জিহাদি – ৩০

(ত্রিশ)

পলাশছ্যাররা তিনজন বাইরে কোথাও বেড়াতে গেছেন। হাতে কোনও কাজ নেই। নাস্তা করার পর ইমনের মনে হল, জিহাদিদের উপর লেখা বইটা পড়া শেষ হয়নি। এই সুযোগে পড়ে ফেলা যাক। শেষের মাত্র দশ-বারোটা পৃষ্ঠা বাকি ছিল। জিহাদি আতাতুর্ক শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল কী না, জানার খুব কৌতূহল হল ওর। কাইলকেতুছ্যার মাঝে একদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বইটা পড়ে কেমন লাগল। ইমন খুব লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। চার-পাঁচদিন আগে নিয়ে এসেছিল, এর মধ্যে বইটা ওর ফেরত দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ইমন লক্ষ করেছে, যখনই ও বইটা নিয়ে বসে, তখনই চিরাগ ওকে উত্যক্ত করে।

ওকে পিস্তল দেখানোর পর চিরাগের উপর থেকে ইমনের সহানুভূতি উবে গেছে। এখন ভাবে, কী ভুলই না ও করেছিল, পাবলিক স্টোরেজ থেকে সেদিন চিরাগকে ডেকে এনে। সেদিনই ওর আলাদা হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ছেলেটা একেবারে বদলে গেছে। সবসময় চিড়বিড় করে। রোজিনা ম্যাডামের নামে বাজে বাজে কথা বলে। পলাশছারের মতো একজন ভালামানুষকে খুন করার জন্য চিরাগের হাত নিসপিস করে। ইদানীং মাঝে মাঝেই চিরাগ উধাও হয়ে যাচ্ছে ঘণ্টা কয়েকের জন্য। বলেও যায় না, কোথায় যাচ্ছে। বা কার সঙ্গে আজকাল মেলামেশা করছে। তবে, ওর যে নতুন কয়েকজন সঙ্গী হয়েছে, সেটা ইমন টের পায় কখনও ওর কাছে কারও ফোন-টোন এলে।

জিহাদি সম্পর্কিত বইটা ইমন পেজমার্ক দিয়ে পরশু রাতে রেখেছিল বালিশের পাশে। সেটা খুঁজে পেল না। ডিভানের খাঁজে পড়ে গেছে ভেবে, ও উঁকি মারল। না, মেঝেতে কোথাও নেই। বইটা কি চিরাগ তা হলে লুকিয়ে রেখেছে? কথাটা মনে হতেই ওর মাথা গরম হয়ে গেল। বাস্টার্ড ভেবেছেটা কী? সঙ্গে সঙ্গে ও উল্টো দিকে চিরাগের বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কম্ফর্টারটা আগোছালো অবস্থায় পড়ে আছে। বিছানার গদীটা তুলে ধরতেই ইমনের চোখে পড়ল, নতুন কয়েকটা সিডি আর জিহাদিদের লিফটলেট লুকোনো রয়েছে। একটা সিডি হাতে নিয়ে ও বুঝতে পারল, একেবারে নতুন। যাতে ক্যালিফেট আলজাওয়াকির সাম্প্রতিকতম ভাষণ রয়েছে। সিডিটা পেল কোথায় চিরাগ? ওর সঙ্গে কি তা হলে রাক্কার ক্যালিফেটের যোগাযোগ হয়েছে? অজানা একটা আতঙ্ক গ্রাস করল ইমনকে।

মাইনাসের নিচে তাপমাত্রা। তবুও ইমন ঘামতে লাগল। এ কী সর্বনাশ ডেকে আনছে চিরাগ? পুলিশ যদি কোনওদিন আউট হাউস সার্চ করতে আসে, তা হলে? এমনিতেই ইমন বুঝতে পারছে, সেইদিনটার খুব বেশি দেরি নেই। সুদীশছ্যারের কথাবার্তায় সেদিন ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। আউট হাউস থেকে যদি জিহাদিদের এইসব ডকুমেন্ট পুলিশ উদ্ধার করে, তা হলে তো পলাশছ্যারকেও ওরা ছেড়ে দেবে না। না, না, ছ্যারের মতো ভালামানুষকে এই বিপদে ফেলা মানে গুনাহ। সিডি আর লিফটলেটগুলো চট করে ইমন একটা প্যাকেটে ভরে নিল। সুযোগমতো বাইরে কোথাও ফেলে দেবে। তার পর আউট হাউসের সদর দরজাটা বন্ধ করে এসে, খুঁজতে লাগল, আর কী কী চিরাগ লুকিয়ে রেখেছে।

মাথা ঠান্ডা করার জন্য এসি চালানো দরকার। বোর্ডের দিকে হাত বাড়িয়ে ইমন একটা সুইচ টিপতেই, পিছন থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ শুনতে পেল। ঘুরে তাকিয়ে দেখে, সিঙ্গল সোফা এবং তার নিচের কার্পেট একদিকে সরে গেছে। পা চালিয়ে কাছে গিয়ে ও দেখল, শোয়ানো একটা কাঠের পাটাতন। হা খোদা, এটাই তা হলে চোরাকুঠুরিতে ঢোকার রাস্তা! কাঠের সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে। বহুদিন আগে চিরাগ বলেছিল বটে, আউট হাউসের তলায় চোরাকুঠুরিতে ওকে নিয়ে যাবে। কিন্তু আর পর আর উচ্চবাচ্য করেনি। চোরাকুঠুরিতে কী আছে, তা দেখার প্রবল ইচ্ছেয়, ইমন সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। চিরাগ সেদিন বলেছিল, চোরাকুঠুরিতে ও না কি এমন কিছু পেয়েছে, যা প্রমাণ করে পলাশছ্যার ভালামানুষ না।

নিচে নেমে পুরো চোরাকুঠুরি একবার চক্কর দিতে ইমনের সাত-আট মিনিট লেগে গেল। বড় দুটো হলঘর। গুদামও বলা যায়। তাতে পলাশ গারমেন্টস-এর বড় বড় পেটি। সম্ভবত বাংলাদেশ থেকে আনা। একপাশে একটা অফিসঘরের মতো। সেখানে দু’তিনটে ল্যাপটপ রয়েছে। একটা আবার খোলা অবস্থায়। যেন কেউ কাজ করতে করতে উঠে গেছে। সোফা, টেবল, চেয়ার দিয়ে ঘরটা বেশ সুন্দর সাজানো। তার পাশে একটা রেস্টরুমের মতো। কাচের সুইংডোর খুলে ওই ঘরে উঁকি মারতেই ইমন চমকে উঠল। প্রায় নগ্ন একটা যুবতী মেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে। তার হাত আর পা বাঁধা। দরজা খোলার আওয়াজ পেতেই মেয়েটা চিৎ হওয়ার পর ইমন দেখল, তার মুখে কাপড় গোঁজা। চোখ-মুখে আতঙ্কের চিহ্ন। দেখেই ওর মনে হল, মেয়েটার উপর পাশবিক অত্যাচার করা হয়েছে। মেয়েটা এল কোত্থেকে? তা হলে চিরাগ নিয়ে এসেছে না কি!!

দ্রুত কাছে গিয়ে ইমন আগে ওর মুখের ভেতর থেকে কাপড় বের করে দিল। মেয়েটা অপ্রত্যাশিতভাবে পা ছুড়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘গো অ্যাওয়ে বাস্টার্ড।’ একই কথা বারবার বলতে লাগল।

মেয়েটা উঠে বসার চেষ্টা করছে। কাছে গেলে ফের হয়তো হিংস্র হয়ে উঠতে পারে। আশপাশে তাকিয়ে ইমন দেখল টেবলের উপর একটা পানির বোতল রাখা আছে। তাড়াতাড়ি বোতলটা এগিয়ে দিয়ে ও ইঙ্গিত করল, পানি খাবে? এ বার মেয়েটা প্রতিবাদ করল না। মুখ হাঁ করে পানি খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করল। কয়েক ঢোঁক পানি খাওয়ার পর মেয়েটা হাঁফাতে লাগল। ইমন আরও একধাপ এগিয়ে মেয়েটার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে বলল, ‘তুমি কে? এখানে কীভাবে এলে?’

হাতে ভর দিয়ে কোনও রকমে বিছানায় উঠে বসে মেয়েটা গুম মেরে গেল। পা দুটো ছড়িয়ে দিয়েছে। উরুতে রক্তের ছোপ দেখে ইমন শিউড়ে উঠল। ও ভাবতেই পারছে না, আউট হাউসের তলায় এমন জঘন্য কাজ হতে পারে। চিরাগ একা এই অপরাধটা করেছে, না কি আরও কেউ ওর সঙ্গে ছিল? সম্ভব, ওর পক্ষে সবই সম্ভব। বাইরের লোক ডেকে এনে নারীসম্ভোগ করা। তৌফিককে লুকিয়ে ও একদিন এই ঘরে নিয়ে এসেছিল। চিরাগ সেদিন কথায় কথায় আরও বলেছিল, এই চোরাকুঠুরির অন্য প্রান্তটা পার্কের দিকে। ইমনের জিহাদি ট্রেনিং মাথায় সিগন্যাল দিতে লাগল, আগে সেই প্রান্তটা বন্ধ করে আসা দরকার। চিরাগ যদি কাউকে সঙ্গে নিয়ে, পার্কের দিক থেকে ভিতরে ঢুকে আসে, তা হলে একা ওদের সঙ্গে যুঝতে পারবে না। সিদ্ধান্তটা নিয়ে ও মেয়েটাকে বলল, ‘কুল ডাউন প্লিজ। আমি তোমার কোনও ক্ষতি করতে আসিনি।’

বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে ও দরজাটা বন্ধ করে দিল। হাতের বাঁধন খুলে দিয়েছে। ইচ্ছে করলে মেয়েটা নিজেই পায়ের বাঁধন খুলে ফেলতে পারে। খুলুক, ওর বিশ্বাস অর্জন করার জন্য এটুকু করা দরকার। করিডর দিয়ে হাঁটার সময় ইমন ঠিক করে নিল, উপরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে কিছু খাবার নিয়ে আসবে। মেয়েটাকে দেখে মনে হয়, অভুক্ত। খাবার পেটে পড়লে ও খানিকটা স্বাভাবিক হবে। চোরাকুঠুরির অপর প্রান্তে গিয়ে ইমন দেখল, ভিতর থেকে লক করা আছে। সিঁড়ির পাশেই একটা ঘর। টেবলের উপর থার্মোকলের একাধিক প্লেট ও গ্লাস। মদের একটা বোতল। রেস্তোরাঁ থেকে আনা প্যাকেটে কিছু অভুক্ত খাবার পড়ে আছে। তার মানে ক্রিসমাস ইভ-এ ভাল মেহফিল বসেছিল এখানে। পলাশছ্যারেরা তখন কোথাও ডিনারে গেছিলেন। আর ও একা ঘরে বসে বিটিভিতে সিনেমা দেখছিল।

হঠাৎ টেবলের উপর জিহাদিদের নিয়ে বইটার মলাট ইমনের চোখে পড়ল। পৃষ্ঠাগুলো কুচি কুচি করে ছেঁড়া। মেঝের এককোণে জড়ো করা। বইটা এখানে এল কী করে? একটু চিন্তা করতেই ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, চিরাগের সঙ্গে কাল রাতে যে বা যারা এই ঘরে ছিল, তারাও জিহাদি। ভোরবেলায় তারা বেরিয়ে গিয়েছে। ধরা পড়বে, সবাই ওরা ধরা পড়বে। ওরা জানে না, ইন্টারপোল অফিসাররা প্রতি মুহূর্তে ওদের উপর নজর রাখছেন। অফিসাররা খবর পেয়ে গেছেন, নিউ জার্সিতে জিহাদিরা আত্মগোপন করে আছে। কথাটা ভাবতে ভাবতেই ইমন দ্রুত পায়ে ফিরে এল উপরের ঘরে। ফ্রিজ থেকে ফ্রুট জু’স-এর প্যাকেট বের করে নিয়ে ফের নিচে নামল। হাতে খুব বেশি সময় নেই। যে কোনও মুহূর্তে চিরাগ আউট হাউসে চলে আসতে পারে। তার আগে মেয়েটাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া দরকার। নিচে

দরজা খুলে ঘরে ঢুকে ইমন দেখল, মেয়েটা বিছানায় নেই। বিছানায় পড়ে থাকা ওর পোশাকও নেই। সম্ভবত ও অ্যাটাচড বাথরুমে ঢুকেছে। ওর অপেক্ষায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ইমন বাথরুমের দরজায় নক করতে লাগল। কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে, দরজা খুলে ও দেখল, মেয়েটা বাথরুমেও নেই। তার মানে ও আসার আগেই মেয়েটা বাইরে বেরিয়ে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। বিছানায় মেয়েটার সেল ফোন পড়ে রয়েছে। সেটা কুড়িয়ে নিয়ে ইমন বাইরে বেরিয়ে এল। নিশ্চয়ই কোনও একটা ঘরে আত্মগোপন করেছে। তাই ঘরে ঘরে ঢুকে ও অনুচ্চস্বরে ডাকতে লাগল, ‘তুমি কোথায়। বেরিয়ে এসো।’

গুদাম ঘরের ভিতর হঠাৎ ইমনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল, ওর পিছনেই কেউ দাঁড়িয়ে। ক্ষিপ্রগতিতে ও একদিকে সরে যেতেই, ঠং করে একটা শব্দ। লোহার খাঁচায় ঠক্কর খেয়ে একটা রড ছিটকে পড়ল মেঝেতে। লাগলে ওকে আর উঠে দাঁড়াতে হত না। অনুরোধের সুরে ইমন বলল, ‘কাম ডাউন প্লিজ। আমি তোমাকে সাহায্য করতে এসেছি। বলো, তুমি কী করে এখানে এলে?’

মেয়েটা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে। দু’হাতে মুখ ঢেকে কাঁদছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ইমন ওকে হালকা হতে দিল। তার পর সাহস করে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘উঠে বোসো। আগে বলো, তুমি কে?’

মেয়েটা উঠে চেয়ারে বসে বলল, ‘আমি লায়লা। প্লিজ, তুমি আমাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে চলো। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তুমি আমাকে কোনও পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে দাও।’

‘নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু কে তোমাকে এখানে নিয়ে এল, বলো।’

‘মামুন… মামুন আল ফারখ। আমার দেশের বাড়ি ইস্তানবুলে। মামুন আমাদের প্রতিবেশী ছিল।’

নামটা চেনা চেনা মনে হল ইমনের। হ্যাঁ, আজ সকালেই টিভিতে শুনেছে। অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সিতে মামুন বলে ওই সিরিয়ান জিহাদিকে পুলিশ ধরেছে। তার কাছে একটা হ্যান্ডগান ছিল তখন। পর্দায় দেখাল, হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, পুলিশ ওকে গাড়িতে তুলছে। মামুনের মুখটা দেখে ইমন চিনতে পেরেছিল। আরে, এই তো সেই ছেলেটা মোসুল ক্যাম্পে যাকে দেখেছিল। মামুনকে ওর আরও মনে আছে এই কারণে যে, ও ব্ল্যাক হ্যাট ক্র্যাকার। সামান্য একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন থেকে, যে কোনও লোকের পার্সোনাল ডিটেলস কয়েক মিনিটের মধ্যে বের করে ফেলতে পারে। ব্যাঙ্ক থেকে হ্যাপিশ করে দিতে পারে লাখ লাখ ডলার। এঁরা হচ্ছে সাইবার ক্রিমিনাল।

মোসুল ক্যাম্পে চিরাগের সঙ্গে তোলাবাজি করতে যেত মামুন। ও এখন নিউ জার্সিতে, এই কথাটা চিরাগ জানায়ওনি। দু’জনের মধ্যে ফের যোগাযোগটা হল কী করে, একটু ভাবতেই ইমনের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। টিভির খবরে যখন নিউজ রিডার বললেন, ‘অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সিতে অনেক ভিআইপি থাকেন। তাঁদের মধ্যে একজন ইউনিসেফের লিলি গডউইন। মামুন কী উদ্দেশ্যে ওখানে গেছিল, পুলিশ সেটা জানার চেষ্টা করছে।’ হায় খোদা, মামুনকে তা হলে এখানে পাঠানো হয়েছে, লিলি গডউইনকে খুন করার জন্য। আর সেই ব্যাপারে সাহায্য করছিল চিরাগ!

লায়লা মেয়েটা ক্রমেই স্বাভাবিক হচ্ছে। এখন চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে। ইমন জিজ্ঞাসা করল, ‘এখানে মামুনের সঙ্গে তোমার দেখা হল কী করে?’

‘মেট্রো পার্ক স্টেশনে। এখানে আমার এক আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম। ট্রেনে করে নিউ ইয়র্ক ফিরে যাওয়ার জন্য যখন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে, তখনই মামুনের সঙ্গে দেখা। বলল, ওর সঙ্গে গাড়ি আছে। ও নিউ ইয়র্কেই ফিরে যাবে। কিন্তু, কাছেই ওর এক বন্ধুর বাড়ি। সেখানে মুখ দেখিয়ে ও বেরিয়ে আসবে। এ কথা বলে, মামুনই আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। বুঝতে পারিনি, দু’দিন ধরে আমাকে আটকে রাখবে। আমাকে রেপ করবে।’ টানা কথা বলে বোধহয় গলা শুকিয়ে গেছে লায়লার। ফ্রুট জু’সের প্যাকেট থেকে ও খানিকটা জু’স গলায় ঢালল।

মামুনের বন্ধু বলতে লায়লা নিশ্চয়ই চিরাগকে বোঝাচ্ছে। ইমন জিজ্ঞাসা করল, ‘মামুনের বন্ধুটি এখন কোথায়, তুমি কি জানো?’

লায়লা বলল, ‘মামুন কাল রাতে ফিরে আসেনি। কোথা থেকে একটা ফোন পেয়ে ওর খোঁজে ওর বন্ধু ভোরবেলায় তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। আমি বুঝতে পারিনি, মামুন আইএস জিহাদি। আমার উপর অত্যাচার করার জন্যই, ও আমাকে খুঁজে বের করেছিল।’

‘তোমার এ রকম মনে হল কেন?

‘আমার হ্যাজব্যান্ড ডেমির্টাস তুরস্কে কুর্দ আন্দোলনের নেতা। এখানে এসে বুঝতে পারলাম, ইস্তানবুলে মামুনরা ওদের রাইভাল। ডেমির্টাস এখন দেশে পুলিশ কাস্টোডিতে আছে। ও ইচ্ছে করেই জেলে ঢুকে গেছে। না হলে মামুনরা ওকে মেরে ফেলত। আইএস-এর সেই রাগটা এখন এসে পড়েছে আমার উপর। আমি পুলিশকে সব বলতে চাই। প্লিজ, তুমি আমাকে নিয়ে চলো।’

‘এখানে…মানে নিউ ইয়র্কে কি তুমি একা থাকো?’

‘হ্যাঁ। আমার দুই ছেলে। ওরা ডালাসের এক হোস্টেলে থাকে। আমি নিউ ইয়র্কের একটা পার্লারে হেয়ার কাটারের কাজ করি। ওই পার্লারে সেলিব্রিটিরা চুল কাটেন।’

‘তাঁদের মধ্যে কেউ তোমাকে চেনেন?’

‘আছেন একজন। ইউনিসেফের মিস লিলি গডউইন। আমাকে উনি মেয়ের মতো দেখেন। আমার ছেলে দুটোকে উনি ওঁর হোস্টেলেই ঠাঁই দিয়েছেন। উনি মানুষ নন, আমার কাছে দেবী।’

লিলি গডউইনের নামটা শুনে ইমন চমকে উঠল। ওঁর জীবনে এই ভদ্রমহিলার নামটা বারবার ঘুরে ফিরে আসছে। লায়লা ভদ্রমহিলাকে নিশ্চয়ই রেপের কথা জানাবে। উনি প্রভাব খাটালে পুলিশ এক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে নিউ জার্সির এই বাড়িতে। নাহ, যত দ্রুত সম্ভব, চিরাগকে ধরিয়ে দেওয়া দরকার। তেমন হলে ও কাইলকেতুছ্যারের সাহায্য নেবে। দ্রুত সিদ্ধান্তটা নিয়ে ইমন বলল, ‘তোমাকে আমি নিউ ইয়র্ক পর্যন্ত পৌঁছে দেব লায়লা। যদি তুমি আমার একটা অনুরোধ রাখো।’

শুনে নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে রইল লায়লা। একটু ইতস্তত করে ইমন বলল, ‘এই বাড়ির ল্যান্ডলর্ড যিনি, তিনি অত্যন্ত সজ্জন মানুষ। উনি জানেনই না, এ বাড়িতে জিহাদিরা লুকিয়ে আছে। ইন ফ্যাক্ট উনি এখন বাড়িতেও নেই। ক্রিসমাসের ছুটিতে কোথাও বেড়াতে গেছেন। আমি এ বাড়িতে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করি। তুমি যদি পুলিশে কমপ্লেন করো, তা হলে প্লিজ এই বাড়িটার কথা উল্লেখ কোরো না।’

লায়লা বলল, ‘তুমি কি মনে করো, আমি না বললে পুলিশ খুঁজে বের করতে পারবে না?’

খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো করে ইমন বলল, ‘তোমাকে আমি একজনের ছবি দিয়ে দিচ্ছি। তার নাম চিরাগ। ইন্টারপোল তার কথা জানে এবং তাকে খুঁজে বেরাচ্ছে। প্লিজ, পুলিশকে তুমি আমার কথা বোলো না। ফর নাথিং ওরা আমাকে হ্যারাস করবে। আমি নিজেও পুলিশ স্টেশনে ঢুকব না। কাছাকাছি তোমাকে নামিয়ে দিয়েই নিউ জার্সিতে ফিরে আসব।’

সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল লায়লা। খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে ইমন বলল, ‘চলো। আমরা বেরিয়ে পড়ি।’

চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে লায়লার মাথা টলে গেল। তলপেট ধরে ও ফের বসে পড়ল। ইমনের বুঝতে অসুবিধে হল না, কোথাও ওর যন্ত্রণা হচ্ছে। দ্বিধা না করে ও পাঁজকোলা করে তুলে নিল লায়লাকে। তার পর সযত্নে ওকে উপরে তুলে এনে বলল, ‘এ বার কি তুমি হেঁটে গিয়ে গাড়িতে বসতে পারবে? বাইরে দেখবে একটা সিডান দাঁড়িয়ে আছে।’

দেওয়াল ধরে ধরে অতি কষ্টে লায়লা ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার পর, সুইচ টিপে সোফাটাকে ফের যথাস্থানে বসিয়ে দিল ইমন। তার পর ঘরের চারদিকে একবার নজর বুলিয়ে, রাইটিং প্যাড টেনে নিয়ে লিখল, ‘চিরাগ, আমি ক্রিসমাসের নেমতন্ন খেতে রোহিতের বাড়িতে যাচ্ছি। আমার জন্য ওয়েট করিস না। লাঞ্চ করে নিস। কখন ফিরব বলতে পারছি না।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *