(আঠাশ)
অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সির অ্যাপার্টমেন্টে বোন সাশার সঙ্গে আড্ডা মারছেন লিলি গডউইন। বাইরে গুড়ি গুড়ি বরফ পড়ছে। তাপমাত্রা মাইনাস ফাইভ ডিগ্রি। পাতলা বরফের আস্তরণ সবুজ লনগুলোতে। কাল সকালে সবুজের বদলে রংটা সাদা হয়ে যাবে। টিভিতে লিলি দেখেছেন, আরও পূর্বে বোস্টন আর শিকাগো না কি বরফের তলায় চাপা পড়ে গেছে। ক্রিসমাস ইভ, বরফ ছাড়া ভাবা যায় না কি? এই সময়টায় নিউ ইয়র্কের বাইরে কোথাও গেলে তাঁর মন খারাপ হয়ে যায়। অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সির পুরোটা আলোর মালা দিয়ে এমন সুন্দর সাজানো হয়, দূর-দূরান্ত থেকে লোকে আসে তা দেখতে। লেকের মাঝে বিশাল একটা ক্রিসমাস ট্রি সবথেকে বড় আকর্ষণ। তার প্রতিবিম্ব লেকের জলে পড়ে। বিকালে একদল আবাসিক ক্রিসমাস ক্যারল গাইতে গাইতে কমপ্লেক্স চত্বর ঘুরে বেড়ায়। এই বয়সেও দেখতে দারুণ লাগে।
বহুদিন পর ক্রিসমাসের সময় পরিবারের পনেরো-ষোলোজন একত্রিত হয়েছেন। সাশা থাকে লস অ্যাঞ্জিলেসের কাছে টোরেন্স বলে একটা জায়গায়। ওর স্বামী এডওয়ার্ড নামকরা ল’ইয়ার। একবার সেনেট নির্বাচনে প্রার্থীও হয়েছিল রিপাবলিকানদের হয়ে। মাত্র তিনশো ভোটে হেরে যায়। ছেলেটা অবশ্য রাজনীতির ময়দান থেকে সরে যায়নি। তিন ছেলেমেয়ে মানুষ করতে গিয়ে সাশা একেবারে জেরবার। ঘরোয়া টাইপের মেয়ে। তবে এডওয়ার্ডের সঙ্গে সমাজসেবাতেও যতটা পারে, অংশ নেয়। লিলির সঙ্গে তাঁর বয়সের তফাৎ প্রায় দশ বছরের। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও দিদিকে ও মায়ের মতো সম্মান করে।
হল ঘরে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো রয়েছে। তার গায়ে পাঁচ-ছ’টা লাল মোজা ঝোলানো। বাচ্চাদের আশা, কাল জেসাসের জন্মদিনের সকালে ঘুম থেকে উঠে ওরা গিফট পাবে ক্রিসমাস ট্রি-র নিচ থেকে। চিমনি দিয়ে ঘরে ঢুকবেন স্যান্টা ক্লস। মোজার ভিতর ওদের প্রত্যেকের জন্য গিফট রেখে যাবেন। ক্রিসমাস ট্রি-র পাশের সোফাতেই বসে আছে সাশা। একটু আগে বারান্দা থেকে ঘুরে এসেছে। বলল, ‘ভাল বরফ জমছে লনে। আমাদের টোরেন্সে বরফ পড়ে না। কাল দেখবে, আমার ছেলেমেয়েদের তুমি ঘরের ভিতর আটকে রাখতে পারবে না।’
লিলি বললেন, ‘ওদের আটকাস না। আমাদের ছেলেবেলার কথা তোর মনে নেই? মাম্মি তোদের বারণ করত না। কিন্তু আমাকে বরফে গড়াগড়ি খেতে দিত না। তবুও, লুকিয়ে-চুরিয়ে বরফ নিয়ে কেমন খেলতাম।’
‘সত্যি, গোথেনবার্গের সেই দিনগুলো খুব ভাল ছিল। বরফের মধ্যে হর্স রেসিংও হত। আমার বেশি করে মনে পড়ে, কেননা এডওয়ার্ডের সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ ওই রেসিংয়ের সময়।’ কথাগুলো বলে সাশা হাসতে লাগল।
ওয়াশিংটন থেকে এসেছে লিলির ভাই ড্যানিয়েলও, ওর স্ত্রী আর মেয়েকে নিয়ে। ড্যানি ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কে খুব বড় পোস্ট-এ চাকরি করে। ওর মেয়ে মারিয়া নাসা স্পেস সেন্টারের বিজ্ঞানী। মারিয়া বিয়ে করেছে এক অ্যাস্ট্রেনটকে। ওরা থাকে হিউস্টনে। ওদের দুই ছেলে-মেয়ে। মারিয়াকে খুব ভালবাসেন লিলি। মারিয়াও একটা সময় পিসিঅন্ত প্রাণ ছিল। মাঝে মধ্যেই মেয়েটা ফোন করে হিউস্টন থেকে। নাসার কোনও না কোনও প্রোজেক্টের সঙ্গে যুক্ত থাকে বলে মেয়েটা নিউ ইয়র্কে আসতে পারে না। এতদিন স্যাটার্নে স্পেসশিপ পাঠানোর প্রোজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিল। সেটা সাফল্যের সঙ্গে ছাড়া হয়ে গেছে। তাই এ বার ক্রিসমাসে ছুটি পেয়েছে। শুধু তাই নয়, মারিয়া সঙ্গে নিয়ে এসেছে ওর শ্বশুর আর শাশুড়িকেও।
সাশা ছাড়া অ্যাপার্টমেন্টে আর কেউ নেই এই মুহূর্তে। বাকিরা গেছে ডিয়ার ফিল্ড বলে একটা বিশাল হাউসিং কমপ্লেক্সে। মাল্টি মিলিওনিয়ারদের কমপ্লেক্স। ক্রিসমাসের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ডিয়ার ফি ল্ড ক্রিসমাস আলোর সাজে সেজে ওঠে। প্রত্যেকটা গাছে রঙিন এলইডি বালব। প্রত্যেকটা বাড়ি আর তার সামনের কোর্ট ইয়ার্ডও আলো দিয়ে সাজানো। কোথাও সান্টা ক্লজের রথ টেনে নিয়ে যাচ্ছে এল্ক হরিণের দল, কোথাও যিশু খ্রিষ্টের জন্ম হচ্ছে ন্যাজারথে। কোথাও মিউজিকের তালে তালে নাচছে সান্টা ক্লজ। কনটেস্টও হয় বাড়ি সাজানো নিয়ে। গতবার বিচারক হয়ে লিলি ডিয়ার ফিল্ডে গেছিলেন। জাঁকজমক আর ভিড় দেখে তিনি অবাক! সব ক’টা বাড়ির ডেকোরেশন তাঁর এত ভাল লেগেছিল যে, কাকে ফার্স্ট প্রাইজ দেবেন বুঝতে পারছিলেন না। সেই গল্পই দু’একদিন আগে তিনি করেছিলেন বাচ্চাদের কাছে। ওরা জোর করে বড়দের ধরে নিয়ে গেছে ডিয়ার ফিল্ডে।
সন্ধে প্রায় সাড়ে ছ’টা বাজে। সবাই ফিরে এলে ডিনারে ওঁরা বসে যাবেন। মারিয়ার শাশুড়ি না কি খুব ভাল রান্না করেন। আজ সকালে উনি বলে বসলেন, ক্রিসমাস ইভে একটা কোর্স রান্না করে উনিই সবাইকে খাওয়াবেন। ঘরে হুইস্কি, রেড ওয়াইনের বোতলও মজুত আছে। সাশা নানা ধরনের ককটেল বানাতে পারে। সন্ধেটা খুব সুন্দর কাটবে ভেবে মনটা ফুরফুরে লিলির। তাঁর আরও ভাল লাগত যদি ড্যাডি হাজির হতে পারতেন। অ্যালান গডউইন থাকেন নিউ ইয়র্কেই গ্রিনউইচে। শরীরটা ভাল নেই। বয়স হয়ে গেছে পঁচাত্তরের কাছাকাছি। উনি আর ডাক্তারি করতে চান না। কিন্তু যে ক্লিনিকে উনি বসেন, তারা ওঁকে ছাড়তে চায় না। বাধ্য হয়েই ড্যাডি দিনে ঘণ্টা দুয়েকের জন্য ক্লিনিকে যান। এর বাইরে এখন আর কোত্থাও বেরোন না।
কয়েকদিন আগে ড্যাডির সঙ্গে দেখা করতে গেছিলেন লিলি। লক্ষ করেছেন, উনি এখন একটু খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছেন। কথা বলতে বলতে সাশা ড্যাডির প্রসঙ্গ তোলায় লিলি বললেন, ‘ওঁর মাথায় এখন অদ্ভুত খেয়াল চেপেছে, গোথেনবার্গে ফিরে যাবেন।’
সাশা বললেন, ‘কয়েকদিন আগে এড ওঁকে ফোন করেছিল, কই, তখন তো ওকে ড্যাডি কিছু বলেনি।’
‘গ্র্যান্ডমার শরীর ভাল নেই। এখন না কি মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। সেই কারণেই ড্যাড নিউ ইয়র্কের পাট তুলে দিতে চান।’
সুইডিশ মহিলারা এমনিতে একটু দীর্ঘায়ু হন। গড় আয়ু পঁচাশি বছর। গ্র্যান্ডমার বয়স অনেক বেশি, পঁচানববুই। এই কিছুদিন আগেও গ্র্যান্ডমা বেশ ফিট ছিলেন। প্রায়ই নিজে গাড়ি চালিয়ে বাল্টিক সাগরের তীরে চলে যেতেন রোদ্দূর পোহাতে। আমেরিকায় ছেলের বাড়িতে বেরাতে এলে গ্র্যান্ডমা ওকলাহামায় চলে যান ক্যাসিনো খেলতে। বিশ্বের সবথেকে বড় ক্যাসিনোটা ওখানে।
সাশা জিজ্ঞেস করল, ‘দেশে ফিরে গেলে নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টের কী করবেন ড্যাডি?’
লিলি বললেন, ‘আমি জিজ্ঞাসা করিনি।’ কথাটা সত্যি, লিলি জিজ্ঞাসা করেননি। কিন্তু ড্যাডি সেদিন নিজেই বলেছিলেন, অ্যাপার্টমেন্টটা লিখে দেবেন তাঁর চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের নামে। পাছে সাশা আর ড্যানিয়েল কিছু মনে করে সেই কারণে ড্যাডিকে মানা করে এসেছেন লিলি।
হঠাৎ সাশা জিজ্ঞোসা করল, ‘অ্যান্ডি কেমন আছে রে? ওর কোনও খবর রাখিস?’
লিলি একটু রেখেঢেকে বললেন, ‘ও যোগাযোগ রাখে। হঠাৎ ওর কথা তোর কেন মনে হল?’
‘ওকে তখন বিয়ে করলে তুই ভাল করতি। তোদের ব্রেক আপ হল কেন, সেটা জানতে ইচ্ছে করে। এডও আমাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল।’
এলসা আন্টি কেন মানা করেছিলেন, সেই কথাটা বলা উচিত হবে না। লিলি বললেন, ‘সব মেয়ের জীবনে সব ইচ্ছে তো আর পূরণ হয় না। আমার কপালে ছিল না। তবে, অ্যান্ডি এখনও বিয়ে করেনি। ও এখনও আমাকে ভুলতে পারেনি। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমার জন্যই ও দাম্পত্য সুখ পেল না।’
‘এখন তোর কী এমন বয়স হয়েছে? আজকাল তোর থেকেও বড় বয়সিরা বিয়ে করে মা হচ্ছে। তুই যদি বলিস তো, অ্যান্ডির সঙ্গে আমি কথা বলে দেখতে পারি। আমার খুব খারাপ লাগে যখন ভাবি, বাকি জীবনটা তুই একা কাটাবি কী করে?’
লিলি হেসে উড়িয়ে দিলেন কথাটা, ‘কে তোকে বলল, আমি একা কাটাব? চাইল্ড কেয়ার ইউনিটগুলোতে আমার কত সন্তান, তুই জানিস? ওদের নিয়ে দিব্যি আমার জীবন কেটে যাবে। না, না, অ্যান্ডির সঙ্গে এ ব্যাপারে তুই কোনও কথা বলবি না।’
সাশা তর্ক করতে যাচ্ছিল, এমন সময় ফোন। নিউ ইয়র্ক থেকে ভিডিয়ো কল। পর্দায় ড্যাডির মুখ, ‘মেরি ক্রিসমাস হানি।’
ড্যাডিকে দেখে উচ্ছ্বাস চেপে রাখতে পারলেন না লিলি, ‘মেরি ক্রিসমাস। আমি আর সাশা এখখুনি তোমাকে নিয়ে কথা বলছিলাম। তোমাকে আমরা খুব মিস করছি। তোমার শরীর ঠিক আছে তো?’
‘আমি ঠিক আছি হানি। তুমি কেমন আছ?’
‘রিসেন্টলি ডা. কিংসফোর্ডের কাছে গেছিলাম। উনি আমার লেজার ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিয়েছেন। এখন একটু ভাল বোধ করছি।’
‘তোমাকে নিয়ে টিভিতে কী সব আজে বাজে কথা আলোচনা হচ্ছে লিলি? তুমি না কি ফাউন্ডেশনের অর্থ নয়-ছয় করছ?’
লিলি বললেন, ‘ওতে কান দিও না ড্যাড। আমেরিকান মিডিয়াকে তো তুমি জানো। ওরা আমাকে আরও বিখ্যাত করে দিচ্ছে।’
‘না, না হানি। এডওয়ার্ডকে বলো, যেন স্যু করে দেয়। এ রকম অপবাদ দেওয়ার মানেটা কী?’
‘স্যু করার দরকার নেই ড্যাড। প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস টুইট করে বলে দিয়েছেন, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে কোনও স্টেপ নেবে না। উনি আজই আচমকা সিরিয়ায় চলে গেলেন। না হলে প্রেস কনফারেন্স ডেকে যা বলার বলে দিতেন। আমি জানি ড্যাড, কারা পিছন থেকে আমাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করছে। এটা ডেমোক্রাটদের নোংরামি। আমাকে সামনে রেখে আসলে প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসকে ওরা ঝামেলায় ফেলতে চায়।’
‘তবুও, তুমি সাবধানে থেকো হানি। আর হ্যাঁ, তোমার গেস্টরা সবাই এসে গেছেন?’
‘গেস্ট বলতে দু’জন ইউনিসেফে আমার কলিগ। বাকি তিনজনকে তুমি চিনবে না। এখনও ওরা আসেননি। বাকিরা সবাই ফ্যামিলি মেম্বার।’
‘ঈশ্বর তোমাকে সুখে রাখুন। শোনো হানি, আরও একটা কারণে তোমাকে ফোনটা করলাম। তুমি কি মি. কালকেতু ন্যান্ডি বলে কোনও ইন্ডিয়ান জেন্টেলম্যানকে চেনো?’
একট অবাক হয়েই লিলি জানতে চাইলেন, ‘ওঁর সঙ্গে আমার রিসেন্টলি পরিচয় হয়েছে ড্যাড। তুমি ওকে জানলে কী করে?’
ড্যাডির গলায় ঝাঁঝ, ‘আরে, উনি ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। আমার সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে চান। মেনলি তোমার সম্পর্কেই নানা কথা জানতে চাইছিলেন। আমি সাফ বলে দিয়েছি, তোমার আর্লি লাইফ নিয়ে কোনও প্রশ্নের জবাব দেব না।’
‘আমার সম্পর্কে উনি ঠিক কী জানতে চাইছিলেন ড্যাড?’
‘এই যেমন, তোমাকে কীভাবে আমি দত্তক নিয়েছিলাম। তোমার সঙ্গে বাংলাদেশের কোনও সম্পর্ক আছে কি না? তোমার পিঠের ইনজুরিটা কীভাবে হয়েছিল। এইসব কথা আর কী। আমি এত রেগে গেছিলাম যে নিজেই ফোনের লাইন কেটে দিই।’
শুনে লিলি একটু অস্বস্তিবোধ করলেন। ন্যান্ডির সঙ্গে এই আচরণ করা ড্যাডির উচিত হয়নি। তিনি বললেন, ‘ড্যাড, ওই ইন্ডিয়ান জেন্টেলম্যান কয়েকদিন আগে আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ওকে আর ওর দুই বন্ধু পলাশ আর রোজিনাকে আজ ডিনারে আমি নেমতন্ন করেছি। স্রেফ কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য। ড্যাড প্লিজ, এর পর উনি যদি ফোন করেন, তা হলে তুমি আমার সম্পর্কে যা জানো, ওকে বলে দিও।’
উল্টোদিকে ড্যাডি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, ‘তাই না কি? সরি হানি, আমি জানতাম না। কিন্তু কে তোমাকে মারার চেষ্টা করেছিল?’
টেররিস্ট অ্যাটাকের কথা শুনলে ড্যাডি টেনশনে পড়বেন। লিলি বললেন, ‘ও সব কথা এখন থাক ড্যাডি। শোনো, আমাকে নিয়ে তুমি একদম টেনশন করবে না। জীবনের অর্ধেকটাই তুমি আমাকে নিয়ে টেনশনে ভুগেছ। আমি যখন পিঠের ব্যথায় কাতরাতাম, তখন রাতের পর রাত তুমি আমার বিছানার পাশে বসে কাটিয়েছ। আমার কাছে তুমি ঈশ্বরের থেকেও কম কেউ না ড্যাড। তোমার আশীর্বাদ থাকলেই হল। আমার কোনও ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।’
‘থাক হানি, পুরনো কথা তুলো না। বয়স হয়েছে তো, শুনলে এখন আমি খুব সেন্টিমেন্টাল হয়ে যাই। শোনো, সাশা কি ধারে-কাছে আছে? ওকে ফোনটা দাও মা। ওকে উইশ করি। ওর বাচ্চাগুলোর জন্য গিফট পাঠিয়েছি। আজ রাতের মধ্যে তোমার বাড়িতে পৌঁছে যাবে।’
লিলি হেসে বললেন, ‘সাশা এখন আমার পাশেই বসে আছে। তুমি ওর সঙ্গে কথা বলো।’
ফোনটা সাশার হাতে ধরিয়ে দিয়ে লিলি গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটার দিকে তাকালেন। প্রায় সাতটা বাজে। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে ইউনিসেফের গেস্টরা চলে আসবেন। ডিনারের আয়োজন ঠিকঠাক হয়েছে কি না, তা দেখার জন্য লিলি ছাদে বেরিয়ে এলেন। বিরাট একটা রঙিন সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। উপর থেকে বাহারি কোরিয়ান আলো ঝুলছে। একপ্রান্তে একটা ছোট্ট পোডিয়াম। তাতে পিয়ানো অর্গান রাখা। ডিনারের আগে সবাই মিলে ক্যারল গাইবেন। তখন পিয়ানোয় বসবেন লিলি। ছোটবেলায় টিচার রেখে তাঁকে পিয়ানো শিখিয়েছেন মাম্মি। তখন শারীরিক কারণেই মিউজিক আঁকড়ে ধরেছিলেন লিলি। কর্মজীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ার পর কদাচিৎ পিয়ানোয় বসার সময় পান। এখনও তাঁর আঙুলের জাদু সুরের আশ্চর্য মায়াময় জগতে নিয়ে যায় শ্রোতাদের।
প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ক্রিসমাস কাটাচ্ছেন লিলি। এই ক’ বছর বিভিন্ন শহরে তাঁর চাইল্ড কেয়ার ইউনিটে বাচ্চাদের সঙ্গে অপার আনন্দে সময় কাটিয়েছেন তিনি। এ বছরই তাঁর যাওয়ার কথা ছিল ইয়েমেনের সানা শহরে। আগে ওটাই ইয়েমেনের রাজধানী ছিল। কিন্তু বছর চারেক আগে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হাডি হঠাৎ বন্দর শহর আদেনে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে গেছেন। সানার চাইল্ড কেয়ার ইউনিটে আশ্রিত বাচ্চাদের সংখ্যা প্রায় হাজার। লিলি ভেবেছিলেন, ক্রিসমাসে উপহারসামগ্রী নিয়ে গেলে ওখানে বাচ্চারা প্রচণ্ড খুশি হবে। মিডিয়ারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেন। এই মুহূর্তে প্রায় মুমূর্ষ একটা জাতির পাশে গিয়ে দাঁড়ানো দরকার। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সানায় যাওয়ার প্ল্যান লিলি বাতিল করেন সিকিউরিটি চিফ স্ট্যানলি গর্ডনের পরামর্শে। ‘ম্যাডাম, পশ্চিম এশিয়া আপনার পক্ষে এখন নিরাপদ না। ওখানে যাওয়া মানে মিলিট্যান্টদের খপ্পরে পড়া।’
ছাদ থেকে লিভিং রুমে ঢুকে লিলি দেখলেন, ডিয়ার ফিল্ড থেকে পুরো পরিবার ফিরে এসেছে। ওখানে কী দেখেছে, সেটা বলার জন্য বাচ্চাগুলো একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। এডওয়ার্ড ওদের বকুনি দিয়ে বলল, ‘এখন না। এখন না। অলরেডি ওই আর লেট। আন্টি তোমাদের কথা পরে শুনবেন। তোমরা সবাই চট করে ফ্রেশ হয়ে নাও। ডিনারের আগে এখুনি আমরা প্রেয়ারে বসব।’ শুনে বাচ্চাগুলো হুড়মুড় করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
তখনই নিচ থেকে স্ট্যানলি গর্ডনের ফোন পেলেন লিলি, ‘ম্যাডাম, একটা আর্জেন্ট দরকার ছিল। আপনাকে ডিসটার্ব করার জন্য দুঃখিত।’
লিলি বললেন, ‘ডাজন্ট ম্যাটার। কী বলবে বলো।’
‘খানিকক্ষণ আগে ফ্রন্ট গেটে স্যান্টা ক্লজ সেজে একজন এসেছিলেন। তিনি আপনার অ্যাপার্টমেন্টে যেতে চাইছিলেন। ডিয়ার ফিল্ডে তার সঙ্গে না কি আপনার কাছে আসা বাচ্চাদের আলাপ হয়েছিল। বাচ্চারাই না কি তাঁকে এই অ্যাপার্টমেন্টে আসার জন্য অনুরোধ করেছিল। কিন্তু রেসিডেন্সির সিকিউরিটি স্টাফদের লুকোনো মেটাল ডিটেক্টরে ধরা পড়ে, ভুয়ো স্যান্টা ক্লজের সঙ্গে একটা পিস্তল আছে।’
শুনে শরীরে উপর দিক থেকে একটা ঠান্ডা স্রোত নিচের দিকে নামতে শুরু করল লিলির। তার মানে টেররিস্টরা এখনও তাঁর পিছু ছাড়েনি। স্যান্টা ক্লজের ছদ্মবেশে কোনও টেররিস্ট তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট পর্যন্ত ধাওয়া করতে পারেন, তিনি তা স্বপ্নেও ভাবেননি। এই মুহূর্তে জানাজানি হলে ফ্যামিলি মেম্বারদের মধ্যে প্যানিক ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই লিলি বললেন, ‘ওর কাছ থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে জন মিকেলকে খবরটা দাও। ওকে নিয়ে যা করার, এফবিআই করুক। প্লিজ, দেখো, গুলিগোলা যেন না চলে। আর রেসিডেন্টরা কেউ যেন জানতে না পারেন।’
স্ট্যানলি বলল, ‘রেসিডেন্সির সিকিউরিটি এমন মার মেরেছে, লোকটা এখন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’
শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন লিলি।
