জিহাদি – ১৫

(পনেরো)

বেলা সাড়ে দশটার সময় টাইম নেওয়া আছে লিলির। তার আগেই পার্লারে পৌঁছতে হবে। ঘাড় ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, ব্রডওয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। তার মানে আর দুটো ব্লক। গাড়িতে মিনিট পাঁচেক সময়ও লাগার কথা নয়। রাস্তায় ট্র্যাফিক জ্যাম না থাকলে ঠিক সময়েই পৌঁছে যাবেন। একবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফেল করলে, পার্লারে অন্যদের অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয়। সেটা অবশ্য লিলির ক্ষেত্রে ঘটে না। লায়লা বলে যে মেয়েটা তাঁর চুল কাটে, সে নিয়ম ভেঙে আগে ডেকে নেয়। গত পাঁচ বছর ধরে ওই ইরানি মেয়েটাকে দিয়েই তিনি চুল কাটাচ্ছেন। টিভি চ্যানেলে মাঝে মধ্যে তাঁকে টকশোতে বসতে দেখে। জানে, তিনি কে? মেয়েটা তাই বাড়তি খাতির করে।

পার্লারের নাম দ্য গ্রেট ক্লিপস। এমনই নামী-দামি, সেলেব্রিটিদের খুব ভিড় হয়। বছরের গোড়ার দিকে একসঙ্গে গোটা সাত-আটেক কুপন কেটে রাখেন লিলি। তা হলে চুল কাটার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া সহজ হয়। আগে কুপন কাটার জন্য সামান্য কনসেশনও পাওয়া যায়। সাধারণত, মাস দুয়েক পরপরই লিলি পার্লারে আসেন। এ বার একটু আগেই যেতে হচ্ছে। পিঠে ফের চুলকানি শুরু হয়েছে। প্লাস্টিক সার্জেনের কাছে গেলেই উনি ঘাড় অবধি চুল না-রাখার পরামর্শ দেন। ডাক্তারের কথা শুনে অ্যাদ্দিন সোনালি পরচুলা ব্যবহার করেছেন লিলি। কিন্তু তাতেও পিঠের চামড়ার সমস্যা মেটেনি। বিকেলের দিকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে ডাক্তারের। গাড়িতে যেতে যেতে লিলি একবার ঝালিয়ে নিলেন সারাদিনে কী কী কাজ আছে। লাঞ্চের পরে আসার কথা সেই ইন্ডিয়ান ছেলেটার, যে নায়গারায় প্রাণ বাঁচিয়েছিল। তার সঙ্গে কথা বলেই লিলি চলে যাবেন প্লাস্টিক সার্জেনের কাছে।

সাড়ে দশটার আগে পার্লারের কাছে পৌঁছে লিলি দেখলেন, দু’তিনজন চেনা ফোটোগ্রাফার পার্কিং স্পেসে ঘোরাঘুরি করছেন। তার মানে নিশ্চয়ই কোনও না কোনও সেলেব্রিটি চুল কাটতে এসেছেন। হয়তো খবর পেয়ে ফোটোগ্রাফাররা এসে হাজির হয়েছেন। পার্কিং স্পেসের উল্টো দিকেই ইহুদিদের একটা সিনেগগ। সেখান থেকে ঘণ্টাধ্বনির শব্দ ভেসে আসছে। ইহুদিদের কোনও অনুষ্ঠান আছে বোধহয়। অন্য দিন পার্লার থেকে অনেকটা দূরে গাড়ি পার্ক করেন লিলি। যাতে খানিকটা হাঁটার ব্যায়াম করা যায়। কিন্তু আজ পার্লারের খুব কাছে গিয়ে গাড়িটা দাঁড় করালেন তিনি। ফোটোগ্রাফারদের চোখে পড়লে রক্ষা নেই। খবরের জন্য তাঁরা পিছু ধাওয়া করতে পারেন। গাড়ি থেকে নেমে, টুপির আড়ালে মুখ ঢাকা দিয়ে লিলি পার্লারের ভিতর ঢুকে পড়লেন।

ঢুকেই চোখে পড়ল, লায়লা ওর কিউবিকলে নেই। এমনটা কখনও হয় না। তবে কি ও এখনও পৌঁছতে পারেনি? পার্লারের বাকি সবাই তাঁকে চেনেন। ম্যানেজার মেয়েটা কাছে এসে বলল, ‘ম্যাডাম, লায়লা কি জানে, আপনি আসবেন? ও কিন্তু এখনও আসেনি।’

লিলি বললেন, ‘আমি কিন্তু ওর সঙ্গেই কথা বলে রেখেছিলাম।’

‘আপনার যদি তাড়াতাড়ি থাকে, তা হলে অন্য কোনও হেয়ার কাটারকে বলি?’

লিলি বললেন, ‘না। আমি বরং একটু অপেক্ষা করি।’

পার্লারের ভিতরে কাঁচের দেওয়াল ঘেঁষে সার সার দামি চেয়ার পাতা। তার একটাতে বসে লিলি দু’একটা ফোন সেরে নিলেন। আলাদা আলাদা কিউবিকলে আট-দশজন মেয়ে হেয়ার কাটার-এর কাজ করছে। ক্লায়েন্টদের প্রত্যেকের গায়ে কালো অ্যাপ্রোন। মাথা নিচু করে রাখা। কে কোন জগতের সেলেব্রিটি, উজ্জ্বল সাদা ফ্লুরোসেন্ট আলোতেও তা বোঝা যাচ্ছে না। ঘরের ভিতর মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। মেশিনে এমনভাবে সুগন্ধি ভরে দেওয়া আছে, যা পাঁচ-সাত মিনিট অন্তর আপনা থেকেই বেরিয়ে আসে। হালকা মিউজিকের শব্দও শোনা যাচ্ছে।

দেওয়ালে অ্যাঞ্জেলিনা জোলি আর ব্র্যাড পিটের ছবি। বোধহয় কোনও হেয়ার প্রোডাক্টের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার। আরও অনেক ছবির মাঝে লিলি একটা পোস্টার দেখে একটু অবাক হলেন, ‘স্টপ হিউম্যান ট্র্যাফিকিং।’ মানুষ পাচার করলে তার কী কী শাস্তি, তাও পোস্টারে লেখা। দেশটার হলটা কী? স্কুলের বাইরে লিখে দিতে হচ্ছে, ‘ড্রাগ ফ্রি, গান ফ্রি’ স্কুল। মানে, এই স্কুলে মাদক সেবন হয় না। ছাত্ররা কেউ অস্ত্র নিয়ে ঢোকে না। পার্লারেও লিখে দিতে হচ্ছে, মানুষ পাচার বেআইনি। আশ্চর্য!

বসে থাকতে থাকতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাতিল করবেন কি না ভাবছেন লিলি, এমন সময় কাচের সুইং ডোর ঠেলে ঝড়ের গতিতে ঢুকল লায়লা। কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘অ্যায়াম সরি মিস গডউইন। আমার জন্য আপনাকে কয়েক মিনিট ওয়েট করতে হল।’

লিলি হেসে বললেন, ‘ডাজন্ট ম্যাটার ডিয়ার।’

অন্যদিন লায়লা খুব সেজেগুজে থাকে। চুল কাটতে বসার পর আয়নায় লিলি দেখলেন, লায়লার মুখটা শুকনো, চোখের নিচে কালি। রাতে বোধহয় ভাল ঘুমহয়নি। ওর স্বামী ডেমির্টাস থাকে তুরস্কের ইস্তানবুলে। দুটো বাচ্চাকে নিয়ে মেয়েটা একা নিউ ইয়র্কে রয়েছে। ডেমির্টাস একবার নিউ ইয়র্কে এলে ওর সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছিল লায়লা। তখন শুনেছিল, ও আধা কুর্দ, আধা পারসি। ছেলেটা ভীষণভাবে জড়িয়ে গেছে কুর্দিস্তান তৈরির আন্দোলনে। ইস্তানবুল ছেড়ে পাকাপাকি চলেও আসতে পারছে না নিউ ইয়র্কে। চুল কাটার সময় প্রায়ই নিজের পরিবারের গল্প করে লায়লা। লিলি তাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘খবর সব ভাল, লায়লা?’

হেয়ার কাটিং মেশিন চালিয়ে দিয়ে লায়লা বলল, ‘না ম্যাডাম। একটা বাজে খবর আছে।’ বলতে বলতে ওর চোখের কোণ ভিজে উঠল। ‘তুরস্কের পুলিশ কাল ডেমির্টাসকে অ্যারেস্ট করেছে। ইস্তানবুলের রাস্তায় কুর্দদের একটা মিছিল বেরিয়েছিল। তাতে পুলিশ লাঠি চার্জ করে। শুনলাম, ডেমির্টাসের মাথায় চোটও লেগেছে।’

লিলি জানতে চাইলেন, ‘খবরটা তুমি কার কাছ থেকে পেলে?’

‘প্রথমে আল জাজিরা নিউজ চ্যানেলে ম্যাডাম। ডেমির্টাসকে দেখাও গেছে, রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশ ভ্যানে উঠছে। পরে ওর ভাই আমাকে ফোন করেছিল। কী করব, বুঝতে পারছি না।’

‘ইস্তানবুল যাওয়ার কথা ভাবছ না কি?’

‘কী করে যাব? বাচ্চা দুটো এখানকার স্কুলে পড়ছে। ওদের কার কাছে রেখে যাব ম্যাডাম? ডেমির্টাসকে কতবার বলেছি, দেশ ছেড়ে চলে এসো। আমেরিকায় সেটল করতে কোনও অসুবিধে নেই। কিন্তু ও বলে, কুর্দদের আন্দোলন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক, ইরান… যেখানে যত কুর্দ বসবাস করে, সবাই একটা জায়গায় এসে জড়ো হয়েছে। আমাদের কুর্দিস্তান আর সময়ের অপেক্ষা। দেশের পাট গুটিয়ে ও চলেও আসতে পারছে না।’

কুর্দরা পশ্চিম এশিয়ার একটা এথনিক গোষ্ঠী। লায়লা যে চারটে দেশের নাম করল, তার খানিকটা করে অংশ নিয়ে কুর্দরা কুর্দিস্তানের স্বপ্ন দেখছে। আলাদা রাষ্ট্র বলে ঘোষণাও করেছে নিজেদের। সেনাবাহিনীও তৈরি করে ফেলেছে। কিন্তু এখনও রাষ্ট্রের মর্যাদা পায়নি। দু’একটার বেশি রাষ্ট্র স্বীকৃতি দেয়নি বলে। ইউনাইটেড নেশন’সও মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। তবে আন্দোলন যেভাবে গতি নিচ্ছে, তাতে ওদের দমিয়ে রাখা যাবে না। আপত্তিটা বেশি তুরস্কের তরফে। কেননা, ওদের দেশের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড কুর্দিস্তানে চলে যাবে। পুরো ঘটনাবলি লিলির জানা। তবুও তিনি চুপ করে রইলেন।

লায়লা ফের জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার কী মনে হয় ম্যাডাম, ডেমির্টাস যা বলছে, ঠিক? কুর্দিস্তান হবে? আপনারা তো অনেক বেশি খবর রাখেন।’

‘ডেমির্টাস ঠিকই বলছে।’ লিলি অল্প কথায় সেরে দিলেন।

লায়লা জিজ্ঞেস করল, ‘পুলিশ কাস্টোডি হয়েছে। ওর উপর খুব টর্চার হবে, তাই না ম্যাডাম?’

তা তো হবেই। কিন্তু সেটা বললে লায়লা আরও মুষড়ে পড়বে। পশ্চিম এশিয়া থেকে যে সব খবর আসছে, তা শিউড়ে ওঠার মতো। একদিকে জেনোসাইড চলছে। মৃত্যুর মিছিল। অন্যদিকে, মানবাধিকার লঙ্ঘন। পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে শুরু করে আরও পশ্চিমে লেবানন-প্যালেস্তাইন পর্যন্ত। শিয়া-সুন্নিদের লড়াই।কেউ শান্তিতে নেই। ইস, লায়লা মেয়েটার কপালে দুঃখ আছে। কুর্দ বিরোধীরা যেসব নৃশংস কাণ্ড ঘটাচ্ছে, তাতে ডেমির্টাসের ফিরে আসার সম্ভাবনা কম। তবুও, সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে লিলি বললেন, ‘এখানে বসে তুমি চিন্তা করে কী করবে? আল্লাহর উপর ভরসা রাখো। যা করার উনিই করবেন।’

খানিকক্ষণ চুপচাপ হাতের মেশিনটা চালিয়ে গেল লায়লা। ঘাড়ের কাছে যখন চালাচ্ছে, তখন একবার সুচ ফোটানোর মতো ব্যথা টের পেলেন লিলি। ইদানীং মাঝে মধ্যেই এই যন্ত্রণাটা ফের ভোগাচ্ছে। প্রতি বছর মরশুম বদলানোর সময় পিঠের চামড়া তাকে ভোগায়। ড্যাডির মুখে তিনি শুনেছেন, প্রথমবার চিকিৎসার সময় স্কিন গ্রাফটিংয়ে ডাক্তাররা কিছু ভুলভ্রান্তি করেছিলেন। তার খেসারত সারা জীবন তাঁকে দিয়ে যেতে হবে। পিঠের চামড়া আর মসৃণ নেই। বাঁ হাতের বগলের পিছন দিকের চামড়া টেনে ধরে থাকে সর্বদা। বাঁ হাতটা তিনি পুরোপুরি তুলতে বা নামাতে পারেন না। এখনও তাঁকে উপুড় হয়ে শুতে হয় রাতে।

লায়লা চুল কাটতে খুব বেশি সময় নেয় না। তাঁর পিঠ জুড়ে যে পুড়ে যাওয়া চামড়ার দাগ আছে, সেটা পার্লারে একমাত্র ও-ই জানে। অস্বস্তিটা ও বোধহয় বুঝতে পেরেছে। জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার কি লাগছে ম্যাডাম?’

লিলি ঘাড় নাড়িয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। মনে হচ্ছে, কেউ যেন পিন ফোটাচ্ছে।’

 ‘ম্যাডাম, আপনার ঘাড়ের বেশ কয়েকটা জায়গায় লাল দাগ দেখতে পাচ্ছি। একবার ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করুন।’

লিলি বললেন, ‘হ্যাঁ, আজই অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি।’

‘ম্যাডাম, আপনার স্কিন এখনও নর্মাল হল না? কী করে হয়েছিল?’

একই প্রশ্ন লায়লা আগেও করেছে। একই উত্তর লিলি ওকে আগেও দিয়েছেন। কোথায় হয়েছিল, কী করে হয়েছিল… সেসব লিলি নিজেরও জানা নেই। ড্যাডির মুখে শুনেছিলেন, খুব ছোটবেলায় হ্যালোইনের রাতে ফায়ার ড্যন্সের সময় আগুন লেগে, তাঁর শরীরের পিছন দিকটা ঝলসে গেছিল। বছর খানেক না কি তাঁকে হাসপাতালে পড়ে থাকতে হয়েছিল। সেইসব দিনগুলোর কথা বহুবার মনে করার চেষ্টা করেছেন লিলি। কিন্তু একবিন্দুও মনে পড়েনি। লায়লার কৌতূহল মেটানোর জন্য তিনি শুধু বললেন, ‘জানি না কেন সারছে না। মনে হয়, এ বার লেজার ট্রিটমেন্ট করাতে হবে।’

দ্রুত হেয়ার কাট শেষ করে লায়লা পার্কিং স্পেস পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল। লিলি গাড়িতে উঠতে যাবেন, এমন সময় লায়লা বলল, ‘ম্যাডাম, আপনার কাছে একটা রিকোয়েস্ট ছিল।’

স্টার্ট দেওয়ার জন্য গাড়ির সুইচে আঙুল দিতে গিয়েও লিলি সরিয়ে নিলেন। মেয়েটা মারাত্মক টেনশনে আছে। না হলে নিজের কিউবিকল থেকে বেরিয়ে আসত না। লিলি দরজা খুলে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত সংকোচ করছ কেন লায়লা। বলো।’

‘ম্যাডাম, আপনার চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনে কি আমার বাচ্চা দুটোর ঠাঁই হতে পারে?’

মাই গুডনেস! লায়লা এতদূর অবধি ভেবে নিয়েছে? লিলির চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের একটা স্কুল আছে ডালাসে। সেখানে প্রায় হাজার দুয়েক বাচ্চা হস্টেলে পড়াশুনো করে। বিশ্বের যুদ্ধপীড়িত দেশের অনাথ বাচ্চা তারা। যুদ্ধ অথবা জেনোসাইডের কারণে যে সব বাচ্চা বাবা-মা হারিয়েছে, তাদের জন্য এই স্কুল। আমেরিকায় জন্ম যাদের, তাদের জন্য নয়। তাই লিলি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বাচ্চা দুটো কি তুরস্কে জন্মেছে, না কি আমেরিকায়?’

লায়লা বলল, ‘বড়জনের জন্ম তুরস্কে। ছোটটার এখানে।’

লিলি বললেন, ‘তা হলে বড়জনকে আমাদের স্কুলে নেওয়া যেতে পারে। ছোটটাকে নয়। কিন্তু, জিজ্ঞেস করছি বলে কিছু মনে কোরো না। বাচ্চাদের নিয়ে তুমি এত চিন্তিত কেন লায়লা?’

ফের মেয়েটার চোখের কোণে জল। বলল, ‘কেন জানি না ম্যাডাম, আমার মনে হচ্ছে ডেমির্টাস বোধহয় আর ফিরে আসবে না। আমাকে একবার ইস্তানবুল যেতেই হবে। ডেমির্টাসের জন্য ল’ইয়ার ঠিক করতে হবে। এই সময়টায় ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ানো দরকার। কিন্তু আমি চলে গেলে বাচ্চা দুটোর কী হবে, ভেবে রাতে আমি ঘুমোতে পারছি না।’ বলতে বলতে কেঁদে ফেলল লায়লা।

মেয়েটাকে সান্ত্বনা দিয়ে ফের গাড়িতে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় লিলি কোথাও গুলি চলার আওয়াজ শুনতে পেলেন। পিছন দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, একদল লোক রাস্তার ও পারে সিনেগগের দিক থেকে দৌড়ে আসছে। চিৎকার করে বলছে, ‘টেররিস্ট, টেররিস্ট। পালাও। পালাও।’

শুনে থমকে দাঁড়ালেন লিলি। কী শুরু হয়েছে দেশে? ভর দুপুরে টেররিস্ট অ্যাটাক! তাও সিনেগগে! এই একটু আগেই তো ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছিল ওখান থেকে। ‘ম্যাডাম, শিগগির পার্লারের ভিতর চলুন। এখন গাড়ি নিয়ে বেরোতে হবে না।’ বলে লায়লা হাত ধরে টানল। তখনই পিছন দিকে তাকিয়ে লিলি একটা ভয়ানক দৃশ্য দেখতে পেলেন। আলোর ঝলকানি, কানে তালা দেওয়ার মতো একটা আওয়াজ। সিনেগগের একাংশ ভেঙে পড়ার সঙ্গেসঙ্গে একটা ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠে যাচ্ছে আকাশের দিকে। দৃশ্যটা দেখার পরই মাথার ভিতর কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল লিলির। হঠাৎই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। তার পরই চোখের সামনে অন্ধকার। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে তিনি টলে পড়লেন লায়লার বাহুডোরে।

পুরো শরীরটা হালকা হয়ে গেছে। ধুয়োর কুণ্ডলীর সঙ্গে খানিকটা উপরের দিকে উঠে, শূন্যে ভাসতে শুরু করেছেন লিলি। কয়েক সেকেন্ড পর নিচের দিকে তাকিয়ে রং বদলাতে যাওয়া গাছগুলো তিনি দেখতে পেলেন না। সিনেগগটাও নেই। তার বদলে রয়েছে হিন্দুদের একটা মন্দির। তার খুব কাছে নদীর ঘাট। মন্দিরের লাগোয়া প্রচুর চেনা চেনা গাছ। আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, বাতাবি লেবু। আমগাছের ডালে একটা দোলনা ঝুলছে। ভাসতে ভাসতে লিলি গিয়ে দোলনায় বসে পড়লেন। একটা সময় দোলনা তাঁর খুব প্রিয় ছিল। সময় পেলেই কোঁচড়ে আম-জাম-পেয়ারা বা আচার নিয়ে দোলনায় উঠে পড়তেন। সেই অভ্যাসবশত আজও তিনি দোল খেতে শুরু করলেন।

একবার করে আকাশের দিকে উঠছেন আর নেমে আসছেন। উপরের দিকে ওঠার সময় ডালপালার ফাঁক দিয়ে কয়েকটা টিনের চালের বাড়ি দেখতে পাচ্ছেন লিলি। সেইদিক থেকে কারও গলা ভেসে আসছে। কিন্তু কী বলছে বোঝা যাচ্ছে না।’ নিচের দিকে তাকিয়ে লিলি দেখলেন, বয়স্কা এক মহিলা কোমরে আঁচল বেঁধে তাকে শাসাচ্ছেন। তার হাতে ঘাস থেকে কুড়িয়ে নেওয়া একটা ডাঁশ।

দোলনা থেকে ঝুপ করে লাফিয়ে নামতে গিয়ে লিলি আছাড় খেলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *