জিহাদি – ৪৮

(আটচল্লিশ)

মোজাম্বিক দেশটা ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে দিন কয়েক আগে। ফাউন্ডেশনের অফিসে বসে আল জাজিরা চ্যানেলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনাবলীর দিকে লক্ষ রাখছেন লিলি গডউইন। আফ্রিকার দক্ষিণপূর্ব দিকে ভারত মহাসাগরের তীরে তিন কোটি মানুষের দেশ। আশপাশে মালাউই, জিম্বাবোয়ে, মাডাগাসকর। ‘ইডাই’ ঝড়ের তান্ডবে অসহায় অবস্থায় প্রায় দু’কোটি শিশু ওই অঞ্চলে অনাহারে দিন গুজরান করছে। মোজাম্বিকের বন্দর শহর বেইরা থেকে দু’দিন আগে লিলি একটা মেল পেয়েছিলেন, ‘দয়া করে আমাদের বাচ্চাদের বাঁচান। কলেরা মহামারীর আকার নিয়েছে। প্রচুর বাচ্চা মারা যাচ্ছে।’ ব্যস, ওইটুকুই। তার পর থেকে বেইরার ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ। তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি লিলি। মরিশাসে চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের কর্তাদের ফোন করে তিনি খাবার, ওষুধ আর পোশাক আশাক ভর্তি জাহাজ আজ সকালেই মোজাম্বিকের দিকে রওনা করিয়ে দিয়েছেন।

হলিউডের নামকরা ফিল্ম ডিরেক্টর জুইসেপ্পে বার্লুসকোনি দেখা করতে আসবেন আজ। তাঁর জীবনী নিয়ে যে ছবিটা করছেন, তার প্রোমো তৈরি করে ফেলেছেন বার্লুসকোনি। সেটাই একবার দেখিয়ে নিতে চান। তার আগে আসার কথা, নায়গারায় যে ইন্ডিয়ান ছেলেটা বাঁচিয়েছিল, সেই কালকেতু ন্যান্ডির। কিন্তু মোজাম্বিকের শিশুদের নিয়ে লিলি এমন বিচলিত যে, ওই দু’জনের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল করার কথাও একবার ভেবেছিলেন লিলি। পরে পিএ মার্থাকে বলে দিয়েছেন, এঁরা দু’জন ছাড়া আর কাউকে যেন তাঁর ঘরে পাঠানো না হয়। নিজের চেম্বারে বসে তিনি বিভিন্ন চ্যানেলে মোজাম্বিকের খবর দেখছেন এখন। লন্ডনের গার্ডিয়ান কাগজের এক রিপোর্টার ইডাইয়ের আগে বেইরাতে ছুটি কাটাতে গেছিলেন। টিভিতে তাঁর মুখে লিলি শুনলেন, আর্ত মানুষদের সাহায্যে না কি প্রথম ছুটে যান ভারত মহাসাগরে টহলরত ভারতীয় নৌসেনারা। প্রথম কয়েকটা দিন শরণার্থী শিবিরে খাবার-দাবারের ব্যবস্থা তাঁরাই করেছেন। বিমানে করে অসুস্থ মোজাম্বিকান বাচ্চাদেরও নিয়ে গেছেন মরিশাসে।

শুনে শ্রদ্ধায় মন ভরে উঠেছে লিলির। এই বিশ্বকেই তো তাঁর মতো মানুষরা দেখে যেতে চান। যেখানে মানুষ একে অপরের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেবে। গায়ের রং বিচার করবে না। ধর্ম, ভাষা, কৃষ্টি নিয়ে মাথা ঘামাবে না। ভারতীয় নৌসেনাদের কথা ভেবে কোথায় যেন একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন লিলি। ভারত সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা তাঁর নেই। কিন্তু তিনি জানেন, হাজার হাজার বছরের সভ্যতার দেশ। ভারতীয়রা যে নিজের জীবন তুচ্ছ করে, অন্যের জীবন বাঁচাতে পারেন, সেই নজির তো তিনি একবার চোখের সামনেই দেখেছেন। এই ভারতীয়রাই প্রথম আত্মানুসন্ধানের কথা বলেছিলেন। আগে জানো, তুমি কে?

আত্মানুসন্ধান। কথাটা কয়েকদিন ধরেই মনে মনে নাড়াচাড়া করছেন লিলি। তিনি কে? কোথায় তাঁর শেকড়? এলসা আন্টির কাছ থেকে আঘাত পাওয়ার পর থেকে এই প্রশ্নটাই লিলির মনে ঘোরাফেরা করছে। সেদিন ম্যানহাটন মলেই আন্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা শেষ হয়ে গিয়েছে। এলসা আন্টি এমন আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে তাঁর দিকে এগাচ্ছিলেন যে, লিলির ধারণা হয়েছিল, জোর করে তুলে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেও ইয়ুন লাফিয়ে দু’জনের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছিল। আন্টির হাত মুচড়ে ধরে বলেছিল, ‘গো অ্যাওয়ে লেডি। আদারওয়াইজ আই উইল টিচ ইউ আ লেসন। ব্রেক ইওর হ্যান্ড।’ ওর রুদ্রমূর্তি দেখে লিলি ভয় পেয়ে গেছিলেন। সত্যি সত্যিই আন্টির হাত ভেঙে দেবে না কি? এলসা আন্টিও ভয় পেয়ে, কোনওরকমে হাত ছাড়িয়ে এক্সালেটরে করে নিচের তলায় নেমে যান।

সেই থেকে মনের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন লিলি। এলসা আন্টির উপর এতটা কড়া মনোভাব নেওয়া কি উচিত হয়েছে? মন খারাপ করে কোনও কাজ সুষ্ঠুভাবে করতে পারছিলেন না। তখন বাম কিমই বলেন, ‘সত্য গোপন করা অপরাধ ম্যাডাম। তহবিল তছরুপের কথা ছেড়ে দিন। আপনার আইডেন্টিটি প্রকাশ করার ব্যাপারে ওঁর এত অনীহা ছিল কেন? এর পিছনে কী স্বার্থ আছে? মিসেস গিনেসবেরির সংশ্রব ত্যাগ করে আপনি কোনও অন্যায় করেনিনি।’ বাম কিম বিচক্ষণ মানুষ। উনিই পরামর্শটা দেন। ‘মিস গডউইন, আপনি গ্রিনউইচ ভিলেজে গিয়ে একবার অ্যালানের সঙ্গে দেখা করুন। ওঁর কাছ থেকে সরাসরি জানতে চান, আপনি ঢাকায় জন্মেছিলেন কি না? সুইডেনে গেলেনই বা কী পরিস্থিতিতে?’

বাম কিমের কথা মতো লিলি মাঝে একদিন ড্যাডির কাছে গিয়েওছিলেন। ড্যাডি কী বিশ্রী ব্যবহারই না করলেন তাঁর সঙ্গে! রূঢ় গলায় জানতে চাইলেন, ‘এলসার সঙ্গে তুমি কেন এত অসভ্যতা করলে লিলি? এতটা অকৃতজ্ঞ হতে পারলে? তুমি জানো না, উনি তোমার জন্য কী করেছেন?’

লিলি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, এলসা আন্টি ফাউন্ডেশনের তহবিল তছরুপ করেছেন। শুনে ড্যাডি বিশ্বাসই করলেন না। কথায় কথায় লিলি জানতে চেয়েছিলেন, গোথেনবার্গে যাওয়ার আগে তিনি কোথায় ছিলেন? ঢাকা শহরে কি? কিন্তু প্রশ্নগুলো এড়িয়ে ড্যাডি বারবার একই কথা বলতে লাগলেন, ‘যতক্ষণ না তুমি এলসার কাছে ক্ষমা চাইছ, ততক্ষণ তোমার কোনও প্রশ্নেরই উত্তর দেব না।’ শেষে আর মাথা ঠান্ডা রাখতে পারেননি লিলি। বলেই ফেলেন, ‘তুমি যদি এই অন্যায় আবদারটা করো, তা হলে তোমার সঙ্গে আজই আমার সম্পর্ক শেষ।’ রাগ করে লিলি ড্যাডির বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন।

আজীবন চেনা মানুষগুলো একে একে দূরে সরে গেলেন। এলসা আন্টির সঙ্গে অ্যান্ডিও। ওর সন্তান পেটে ধারণ করেছেন, অথচ সেটা জানানোর সুযোগও লিলি পেলেন না। ড্যাডির সঙ্গে মনোমালিন্যের পর সাশা, এড, ডানিয়েলরা এখন আর কেউ যোগাযোগও করে না। যে সাশা দিনে অন্তত একবার ফোনে কথা বলত, সে ফোন করা তো দূরের কথা। এখন ফোন করলেও ধরে না। বিষণ্ণতার পর্বটা ধীরে ধীরে কেটে যাওয়ার পর এখন একটা জিদও চেপে বসেছে লিলির মনে। অতীতকে খুঁড়ে বের করতেই হবে। কিন্তু কে তাঁকে সাহায্য করতে পারেন? অনেক চিন্তা-ভাবনার পর লিলির মনে পড়েছে, আছেন এমন একজন। তিনি গভর্নেস হেমলতা আন্টি। গোথেনবার্গ থেকে যিনি আমেরিকায় এসেছিলেন, তাঁর দেখাশুনো করার জন্য। কিন্তু এখন তিনি কোথায়, কে জানে?

আর একজনও সাহায্য করতে পারে। সে কালকেতু ন্যান্ডি। ক্রিসমাস ইভ পার্টির ডিনার টেবলে কালকেতু একবার বলেছিল, বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ারের সময় হারিয়ে যাওয়া, শিউলি বলে একটা মেয়েকে খুঁজতে ও আমেরিকায় এসেছে। সেই মেয়েটার পিঠও না কি আগুনে ঝলসে গিয়েছিল। শিউলির সঙ্গে নিজের কোথায় যেন মিল খুঁজে পাচ্ছেন লিলি। কালকেতু কি মেয়েটাকে খুঁজে পেয়েছে? লিলি ভেবে রেখেছেন, ছেলেটা দেখা করতে এলে, তিনি সরাসরি জিজ্ঞাসা করবেন।

টিভিতে মোজাম্বিকের খবর দেখাচ্ছে। প্রবল বৃষ্টির ফলে বহু অঞ্চলে বন্যার পরিস্থিতি। জলমগ্ন গ্রামে ত্রাণ সামগ্রী ফেলা হচ্ছে কপ্টার থেকে। পর্তুগাল সরকার দ্রুত ত্রাণ সামগ্রী পাঠিয়েছে বেইরাতে। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর আগে মোজাম্বিক পর্তুগিজ উপনিবেশ ছিল। সেই কারণেই হয়তো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। টিভির দিক থেকে চোখ সরিয়ে লিলি লক্ষ করলেন, কাচের দরজা অল্প ফাঁক করে মার্থা মুখ বাড়িয়েছে। হাসিমুখে ও বলল, ‘ম্যাডাম, মি. ন্যান্ডি এসে গেছেন।’

টিভি বন্ধ করে লিলি বললেন, ‘নিয়ে এসো।’

মিনিটখানেক পরেই কালকেতু ঘরে ঢুকে বলল, ‘গুড আফটারনুন ম্যাডাম।’

ছেলেটাকে দেখেই মনটা ভাল হয়ে গেল লিলির। স্নেহের সুরে তিনি বললেন, ‘গুড আফটারনুন। হাতে সময় নিয়ে এসেছ তো?’

কালকেতু কৈফিয়ত দেওয়ার সুরে বলল, ‘সরি ম্যাম, কয়েকদিন আগেই আমার আসা উচিত ছিল। কিন্তু…’

‘জানি। রোজিনা কেমন আছে এখন?’

‘ভাল নয়। যে কোনও মুহূর্তে খারাপ খবর আসতে পারে হাসপাতাল থেকে। সে যাক, আমাকে কেন ডেকে পাঠিয়েছিলেন, ম্যাডাম? বলুন, আমার হাতে যথেষ্ট সময় আছে।’

ফের সেই শব্দটাই মাথায় এল। লিলি রহস্য করে বললেন, ‘আত্মানুসন্ধানের জন্য। তোমাদের হিন্দুধর্মে তো শুনেছি, এ নিয়ে বহু চর্চা হয়েছে। ঋষি-মুনিরা অনেক শাস্ত্র লিখে রেখে গেছেন।’

‘ম্যাডাম, আপনি কি আমার সঙ্গে মজা করছেন?’

‘বিন্দুমাত্র না। আমার কথাটার মধ্যে আধ্যাত্মিক মানে খুঁজতে যেও না। একটু সহজ করে নাও। প্রায় অর্ধ শতাধী পেরিয়ে এসে হঠাৎ আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে, আমার রুট কোথায়? উত্তরটা আরও বেশি করে খুঁজছি এই কারণে যে, যাঁদের উপর বিশ্বাস করে এতটা রাস্তা পেরিয়েছি, তাঁরা আমাকে ঠকিয়েছেন।’

কালকেতু ছেলেটার প্রখর বুদ্ধি। বলল, ‘আপনি কি মিসেস গিনেসবেরির কথা বলছেন?’

‘তুমি কী করে বুঝলে?’

‘হাসপাতালে আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে যেদিন আমি ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলেছিলাম, সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম, উনি আপনার সঙ্গে তঞ্চকতা করছেন। পরে রায়ান দেল বস্কে আমার কাছে ওঁর অনেক বদনাম করেছেন।’

‘রায়ানকে তুমি চিনলে কী করে?’

উত্তরে কালকেতু যা বলতে শুরু করল, তা শুনে লিলি অবাক হয়ে গেলেন। রোজিনা মেয়েটার মা হেমলতা আন্টি! আর বাবা রায়ান এখন না কি আলবুকার্কে একটা বিশাল র‌্যাঞ্চের মালিক। ওঁরা দু’জনই এখন এই নিউ ইয়র্ক শহরে! এর থেকে ভাল খবর আর কী হতে পারে? কানের মধ্যে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেলেন লিলি। কালকেতু ছেলেটা বোধহয় ঈশ্বরের দূত হয়ে হাজির হয়েছে। রায়ানকে তিনি চিনতেন গর্ভনেস হেমলতা আন্টির বয়ফ্রেন্ড হিসেবে। মনে পড়ছে, এলসা আন্টির বাড়িতে গিয়ে রায়ান একবার ঝামেলাও করেছিলেন। তার কয়েকদিন পর হেমলতা আন্টি কোথায় যেন চলে যান। ড্যাডি তখন বলেছিলেন, হেমলতা চুরি করে পালিয়েছেন। ঈশ্বরের ইচ্ছা ছাড়া এ আর কী হতে পারে! সত্যিটা এতদিনে প্রকাশ পেয়ে গেল। প্রায় চল্লিশ বছর পর হঠাৎই লিলি সন্ধান পেলেন হেমলতা আন্টির। উনি তা হলে চুরি করে পালাননি। রায়ানকে বিয়ে করার জন্যই চাকরি ছেড়েছিলেন।

এলসা আন্টি সম্পর্কে রায়ান কী বলেছেন, কালকেতু বলে যাচ্ছে। লিলি মিলিয়ে নিচ্ছেন, নিজের অতীতের ঘটনাবলির সঙ্গে। একজন লোভী, স্বার্থপর মানুষকে তিনি এতদিন চিনতে পারেননি, ভেবে লিলি মরমে মরে যাচ্ছেন। কথার ফাঁকে তিনি জানতে চাইলেন, ‘শিউলির খোঁজ পাওয়ার ব্যাপারে তুমি কতদূর এগিয়েছ কালকেতু?’

‘আগে আমি আপনাকে একটা ছবি দেখাতে চাই ম্যাডাম। তার পর বলব, কতটা এগিয়েছি।’

কথাগুলো বলে ব্রিফকেস থেকে একটা ছবি বের করে টেবলের উপর রাখল কালকেতু। দেখে চমকে উঠলেন লিলি। হুবহু তাঁর মুখ। বললেন, ‘আমার এই ছবি তুমি পেলে কোথায়?’

‘ম্যাডাম, এই ছবিটা কম্পিউটার গ্রাফিক্সে করা। শিউলিদিদি যখন হারিয়ে যান, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এখন পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। চেহারারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাঁকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কিন্তু রায়ানই আমাকে পরামর্শ দেন, কম্পিউটার গ্রাফিক্সের সাহায্য নিতে। ভাগ্যক্রমে জন রিড বলে একজন দক্ষ আর্টিস্টকে পাওয়াও গেল। উনিই প্রচুর পরিশ্রম করে এই ছবিটা তৈরি করেছেন। আপনার উত্তরটা কি পেয়ে গেছেন? না কি খুলে আমাকে বলতে হবে।’

উত্তেজনায় উঠে দাঁড়ালেন লিলি। বললেন, ‘তুমি কী বলতে চাইছ কালকেতু? আমিই সেই শিউলি?’

‘অত উত্তেজিত হবেন না ম্যাডাম। এটা আমার অনুমান মাত্র। খোঁজ শুরু করার পর আমার হাতে খুব বেশি তথ্য ছিল না। পুরনো খবরের কাগজের কাটিংস ছাড়া আর কিছুই না। সেইসময় শিউলিকে নিয়ে যা লেখা হয়েছিল, তার উপর ভিত্তি করেই আমি তদন্ত শুরু করি। সূত্র বলতে ঢাকার মেডিক্যাল হাসপাতাল, নার্স এলসা গিনেসবেরি, এবং রিচার্ড গাটম্যানের রিপোর্ট, আর তোলা একটা ছবি। এই দেখুন সেই ছবি, যা গাটম্যানকে পুলিৎজার পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছিল।’ কথাটা বলেই কালকেতু ব্রিফকেস থেকে একটা ছবি বের করে আনল।

ছবিটা হাতে নিয়ে লিলি শিউরে উঠে বললেন, ‘মাই গুডনেস, কখন তোলা হয়েছিল এই ছবি?’

‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। নগ্ন অবস্থায় যে মেয়েটিকে দৌড়তে দেখছেন, সে-ই শিউলি ওরফে বেবি। গাটম্যান একেই ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে ভর্তি করে এসেছিলেন। রেড ক্রশের এলসা গিনেসবেরির আন্ডারে। তখন অন্ধের মতো হাতড়াচ্ছিলাম। আপনার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আমার কৌতূহল বেড়ে যায়। গুগল সার্চ করে জানতে পারি, আপনার শৈশব গোথেনবার্গে কাটলেও আপনি সুইডিশ নন। কিন্তু জন্মসূত্রে কোন দেশের, সে সম্পর্কে কোথাও কিছু লেখা নেই। মিসেস গিনেসবেরি ইচ্ছে করেই কোথাও উল্লেখ করেননি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, আপনার কর্মজীবন এবং ফাউন্ডেশন নিয়ে যত লেখা ইন্টারনেটে পেয়েছি, তার কণামাত্র নেই আপনার বাল্যকাল নিয়ে। ভাগ্যক্রমে আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় রিচার্ড গাটম্যানের। ওঁর সঙ্গে কথা বলেই আমার ধারণা হয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে বেবি নামে যে মেয়েটি ভর্তি ছিল, সে আপনি হলেও হতে পারেন।’

‘রিচার্ড গাটম্যানের সঙ্গে তোমার কোথায় দেখা হয়েছিল?’

 ‘রায়ানের র‌্যাঞ্চে। উনিও দেখলাম, এলসা গিনেসবেরির মিথ্যাচারণে বিরক্ত। ম্যাডাম, গুগল-এ আপনার প্রোফাইলে কেউ একজন লিখেছেন, আপনার পিঠ পুড়ে গেছিল, গোথেনবার্গে হ্যালোইন পার্টিতে ফায়ার ডান্সের সময়। আসলে কিন্তু তা নয়। গাটম্যানের ছবি কিন্তু অন্য প্রমাণ দিচ্ছে। আপনার পিঠ ঝলসে গেছিল, বম্ব ব্লাস্টে। ছবিটা ভাল করে দেখুন, তা হলেই বুঝতে পারবেন।’

নিজের ছয় বছর বয়সের ছবিটার দিকে লিলি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। আতঙ্কিত মুখে তিনি ছুটে যাচ্ছেন নদীর পার দিয়ে। পিছনে ধোঁয়ার বিরাট কুণ্ডলী তাড়া করে আসছে। নিশ্চয় কাছাকাছি কোথাও বোমা পড়েছিল। সেই বিস্ফোরণের স্মৃতি হয়তো এখনও অবচেতন মনে রয়ে গেছে। তাই বিকট আওয়াজ শুনলেই ইদানীং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। ছবিটা দেখতে দেখতে লিলির চোখের কোণ ভিজে উঠল। এই সেই জায়গা, তাঁর সত্যিকারের জন্মভূমি। এই সেই মাটির ধুলো, যা তিনি ছোটবেলায় গায়ে মেখেছেন। বুকের ভিতর থেকে এক দলা আবেগে গলায় উঠে আসছে। স্বর রুদ্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই লিলি প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু ছবির এই মেয়েটাই যে আমি, তা কী করে প্রমাণ হবে?’

‘ম্যাডাম, আমার এক বন্ধু চঞ্চল ঢাকায় খুব নামকরা রিপোর্টার। আমেরিকায় আসার আগে ওকে বেবি মেয়েটি সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেছিলাম। প্রায় মাসদুয়েক খেটে ও মাত্র গতকালই আমাকে জানিয়েছে, বেবি মেয়েটাকে গোথেনবার্গে নিয়ে যাওয়ার সময় মিসেস গিনেসবেরি পাশপোর্টে ওর নাম দিয়েছিলেন লিলি। সবে বাংলাদেশ সরকার হয়েছে। তার উপর চিকিৎসা করানোর জন্য বেবিকে দ্রুত সুইডেনে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। কেউ মেয়েটার নামবদল নিয়ে মাথা ঘামাননি। চঞ্চলের পাঠানো এই তথ্যটা হাতে আসার পর আমার অনুমানটা বিশ্বাসে গিয়ে দাঁড়ায়। সেটা আরও দৃঢ় হয়েছে, কম্পিউটার গ্রাফিক্সে বানানো এই ছবিতে। টু কাট ইট শর্ট, আপনিই পলাশভাইয়ের সেই হারিয়ে যাওয়া দিদি। আমার বিশ্বাসে অবশ্য কিছু এসে-যায় না। যতক্ষণ না আইন স্বীকৃতি দিচ্ছে।’

‘এই ছবিটা কোথায় তোলা কালকেতু?’

‘ঢাকার কাছাকাছি, আমোদপুরে। পলাশভাইয়ের দেশের বাড়ি। এ বার ঢাকায় গেলে আপনি নিশ্চয়ই জায়গাটা ঘুরে আসবেন। ম্যাডাম, আপনার সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক যাদের, তারা কিন্তু আপনার প্রতীক্ষায় রয়েছেন। তার আগে, আপনাকে একটা অনুরোধ করব। আপনিই সেই শিউলি কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডিএনএ পরীক্ষা করান। পলাশভাইয়ের সঙ্গে যদি আপনার ডিএনএ ম্যাচ করে যায়, তা হলে বুঝব, আমার পরিশ্রম সফল হয়েছে।’

ঘরের বাইরে থেকে একসঙ্গে প্রচুর কথাবার্তার আওয়াজ আসছে। লিলি ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। তিনি অফিসে থাকলে পিন পড়ার আওয়াজও পাওয়া যায় না। হঠাৎ কী হল? কথাটা মনে হতেই কাচের দরজায় বাম কিমের উল্লসিত মুখ। তাঁর পিছনে অফিসের বাকি সব কর্মী। বাম কিম বললেন, ‘ম্যাডাম শিগগির টিভি খুলুন। স্টকহোলম থেকে এখুনি অ্যানাউন্সমেন্ট হল। শিশু কল্যাণের জন্য আপনাকে এ বার নোবেল পিস প্রাইজ দেওয়া হচ্ছে।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *