জিহাদি – ৭

(সাত)

ইচ্ছে ছিল না, তবুও সন্ধের দিকে মেক্সিকানদের একটা হ্যালোইন পার্টিতে এসেছেন লিলি গডউইন। একেবারে হাডসন নদীর ধারে একটা পার্কে। নায়গারায় হামলার পর সিকিউরিটি গার্ডরা তাঁকে চলাফেরায় সাবধান হতে বলেছেন। বিশেষ করে, এমন কোনও মিটিং বা পার্টিতে যাওয়ার ব্যাপারে, যেখানে অজ্ঞাত পরিচয় লোকজনের থাকার সম্ভাবনা। কিন্তু লিলি গডউইনের উপায় নেই। তিনি এমন একটা দায়িত্বে আছেন, যেখানে তাঁর কাজই জনসংযোগের। মেক্সিকানদের এই পার্টিটা আয়োজন করেছিল হুলা হুলা বলে একটা সংস্থা। আমেরিকায় বিপন্ন মেক্সিকানদের পাশে দাঁড়ানো যাদের মূল কাজ। বছর তিনেক ধরে এঁদের আমন্ত্রণ এড়িয়ে গেছেন লিলি। কিন্তু এ বার আর না করতে পারেননি। উদ্যোক্তাদের বলে দিয়েছেন, তিনি যাবেন, তবে এক ঘণ্টার বেশি পার্টিতে থাকতে পারবেন না।

পার্টিতে যাওয়ার অন্যতম কারণ আমন্ত্রিতদের তালিকা। কানাডার বিদেশমন্ত্রী ডোমেনিকো পেরেজ আছেন ওই তালিকায়। কানাঘুষোয় লিলি শুনতে পাচ্ছেন, কানাডার অভিবাসন দফতর তাদের নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল করবে। সারা বিশ্বের স্টেটলেস অর্থাৎ দেশহীন কিছু লোককে তারা কানাডায় বসবাস করার অনুমতি দেবে। তবে দেশছুটরা পেশাদার বা টেকনিক্যাল কোনও কাজে দক্ষ হলে ভাল হয়। বিশ্বে দেশহীন মানুষের সংখ্যা এই মুহূর্তে কম নয়। এক দেড়-কোটি তো হবেই। এই তালিকায় সাম্প্রতিক সংযোজন হল মায়নমারের রোহিঙ্গারা। লিলির যাবতীয় চিন্তা এখন এই রোহিঙ্গাদের নিয়েই। ইউনিসেফ তাঁরই উপর দায়িত্ব দিয়েছে রোহিঙ্গা শিশুদের কল্যাণের। কোথাও কোনও খড়কুঁটো দেখলে লিলি তা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছেন। হুলা হুলা-র হ্যালোইন পার্টিতে ডোমেনিকো পেরেজের সঙ্গে লিলির আলাপ করতে চাওয়াটাও সেই সুপ্ত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। কিছু রোহিঙ্গাকে যাতে ওরা কানাডায় থাকতে দেন। বেসরকারিভাবে তিনি আন্দাজের চেষ্টা করবেন, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে কানাডার মনোভাব কী?

ডোমিনিকো পেরেজকে যতটা বয়স্ক লিলি ভেবেছিলেন, ততটা নন। খুব বেশি হলেও তিরিশ। প্রায় ছয় ফুট লম্বা, সুদর্শন। পড়াশুনো করেছেন অক্সফোর্ডে। এই বয়সে কানাডার ছেলেরা ফুটবল আর বেসবল নিয়ে মেতে থাকে। লিলির মনে পড়ল, কানাডায় মাস খানেক আগে নতুন সরকার এসেছে। মিডিয়া মারফৎ তিনি জেনেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বয়স মাত্র বিয়াল্লিশ। বিশ্বের সবথেকে কমবয়সি প্রধানমন্ত্রী। তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা আর কত ভারিক্কি হবেন! পার্টিতে আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার দেওয়ার সময় পেরেজ কানাডার নতুন সরকারের কিছু উন্নয়নমূলক কর্মসূচির কথা বলেই বসে গেলেন। বুদ্ধিমান মানুষ, জানেন, পার্টির ফরফুরে মেজাজে বেশি রাজনীতির কচকচি লোকে পছন্দ করবে না। কিন্তু লিলি সুযোগটা ছাড়লেন না। বিশ্বে ক্রমাগত বাড়তে থাকা বিদ্বেষ আর দেশছুট মানুষদের সম্পর্কে হালকা কথা বললেন। এবং লক্ষ করলেন, পেরেজ তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শুনছেন। লিলি তাঁর কথা শেষ করলেন এই বলে, ‘ডোমেনিকো পেরেজের মতো তরুণ রাষ্ট্রনায়কদের উপর নির্ভর করছে, আগামী দিনে বিশ্ব কতটা শান্তিতে থাকবে।’

মঞ্চ থেকে নামতেই লিলি ঘেরাও হয়ে গেলেন মিডিয়ার লোকদের মাঝে। কেউ একজন প্রশ্ন করলেন, ‘ম্যাম, গতকালই একটা ক্যারাভান পৌঁছেছে সাউথ মেক্সিকোতে। আপনার কি মনে হয়, প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস তাদের উদ্দেশে যে মনোভাব নিয়েছেন, সেটা ঠিক?’

রাজনৈতিক কোনও প্রশ্নের উত্তর দেবেন না লিলি ঠিকই করে রেখেছেন, ইউনিসেফের পরামর্শদাতা হওয়ার পর থেকে। বিশেষ করে, এমন কোনও প্রশ্নের উত্তর, যাতে আমেরিকার সরকার জড়িয়ে আছে। একটা সময় ক্যারাভান কথাটা আরব যাযাবরদের সম্পর্কে বলা হত। এখন অন্য উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। আজকাল এক দেশ থেকে একদল লোক অন্য দেশে অনুপ্রবেশ করার জন্য বেরিয়ে পড়েন। এঁদের বলা হচ্ছে মাইগ্রান্ট ক্যারাভান। হন্ডুরাসে বিশাল ভূমিকম্প হয়েছিল বছর খানেক আগে। দেশটার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। হন্ডুরাসের নিঃসম্বল, অসহায় মানুষেরা দলে দলে মেক্সিকোতে ঢুকে পড়ছেন। তাঁদের লক্ষ শেষ পর্যন্ত আমেরিকা কি না, কেউ নিশ্চিতভাবে জানেন না। কিন্তু আগে থেকেই মিডিয়া ধুয়ো তুলে দিয়েছে, ওঁরা আমেরিকার বর্ডারে এসে অ্যামনেস্টি প্রার্থনা করবেন।

লিলি জানেন সবই। খুব দুর্ভাগ্যজনক, সেন্ট্রাল আমেরিকা থেকে একদল লোক স্টেটলেস-এর তকমা পেতে যাচ্ছে। তবুও, না জানার ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ‘তাই না কি? আমার কানে তো কিছু আসেনি।’

রিপোর্টাররা ছাড়ার পাত্র নন। একজন বললেন, ‘কেন, আপনি প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসের টুইট দেখেননি?’

‘কী লিখেছেন উনি তাতে?’

‘লিখেছেন, চার হাজার মানুষের ক্যারাভান মেক্সিকো দিয়ে আমেরিকার সীমান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন। তাদের মধ্যে মধ্য প্রাচ্যের কুখ্যাত অপরাধী আর ধর্মোন্মাদরা মিশে রয়েছেন। সেনাবাহিনী দিয়ে এঁদের থামানো যাবে না। কেননা, অনুপ্রবেশকারীরা বাসে করে অথবা হেঁটে সীমান্তে হাজির হতে পারেন। সেখানে পৌঁছে যদি অ্যামনেস্টি চান, তা হলে আমাদের কিছু করার নেই। ম্যাম, আপনার কি মনে হয়, প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস সাধারণ লোককে অযথা ভয় দেখাচ্ছেন?’

প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস কী বলেছেন, লিলি জানেন। কেন বলেছেন, তাও তাঁর অজানা নেই। মাসখানেকের মধ্যেই অন্তবর্তী নির্বাচন। প্রেসিডেন্টের টুইট আর কিছু নয়। নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য জনসমর্থন আদায়ের কৌশল। লিলি মৃদু হেসে বললেন, ‘আমাকে কেন এ সব কথা জিজ্ঞেস করছেন? রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে যদি কিছু জিজ্ঞাসা করার থাকে, তা হলে করুন।’

‘রোহিঙ্গাদের আর হন্ডুরানদের সমস্যাটা তো একই ম্যাম। দেশছুট হওয়া।’

লিলি বললেন, ‘আমার মনে হয়, তা নয়। রোহিঙ্গারা দেশছুট হতে চান না। নিজেদের জন্য তাঁরা আলাদা দেশ চান।’

‘সে রকম সম্ভাবনা কি আছে, ম্যাম?’

‘এখনই বলা সম্ভব নয়। মায়ানমার গর্ভমেন্টকে খানিকটা বোঝানো গেছে। দেশ থেকে বেরিয়ে যে সব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের অনেককেই মায়ানমার গর্ভমেন্ট ফিরিয়ে নিতে চাইছেন। রাখাইন প্রদেশে ফিরে গিয়ে তাঁদের যাতে কোনও হিংসার আবহে পড়তে না হয়, ওঁরা তারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। খুব সম্ভব নতুন বছরের আগেই রোহিঙ্গাদের বিরাটসংখ্যক একটা দল রাখাইনে চলে যাবে। খবরটা আপনারা লিখতে পারেন।’

যাতে ঘেরাও মুক্ত হতে পারেন, তার জন্য লিলি এক পা সামনের দিকে বাড়ালেন। তাঁর ইচ্ছেটা বুঝে সিকিউরিটি স্ট্যানলি গর্ডন পাশে এসে দাঁড়াল। মিডিয়ার দলটা এ-দিক সেদিক ছড়িয়ে গেল। স্ট্যানলি জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি এখানেই ডিনার করবেন ম্যাম?’

সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন লিলি। দেখে স্ট্যানলি বলল, ‘অর্গানাইজাররা অ্যানাউন্স করছিলেন। এখুনি মনে হয় কস্টিউম শো শুরু হবে। আপনাকে ওখানে যেতে হবে। ম্যাম, আমরা কাছাকাছিই আছি।’

স্ট্যানলি দূরে সরে যেতেই অল্পবয়সি একটা মেয়ে কাছে এসে বলল, ‘ম্যাম, আমার নাম রেজওয়ানা চৌধুরী। আপনার সঙ্গে কি কয়েক মিনিট কথা বলতে পারি? আমি যুগযুগান্ত কাগজের নিউ ইয়র্ক করেসপন্ডেন্ট। কাগজটা আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রকাশিত হয়।’

বাংলাদেশ সম্পর্কে লিলি এমনিতেই একটু দুর্বল। তিনি মানুষ হয়েছেন বাংলাদেশি গর্ভনেসের কাছে। পরিষ্কার বাংলায় তিনি বললেন, ‘আগে তো তোমাকে কখনও দেখিনি রেজওয়ানা?’

‘আমি ভেরি রিসেন্টলি নিউ ইয়র্কে এসেছি।’

আড়চোখে ডোমেনিকো পেরেজের দিকে একবার তাকালেন লিলি। দেখলেন, উনি চার-পাঁচজনের জটলায় দাঁড়িয়ে কথা বলায় ব্যস্ত। হাতে মদের গ্লাস। উনি ফাঁকা না হলে কথা বলা যাবে না। ততক্ষণ বাংলাদেশি মেয়েটার সঙ্গে কথা বলা যেতেই পারে। ভেবে লিলি বললেন, ‘বলো, তোমার কী জানার আছে।’

‘আপনি এত ভাল বাংলা বলছেন কী করে ম্যাম?’

উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে লিলি বললেন, ‘আমি আরও ছ’টা ভাষায় ফ্লুয়েন্টলি কথা বলতে পারি।’

‘চার-পাঁচদিন আগে আমাদের কাগজের ঢাকা এডিশনে একটা খবর বেরিয়েছিল, আমি সেই ব্যাপারেই আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই।’

ঢাকার কাগজের সাংবাদিক, নিশ্চয়ই রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করবে। তাই লিলি আগেই বলতে শুরু করলেন, ‘রোহিঙ্গাদের সমস্যা মিটিয়ে দেওয়ার কাজে ইউনিসেফ এক পা এগিয়েছে…’

বাধা দিয়ে রেজওয়ানা বলল, ‘আমার প্রশ্নটা রোহিঙ্গাদের নিয়ে নয়। ম্যাম, আপনি রোকেয়া সুলতানা বলে কাউকে চেনেন?’

শুনেই বুকের ভিতরটা একবার কেঁপে উঠল লিলির। তাঁর উপর হামলার খবরটা কি তা হলে লিক হয়ে গেছে? না-চেনার ভান করে তিনি বললেন, ‘রোকেয়া সুলতানা! উনি কে বলো তো?’

‘ঢাকায় বন্ধু বলে একটা এনজিও আছে, সেটা উনি চালান। আমাদের দেশের নামকরা সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট। উনি কিন্তু বলেছেন, আপনার সঙ্গে যথেষ্ট পরিচয় আছে।’

এ বার অস্বীকার করলে রোকেয়াকে ছোট করা হয়। লজ্জিত মুখে লিলি বললেন, ‘ছি ছি, এতক্ষণ আমার মনে পড়ছিল না কেন, কে জানে? ভাল করে চিনি। কেমন আছেন তিনি?’

‘রোকেয়া আপা ঢাকায় ফিরে গেছেন। কিন্তু ফের নার্সিং হোমে ভর্তি হয়েছেন। বুলেট ইনজুরির কারণে। এখানে ওকে কারা গুলি করেছিলেন, সে ব্যাপারে কি আপনার কিছু জানা আছে? আমাদের কাগজে উনি কিন্তু স্টেটমেন্ট দিয়েছেন, নায়গারা পার্কের বাইরে শ্যুট আউটের আগে, একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে উনি আপনার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তখনই গুলিটা ওর পেটে লাগে। আপনার সিকিউরিটির লোকজনই ওঁকে বাফেলোর এক হাসপাতালে নিয়ে যান।’

খবরটা যে রোকেয়ার মুখ দিয়ে ফাঁস হয়ে যাবে, লিলি তা স্বপ্নেও ভাবেননি। ওঁকে দোষও দেওয়া যায় না। মুখ বন্ধ রাখতে হবে, এ কথা ওকে বলে দেওয়া হয়নি। রেজওয়ানা যা বলেছে, সবই সত্যি। অপ্রত্যাশিত এই পরিস্থিতিটা তিনি কীভাবে সামাল দেবেন, লিলি তা বুঝতে পারলেন না। আমতা আমতা করে তিনি বললেন, ‘ঠিক। রোহিঙ্গা শিশুদের রিহ্যাবিলিটেশন নিয়ে কথা বলার জন্য সেদিন আমরা মিট করেছিলাম। কিন্তু আমি গাড়িতে উঠে যাওয়ার পর কী হয়েছিল, আমার জানা নেই। তুমি নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশের সঙ্গে কথা বলছ না কেন?’

‘নায়গারায় গিয়ে আমি শেরিফের সঙ্গে কথা বলেছি। উনি বললেন, শ্যুট আউটের ঘটনার কথা ওঁর জানা নেই। আমার মনে হল, উনি সবই জানেন। কিন্তু কোনও কারণে মুখ খুলছেন না। বাফেলোর হসপিটালে গেছিলাম, ওরা বললেন, সেদিন রাতে গাড়ির ধাক্কায় একজন ইনজিওয়র্ড অবস্থায় ভর্তি হয়েছিলেন। ট্রিটমেন্টের পর তাকে পরদিন বিকালেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। সত্যিটা কী, আপনি কি জানেন, ম্যাম? বুলেট ইনজুরিকে কার অ্যাক্সিডেন্ট বলে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে কেন? এর পিছনে কি অন্য কোনও রহস্য আছে? বাংলাদেশের মানুষ জানতে চায়।’

‘স্ট্রেঞ্জ! এতকিছু ঘটে গেছে, অথচ এখানকার মিডিয়ায় বিন্দুবিসর্গ লেখালেখি হয়নি! এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে, রোকেয়া আমার সঙ্গে যোগাযোগ করল না কেন?’

‘উনি নিজের ইচ্ছেয় চলে যাননি। খবর পেয়ে ওঁর ছেলে এসে ওঁকে নিয়ে গেছেন।’

‘ঢাকার কাগজে আর কী লেখা হয়েছে, রেজওয়ানা?’

‘অ্যান্টি আমেরিকান প্রোপাগান্ডা হচ্ছে। আমাদের প্রাইম মিনিস্টার না কি রোকেয়া আপার ব্যাপারে কথা বলেছেন আমেরিকান অ্যামব্যাসাডরের সঙ্গে।’

ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে লিলি ভাবতেও পারেননি। স্টেজে কস্টিউম কনটেস্ট বোধহয় শেষ হয়ে গেছে। প্রাইজ দেওয়ার জন্য হুলা হুলা-দের একজন ওকে ডাকতে এসেছেন। লিলি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। রেজওয়ানাকে উনি বললেন, ‘রোকেয়ার সঙ্গে আমি আজই একবার কথা বলব। যতদূর জানি, ওর সঙ্গে কারও শত্রুতা নেই। ওকে কেন লোকে গুলি করবে? তোমার কী মনে হয় রেজওয়ানা? কারা ওকে অ্যাটাক করতে পারে?’

‘আমাদের কাগজের সাংবাদিকরা মনে করছেন, এটা জামাইত ইসলামি জঙ্গিদের কাজ। নানা কারণে ওরা রোকেয়া আপার উপর বিরক্ত।’

‘আমার তা মনে হয় না রেজওয়ানা। তাই যদি হতো, বাংলাদেশি জঙ্গিরা আমেরিকায় এসে হামলা করার ঝুঁকি নেবে কেন? ওটা তো দেশেই করতে পারত।’

‘আপনার কী মনে হয় ম্যাম, জঙ্গিরা মিসফায়ার করেছে। মানে রোকেয়া আপা নন, অন্য কেউ ওদের টার্গেট ছিলেন?’

মাই গুডনেস! এ তো তির সোজা টার্গেটে মারছে! কী বলতে কী বলে ফেলবেন ভেবে, মেয়েটাকে এড়ানোর জন্য লিলি হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘এক্সকিউজ মি রেজওয়ানা, প্রাইজ দেওয়ার জন্য আমাকে পোডিয়ামে যেতে হবে। ওই দ্যাখো, কানাডার ফরেন মিনিস্টার আমার জন্য ওয়েট করছেন। পরে দরকার হলে আমাকে ফোন কোরো কেমন? তখন ডিটেলে কথা বলা যাবে।’

পোডিয়ামে ওঠার সময় স্ট্যানলি পাশ থেকে বলল, ‘ম্যাম, একটা খারাপ খবর আছে।’

খবরটা শোনার জন্য লিলি দাঁড়িয়ে গেলেন। স্ট্যানলি বলল, ‘এফবিআইয়ের অনুমানই ঠিক। বাংলাদেশি টেররিস্টরা স্টিল অ্যাকটিভ। এখানে বেশিক্ষণ থাকা আপনার ঠিক হবে না ম্যাম।’

‘কেন কী হয়েছে?’

‘জন মিকেল একটু আগে আপনার খোঁজ করছিলেন। জানতে চাইছিলেন, আপনি ঠিক আছেন কি না? তার পর উনি এমন একটা খবর দিলেন, যেটা ডিসটার্বিং। নায়গারায় যে ইন্ডিয়ান জেন্টেলম্যান আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন, একটু আগে তার উপর অ্যাটাক হয়েছিল।’

শুনে চমকে উঠলেন লিলি। তার মানে… কালকেতু নন্দী! তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ছেলেটি এখন কোথায়? হামলাটাই বা হল কীভাবে?’

 ‘ম্যাম, নায়গারায় সেদিন ছেলেটির সঙ্গে একজন বাংলাদেশি বিজনেসম্যান মি. পলাশ চৌধুরী ছিলেন। আপনি দেখলে হয়তো তাঁকে চিনতে পারবেন। এখানে তাঁর একটা অ্যাপার্টমেন্ট আছে চেলসিতে। মি. নান্ডি সেখানেই ছিলেন। আজ সন্ধেবেলায় হ্যালোইন কস্টিউমে টেররিস্টরা সেই অ্যাপার্টমেন্টে ব্রেক ইন করে। তখন ইন্ডিয়ান জেন্টেলম্যান ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। নিউ ইয়র্কের মতো হাই সিকিউরিটি জোনে আগে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি। বিশেষ করে, হ্যালোইনের সন্ধেতে।’

শুনে টেনশন বোধ করতে লাগলেন লিলি। হুলা হুলার এই পার্টিতে হ্যালোইন কস্টিউমে প্রচুর মানুষ তাঁর চোখের সামনে ঘোরাঘুরি করছেন। তাঁদের আসল চেহারা বোঝা মুশকিল। কে টেররিস্ট, কে নন, কে জানে? নাহ, আর বেশিক্ষণ পার্টিতে থাকা উচিত হবে না। প্রাইজ দিয়েই তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে যাবেন। স্ট্যানলিকে কাছাকাছি থাকতে বলে লিলি পোডিয়ামে উঠে গেলেন। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি লক্ষ করছেন, যখনই স্ট্রেস ফিল করেন, বা টেনশনে পড়েন, তখন ঘাড়ের নিচে পিঠের দিকটায় চুলকোয়। আর ভুল করে চুলকে ফেললে, চামড়ায় লাল চাকা চাকা দাগ হয়ে যায়। তখনই ডার্মাটোলজিস্ট বা প্লাস্টিক সার্জেনের কাছে ছোটেন লিলি। কালকেতু ন্যান্ডির উপর হামলার খবরটা শোনার পর থেকে তাঁর পিঠে সুড়সুড়ানি টের পেলেন লিলি।

মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে ফের টেররিস্ট অ্যাটাকের কথা শুনে। চাপ কমানোর জন্য লিলি পার্টিতে সেজে আসা বাচ্চাদের দিকে মন দিলেন। ছোটবেলায় তিনি এমন অসুস্থ থাকতেন, ড্যাডি কখনও হ্যালোইনের রাতে তাঁকে বাইরে বেরতে দিতেন না। বাড়িতে তাঁর সমবয়সিরা ক্যান্ডি উপহার নিতে এলেও, ড্যাডি তাদের বাইরে থেকে ফিরিয়ে দিতেন। হুলা হুলা পার্টিতে বাচ্চাদের হাসিখুশি মুখগুলো দেখে খুব ভাল লাগতে শুরু করল লিলির। সেরা কস্টিউমের প্রাইজ নিতে উঠে এল একটা বাচ্চা ছেলে। তার কস্টিউম দেখে কৌতুকবোধ করলেন তিনি। স্কন্ধকাটা ভূত। কস্টিউম মেকাররা পারেনও বটে! সত্যিই মনে হচ্ছে, বাচ্চাটা তার মুন্ডু হাতে ধরে আছে। ধড়ের ঠিক পিছনে কাটা গলার ভিতর একটা ছোট থলে বসানো। তাতে উপহার পাওয়া ক্যান্ডিগুলো বাচ্চাটা জমিয়ে রেখেছে। পুরস্কারের হাজার ডলারের চেক বাচ্চাটার হাতে তুলে দিলেন লিলি। পরক্ষণেই চমক, মাইক হাতে নিয়ে সে বলল, পুরস্কারের অর্থ চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনে দান করতে চায়। কথাটা বলেই সে চেক ফিরিয়ে দিল সংগঠকদের কাছে। পার্টিতে তাঁকে নিয়ে আসার কারণটা এ বার বুঝলেন লিলি। চেকটা তাঁর ফাউন্ডেশনেই যাবে।

ডোমিনিকো পেরেজ প্রাইজ তুলে দিচ্ছেন সেরা কস্টিউমে অ্যাডাল্ট জুটিকে। ভূত আর ডাইনি। রসিকতা করে তাঁদের বলছেন, আসল চেহারা দেখাতে। সঞ্চালক তাদের নাম দুটো জানিয়ে দিলেন। মহিলার নাম রোজিনা দেল বস্কে। আর তাঁর পুরুষ সঙ্গীর নাম পলাশ চৌধুরী। ভদ্রলোক ভূতের মুখোশটা খুলে ফেলার পর হাততালিতে হলঘর ফেটে পড়ল। পার্টিতে এই দ্বিতীয়বার লিলি চমকে উঠলেন। আরে, এই নামটা তো একটু আগেই স্ট্যানলির মুখে শোনা। এই সেই লোক, যাঁর ভাড়া করা গাড়ি চুরি করে টেররিস্টরা নায়গারায় শ্যুট আউট করেছিল! ভদ্রলোক হাঁটু গেড়ে বসে হাসিমুখে অভিনন্দন নিচ্ছেন দর্শকদের। অদ্ভুত তো! একটু আগে ওঁর চেলসির অ্যাপার্টমেন্টে অতবড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে, অথচ উনি দিব্যি হাসছেন?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *