(চুয়াল্লিশ)
ইউনিসেফের কনফারেন্স রুমের বাইরে লিলি গডউইন অপেক্ষা করছেন। কাচের দেওয়ালের ও পাশে তিনি দেখতে পেলেন, লাউঞ্জে রেজওয়ানা, মার্থা আর মি. বাম কিম দাঁড়িয়ে আছে। তাঁকে দেখে বাম কিম দূর থেকে দুটো আঙুল ভি আকারে তুলে দেখালেন। ভি ফর ভিক্টরি। দেখে লিলি খুশি হলেন। তার মানে, ইউনিসেফের মিটিংয়ে রোহিঙ্গা বাচ্চাদের নিয়ে তাঁর ব্রিফিং মন্দ হয়নি। বাম কিম এমনিতে একটু অর্ন্তমুখী টাইপের। চট করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন না। কিন্তু আজ নিজেকে সামলে রাখতে না পেরে, কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে, হাসিমুখে উনি বললেন, ‘কনগ্রাটস ম্যাডাম। আপনার সুপার্ব প্রেজেন্টেশন আজ আমাদের সবার মন ছুঁয়ে গেছে। ওয়ান্ডারফুল, অসাম।’
রুমাল দিয়ে মুখ মুছে লিলি বললেন, ‘থ্যাঙ্কস মি. কিম। রোহিঙ্গা বাচ্চাগুলোর জন্য কিছু করতে পারলে আমি খুব খুশি হব। তাই একটু তৈরি হয়েই এসেছিলাম।’
বাম কিমের দেখাদেখি, রেজওয়ানাও ভিতরে ঢুকে এসে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলল, ‘ম্যাডাম, অ্যাদ্দিন আপনাকে চিনতে পারিনি। রোকেয়া আপাকে আজ আপনি যা সম্মান দিলেন, বাংলাদেশের মানুষ তা কোনওদিন ভুলবে না।’
বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা বাচ্চাদের উপর অত্যাচারের ঘটনা ইউনিসেফের নজরে আনার জন্য কর্তাদের মিটিং ডাকতে অনুরোধ করেছিলেন লিলি। মিটিংয়ে এত লোক হবে, আজ সকালেও তিনি ভাবতে পারেননি। থ্যাঙ্কস টু মার্থা। পেন ড্রাইভে রোকেয়ার পাঠানো ছবিগুলো ভাগ্যিস সাজিয়ে দিয়েছিল। ছবিগুলো পর্দায় ফেলে লিলি যখন রোহিঙ্গা বাচ্চাদের উপর মায়ানমার সেনার নিষ্ঠুরতার ব্বিরণ দিচ্ছিলেন, তখন ইউনিসেফ কর্তাদের মধ্যে অনেকেই আর চুপ করে থাকতে পারেননি। ‘শেম, শেম’ বলে চিৎকার করে উঠেছিলেন। লিলির চোখেও জল এসে গিয়েছিল। বক্তৃতা থামিয়ে একাধিকবার তিনি রুমাল দিয়ে চোখও মুছেছিলেন। ‘এই বাচ্চাগুলোর জন্য এখুনি আমাদের কিছু করা দরকার। এখুনি। না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।’
কথা বলতে বলতে একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলেন লিলি। তখন আর টেররিস্ট অ্যাটাক, মৃত্যুভয়, ফাউন্ডেশনে হ্যাকিং, এলসা আন্টির ষড়যন্ত্র, অতীত জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টার কথা তাঁর মনেই ছিল না। পর্দা জুড়ে মৃত রোহিঙ্গা শিশুর নিথর দেহ, তাতে জলজ প্রাণীর দংশনের চিহ্নগুলো তাঁর চোখের সামনে ভাসছিল। কানে রোহিঙ্গা মায়ের তীব্র আর্তনাদ আর হাহাকারের শব্দ। মনের ভিতর থেকে গলগল করে কিছু কথা উঠে আসছিল। বক্তৃতায় হন্ডুরান, ইয়েমেনিজ, রোহিঙ্গা বাচ্চারা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল। ‘যে যেখানেই থাকুক, যে ধর্মেরই হোক, এরা সবাই মানবসন্তান, ঈশ্বরের প্রিয়পাত্র।’ লিলি বলেছিলেন, ‘আমরা যেন তা না ভুলি। সেই তাগিদেই ঢাকায় আমি চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের একটা শাখা খুলতে চাই। অনাথ রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য। রোকেয়া সুলতানা চাইল্ড কেয়ার ইউনিট। আপনাদের অবগতির জন্য জানাই, রোহিঙ্গা শিশু নিগ্রহের যে ছবিগুলো একটু আগে আপনাদের দেখালাম, তা আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশের সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট রোকেয়া সুলতানা। সম্প্রতি তিনি জঙ্গিদের আক্রমণে মারা গেছেন। ঢাকার ইউনিটের সঙ্গে আমি তাই তাঁর নামটা জুড়ে রাখতে চাই।’ লিলির ঘোর কেটেছিল অনেকক্ষণ পর, হাততালির শধে।
ইউনিসেফ কর্তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন। ওঁরা কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটা জানার জন্য লিলি বাইরে অপেক্ষা করছেন। হঠাৎ কনফারেন্স রুমে দরজা খুলে গেল। কর্মাধ্যক্ষের সচিব মেরি ক্লপের মুখটা উঁকি দিল, ‘মিস গডউইন, দয়া করে আপনি ভিতরে আসুন।’
মিসেস ক্লপের সঙ্গে কনফারেন্স রুমের ভিতরে ঢুকতেই ফের হাততালির ঝড়। ফোটোগ্রাফারদের ক্যামেরার ঝলকানি। লিলি পোডিয়ামে ওঠার পর কর্মাধ্যক্ষ অ্যান্টনি গোমস বললেন, ‘মিস গডউইন আপনার বক্তব্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত। আপনার প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করলাম। আপনি যত শিগগির পারেন, রোকেয়া সুলতানা চাইল্ড কেয়ার ইউনিট চালু করে দিন। আমি নিজে ইনঅগোরেশনের দিন সেখানে হাজির থাকব। ইউনিসেফ আপনার এই প্রোজেক্টের জন্য এক মিলিয়ন ডলার ডোনেশন দেবে।’
ফের কনফারেন্স রুমে হাততালি ঝড়। বেরিয়ে আসার সময় অনেকগুলো হাত ছুয়ে গেল তাঁর হাতকে। মন থেকে একটা বিরাট ভার নেমে গেল লিলির। রোকেয়ার আত্মা অন্তত শান্তি পাবে। ওর পরিবারের লোকেরা ভবিষ্যতে আর দোষারোপ করবে না। ভুল চিকিৎসায় বেচারি মারা গেছে। কিন্তু অ্যাদ্দিন দায় নিতে হচ্ছিল তাঁকে। মনের মধ্যে কথাগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে রিসেপশনে নেমে এলেন লিলি। তখনই বাম কিম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি এখন অ্যাকোয়াটিকাতে ফিরে যেতে চাম ম্যাডাম?’
কী মনে হল, লিলি বললেন, ‘না। আগে একবার ম্যানহাটন শপিং মলে যাব। অনেকদিন যাওয়া হয়নি।’
‘কেন ম্যাডাম? কিছু কিনবেন?’
‘না। ওখানে আমার ছোটবেলাকে খুঁজতে যাব।’
শুনে বাম কিম একটু অবাক হলেন। কিন্তু মুখে কিছু বললেন না। এটা একটা বিরাট গুণ মি. কিমের। কোথায় চুপ করে যেতে হয়, জানেন। মানুষটাকে এই কারণে লিলি পছন্দ করেন। এই একটু আগে ইউনিসেফ দফতরে যে প্রশংসাটা তিনি পেলেন, সেটা তাঁর প্রাপ্য ছিল না। ঢাকায় চাইল্ড কেয়ার ইউনিট রোকেয়ার নামে করার পরামর্শ বাম কিমই দিয়েছিলেন। ‘ম্যাডাম, বাংলাদেশে আপনাকে নিয়ে যে সমালোচনা হয়েছে, তা সব মুছে যাবে, যদি এই প্রস্তাবটা পাশ করাতে পারেন।’ ভদ্রলোক যে কতটা দূরদর্শী, আজই প্রমাণ হয়ে গেল। মিটিং থেকে বেরনোর পরই লিলি সেটা টের পেয়েছিলেন। রেজওয়ানা যখন পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। বাঙালিরা এ ভাবেই শ্রদ্ধা জানায়। ছোটবেলায় হেমলতা আন্টির কাছে তিনি শিখেছিলেন। বাম কিম মানুষটা ছোট্টখাট্টো। কিন্তু বুদ্ধিতে এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং।
ইউনিসেফ বিল্ডিংয়ে যখনই তিনি আসেন, তখন আর বেরোতে ইচ্ছে করে না লিলির। প্রায় বছর দশেক চাকরি করেছেন তিনি এই বাড়িতে। বেবি ফ্রেন্ডলি ইনিসিয়েটিভ বলে একটা দফতরে। বাবা-মা আর বাচ্চার মধ্যে কীভাবে বন্ধন দৃঢ় করা যায়, সে ব্যাপারে পরামর্শ দেয় এই দফতর। বিশেষ করে, সদ্যোজাত শিশুদের সঙ্গে। বাচ্চাদের মানুষ করার ক্ষেত্রে অনেক ভুল ধারণা থাকে বাবা-মায়েদের। যেমন, হাতে খেলনা ধরিয়ে দিলেই বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখা যায়। বাচ্চাদের অতিরিক্ত আদর দেওয়া ঠিক নয়। ওই দফতরে কাজ করার সময় লিলি অভিভাবকদের বোঝাতেন, যতটা পারুন বাচ্চাকে সময় দিন। আপনার মুখ দেখে বা কথা শুনে বাচ্চা পৃথিবী চিনতে শিখবে। সারা দিন বাচ্চা কোলে বাবা-মায়েদের দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন লিলি। আজও লিফটে করে নিচে নেমে দেখলেন, প্রথম বাবা বা মা হওয়া অনেকেই বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে রিসেপশনে বসে রয়েছেন। বাচ্চাদেরদেখে লিলির বুক থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। এত যত্ন কেন একজন ইয়েমেনিজ বা রোহিঙ্গা বাচ্চার কপালে জোটে না? তার জন্য দায়ী কারা?
রিসেপশনের পাশ দিয়ে সদর দরজার দিকে এগোনোর সময় লিলির চোখে পড়ল, রেজওয়ানা তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কেমন যেন কুণ্ঠা। কাছে এগিয়ে এসে ও বলল, ‘ম্যাডাম, এক মিনিট কথা বলা যাবে?’
লিলি হেসে বললেন, ‘আমার গাড়িটা না আসা পর্যন্ত কথা বলতে পারো।’
রেজওয়ানা বলল, ‘আমাদের কাগজে আপনার নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে একটা রিপোর্ট করব। ঢাকায় কোথায় এই ইউনিট করবেন, ঠিক করেছেন কিছু?’
চট করে পলাশ চৌধুরী আর রোজিনার চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠল লিলির। ওরা নিশ্চয়ই সাহায্য করতে পারবে। তাই বললেন, ‘ঢাকায় পলাশ চৌধুরী বলে একজন প্রভাবশালী মানুষের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। উনি একবার আমার কাছে এসেছিলেন, এখানে চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার খোলার ব্যাপারে সুপারিশ নিতে। ওঁর দ্বারস্থ হতে পারি।’
রেজওয়ানা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ‘খুব ভাল হয় তা হলে। ভদ্রলোক আমারও খুব ওয়েলউইশার। খুব ভাল করে ওঁকে চিনি। কিন্তু ম্যাডাম উনি এই মুহূর্তে খুব বিপদের মধ্যে রয়েছেন।’
নিউ মেক্সিকোর এক র্যাঞ্চে গিয়ে পলাশ আর রোজিনা নেকড়ের পাল্লায় পড়েছিলেন। এই খবরটা দু’তিনদিন আগে নিউ ইয়র্ক টাইমসে চোখে পড়েছে লিলির। রেজওয়ানার মুখে পুরো ঘটনাটা শুনে বিষণ্ণবোধ করতে লাগলেন তিনি। এত সুন্দর একটা কাপল, তাঁদের কপালে এমন দুর্ভোগ, অকল্পনীয়। লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘রোজিনা কোন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে, জানো? ভাবছি, ওকে দেখতে যাব কি না?’
‘ম্যাডাম, প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতাল।’
‘দেখি, সময় করে উঠতে পারি কি না। তোমার আর কোনও প্রশ্ন আছে রেজওয়ানা?’
‘ঢাকায় টার্গেট ডে কবে, ম্যাডাম?’
‘ইচ্ছা তো ছিল ইউনিভার্সাল চিল্ডেন্স ডে… মানে বিশে নভেম্বর ওপেন করার। কিন্তু তোমাদের দেশে ওইদিন জাগো ফাউন্ডেশন একটা বড় অনুষ্ঠান করে। অতদিন অপেক্ষা করা যাবে না। আমরা চেষ্টা করব ফোরটিন্থ মার্চ করার। কেননা, শেখ মুজিবর রহমানের জন্মদিন বলে তোমাদের দেশে ওইদিনটা চিল্ডেন্স ডে পালন করা হয়।’
কথাটা বলতে বলতেই লিলি লক্ষ করলেন, পোর্টিকোর নিচে তার জন্য রোলস রয়েস এসে দাঁড়িয়েছে। অফিস বা বাইরে বেরোলে এখন বাম কিম একই গাড়িতে রোজ তাঁকে চাপতে দেন না। জঙ্গিদের ভয়ে রোজ আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা করেন। নতুন একজন বডি গার্ড উনি অ্যাপোয়েন্ট করেছেন। অল্পবয়সি কোরিয়ান মেয়েটার নাম সেও ইয়ুন। প্রায় ছ’ফুটের মতো লম্বা। অনেক দুরে দাঁড়িয়ে থাকলেও ওকে চোখে পড়ে। মেয়েটা না কি এমন দক্ষ যে, টেক্সাস স্টেটে গভর্নর্স মেডেলও পেয়েছে। সাধারণ পোশাকে মেয়েটা সর্বদা ছায়ার মতো অনুসরণ করে। ওকে একবার দেখে নিয়ে লিলি রেজওয়ানাকে বললেন, ‘তুমি কী লিখলে, আমাকে দেখিও। আগেরবার কিন্তু তোমার লেখা আমাকে খুব অসুবিধের মধ্যে ফেলেছিল।’
রেজওয়ানা ঘাড় নেড়ে বলল, ‘ঠিক আছে ম্যাডাম, খবরটা পাবলিশ হলে আপনাকে দিয়ে যাব।’
গাড়িতে ওঠার সময় লিলি দেখলেন, সন্ধে হয়ে গেছে। ম্যানহাটন এখন আলোর সাজে সাজছে। কাছেই টাইমস স্কোয়্যারে মাত্র দু’দিন আগে নিউ ইয়ার্স ইভ-এ বল ড্রপ পার্টি হয়ে গেছে। সারা বিশ্ব থেকে টুরিস্টরা টাইমস স্কোয়্যারে এসে হাজির হন বল ড্রপ দেখার জন্য। ফর্টি সেকেন্ড অ্যাভেনিউ থেকে সেন্ট্রাল পার্ক পর্যন্ত লাখ লাখ লোক ঠান্ডায় জমে গিয়েও খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকেন। টাওয়ার থেকে একটা আলোর বল নিচের দিকে নেমে আসতে থাকে রাত ঠিক বারোটার সময়। সমবেত দর্শক গলা ফাটিয়ে প্রতি সেকেন্ড কাউন্ট করতে থাকেন, নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য। অ্যান্ডির সঙ্গে একবার বল ড্রপ দেখতে এসেছিলেন লিলি। কিন্তু তিনি এনজয় করতে পারেননি। একে তো বেলা দশটায় টাইমস স্কোয়ারে এসে জায়গা দখল করতে হয়েছিল, তার পর ভিড়ে নড়াচড়ার উপায় ছিল না। একটা সময় দমবন্ধ হয়ে এসেছিল লিলির। রাত্তির দুটো অবধি টয়লেটেও যেতে পারেননি।
মিনিট দশেক পরে গাড়ি এসে পার্ক করল ম্যানহাটন শপিং মলে। চল্লিশ বছর আগে প্রায়ই তিনি এই মলে আসতেন হেমলতা আন্টির সঙ্গে। বিশেষ করে ক্রিসমাসের আগে। একতলায় আইস স্কেটিং রিঙ্ক-এর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দেখতেন, তাঁরই বয়সি ছেলে-মেয়েরা বাবা-মায়ের সঙ্গে স্কেটিং করছে। লিলির নিজেরও খুব ইচ্ছে করত, জমাট বরফের উপর নেচে বেড়ানোর। কিন্তু আন্টি তাঁকে আটকে রাখতেন। তখন কত বয়স হবে তাঁর? নয়-দশ বছর। দোকানে ঘোরার সময় লিলি যা চাইতেন, আন্টি কিনে দিতেন। কখনও না করতেন না। মনে আছে, একবার তিনি কার্পেট পিয়ানো কিনে দেওয়ার জন্য বায়না ধরেছিলেন। ছোট কার্পেটের মতো পিয়ানো, বিছিয়ে দিয়ে তার উপর দিয়ে হেঁটে গেলে নানারকম মিউজিক বাজতে থাকে। লিলি জানতেন না, পিয়ানোটার অনেক দাম। ওই একবারই হেমলতা আন্টি সেদিন তাঁকে কিনে দিতে পারেননি। কিন্তু মাসখানেক পরে বার্থ ডে পার্টিতে পিয়ানোটা উপহার দিয়ে চমকে দিয়েছিলেন।
শপিং মলের উত্তর দিকের গেটের মুখেই ফুড কোর্ট। লিলির মনে পড়ল, কাছাকাছি কোথাও তখন একটা ইতালিয়ান আইসক্রিম পার্লার ছিল। হেমলতা আন্টি মাঝে মাঝেই ওঁকে নানা ফ্লেভারের আইসক্রিম খাওয়াতেন। সাদা পোশাকপরা ইতালিয়ান মেয়েরা পছন্দমতো বানিয়ে দিত। সাদা, গোলাপি, নীল, সবুজ রঙের সব আইসক্রিম। কাচের শো কেসের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে লিলি তখন ভাবতেন, বড় হলে অবশ্যই আইসক্রিমের দোকানে কাজ করবেন। শপিং মলের ভিতরে হাঁটার সময় ডান দিকে সেই পার্লারটার দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, একই রকম আছে। শো কেসের সামনে সুস্থ, সবল বাচ্চাদের ভিড়। ইয়েমেনি বা রোহিঙ্গা বাচ্চারা কোনওদিনই হয়তো সুযোগ পাবে না এই অমৃতের স্বাদ নেওয়ার। ভেবে, মনটা খারাপ হয়ে গেল লিলির।
এই শপিং মলেরই কোনও একটা ব্লকে অদ্ভুত একটা ঘড়ি ছিল। পনেরো ফুট উঁচু, তাতে চব্বিশটা ঘর। প্রতি ঘণ্টায় একবার করে সেই ঘরগুলোর দরজা খুলে যেত। একেকটা করে পাখি বেরিয়ে এসে সুরেলা গলায় ডাকত। সবথেকে উপরের ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসত এক মোরগ। তার ডাকেই বোঝা যেত ক’টা বাজে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে পাক্কা এক মিনিট লাগত। লিলি তখন হাঁ করে তাকিয়ে থাকতেন ঘড়িটার দিকে। আন্টিকে একবার জিজ্ঞেসই করে ফেলেছিলেন, সারাদিন ঘরের ভিতর পাখিগুলো কী খায়, কী করে। হেমলতা আন্টি হেসে তাঁকে বুঝিয়ে ছিলেন, ওগুলো আসল নয়, কৃত্রিম পাখি। ঘড়ির ব্লকটা কোথায়, লিলির এখন অবশ্য মনে নেই।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি এসে দাঁড়ালেন শপিং মলের ঠিক মাঝখানে গোল চত্বরে। চোখে পড়ল, ক্রিসমাসের চিহ্ন। বিশাল রথের উপর বসে আছেন সান্তা ক্লজ। আট-দশটা এল্ক হরিণ আকাশ থেকে সেই রথ টেনে নিয়ে আসছে। অতীতের একটা কথা মনে পড়ায় লিলি হাসলেন। এই গোল চক্করেই তিনি একবার হারিয়ে গেছিলেন। কাছেই একটা ফোয়ারা ছিল। জলে ঘুরে বেড়াত ছোট ছোট কচ্ছপ। সেই কচ্ছপ গুনতে গিয়ে হঠাৎ তিনি আবিষ্কার করেন ধারে-কাছে হেমলতা আন্টি নেই। একটু আগে আন্টি এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। গেলেন কোথায়? ভয়ে লিলি কেঁদে ফেলেছিলেন। তাঁকে ঘিরে ভিড় জমে গেছিল। সিকিউরিটি গার্ডেরা তাঁর হাতে ক্যান্ডি আর টফি গুঁজে দিয়েছিল। খানিক পরে দৌড়তে দৌড়তে এসেছিলেন হেমলতা আন্টি। তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। এই তো সেই জায়গাটা। চোখের সামনে যেন আন্টিকে দেখতে পেলেন লিলি। লায়লার চিকিৎসার দিন আন্টির কথা মনে পড়েছিল। কিন্তু মুখটা এই এখুনি চোখের সামনে ভেসে উঠল। বিশেষ করে, ওঁর কপালের টিপ। কী সুন্দরই না দেখতে ছিলেন আন্টি!
কত ধরনের নতুন নতুন ব্র্যান্ড, কত দোকান! মেয়েদের পোশাকের একটা দোকানের সামনে লেখা নতুন কালেকশন এসেছে। কৌতূহলে দোকানের ভিতর ঢুকে পড়েই চমকে উঠলেন লিলি। খুব কাছে দাঁড়িয়ে এলসা আন্টি। এতক্ষণ অনুসরণ করছিলেন না কি? আক্রমণাত্মক মেজাজে আন্টি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার লিলি। আমার ফোন ধরছ না। মেল করলে উত্তর দিচ্ছ না। আমার সঙ্গে বেইমানি করার কথা ভাবছ না কি?’
অভ্যাসবশতঃ পিছন ফিরে একবার লিলি দেখলেন সেও ইয়ুন ধারে কাছে আছে কি না। তাকে দেখতে পেলেন না। তবুও, বললেন, ‘আপনার মান থাকলে তো বেইমানির কথা উঠবে।’
‘তোমার সঙ্গে আমার বোঝা-পড়া আছে। আমার সঙ্গে চলো।’
‘সরি। যাওয়া সম্ভব না। আপনাকে আর বিশ্বাস করি না।’
‘তোমার এত বড় স্পর্ধা। কাকে কী বলছ, তুমি জানো?’
‘জানি, আমি একজন প্রতারকের সঙ্গে কথা বলছি।’
‘তোমাকে আমি উচিত শিক্ষা দেব। চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশন আমার গড়া প্রতিষ্ঠান। তোমাকে কেয়ার টেকার হিসেবে রেখেছিলাম…।’
এলসা আন্টি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দু’জনের মাঝে লাফিয়ে এসে দাঁড়াল সেও ইয়ুন। ওর লম্বা শরীরে ঢাকা পড়ে গেলেন এলসা আন্টি। লিলি শুধু একটা আর্তনাদ শুনতে পেলেন।
