জিহাদি – ২৩

(তেইশ)

প্রায় একমাস আমেরিকায় কাটিয়ে ফেলল কালকেতু। শিউলিদিদিকে খোঁজার কাজ যতটা এগোনো উচিত ছিল, ততটা এগোয়নি। মনে মনে অপরাধবোধে ভুগছিল কালকেতু। কিন্তু কর্নেল মজুমদারের সঙ্গে কথা হওয়ার পর ও একটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। উনি এমন কয়েকটা তথ্য দিয়েছেন, যা কালকেতু পুরনো পেপার কাটিংগুলোতে পায়নি। খোঁজটা ও শুরু করেছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে। ঢাকায় ওর এক বন্ধু থাকে। ইত্তেফাক কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার চঞ্চল। প্রশাসনের উঁচুতলায় ওর যাওয়া-আসা আছে। কালকেতু ওকেই প্রথম একটা মেল পাঠায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেডিক্যাল কলেজে যারা ভর্তি হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছয় বছরের কোনও বাচ্চা মেয়ে ছিল কি না, তা জানার জন্য? মেয়েটাকে নিয়ে তখন খুব লেখালেখি হয়েছিল। মেল পাওয়ার পরই চঞ্চল জানতে চায়, মেয়েটির ব্যাপারে আর কিছু জানানো কি সম্ভব? কালকেতু রেখে ঢেকে তথ্য পাঠিয়েছে। এখনও চঞ্চল কিছু জানায়নি।

দ্বিতীয় যে কাজটা কালকেতু করেছে, সেটা হল, গোথেনবার্গে মিসেস এলসা গিনেসবেরির সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা। কর্নেল মজুমদার ভদ্রমহিলার অফিসের মেল অ্যাড্রেস আর কন্টাক্ট নাম্বার দুটোই পাঠিয়েছিলেন। এলসা ম্যাডামের সঙ্গে ও কথা বলতে চায়, এইরকম একটা মেল পাঠানোর প্রায় একঘণ্টার মধ্যে উত্তর এসে যায়। ভদ্রমহিলা মনে হয়, কোনও চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত। ওঁর অফিসের একজন স্টাফ জানান, মিসেস গিনেসবেরি এখন লাস ভেগাসে ছুটি কাটাতে গেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসবেন। উনিই আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবেন।

কালকেতুর তালিকায় তৃতীয় নামটা ছিল, রিচার্ড গাটম্যানের। নিউ ইয়র্ক টাইমস অফিসের দেওয়া ওর নাম্বারে বারবার ফোন করা সত্ত্বেও কেউ তোলেননি। দীর্ঘ-সময় ধরে রিং হয়ে গেছে। গুগল সার্চ করে কালকেতু জানতে পারে, ভদ্রলোক ডালাসের বাড়িতে উইক এন্ড-এ থাকেন। ডালাস শহর থেকে প্রায় কুড়ি মাইল দূরে প্লেনো বলে জায়গা আছে। সেখানে গাটম্যান একটা ফোটোগ্রাফি ইন্সটিটিউট চালান। ছাত্র-ছাত্রী আর তাদের অভিভাবকদের বাইরে অন্য লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে তিনি নাকি এখন উৎসুক নন। দু’চারজন সাংবাদিক ছাড়া কারও সঙ্গে খুব মেশেনও না।

কালকেতু কথা বলার চেষ্টা করেছিল রেড ক্রসের ডিন জোন্স বলে এক ডাক্তারের সঙ্গেও। ঢাকায় উনি বেবির ট্রিটমেন্ট করেন প্রথম দিকে। উনি অস্ট্রেলিয়ান, থাকতেন সিডনি শহরে। রেড ক্রসের হেড কোয়াটার্স জেনিভায় অনেকবার ফোন করার পর মেল মারফৎ একটা খবর পেয়েছে কালকেতু। ডা. জোন্স বেঁচে নেই। সোমালিয়ার সিভিল ওয়ারের সময় রেড ক্রস শিবিরে বোমা পড়েছিল। সাত বছর আগে সেইসময় ডাঃ জোন্স মারা যান। মেল-এর সঙ্গে একটা অবিচুয়ারিও পিডিএফ করা ছিল। সেটা পড়ে কালকেতুর মন খারাপ হয়ে গেছিল।

গুগল সার্চ করার সময় একটা ইন্টারেস্টিং স্টোরি চোখে পড়েছে কালকেতুর। এক ভিয়েতনামি মেয়ের কাহিনি। নাম কিম ফুক ফান থি। সারা বিশ্বে পরিচিত ‘দ্য ন্যাপাম গার্ল’ হিসেবে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকার ন্যাপাম বোমায় তিনি মারাত্মক আহত হন। ঢাকায় বেবির খোঁজ কেউ রাখেনি। কিন্তু কিম ফুক বরাবর মিডিয়ার নজরে ছিলেন। ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকার তাঁকে কিউবাতে পাঠান চিকিৎসার জন্য। শ্রুশ্রষা চলার মাঝেই হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াশুনো শেষ করেন। তার পর বিয়ে করেন এক সহপাঠীকে। ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতাদের আচরণ পছন্দ হচ্ছিল না কিম ফুকের। হনিমুনে যাওয়ার নাম করে, রাশিয়ায় যাওয়া পথে মস্কো এয়ারপোর্ট থেকেই দু’জনে পালান। কানাডায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এখনও তিনি কানাডাবাসী, দুই সন্তানের মা। ইউনিসেফের হয়ে কিম ফুক সারা বিশ্বে শান্তির বার্তা দিয়ে বেড়ান।

উইকিপেডিয়ায় কিম ফুকের জীবনী পড়ে কালকেতু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, বেবি বলে মেয়েটিকে খুঁজে বের করতেই হবে। দু’জনের জীবনের ঘটনাপ্রবাহ প্রায় একই রকম। কিম ফুকের চিকিৎসা হয়েছিল কিউবায়। এ দিকে, এলসা গিনেসবেরি বেবিকে নিয়ে গেছিলেন তাঁর দেশে। বেবির প্রচারের পিছনে ছিলেন এক আমেরিকান ফোটোগ্রাফার রিচার্ড গাটম্যান। অন্যদিকে, কিম ফুকের ছবি ছাপিয়ে তাঁকে বিশ্বখ্যাত করেন যিনি, তিনিও এক ফোটোগ্রাফার। ভিয়েতনামের নিক ওট। দু’টি ঘটনা কয়েকমাস তফাতের। মুক্তিযুদ্ধ উনিশশো একাত্তর সালে, ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা জড়িয়ে পড়ে বাহাত্তরে। বেবি আর কিম ফুকের জীবনীপুঞ্জে একটাই তফাৎ। কিম স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করছেন, সবাই জানেন। কিন্তু বেবি বেঁচে আছেন কি না, বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন বা সংসার পেতেছেন, তা মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া আর কেউ জানেন না।

পলাশভাইয়ের সঙ্গে দু’টো দিন দেখা হয়নি। রোজিনা ম্যাডামকে নিয়ে উনি ডালাস গেছেন। প্রাইভেট জেল তৈরির ব্যবস্থাপনা দেখতে। ফলে অফুরন্ত সময় এখন কালকেতুর হাতে। দু’দিন বাড়ির বাইরে পা দেয়নি ও। ক্রমাগত ভেবে যাচ্ছে, পলাশভাইয়ের শিউলিদিদিকে নিয়ে। ওর মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা, ফিল্ম ডিরেক্টর কাফি বীর যেন ওকে টেক্কা দিতে না পারেন। ভদ্রলোককে কালকেতু একবার ফোন করেছিল। ওর প্রোডাকশন অফিসের কেউ একজন জানালেন, কাফি এখন ঢাকায় নেই। কবে ফিরবেন, বলা সম্ভব নয়। নিজের পরিচয় দিয়ে কালকেতু তখন বলে, কাফি ফিরে এসে যেন ওর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

হাত-পায়ে জং ধরে গেছে। কালকেতু বাইরের লনে কিছুক্ষণ হেঁটে আসার কথা ভাবছিল, তখন দেখে লারেইনা হাসিমুখে ওর ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। মেক্সিকান মেয়েটা প্রায়ই রুম সার্ভিসের জন্য আসে। রোজিনা ম্যাডামের খুব প্রিয়পাত্রী। সবসময় হাসিমুখে থাকে। মাঝেমাঝে যেচে কথাও বলে। মেয়েটা একদিন বলেছিল, ওর খুব ইচ্ছে, এফবিআইতে চাকরি করবে। সেজন্য ও জোর কদমে তৈরি হচ্ছে। আজও রুম সার্ভিসের জন্য এসেছে ভেবে, কালকেতু ঘর থেকে বেরিয়ে আসছিল। কিন্তু লারেইনা বলল, ও আগে আউট হাউসের ঘরগুলো গুছিয়ে দেবে। তারপর সময় পেলে মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকবে। কথাগুলো বলে ও হেঁটে আউট হাউসের দিকে গেল।

ও চলে যাওয়ার পরই দরজায় নক করার শব্দ। তার পরই ইমন বলে ছেলেটার গলা, ‘ছ্যার, আফনে ঘরে আসেন না হি? এগবার বাইরে আইবেন?’

কালকেতু বলল, ‘তুমি ভেতরে এসো ইমন।’

ঘরে পা ইমন দিয়ে বলল, ‘ছ্যার, অ্যামাজন থেইক্যা আফনের একডা পার্সেল আইসে। মনে হয়, বই।’

সঙ্গে সঙ্গে কালকেতুর মনে পড়ল, নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার দিনই ও অ্যামাজনে একটা অন লাইন অর্ডার দিয়েছিল। জিহাদিদের নিয়ে লেখা একটা বই। ড্যারেল স্মিথের ‘মাই লাইফ উইথ জিহাদি’। বাইশ ডলার দাম। মূলত জিহাদিদের সম্পর্কে কৌতূহল মেটানোর জন্যই কিনতে চাওয়া। এই সব বই ভারতের বাজারে অনেক দিন পরে পৌঁছয়। হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিয়ে কালকেতু বলল, ‘দাঁড়াও, দামটা দিয়ে দিচ্ছি।’

ইমন বলল, ‘দাম আমি মিটাইয়া দিসি ছ্যার। পরে আমারে দিয়া দেবেন।’

প্যাকেট খুলে কালকেতু দেখল, প্রায় সাড়ে তিনশো পাতার বই। ও চট করে লেখক পরিচিতিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। ড্যারেল লিখেছেন, সিরিয়ায় দীর্ঘদিন তিনি জিহাদিদের ক্যালিফেটে কাটিয়েছেন। ধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য, কবিতা ও গানের প্রতি ভালবাসা যেমন তিনি দেখেছেন, তেমনই তাদের প্রতিশোধস্পৃহা, নিষ্ঠুরতা দেখে কখনও কখনও তিনি বাকরহিত হয়ে গিয়েছেন। ভদ্রলোক দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করেছেন। লন্ডনের এক কাগজের হয়ে সিরিয়ার সিভিলওয়ার কভার করতে গিয়ে কী ধরনের ঝুঁকি নিয়েছেন, ভাবতেই কালকেতুর মন শ্রদ্ধায় ভরে গেল। বইয়ের ব্যাককভার থেকে মুখ তুলে ও দেখল, ইমন তখনও দাঁড়িয়ে আছে। একটু অবাক হয়েই কালকেতু জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু বলবে?’

‘জ্বী ছ্যার, আফনের এই বইডা আমারে পইড়তে দিবেন?’

‘জিহাদিদের নিয়ে তোমার ইন্টারেস্ট আছে না কি?’

‘জ্বী ছ্যার। জিহাদিগো আমি কাইছ থেইক্যা দ্যাখসি। তাই মিলাইয়া দ্যাখতাম। বইতে যা লিখসে, সব হত্য কথা কি না।’

কালকেতু জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কদ্দূর পড়াশুনো করেছ ইমন?’

‘ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেইক্যা পাস করসিলাম। তাইর পর আর আগাইল না।’

‘আরে বাহ। পলাশভাই কি জানেন, তুমি ইঞ্জিনিয়ার?’

‘কই নাই। কইলে উনি আমারে কাম দিতেন না। জীবনে একডা বড় ভুল কইর‌্যা ফালাইসিলাম ছ্যার। বিদেশে চাগরি করনের ইচ্ছায়, দ্যাশ ছাইড়া আইসা। কপাল খারাপ, অহন আমারে সিকিউরিটি গার্ডের কাম করতে হইতাসে।’

ইমন কি সত্যি কথা বলছে? না কি সেদিন সুদীশের কথাবার্তা শুনে, ওকে বাজিয়ে দেখার জন্য পাল্টা চাল দিচ্ছে? কালকেতু বুঝতে পারল না। তবুও উৎসাহ দেখিয়ে ও বলল, ‘বোসো, বোসো। আমাকে বলো তো, তুমি কোথায় দেখেছ জিহাদিদের। সত্যিই কাছ থেকে দেখেছ?’

সোফায় মুখোমুখি বসে ইমন বলল, ‘জ্বী ছ্যার। নিউ ইয়র্কে আমরা যে পাবলিক স্টোরেজে কাম কইরতাম, সেহানে হ্যাগো দ্যাখসি। স্টোরেজের বেসমেন্টে চাইরজন জিহাদি লুকাইয়া ছিল। স্টোরেজের ম্যানেজার ছাড়া আর কেউ জাইনত না। আমাগো কাছে ধরা পড়ার পর হ্যারা আমাগো থেরেট করছিসল, পুলিশরে জানাইলে খতম কইর‌্যা দিমু।’

‘ওরা কি এখনও পাবলিক স্টোরেজেই আছে?’

‘কইতে পারুম না ছ্যার। আফনের বন্ধু সুদীশছ্যার হেইদিন গাড়িতে যার কথা কইতাসিল, তারে আমি চিইনতাম।‘

‘কার কথা তুমি বলছ? আই সিক্সটিফাইভ… মানে ইন্ডিয়ান ছেলেটাকে না কি?’

‘জ্বী ছ্যার। করিমগঞ্জের পোলাডারে। বাংলায় কথা কয় বইল্যা হ্যার সাথে আমার রেগুলার কথা হইত।’

‘এই কথাগুলো তুমি সুদীশছ্যারকে সেদিন বলোনি কেন?’

‘ডর লাগতাসিল। হ্যায় আমারেও যদি জিহাদি বইল্যা ধইর‌্যা নেন। হত্য কথা হইল, জিহাদিরা এহন কোথায়, আমি জানি না। পাবলিক স্টোরেজ থেইক্যা যেদিন আমরা চইলা আসি, তাইর পরের দিন পুলিশ রেইড করসিল। জানি না, অরা চাইরজন ধরা পড়সিল কি না। ’

‘ওদের সম্পর্কে তুমি আর কী জানো ইমন?’

‘দুইডা ঘটনার কথা জানি। হ্যাগো তিনজন নায়গারায় গেসিল লিলি গডউইন বইল্যা এগজনরে খুন করার জন্য। সাকসেসফুল হয় নাই। তহনই আমারে হ্যায় কইসিল, জিহাদি ক্যাম্পে আর ফিইর‌্যা যাইব না।’

রোকেয়া সুলতানা নন। লিলি গডউইনই তা হলে সেদিন টার্গেট ছিলেন। কালকেতু একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা লিলি গডউইনকে মারতে চেয়েছিল কেন?’

‘হ্যায় না হি ইউনিসেফের কাছে খারাপ রিপোর্ট দিতাসিল রোহিঙ্গাগো সম্পর্কে। বাংলাদ্যাশের জামায়েতিরা চেইত্যা গেসিল। জামায়েতিরাই আইএসের কাছে রিকোয়েস্ট করসিল, নায়গারায় লিলি গডউইনরে খুন করার জন্য। ’

‘তোমার জানা দ্বিতীয় ঘটনাটা কী?’

কী যেন চিন্তা করে ইমন বলল, ‘ছ্যার, আফনেরে মারার জন্য জিহাদিরা যারে পাঠাইসিল, হ্যায় আর বাঁইচ্যা নাই।’

কথাটা শুনে কালকেতু চমকে উঠল। ইমন গল্প বানাচ্ছে না কি? এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে, যেন ও মৃত। পুলিশ যেন ওকে খুঁজে বের করার জন্য আর সময় নষ্ট না করে। সুদীশ সেদিন যা বলেছিল, তা হলে সেটা ঠিক। জিহাদিরা কাউকে খুন করতে যাওয়ার আগে, পাবলিক স্টোরেজের গার্ডদের কাছে গল্প করবে, এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? দ্রুত চিন্তা করে নিয়ে কালকেতু পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘আমার উপর যে অ্যাটাক হয়েছিল, তুমি কী করে জানলে ইমন?’

‘কাউরে খুন করতে যাওয়ার আগে জিহাদিরা প্রেয়ার কইর‌্যা যাইত। আল্লাহরে জানাইয়া যাইত, কাফের নিধন করতে যাইতাসে। হ্যালোইনের রাতে হেইদিন বেসমেন্টে খাওয়া- দাওয়ার ব্যবস্থাও হইসিল। হ্যারা আমাগো দুইজনরে দাওয়াত দিসিল। গিয়া দেখি, আফনের ছবি দেওয়ালে ঝুলতাসে।’

‘তুমি কি জানো, কেন ওরা আমাকে মারতে চেয়েছিল?’

‘জ্বী ছ্যার। তহন হ্যাগো মুখে যা হুনসি, কই। আফনে ছ্যার কি কুনও বই লিখসেন, যেহানে রোহিঙ্গা মুসলিমগো খুব নিন্দা করসেন?’

চট করে কালকেতুর মনে পড়ল, ওর লেখা একটা উপন্যাসের কথা। যার পটভূমি মায়ানমারে বৌদ্ধ আর মুসলিমদের লড়াই। ইমন ওকে বোকা বানাচ্ছে না কি? সত্যি বলতে কী, উপন্যাসটায় কালকেতু এমন কিছু কড়া কথা লেখেনি, যাতে মুসলিম সম্প্রদায় ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে। কিন্তু উপন্যাসটা সম্পর্কে ইমন জানলই বা কী করে? আর যেই হোক, ও তো সুলেমান রুশদির মতো বিখ্যাত নয়। পরক্ষণেই ওর মনে হল, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এ এমন কি কঠিন কাজ? ফেসবুকে এই কিছুদিন আগেও বিস্তর আলোচনা হয়েছে বইটা নিয়ে। সেখানে কেউ কেউ বলেওছিলেন, কালকেতু নন্দী ইসলামকে অবমামনা করেছেন। ইমনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কালকেতু পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাকে যে ছেলেটা মার্ডার করতে এসেছিল, তার কী হল? তার উপর জিহাদি কমান্ডাররা অত্যাচার করেছিল না কি?’

‘জ্বী জ্বী। ঠিকই ধরসেন। হুধু অইত্যাচার না, হ্যারে গুলি কইর‌্যা, মাইর‌্যাই ফ্যালসে ছ্যার। পাবলিক স্টোরেজের পিছনের জমিতে হ্যারে পুইত্যা দিসে। আমি নিজের চোখখে দাখসি।’

শুনে কালকেতুর হাসি পেল। এতক্ষণে ও মোটামুটি নিশ্চিত, জিহাদি চিনতে সুদীশ অন্তত ভুল করেনি। ইমন ছেলেটার কপালে অশেষ দুঃখ লেখা আছে। সুদীশ একবার যার উপর থাবা বসায়, তাকে সহজে ছাড়ে না। ও কাউকে কিছু বলতে মানা করেছে। কোনও দরকার নেই জিহাদিদের নিয়ে মাথা ঘামানোর। যে কাজ করার জন্য আমেরিকায় এসেছে, অতঃপর তাতেই ও মন দেবে। ইমনকে বাজিয়ে দেখার জন্য ও একবার বলল, ‘তুমি কি এ সব কথাসুদীশস্যারকে বলতে পারবে? ওকে নিয়ে যেতে পারবে সেই জায়গাটায়, যেখানে জিহাদিরা ওই ছেলেটাকে কবর দিয়েছে?’

‘জ্বী ছ্যার কইতে পারুম। কিন্তু আমারে কোথাও যাইতে কইবেন না। আর আফনেরে কথা দিতে অইব, জিহাদিরা য্যান আমার কথা জাইনতে না পারে। হ্যারা খুউব ডেঞ্জারাস টাইপের ছ্যার। যে সব গল্প হ্যাগো মুখে হুনসি, তাতে ডর লাগে। হ্যারা ঠিক আমাগো খুঁইজ্যা বাইর করব। তাইর পর গুলি কইর‌্যা মারব।’

‘ভয় পেও না ইমন। সুদীশস্যারেরা তোমাদের প্রোটেকশন দেবে। তুমি কি জিহাদিদের স্কেচ আঁকায় সাহায্য করতে পারবে?’

‘জ্বী ছ্যার, পারুম। আমি নিজেই স্কেচ আঁইক্যা দিতে পারি। তবে, পুলিশের চক্করে আমি জড়াইয়া পড়তে চাই না। অনেক কষ্টে পলাশছ্যারের এহানে আশ্রয় পাইসি। হেইডা নষ্ট কইরতে চাই না। ছ্যার, আফনেরে দেইখ্যা আমার মনে হইসে, আফনে পলাশছ্যারের মতো ভালা মানুষ। আফনেরে আগে থেইক্যা সব কইয়া রাখলাম। নাইলে হান্তি পাইতাসিলাম না।’

‘আমাকে সব কথা বলে ভাল করেছ ইমন। এখন তুমি যাও। জিহাদিদের বইটা তুমি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারো। পড়া শেষ হলে ফেরত দিয়ে যেও।’

সোফা ছেড়ে উঠে বইটা হাতে নিয়ে ইমন ঘর থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে কালকেতুও বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

 পলাশভাই সেদিন বলছিলেন, শীতের শুরুতে এই সময় গাছের পাতা শুকিয়ে বাদামি বা খয়েরি রঙের হয়ে যায়। পাতাগুলো ঝরে লনে জড়ো হতে থাকে। রোদ্দুর উঠলে আশপাশের গাছ থেকে কাঠবেড়ালিরা নেমে লনে খেলা করতে আসে। কাঠবেড়ালিগুলোর শরীরের তুলনায় লেজের দিকটা বেশ মোটা ও লোমে ভরা। লনের গর্ত থেকে কয়েকটা খরগোসও বেরিয়ে এসে কুটকুট করে ঘাস খায়। নিউ জার্সির বেড়ালগুলো তখন হঠাৎ হানা দেয়। এই ব্ব ক্যাটদের সঙ্গে কাঠবেড়ালির লুকোচুরি খেলা দেখতে কালকেতুর খুব মজা লাগে। আজ লনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ওর চোখে পড়ল, আউট হাউসের বারান্দায় চিরাগ হাতে গুলতি নিয়ে দাঁড়িয়ে। দেখে ওর ভ্রু কুঁচকে গেল।ছেলেটার মতলবটা কী? কাঠবেড়ালি মারবে না কি? গুলতিই বা ও পেল কোথায়?

শুকনো পাতার উপর দুটো কাঠবেড়ালি দৌড়ে বেরাচ্ছে। আউট হাউসের বারান্দা থেকে পনেরো ষোলো গজ দূরে। কালকেতু দেখল, চিরাগ গুলতি তাক করে আছে। তার দু’এক সেকেন্ড পরেই কাঠবেড়ালিটা একবার লাফিয়ে উঠল। তার পর দু’তিনবার গড়িয়ে গিয়ে নিথর হয়ে গেল। ওর গা দিয়ে রক্ত ঝরছে। নিজের চোখকে কালকেতু বিশ্বাস করতে পারল না। এমন নিখুঁত টিপ কারও হয় না কি? চোখের সামনে একটা নিরীহ পশুকে হত্যা করতে দেখে ওর ভয়ানক রাগ হল চিরাগের উপর। চট করে ওর মনে হল, রোজিনা ম্যাডামই ঠিক। যাদের মনে এমন জিঘাংসা, তারা কখনও স্বাভাবিক মানুষ হতে পারে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *