা করার জন্য এসেছে, এতক্ষণে কালকেতুর তা মনে পড়ল। কিন্তু উনি সুযোগই দিচ্ছেন না। অস্ট্রেলিয়ায় ক্যানসার ফাউন্ডেশনের জন্য কীভাবে টাকা তোলা হয়, সে গল্প শোনাচ্ছেন। হঠাৎ সিকিউরিটি সিস্টেমের পর্দায় গার্ডের মুখ ভেসে উঠল। বাইরে দু’জন ভিজিটর দাঁড়িয়ে আছেন। পলাশভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে চান। ভিজিটরদের মুখ পর্দায় দেখা যেতেই পলাশভাই বললেন, ‘তুমি! নায়গারা থেইক্যা ফেরার সময় রেস্ট এরিয়ায় তোমার সঙ্গেই তো দেখা হইসিল। তাই না? তোমার নাম তো ইমন। তা কী মনে কইর্যা?’
পর্দার দিকে ভাল করে তাকিয়ে কালকেতু দেখল, পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের দুটি ছেলে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে। একজনের পরনে জিনসের প্যান্ট ও কালো জ্যাকেট, কাঁধে ব্যাগ। অন্যজনের গায়ে সাদা রঙের টি শার্ট, তাতে লেখা নো শেভ নভেম্বর। টি শার্ট পরা ছেলেটা করুণ মুখে বলল, ‘ছ্যার, আফনে কাইজ-কাম দিবেন কইসিলেন। খুব অসুবিধার মধ্যে পড়সি। দ্যাশে ফিরার ট্যাহাও নাই। আফনে না দ্যাখলে আমাগো না খাইয়া মরতে অইব। প্লিজ, ছ্যার আমাগো ফিরাইয়া দিবেন না।’
পলাশভাই খুব বিচলিত হয়ে উঠলেন বলে কালকেতুর মনে হল। উনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার সাথে যে পোলাডা আইসে, সে কে?’
ইমন বলে ছেলেটি বলল, ‘হ্যায় চিরাগ, ইন্ডিয়ান। করিমগঞ্জের পোলা। আমার সাথে পাবলিক স্টোরেজেই কাম কইরত। হ্যারেও মালিক বাইর কইর্যা দিসে।’
‘ঢাকায় তুমি ক’দ্দূর ল্যাখাপড়া করসিলা?’
‘আমি কলেজ অবধি পড়সি। কিন্তু পাশ করি নাই।’
‘পাবলিক স্টোরেজে কী কাম কইরতা?’
‘সিকিউরিটি গার্ডের ছ্যার। আমাগো দুইজনেরই সিকিউরিটি ট্রেনিং নেওয়া আসে। আমাগো এড্ডু হেলফ করেন ছ্যার। পরে আফনের অনেক কাজে লাগুম।’
পলাশভাই একটু চিন্তা করে বললেন, ‘তোমরা যদি আধঘণ্টা আগে আইসতা, তাইলে পাকা কথা দিতে পাইরতাম। কিন্তু এহানে আমার বিজনেস যে ম্যাডাম চালান, হ্যায় অহন নাই। তোমরা এ হানে আছ কোথায়? পরে একবার দেখা কইরতে পারবা?’
‘রাস্তায় আছি ছ্যার। অনেক কষ্টে ট্রেনে কইর্যা নিউ জার্সিতে আইসি। আমাগো থাকনের জায়গা নাই। দুই রাত্তির চোখে ঘুম নাই, খাওয়া দাওয়া, স্নান নাই। এজেন্টের পাল্লায় পইড়্যা এ দ্যাশে আইসিলাম। খুব ভুল করসি ছ্যার। জমি বিককিরি কইর্যা আববু এজেন্টেরে ট্যাহা দিসিল। অহন দ্যাশে ফিরতে পারুম না।’
‘থাউক থাউক। আর কিছু কইতে অহব না। তোমরা আহাম্মক, তাই বইল্যা আমি তো আহাম্মক হইতে পারি না। আমার বাসায় সিকিউরিটি গার্ডের কাম কইরতে পারবা?’
‘পারুম ছ্যার। এগবার বিশ্বাস কইর্যা দ্যাখেন।’
‘তুমি আমার দ্যাশের পোলা। তোমারে বিশ্বাস না কইর্যা পারি? আইসো, তাইলে ভিতরে চইল্যা আইসো। আইজ রাইতটা আউটহাউসে থাকো। কাইল রোজিনা ম্যাডামরে তোমাগো কাগজপত্তর সব দ্যাখাইও।’
