জিহাদি – ৩৪

(চৌত্রিশ)

ডাইনিং হলে রিচার্ড গাটম্যানের সঙ্গে নিজে যেচে গিয়ে আলাপ করল কালকেতু। গেস্টদের হাতে তখন বিয়ার আর ওয়াইনের গ্লাস। এক কোণে টেবলে বিয়ারের মগ নিয়ে বসে রয়েছেন রিচার্ড। হাতের সেল ফোনের দিকে চোখ। কাছে গিয়ে কালকেতু বলল, ‘স্যার, আমি একজন ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট। নাম কালকেতু নন্দী। আমি রোজিনা ম্যাডামের গেস্ট। আপনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলতে পারি?’

জার্নালিস্ট শুনে রিচার্ড স্মিত হেসে বললেন, ‘সিওর। কোন নিউজপেপার… ইত্তেফাক?’

উল্টোদিকের চেয়ারে বসে কালকেতু বলল, ‘না স্যার। ইত্তেফাক ঢাকা থেকে পাবলিশ হয়। আমি কলকাতার জনবার্তা কাগজের।’

‘ইয়েস, ইয়েস।’ রিচার্ড বললেন, ‘আমার যে বয়স হচ্ছে, এখন বুঝতে পারছি। পঞ্চাশটারও বেশি দেশে কভার করতে গেছি। এখন অনেক কিছু মনে রাখতে পারি না।’

সুযোগটা ছাড়ল না কালকেতু। বলল, ‘আপনি তো একবার বাংলাদেশেও গেছেন।’

‘অফ কোর্স গেছি। তখনও বাংলাদেশ হয়নি। ওয়েট ওয়েট, জনবার্তার একজন ফোটোগ্রাফারের কথা মনে পড়ছে। তাঁর নাম রামা… রামাপ্রসাড চাকলাডার। এক্সিলেন্ট ফোটোগ্রাফার। ঢাকায় আমরা একইসঙ্গে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কভার করেছিলাম।’

‘উনি রমাপ্রসাদ চাকলাদার। ওর কাছে আপনার নাম শুনেছি। আপনি যে লিবারেশন ওয়ারের ছবির জন্য পুলিৎজার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন, আমি জানি। ছবিটা ইন্টারনেটেও দেখেছি।’

‘রামাপ্রসাদও সেবার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ওয়ার্ল্ড’স বেস্ট ওয়ার পিকচারের জন্য। ওরই পুলিৎজার পাওয়া উচিত ছিল। অ্যাওয়ার্ডটা আমি নিয়েছিলাম বটে, কিন্তু অনিচ্ছাসত্ত্বে। আমার ওই ছবিটা নিয়ে আমেরিকায় অনেক কন্ট্রোভার্সি হয়েছিল। আমেরিকান গর্ভমেন্ট বলেছিল, ছবিটা সাজিয়ে তোলা… কনককটেড। কেউ প্রশ্ন তুলেছিল, নগ্ন মেয়েটার ছবি ছাপানো উচিত হয়নি। যতই তার বয়স ছয়-সাত বছর হোক না কেন? ইন ফ্যাক্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমসে আমার কলিগরাও ছবিটা ছাপার আগে তিনবার ভেবেছিলেন। কিন্তু এডিটর ফার্ম ডিসিশন নেন, ছবিটা ছাপানো হবে।’

‘আপনি যে মেয়েটাকে নিজে অর্ধদগ্ধ অবস্থা হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন, সে কথা বলেননি?’

‘মাই গুডনেস, আপনি তো সবই জানেন দেখছি। হ্যাঁ, বলেছিলাম। ঢাকায় আমার সঙ্গে গেছিল আজকের পার্টি হোস্ট রায়ান। রোজিনার ফাদার। ও নিউ ইয়র্কে ফোন করে এডিটরকে কনভিন্স করেছিল, ছবিটা সাজানো নয়। রায়ান যদি সেদিন আমার পাশে না দাঁড়াত, তা হলে হয়তো বদনাম নিয়েই আমাকে পেশা ছাড়তে হত। এই কারণেই ওর সঙ্গে এখনও আমার বন্ধুত্বটা টিকে আছে। আপনি তো জানেন, আমাদের পেশায় বন্ধু পাওয়া কতটা কঠিন।’

‘হ্যাঁ জানি।’ বলে কালকেতু প্রসঙ্গ ঘোরাল, ‘আচ্ছা, এ কথাটা কি ঠিক, ওই ছবি তোলার পর আপনি না কি জীবনে আর কখনও যুদ্ধের ছবি তোলেননি?’

‘ঠিকই শুনেছেন। যুদ্ধে আমার ঘেন্না এসে গেছিল। আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ওটাই আমার জীবনের সেরা ছবি কি না, আমার উত্তর হবে, না।’

কোথায় যেন কালকেতু পড়েছিল, প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির মার্ডারের ছবি তোলা নিয়ে রিচার্ডের লেখা একটা বই একটা সময় টানা একবছর বেস্টসেলার হয়েছিল। প্রসঙ্গটা তুললে উনি খুশি হবেন। প্রশ্নটা করার আগে কালকেতু দেখল, পলাশভাই টেবলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। রিচার্ডকে লক্ষ করে উনি বললেন, ‘আমি কি আপনাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারি?’

রিচার্ডের সঙ্গে বোধহয় আগেই পলাশভাইয়ের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন রোজিনা ম্যাডাম। চিনতে পেরে উনি বললেন, ‘হোয়াই নট? মাই প্লেজার।’

বিয়ারের মগে চুমুক দিয়ে রিচার্ড বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি কী যেন বলতে চাইছিলেন মি. ন্যান্ডি।’

‘আপনি তো প্রেসিডেন্ট কেনেডির মার্ডার নিয়ে একটা বইও লিখেছিলেন।’

‘হ্যাঁ। বইটা দুই মিলিয়ন কপি বিক্রিও হয়েছিল।’

বিশ লাখ!! শুনে কালকেতু অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, ‘এত হিউজ কপি বিক্রি হওয়ার কারণ?’

রিচার্ড বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট যেদিন অ্যাসাসিনেটেড হল, আমি সেদিন ডালাসে হাজির ছিলাম। লাকিলি, এমন কয়েকটা ছবি পেয়েছিলাম, যা কোনও ফোটোগ্রাফার পাননি।’

 পলাশভাই ইংরেজিতে বললেন, ‘সে তো পঞ্চান্ন বছর আগেকার কথা। আমার জন্মেরও পনেরো-ষোলো বছর আগে। পরে ম্যাগাজিনে কেনেডি মার্ডারের কথা পড়েছি। আপনার লেখা বইটা কি পড়া যাবে?’

রিচার্ড বললেন, ‘বইটা এই র‌্যাঞ্চের লাইব্রেরিতে আছে। আমি রায়ানকে এক কপি পাঠিয়ে ছিলাম। কাল লাইব্রেরিতে গিয়ে শুনলাম, ট্যুরিস্টদের মধ্যে বইটা এখনও খুব পপুলার।’

কালকেতু প্রশ্ন করতে গেল, বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার নিয়ে কোনও বই লেখেননি? কিন্তু তার আগেই পলাশভাই জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘অসওয়ার্ল্ড কি সত্যিই প্রেসিডেন্ট কেনেডিকে খুন করেছিলেন? এ নিয়ে নাকি অনেক কন্ট্রোভার্সি হয়েছিল?’

রিচার্ড খুশি হয়ে বললেন, ‘গুড কোয়েশ্চেন। আপনি ঠিকই বলেছেন, বিতর্কটা উঠেছিল আমার বই পাবলিশ হওয়ার পর। প্রেসিডেন্টের মৃত্যু আর আমার বই পাবলিশ হওয়ার মাঝে তখন তিনটে বছর কেটে গেছে। ’

পলাশভাই বললেন, ‘যদি আপত্তি না থাকে, তা হলে ডিটেলে বলবেন?’

‘কেন নয়? তখন আমার বয়স পঁচিশ বছর। সবে ডালাস নিউজে চাকরি পেয়েছি। সারাদিন ভাল ছবি তোলার আশায় টো টো করে ঘুরে বেড়াতাম। দিনটার কথা এখনও আমার মনে আছে। বাইশে নভেম্বর ১৯৬৩। ডালাসে সেদিন প্রেসিডেন্ট কেনেডির আসার কথা। ডেমোক্রাট দলের কর্তাদের মধ্যে ঝগড়া মিটিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রেসিডেন্টের লাঞ্চের ব্যবস্থা হয়েছিল ডিলে প্লাজার ট্রেড মার্ট বলে একটা বাড়িতে। তার কাছাকাছি একটা রাস্তা… এলম স্ট্রিটে গিয়ে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। ওখান দিয়ে হুডখোলা লিমুজিনে করে প্রেসিডেন্ট লাঞ্চে যাবেন, ডালাসের মানুষের অভিবাদন নিতে নিতে। বেলা বারোটা বাজে। ঝকঝকে রোদ্দুর। ডিলে প্লাজায় উৎসবের মেজাজ। প্রেসিডেন্ট কেনেডি আর তাঁর স্ত্রী জ্যাকুলিন জনতার উদ্দেশে হাত নাড়ছেন। হঠাৎ গান ফায়ারের শব্দ। দেখলাম, প্রেসিডেন্ট কেনেডি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। কয়েক সেকেন্ড বাদে পর পর আরও দুটো শব্দ। আমি ছবি তুলেই যাচ্ছি। দেখি, ফার্স্ট লেডি জ্যাকুলিন গাড়ির পিছন দিককার বনেটে উঠে হামাগুড়ি দিয়ে কিছু জড়ো করার চেষ্টা করছেন। আশপাশ থেকে সিক্রেট সার্ভিসের লোকেরা দৌড়ে আসছে গাড়ির দিকে।’

রিচার্ড নিখুঁত বর্ণনা দিচ্ছেন সেদিনকার ঘটনার। টেবলের আশপাশে আরও অনেকে জুটে গেছেন। চেয়ার টেনে রায়ানও বসে পড়েছেন রিচার্ডের পাশে। বিয়ারে চুমুক দিয়ে রিচার্ড ফের বলতে শুরু করলেন, ‘তখনও আমি বুঝতে পারিনি কোন ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি তুলেছি। কালো লিমুজিন রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে। তখনই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, প্রেসিডেন্টকে অ্যাসাসিনেট করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন টেক্সাসের গর্ভনর কনোলিও। হঠাৎ আমার চোখে পড়ল, ভিড়ের বাইরে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা স্যুট পরা একজন দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছেন প্লাজার দিকে। ছবি প্রিন্ট করার পর দেখি, ছাতার আড়ালে লোকটা পিস্তল তাক করে আছে প্রেসিডেন্টের কনভয়ের দিকে। আমার বইয়ে এই ছবিটাই বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। কে এই লোকটা? তাকে পুলিশ ধরতে পারল না কেন?’

পলাশভাই বলে উঠলেন, ‘আপনি বলতে চান, অসওয়াল্ডের গুলিতে কেনেডি মারা যাননি?’

রিচার্ড বললেন, ‘ডিলে প্লাজার একটা বাড়ির ছ’তলার জানালা দিয়ে অসওয়াল্ড গুলি চালান। সেই বুলেটে প্রেসিডেন্ট মারা যাননি। উল্টো দিক থেকে আসা অন্য একটা বুলেট প্রেসিডেন্টের মাথায় লাগে। ভয়ানক ব্যাপার হল, মাথার ঘিলু গাড়ির পিছনের বনেটে ছিটকে পড়েছিল। আর সেটাই ফার্স্ট লেডি জড়ো করার চেষ্টা করছিলেন। আমার বইয়ে ছবিগুলো পর পর সাজানো আছে। দেখলেই আপনারা বুঝতে পারবেন। অনেকগুলো প্রশ্ন উঠেছিল। ষড়যন্ত্র তো বটেই। পুলিশ কাস্টোডিতে অসওয়াল্ড মারা গেলেন কেন? ছাতা মাথায় লোকটা কে? প্রেসিডেন্ট যে রুট দিয়ে ট্রেড মার্টে লাঞ্চে যাবেন, সেটা মিডিয়ায় জানানো হল কেন? কমিশনের পর কমিশন বসেছে। এখনও কিন্তু প্রেসিডেন্টের মৃত্যু রহস্যের জট খোলেনি।’

ভিড়ের মাঝখান থেকে কে যেন প্রশ্ন করলেন, ‘মি. গাটম্যান, কারা ষড়যন্ত্রে সামিল ছিলেন, সে ব্যাপারে কি আপনার বইতে কোনও হিন্ট দেওয়া আছে?’

রিচার্ড বললেন, ‘পড়লেই বুঝতে পারবেন। ওয়ারেন কমিশন আমাকে ওয়াশিংটন ডিসি-তে ডেকে পাঠিয়েছিল। যা ওরা জানতে চেয়েছিল, বলে দিয়েছিলাম। মার্ডার মিস্ট্রির রিপোর্ট করেছিল যারা, তাদের মধ্যে একজন আমার সামনেই বসে আছে। রায়ান ভাল বলতে পারবে, কন্সপিরেসি থিওরি সম্পর্কে।’

রায়ান ব্যারিটন গলায় বলে উঠলেন, ‘আমাকে আর এর মধ্যে টেনো না রিচার্ড। আমি এখন বিজনেস করে খাই। কে কোত্থেকে পিছনে লেগে যাবে, কে জানে?’ শুনে সবাই হেসে উঠলেন। রায়ান ফের বললেন, ‘আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, রিচার্ড এখনও প্রতি বছর বাইশে নভেম্বর বেলা বারোটার সময় ডালাসের ডিলে প্লাজায় যায়। প্রেসিডেন্টের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। গত পঞ্চান্ন বছরে তার ব্যতিক্রম হয়নি। এ বারও গিয়েছিল। স্পটে গিয়ে ও নিজের সই করা বই বিক্রি করে। লোকের প্রশ্নের উত্তর দেয়।’

‘ওয়াও’। একসঙ্গে বিস্ময়সূচক আওয়াজ ছিটকে বেরোল অনেকের মুখ থেকে। হাত তুলে তাঁদের চুপ করিয়ে দিয়ে রিচার্ড মজা করে বললেন, ‘শুধু শ্রদ্ধা নয়, আমি কৃতজ্ঞতাও জানাতে যাই। প্রেসিডেন্টের মৃত্যুর পর আমার লাভ হয়েছিল। নিউ ইয়র্ক টাইমসে আমি চাকরি পাই। টানা তিনটে দশক ওখানেই সসম্মানে চাকরি করেছি।’

পলাশভাইয়ের কৌতূহলের শেষ নেই। আরও কী প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন। রোজিনা ম্যাডাম এসে জমাটি আড্ডাটা ভেঙে দিলেন। ‘লাঞ্চ রেডি। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। রিচার্ড আঙ্কল এখন দিনতিনেক থাকবেন র‌্যাঞ্চে। অনেক সময় পাবেন, ওর কাছে গল্প শোনার। এখন চলুন ব্যুফে টেবলের দিকে।’

ব্যুফে টেবলে সাজানো মেক্সিকান খাবার। এনচিলাদা চিকেন, শ্রিম্প এনচিলাদাস, বুরিতো এগরোল, চিলি চিজ ক্রাঞ্চর‌্যাপ, চিকেন ফাজিতাস, চিজি বিফ কেসাডিয়াস, পর্ক টাকোস, করন স্যালাড, কেটো টাকিটোস। খাবারের নামগুলো কালকেতুর জানা রোজিনা ম্যাডামের সৌজন্যে। চিকেন আর শ্রিম্পের দুটো পদ প্লেটে তুলে নিয়ে এসে কালকেতু বসল একটা চেয়ারে। কাছেই একটা টেবলের চারপাশে বসেছেন রিচার্ড, রায়ান, হেমলতা, রোজিনা আর পলাশভাই। খেতে খেতে ওঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে হাত কামড়াতে লাগল কালকেতু। ইস, কথায় কথায় তখন রিচার্ড নিজেই মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আর একটু হলেই শিউলিদিদি সম্পর্কে কথা উঠতই। কিন্তু মাঝখান থেকে সব ভণ্ডুল করে দিলেন পলাশভাই।

রিচার্ডের টেবলের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় হঠাৎ কালকেতুর মনে হল, আমোদপুরে যে বাচ্চা মেয়েটিকে উনি উদ্ধার করেছিলেন, তার সম্পর্কে রায়ানও নিশ্চয় জানেন। কেননা তিনিও একাত্তরে বাংলাদেশের যুদ্ধ কভার করতে গেছিলেন। পরক্ষণেই ওর খটকা লাগল, যে ভদ্রলোক একটা সময় সাংবাদিকতা করতেন, তিনি এই বিশাল র‌্যাঞ্চের মালিক হলেন কী করে? এই বিপুল সম্পত্তি কি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া? কালকেতুর তীব্র কৌতূহল হল, এটা জানার জন্য যে, হেমলতার সঙ্গে রায়ানের পরিচয়ও কি ঢাকায় ওই সময় হয়েছিল? ভদ্রমহিলার বয়স এখন ষাটের কাছাকাছি। দেখে অবশ্য তা বোঝা যায় না। তা হলে রায়ানের সঙ্গে হেমলতার বয়সের ব্যবধান কমপক্ষে পনেরো-ষোলো বছরের। নিউ মেক্সিকোর এই র‌্যাঞ্চে একজন বাংলাদেশি মহিলা নিজেকে কীভাবে ক্যারি করছেন, অবাক হয়ে তা কালকেতু দেখতে লাগল।

পলাশভাই খাবার আনতে উঠে গেছিলেন। ফিরে আসার সময় ওকে দেখতে পেয়ে উল্টোদিকের চেয়ারে বসে উনি বললেন, ‘মেক্সিকান ডিশ-এর তুলনা নাই কাইলকেতুভাই। বুরিতো এগরোলগুলান কী মুইচমুইচ্যা হইসে, টেস্ট কইর‌্যা দ্যাখেন। আমি কী লাকি ভাবেন তো। ইন ফিউচার, মেক্সিকান ফুড তো খাইতে পামই, সেইসাথে বাংলাদেশি রান্না। আমার উড বি মাদার ইন ল এট্টু আগে কী কইল, হোনবেন? কইল, কাইল লাঞ্চে আমার জন্য শুটকি মাছের প্রিপারেশন রাইধ্যা খাওয়াইব। প্লাস সরস্যা-ইলিশ।’

কালকেতু মজা করার জন্য বলল, ‘দেখবেন, আমিও যেন শেয়ার পাই। কিন্তু আপনি ওই টেবল ছেড়ে উঠে এলেন কেন?’

‘রোজিনা ম্যাডামগো টেবলে কী হইতাসিল হোনবেন? আমারে নিয়া তামাশা। চিটাগংয়ে আমি র‌্যাঞ্চ করুম শুইন্যা অরা হাসাহাসি করতাসিলেন। আফনেরে কইয়া রাখতাসি, র‌্যাঞ্চ আমি করুমই।’

‘ওদের কথাবার্তা আপনি বুঝতে পারছিলেন কী করে? আপনি স্প্যানিশ জানেন?’

‘অ্যাক বিন্দুও না। ল্যাঙ্গুয়েজ জানেন বা না জানেন, কেউ যদি আফনারে নিয়ে ফকরামি করে, আফনে ঠিকই বুইঝতে পাইরবেন। ঢাকায় ফিইর‌্যা গিয়াই আমারে স্প্যানিশ শিখতে অইব। হালায় ঢাকায় আবার স্প্যানিশ শেখার ইনস্টিটিউট আসে কি না, দ্যাখতে অইব।’

‘আপনার উড বি মাদার ইন ল-কে দেখে আমি একটু অবাকই হয়েছি পলাশভাই। রায়ান আর উনি… পৃথিবীর দু’প্রান্তের দু’জন মানুষ… কাপল হলেন কী করে?’

শুনে পলাশভাই হেসে বললেন, ‘উপরওয়ালা কার সাথে কার জুটি বাইধ্যা দেন, কহন যায় না কি? রোজিনা ম্যাডামের মুখে আমি যদ্দূর হুনসি, আমার উড বি মাদার ইন ল হ্যামলতা বাই প্রোফেশন নার্স সিলেন। রায়ানের সাথে হ্যার যহন আলাপ হয়, তহন হ্যামলতা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র নার্স। আর রায়ান নিউ ইয়র্ক টাইমসের ঢাকা করেসপন্ডেন্ট। হ্যার ফার্স্ট ওয়াইফ অসুস্থ হইয়া পড়ায় রায়ান প্রায়ই হাসপাতালে যাইতেন। সেহানেই হ্যামলতার সাথে রায়ানের আলাপ, প্রেম। আমাগো ঢাকা শহরটা ভালা লাগতাসিল না রায়ানের ফার্স্ট ওয়াইফের। হ্যায় ঝগড়া কইর‌্যা আমেরিকায় চইল্যা আসেন। তার পরের স্টোরিটা কইতে অইব না হি?’

রায়ান সম্পর্কে যে প্রশ্নটা এতক্ষণ ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল, সেটা কালকেতু করেই ফেলল, ‘রায়ান এত বড় একটা সম্পত্তি করলেন কী করে?’

‘এইডা হ্যার ম্যাটারনাল প্রোপারটি। হ্যামলতারে বিয়া করার পর হ্যার কপাল খুইল্যা গ্যাসে। ম্যাটারনাল গ্র্যান্ড ফাদারের কুনও পোলাপান ছিল না। সব প্রোপারটি হ্যায় রায়ানরে দিয়া গ্যাসেন। আগে এই র‌্যাঞ্চের নাম ছিল টার্ফগ্রাস র‌্যাঞ্চ। মাইয়্যা হওনের পর রায়ান নাম বদলাইয়া করসেন রোজি র‌্যাঞ্চ।’

কাঁটা-চামচ ব্যবহার না করে পলাশভাই হাত দিয়ে খাবার খাচ্ছেন। খেতে খেতেই বললেন, ‘ইভনিংয়ে হর্স রাইডিংয়ে যাম। আফনে যাইবেন?’

কালকেতু বলল, ‘না। ঘোড়ায় চড়ার সৌভাগ্য কোনওদিন হয়নি। বুড়ো বয়সে হাত-পা ভাঙার ইচ্ছে আমার নেই। আপনার অভ্যেস আছে না কি?’

হেসে পলাশভাই বললেন, ‘আমারও নাই। রোজিনা ম্যাডাম কইল, কাউবয়রা সাথে থাইকব। চিন্তা করনের প্রয়োজন নাই। এহানে দশ-বারো মাইল দূরে, পাহাড়ের কোলে ঝরণার ধারে না হি একডা স্পট আসে, পূর্ণিমার রাতে মাস্ট গো সাইট। এমন রোম্যান্টিক জায়গা না হি আলবুকার্কে আর নাই। হিসাব কইর‌্যা দ্যাখলাম, আজই পূর্ণিমা। রোজিনা ম্যাডাম আমারে সেহানে লইয়্যা যাইব। কিন্তু আফনে তাইলে কী কইরবেন? আরে মশয়, র‌্যাঞ্চ অইল ফূর্তির জায়গা। আফনে ইভনিংয়ে বেলি ড্যান্স দেইখ্যা আসেন।’

সন্ধেবেলাটা কীভাবে কাটাবে, কালকেতু মনে মনে ছকে নিল। একবার র‌্যাঞ্চের লাইব্রেরিতে ঘুরে এলে কেমন হয়? জিহাদিদের উপর বই পেলে ঘরে নিয়ে যাবে। নিউ জার্সিতে জিহাদিদের উপর লেখা একটা বই কিনল, কিন্তু পড়াই হল না। ইমন পড়বে বলে নিয়ে গেল, অথচ ফেরত দিয়ে গেল না। কী অদ্ভুত, নিউ জার্সির বাড়িতে দুই জিহাদি বসে আছে। অথচ বই পড়ে ওকে জানতে হচ্ছে জিহাদিদের সম্পর্কে। ইমন আর চিরাগ পলাশভাইয়ের কী ক্ষতি করে দেবে, কে জানে? চিরাগ ছেলেটা রাফ টাইপের। ওর চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কিলার। নিজের চোখে কালকেতু একদিন ওকে কাঠবেড়ালি মারতে দেখেছিল। যে কোনও সময় ও মানুষ খুন করতে পারে।

লাঞ্চ শেষ করে কালকেতু নিজের ঘরে ফিরে এল। তখনই ওর ফোনটা বেজে উঠল। কী আশ্চর্য, অপর প্রান্তে সুদীশ। গলার স্বর পেয়ে ও জিজ্ঞাসা করল, ‘তুই কোথায় রে? নিউ জার্সিতে নেই?’

কালকেতু বলল, ‘না। আমি পলাশভাইদের সঙ্গে নিউ মেক্সিকোতে এসেছি। কী খবর বল।’

‘আমারও তাই মনে হল, তোরা কেউ নেই। শোন, চিরাগ বলে ছেলেটাকে প্রচণ্ড মারধর করে কেউ মেট্রো স্টেশনের কাছে পার্কিং স্পেসে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। ওর পকেটে তখন একটা পিস্তল ছিল। পুলিশ প্রথমে মনে করেছিল, ছিনতাইবাজ। রাতের দিকে যে সব প্যাসেঞ্জার নামে, তাদের লুট করার জন্য স্টেশনের কাছাকাছি ঘুরঘুর করছিল। পরে ওর আসল পরিচয় জানতে পারে। চিরাগ এমন মার খেয়েছে, হয়তো মরেই যেত আর্লি মর্নিংয়ে পুলিশের চোখে পড়ে না গেলে। পুলিশ ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। এখনও ছেলেটার জ্ঞান ফেরেনি।’

‘ইমন কোথায়?’

‘মনে হয়, বাড়িতে নেই। ওর উপর আমরা লক্ষ রাখছি। মনে হয়, এটা জিহাদিদের নিজেদের মধ্যে মারামারি। এইভাবেই শালারা মরে। যাক গে, তোরা কবে ফিরছিস, বল?’

‘বলতে পারছি না রে। তবে, পয়লা জানুয়ারির আগে তো নয়ই। তুই কি এখনও নিউ জার্সিতে?’

‘না, নিউ ইয়র্কে। এখানে দু’তিনদিনের মধ্যে একটা বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আটকে গেছি। এখন ছাড়ি রে। পরে আবার কথা হবে।’

ফোন ছেড়ে কালকেতু ঠিক করতে পারল না, খবরটা এখনই পলাশভাইকে দেবে কি না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *