(বত্রিশ)
পলাশ আর রোজিনাকে বেশ ভাল লেগেছে লিলি গডউইনের। এমন একটা কাপল যদি তাঁর চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনে থাকত, তা হলে তিনি সোনা ফলিয়ে দিতেন। গত পরশু ক্রিসমাস ইভ ডিনারের পর ভাল করে আলাপ হল পলাশদের সঙ্গে। প্লেনোতে ওরা চাইল্ড ডিটেনশন সেন্টার খুলতে চায়, কালকেতু নন্দীর মুখে এ কথা শোনার পর তিনি এমনিতেই একটু উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফেলেছিলেন। পরে গল্প করার সময় বুঝতে পারলেন, শুধু লাভ করার উদ্দেশ্যে পলাশ সেন্টার খুলতে চাইছে না। এর পিছনে ওর সমাজসেবা করার ইচ্ছেটাও আছে।
নিকট পরিজনেরা যে যাঁর বাড়িতে ফিরে গেছে। টানা তিন-চারটে দিন বাচ্চাগুলো হুটোপাটি করে অ্যাপার্টমেন্ট আনন্দে ভরিয়ে রেখেছিল। ওরা চলে যেতেই লিলি ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ফাউন্ডেশনের চ্যারিটি শো নিয়ে। হাতে আর বেশি সময় নেই। লাস ভেগাসে যেখানে শো হবে, সেই জায়গাটা দেখতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে গেছে অ্যান্ডি। এ ব্যাপারে বাম কিমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন লিলি। ঠিক হয়েছে, এ বার নিউ ইয়ারস ইভ ওই ভেনিসিয়ান হোটেলেই কাটাবেন ওঁরা। শো-র অর্ধেক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে অ্যান্ডি। রোজই আজকাল একবার করে ফোন করে। ওর ভালবাসার উত্তাপটা নতুন করে টের পাচ্ছেন লিলি।
সেদিন কথায় কথায় পলাশের ফিয়াসেঁ রোজিনা একটা দারুণ সাজেশান দিল। ‘ম্যাম, যাদের জন্য আপনার এই চ্যারিটি শো, তারা বঞ্চিত হবে কেন? আপনার ফাউন্ডেশনে যেখানে যত বাচ্চা আছে, তাদের সববাইকে লাস ভেগাসে নিয়ে চলুন। ওদের জন্য শো। শুধু হলিউডের স্টাররা নন, শো-য়ের গ্র্যাঞ্জার ওরাও দেখুক। সারা জীবনের জন্য একটা অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে। ওদের দিয়ে যদি কোনও পারফরম্যান্স করানো যায়, নাচ বা গান যা-ই হোক না কেন, তা হলে তো কথাই নেই।’
সারা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দশটা চাইল্ড কেয়ার সেন্টার আছে ফাউন্ডেশনের। ভিয়েতনাম থেকে গুয়াতেমালা পর্যন্ত। কমপক্ষে হাজার পাঁচেক বাচ্চা তো হবেই। যুদ্ধপীড়িত দেশের অনাথ ছেলে-মেয়ে। লেখাপড়ার সঙ্গে ওদের নাচ-গানও শেখানো হয়। যারা স্পোর্টসে আগ্রহী, তাদের সেদিকে ঠেলে দেওয়া হয়। কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ওদের লাস ভেগাসে নিয়ে যাওয়া কম ঝক্কির না কি! আইডিয়াটা অবশ্য রোজিনা মন্দ দেয়নি। একই মঞ্চে এশিয়ান, আফ্রিকান, বলকান, সেন্ট্রাল আমেরিকান বাচ্চারা বিশ্ব শান্তির গান গাইছে, সেটা একটা অভিনব দৃশ্য হবে। পলাশ খুব জোর দিয়ে সেদিন বলেছিল, ‘ম্যাম, বাচ্চাগুলার জইন্য যা খরচ অইব, সব আমার। আফনে সিরিয়াসলি ভাবেন। আমি চাই, ইয়েমেনের বাচ্চারাও আফনের শো-তে আসুক। দ্যাশটার অবস্থা আফনের মুখে যা হুনলাম, হুইন্যা ইস্তক আমার প্রাণ কাঁদতাসে।’
এইসব কথা হওয়ার আগে কালকেতু বলেছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পলাশের এক দিদি না কি নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁর খোঁজ করার জন্য ও আমেরিকায় এসেছে। এই সেন্টিমেন্ট থেকেই যুদ্ধের কারণে অনাথ হওয়া বাচ্চাদের জন্য পলাশ কিছু করতে চান। মেক্সিকান বাচ্চাদের ডিটেনশন সেন্টার খোলার ব্যাপারে তাই উৎসাহী। ভাল কথা। কিন্তু সত্যি বলতে কী, লিলি একটু অবাকই হয়েছিলেন, প্রায় অর্ধ শতাধী আগে হারিয়ে যাওয়া এক মেয়েকে খুঁজে বের করার জন্য কালকেতু এ দেশে এসেছে শুনে। মেয়েটা এখন পঞ্চাশোর্ধ। তার চেহারাও অনেক বদলে গিয়েছে। এতদিন পর তাকে খুঁজে পাওয়া কি সম্ভব?
আবার অসম্ভব বলাটাও ঠিক না। বিশেষ করে, এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের যুগে। তাঁর চাইল্ড কেয়ার ইউনিটেই এই রকম পুনর্মিলনের ঘটনা কিন্তু ঘটেছে। পাঁচ বছর আগে সিরিয়ার এক শহর কাবোনে থেকে কয়েকটা অনাথ বাচ্চাকে ইউনিসেফ শিবির থেকে তুলে এনেছিলেন তিনি। জিহাদি আর সরকারি পক্ষের লড়াইয়ের জন্য শহরটা তখন একেবারে ধ্বংসস্তুপে পরিণত। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কুর্দরাই। বাচ্চাগুলো কেউ অসুস্থ, অভুক্ত, কেউ আহত। পরিবারের লোকজনের কোনও হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না। ডালাসে ওদের নিয়ে আসার জন্য গেছিলেন বাম কিন। ফিরে এসে পরে উনি পরামর্শ দেন, পরিবারের লোকজন যুদ্ধে মারা গেছে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কেউ কেউ হয়তো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। অথবা জিহাদিদের ভয়ে আত্মগোপন করে আছেন। বাচ্চাগুলোর ছবি সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটে দিয়ে রাখা যাক। হয়তো কখনও পরিবারের কারোর চোখে পড়ে যাবে।
কুর্দ বাচ্চাগুলোর মধ্যে একটা ফুটফুটে মেয়েকে লিলি ভোলেননি। বয়স আট বছর, নাম রাশা। ডালাসে যখন ওকে নিয়ে আসা হয়, তখন ওর পিঠে দগদগে ঘা। আগুনে পুড়ে যাওয়ার জন্য। ওর ওই অবস্থা দেখে লিলির নিজের ছোটবেলাকার কথা মনে পড়েছিল। নিউ ইয়র্ক থেকে ড্যাডিকে ডালাসে নিয়ে গিয়ে তিনি রাশার চিকিৎসা করান। মাস ছয়েকের মধ্যে মেয়েটা সুস্থ হয়ে ওঠে। তার পরই ওর প্রতিভা ইউনিটের সবার চোখে পড়ে। রাশা সুন্দর গান গাইত। লিলি মাঝে মধ্যেই ওর খোঁজ নিতেন। বছর তিনেক এ ভাবে কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ ওর বাবা-মায়ের খোঁজ পাওয়া যায়। ততদিনে আমেরিকান সৈন্যরা কাবোনে শহর জিহাদিদের হাত থেকে মুক্ত করে দিয়েছে। কুর্দরা শহরে ফিরে গিয়েছেন। সোশ্যাল নেট ওয়ার্কে মেয়ের ছবি দেখে, ওঁরাই ডালাসে এসে রাশাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
তার পর থেকে প্রতি বছর রাশাকে ক্রিসমাসের গিফট পাঠান লিলি। এ বারও মেয়েটা কার্ডের সঙ্গে একটা গানের সিডি পাঠিয়েছে। ওর জীবনের প্রথম অ্যালবাম। এখনও ওর গান শোনার সময় পাননি লিলি। চ্যারিটি শো-তে রাশাকে দিয়ে গান গাওয়ানোও যেতে পারে। ঠিক সময়ে ঠিক চিকিৎসা পেয়েছে বলে মেয়েটা এখন পুরোপুরি সুস্থ। মেয়েটাকে নিয়ে ভাবার সময় লিলির মনে হল, ইস, ছোটবেলায় ভুল স্কিন গ্র্যাফটিংয়ের জন্য এখনও তাঁকে ভুগতে হচ্ছে। চিকিৎসাটা ঠিকঠাক হলে তাঁর জীবন অন্য খাতে বইত। অ্যান্ডির স্ত্রী হিসেবে হয়তো বাকি জীবন তিনি লাস ভেগাসে কাটাতেন।
লিভিং রুমের দেওয়ালে প্রেসিডেন্ট নিকি অ্যাডামসের সঙ্গে তাঁর একটা ছবি ঝোলানো আছে। ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে তিনি অ্যাওয়ার্ড নিচ্ছেন। সেদিকে তাকিয়ে লিলি মৃদু হাসলেন। অ্যান্ডির স্ত্রী হিসেবে কি তিনি এই সম্মানটা পেতেন? মনে হয়, না। শুধু প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসই নন, বিশ্বের বহু রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে তাঁর ছবি আছে। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার নাটালে কৃষ্ণাঙ্গ বাচ্চাদের জন্য একটা চ্যারিটি শো-তে ম্যান্ডেলা এসেছিলেন। এলসা আন্টি মাঝে মাঝেই বলতেন, ‘জীবনে যা পেয়েছ, তা খুব কম মহিলার ভাগ্যে জোটে। অনাথ বাচ্চাদের মুখে তুমি হাসি ফুটিয়েছ। এর থেকে বড় পাওনা আর কী হতে পারে? সবসময় তোমার জন্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ বরাদ্দ থাকবে।’
লিলির ফাউন্ডেশনের দফতরে আরও একটা প্রিয় ছবি টাঙানো আছে। হাতে অসংখ্য সাদা বেলুন নিয়ে বাচ্চাদের মাঝে হাসিমুখে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। পঞ্চাশ-ষাটটা ছোট ছোট হাত সেই বেলুনগুলো ছোয়ার চেষ্টা করছে। তাদের চোখ-মুখে আনন্দের অভিব্যক্তি দেখে লিলি এখনও নতুন করে উৎসাহ পান। ছবিটা তোলা ম্যাডিসন স্কোয়্যার গার্ডেন্সে। ফাউন্ডেশনের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। ওই অসাধারণ মুহূর্তের ছবিটা লিলিকে উপহার দিয়েছিলেন নামী ফোটোগ্রাফার রিচার্ড গাটম্যান। সেদিনের অনুষ্ঠানে রিচার্ড প্রধান অতিথি ছিলেন। দফতরে মাঝে মধ্যেই কোনও না কোনও ডোনার আসেন। হাঁ করে তাঁরা তাকিয়ে থাকেন ওই ছবিটার দিকে।
ছবির প্রতিটি বাচ্চার সম্পর্কে ডোসিয়ার আছে। ল্যাপটপ খুলে এক মিনিটেই লিলি বলে দিতে পারবেন, কাকে কবে কোত্থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। চাইল্ড কেয়ার ইউনিটে কার কতটা অগ্রগতি হল, সেই হিসেবটাও তাঁরা রাখেন। তাঁর ফাউন্ডেশনের বয়স প্রায় পনেরো বছর হয়ে গেল। প্রথম দিকে যে শিশুদের তিনি তুলে এনেছিলেন, তারা অনেকেই এখন সমাজের মূলস্রোতে ঢুকে পড়েছে। কেউ কেউ ফাউন্ডেশনের হয়েও কাজ করছে। এই কয়েকদিন আগে ইউএস আর্মির পোশাকে একটা ছেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। ছেলেটাকে প্রথমে তিনি চিনতে পারেননি। কিন্তু ও যখন বলল, ফাউন্ডেশনের প্রথম ব্যাচের ছেলে, তখন আনন্দে মনটা ভরে উঠেছিল লিলির। সঙ্গে সঙ্গে ডোসিয়ার বের করে জানতে পেরেছিলেন, অনাথ মার্কিন ছেলেটার নাম বিল কার্টার। ওর বাবা ইরাকের যুদ্ধে মারা গেছিলেন। লিলির আরও ভাল লেগেছিল জেনে, বিল সদ্য আর্মিতে ঢুকেছে। ওর প্রথম মাসের বেতন ডোনেট করতে এসেছে ফাউন্ডেশনে।
ঢং ঢং ঢং… গ্র্যান্ড ফাদার ক্লক জানাল, বেলা ন’টা বাজে। হঠাৎ লিলির খেয়াল হল, সিকিউরিটি স্টাফরা কেউ পৌঁছয়নি। স্টাফদের মধ্যে চিফ স্ট্যানলি গর্ডন খুব বিশ্বস্ত। খবর না দিয়ে আগে কোনওদিন গরহাজির হয়নি। ইদানীং স্ট্যানলির মধ্যে খানিকটা ঢিলেমি লক্ষ করছেন লিলি। বিশেষ করে, নায়গারায় শ্যুট আউটের ঘটনার পর থেকে। হয় স্ট্যানলি কোথাও বেশি ডলারের চাকরির অফার পেয়েছে। মুখে সেটা বলতে লজ্জা পাচ্ছে। নয়তো নিজেই সিকিউরিটি এজেন্সি খুলে বসতে চায়। মুশকিল হচ্ছে, ইউনিসেফ থেকে লিলিকে বলে দেওয়া হয়েছে, সিকিউরিটি ছাড়া উনি যেন বাইরে কোথাও যাতায়াত না করেন।
বাম কিমকে ফোন করার কথা লিলি ভাবছেন, এমন সময় সিকিউরিটি সিস্টেমের পর্দায় লায়লার মুখ। গেটের বাইরে থেকে কাঁদো কাঁদো মুখে ও বলল, ‘ম্যাডাম, কয়েক মিনিটের জন্য আপনার কাছে আসতে পারি?’
লায়লার শুকনো মুখটা দেখে লিলির মনে কুডাক দিল। তা হলে কি ইস্তানবুলে ডেমির্টাসের খারাপ কিছু হল? অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সিতে ও কখনও আসেনি। নিশ্চয়ই জরুরি দরকার। সুইচ টিপে সদর দরজার গেটটা তিনি খুলে দিলেন। কয়েক মিনিট পর লায়লা ভিতরে এসে দাঁড়াতেই, ওর দিকে তাকিয়ে লিলি চমকে উঠলেন। তাড়াতাড়ি ওকে সোফা বসিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোত্থেকে এলে?’
উত্তর না দিয়ে লায়লা মুখ দু’হাত দিয়ে ঢেকে কাঁদতে শুরু করল। লিলি বললেন, ‘ইস্তানবুল থেকে কি কোনও খারাপ খবর পেয়েছ?’
লায়লা বলল, ‘না, ডেমির্টাস ঠিক আছে। কিন্তু আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাকে টেররিস্টরা তুলে নিয়ে গেছিল। কোনও রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরেছি।’
কয়েক মিনিটের মধ্যেই লায়লা গুছিয়ে সব বলে ফেলল। পুলিশ যে ওকে মেডিক্যাল চেক আপের জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছিল, সে কথাও অকপটে বলল। একটা রাত্তির ও হাসপাতালে কাটিয়েছে। ভয় না পেয়ে ও পুলিশে কমপ্লেন করেছে শুনে লিলি মনে মনে তারিফ করলেন। পৃথিবীটা কী জঘন্য সব লোকে ভর্তি হয়ে গেছে। হাজার হাজার মাইল দূরে দুটো দলের মধ্যে তথাকথিত ধর্মযুদ্ধ চলছে। আর তার রেশ এসে পড়ছে আমেরিকার মতো একটা সুসভ্য দেশে। পুরো ঘটনাটা শুনে একটু খটকাও লাগল লিলির। তাঁর কাছের আরেকটা মানুষ জিহাদিদের টার্গেট হল। এটা কি জিহাদিরা প্ল্যানিং করেই করছে? লিলির একবার মনেও হল, লায়লা সবকিছু খুলে বলল না। জিহাদিরা কোথায় ওকে আটকে রেখেছিল? কে ওকে বেসমেন্ট থেকে বের করে নিয়ে এসে পুলিশের কাছে পৌঁছে দিল? বেশ কয়েক বছর ধরে ও নিউ ইয়র্কে আছে। জায়গাটা চিনবে না, এমনটা হতে পারে না।
লায়লাকে লিলি বললেন, ‘গেস্ট রুম গিয়ে তুমি রেস্ট নাও। ফ্রিজে খাবার আছে। গরম করে খেয়ে নিও। আমি ততক্ষণে জরুরি কয়েকটা কাজ সেরে নিই।’
লিভিং রুমে ফিরে লিলি হট লাইনে ধরলেন বাম কিমকে। ‘কী ব্যাপার বলুন তো? স্ট্যানলি আর ওর কলিগরা কেউ কিন্তু এখনও আসেনি কেন?’
ওদিক থেকে বাম কিম বললেন, ‘ম্যাডাম, জরুরি একটা দরকারে আমি আপনাকে ফোন করতে যাচ্ছিলাম। ভালই হল, ফোনটা আপনি করলেন। স্ট্যানলি আমায় কিছু বলে যায়নি। তবে, আমার সিকিউরিটির একজনের মুখে শুনলাম, ও না কি হঠাৎ মিচিগানে গেছে।’
‘মিচিগানে কেন? ওর ফ্যামিলি ওখানে থাকে না কি?’
‘না ম্যাডাম, ফ্যামিলি বলতে এখন ওর কিছু নেই। বউয়ের সঙ্গে রিসেন্টলি ওর ব্রেক আপ হয়ে গেছে। ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে ওর বউ পেনসিলভেনিয়ায় চলে গেছে। মিচিগানে স্ট্যানলির কোনও রিলেটিভ থাকে কি না, বলতে পারব না।’
‘কতদিনের জন্য গেছে, বলেছে কিছু?’
‘আমার সিকিউরিটি বলছিল, ইদানীং ও না কি অনেক বদলে গেছে। মনে হয়, সিকিউরিটি এজেন্সিতে ও আর কাজ করবে না। আপনি কিন্তু আর্মড সিকিউরিটি ছাড়া অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে বেরোবেন না ম্যাডাম। আমি এজেন্সিতে কথা বলে দেখছি, ও অ্যাবসেন্ট কেন? অন্য কাউকে পাঠাতে বলছি।’
‘আপনি আমাকে ফোন করতে চাইছিলেন কেন?’
‘ম্যাডাম, ফোনে কথাগুলো বলাটা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছি না।’
‘আমাকে অযথা টেনশনে ফেলবেন না মি. কিম।’
‘ম্যাডাম মনে হচ্ছে, আমাদের সফটওয়ার সিস্টেম হ্যাকড হয়েছে। ফাউন্ডেশনের সব ডেটা পাচার হয়ে যাচ্ছে। অ্যাকাউন্টসে নানা গরমিল দেখা যাচ্ছে। ক্রিসমাস ইভ-এর ছুটিতে কেউ এই কুকর্মটা করেছে।’
লিলি একটু উচ্চকিত স্বরে বললেন, ‘সে কী! কী করে হল?’
‘চ্যারিটি নেভিগেটর থেকে একজন হাই প্রোফাইল অফিসিয়াল প্রথমে আমাকে অ্যালার্ট করেন। শোনার পরই কাল রাত থেকে আমি ফাউন্ডেশনের অফিসে রয়েছি। জিমি রাইটস বলে আমার পরিচিত একজন এথিক্যাল হ্যাকারকে আমি সিস্টেমে বসিয়ে দিয়েছি। জিমি আমার খুব বিশ্বস্ত। গত দশ ঘণ্টা ধরে সে চেষ্টা করে যাচ্ছে, কোথা থেকে হ্যাকিং হয়েছে, সেটা খুঁজে বের করার। প্রাইমারিলি জিমি বলল, এর সঙ্গে জিহাদিদের লিঙ্ক খুঁজে পাচ্ছে। এবং সেটা হয়েছে নিউ জার্সির কোথাও থেকে।’
‘হ্যাকার কতটা ক্ষতি করেছে মি. কিম?’
‘জিমি বলল, খুব সামান্যই। ফাউন্ডেশনের টয় ডিভিশনের অ্যাকাউন্ট থেকে ক্র্যাকার হাফ মিলিয়ন ডলার ট্রান্সফার করেছে মরিশাসের এক ফাইনান্সিয়াল কোম্পানিতে। মনে হয়, ক্র্যাকার টোকা মেরে আমাদের রিঅ্যাকশন দেখতে চাইছিল। জিমি আরও বলল, হ্যাকিং অসমাপ্ত রেখে ক্র্যাকার অন্য কোনও কাজে ব্যস্ত। আপনি যদি অনুমতি দেন ম্যাডাম, তা হলে আমি জন মিকেলের সঙ্গে যোগাযোগ করব। এফবিআইয়ের সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট খুব শক্তিশালী।’
শুনে সোফায় বসে পড়লেন লিলি। হ্যাকিং আধুনিক সভ্যতার এক অভিশাপ। একটা মানুষ বা প্রতিষ্ঠানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে হ্যাকিং দানব। তাঁকে খুন করতে না পেরে জিহাদিরা তাঁর ফাউন্ডেশনেকে শেষ করে দিতে চায় না কি! যত বাচ্চা চাইল্ড ইউনিটগুলোতে থাকে তাদের খেলনা তৈরি করার জন্য ফাউন্ডেশনের একটা ডিভিশন আছে। মার্কেটে বিক্রিও হয় এবং খেলনাগুলোর ভাল চাহিদা আছে। ফাউন্ডেশনের ভাল একটা রোজগার। সেখানকার হিসেবে গণ্ডগোল থাকলে চ্যারিটি নেভিগেটরের শংসাপত্র তিনি পাবেন না। ডোনাররাও ভবিষ্যতে পিছিয়ে যেতে পারেন। নাহ, লিলি তা হতে দেবেন না। নিরাপত্তা নিয়ে সব সাবধানবাণী তিনি ভুলে গেলেন। নিজেকে নিয়ে কোনওদিনই তিনি ভাবেননি। সবসময় লিলি অগ্রাধিকার দিয়েছেন তাঁর প্রতিষ্ঠানকে। লায়লা যে তাঁর আশ্রয়ে এসে উঠেছে, সে কথাও তাঁর মনে রইল না। বাম কিমকে তিনি বললেন, ‘আমি এখুনি আসছি।’
