(সাতাশ)
স্টারবাকস-এ খুব একটা ভিড় নেই। আমেরিকায় এসে এই ক্যাফেটোরিয়ার প্রেমে পড়ে গেছে কালকেতু। সেলসগার্লদের বলে দিলেই হল। পছন্দের ফ্লেভারে কফি চট করে বানিয়ে দেয়। জানলার ধারে রেজওয়ানা বসে আছে। মেয়েটা ওর সঙ্গে কথা বলার জন্য হাসপাতালের রিসেপশনে অপেক্ষা করছিল। কাউন্টার থেকে কফির দুটো গ্লাস নিয়ে গিয়ে, উল্টো দিকের চেয়ারে বসে কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘ঢাকায় আপনার বাসা কোথায় রেজওয়ানা?’ মেয়েটা কে, আগে তা ভাল করে জেনে নেওয়া দরকার। তার পর কেন কথা বলতে চায়, ও শুনবে।
রেজওয়ানা পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘ঢাকায় কি আপনি কখনও গ্যাছেন?’
‘অনেকবার। ওখানে রিপোর্টার সার্কেলে আমার কিছু বন্ধুও আছেন।’
‘আমাদের বাসা ঢাকা শহরে না, কালকেতুদা। ঢাকার শহরতলিতে। আমোদপুর বলে একটা জায়গায়।’
আরে, আমোদপুর তো পলাশভাইয়ের গ্রাম। কী আশ্চর্য, মেয়েটা সেই গ্রামের! বয়স বেশি না। সেই কারণে আপনির বদলে তুমিতে নেমে এল কালকেতু। জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি ওখানকার পলাশ চৌধুরী বলে কাউকে চেনো?’
‘চিনি। ভদ্রলোক মাল্টি মিলিওনার। ওঁনার আসল বাসা এখন ঢাকার ধানমণ্ডী এলাকায়। আমোদপুরে দেশের বাড়ি। ওঁনার রিলেটিভরা এখনও সেই বাড়িতে থাকেন। পলাশভাই কালীপূজার সময় আমাদের গেরামে যান। ওদের বাসার সঙ্গেই সেই কালীমন্দির। আপনি তারে চেনেন না কি?’
কী মনে হল, কালকেতু বলল, ‘না। আমি এক বন্ধুর মুখে ওর নাম শুনেছি। আচ্ছা, মুক্তিযুদ্ধের সময় ওঁর এক দিদি নিখোঁজ হয়েছিলেন। তুমি কি তাঁর সম্পর্কে কিছু জানো?’
‘হ্যাঁ, ওনাকে পাওয়া গেছিল বলে শুনেছি। কিছুদিন তিনি আমোদপুরের বাড়িতে ছিলেনও। কিন্তু পরে না কি ধরা পড়ে, তিনি চিটার। পলাশভাইয়ের টাকা পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য দিদি সেজে ওই বাড়িতে ঢুকে পড়েন। ওনার পিছনে বড় একটা চক্র ছিল।’
পলাশভাই কখনও এই খবরগুলো দেননি। আজই দেখা হলে ওকে জিজ্ঞেস করতে হবে। প্রসঙ্গ বদলে কালকেতু বলল, ‘তুমি না কি ঢাকার যুগযুগান্ত বলে একটা কাগজে চাকরি করো। কত বড় কাগজ যে, আমেরিকায় রিপোর্টার রাখার কথা ভাবতে পারে?’
প্রশ্নটা শোনার পর রেজওয়ানার মুখে রং সামান্য বদলাল। ও বলল, ‘কাগজটা নিউ ইয়র্ক থেকে ছাপা হয় কালকেতুদা। আপনি তো জানেন, আমেরিকায় প্রচুর বাংলাদেশি থাকেন। তাঁরা আগে অন লাইনে ঢাকা বা চিটাগংয়ের কাগজ ফলো করতেন। ইন্ডিয়ানদের ইন্ডিয়ান অ্যাব্রড বলে একটা কাগজ আছে, আমেরিকা থেকে বের হয়। তাদের দেখাদেখি বাংলাদেশিদেরও ইচ্ছে হয়েছিল, এখান থেকে একটা কাগজ বের করবেন। তাঁরাই এই যুগযুগান্ত কাগজটার ফাইনান্সার, তাঁরাই এই কাগজের সাবস্ক্রাইবার। সার্কুলেশন মন্দ না। প্রায় পঞ্চাশ হাজার। মেনলি বাংলাদেশ রিলেটেড আর্টিকেল থাকে।’
কথাবার্তার শুরুতেই কালকেতু বুঝে গেল, রেজওয়ানা মেয়েটাকে সন্দেহ করার কিছু নেই। তবুও, ও জিজ্ঞেস করল, ‘আমেরিকায় কদ্দিন আছ রেজওয়ানা? এসেছিলেই বা কী সূত্রে?’
‘চাকরি পেয়ে এসেছি। কামিং জানুয়ারিতে চারমাস হবে। এখন এই নিউ ইয়র্কেই থাকি। একটা ইন্ডিয়ান মেয়ের সাথে রুম শেয়ার করে।’
‘এ বার বলো, তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছ কেন?’
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে রেজওয়ানা বলল, ‘কালকেতুদা, নায়গারায় লিলি ম্যাডামের উপর হামলার ঘটনার দিন যা ঘটেছিল, তা আমাকে একবার বলবেন প্লিজ। পরে বলব, কেন জানতে চাইছি?’
কালকেতু বলল, ‘নিশ্চয়ই বলব। ডিনার সেরে রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে দাঁড়াতেই সেই রাতে আমার চোখে পড়েছিল, পার্কের দিকের অন্ধকার থেকে একটা কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়ি হঠাৎ মারাত্মক স্পিড বাড়িয়ে ইউ টার্ন নিল। ভারি টায়ারের চমকে দেওয়ার মতো একটা শধ শুনতে পেলাম। অপরাধ জগতের সম্পর্কে খোঁজ রাখি বলে আমি জানতাম, টেররিস্টরা এইভাবেই অতর্কিতে আক্রমণ করে। শব্দও ওদের হাতিয়ার। শিকারকে বিন্দুমাত্র সাবধান হওয়ার সময় দেয় না। ইউ টার্নের মুখেই দেখলাম, গাড়ির জানলার কালো কাচ ধীরে ধীরে নেমে আসছে। থ্যাঙ্কস টু রেস্টুরেন্টের নিওন আলো। দেখি, জানালার কাছেই পিস্তলের নল, আমাদের দিকে তাক করা। তখনই আমার মস্তিষ্ক আমাকে অ্যালার্ট করে দিল। আমার সামনে দাঁড়িয়ে এক মহিলার সঙ্গে তখন কথা বলছিলেন মিস গডউইন। আমার মনে হয়েছিল, টার্গেট উনিই।’
‘কেন আপনার মনে হয়েছিল, উনি টার্গেট? অন্য কেউ নন?’
‘দেখো, আমি দীর্ঘদিন ক্রাইম বিট-এ রিপোর্টিং করেছি। আগেই বললাম, ক্রিমিনাল ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে সামান্য খোঁজ খবর রাখি। আমি লিলি ম্যাডামের হাত ধরে টান দিয়েছিলাম। কারণ, আমার সিক্সথ সেন্স বলেছিল, উনি সিকিউরিটি গার্ড নিয়ে ঘুরছেন, উনি ভিভিআইপি। উনিই টার্গেট। ওঁর আশপাশে আমরা যাঁরা দাঁড়িয়ে ছিলাম, তাঁরা সাধারণ মানুষ। অত অল্প সময়ের মধ্যে আমি কিন্তু ঠিক সিদ্ধান্তটাই নিয়েছিলাম।’
‘তার মানে আপনিই ওঁকে বাঁচিয়ে দেন?’
‘এখন তো দেখা যাচ্ছে, তাই। গাড়ি থেকে ছোঁড়া প্রথম গুলিটা আমার পাশ দিয়ে গিয়ে লাগে কাচের দেওয়ালে। আমারও শরীরে লাগতে পারত। ওই মোমেন্টামে টেররিস্টরা দ্বিতীয় বার ফায়ার করে। ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট, গুলিটা লাগে বাংলাদেশি মহিলা… কী যেন নাম তাঁর, রোকেয়া সুলতানার গায়ে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে উনি যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। রাস্তাটা রক্তে ভেসে গেছিল। ওর পড়ে থাকার ভঙ্গি দেখে আমার মনে হয়েছিল, গুলিটা শরীরের তলার দিকে কোথাও লেগেছে। তখন অবশ্য আমার মনোযোগ ছিল লিলি ম্যাডামের দিকে। কিন্তু, তুমি এত ডিটেলে জানতে চাইছ কেন রেজওয়ানা?’
‘নিজের সন্তুষ্টির জন্য। বিশ্বাস করে, আপনাকে কি একটা কথা বলতে পারি, কালকেতুদা? আজ দেখলাম, লিলি ম্যাডামকে আপনি খুবই শ্রদ্ধা করেন। তাই বলতে ভরসা পাচ্ছি না।’
শুনে কালকেতুর ভ্রুঁ কুঁচকে উঠল। ও বলল, ‘কী ব্যাপার, খুলে বলো তো?’
‘জটিলতাটা সৃষ্টি করেছেন লিলি ম্যাডামই। ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় আমাকে উনি বলেছিলেন, নায়গারায় হামলার কোনও ঘটনাই না কি ঘটেনি। রোকেয়া আপার গায়ে গুলি লেগেছিল কি না উনি জানতেনই না। ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের ওয়াশ রুমে গিয়ে ওঁরা না কি পোশাক বদলাবদলি করেননি। অথচ আমার কাছে যা এভিডেন্স আছে, তা প্রমাণ করে, উনি আমায় সত্যি কথা বলেননি।’
শুনে কালকেতু একটু অবাকই হল। বিরূপ মন্তব্য করলে লিলি ম্যাডামকে ছোট করা হবে। ও বলল, ‘বুঝতে পারছি না, কেন লিলি ম্যাডাম সত্যি কথা বললেন না।’
‘রেস্টুরেন্টের ভিতর ওঁর থেকে কতদূরে আপনি খেতে বসেছিলেন কালকেতুদা?’
‘পাঁচ ছ’টা টেবল দূরে হবে।’
‘লিলি ম্যাডাম আর রোকেয়া আপা নিজেদের মধ্যে কী কথা বলছিলেন, তা নিশ্চয়ই আপনি শুনতে পাননি। কিন্তু সেদিন ওরা কেন নায়গারায় মিট করেছিলেন, এবং কী আলোচনার জন্য রেস্টরেন্টটা বেছে নিয়েছিলেন, আপনি কি তা জানতে চান?’
কালকেতুউত্তরোত্তর অবাক হচ্ছে। ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে ও বলল, ‘নিশ্চয়ই জানতে চাই। কিন্তু তুমি জানলে কী করে?’
রেজওয়ানা বলল, ‘রোকেয়া আপা পুরো কনভার্সেশন মোবাইলে রেকর্ড করে রেখেছিলেন। যেটা লিলি ম্যাডাম ভাবতেও পারেননি। মারা যাওয়ার আগের দিন রোকেয়া আপা তাঁর ছেলেকে সত্যিটা জানিয়ে যান। ওঁর মোবাইল থেকে আমি রেকর্ড করে রেখেছি। শুনুন, সেই কনভার্সেশন।’
হ্যান্ডব্যাগ থেকে মোবাইল সেট বের করতে গিয়ে, কাকে দেখে যেন গুটিয়ে গেল রেজওয়ানা। তার পর বলল, ‘রেকর্ড শোনানোর সেফ জায়গা এটা নয়, কালকেতুদা। মোদ্দা কথা শুনে রাখুন, লিলি ম্যাডামের চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ছিলেন রোকেয়া আপা। সারা বছর বাংলাদেশ থেকে ডোনেশন তুলে উনি পাঠিয়ে দিতেন নিউ ইয়র্কের হেড অফিসে। কিন্তু লিলি ম্যাডামের সঙ্গে নায়গারায় দেখা করতে যাওয়ার আগের দিন, ফাউন্ডেশনেরই একজন রোকেয়া আপাকে একটা অদ্ভুত প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ থেকে তোলা ডোনেশনের একটা অংশ তিনি মরিশাসের একটা ফাইনান্সিয়াল অর্গানাইজেশনে পাঠাতে বলেন। এবং সেটা যেন কেউ জানতে না পারে। এই অন্যায় আবদার শুনে রোকেয়া আপা সরাসরি তাঁকে না করে দেন। লোক জানাজানি হলে, ঢাকায় ওঁর বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যাবে বলে।’
শুনে কালকেতু মেনে নিতে পারল না। লিলি ম্যাডাম আর রোকেয়া সেদিন দু’জনেই হাসিহাসি মুখে কথা বলছিলেন। রেস্টুরেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার সময় লিলি ম্যাডামকে ও বলতে শুনেছিল, ‘ওদের বলো, যেন ভায়োলেন্সের পথে না যায়।’ ওরা বলতে ম্যাডাম কাকে বুঝিয়ে ছিলেন, কালকেতুর মাথায় ঢোকেনি। রেজওয়ানাকে ও প্রশ্ন করল, ‘ফাউন্ডেশনের কে ডোনেশনের একটা অংশ মরিশাসের ফাইনান্সিয়াল অর্গানাইজেশনে পাঠাতে চাইছিলেন? এবং কেন?’
‘যতদূর আমি শুনেছি, ব্যক্তিগত ফায়দা তোলার কারণে।’
‘ব্যক্তিগত ফায়দা মানে? টাকাটা কি লিলি ম্যাডাম আত্মসাৎ করতে চাইছিলেন?’
‘ঠিক তা নয়। রোকেয়া আপা যা বলে গেছেন, সেটাই আপনাকে বলি। এ বার বিশ্ব শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে লিলি ম্যাডামের। পেলে ফাউন্ডেশনের কদর বাড়বে। কেউ তাই চইিছিলেন, জুরি কমিটিতে যাঁরা আছেন, তাঁদের ইনফ্লুয়েন্স করার জন্য কিছু অর্থ দরকার। সেটা ফাউন্ডেশন ফান্ড থেকে তোলা যাবে না। সেই কারণেই কিছু অর্থ আলাদা জায়গায় সরিয়ে রাখা দরকার।’
‘লিলি ম্যাডাম সম্পর্কে আমাকে এত কথা বললে কেন রেজওয়ানা?’
‘বলতাম না। কিন্তু ম্যাডামকে তখন আপনি বলছিলেন, সত্যি কথাটা বলার জন্য আপনি মিডিয়ার কাছে যেতে চান। এর ভিতর নিজেকে জড়ালে কিন্তু ভবিষ্যতে আপনি মুশকিলে পড়তে পারেন।’
শুনে ভাল লাগল না কালকেতুর। ও বলল, ‘থ্যাঙ্কস রেজওয়ানা। আর কিছু বলবে? আমাকে এখনই নিউ জার্সিতে ফিরতে হবে।’
কথাটা বলতে বলতেই কালকেতু উঠে দাঁড়াল। তখনই ওর চোখে পড়ল, কফির কাপে একটা চুমুকও দেয়নি রেজওয়ানা। কলকাতায় স্টারবাকসে একেকটা কাপ কফির দাম প্রায় তিনশো টাকার মতো। সেটা নষ্ট হতে দেখে কালকেতু মনে মনে একটু অসন্তুষ্টই হল। পুরস্কার পাওয়ার লোভে লিলি ম্যাডাম ফাউন্ডেশনের অর্থ সরিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, অন্য কাউকে দিয়ে প্রস্তাবটা রোকেয়া সুলতানাকে দিয়েছিলেন, এই কথাটা ওর হজম হচ্ছিল না। মেয়েটার সঙ্গে ফের যোগাযোগ হওয়ার সম্ভাবনা ও উড়িয়ে দিল। কালকেতু ঠিক করে নিল, রেজওয়ানা ফোন করলেও ধরবে না। স্টারবাকস থেকে বেরিয়ে ও সিধে হাঁটতে শুরু করল এক্সিট গেটের দিকে।
তখনই মোবাইলে পিং হওয়ার শব্দ শুনল। মেসেজ খুলে কালকেতু দেখল, সুদীশ লিখেছে, ‘মেয়েটা ছেড়েছে তোকে? তা হলে চলে আয়। তোর গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একসঙ্গে নিউ জার্সি যাব।’
মাঝে দু’তিনদিন সুদীশের সঙ্গে ফোনেও কথা হয়নি। ও সম্ভবত নিউ ইয়র্কেই ছিল। কিন্তু সুদীশ জানল কী করে, ও হাসপাতালে এসেছে? পলাশভাই আর রোজিনা ম্যাডাম ছাড়া আর কেউ কথাটা জানে না। ওই দু’জনের কাছ থেকে খবরটা জানা সম্ভবও নয় সুদীশের পক্ষে। কেননা, বার কয়েক অনুরোধ করার পরও সুদীশ ওদের সঙ্গে দেখা করতে চায়নি। প্রতিবারই বলেছে, ‘তোর পলাশভাইয়ের কাছে আমাকে এমনিতেই যেতে হবে। ওঁকে যখন আমার দরকার হবে, তখন নিজে থেকেই যাব।’ পার্কিং স্পেসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে কালকেতুর মনে হল, সুদীশ সম্ভবত, অন্য কোনও কারণে হাসপাতালে এসেছিল। রেজওয়ানার সঙ্গে বসে যে ও এতক্ষণ কফি খাচ্ছিল, সেটা বোধহয় ওর চোখে পড়েছে।
আগের দিন গাড়ি চালিয়ে নিউ ইয়র্কে নিয়ে এসেছিল ইমন। আজ বোধহয় ওকে পলাশভাই অন্য কাজে পাঠিয়েছেন। সেই কারণে কালকেতু এসেছে চিরাগের সঙ্গে। গাড়িতে ওঠার সময় ছেলেটা রাগী গলায় বলল, ‘আপনার এত দেরি হবে, আগে বলেননি কেন? আমি তা হলে কোথাও কিছু খেয়ে নিতাম।’
শুনে কালকেতু ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ভারি অসভ্য তো? তুলনায় ইমন ছেলেটা অনেক ভাল। আগের দিন নিজের সিট ছেড়ে নেমে এসে ইমন গাড়ির পিছনের দরজা খুলে দিয়েছিল। চিরাগ কিন্তু গোঁজ হয়ে ড্রাইভারের সিটে বসে রইল। সুদীশও চটেছে, ওর আচরণে। দুটো আঙুল তুলে ইশারায় জানতে চাইল, এটা কি পলাশভাইয়ের বাড়িতে লুকিয়ে থাকা সেই দু’নম্বর জিহাদি? কালকেতু ঘাড় নেড়ে জানাল, হ্যাঁ। দেখে সুদীশের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার কিছুক্ষণ পর ও স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘লিলি গডউইনকে কেমন দেখলি কালকেতু?’
‘আজ থেকে ওঁর ট্রিটমেন্ট শুরু হবে। দেখে মনে হল, উনি খুব ভাল নেই।’
‘ওখানে এলসা গিনেসবেরির সঙ্গেও নিশ্চয় তোর দেখা হয়েছে। কথা হল ভদ্রমহিলার সঙ্গে?’
প্রশ্নটা শুনে কালকেতু একটু অবাকই হল। সুদীশ জানল কী করে, এলসা গিনেসবেরিও হাসপাতালে এসেছিলেন? ও বলল, ‘হ্যাঁ কথা হল। কিন্তু আমার তাতে কোনও লাভ হল না। উনি সাফ জানিয়ে দিলেন, শিউলি বলে কারও নাম কখনও শোনেননি। আমাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করলেন।
এলসা গিনেসবেরির সঙ্গে ওর যা কথাবার্তা হয়েছে, খুঁটিয়ে তা শুনে সুদীশ বলল, ‘শুনেছি, ভদ্রমহিলা খুব সুবিধের নন। একবার যখন না বলে দিয়েছেন, তখন ওঁর মুখ থেকে কিছু বের করতে পারবি না। তুই বরং ডা. অ্যালান গডউইনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা কর।’
‘আজ হাসপাতালে এসে হঠাৎ আমার কী মনে হল সুদীশ, জানিস। আমি যাকে খুঁজে বেরাচ্ছি, তিনিই আমার খুব কাছে আছেন। আজ শুনলাম, ছোটবেলায় মিসেস গডউইনের পিঠের দিকটা আগুনে পুড়ে গেছিল। এখনও তাঁর ট্রিটমেন্ট চলছে। একটু ভেবে দ্যাখ তো, এমনটা কি হতে পারে, এই মিসেস গডউইনই পলাশভাইয়ের শিউলিদিদি?’
শুনে চমকে উঠল সুদীশ। জিজ্ঞেস করল, ‘তোর এটা মনে হচ্ছে কেন?’
‘আমি কোথাও যেন একটা যোগসূত্র দেখতে পাচ্ছি। শিউলিদিদি আর এই মিস লিলি গডউইনের রোগটা কমন। পুড়ে যাওয়া পিঠের চামড়া সংক্রান্ত। ট্রিটমেন্ট করেছেন ডা. গডউইন। শুধু তাই নয়, তখন নিজের সন্তান ছিল না বলে, ছোটবেলায় উনি লিলিকে অ্যাডাপ্ট করেছিলেন। নামটা হয়তো তখন বদলে দিয়েছিলেন। শিউলির বদলে লিলি। আমি এই লাইনে ভাবছি।’
সুদীশ বলল, ‘মুশকিলটা হল, এলসা গিনেসবেরির কথা অনুযায়ী, মিসেস গডউইন নিজেও জানেন না, ছোটবেলায় তার নাম শিউলি ছিল কি না? ওই অধ্যায়টা ওঁর স্মৃতি থেকে মুছে গেছে।’
‘হ্যাঁ, আমিও সেটাই ভাবছি। প্রমাণ করা মুশকিল হবে। তবে, ডিএনএ টেস্ট করালে হয়তো ধরা যাবে।’
এর পর খানিকক্ষণ দু’জনেই চুপচাপ। হঠাৎই কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘তুই হাসপাতালে কেন সুদীশ?’
সুদীশ বোধহয় এই প্রশ্নটাই শুনতে চাইছিল। ও বলল, ‘কামাল বলে যে জিহাদি ছেলেটাকে আমরা পাবলিক স্টোরেজ থেকে ধরেছিলাম, কথাটা সেদিন বোধহয় তোকে বলেওছিলাম… সে এই হাসপাতালে ভর্তি আছে। এফবিআই ওকে এমন মার মেরেছে, প্রায় মরার অবস্থা হয়ে গেছিল। মিসেস গডউইনকে যারা খুন করতে চেয়েছিল, এই কামাল ছিল তাদের একজন। সে অপরাধ স্বীকারও করে নিয়েছে। ওর সঙ্গী ছিল একজন ইন্ডিয়ান জিহাদি। যার কোড নাম্বার আই সিক্সটি ফাইভ। তাকেও আমরা প্রায় হাতের নাগালে পেয়ে গেছি রে কালকেতু।’
চিরাগকে শোনানোর জন্যই কথগুলো বলছে সুদীশ। ওকে যাতে নার্ভাস করে দেওয়া যায়, সেই জন্য। ইমনের সঙ্গেও একই ট্রিটমেন্ট করেছিল ও। লুকিং মিররে চোখ পড়ায় কালকেতু দেখল, চিরাগ ওর দিকে তাকিয়ে। ওর চোখে সত্যিই ভয়ের চিহ্ন। সুদীশকে আরও উসকে দেওয়ার জন্য কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘তুই বলেছিলি, দু’জন জিহাদি নিউ জার্সিতেই লুকিয়ে আছে। এই আই সিক্সটি ফাইভ কি তাদেরই একজন?’
সুদীশ বলল, ‘হ্যাঁ। এই দ্যাখ, তোকে আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি। একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটে গেছে। বাংলাদেশি যে জিহাদিটাকে আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম, আজই সকালে তাকে ধরেছি ওয়ালমার্ট থেকে। দু’চার চড়-চাপড় মারতেই, সে সব উগড়ে দিয়েছে। কান্নাকাটি করে সে বলেছে, দেশে মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে চায়। এতদিনে না কি সে বুঝতে পেরেছে, আইএসে যোগ দিয়ে ভুল করেছে। ওকে আমরা অ্যারেস্ট করিনি। কেননা, ছেলেটাকে ছেড়ে রাখলে আমরা আরও অনেক খবর পাব। প্লাস আই সিক্সটি ফাইভকেও ধরে ফেলতে পারব।’
কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘আই সিক্সটি ফাইভ সম্পর্কে ও কিছু বলেনি?’
‘ওর সম্পর্কে যা আইডিয়া দিল, তা ভয়ংকর। সে না কি বলে বলে খুন করে। অসাধারণ না কি হাতের টিপ। অসমে থাকার সময়ও একটা মেয়েকে ও নৃশংসভাবে খুন করেছিল। প্রথমে রেপ করে, তারপর মেয়েটার ভ্যাজাইনায় গুলি করে। ছেলেটা এমন ডেঞ্জারাস টাইপের, নিজের বাবাকেও প্রকাশ্যে গুলি করে মেরেছে। বাস্টার্ডটা না কি ফের ক্যালিফেটে ফিরে যেতে চায়। তাই এখান থেকে পালানোর সুযোগ খুঁজছে। জানে না, ওর নামে ইন্টারপোল রেড অ্যালার্ট জারি করে দিয়েছে। একবার ধরা পড়লে ফাঁসি ছাড়া আর কোনও শাস্তি ওর হতেই পারে না।’
‘ইসসস, শুনে খুব খারাপ লাগছে রে।’
‘এদের জন্য দুঃখ করে লাভ নেই। শুনে তোর আরও খারাপ লাগবে, এই আই সিক্সটি ফাইভের মা আর বোনকে অসমের হিন্দু মৌলবাদীরা কাল রেপ করে মেরে ফেলেছে। ও এখনও তা জানে না। ভাবছি, অ্যারেস্ট করার পর ওকে সুখবরটা আমরাই প্রথম ওকে দেব। দুই-একদিনের মধ্যে ছেলেটার অ্যারেস্ট হওয়ার খবর তুই পেয়ে যাবি।’
লুকিং মিররের দিকে তাকিয়ে কালকেতু দেখল, চিরাগের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেছে।
