জিহাদি – ৩১

(একত্রিশ)

একটা র‌্যাঞ্চ যে এত বিশাল জায়গা নিয়ে হতে পারে, কালকেতু ভাবতেই পারেনি। কী নেই তাতে? পাহাড়, নদী, ঝরণা, জঙ্গল. সমতলভূমি… সব আছে। মেন এন্ট্রান্স থেকে রোজিনা ম্যাডামদের রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিং পর্যন্ত পৌঁছতেই ওদের প্রায় আধ ঘণ্টা লেগে গেল। জেএফকে এয়ারপোর্ট থেকে আলবুকার্ক আসার ফ্লাইট ধরার জন্য বাড়ি থেকে ওরা ভোর পাঁচটায় রওনা হয়েছিল। সাড়ে পাঁচঘণ্টার প্লেন জার্নি। আলবুকার্ক এয়ারপোর্টে যখন প্লেন নামল, তখন বেলা পৌনে বারোটা। লারেইনা আর ওর মায়ের গাড়িতে মালপত্তর তুলে দেওয়া হল। রোজিনা ম্যাডাম, পলাশভাইয়ের সঙ্গে ও র‌্যাঞ্চে পৌঁছল বেলা একটার সময়। মূল গেটের পাশে বড় করে লেখা, রোজি র‌্যাঞ্চ।

গাঢ় নীল আকাশ, ঝকঝকে রোদ্দুর। নিউ ইয়র্কের ওই শীতল আবহাওয়া থেকে নিউ মেক্সিকোতে এসে সবাই হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। শীতের পোশাকও খুলে ফেলেছেন। আলবুকার্কে এই মুহূর্তে অতটা ঠাণ্ডা নেই। র‌্যাঞ্চের ভিতর দিয়ে গাড়িতে যাওয়ার সময়ই কালকেতুর চোখে পড়ল, আকাশে রঙিন দশ-বারোটা বেলুন উড়ছে। কাছাকাছি যেতেই রোজিনা ম্যাডাম বললেন, ‘ওগুলো হট এয়ার বেলুন। অনেক শৌখিন মানুষ আছেন, যাঁরা বেলুনে চড়ে সান রাইজ দেখতে চান। উপর থেকে জঙ্গলের জন্তু-জানোয়ারও পরিষ্কার দেখা যায়। ওই দেখুন, বেলুনে ট্যুরিস্টরা দাঁড়িয়ে রয়েছেন।’

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পলাশভাই ট্যুরিস্টদের দেখার চেষ্টা করলেন। বেলুনগুলো খুব বেশি উচ্চতায় ভেসে যাচ্ছে না। খুশি গলায় পলাশভাই বললেন, ‘সত্যি, আমেরিকানগো মতোন ইনোভেটিভ জাইত আর নাই। বিজনেস কী কইর‌্যা কইরতে হয়, হ্যাগো কাসে শিইখতে অইব। ম্যাডাম, বেলুন রাইডে আফনেরা কত কইর‌্যা চার্জ করেন?’

রোজিনা বললেন, ‘সানরাইজ দেখার জন্য পার আওয়ার মিনিমাম ফাইভ হান্ড্রেড ডলার তো অইবই। অহন ঠিক কত হইসে, কইতে পারুম না। দুপুর বেলায় কিসু কম। ভয় নাই, আফনে আমার গেস্ট। আফনেরে কিছু দিতে অইব না।’

ম্যাডামের গলায় ঠাট্টার সুর। কালকেতু আরও উসকে দিয়ে বলল, ‘পলাশভাই, চিটাগাংয়ের খৈয়াছড়ায় আপনি যদি র‌্যাঞ্চ করেন, তা হলে হট এয়ার বেলুনের একটা রাইড রাখবেন। আমাদের ইন্ডিয়ায় অনেকে শখ করে বেলুন রাইড করেন। আপনাদের দেশে আছে কি না জানি না।’

পলাশভাই বললেন, ‘প্রোফেশনালি হয় বইল্যা, আমি তো কহনও হুনি নাই। কালীপূজার দিন আমাগো ওহানে ফানুষ উড়ানোর চল আছে। আমাগো আমোদপুরে আমি নিজেও ফানুষ বানাইসি। অহন বাংলাদ্যাশের মার্কেট চাইনিজ ফানুষে ভর্তি হইয়্যা গেসে। আমি যদি বেলুন রাইড অ্যারেঞ্জ করি, তাইলে বাংলাদ্যাশে ফার্স্ট টাইম অইব। সান রাইজ রাইড… সমুন্দরের তলা থেইক্যা সূর্য উইঠ্যা আইতাসে, ভাবেন তো কী ফ্যান্টাস্টিক দৃশ্য অইব! ঠিক আসে কাইলকেতুভাই, আফনের রিকোয়েস্টটা আমার মনে থাইকব।’

রোজিনা ম্যাডাম ফুট কাটলেন, ‘গাসে কাঁঠাল, গুঁফে ত্যাল।’

পলাশভাই বললেন, ‘মশকরা কইরেন না ম্যাডাম। আমার ম্যাটারনাল গ্র্যান্ডফাদার কী কইতেন জানেন, জগতে অসম্ভব বইল্যা কিসু নাই। সাহস কইর‌্যা আগাইতে অইব। হ্যার নাম রণদাপ্রসাদ সাহা। ইস্ট পাকিস্তানে হ্যার মতোন রিচ তহন আর কেউ সিল না। ম্যাটারনাল গ্র্যান্ডফাদারের অ্যাডভাইস আমি সবসময় মাথায় রাখি।’

লম্বা কংক্রিটের রাস্তা এদিক ওদিক চলে গিয়েছে। র‌্যাঞ্চের কোন অঞ্চলে কী, বোর্ডে নির্দেশ দেওয়া আছ। কোথাও রুক্ষ প্রান্তর, মানুষজন নেই। কোথাও নদীর সাদা বালিয়াড়িতে অশ্বারোহীরা ঘোড়া ছোটাচ্ছেন। কাউবয়রা অনেককে হর্স রাইডিং শেখাচ্ছেন। কাউবয়দের মাথায় হ্যাট, পরনে একশো বছর আগেকার পোশাক। গাড়ি দেখে কাউবয়রা টুপি খুলে অভিবাদন জানাল। নদীর অপর প্রান্তে ঘোড়া আর বাইসনের দল আপন মনে চড়ে বেরানোর সময় ঘাস খাচ্ছে। একটা জায়গায় নেটিভদের বসতি চোখে পড়ল কালকেতুর। বোর্ডে লেখা, ‘হুয়ালাপাই ভিলেজ।’ গ্রামে ছোট ছোট কুটির, আলপনা দিয়ে সাজানো। খেতি জমিতে নেটিভরা চাষ করছে। তাদের বাড়ির সামনে কোথাও অদ্ভুত দেখতে মূর্তি দাঁড় করানো। কালকেতু বলেই ফেলল, ‘নেটিভদের বসতিটাও কি র‌্যাঞ্চের ভিতর?’

রোজিনা ম্যাডাম বললেন, ‘হ্যাঁ, আজকাল ইকো ট্যুরিজম অনেক লোক পছন্দ করেন। অনেক ট্যুরিস্ট নেটিভদের সঙ্গে থাকা, ওদের খাওয়া-দাওয়ার স্বাদ পেতে চান। ওদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতেও ইচ্ছুক। সেই কারণে নেটিভদের এনে রাখা হয়েছে।’

‘বাঃ’। পলাশভাই বলে উঠলেন, ‘খৈয়াছড়ায় আমরাও তাইলে চাকমাগো আইন্যা রাইখতে পারি।’

পলাশভাইয়ের কথা শুনে কালকেতু মজা পাচ্ছে। উনি কিন্তু খৈয়াছড়া প্রোজেক্টের কথা ভোলেননি। ঠাট্টা ইয়ার্কির মাঝে গাড়ি এসে দাঁড়াল প্রাসাদের মতো একটা বাড়ির সামনে। উল্টোদিকে পার্কিং স্পেসে অন্তত শ’খানেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নীল উর্দি পরা সিকিউরিটি গার্ড। সদর দরজার ডানদিকে বিরাট এরিয়া জুড়ে ক্যাসিনো। বহু লোক বসে সেখানে খেলছেন। বাঁ দিকে রিসেপশনে লারেইনা আর ওর মা দাঁড়িয়ে আছে। ওদের পাশেই অপূর্ব সুন্দরী এক মাঝবয়সি মহিলা। পরনে জামদানি শাড়ি। দেখেই কালকেতু বুঝতে পারল, ইনি রোজিনার মা। কাছে এসে রোজিনা ম্যাডামকে জড়িয়ে ধরে উনি বললেন, ‘কতদিন পর তরে দ্যাখলাম মা।’

পলাশভাইয়ের পাশে কালকেতু দাঁড়িয়ে। ভদ্রমহিলার মুখ দেখেই কালকেতু বুঝতে পারল, উনি আন্দাজ করতে পারছেন না, রোজিনা ম্যাডামের বয়ফ্রেন্ড কে? সন্দেহ নিরসন করার জন্য ও মাথা ঝুঁকিয়ে প্রণাম করে বলল, ‘আন্টি, আমি কালকেতু। পলাশভাইয়ের গেস্ট।’

রোজিনা ম্যাডাম মিটিমিটি হাসছেন। পলাশভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আহেন, আমি পরিচয় করাইয়া দিই। হ্যায় আমার মাম্মি… হেমলতা। আর মাম্মি, হ্যায় পলাশ।’

পলাশভাইও পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বললেন, ‘কী আইশ্চর্য, আমার মায়ের নাম আশালতা। কী মিল দ্যাখছেন।’

হেমলতা হেসে বললেন, ‘তহনকার দিনে আববা-আম্মুরা তো হ্যায় নামই রাখত। তা বাবা, তোমার বাসা ঢাকার কোথায়? আমি নারাণগঞ্জের মাইয়া।’

‘আমি অহন থাকি ধানমণ্ডীতে। কিন্তু আমাগো দ্যাশের বাড়ি আমোদপুরে।’

রসভঙ্গ করলেন রোজিনা ম্যাডাম। তাড়া দিলেন, ‘হ্যার ঠিকুজি পরে নিও মাম্মি। আমার মারাত্মক ঘুম পাইসে। লাঞ্চ কইর‌্যা একটু রেস্ট নিমু।’ কথাগুলো বলে তিনি আর দাঁড়ালেন না। লিফটের দিকে এগোলেন।

লারেইনার সঙ্গে পাঁচতলায় গেস্ট রুমে ঢুকে কালকেতুর চোখে বিস্ময় ঠিকরে বেরোল। এ তো কোনও ফাইভ স্টার হোটেলের কামরা। রোজিনা ম্যাডাম এত ধনী পরিবারের মেয়ে, সে সম্পর্কে ওর কোনও ধারণা ছিল না। সত্যি কপাল করে এসেছেন পলাশভাই। এমন একজন শিক্ষিত, তুখোড় বুদ্ধিসম্পন্ন, সুন্দরী মহিলাকে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে পাবেন। জানালা দিয়ে বাইরে দিকে তাকিয়ে ও দেখল, একটা নদী বয়ে যাচ্ছে। তার উপর বেশ কয়েকটা ইয়ট ভেসে বেরাচ্ছে। বিলাসের সব রকম উপকরণই র‌্যাঞ্চে মজুত। না এলে কালকেতু অনেক কিছু মিস করত।

লারেইনা তখনও ঘর ছেড়ে যায়নি। কালকেতু ওকে জিজ্ঞেস করল, ‘র‌্যাঞ্চ যে এত লাক্সারিয়াস হয়, সে সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না।’

লারেইনা হেসে বলল, ‘আলবুকার্কে এ রকম আরও পাঁচ-ছ’টা র‌্যাঞ্চ আছে। কিন্তু আমাদের রোজি র‌্যাঞ্চটাই সবথেকে বড়। মালিক মেক্সিকান বলে মেক্সিকো আর সাউথ আমেরিকা থেকে প্রচুর ট্যুরিস্ট আসেন। বিশেষ করে, কলম্বিয়া আর ভেনিজুয়েলা থেকে। বেশিরভাগই ড্রাগ ডিলার। হাতে প্রচুর ডলার। এখানে উড়িয়ে যান। এখন ক্রিসমাস উইক বলে কোনও রুম খালি নেই। কেমন লাগছে আমাদের র‌্যাঞ্চ?’

কালকেতু মনের কথাটাই বলল, ‘দারুণ।’

‘সূর্য ডুবুক, তার পর দেখবেন অচেনা জগতে ঢুকে পড়েছেন। কত রকমের প্রোগ্রাম। কোথাও বেলি ড্যান্সের ফ্লোর, কোথাও গানের পোডিয়াম। ম্যাজিক দেখতে চান, সেখানে হাজির থাকতে পারেন। এখানে একটা ট্যুরের ব্যবস্থা আছে। ছাদহীন বাসে করে ঘোস্ট জোনে ঘোরানোর। মাইল দশেক দূরে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝে একটা জায়গায় সত্যিই নানা রকম ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটে। খুব রোমাঞ্চকর সেই জার্নি। তিন-চারশো বছর আগে, হোয়াইটরা যখন এই অঞ্চলগুলো দখল করছিল, তখন নেটিভদের সঙ্গে ওদের লড়াই হয়েছিল। প্রচুর নেটিভ তাতে মারা যান। তাদেরই আত্মারা এখনও ওই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। সাহস করে যাবেন না কি সেখানে? চলুন ঘুরে আসি।’

মজা করে কালকেতু বলল, ‘আমি গেলে পলাশস্যারের সঙ্গে যাব। দেখি, উনি রাজি হন কি না?’

শুনে লারেইনা হিহি করে হাসতে লাগল। তার পর বলল, ‘থাক, আপনাকে যেতে হবে না। রোজিনা ম্যাডাম তা হলে আমাকে আস্ত রাখবেন না। তার চেয়ে বরং চট করে তৈরি হয়ে নিন। বেলা দেড়টার সময় লাঞ্চ। ডাইনিং হলটা এই ফ্লোরেই।’

লারেইনা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ওয়াশরুমে ঢুকে কালকেতু ফের একবার চমকাল। একদিকে দেওয়াল জুড়ে কাচের আয়না। সেখানে ছোট পর্দার টিভি চলছে। ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করলে আপনা থেকেই টিভি চালু হয়ে যাচ্ছে। দরজা খুললে টিভি বন্ধ। প্রযুক্তির এমন চমৎকারিত্ব কালকেতু আগে কখনও দেখেনি। টিভির পর্দার দিকে কয়েক সেকেন্ড ও হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এমন বিলাসবহুল র‌্যাঞ্চে সাধারণ মানুষরা তো আসেন না। তাঁদের কাছে স্নানের সময়টাতেও বিজনেস নিউজ গুরুত্বপূর্ণ। বাথটাবে শুয়েও যাতে টিভির পর্দায় তাঁরা চোখ রাখতে পারেন, তার জন্যই এই ব্যবস্থা।

গরম জলে স্নান করার সময় ও নিউজ রিডারের গলা পেল। ‘গতকাল নিউ ইয়র্কের অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সি থেকে যে সিরিয়ান জঙ্গিকে পুলিশ ধরেছিল, সেই মামুন আল ফারখ কবুল করেছে, ক্রিসমাস ইভ-এ সে হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই কমপ্লেক্সে ঢুকেছিল। তার টার্গেট ছিলেন চাইল্ড কেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট মিস লিলি গডউইন এবং তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে আমন্ত্রিত এক ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট কালকেতু ন্যান্ডি। উল্লেখ্য, আইএস টেররিস্টরা এর আগেও একবার ওই দু’জনকে হত্যার চেষ্টা করেছিল। এফবিআই আন্দাজ করছে, কিছুদিন আগে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার কারণেই মিস লিলি এবং মি. ন্যান্ডির নাম হিট লিস্টে।’

স্নান করা মাথায় উঠল কালকেতুর। টেররিস্টরা তা হলে এখনও ওদের পিছু ছাড়েনি। একটা প্রশ্ন ওকে ভাবিয়ে তুলল। টেররিস্টরা জানল কী করে, ও মিস গডউইনের বাড়িতে নেমতন্ন খেতে যাবে? খবরটা ওদের দিলই বা কে? চিরাগ, না ইমন? কাল রাতে রোজিনা ম্যাডাম নিজে ড্রাইভ করে অ্যাড্রিয়াটিকা রেসিডেন্সিতে ওদের নিয়ে গেছিলেন। চিরাগ বা ইমনের সেটা জানার কথা নয়। হ্যালোইনের দিন ভূতের কস্টিউম পরে ইমন গেছিল। আর কাল রাতে স্যান্টা ক্লজ সেজে মামুন। তা হলে কি সর্ষের মধ্যেই ভূত লুকিয়ে আছে! মিস গডউইনের কাছাকাছি এমন কেউ রয়েছে, যার সঙ্গে জিহাদিদের যোগাযোগ আছে? র‌্যাঞ্চে কয়েকটা দিন সুন্দর কাটবে, মনে হচ্ছিল। কিন্তু খবরটা শোনার পর এখন ওর মারাত্মক টেনশন হচ্ছে।

ঘরে ফিরে পোশাক বদলানোর ফাঁকে কালকেতু ঠিক করে নিল, ব্যাপারটা হালকাভাবে আর নেওয়া যাবে না। এখুনি একবার সুদীশের সঙ্গে কথা বলা দরকার। সুদীশ লিঁওতে ফিরে গেছে কি না, ও জানে না। মাঝে দু’দিন ওর সঙ্গে ফোনেও কথা হয়নি। সেল ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে কালকেতু ধরল সুদীশকে। জিজ্ঞেস করল, ‘টিভির খবরটা কি তুই শুনেছিস?’

উত্তর না দিয়ে সুদীশ পাল্টা জিজ্ঞেস করল, ‘তুই এখন কোথায়?’

‘আলবুকার্কে। রোজিনা ম্যাডামদের র‌্যাঞ্চে বেড়াতে এসেছি। পলাশভাইও আমাদের সঙ্গে আছেন।’

‘টিভির খবরটা ঠিক। এফবিআই জিহাদি মামুনকে পিটিয়ে, ওর মুখ থেকে সব বের করে নিয়েছে।’

‘চিরাগ বা ইমন… কেউ ইনভলভড?’

‘ইমন নয়, ফর সিওর। একটা খবর শুনলে তুই চমকে যাবি। নিউ জার্সির কোনও একটা বাড়ির বেসমেন্টে… আমার ধারণা পলাশভাইয়ের আউট হাউসে… মামুন আর চিরাগ একটা কুর্দ মেয়েকে তুলে নিয়ে আটকে রেখেছিল। তাকে দু’দিন ধরে রেপ করেছে। বাড়িরই একজন তাকে উদ্ধার করে নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশের কাছে পৌঁছে দেয়। মনে হয়, সে ইমন। কুর্দ মেয়েটা মামুন সম্পর্কে কমপ্লেন করেছিল। পুলিশ বুঝতে পেরে ওকে মামুনের ছবি দেখালে, মেয়েটা আইডেন্টিফাই করে। তবে, চিরাগ কিন্তু এখনও পালিয়ে বেরাচ্ছে।’

‘অনেক আগেই তোদের উচিত ছিল, ওকে অ্যারেস্ট করা।’

‘ভুল ধারণা। ওকে ছেড়ে না রাখলে, মামুনকে আমরা ধরতে পারতাম না। যাক গে, পলাশভাইকে তুই এখন কিছু জানাস না। আমি আজই হয়তো ওর বাড়িতে গিয়ে ইমনকে ইন্টারোগেট করব। আউট হাউস সার্চও করতে পারি। আর হ্যাঁ, দু’চারটে দিন তোদের নিউ জার্সিতে ফেরার কোনও দরকার নেই। মানে বলতে চাইছি, চিরাগ আমাদের হাতে ধরা পড়া না পর্যন্ত তোরা আলবুকার্কে থাকলে ভাল হয়।’

‘কেন? ফের অ্যাটেম্পট হতে পারে না কি?’

‘এই জিহাদিগুলো টার্গেট খতম না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়ে না। একের পর এক লোক লাগিয়েই যায়। তবে, কদ্দিন পারবে, জানি না। প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস ছাড়নেওয়ালা মানুষ নন। ইন্টেলিজেন্স মারফৎ উনি সিওর হয়ে গেছেন, জিহাদিদের দম ফুরিয়ে এসেছে। সিরিয়ায় গিয়ে কাল উনি আমেরিকান সোলজারদের একটা ট্রুপ তুলে নিলেন। জিহাদিরা নির্মূল হতে যাচ্ছে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।’

মিনিট দুয়েক পর ডাইনিং হলে পৌছে কালকেতু টের পেল, ভাল খিদে পেয়েছে। প্লেনে বেলা ন’টার সময় একটা স্যান্ডউইচ, খানিকটা ফ্রুট স্যালাড আর এক কাপ কফি খেয়েছিল। র‌্যাঞ্চে ঢোকার পর বৈভব দেখে ও ভুলেই গেছিল, দীর্ঘসময় পেটে কিছু পড়েনি। ডাইনিং হলে ব্যুফের ব্যবস্থা করা আছে। অন্তত, তিরিশ-পঁয়ত্রিশ ধরনের খাবার সাজানো। হলের একদিকে একটা পোডিয়াম। তাতে প্রায় সমবয়সী দু’জন ভদ্রলোক বসে আছেন। পনেরো-ষোলোজন অভ্যাগত চেয়ারে বসে। একটা ফাঁকা চেয়ারে কালকেতু বসে পড়ল।

তখনই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে রোজিনা ম্যাডাম পোডিয়ামে উঠে বলতে শুরু করলেন, ‘সবাইকে মেরি ক্রিসমাস। মঞ্চে যে দু’জন বসে আছেন, তাঁদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই। ডানদিকে যিনি বসে আছেন, তিনি আমার ড্যাডি রায়ান দেল বস্কে। এই ল্যাঞ্চের তিনিই হোস্ট। তাঁর পাশে যিনি বসে, তিনি বিশ্ববিখ্যাত ফোটোগ্রাফার রিচার্ড গাটম্যান। আজ তাঁর সম্মানেই লাঞ্চ। এঁরা দুই বাল্যবন্ধু। একটা সময় দু’জনে একই খবরের কাগজ… নিউ ইয়র্ক টাইমসে চাকরি করতেন। প্রায় এক দশক পর ওঁরা আজ মিলিত হয়েছেন। বন্ধুত্বের গোল্ডেন জুবিলি সেলিব্রেট করার জন্য।’

রিচার্ড গাটম্যান!! নামটা শুনে কালকেতুর মনে হল, নিয়তির কী আশ্চর্য পরিহাস। যাঁকে ও খুঁজে বেরাচ্ছে, তাঁর সঙ্গে অপ্রত্যাশিতভাবে এই র‌্যাঞ্চে দেখা হয়ে যাবে, ও ভাবতেই পারেনি! ভদ্রলোকের দিকে ও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। মাথায় ঝুঁটি বাঁধা চুল সাদা হয়ে গেছে। গালে খোঁচা দাঁড়ি। চশমার ফাঁকে উজ্জ্বল দুটি চোখ। চওড়া কাঁধ। উচ্চতা ছয় ফুটের বেশি। শরীরে এতটুকু মেদ নেই। পরনে খুব অল্প দামের হুডি। তাতেও ওর আভিজাত্য কমেনি। তাঁর পাশে থ্রি পিস স্যুটে রায়ান দেল বস্কেকে অনেক বেশি কর্পোরেট মনে হচ্ছে। অগ্রজ দুই সাংবাদিককে দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এল কালকেতুর। লাঞ্চের কথা ও ভুলে গেল। ওর মন বলল, এঁদের কারোর কাছ শিউলিদিদির খোঁজ ও পাবেই। রোজিনা ম্যাডামকে কালকেতু ধন্যবাদ জানাল, ওকে র‌্যাঞ্চে নিয়ে আসার জন্য।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *