(একচল্লিশ)
এলসা আন্টির কুকীর্তির কথা জানার থেকে শরীরটা ভাল নেই লিলির। সত্যি, জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। এতদিন যাঁকে তিনি মনে মনে পুজো করে এসেছেন, তিনি এত স্বার্থান্বেষী হতে পারেন! কথাটা লুকোছাপা থাকেনি। সম্ভবত, বাম কিমের কাছ থেকে অনেকেই জেনে গেছেন। ফাউন্ডেশনের ট্রাস্টি মেম্বাররা সবাই তাঁকে ফোন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সমাজের নামী-দামি মানুষ। কেউ ব্যাঙ্কার, কেউ জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন কর্তা, কেউ সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। সবাই বলেছেন, মিটিং ডেকে এখুনি এলসা গিনেসবেরিকে ছেঁটে দিন। কিন্তু অনেক ভাবনা-চিন্তার পর লিলি ধীরে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আইনের জালে কাউকে ফেলতে গেলে আমেরিকায় যথেষ্ঠ প্রমাণ সংগ্রহ করতে হয়। লিলির মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে কোনও পদক্ষেপ নিতে গেলে, এলসা আন্টি জাল কেটে পালিয়ে যেতে পারেন। ওঁর বিরুদ্ধে পুলিশ আরও তথ্য প্রমাণ জোগাড় করুক।
গোথেনবার্গ থেকে এলসা আন্টি মাঝে দু’তিনদিন ফোন করেছিলেন। মনে হয়, ফাউন্ডেশনের হাল হকিকত জানার জন্য। কিন্তু, লিলি ফোন ধরেননি। পরে আন্টি একটা মেলও পাঠান। নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে। তারও কোনও উত্তর দেননি লিলি। শুধু চাইল্ড কেয়ার ইউনিট ইনচার্জদের ঘুরিয়ে একটা বার্তা পাঠিয়ে দিয়েছেন। অতঃপর এলসা গিনেসবেরি যদি কোনও ইউনিটে কর্তৃত্ব ফলাতে যান, তা হলে যেন সঙ্গেসঙ্গে তাঁকে জানানো হয়। ফাউন্ডেশনের অফিসেও লিলি যাচ্ছেন না। রোজই মার্থা আসছে কিছু ফাইলপত্র নিয়ে। অ্যাপার্টমেন্টে বসেই জরুরি ফাইলগুলোতে সই করে দিচ্ছেন তিনি।
এইসময়টায় লাস ভেগাসে অ্যান্ডির হোটেলে থাকার কথা ছিল তাঁর। চ্যারিটি শো-য়ের চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করার জন্য। কিন্তু অ্যান্ডিকে মেল করে তিনি জানিয়ে দেন, জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ায় লাস ভেগাস যেতে পারবেন না। আশ্চর্য, তার পর থেকে অ্যান্ডির তরফেও কোনও সাড়া নেই। যে মানুষটা দিনে একাধিকবার ফোন করে কথা বলত, এলসা আন্টি ধরা পড়ে যাওয়ার পরদিন থেকে সে একটা ফোনও করেনি। এই নীরবতা নিয়ে বাম কিমের সঙ্গে মাঝে একদিন কথা হচ্ছিল লিলির। বাম কিম ব্যাখ্যা করতে চাইছিলেন এই ভাবে, ‘ম্যাডাম, আমার তো সন্দেহ হচ্ছে, দু’জনে মিলেই হয়তো আপনাকে আরও বড় ফাঁদে ফেলার ষড়যন্ত্র করছিলেন। চ্যারিটি শো-য়ের নাম করে হয়তো এমন ঋণ চাপিয়ে দিতেন, যা শোধ করতে আমাদের জান বেরিয়ে যেত। আমার মনে হয়, শো লাস ভেগাসে করার দরকার নেই। অন্যবারের মতো, এবারও ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেন্সেই আমাদের অনুষ্ঠানটা হোক।’
ডা. সুধা বলে গেছেন, ‘এবার একটু শরীরের প্রতি নজর দেবেন ম্যাম। আপনার শরীরের মধ্যে কিন্তু আরও একটা শরীর বড় হচ্ছে। চিন্তা করবেন না, আমি আছি। মাঝে মাঝে এসে আপনাকে চেক করে যাব।’ লিলি হিসেব করে দেখেছেন, কোনও জটিলতা দেখা না দিলে, অগাস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ডেলিভারি হতে পারে। ফাউন্ডেশনের বকেয়া কাজ আগামী তিন-চার মাসের মধ্যেই তাই সেরে ফেলতে হবে। কারণ, তার পর হয়তো দৌড়-ঝাঁপü করার সুযোগ তিনি পাবেন না। লিলি একবার ভেবেও ছিলেন, এত বেশি বয়সে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি না নেওয়াই ভাল। কিন্তু বারান্দা থেকে যখন রেসিডেন্সির গির্জার দিকে তিনি তাকান, তখন মনে হয়, একজন ক্যাথলিক হয়ে এই পাপ তিনি কীভাবে করবেন? এখনও পর্যন্ত গর্ভধারণের কথা লিলি অবশ্য কাউকে জানাননি। এমন কী, অ্যান্ডিকেও না। এলসা আন্টির উপর এতটাই বিতৃষ্ণা এসে গেছে যে, তাঁর বোনপো অ্যান্ডিকেও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
সারাটা দিন অ্যাপার্টমেন্টে একা। এলোমেলো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে লিলির মনের মধ্যে। অতীতের কথা যখনই ভাবছেন, তখনই মনে হচ্ছে, তিনি আসলে কে? এটা জানা জরুরি। শৈশবের কথা তাঁর কিছুই মনে নেই। এলসা আন্টিকে যখন জিজ্ঞেস করতেন, তখন উনি বলতেন, ‘তোমার জানার দরকার নেই। জানলে তোমার ক্ষতি হয়ে যাবে।’ ওই সময়টায় পিঠের ক্ষত সবে সারছে। আন্টি ছাড়া তিনি তখন আরও একজনকে চিনতেন। গর্ভনেস হেমলতা আন্টি। বহু বছর পর হঠাৎ হেমলতা আন্টির কথা মনে করতে পারছেন লিলি। ছোটবেলায় এই আন্টি সবসময় ওঁকে আগলে রাখতেন। বিকেলবেলায় হাত ধরে নিয়ে যেতেন পার্কে। কখনও বা শপিং মলে। বলতেন, ‘মামণি, তোমার কী কিনতে ইচ্ছে করছে বলো।’ মামণি বলে ডাকার সময় তাঁর গলা থেকে স্নেহ ঝরে পড়ত।
কিন্তু এলসা আন্টি এই গর্ভনেস আন্টিকে মোটেই পছন্দ করতেন না। সবসময় তাঁর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতেন। হেমলতা আন্টির মুখটা ভাল করে মনে নেই লিলির। কিন্তু তাঁর পোশাক-আশাক, হেয়ার স্টাইল একটু অন্য রকমের ছিল। তাঁর বিনুনি বাঁধা লম্বা চুল কোমরের কাছে নেমে আসত। দেখতেও ছিলেন খুব সুন্দরী। বাইরের অনেকেই ভাবতেন, তিনি হেমলতা আন্টির মেয়ে। মনে পড়ছে… সেই সব দিনগুলোর কথা লিলির মনে পড়ছে। এলসা আন্টির কাছে মাঝে মধ্যেই বিদেশ থেকে লোকজন আসতেন। তখন সেই লোকগুলোর সামনে আন্টি তাঁকে সাজিয়ে গুছিয়ে বসিয়ে দিতেন। লোক দেখানো খুব আদরও করতেন। বিদেশি লোকগুলো তখন তাঁর প্রচুর ছবি তুলতেন। দিনগুলো খুব আনন্দে কাটানোর কথা। কিন্তু, তিনি উপভোগ করতে পারতেন না। পিঠের ব্যথায় সবসময় কাঁবু হয়ে থাকতেন। লিলির মনে পড়ল, তাঁকে নিয়ে একবার দুই আন্টির মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল। গর্ভনেস আন্টিকে তিনি বলতে শুনেছিলেন, ‘আফনে মানুষ না, আফনে জানোয়ার।’
সেই হেমলতা আন্টি হঠাৎ তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে গেলেন। তার পর চার্চের কোনও একটা অনুষ্ঠানে তাঁকে নিয়ে গিয়ে এলসা আন্টি বলেছিলেন, ‘আজ থেকে ডা. অ্যালান গডউইন তোমার ড্যাডি। তোমাকে ওঁর বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে।’ দত্তক কন্যার মানেটা অবশ্য অনেক পরে বুঝেছিলেন লিলি। ততদিনে সৎভাই ড্যানিয়েল আর সৎবোন সাশা হয়ে গেছে। ড্যাডি কখনও এই দু’জনের সঙ্গে তাঁকে আলাদা করে দেখেননি। বরং অসুস্থতার জন্য তাঁকে একটু বেশিই ভালবাসতেন। মাম্মির আচরণেও লিলি কখনও বুঝতে পারেননি, তাঁর সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক নেই। খেলনা পুতুল নিয়ে ছোটবেলায় সাশা একবার জেদাজেদি করেছিল। মাম্মি ওকে এমন শাস্তি দিয়েছিলেন যে, জীবনে সাশা আর কখনও তাঁর সঙ্গে হিংসেমি করেনি।
কলেজে পড়ার সময় লিলির মনে একবার প্রশ্ন জেগেছিল, ডা. গডউইন যদি তাঁর পালক পিতাই হন, তা হলে তাঁর আসল ড্যাডি কে? তাঁর অসুস্থতার কারণটাই বা কি? ড্যাডি প্রথম প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছিলেন। কিন্তু পিঠ আগুনে ঝলসে যাওয়ার কারণটা পরে বলেছিলেন। হ্যালোইনের পার্টিতে ফায়ার ডান্সের সময় না কি আগুন লেগে জ্বলন্ত সামিয়ানা তাঁর পিঠের উপর পড়েছিল। উত্তরটা শুনে এতদিন লিলি সন্তুষ্টই ছিলেন। এখন ফের নতুন করে প্রশ্নটা মনে জাগছে। বিদ্যুৎ চমকের মতো তাঁর মাথায় একটা নাম উঠে এল, হেমলতা আন্টি! হ্যাঁ, উনিই পারবেন, পরিবারের শিঁকড় সম্পর্কে আন্দাজ দিতে। কিন্তু কোথায় পাওয়া যাবে তাঁকে? এলসা আন্টি কাকে যেন একবার বলছিলেন, চুরি করে হেমলতা আন্টি কার সঙ্গে যেন পালিয়ে গেছিলেন। সে প্রায় বছর চল্লিশেক আগের কথা। এখনও যে হেমলতা আন্টি নিউ ইয়র্কে আছেন, তা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
‘কী ভাবছেন ম্যাডাম?’ লায়লার গলা শুনে লিলি প্রায় চমকে উঠলেন। একা থাকার অভ্যেস। তাঁর মনেই ছিল না, গত তিন-চারদিন ধরে আরও একজন অ্যাপার্টমেন্টে আছে। লায়লার হাতে কফির পেয়ালা, ধুয়ো উঠছে। হাসিমুখে পেয়ালাটা এগিয়ে দিয়ে ও বলল, ‘চমকে উঠলেন যে?’
কাপটা হাতে নিয়ে লিলি বললেন, ‘পুরনো দিনের কথা ভাবছিলাম। খেয়ালই করিনি তোমাকে।’
লায়লা যেদিন বিধ্বস্ত অবস্থায় অ্যাপার্টমেন্টে এসেছিল, সেদিনকার কথা মনে পড়ল লিলির। ধর্ষিতা হওয়ার যন্ত্রণা ও ভুলতে পারছিল না। ডা. সুধাকে খবর দিতে হয়েছিল। জিহাদিদের ভয়ে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে যেতে ইতস্তত করছিল লায়লা। ওকে ছেড়ে দিতে মন চায়নি লিলির। ঠিক সময়ে বিয়ে-থা করলে তাঁর নিজের মেয়ে ও লায়লার বয়সি হত। মাঝে একদিন নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে লায়লা ওর কাজের টুল বক্স নিয়ে এসেছে। পার্লারে আট ঘণ্টা কাজ করে, প্রতিদিন এখানেই ফিরে আসছে। এখন অনেক সুস্থ আর স্বাভাবিক লাগছে ওকে। পোড় খাওয়া মেয়ে, খুব কাজের। কফিটা মনোমতো বানায়। কফিতে চুমুক দিয়ে লায়লা বলল, ‘পুরনো দিনের কি এমন কোনও কথা ম্যাডাম, যা আপনি চেষ্টা করেও মনে করতে পারছেন না?’
‘ঠিক তাই।’ লিলি বললেন।
‘তা হলে, একটা কুর্দিশ দাওয়াই আপনাকে দিতে পারি। যদি আপনি বিশ্বাস করেন, তবেই।’
‘তুমি বলতে চাও, তা হলে আমি অতীতের কথা মনে করতে পারব? বেশ, কী করতে হবে আমাকে?’
‘আপনার যা বয়স, তা থেকে এক পর্যন্ত… আপনাকে গুণতে হবে। প্রত্যেক সংখ্যার মাঝে দশ সেকেন্ড করে সময় দেবেন। দেখবেন, আপনি যা মনে করতে চাইছেন, তা মনে পড়ে যাবে। আমার মা কী বলতেন, জানেন? আমাদের ব্রেন হচ্ছে সুপার কম্পিউটার। প্রতি মুহূর্তের সবকিছু ধরে রাখে। ব্রেন কখনই তোমার সঙ্গে বিট্রে করবে না, যদি তোমার শরীর সুস্থ থাকে। ব্রেনের ভিতর যে অসংখ্য সেল থাকে, তাদের টক্সিনমুক্ত রাখতে হবে। মায়ের যখন পঁচাশি বছর বয়স, তখন দেখতাম, পাঁচ বছর বয়সে উনি কী করেছেন, সব বলে দিতে পারতেন।’
লায়লা সাধারণত এত কথা বলে না। ওর সঙ্গে কথা বলতে মন্দ লাগছে না। যদিও, নতুন কোনও কথা ও বলেনি। লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার মা কি বেঁচে আছেন লায়লা?’
‘না ম্যাডাম, সিভিল ওয়ারে আমাদের পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেছে। আমার বাবা-মা, ভাইবোনেরা সবাই মারা গেছেন। আমি বেঁচে গিয়েছিলাম, এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম বলে। ওইদিনগুলোর কথা আর মনে করতে চাই না। ম্যাডাম, আপনি কি সত্যিই আপনার অতীতের কথা মনে করতে চান? তা হলে আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
‘কোত্থেকে তুমি এই চিকিৎসাটা শিখলে?’ লিলি জানতে চাইলেন।
‘ইস্তানবুলে আমি ডা. করিম বক্স বলে একজন হেকিমের চেম্বারে চাকরি করতাম। সেখানে জিহাদিদের নিয়ে আসা হত। থার্ড ডিগ্রি দেওয়ার পরও যেসব জিহাদি মুখ খুলত না, হিপনোটাইজ করে তাদের পেট থেকে কথা বের করে নিতেন ডা. করিম। এক ধরনের ব্ল্যাক ম্যাজিকও বলতে পারেন। তার কাছ থেকেই আমি শিখেছি ম্যাডাম। ওঁকে আমি অ্যাসিস্ট করতাম।’
‘আমাকে এখন কী করতে হবে, বলো।’
‘প্লিজ, আমাকে ঘণ্টাখানেক সময় দিন। এই সময়টায় কেউ যেন আপনাকে ডিসটার্ব না করে। নিজেকে বর্তমান জগৎ থেকে উইথড্র করে নিতে হবে। মানে… আপনার বাড়িতে এখন কেউ এলে কথা বলতে পারবেন না। ফোন এলে ধরবেন না। আপনি ধ্যান করেন বলে আপনার মনোসংযোগ করার ক্ষমতা অন্যদের তুলনায় বেশি। ফলে, আপনার পক্ষে অতীতে ফিরে যাওয়া তুলনামূলক ভাবে সহজ।’
‘বেশ, তা হলে এখনই চেষ্টা করো। আমি রেসিডেন্সির অফিস রুমে বলে দিচ্ছি, কেউ দেখা করতে এলে যেন ওঁরা অ্যাপার্টমেন্টে না পাঠান। ফোনেরও সুইচ অফ করে রাখছি। তোমার আর কী চাই, বলো। কোন ঘরে বসে চেষ্টাটা তুমি করতে চাও।’
‘ম্যাডাম, গেস্ট রুমে চলুন। ওখানে আমার টুল বক্স আছে।’
‘তুমি রেডি করো। আমি আসছি।’
মিনিট পাঁচেক পর লিলি গেস্ট রুমে গিয়ে দেখলেন, সব জানলার পর্দাগুলো লায়লা টেনে দিয়েছে। অন্ধকার ঘরে টেবলের উপর একটা নীল রঙের আলো জ্বলছে। লিভিং রুম থেকে রিক্লাইনার চেয়ারটা নিয়ে এসেছে লায়লা। সেটা টেবলের উল্টোদিকে বসিয়ে দিয়েছে। ঘরের ভিতরে বোধহয় কিছু স্প্রে করেছে। আতরের গন্ধে পুরো ঘর ম ম করছে। লায়লা বলল, ‘চেয়ারটার উপর আরাম করে শুয়ে পড়ুন ম্যাডাম। শরীরটাকে চেয়ারের উপর ছেড়ে দিন। চোখ বুঁজে মনে করতে থাকুন, আপনার শরীরটা নেই।’
কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে স্মোক অ্যালার্ম বেজে উঠল। আওয়াজটা শুনে লিলি চমকে উঠলেন। অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিটা ঘরে স্মোক অ্যালার্ম লাগানো আছে। কোথাও ধোঁয়া বেরলে আপনাআপনি অ্যালার্ম বেজে ওঠে। সিলিংয়ে অ্যালার্মের লাল আলো জ্বলছে। উপরের দিকে হাত বাড়িয়ে লায়লা ভেড়ার লোমের ঝাড়ন নাড়তে লাগল। লাল আলোটা নিভে গেল। লজ্জিত মুখে লায়লা বলল, ‘সরি ম্যাডাম, গন্ধের ধোঁয়াটা একটু বেশি পরিমাণে দিয়ে ফেলেছিলাম।’
এর পর কালো চামড়ার টুল বক্সটা খুলে ফেলল লায়লা। সেখান থেকে একটা শিশি বের করে, হাতে সবুজ তেল ঢেলে নিয়ে বলল, ‘এটা একটা হার্বাল অয়েল ম্যাডাম। এই তেল দিয়ে ম্যাসাজ করলে আপনি অদ্ভুত আরাম পাবেন।’
লিলির মাথায় তেল খানিকক্ষণ ঠেসে ধরে, তার পর ধীরে ধীরে ম্যাসাজ করতে লাগল লায়লা। তেল থেকে ল্যাভেন্ডারের সুন্দর গন্ধ বেরচ্ছে। লিলি জানেন, মিডল ইস্টে একটা সময় ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি খুব উন্নত মানের ছিল। গাছের ফুল-ছাল-পাতা দিয়ে ওরা রোগ নিরাময় করতেন। তিনি টের পেলেন, তেল দেওয়ার পর থেকে মাথার ভেতরটা ক্রমশ ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। চুলের মধ্যে লায়লার আঙুলগুলো খেলা করছে। আর ঠান্ডা আবেশটা ঘাড়ের পিছনে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। সঙ্গেসঙ্গে পিঠ থেকে চিনচিনানি ব্যথাটা উধাও। অ্যারোমাথেরাপি না কি? অ্যারোমাথেরাপি ম্যাসাজের কথা জানেন লিলি। একধরনের সুইডিশ ম্যাসাজ। ছোটবেলায় গোথেনবার্গে দেখেছেন, এলসা আন্টি মানসিক অবসাদ কাটানোর জন্য সপ্তাহে অন্তত দু’দিন সুইডিশ ম্যাসাজ নিতেন। শরীর ও মনের ক্লান্তি না কি দূর হয়ে যেত।
খানিক পরে লিলির মুখ থেকে স্বস্তিদায়ক আওয়াজ বেরিয়ে এল, ‘আঃ’।
তখনই লায়লা বলল, ‘নীল আলোটার দিকে তাকিয়ে থাকুন ম্যাডাম। চোখের পলক যেন না পড়ে।’
লায়লা কি পাতাল থেকে কথা বলছে? ওর গলাটা এমন ধাতব মনে হচ্ছে কেন? কথাগুলো ভেঙে ভেঙে ভেসে আসছে। লায়লাকে দেখতে চাইলেন লিলি। কিন্তু চোখের তারা ঘোরানোর চেষ্টা করেও তিনি সফল হলেন না। নীল আলোটার দিকে, চোখের তারা দুটো কে যেন আটকে দিয়েছে। লিলির হঠাৎ ভয় ভয় করতে লাগল। এই মুহূর্তে অ্যাপার্টমেন্টে আর কেউ নেই। লায়লার মনে যদি এলসা আন্টির মতো কোনও বদমতলব থাকে, তা হলে? প্রশ্নটা মনের আসার পরই মাথার ভিতর আলোর বিস্ফোরণ। ক্রিসমাসের রঙীন টুনি বালবগুলো যেন চোখের সামনে ছড়িয়ে পড়তে থাকল। তার পরই ঘন অন্ধকার।
‘এ বার কাউন্ট শুরু করুন ম্যাডাম। আমি যেন শুনতে পাই।’
তাঁর বয়স এখন তিপ্পান্ন। লায়লার কথামতো লিলি বলতে শুরু করলেন, ‘ফিফটি থ্রি।’ সঙ্গেসঙ্গে লায়লা, মার্থা, বাম কিমের মুখটা দেখতে পেলেন তিনি। চোখের সামনে থেকে দ্রুত ফ্রেমটা সরে গেল। দশ সেকেন্ড পর তিনি ‘ফিফটি টু’ বলতেই ভেসে উঠল সাশা, ড্যানিয়েল আর ওদের ছেলে-মেয়েদের মুখগুলো। লায়লা জিজ্ঞেস করল, ‘ম্যাডাম, কিছু দেখতে পাচ্ছেন?’
লিলি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার পরিচিত মুখগুলো।’
‘যত পিছনের দিকের সংখ্যা গুণবেন, ততই পুরনো হয়ে যাওয়া মুখগুলো আপনি দেখতে পাবেন।’
সত্যিই, সদ্য ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা দেখতে পাচ্ছেন লিলি। লায়লার পার্লারের বাইরে অসুস্থ হয়ে পড়া। নিউ ইয়র্কের হাসপাতালে এলসা আন্টি আর অ্যান্ডির সঙ্গে দেখা হওয়া। নায়গারায় রোকেয়া সুলতানার সঙ্গে কথা বলা, কালকেতু ন্যান্ডির সঙ্গে পরিচয় হওয়া, বাফেলোর সেই হাসপাতাল। ফ্রেমগুলো একের পর এক সরে যাচ্ছে। সংখ্যাগুলো বলার সঙ্গেসঙ্গে অতীতের দিকে একেকটা বছর পিছোতে শুরু করলেন লিলি। ইয়েমেনের শহর আদেনে জাহাজে তাঁদের আটকে দেওয়া হয়েছে, সেখানে বুভুক্ষ বাচ্চাগুলোর মুখ। ইউনিসেফ দফতরের মিটিংয়ে তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণ। প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎকার। চ্যারিটি নেভিগেটর দফতরে সংবর্ধনা। বোস্টনে চাইল্ড কেয়ার ইউনিটের উদ্বোধন অনুষ্ঠান। তাঁর কর্মব্যস্ত জীবনের পৃষ্ঠাগুলো একের পর এক উল্টে যাচ্ছে। জোহানেসবার্গে নেলসন ম্যান্ডেলার হাত থেকে পুরষ্কার নেওয়ার ছবিটাও দেখতে পেলেন লিলি। হোটেলে ফিরে এলসা আন্টি সে বার রাগে ফেটে পড়েছিলেন। উনি মনে করেছিলেন, ফাউন্ডেশনের সবথেকে বয়োজ্যোষ্ঠ হওয়ার কারণে, ম্যান্ডেলার হাত থেকে পুরষ্কারটা নিতে উনিই মঞ্চে উঠবেন। কিন্তু সংগঠকরা ওঁকে পাত্তা দেননি।
হোটেলে ফিরে সবার সামনে এলসা আন্টি বলে ফেলেছিলেন, ‘এখন বুঝতে পারছি, ঢাকার মেডিক্যাল হাসপাতালে তোমাকে মর্গে না পাঠিয়ে, সেদিন আমি খুব ভুল করেছিলাম। আজ তুমি যে অপমানটা আমায় করলে, তার যোগ্য উত্তর তুমি পাবে।’
কথাগুলো শুনে লিলি পরের সংখ্যাটা বলতেই ভুলে গেলেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ!! তা হলে কি তাঁর পরিবারের শিঁকড় বাংলাদেশের ওই শহরে?
